|
অক্টোবর বিপ্লব: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অনপনেয় স্বাক্ষরসীতারাম ইয়েচুরি |
|
প্রথম পর্ব ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয় ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভের প্রক্রিয়ায় জোরালো অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল– যার ফলে বহু দেশ ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্তি লাভ করে। চীন বিপ্লবের ঐতিহাসিক বিজয়, ভিয়েতনামের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম, কোরীয় জনগণের লড়াই এবং কিউবা বিপ্লবের সাফল্য বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহে অত্যন্ত গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বিভিন্ন সাফল্য– দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বেকারত্বের অবসান ঘটানো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যাপক বিস্তার– বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামে গভীর প্রেরণা জুগিয়েছিল। এই সমস্ত বৈপ্লবিক পরিবর্তন মানব সভ্যতার গুণগত উত্তরণ ঘটিয়েছিল এবং আধুনিক সভ্যতার উপর চিরস্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছিল। সংস্কৃতি, নন্দনতত্ত্ব, বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রেই এর প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। আইজেনস্টাইন চলচ্চিত্র নির্মাণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। অন্যদিকে স্পুটনিকের সাহায্যে আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। সমাজতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি ও শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও বিংশ শতাব্দীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময় জুড়ে ইউএসএসআর বিপুল সাফল্য লাভ করে। তবুও মহাশক্তিশালী ইউএসএসআর কেন তার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারল না? সাধারণভাবে বলতে গেলে, দুটি ক্ষেত্রে ভুল বোঝাপড়া ছিল ও যার ফলে ভুল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। প্রথম ভুলটি ছিল সমকালীন বিশ্বের পরিস্থিতি এবং সমাজতন্ত্রের মূল ধারণা সম্পর্কে মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে। দ্বিতীয়টি ছিল সমাজতান্ত্রিক নির্মাণের সময় যে সকল বাস্তব সমস্যাগুলির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেগুলি সম্পর্কিত। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতনের পর, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) তার চতুর্দশ পার্টি কংগ্রেসে (জানুয়ারি, ১৯৯২) এই ঘটনার বিস্তারিত পর্যালোচনা করে এবং তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, সমাজতন্ত্রের এই বিপর্যয় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈপ্লবিক মতাদর্শকে যেমন নস্যাৎ করতে পারেনি, তেমনই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রাসঙ্গিকতাকেও অর্থহীন করে দেয়নি। ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে, বিশেষত ভারতের উপর প্রভাব অক্টোবর বিপ্লব সারা বিশ্বে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। এই বিপ্লব নতুন নতুন বৈপ্লবিক আন্দোলনগুলিকে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং জনগণের সংগ্রামকে আরও আপসহীন করে তুলেছিল। বিশেষত, ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা দেশগুলিতে স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যে যে সংগ্রাম চলছিল, তার ওপর এই বিপ্লবের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। অক্টোবর বিপ্লব শিক্ষা দিয়েছিল, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে তীব্রতর করতে হলে ব্যাপক জনসমাবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে আরো তীব্র করে তোলার ক্ষেত্রে কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল অক্টোবর বিপ্লব। অক্টোবর বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই, ঔপনিবেশিক বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের গণআন্দোলনের এক অভূতপূর্ব জোয়ার দেখা গিয়েছিল– ১৯১৯ সালে ইজিপ্টের অভ্যুত্থান, ১৯১৯-এর ১লা মার্চে কোরিয়ার আন্দোলন, ১৯২০ সালে ইরাকের বিদ্রোহ এবং মঙ্গোলিয়ার ১৯২১ সালের অভ্যুত্থান, যার ফলস্বরূপ মঙ্গোলিয়ায় বিশ্বের দ্বিতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালে চীনে শুরু হওয়া ৪ঠা মে-এর আন্দোলন ১৯২১ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গঠনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ভারতেও ১৯১৯-২০ সাল নাগাদ ব্যাপক শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। লেনিন তাঁর ‘জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্ন সংক্রান্ত থিসিস’-এ ঔপনিবেশিক দেশগুলির স্বাধীনতার সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন। বিশ্বব্যাপী জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সম্পর্কে এই বোঝাপড়া এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে, ফ্রান্সে বসবাসকারী হো চি মিন পরবর্তীকালে এর প্রভাবের কথা স্মরণ করতে গিয়ে বলেছিলেন— “...একজন কমরেড আমাকে ল্যুমানাইট (l'Humanite) প্রকাশিত লেনিনের ‘জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্ন সংক্রান্ত থিসিস’ পড়তে দিয়েছিলেন। ওই থিসিসে এমন বেশ কিছু রাজনৈতিক পরিভাষা ছিল, যেগুলি বুঝতে পারা বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু বারবার পড়তে পড়তে শেষ পর্যন্ত আমি এর মূল বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। লেখাটি আমার মনে কতটাই না গভীর আবেগ, উদ্দীপনা, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করেছিল! আনন্দে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। যদিও আমি আমার ঘরে একাই বসেছিলাম, তবুও যেন বিশাল জনসমাবেশের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছি, এমনভাবে আমি উচ্চস্বরে বলে উঠেছিলাম— ‘প্রিয় শহিদ দেশবাসী! আমাদের ঠিক এটাই প্রয়োজন, এটাই আমাদের মুক্তির পথ!’ (“The Path Which Led Me to Leninism”, 1960, Selected Works of Ho Chi Minh, Vol. IV.) তৎকালীন ঔপনিবেশিক দেশগুলির জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের প্রভাবিত করে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবীতে রূপান্তরিত করার বিষয়টির উপরে লেনিন বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন। ঔপনিবেশিক দেশগুলির তরুণ বিপ্লবীদের তিনি বলেছিলেন- (১) তাদেরকে একটি শ্রমিক শ্রেণির স্বতন্ত্র বিপ্লবী রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে, যদিও তখন এই সমস্ত দেশগুলিতে শ্রমিক শ্রেণির এমন দল গড়ে তোলার মতো উপাদান অত্যন্ত দুর্বল ছিল। (২) সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বুর্জোয়া শ্রেণিসহ অন্যান্য শ্রেণির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তুলতে হবে। (৩) সর্বোপরি, তিনি দেখিয়েছিলেন যে, শ্রমিক-কৃষক ঐক্যই হল জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের প্রধান ভিত্তি। এই বোঝাপড়াগুলিই সমগ্র ঔপনিবেশিক বিশ্বে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে নতুন শক্তিতে উদ্দীপ্ত করেছিল। আমরা মূলত ব্রিটিশ উপনিবেশগুলির জনগণের লড়াই সংগ্রামের সাথেই তুলনামূলকভাবে বেশি পরিচিত। কিন্তু আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশেও ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল মুক্তির লক্ষ্যে বৈপ্লবিক শক্তির উত্থান দেখে ফরাসি ও পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। ব্রাজিল ও লাতিন আমেরিকার পর্তুগিজ উপনিবেশগুলিতে অক্টোবর বিপ্লবের প্রেরণায় গড়ে ওঠা কমিউনিস্টরা জনগণের সংগ্রামকে উদ্দীপ্ত করার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে যেমন, দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, কেপ ভার্দে, কঙ্গো এবং উত্তর আফ্রিকার প্রায় সমস্ত দেশেই প্রভাবশালী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠেছিল। একইভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলন প্রভাব বিস্তার করেছিল সুদান, ইরান, ইরাক ও মিশরের মতো দেশেও। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের এই উত্থান এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, ঠাণ্ডাযুদ্ধের সময় যখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রধান স্লোগান ছিল ‘কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’, তখন চীন, ভিয়েতনাম ও কোরিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে পরিচালিত জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম অনিবার্যভাবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলিকে সমাজতন্ত্রের পথে নিয়ে যাবে। এই আশঙ্কা থেকেই আফ্রিকায় তারা এক ভয়াবহ পরিকল্পনা গ্রহণ করে, যার লক্ষ্য ছিল এই ধরনের নেতাদের হত্যা করা। কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা থেকে শুরু করে আগোস্তিনিয়ো নেতো, সামোরা মাশেল ও কেপ ভার্দের আমিলকার কাবরাল সহ দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা এবং বর্ণবৈষম্যবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের সেনানায়ক ক্রিস হানি— এঁদের সবাইকেই হত্যা করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, এই বৈপ্লবিক আন্দোলনগুলিই দেশগুলিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য কঙ্গোর মতো কিছু দেশে এর পরিণতি হয়েছিল নৈরাজ্য ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যমূলক শাসনের উচ্ছেদ এবং নামিবিয়ার স্বাধীনতা অর্জন— এই দুই ঐতিহাসিক ঘটনাই অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাব ও প্রেরণার সাক্ষ্য বহন করে। (ক্রমশ) লেখাটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে ডিসেম্বর মাসে ফ্রন্টলাইন পত্রিকার রাশিয়ার বিপ্লবের ১০০তম বার্ষিকী সংক্রান্ত বিশেষ সংখ্যায়।
প্রকাশের তারিখ: ১২-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |