‘এক দেশ, এক চাঁদা’, জ্ঞানচর্চার পায়ে বেড়ি

তপন মিশ্র
প্রাচীনকাল থেকে আমাদের দেশের বিজ্ঞান গবেষণার যে ঐতিহ্য রয়েছে, তার উপর আধারিত যে শ্লোকটি আমাদের উৎসাহিত করে তা হল ‘সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে’। যার অর্থ হল ‘সেটাই জ্ঞান, যা আমাদের মুক্তি দেয়’।... যদি এই বিদ্যাই হিন্দুত্বের প্রহরীদের পোষিত কর্পোরেটদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে সঙ্ঘ পরিবার ও তার বিজেপি সরকার বিদ্যাচর্চার মধ্যে বিপদের গন্ধ খুঁজে পাচ্ছে। বিদ্যা যখন নিজেই মুক্ত নয়, তা আমাদের মুক্ত করবে কিভাবে?

গবেষকদের গবেষণার স্বার্থে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট তাদের বিষয়ে যে গবেষণা সংগঠিত হয়েছে, বা এখন হচ্ছে সেগুলির সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার। গবেষককে তার নির্ধারিত বিষয়ে কতটা গবেষণার অগ্রগতি ঘটেছে সেটা জানা প্রাথমিক কাজ। কারণ সেই ইতিহাস না জানলে কোথা থেকে শুরু করতে হবে এবং জ্ঞানের ঘাটতি কোথায় আছে, তা জানা সম্ভব নয়। সমাজ ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের গবেষণা ক্রমবিকাশমান। ধর্মীয় শাস্ত্রের মতো স্থবির নয়। কাজেই গবেষকদের প্রতিনিয়ত সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। এই ধারাবাহিকতার জন্যই গবেষকের প্রথম কাজ হল লিটারেচার রিভিউ বা আগের বা সমসাময়িক গবেষণার পর্যালোচনা। এই পর্যালোচনা না করলে গবেষণার নীতি লঙ্ঘিত হয়। আর একটি গণতন্ত্রিক পরিমণ্ডল বিজ্ঞান গবেষণায় সবসময় রয়েছে। তা হল এই পর্যালোচনায় দেশ, কাল, জাত কোনওটাই বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য কেবল বৈজ্ঞানিক তথ্য।    

ভারত সরকার তার বহু চর্চিত ‘এক দেশ, এক চাঁদা’ বা ওয়ান ন্যাশন ওয়ান সাবস্ক্রিপশন (ওএনওএস) স্কিম মন্ত্রীসভায় পাস করিয়ে গতবছর নভেম্বর থেকে চালু করেছে। নিউ এডুকেশন পলিসি (এনইপি) বা ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘোষিত নতুন শিক্ষানীতির অংশ হিসাবে এই ধারণাটি প্রথম প্রস্তাবিত হওয়ার পর থেকে দেশের গবেষকরা বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ধরণের আশঙ্কা প্রকাশ করতে শুরু করেন। সরকারের দাবি, এই স্কিমের লক্ষ্য হল এম্পাওয়ারিং ইন্ডিয়া’স রিসার্চ ইকোসিস্টেম, অর্থাৎ দেশের গবেষণা ব্যবস্থাকে শক্তশালী করা। কিন্তু গবেষকদের আশঙ্কা হচ্ছে দেশের জ্ঞান চর্চাকে মহার্ঘ করে তার ঐতিহ্যকেই এতে সঙ্কুচিত করা হচ্ছে। এই সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয় আলোচনায় আসা দরকার কারণ জ্ঞান চর্চায় বেড়ি পরানো হলে, আখেরে ক্ষতি হবে অসংখ্য গবেষকদের এবং সর্বোপরি আমাদের দেশের।    

কীসের চাঁদা?... 

গবেষকদের (কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বা ব্যক্তি গবেষক) প্রতিনিয়ত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের গবেষণাপত্রগুলি একাডেমিক জার্নাল বা গবেষণার প্রবন্ধ সঙ্কলনের মাধ্যমে পঠন পাঠন করতে হয়। এগুলির অধিকাংশই ‘কপিরাইট’ আইন দ্বারা রক্ষিত। অর্থাৎ এগুলি পড়তে হলে (ছাপা বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে) অর্থব্যয় করতে হয়। এই অর্থ সাধারণভাবে প্রকাশনা সংস্থা নিয়ে থাক। গবেষকরা যারা এই প্রকাশনার কারিগর, তারা কোনওভাবেই এই অর্থের ভাগ পান না। তবে কিছু একাডেমিক জার্নাল আছে যেগুলির ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ বা বিনামূল্যের বিভাগ রয়েছে। যেখানে কিছু গবেষণাপত্র বিনামূল্যে বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করা যায়। ভারতে এইভাবে ডাউনলোড করা গবেষণাপত্রের সংখ্যা মাত্র ১৮ শতাংশ। বাকি জার্নালগুলি বা সেগুলির প্রবন্ধ সাবস্ক্রিপশন বা চাঁদা দিনে দিনে মহার্ঘ হয়ে যাচ্ছে। এবং কোনও একজন গবেষকের পক্ষে এগুলি সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। সেই কারণে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব উদ্যোগে বেশ কিছু জার্নাল একসঙ্গে চাঁদা দিয়ে তাদের গবেষকদের জানার পিপাসা মেটায়। 

কিন্তু ভারত সরকারের ২০২৪ সালের আইনের ফলে সরকার নিজেই এই জার্নালগুলির জ্ঞানভাণ্ডারের ক্রেতা (সাবস্ক্রাইবার) হবে। এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বিক্রি করবে। কোনও গবেষক বা প্রতিষ্ঠান নিজে থেকে আলাদা করে সরাসরি চাঁদা দিয়ে গ্রাহক হতে পারবেন না। ফলে প্রথমত, যে আশঙ্কা করা হচ্ছে তা হল এই খাতে সাবস্ক্রিপশনের হেরফের হতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট কিছু জার্নাল বা প্রবন্ধগুলি ছাড়া আমাদের দেশের বিভিন্ন গবেষকদের চাহিদা পূরণ করতে অক্ষম হবে। তৃতীয়ত, যে সমস্ত গবেষক বা পাঠক কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নয়, তাদের পক্ষে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে গবেষণাপত্র সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। এগুলির নিটফল হল গবেষণার ক্ষেত্রে বাধা আসবে এবং সমস্তটাই সরকার নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে।  

সাই-হাব মামলা এবং সরকারের ভূমিকা  

গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো গবেষণার ক্ষেত্রে আর একটি বাধা তৈরি হয়েছে সাই-হাব সংক্রান্ত মামলায়। সাই-হাব হলো ২০১১ সালে কাজাখিস্তানের আলেকজান্দ্রা এলবাকিয়ান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি ওয়েবসাইট। যা এক বিপুল সংখ্যক গবেষণাপত্র, বই  ইত্যাদি বিনামূল্যে প্রাপ্তির সুযোগ করে দেয়। দিল্লি হাইকোর্ট, সাই-হাবের বিরুদ্ধে করা এক মামলায় গত ২৬ আগস্ট একটি অন্তর্বর্তী আদেশে বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক এবং ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমিউনিকেশন-কে বলে যে, আমাদের দেশে সাই-হাব নামে ওয়েবসাইটকে সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করে দিতে হবে। মামলাটি Elsevier, Wiley Periodicals এবং The American Chemical Society (গবেষণা জার্নালের প্রকাশক) নামে পৃথিবীর বড় বড় কয়েকটি জ্ঞান-ব্যবসায়ী, সাই-হাবের বিরুদ্ধে করে।  

সাই-হাবের যুক্তি, জ্ঞান হওয়া উচিত মুক্ত। যদিও এই ওয়েবসাইটটি গবেষকদের জন্য অনেকটাই সুবিধাজনক এবং পৃথিবীর বৃহত্তম ডিজিটাল লাইব্রেরির কাজ করে, তবুও এর ব্যবহার কপিরাইট আইনকে যে লঙ্ঘন করে, এব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ওয়েবসাইট পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি গবেষকদের সাহায্য করেছে। এবং এখনও করছে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই।   

২০২১ সালে জার্নাল অফ সায়েন্টোমেট্রিক রিসার্চের গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছিল যে সাই-হাবকে ‘ব্লক’ করলে কেবল গবেষকদের কাজ এবং তাদের সৃজনশীলতাই প্রভাবিত হবে না, বরং ‘ভারতে গবেষণার উপর এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে’। দিল্লি হাইকোর্ট যদি ডিসেম্বরের শুনানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করে, তাহলে ভারতের হাজার হাজার ব্যক্তি গবেষক এমনকি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। 

এবারে যা হতে চলেছে...

আমাদের দেশে গত শতকের নয়ের দশক পর্যন্ত সব স্তরে শিক্ষা ও গবেষণা নি-শুল্ক না হলেও অলাভজনক হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। সংবিধানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং বাজেট বরাদ্দ করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য উভয় সরকারকেই দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে, ইউপিএ সরকারের আমলে সংসদ শিশুর বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু তার পরে বছরের পর বছর ধরে, সংসদের বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে, বেসরকারি ট্রাস্টগুলিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার জন্য এই নীতি সংশোধন করা হয়। এর ফলে আমাদের দেশে অনেকগুলি প্রাইভেট স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। 

কিন্তু এর পর আরও উচ্চশিক্ষার পথ অবরুদ্ধ করা এবং কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করতে আরও কিছু পরিকল্পিত প্রয়াস চলছে। অনেকেই এই যুক্তি দিচ্ছেন যে ‘এক দেশ, এক চাঁদা’ পরিকল্পনাটি গবেষকদের স্বাধীনভাবে গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক ধীরে ধীরে ক্ষতি সাধন করবে। বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রকাশকরা লাভের জন্য ব্যাপকভাবে ভারত সরকারের এই নীতিগুলিকে সমর্থন করছে। কারণ ভারতে তারা একটা নির্দিষ্ট, কেন্দ্রীভূত এবং সুরক্ষিত বাজার পাচ্ছে। আর তার মূল্য দিতে হচ্ছে তরুণ গবেষকদের। 

আর একটি আশঙ্কা হল আমাদের দেশে প্রায় ১৮০ লক্ষ গবেষক এবং শিক্ষার্থী এই ‘এএনওএস’ প্রকল্পের সম্ভাব্য খদ্দের হতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে সরকার, এই সম্পদের বৃহত্তম এবং একমাত্র ক্রেতা হওয়ায়, শিক্ষাক্ষেত্রে যেমন ব্যয় সঙ্কুচিত করছে ঠিক তেমনই ‘এএনওএস’ প্রকল্পে ব্যয় সীমিত করবে। ফলে এই বিশাল সংখ্যক গবেষকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে পৃথিবীর কয়েকজন প্রকাশককে সরকার সমগ্র ভারতীয় বাজারের জন্য একটি নির্দিষ্ট রাজস্বের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

২০২২ সালের তথ্য বলছে যে ভারতীয় গবেষকরা প্রতি বছর প্রায় ২,০০,০০০ গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করেন। এই সংখ্যাটি সারা বিশ্বের মাত্র ১ শতাংশ। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমনকি যদি আমরা প্রারম্ভিক কর্মজীবনের গবেষক, শিক্ষক গবেষক, সিনিয়র গবেষকদের হিসেব নিই, তাহলে দেখব যে আনুমানিক ২৯ লক্ষ মানুষ সরাসরি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে মাত্র ২ লক্ষ গবেষকদের গবেষণাপত্র পৃথিবীর ৩০টির শীর্ষ প্রকাশকদের উন্নত মানের জার্নালে প্রকাশনার সুযোগ পায়। ভারতীয় গবেষকদের এই উচ্চ মানের গবেষণা জার্নালে  গবেষণা-পত্রে প্রত্যাখ্যানের হার প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত। অবশ্য ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের (বাঙ্গালোর) প্রাক্তন প্রধান পি বলরামের মতে যে পদ্ধতিতে একটি জার্নালের এবং প্রবন্ধের প্রভাব (ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর) মূল্যায়ন করা হয় তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। 

প্রাচীনকাল থেকে আমাদের দেশের বিজ্ঞান গবেষণার যে ঐতিহ্য রয়েছে, তার উপর আধারিত যে শ্লোকটি আমাদের উৎসাহিত করে তা হল ‘সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে’। যার অর্থ হল ‘সেটাই জ্ঞান, যা আমাদের মুক্তি দেয়’। 

এই শ্লোক বোঝায় যে প্রকৃত শিক্ষা বা বিদ্যা হল সেটাই, যা মানুষকে অজ্ঞানতা ও বন্ধন থেকে মুক্ত করে। যদি এই বিদ্যাই হিন্দুত্বের প্রহরীদের পোষিত কর্পোরেটদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে, সঙ্ঘ পরিবার ও তার বিজেপি সরকার বিদ্যাচর্চার মধ্যে বিপদের গন্ধ খুঁজে পাচ্ছে। 

বিদ্যা যখন নিজেই মুক্ত নয়, তা আমাদের মুক্ত করবে কীভাবে?


প্রকাশের তারিখ: ০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org