উমর খালিদ ও শারজিল ইমাম: একটা দৃঢ় অবস্থান নিতেই হবে বিরোধীদের

বৃন্দা কারাত
‘ভোটের বোতাম এতটা জোরে টিপুন যাতে শাহীন বাগ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়’- ভোটারদের উদ্দেশ্যে করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সেই প্ররোচণামূলক বক্তব্যকে কে ভুলতে পারে? বিজেপি ভোটে হেরে যায়। এই নির্বাচনে পরাজয়ের পর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করা, সেখানে অন্তর্ঘাত ঘটানো এবং একে সাম্প্রদায়িক চেহারায় হাজির করাটা শাসক দলের তরফে যেন আরও বেশি করে অপরিহার্য হয়ে গেল। উমর খালিদ, শারজিল ইমাম বা অন্য আন্দোলনকর্মীদের বক্তব্যের পাশাপাশি যদি অনুরাগ ঠাকুর, পরবেশ ভার্মা, কপিল মিশ্র সহ অন্য বিজেপি নেতাদের বক্তব্যকে রাখলে স্পষ্ট হবে কাদের বক্তৃতা ঘৃণা ও সহিংসতায় উস্কানি জুগিয়েছে।

এই যে সুপ্রিম কোর্ট একই মামলায় অন্য পাঁচজনকে জামিন দিয়ে উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের বেলায় না-মঞ্জুর করে দিল, সেটা শুধুমাত্র দুজন ব্যক্তিকে নেওয়া নিছক একটি বিচারিক আদেশ নয়। এই বিষয়টি ভারতের সাংবিধানিক গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এক চরম উদ্বেগজনক মুহূর্তকে চিহ্নিত করে। একদিকে এই আদেশ নিয়ে ধর্মান্ধ হল্লাবাহিনী এবং তোতাপাখি সংবাদ মাধ্যমকে সঙ্গী করে শাসক দলের সোল্লাস উদ্‌যাপন, অন্যদিকে বামপন্থীরা ছাড়া মূলধারার বিরোধী দলগুলির রাজনৈতিক নীরবতা— সব মিলিয়ে যা দাঁড়ালো সেটার গভীর তাৎপর্য রয়েছে যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থেকে যাচ্ছে।

এই আদেশ একটি প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে যেখানে অরাজক আইনগুলিকে, বিশেষ করে বেআইনী কার্যকলাপ (নিবারক) আইন (ইউএপিএ)-কে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ রক্ষার ঘোষিত লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বিরোধী কণ্ঠস্বরের দীর্ঘকালীন কারাবন্দির উপকরণ হিসেবে সাধারণ মান্যতা প্রদান করা হয়। অপরাধকর্মে তাদের সরাসরি সম্পৃক্তা পাওয়া গেছে দাবি করে তদন্তকারী সংস্থা যে প্রাথমিক অনুমান হাজির করে তাকে মান্যতা দিয়ে বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও এন. ভি. আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ উমর খালিদ ও শারজিল ইমামকে ‘গুণগতভাবে পৃথক অবস্থানে’ বলে বিবেচনা করেছে।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

পরিহাসের বিষয়, অন্যদের চেয়ে এই দুজনের একমাত্র তফাৎ হল, হিংসাত্মক ঘটনাবলী চলাকালীন সময় এদের দুজনের কেউই দিল্লিতে ছিলেন না। শারজিল হিংসার ঘটনার একমাস আগে জানুয়ারি থেকেই জ্বালাময়ী ভাষণ দেওয়ার অভিযোগে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে কারাগারে আটক রয়েছেন। উমর খালিদ ছিলেন অন্যত্র। এই তথ্যগুলি যা তাদের জড়িত না-থাকার যুক্তিকে জোরদার করত সেটাকেই উল্টে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে বিকৃতভাবে বলা হয়েছে যে হিংসার ঘটনাস্থলে না-থাকাটাই তাদের সুচিন্তিত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ।

ইউএপিএ-র মামলায় জামিনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট এর আগে যে যুক্তিগ্রাহ্য অবস্থান নিয়েছিল এই রায় সেটাকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে। দানবীয় বলে অভিহিত এই আইনে এই বিচারিক আদেশ আরও বিপজ্জনক কতগুলি নতুন দিক যুক্ত করেছে। এই ব্যাখ্যায়, একজনকে হিংসায় সরাসরি যুক্ত থাকার বা উস্কানি দেওয়ার বাধ্যতা নেই। সড়ক অবরোধ, সর্বজনীন পরিসরে ব্যাঘাত অথবা ‘অর্থনৈতিক সুস্থিতি’কে ক্ষতি করছে বলে অনুমান করা যে কার্যকলাপকেই দেশদ্রোহ বলে চিহ্নিত করা যাবে।

আইনের এই সম্প্রসারিত ব্যাখ্যায়, শ্রমিকদের হরতাল, নিজেদের জমিতে খনি তৈরি বিরুদ্ধে আদিবাসীদের সড়ক অবরোধ, বাসস্থান রক্ষায় বস্তিবাসীদের বেআইনী উচ্ছেদ প্রতিরোধ— এই সবকিছুতেই ইউএপিএ প্রয়োগ করে গ্রেফতার করে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যাবে। তারপর আর ‘সোনালী ত্রিভুজ’ বলে গর্ব করা সংবিধানের ১৪ ধারা (সমতার অধিকার), ১৯ ধারা (বাকস্বাধীনতা) এবং ২১ ধারা (জীবনধারণ ও স্বাধীনতার অধিকার)-এর কীই-বা অবশিষ্ট থাকে? এই ব্যাখ্যা স্বৈরাচারী সরকারকে বিরুদ্ধমত ও দেশদ্রোহকে একাকার করে কারাগারে নিক্ষেপের ভীতিপ্রদর্শন করে তাদের নীতির সকল রকমের বিরোধিতাকে অবরুদ্ধ করবে। 

চরমতম অন্যায়ের এই দৃষ্টান্তের অন্তঃস্থলে রয়েছে আরেকটি সুকঠিন বাস্তবতা: প্রাথমিক অনুমান এবং বাস্তবে ঘটনাবলীর পর্যায়গুলি সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে। হিংসাত্মক ঘটনার প্রেক্ষাপট ছিল সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ-এর বিরোধিতা। এই বিরোধিতা সামগ্রিকভাবে ছিল শান্তিপূর্ণ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং জাতি, সম্প্রদায়, ধর্ম ও আঞ্চলিকতার এক অভূতপূর্ব ঐক্যের স্বাক্ষরবাহী। এই প্রতিবাদকে কালিমালিপ্ত করাই হয়ে গেল ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দিল্লি নির্বাচনে বিজেপির প্রচারের মূল সুর।

‘ভোটের বোতাম এতটা জোরে টিপুন যাতে শাহীন বাগ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়’- ভোটারদের উদ্দেশ্যে করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সেই প্ররোচণামূলক বক্তব্যকে কে ভুলতে পারে? বিজেপি ভোটে হেরে যায়। এই নির্বাচনে পরাজয়ের পর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করা, সেখানে অন্তর্ঘাত ঘটানো এবং একে সাম্প্রদায়িক চেহারায় হাজির করাটা শাসক দলের তরফে যেন আরও বেশি করে অপরিহার্য হয়ে গেল। উমর খালিদ, শারজিল ইমাম বা অন্য আন্দোলনকর্মীদের বক্তব্যের পাশাপাশি যদি অনুরাগ ঠাকুর, পরবেশ ভার্মা, কপিল মিশ্র সহ অন্য বিজেপি নেতাদের বক্তব্যকে রাখলে স্পষ্ট হবে কাদের বক্তৃতা ঘৃণা ও সহিংসতায় উস্কানি জুগিয়েছে।

এই নিবন্ধ লেখক সপ্রমাণ ভিডিও সহ এই বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে পুলিসে অভিযোগ এবং আদালতে মামলাও করেছে। কিন্তু কোনো ধরনের নিবর্তনমূলক পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হল না। বরং ভিডিও প্রমাণে দেখা গেল পুলিস দাঙ্গাকারীদের সাথে যোগসাজশে দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির সংখ্যালঘু আয়োগ অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উপ-রাজ্যপালের কাছে চিঠি লিখে কার্ফু বলবতের আবেদন করে। একইদিনে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও পুলিশ কমিশনার অমূল্য পট্টনায়ক নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রতুলতা নিয়ে রাজধানীর আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। 

অপ্রতুল পুলিশ বাহিনী মোতায়েনের জন্যে দায়ী কে? কেন সামরিক বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হল না? কেন কার্ফু ঘোষণায় বিলম্ব হল এবং কেনই বা সেটা শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ করা হল? সরকারি তথ্য অনুযায়ী ৫৩জন মৃত মানুষের ৪১জনই মুসলিম সম্প্রদায়ের এবং যাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও উপাসনাস্থল ধ্বংস করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই মুসলিম। অতীতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মতোই এই বিলম্বিত এবং বাছাই-করা সরকারি তৎপরতা দাঙ্গাকারীদেরকে অধিকতর নৃশংস হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

তারপরেও আমাদেরকে বিশ্বাস করতে বলা হয় যে, সহিংসতার গোটা ঘটনাবলী মাত্র ১৮টি মানুষের দ্বারা পরিকল্পিত ও বাস্তবায়িত এবং যাদের বেশিরভাগই তরুণ ছাত্র। ঘটনাবলীর যে আরেকটি দিক উপেক্ষণীয় নয়, তা হল সাংবিধানিক বিবেচনা থেকে। যে মুসলিম আন্দোলনকর্মীরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতা করেছে তাদের কালিমালিপ্ত করা। যে ১৮জনের ওপর ইউএপিএ আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁদের মধ্যে তিনজন নারী সহ ১৬জনই মুসলিম। সে সময়ে দায়েরকৃত আনুমানিক ৭৫১টি মামলার একের পর একটির ক্ষেত্রে দুর্বল তদন্ত ও সন্দেহজনক সাক্ষী হাজির করার জন্যে নিম্ন আদালত দিল্লি পুলিসের কড়া সমালোচনা করেছে।

বিরোধী দলগুলি, বিশেষ করে কংগ্রেসের জন্যে কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়— এই প্রশ্নে সুস্পষ্ট এবং অবিচ্ছিন্নভাবে সোচ্চার হওয়া। নীরবতা কার্যত অবিচারে পরিণত হয়। বিশেষ করে যখন গতানুগতিক প্রশাসনিক কাজেও সাম্প্রদায়িক রঙ চাপানো হয়। দিল্লি দাঙ্গা, ভীমা কোরেগাঁও কিংবা নিউজক্লিক মামলায় আদালতের অন্যায় আদেশ বা ইউএপিএ-র মতো অরাজক আইনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক নিপীড়ন নামিয়ে আনার বিরুদ্ধাচারণ করার ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্ততা দেখা যায়, তখন শাসক সরকারকে প্রকৃত বিচারে তার নিপীড়ক ভূমিকার জন্যে কোনো ধরনের মূল্য চোকাতে হয় না। এমন একটি রাজনৈতিক বাতাবরণে সাধারণ জামিন এবং ন্যূনতম মানবিক চাহিদা না-মঞ্জুরের মতো নিষ্ঠুরতায় বিচারিক হেফাজতে স্ট্যান স্বামীর মৃত্যুর ঘটনাও স্বাভাবিকতা অর্জন করে ফেলে।

উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের মামলার মতো বিষয়ে বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণের অপারগতা প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার সংগ্রামকেই দুর্বল করে।

অনুবাদ- শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
ঋণ- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস


প্রকাশের তারিখ: ১৩-জানুয়ারি-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org