নারী নির্যাতন প্রসঙ্গে কাকাবাবুর দুটি লেখা

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ
প্রকাশিত যেদুটি বিতর্কমূলক লেখা এখানে পুনরুদ্ধৃত করছি তার মধ্যে সমকালীন এক বিশেষ সংকটের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের কথা উঠেছে এবং তাঁর যুক্তির অংশ-হিসাবেই লেখক নিয়ে আসছেন কমিউনিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে মেয়েদের সামাজিক অবস্থানের বিশ্লেষণ, যা আজকের সাম্প্রদায়িক বাড়বাড়ন্তের মুহূর্তে নতুন করে স্মরণ করার যোগ্য।

মুখবন্ধ

আমাদের দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এই আন্দোলনে এবং কমিউনিস্ট পার্টিতে মেয়েদের যোগদান। এই ইতিহাস থেকে জানা যায় যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সূত্রপাত যদিও গত শতাব্দীর কুড়ির দশকের গোড়াতেই, তবু কমিউনিস্ট আন্দোলনে মেয়েদের প্রবেশ আরো বেশ খানিকটা পরে ঘটেছে। কিছু কিছু কলকারখানায় নারী-শ্রমিকদের উপস্থিতি ছিল, এইসময়ের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনগুলিতে সংখ্যায় কম হলেও তাঁরা যোগ দিয়েছেন। কিন্তু বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম নারী সদস্য লতিকা দাশ (সেন) সদস্যপদ লাভ করেন ১৯৩৬ সালে, ১৯৩৮ সালে আরো দুজন নারী এই সদস্যতা পান। একজন কনক দাশগুপ্ত (মুখোপাধ্যায়), অন্যজন কমলা চ্যাটার্জি। চল্লিশের দশকের গোড়া থেকে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির বেশ কিছু নারী সদস্য AIWC-র মতো জাতীয় মহিলা সংগঠনগুলির ভিতর থেকে কাজ করছিলেন সেকথা আমরা জানি। পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পরে ১৯৪৩ সালে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে তাঁদের নিজস্ব সংগঠন, মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি এবং দুর্ভিক্ষ দাঙ্গা দেশভাগের উত্তাল সময় জুড়ে এই সংগঠনটি প্রাণপাত কাজের মধ্য দিয়ে বিস্তার লাভ করে এবং মজবুত হয়ে ওঠে।

এটা গেল একদিকের কথা। অন্য যে দিকটি নিয়ে আমাদের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে তা হল এই যে কমিউনিস্ট পার্টির চিন্তায় তথা তার দলিল-দস্তাবেজে নারীমুক্তির প্রসঙ্গটিকে কোন্‌ অভিমুখ থেকে দেখা হয়েছে; এ নিয়ে আলাপ-আলোচনার কোনো প্রমাণ রয়েছে কিনা। এটা বলতেই হবে যে প্রথমদিকের দলিলগুলিতে আলাদাভাবে মেয়েদের প্রসঙ্গটি বিশেষ পাওয়া যায় না। আমরা  কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের ১৯২৬ এবং ১৯২৭ সালে ‘গণবাণী’তে প্রকাশিত যেদুটি বিতর্কমূলক লেখা এখানে পুনরুদ্ধৃত করছি তার মধ্যে সমকালীন এক বিশেষ সংকটের প্রেক্ষাপটে মেয়েদের কথা উঠেছে এবং তাঁর যুক্তির অংশ-হিসাবেই লেখক নিয়ে আসছেন কমিউনিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে মেয়েদের সামাজিক অবস্থানের বিশ্লেষণ, যা আজকের সাম্প্রদায়িক বাড়বাড়ন্তের মুহূর্তে নতুন করে স্মরণ করার যোগ্য।

কুড়ির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বেশকিছু ঘটনা ঘটে। তাতে আরো উশকানি দিতে হিন্দুমহাসভা এবং সদ্যোজাত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ যে প্রচার চালাচ্ছিল দুটি লেখারই উদ্ভব সেই বিতর্ক থেকে। সেসময়ে বেশকিছু বাংলা সংবাদপত্র এই হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থনে দাঁড়িয়ে হিন্দু নারীর ওপর মুসলিম পুরুষের অত্যাচারকে বাংলায় নারীনির্যাতনের মূল কারণ বলে চালানোর চেষ্টা করছিল। তার জন্য বিকৃত তথ্যের অবতারণা করতেও তারা কসুর করত না। যেন, বাংলায় মুসলিম পুরুষরা না থাকলে মেয়েরা সুরক্ষিতই থাকত। দুটি প্রবন্ধেই মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের মূল প্রতিপাদ্য, নারীনির্যাতনের এই সাম্প্রদায়িক ব্যাখ্যা আমাদের নজরকে সরিয়ে দিতে চায় ধর্ম নির্বিশেষে যে কোনো শ্রেণিসমাজে মেয়েদের ওপর যে জুলুম চলে তার থেকে। এধরনের আক্রমণের আসল কথা কেবল ধর্মের নামে ঘৃণার বিস্তারে মদত জোগানো নয়, যেকোনো রক্ষণশীল সমাজের পক্ষে নারীর ওপর যে নিয়ন্ত্রণ অত্যাবশ্যক তাকেই জোরদার করা।  

মালিনী ভট্টাচার্য

নারী-নির্য্যাতন

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ

এক এক সময় এক একটা বিশেষ জিনিসের উপরে আমাদের খবরের কাগজ ওয়ালাদের ঝোঁক চেপে যায়। আজকাল কাগজের পাতা উল্টালেই নারী ধর্ষণ বা নির্য্যাতনের শিরোনাম আমরা দেখতে পাই। ভারতবর্ষে নারীদের যে অবস্থা আমরা করে রেখেছি। তাতে তাদের উপরে অত্যাচার না হওয়াটাই খুব আশ্চর্য্যের বিষয়। নারীর কোনো পৃথক সত্তা আমাদের দেশে নেই । এদেশে নারী পুরুষের খেলার পুতুল, সখের সামগ্রী। কাজেই, নারীদের উপরে অত্যাচার যদি এ দেশে না হয় তা-হলে আর কোন দেশে হবে ?

খবরের কাগজ ওয়ালারা যে এ নারী-নির্য্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, এটা খুবই আনন্দের বিষয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু, ব্যাপারটা একটুকু তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারা যায় যে কোনো শুভ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে তাঁরা নারী নির্য্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না। এখানেও আর আর সব বিষয়ের ন্যায় সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধির দ্বারাই তাঁরা প্ররোচিত হচ্ছেন। কারণ, যখনই আমরা এ বিষয়ে কোনো সংবাদ কাগজে পড়ি তখনই দেখতে পাই যে কোনো না কোনো মুসলমানই হিন্দু নারীর উপরে অত্যাচার করেছে, অন্ততঃ ‘মুসলমান দুর্বৃত্তের দ্বারা হিন্দু নারী ধর্ষণ’ এরূপ শিরোনামই খুব বড় বড় অক্ষরে কাগজে ছাপান হচ্ছে। সত্যই কি হিন্দু নারী ধর্ষণের একমাত্র ঠিকা মুসলমানরাই নিয়েছে? হিন্দুর দ্বারা হিন্দু নারী ও মুসলমানের দ্বারা মুসলমান নারী কি কখনো ধর্ষিতা হয় না? ‘আনন্দ বাজার পত্রিকা’ ও ‘নায়ক’-এ হিন্দুর দ্বারা হিন্দু নারী ধর্ষণের খবর আমরা পড়েছি, কিন্তু, সে সব খবরের শিরোনাম কখনো তেমন বড় বড় অক্ষরে ছাপান হয় না যেমনটা করা হয় মুসলমানের বেলা। নিশ্চই মুসলমানদের মধ্যে এমন অনেক পশু আছে যারা নারীর উপরে পাশব অত্যাচার করেছে বা করে থাকে। সে সকল মুসলমান সকলেরই ঘৃণার পাত্র। কিন্তু, সত্যের খাতিরে এ কথাও মেনে নিতে হবে যে নারীর উপরে বিশেষ করে হিন্দু নারীর উপরে, পাশব ব্যবহারটা কেবলমাত্র মুসলমানের একচেটিয়া নয়। নারী-ধর্ষণ যে করে—হিন্দু হোক, মুসলমান হোক,—তার দৃষ্টি পড়ে কেবলমাত্র নারীরই উপরে, তা সে নারী যে সমাজেরই হোকনা কেন। আদালতের মোকদ্দমার বিবরণ পাঠে আমাদের একথার সত্যতা সকলেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষানলে ঘৃতাহুতি দেবার জন্যেই যে জিনিসটি সাম্প্রদায়িক নয়, সে জিনিসটিও সাম্প্রদায়িক রঙে রঞ্জিত করে কাগজের পরিচালকগণ সকলের চোখের সামনে ধরে দিচ্ছেন। এতই অন্ধ তাঁরা হয়ে গেছেন যে এর দ্বারা কি সর্ব্বনাশ তাঁরা দেশের করছেন তা তাঁরা দেখেও দেখছেন না।

গণবাণী : ২০ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬

‘আসল কথাটা কি?’

মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ

ওপরের লেখা শিরোনামা দিয়ে শ্রীবটুক ভৈরব ৬ই মে তারিখে ‘আত্মশক্তি’তে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন। ২৮শে এপ্রিল তারিখের ‘গণবাণী’তে ‘অর্থনীতিক অসন্তোষ’ নাম দিয়ে আমরা যে প্রবন্ধটি প্রকাশ করেছিলাম শ্রীবটুক ভৈরবের প্রবন্ধটি তারি সম্বন্ধে লেখা। পূর্ববঙ্গের হিন্দু-মুসলিম বিরোধ নিয়ে ২৩শে এপ্রিলে ‘ফরওয়ার্ড’-এ একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই প্রবন্ধটিকে ভিত্তি করেই আমাদের ‘অর্থনীতিক অসন্তোষ’ শীর্ষক প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল। শ্রীবটুক ভৈরব আমাদের জিজ্ঞাসা করেছেন ‘আসল কথাটা কি?’ এ প্রশ্নের জবাব দিতে হলে আমাদের প্রথমেই বলতে হবে, আসল কথা এই হচ্ছে যে, শ্রীবটুক ভৈরব মশায় আমাদের প্রবন্ধটি ভাল করে পড়েননি। এতটুকুও নিরপেক্ষ মন নিয়ে তিনি যদি আমাদের প্রবন্ধটি পড়তেন তা হলে তাকে ছদ্মনামের আড়ালে দাঁড়িয়ে কখনো জিজ্ঞাসা করতে হতো না যে আসল কথাটা কি?

আমাদিগকে সাম্যবাদী বলে বটুকজী সার্টিফিকেট দিয়েছেন। হাঁ, আপনাকে সাম্যবাদী বলে পরিচয় দেবার ধৃষ্টতা এ অধম লেখকের আছে। যিনি কোনো লোককে সাম্যবাদী হওয়ার সার্টিফিকেট দিতে পারেন তিনি নিশ্চয়ই এটুকু জানেন যে সাম্যবাদীরা কখনো কোনো বিশিষ্ট ধর্মের গণ্ডির ভিতরে দাঁড়িয়ে কোনো কিছুর বিচার করেন না। তাঁরা প্রত্যেক বস্তুরই বিচার বৈজ্ঞানিকভাবে করেন এবং ধর্মের গণ্ডির বাইরে দাঁড়িয়েই করেন। কিন্তু, এখানেই আমাদের সহিত বটুকজীর একটুকু তফাত রয়েছে। তিনি দু’টো গণ্ডির ভিতরে আপনাকে আবদ্ধ করে রেখে তবে ব্যাপারটিকে দেখতে চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ তিনি যে আপনাকে শুধু হিন্দুত্বের গণ্ডির ভিতরে আবদ্ধ রেখেছেন তা নয়, তাঁর ছদ্মনামের আবরণ ভেদ করে ব্রাহ্মণত্বর গন্ধও বেরুচ্ছে। হিন্দু শুধু তিনি নন, ব্রাহ্মণও বটে। কাজেই আমাদের দেখার সহিত তার দেখার তফাত হওয়াটা কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।

তিনি লিখছেন – ‘হিন্দু নেতারা নীরব-সরব হবার কোনো প্রয়োজন নেই বলে’ কিন্তু এদিকে দেবদেবীর মন্দির আর স্ত্রীলোকের উপর অত্যাচার সমান বেগেই চলেছে। একটা নূতন থিওরি খাড়া না করলে আর মুখরক্ষা হয় না! কাজেই আমাদের সাম্যবাদী সহযোগী গণবানী একটা নূতন থিওরি নিয়ে আসরে নেমেছেন। তিনি বলেছেন – ‘বাংলা দেশের নানা স্থানে যে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ বেধে উঠেছে এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অর্থনীতিক অসন্তোষের ওপরে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। দেবদেবীর মন্দির আর স্ত্রীলোকের ওপরে অত্যাচার চলেছে বলে ‘গণবাণী’তে নূতন থিওরি কেনই বা খাড়া করতে হবে, আর কেনই বা খাড়া না করলে মুখরক্ষা হবে না একথাটার কোনো জওয়াব শ্রীবটুক ভৈরব মশায় দিতে পারেন কি? ‘গণবাণী’ সাম্যবাদীদের কাগজ নয়— ‘বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিকদল’-এর কাগজ। এ-দল যে প্রোগ্রাম গ্রহণ করেছে তা সাম্যবাদীদের প্রোগ্রাম নয়, একটা উন্নত জাতীয় প্রোগ্রাম মাত্র। অর্থাৎ অন্যান্য জাতীয় দলের প্রোগ্রাম প্রতিক্রিয়াশীল, বঙ্গীয় কৃষক ও শ্রমিক দলের প্রোগ্রাম তা নয়। যাক, আগেই বলেছি এ লেখক একজন সাম্যবাদী (কম্যুনিস্ট) বটে। শ্রীবটুক ভৈরব কি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, সাম্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও এ লেখক মুসলমানদের সকল অপকর্মের সমর্থন করতে সদাই ব্যস্ত থাকে এবং তারই জন্যে তাদের মন্দির আর স্ত্রীলোক নিয়ে উৎপাত করাকে সমর্থন করার জন্যেই অর্থনীতিক অসন্তোষের থিওরিকে খাড়া করেছে? ঘৃণিত সাম্প্রদায়িকত্বের ব্যবসায় আমরা কখনো সমর্থন করিনি। আর কিছু দাবি করার আমাদের থাক বা না থাক এটুকু দাবি করার অহঙ্কার আমাদের আছে। শ্রীবটুক ভৈরব আদতে যে ‘ফরওয়ার্ড’-এর হয়ে ওকালতি করতে আসরে অবতীর্ণ হয়েছেন সে ‘ফরওয়ার্ড’কে সাম্প্রদায়িকত্ব মাঝে মাঝে অন্ধ করে দিয়ে থাকে। ২৩শে এপ্রিল তারিখের ‘ফরওয়ার্ড’-এর লেখার উল্লেখ আমরা আমাদের ‘অর্থনীতিক অসন্তোষ’-এ করেছি। ২২শে এপ্রিলের ‘ফরওয়ার্ড’ বরিশালে মুসলমানদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেবার কথা ছেপেছিলেন, অবশ্য সংবাদ হিসাবে। যদি নিরপেক্ষ বিচার করার ক্ষমতা ‘ফরওয়ার্ড’-এর থাকত তা হলে ২৩শে এপ্রিলের প্রবন্ধে ‘ফরওয়ার্ড’ নিশ্চয়ই সে-ব্যাপারটারও আলোচনা করতেন। গত বছরের কলকাতার হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কথাও আমাদের মনে আছে। সে-সময়ে পরস্পরের প্রতি সকল প্রকার অত্যাচার করার জন্যে স্বধর্মাবলম্বীকে উপদেশ দিয়ে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় বদমায়েশেরা বিজ্ঞাপনী সব প্রচার করেছিল। মুসলমানদের তরফ থেকে যে সকল বিজ্ঞাপন বের হয়েছিল সেগুলি হাতে পড়লেই ‘ফরওয়ার্ড’ ছেপে দিতে এতটুকুও কসুর করতেন না। কিন্তু, সেরূপ বিজ্ঞাপন হিন্দুদের তরফ থেকে যেগুলি বন্টিত হয়েছিল তার একখানিও ‘ফরওয়ার্ড’ কোনোদিন ছাপেনি। অ্যালবার্ট হলে হিন্দু নাগরিকদের রক্ষার জন্যে যে সভা দাঙ্গার সময়ে হয়েছিল সে সভায় এক বাংলা বিজ্ঞাপন বন্টিত হয়েছিল। তাতে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা মুসলমান মাত্রেরই ওপরে অত্যাচার করার জন্যে হিন্দুদিগকে উত্তেজিত করা হয়েছিল। ‘ফরওয়ার্ড’-এর অন্যতম সম্পাদক শ্রীযুক্ত উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সে-সভায় উপস্থিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও সে-বিজ্ঞাপন সম্বন্ধে পর্যন্ত কোন উচ্চবাচ্য ‘ফরওয়ার্ড’ করেন নি। শ্রীবটুক ভৈরব দেখিয়ে দিতে পারেন কি যে সাম্প্রদায়িকত্বর দ্বারা এরূপ অন্ধ আমরা কখনো হয়েছি?

আমাদের বিদ্যে বেশি নেই। যেটুকু আছে সেটুকু যে পুঁথির সাহায্যেই আয়ত্ত্ব করতে হয়েছে সে-কথা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারব না। শ্রীবটুক ভৈরব কি পুঁথি না পড়েই বিদ্যায়ত্ত্ব করেছেন? হিন্দু-মুসলিম বিরোধের ভিতর যে অর্থনীতিক অসন্তোষ মোটেই নেই, একথা শ্রীবটুক ভৈরব গায়ের জোরে অস্বীকার করছে পারেন, আমরা কিন্তু তা পারব না। আমাদের একটা বদভ্যাস এই যে, যে জিনিস যেভাবে থাকে ঠিক সেভাবেই আমরা তাকে দেখতে পারি, অন্যভাবে পারিনে। দুই-এর সাথে দুই যোগ করলে আমাদের সাদা হিসাবে বরাবর চারই হয়ে থাকে, পাঁচ কখনোই হয় না। ফ্রি প্রেস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিনিধি পাবনা থেকে এসে যে রিপোর্ট সংবাদপত্রে পাঠিয়েছিলেন তা আর সকল কাগজে যেমন ছাপা হয়েছিল, ঠিক তেমনি ‘ফরওয়ার্ড’-এও ছাপা হয়েছিল। সে প্রতিনিধিও বলেছিলেন যে, বিরোধের মুখে অর্থনীতিক অসন্তোষ রয়েছে। অর্থনীতিক অসন্তোষ যে শ্রেণী-সংগ্রামে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে এটা ঐতিহাসিক সত্য। বর্তমান হিন্দু-মুসলিম বিরোধ যে শ্রেণী-সংগ্রাম একথাও ঠিক তেমনি সত্য। আমরা আমাদের ‘অর্থনৈতিক অসন্তোষ’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছি- ‘পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে যে ব্যাপার ঘটছে বা যা ঘটেছে তা-ও শ্ৰেণী-সংগ্রাম বটে, কিন্তু বিপথে চালিত শ্রেণী-সংগ্রাম’। কৃষকগণ অর্থনীতিক, রাষ্ট্রনীতিক, সামাজিক ও ধর্মগতভাবে শোষিত হয়ে থাকে। তাদের সত্যকারের শ্রেণী-সংগ্রাম ব্যাহত হচ্ছে এ ধর্মগত শোষণকারীদের দ্বারা। ধর্মের ভিতরে কতকগুলি মিথ্যা সংস্কারের সৃষ্টি করে যারা সরল জনসাধারণকে ধর্মের নামে, ঈশ্বরের নামে ও পরকালের নামে শোষণ করে থাকে তারা আর শোষণকারীদের চেয়ে কোনো অংশেই কম ঘৃণ্য জীব নয়। বর্তমান সময়ে বাংলা দেশের কৃষকগণের শ্রেণী-সংগ্রাম এ শ্রেণীর স্বার্থপর শোষণকারীদের দ্বারা বিপথে চালিত হচ্ছে। আমাদের আগেকার প্রবন্ধে একথা আমরা পরিষ্কাররূপে বলে দিয়েছি। তবুও বটুক ভৈরব মশায় ব্যস্ত হয়ে প্রমাণ করতে চাইছেন যে এ-সব মোটেই শ্রেণী-সংগ্রাম নয়। জগতের সর্বত্রই যদি শ্রেণী-সংগ্রাম চলতে পারে তা হলে বাংলায় বা ভারতে চলবে না কেন? এর চেয়েও অধিকতর শোষিত দেশ জগতের আর কোথাও আছে কি?

আমরা একটা জিনিসের সত্যকারের মূর্তি সকলের চোখের সম্মুখে ধরে দিয়েছিলেম। পরিদৃশ্যমান বস্তুর অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্যে বেশি যুক্তি-তর্ক প্রয়োগ করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করিনি। বটুক ভৈরব আমাদের কথা এই বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন যে ব্যাপারটা যদি শ্রেণী-সংগ্রাম হতো তা হলে ঝগড়া হতো মুসলমান প্রজা আর হিন্দু জমিদারের মধ্যে। কিন্তু, তা না হয়ে ঝগড়াটা হচ্ছে মুসলমান প্রজা আর হিন্দু প্রজার মধ্যে। কাজেই শ্রেণী-সংগ্রামের যুক্তিটা মোটেই টিকতে পারে না। যে যুক্তির দ্বারা বটুক ভৈরব আমাদের কথা উড়িয়ে দিতে এসেছেন তার সে যুক্তি আপনা থেকেই উড়ে যাচ্ছে। প্রজা শব্দটা বাংলা দেশে খুবই ব্যাপক। জমিদারের নিচে যার স্বত্ব আছে সেই প্রজা। এমন প্রজাও আছে যার বার্ষিক আয় অনেক বড় জমিদারের চেয়েও বেশি। দু’একজন প্রজা যে রাজা বা নওয়াব উপাধি পর্যন্ত পেয়েছে তা আমরা জানি। প্রজা হলেই যে সে শোষিতও হবে এমন কোনো কথা নেই। বাংলাদেশে অসংখ্য প্রজা আছে যারা উৎপাদক শ্ৰেণীভুক্ত নয়। অর্থাৎ জমিদার প্রভৃতির ন্যায় বে-রোজগারের কড়ি ভোগ করে তারাও জীবনধারণ করে। একজন কৃষক প্রজাও হতে পারে, কিন্তু, প্রজামাত্রই কৃষক নয়। কাজেই, বর্তমান বিরোধটা মুসলমান প্রজা আর হিন্দু প্রজার মধ্যে নয়। পরন্তু, মুসলমান কৃষক আর হিন্দু প্রজা ও জমিদারের মধ্যে। বটুক ভৈরব শ্রেণী-সংগ্রামটাকে উড়িয়ে দেবার জন্যে তাড়াতাড়ি শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চেয়েছেন।

তার পরে, বরিশাল জেলার মুসলমান কৃষক আর মুসলমান জমিদার বা তালুকদারের মধ্যে যে বিরোধ নেই এ খবরটি বটুক ভৈরবকে কে দিলে তা আমরা একবার জানতে পারি কি? বিরোধ যথেষ্টই আছে। মুসলমান জমিদার বা জোতদার আদি মুসলমান কৃষকদিগকেও শোষণ করে থাকে একথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আর শোষণ যেখানে আছে বিরোধও সেখানে আছে। এটা নূতন থিওরি নয়, অনেক পুরাতন সত্য কথা। কিন্তু, বর্তমান সময়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতিপত্তিতে আপাতত মুসলমান জমিদার আর কৃষকের সংগ্রামের কথাটা কেউ লিখবে না। নতুবা আমরা তো বরিশাল জিলার এমন মুসলমান জমিদারের কথা জানি যাকে মুসলমান কৃষকদের ভয়ে পৈতৃক বাসভবন ছেড়ে অন্যত্র পালাতে হয়েছে। আমরা তো বলেইছি যে পূর্ববঙ্গের কৃষকদের শ্রেণী-সংগ্রাম সত্যকারের নেতৃত্ব পায়নি। বটুক মশাই নিজেই স্বীকার করেছেন যে আর্থিক বৈষম্যের ফলে শ্রেণীতে শ্রেণীতে সংগ্রাম উপস্থিত হয়ে থাকে। এখানেও যখন আর্থিক বৈষম্য আছে তখন সংগ্রাম থাকবে না কেন? তিনি আরো বলেছেন অর্থই জগতে একমাত্র সত্য বস্তু নয়। কিন্তু অর্থ যে অত্যন্ত বেশি মাত্রায় সত্য একথাটা তিনি কি অস্বীকার করতে পারেন? অর্থের ব্যাপার পেছনে না থাকলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা কখনো এরূপ মূর্তি ধারণ করতে পারত না। বটুক ভৈরব নিশ্চয়ই এ-সব খবর কিছু কিছু রাখেন।

এদেশে শ্রেণী-সংগ্রাম নেই বললেই কিন্তু শ্রেণী-সংগ্রামটা মিটে যাবে না। ধনিক বণিকের অনুচর ও প্রসাদভোগী যারা তারা এমন কথা প্রচার করতে পারে। কিন্তু, এরূপ প্রচারের ফলে শ্রেণী-সংগ্রামের বিলোপ হবে না। ব্যাপারটিকে সাম্প্রদায়িক পথে পরিচালিত করে কিছুদিনের জন্যে ব্যাহত করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু, মূলসংগ্রামের কারণ যখন অত্যন্ত তীব্রভাবে বর্তমান রয়েছে তখন তা কি কখনো বিলোপ পেতে পারে? যারা উৎপাদক শ্রেণীভুক্ত নয়, যারা ধনিক-বণিক ও জমিদারের কৃপার ভিখারি তারা এখন সাম্প্রদায়িক বিরোধকে বাড়াবার জন্যে নানা দিক থেকে নানাভাবে চেষ্টা করছে। তারা হয়তো মনে করছে যে হিন্দু-মুসলিমকে উৎকটরূপে হিন্দু-মুসলিম করে দিতে পারলে শ্রেণী-সংগ্রামের কথা ধামাচাপা পড়ে যাবে। কিন্তু শ্রেণী সংগ্রামের কারণ বর্তমান আছে বলেই যে এ সাম্প্রদায়িক বিরোধও তারা বা সমর্থ হয়েছে এটা তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না।

বটুক ভৈরব জিজ্ঞাসা করেছেন, শ্রেণী-সংগ্রামের কোন্‌ নিয়মের ফলে ঝগড়াছ এমন বীভৎস মূর্তি ধারণ করেছে? এ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার পূর্বে আমরা তার উত্তর আমাদের আগেকার প্রবন্ধে দিয়েছি। সংগ্রাম যে বাধবে এটা মানুষ বলে দিতে পারে। কিন্তু, সংগ্রাম কি মূর্তি পরিগ্রহ করবে এটা কেউ বলে দিতে পারে না। ভাল নেতৃত্ব পেলে সংগ্রাম ঠিক পথে চলে, আর না পেলে বেঠিক পথেও চলে। নারী নিগ্রহের কথা নিয়েই ওপরের প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। হিন্দুতে হিন্দুতে ঝগড়া বাধলে নাকি কোথাও নারীদের ওপরে অত্যাচার হওয়ার কথা শোনা যায় না, আর হিন্দুতে মুসলমানে বাধলেই অনেক বেশি শোনা যায়। বটুক ভৈরবের বিশ্বাস নারী নিগ্রহের কুপ্রবৃত্তিটা মুসলমান সম্প্রদায়ের একচেটিয়া উত্তরাধিকার। তাঁর মতে আরও খোলসাভাবে বলতে গেলে বলতে হয় যে কাম প্রবৃত্তিটা কেবলমাত্র মুসলমানদের মধ্যেই আছে। আমাদের বিশ্বাস কিন্তু অন্যরূপ। আমরা জানি কাম প্রবৃত্তিটা কেবলমাত্র মুসলমানদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। এটা সকল সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যেই আছে এবং যারা বে-রোজগারের কড়ি খেয়ে অলস জীবন যাপন করে তাদের মধ্যে কিছু বিশ্রী মাত্রায় আছে। নারীকে আমরা যে সামাজিক পদমর্যাদা দিয়ে রেখেছি তাতে তার ওপরে নিগ্রহ না হওয়াটাই আশ্চর্যের কথা। কাম প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যে নারীর ওপরে নিগ্রহ হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরাই করে এবং কেউ কারো চেয়ে কম করে না। একই তারিখের কাগজে আমরা হিন্দু কর্তৃক ও মুসলমান কর্তৃক নারী নিগ্রহের কথা পাঠ করে থাকি। হিন্দু কাগজওয়ালারা মুসলমানদের ব্যাপারে শিরোনাম দিয়ে থাকেন— ‘মুসলমান দুর্বৃত্ত কর্তৃক হিন্দু নারীর উপরে পাশবিক অত্যাচার’। আর হিন্দুর বেলায় দিয়ে থাকেন—‘জমিদার হত্যার মোকদ্দমা’। নারীর ওপরে বলাৎকার করতে যেয়েই এ জমিদার বধ হয়েছিল। ক’দিন পূর্বে ‘বসুমতী’তে এরূপ একটা খবর আমরা পড়েছিলাম। আর একটা ঘটনা ‘ফরওয়ার্ড’ প্রকাশ করেছিলেন। একজন হিন্দু আর একজন মুসলমানেতে মিলে একটা মেয়েকে চুরি করেছিল। রাধারাণী কি এমন কিছু একটা নাম সে মেয়েটির হবে। শিরোনামে কিন্তু ‘ফরওয়ার্ড’ ও দোষটা চাপালে মুসলমানেরই ঘাড়ে। রাজ-কুমারীর ওপরে অত্যাচার কারা করেছিল? নারী লাঞ্ছনার এর চেয়েও ঘূর্ণিত চিত্র আর কেউ অভয় প্রদান করতে পারেন যে আমাদের নামে করে মোকদ্দমা হবে না তা হলে আমরা হিন্দু কর্তৃক নারী নিগ্রহের অনেক খবর প্রকাশ করতে পারি। অবশ্য আদালতে মোকদ্দমা ওঠেনি কিংবা খবরের কাগজে ছাপা হয়নি—এমন খবরের কথাই আমরা বলছি। তাছাড়া আদালতে মোকদ্দমা উঠেছে কিংবা কাগজে ছাপা হয়েছে হিন্দুর ধারা নারী নিগ্রহের এমন অনেক প্রমাণ আমরা বটুক ভৈরবকে যে-কোনো সময়ে দেখাতে প্রস্তুত আছি। আমরা মুসলমান সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে একথা বলছিনে, ন্যায় ও সত্যের পক্ষ থেকেই বলছি। যেখানে যত বটুক ভৈরবের দল আছে তাঁদের সকলকেই আমরা অনুরোধ করছি যে তারা দৃষ্টিকে আরো প্রসারিত করুন। তা হলেই সব বস্তু ঠিকভাবে দেখতে পাবেন। এখন তারা সব জিনিসেরই একটা দিক দেখছেন মাত্র, অনেক জিনিস আবার দেখেও দেখছেন না।

হাঁ, আর একটা কথা। পুঁথির চাপে আমাদের বুদ্ধি মারা পড়েনি, সাম্প্রদায়িকতার চাপে বটুক ভৈরব-মশায় অন্ধ হয়েছেন। সত্যকার লোক যদি মোড়লি গ্রহণ না করে তা হলে খান সাহেবের দল করবে না কেন? বটুক ভৈরবরা একবার কৃষকদের নিকটে যান না কেন হিন্দুর রূপে নয় মানুষের রূপে। তা করার পরে যদি কৃষকেরা তাদের নেতৃত্বের অধীনে না চলে তবেই তিনি আমাদের বলতে পারেন যে পুঁথির চাপে আমরা মরেছি। কিন্তু তা তাঁরা করতে যাবেন কেন? তাঁদের সহানুভূতি যে ধনিক-বণিক ও জমিদারের প্রতিই বেশি। উৎপাদনের উপায় বেশি হাতে নেই বলে কিংবা মোটেই নেই বলে তাঁরা জনগণকে খুব বেশিরূপে শোষণ করতে পারেন না বটে, কিন্তু, আদতে তাঁরা শোষকশ্রেণীর লোক, অন্তত বর্তমানে পরগাছা তো বটেনই। ধর্মশিক্ষার মধ্যে গোড়ায় যেখানে গলদ রয়েছে সেটা দূর করতে বটুক ভৈরব আমাদের অনুরোধ করেছেন। আমাদের মতে ধর্মশিক্ষার কেবলমাত্র গোড়ায় গলদ নেই, ওর আগাগোড়াই গলদ। একথাটা কোনো একটা বিশিষ্ট ধর্মের সম্বন্ধে আমরা বলছিনে। পৃথিবীর সকল ধর্মেরই এ দুর্দশা হয়েছে। মসজিদের সম্মুখে বাদ্য বন্ধ করে মুসলমানরা যেমন মিথ্যা ধর্মভক্তির পরিচয় দিচ্ছে ঠিক তেমনি পূজো ও সংকীর্তনের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়ে হিন্দুরাও ঠিক অনুরূপ ধর্মভক্তির পরিচয় দিতে ছাড়ছে না। ধর্মের বিধান সকল দেশে সকলকালেই রাজা বা শাসনকর্তার মুখের দিকে চেয়ে রচিত হয়েছে। প্রথমে যে মূর্তিতে ধর্ম প্রচারিত হয়েছে সে মূর্তি তার কিছুকাল পরেই পরিবর্তিত হয়ে গেছে রাজা-বাদশার প্রয়োজনে। শোষণ-যন্ত্ররূপে ব্যবহার করে ধর্মকে নিতান্তই অধর্মে পরিণত করা হয়েছে। মোটের ওপরে ধর্মের নামে যত ব্যাপার সংঘটিত হয় তার সমস্তই কিছু ধর্ম নয়। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নাস্তিক ছিল। অথচ সে-ও চীনে মিশনরি পাঠিয়েছিল ধর্মপ্রচার করার জন্যে। তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল চীনে শোষণের সুবিধা হতে পারে কিনা তা দেখা। আর্থিক শোষণের পরিসমাপ্তির জন্যে যেরূপ শ্রেণী-সংগ্রাম চালাবার প্রয়োজন আছে ঠিক সেরূপ প্রয়োজনে শোষণের বিরুদ্ধেও আমাদের সংগ্রাম চালাতে হবে।

শেষ কথা, ‘শ্রেণী-সংগ্রামের দিন নিকটবর্তী হয়ে আসবে’ নয়, যে-দিন ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি জগতে হয়েছে সেদিন থেকেই এসেছে। পূর্বদিকে আগুন আমরা দেখিনি, সূর্যই দেখেছি। বটুক ভৈরবরা যে টের না পাচ্ছেন তা নয়, তবে হয়কে নয় করতে চাইছেন।

গণবাণী : ১২ মে, ১৯২৭


প্রকাশের তারিখ: ১৭-অক্টোবর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org