|
মার্কিনী গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠিমার্কিন যুক্তরাষ্ট্রবাসী প্যালেস্তিনীয় ও ইজরায়েলী বুদ্ধিজীবীরা |
|
বিদ্যাচর্চার সাথে যুক্ত থেকে আমরা যারা আমাদের সারা জীবনের পেশাগত কর্তব্য হিসেবে প্যালেস্তাইন/ইজরায়েল বিষয়টি অধ্যয়ন করেছি এবং ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগনকে এ বিষয়ে আলোকিত করার চেষ্টা করেছি, তারা মার্কিন গণমাধ্যমের মুদ্রণ ও বৈদ্যুতিন দু'টি অংশেরই সংবাদ উপস্থাপনে অত্যন্ত বিচলিত বোধ করছি। 'যুদ্ধে ইজরায়েল' শিরোনামের সিএনএন-এর বিষয় চয়ন যা খোলাখুলিভাবে ইজরায়েলের দৃষ্টিকোণকে গ্রহণ করে গাজাকে দৃশ্যপট থেকে বাতিল করেছে, সেটা থেকে আরম্ভ করে ব্যাপকমাত্রায় ইজরায়েলী নারীর ধর্ষণ ও শিশুর শিরশ্ছেদের একমুখী, নির্দায়, ভিত্তিহীন খবরের বারংবার সম্প্রচার- এমন ধরনের সমালোচনাহীন, দায়িত্বজ্ঞান রহিত সাংবাদিকতা আমরা ৯/১১-র ঘটনার পরবর্তী বা ইরাক আগ্রাসনের পূর্ববর্তী ক্ষেত্র প্রস্তুতকারী পর্বের পর কখনো প্রত্যক্ষ করিনি। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বা ন্যূনতম পেশদারী সততার কথা বাদ দিয়েও, শুধুমাত্র সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমাদের বোঝা উচিত যে এ ধরনের উত্তেজনাপ্রবণ ও অমানবিক সম্প্রচার কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আশা রাখি, আপনারাও আমাদের এই বিশ্বাসের অংশীদার; যে সাংবাদিকতার পরাকাষ্ঠা নিহিত রয়েছে অবিচ্ছিন্ন সমালোচনা এবং ক্রমাগত সংশয়ে, বিশেষ করে ক্ষমতাধরদের ক্ষেত্রে এবং আরো সবিশেষে যুদ্ধকালীন সময়ে। তবেই সাংবাদিকতা চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে তার গণতান্ত্রিক কর্তব্যটি যথাযথভাবে পালন করে যার ফলে আমরা পর্যাপ্ত জ্ঞান ও যৌক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে নীতিগত প্রশ্নগুলির ক্ষেত্রে বুদ্ধিসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়ে উঠি। এই বিষয়ে দায়িত্বজ্ঞান সম্পন্ন খবর করার জন্যে প্রয়োজনীয় রসদ ও তথ্য দুইই আপনাদের হাতে রয়েছে। আপনাদের অনেকেই ২০২২ সালে ইজরায়েলী সৈন্যদের হাতে প্যালেস্তিনীয় বংশোদ্ভুত মার্কিন সাংবাদিক শিরিন আবু আখলেহ-র খুন হওয়ার ঘটনার তদন্তমূলক প্রতিবেদন করেছেন ফলে আপনারা জানেন ইজরায়েলী সামরিক বাহিনী ও সরকারি কর্তারা কতটা মিথ্যাচার করে থাকে। আপনাদের প্রশ্নমুখরতা আজ কোথায়, যখন সেটার প্রয়োজন সর্বাধিক? কেন আমরা কার্যত কোনো ধরনের সাংবাদিক সুলভ প্রতি আক্রমণ বা তদন্তমুখী প্রশ্নমালা নিক্ষিপ্ত হতে দেখছি না যখন গাজায় যুদ্ধ তৎপরতাকে যথার্থতা দিতে ইজরায়েলী কর্তাদের তরফে উত্তেজনামূলক প্ররোচনা, প্রমাণহীন দাবি দাওয়া ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে? আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট যে পশ্চিমী দুনিয়ার জনমতকে যাতে গাজা ভূখণ্ডে চলমান হানাদারীর যে ঘটনায় ১,০৩০ জন শিশু সহ ২,৭৫০ সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, তার স্বপক্ষে টেনে আনা যায় তারই চেষ্টা চালাচ্ছে ইজরায়েলী সরকার। সাধারণ নাগরিকদের উপর যুদ্ধাপরাধ চালানোর মনুষ্যত্বহীনতাকে পুষ্ট করতে বিনা প্রশ্নে একটা কথা চেষ্টা হচ্ছে যে প্যালেস্তিনীয়দের জন্যে আসলে কোনও 'প্ররোচনা' ছিলই না, যখন বাস্তবে শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই ৪৭ জন শিশু সহ মোট ২৫০ জন প্যালেস্তিনীয়কে হত্যা করেছে ইজরায়েল। গত শনিবারের ঘটনার আগে কেন আপনারা এক দশক জুড়ে চলতে থাকা ইজরায়েলের হিংস্র আক্রমণ ও প্যালেস্তিনীয় জীবন নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অভিযানের কোনো খবর করলেন না বা কেনই বা গাজা ভূখণ্ডের সর্বনাশের সরেজমিন সংবাদ করার জন্যে হাতেগোনা সাংবাদিক রেখেছেন বা কোনো সাংবাদিকই রাখেননি এবং কেনইবা প্যালেস্তিনীয়দের অভিজ্ঞতা বা দৃষ্টিকোণ পাঠক বা দর্শকদের কাছে হাজির করার মত কোনো পরিসরই তৈরি করেননি, সে বিষয়ে প্রশ্ন করার জন্যে যথেষ্ট সময় ভবিষ্যৎ সময়ে আসবে। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সকলের জন্যে ধ্বংস নিয়ে আসছে যে সর্বনাশা যুদ্ধ, তার স্বপক্ষে ঢোলকাঁসি বাদ্যকে উচ্চকিত করা নয়, বরং থামানো। ৭ অক্টোবরের পর থেকে আপনাদের সহকর্মী প্যালেস্তিনীয় বংশোদ্ভুত সাংবাদিকদের ১১ জন ইতিমধ্যেই ইজরায়েলের হাতে খুন হয়েছে এবং আরো বহু বহু প্যালেস্তিনীয় কন্ঠ আগামীদিনে স্তব্ধ হয়ে যাবে। আমরা আবেদন জানাচ্ছি, প্যালেস্তিনীয় জনগনের ওপর ইজরায়েলের হিংসাত্মক আক্রমণের যাচাইবিহীন সংবাদ পরিবেশন বন্ধ করুন এবং আজ প্যালেস্তিনীয়দের হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন বলে এক দশক পর দুঃখ না করে আজকের আশু কর্তব্যগুলি পালন করুন। আমরা চাই, নিচে বিবৃত সুনির্দিষ্টভাবে চারটি পদক্ষেপ আপনারা অনতিবিলম্বে গ্রহণ করুন: # মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে যে ধরনের স-সন্দেহ প্রশ্নমুখরতা আপনাদের থাকত সেই একই মনোভাব ইজরায়েলী কর্তাদের ক্ষেত্রেও আনুন এবং তাদের প্রমাণহীন অভিযোগ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আরোপগুলি তোতাপাখির মত আউড়ে যাওয়া বন্ধ করুন। # সমষ্টিগত শাস্তিভোগ এবং বিধিভঙ্গকারী হিসেবে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও মানবাধিকার গোষ্ঠীর দ্বারা অভিহিত অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা গাজা ভূখণ্ডের সামরিক দখলদারি ও বিগত ১৬ বছর ধরে চলা ইজরায়েলের শ্বাসরোধকারী অবরোধের মত গুরুতর প্রেক্ষাপটকেও আপনাদের বিবেচনায় অন্তর্ভুক্ত করুন। # আপনাদের সমস্ত সংবাদ প্রতিবেদনে প্যালেস্তিনীয় কন্ঠস্বর অন্তর্ভুক্ত রাখাকে সুনিশ্চিত করুন। # স্বজনহারা প্যালেস্তিনীয় অতিথিদের অনুষ্ঠানের পর্দায় এনে আলোচনায় অংশ নেওয়ার কার্যত পূর্বশর্ত হিসেবে ‘সন্ত্রাসবাদ’ ও হামাসের নিন্দা করাকে বাধ্যতামূলক করার অধিকাংশ সম্প্রচারের প্রবণতা কেন? অসংখ্য প্যালেস্তিনীয় দুটোই অনুমোদন করেন না, কিন্তু ভিন্নতর ভাবে বিষয়টি উত্থাপন করেন। আপনাদের দর্শক/পাঠকরা কখনোই প্যালেস্তিনীয় দৃষ্টিকোণ যথার্থভাবে বুঝতে পারবেন না যদি তাদের কথা না-ই শোনেন। কখনো সখনো যে অন্তর্ভেদী প্রতিবেদন বা বিশ্লেষণ আপনারা বা আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলি হাজির করেন তা আমরা উপেক্ষা করছি না বা সেটা অস্বীকারও করছি না। আমরা চাই আপনারা আরো ধারাবাহিকতায় উন্নত হয়ে উঠুন। মার্কিনী দর্শক/পাঠক তাদের স্বার্থে এবং প্যালেস্তাইন/ইজরায়েলের জনগনের কল্যাণে এই লক্ষ্য পূরণে আমরা সহযোগিতা ও সমর্থনের অঙ্গীকার প্রকাশ করছি। স্বাক্ষরকারী : লীলা আবু-লুঘদ, বুটেনওয়েইজার অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ালিদ আফিফি, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ, ক্যালিফোর্নিয়া সান্টা বারবারা বিশ্ববিদ্যালয় নাদেজ আল-আলি, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান ও মধ্যপ্রাচ্য বিদ্যা, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় এভেলিন আলসুলতানি, অধ্যাপক, সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সাঈদ আতসান, সহযোগী অধ্যাপক, শান্তি ও সংঘাত বিদ্যা ও নৃবিজ্ঞান, সোয়ার্থমোর কলেজ খলিল বারহোম, স্ট্যান্ডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় মুস্তাফা বেয়উমি, অধ্যাপক, সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক- ব্রুকলিন কলেজ হাতেম বাজিয়ান, প্রভাষক, মধ্যপ্রাচ্য ভাষা ও সংস্কৃতি, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কেলি জোয়েল বেইনিন, ডোনাল্ড জে. ম্যাকলাচলান খয়রা অধ্যাপক, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় নীনা বেরমান, অধ্যাপক, সাংবাদিকতা, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আমাহাল বিশারা, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান, টুফ্টস বিশ্ববিদ্যালয় জর্জ বিশারত, সম্মানীয় র্যামন্ড এল. সালিভান অধ্যাপক, আইন, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ অব ল, সান ফ্রানসিসকো পলা চক্রবর্তী, জেমস ওয়েলডন জনসন সহযোগী অধ্যাপক, গণমাধ্যম বিদ্যা, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় ওমার দাজানী, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ম্যাকজর্জ স্কুল অব ল কারাম দানা, অ্যালিসন ম্যাকগ্রেগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক, উৎকর্ষ ও রূপান্তরযোগ্য গবেষণা, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়, বোথেল বেশারা দোউমানি, মাহমুদ দারবিশ অধ্যাপক, প্যালেস্তাইন বিদ্যা, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় ডানা এল কুর্দ, রাজনীতি বিজ্ঞান, রিচমন্ড বিশ্ববিদ্যালয় জুলিয়া এলিয়াচার, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় নোরা এরাকাত, সহযোগী অধ্যাপক, আফ্রিকানা বিদ্যা ও অপরাধ বিচার প্রকল্প, রুটজার্স বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ ব্রুনসুইক রিচার্ড ফালক, খয়রা অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক আইন, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় লেইলা ফারসাক, অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান, ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়, বোস্টন কিইথ ফেলডম্যান, সহযোগী অধ্যাপক, ক্যালিফের্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলি গ্যারি ফিলডস, অধ্যাপক গণযোগাযোগ, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, স্যান ডিয়েগো লিসা হাজ্জর, অধ্যাপক, সমাজতত্ত্ব, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান্তা বারবারা রোসিনা হাসসোন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান, সাগিনাও ভ্যালি স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় মাহমুদ ইব্রাহিম, খয়রা অধ্যাপক, ইতিহাস, ক্যাল পলি, প্রমোনা রশিদ খালিদি, এডওয়ার্ড সাঈদ অধ্যাপক, আধুনিক আরব বিদ্যা ড্যারিল লি, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় জাচারি লকম্যান, অধ্যাপক, মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামি বিদ্যা ও ইতিহাস, নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালেক্স লুবিন, অধ্যাপক, আফ্রিকান আমেরিকান বিদ্যা, পেনসিলভিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সুনাইনা মাইরা, অধ্যাপক, এশিয়ান আমেরিকান বিদ্যা, ক্যালিফের্নিয়া ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয় প্রমুখ…
ভাষান্তরঃ শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার প্রকাশের তারিখ: ২৩-অক্টোবর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |