|
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
অসংগঠিত পুঁজি, অসংগঠিত শ্রম, এবং “বাংলায় হিন্দুত্ববাদ”- এক দশকের নিরীক্ষণসোহম ভট্টাচার্য |
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
গরীব মানুষ তাঁর সারাদিনের যাপনে, নুন-পান্তা জোগাড়ের ফাঁকে, সামান্য সময়ই ধর্মের চিন্তা করে। সেই চিন্তাও, তার নুন-পান্তা জোগাড়ের চিন্তায়, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর চিন্তায়, প্রাইভেটের মাস্টারের টাকা সময়ে দিতে পারবে কি না, সেই চিন্তায় ঈশ্বরকে ডাকা। ধর্ম, তাকে এটুকুই ধারণ করে ছিল। তাই সেই সময় সে ভোটব্যাংকের মতো ভাবে না। সে তৃণমূল-বিজেপির মতো ভাবে না। সে গরীবের মতো-ই ভাবে। দলিতের অপমান, আদিবাসীর অপমান, মুসলমানের অপমান, কোথাও লুকিয়ে আছে তাঁকে শুধুমাত্র একমাত্রিক ভাবে দলিত বা মুসলমান করে রাখাতেই, তাঁর ব্যক্তি অধিকারকে, পরিচয়কে বারংবার একটি পরিচয়ে দেখার, এবং রাষ্ট্রের ভাষাতে, দেখিয়ে দেবার। তা ব্যক্তি মানুষের অপমান, অপমান সমষ্টিরও। |
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
১। দক্ষিণ-পন্থার উন্মেষ এবং গত দশকের পশ্চিমবঙ্গ: একটি আর্থ-রাজনৈতিক নিরীক্ষণ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী), তাঁদের শেষ পার্টি কংগ্রেসে (২০২২), পলিটিকাল-ট্যাকটিকাল লাইন (CPIM 2022) নথিতে, ভারতীয় সমাজ-রাজনৈতিক সংকটের রূপরেখাতে লিখছেন—
সূত্রঃ ত্রিবেদী সেন্টার ফর পলিটিকাল ডেটা (TCPD), অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়। লেখকের পরিমার্জন। প্রথমত উল্লেখ্য, উত্তর-পার্বত্য অংশে বিজেপি (মূলত আরএসএস) উত্থানের ক্ষেত্রে, ২০১১-২০১৬ (তিনগুণ ভোট বৃদ্ধি) এবং ২০১৬-২০২১ এর ক্ষেত্রে, প্রায় আড়াই-গুণ বৃদ্ধি। এ-যাবৎ সমস্ত পাঠেই3 উত্তর-পার্বত্য অংশে আদিবাসী-রাজনীতিতে আরএসএস-এর আধিক্য এবং চা-বাগানের (অধিকাংশ বন্ধ হতে থাকা) শ্রমিকদের দুর্দশাকে সামনে রেখে গোর্খা-জনজাতির রাজনীতির সাথে আরএসএস এবং বিজেপির সম্পর্ক। এই নির্বাচনী বৃদ্ধিকে লক্ষ্য করেই তৃণমূলের তৎপর হয়েছে; সেখান থেকেই ‘পাহাড় হাসছে’ ধরনে ফিরে আসার চেষ্টারত। কিন্তু, এই চাপান-উতোরের মাঝে আর্থিক-শ্রেণি ভিত্তির আলোচনা আপাতভাবে নেই। জাতি-বর্ণ-ধর্মের (যদি তা বিভেদ-বিভাজনের বিরুদ্ধে হয়) রাজনীতির, মূলত প্রান্তিকতার ক্ষেত্রে, একটি শ্রেণি চরিত্র থাকে (আইডেন্টিটি পলিটিক্স এবং আইডেন্টিটি রেসিস্টেন্স পলিটিক্সের এক্ষেত্রে একটি বিভেদ রাখা প্রয়োজন)। এই শ্রেণি চরিত্র সামনে না-থাকলেও, আলোচিত না-হলেও, ভিত্তিতে থাকেই। দ্বিতীয়ত, পূর্ব-সমতল এবং দক্ষিণ-সমতল-ও সামান্য পঠিত। অধ্যাপক রজত রায় (২০২২), তাঁর ফিল্ড-ওয়ার্ক ভিত্তিক গবেষণায় (নদীয়া এবং উত্তর-২৪ পরগণা) লক্ষ করছেন, দলিত-রাজনীতিতে (যা একটি রাজনৈতিক শব্দবন্ধ) ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে স্পর্ধা-বিরোধকে পাঠ/আলোচনা না-করেই, সরকারি মতানুসারে শিডিউল্ড কাস্ট এবং দলিতকে একত্র করে তুললে, “দলীয় সমাজের তাত্ত্বিক পরিভাষার মধ্যে জাতি-বিরোধী রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়”। কেন নয়? কারণ দলিত রাজনীতির মূল বিরোধাভাস যেখানে, সামাজিক অর্জনের বিরোধ, তাঁকে এলিট এবং ‘সাব-অল্টারণ’ বিরোধাভাসের নিরিখে পাঠের মাঝে গভীর অপটুতাই আছে। অন্তত সেই ‘সাব-অল্টারন’ তকমাতে যদি ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রবণতাগুলির নির্বাচনী বশ্যতা-ই রাজনীতির উপজীব্য হয়, অপটুতা সেখানেই। তৃতীয়ত, পশ্চিম-সমতলের জেলাগুলি আসলেই এই দশকের বিস্ময়। যে মাওবাদী-আদিবাসী উত্থানের ন্যারেটিভ রচনার সূত্রে, গ্রামীণ গরীব মানুষকে তৃণমূল (সেই-সময়ের বিজেপি সমেত) আশ্বাস দিয়েছিল, সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে, বিজেপি এখন ক্রমবর্ধমান। শুভাশিস রায় (২০২১; সম্পাদনা- সুমন নাথ এবং দেবরাজ ভট্টাচার্য, ২০২১)4 এই হিন্দুত্ব-বিজেপি ক্রমবর্ধমানতার পাঠ করেছেন পশ্চিম-সমতলে। সেই ক্ষেত্রে তিনি দেখছেন, ভোটের কিংবা রাজনৈতিক প্রতিস্পর্ধার চেয়েও বেশি, আরএসএস এবং বিজেপির বিভিন্ন শাখা এবং দলীয় অংশগুলি, নির্বাচনের বাইরের মানুষের প্রাত্যহিক জীবন-জীবিকার সূত্রে জুড়ে নিচ্ছে। গ্রামের স্কুল, সামাজিক অনুষ্ঠান, ইত্যাদি। এই সমস্ত আংশিক উত্তরের মাঝে, একটি প্রবণতা লুকিয়ে আছে। রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থার বিবিধ উন্মেষ। নির্বাচনে, দৈনন্দিন যাপনে, হনুমান পুজোয়, গনেশ পুজোয়, এবং বিশ্বাসের ক্ষেত্রে। বিশ্বাস শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক নয়, রাজনৈতিক-সামাজিক। এই প্রবণতার বাকি উপসর্গ, ব্যাধি, ওষধি ইত্যাদি আমার এই লেখার উপলক্ষ্য নয়। কিন্তু এই ‘বিশ্বাসের’ আর্থিক’ ভিত্তি কী? এই লেখার মূল সন্দর্ভটি এই ভিত্তি সন্ধানের। ক্ষুদ্র-পুঁজির ব্যক্তিগতকরণ এবং বৃহৎ-পুঁজির শ্রম-বিশোষণের ক্ষমতা হ্রাস এই দুটি একত্রে, এক নতুন ধরণের ‘বিপন্ন পরিবারের’ জন্ম দিয়েছে। এই পরিবার ক্রমাগতভাবে একক পুঁজির, স্ব-নিযুক্ত শ্রমের, এবং সেই সূত্রেই বিপন্নতর অবস্থায় শ্রমের পুনরুৎপাদনের উপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতার সামনে দাঁড়িয়ে একটি পরিবারের কোনও একটি কর্মসূত্রের আয় থেকেই সেই পরিবারের জীবনধারণের উপায় থাকে না। তাই বিভিন্ন সূত্রের আয়ের উপর (মূলত স্বনিযুক্তি এবং অসংগঠিত পুঁজির উপর নির্ভরশীল থেকে) মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। তাই একটি পরিবারকে তাঁদের শ্রমের-বিশোষণ ক্ষেত্র থেকে (একজন ফ্যাক্টরি শ্রমিককে ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা একজন ছোটো জোতের কৃষক-সভার সূত্রে) লড়াই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আরও সুবিন্যস্ত জীবন ও যাপনের দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচলিত বামপন্থী বিন্যাসের একটি আপাত-সমস্যা রয়েছে। সেই সমস্যার কারণ বহুধা-বিভক্ত। কিন্তু একটি কারণ নিয়েই আমরা আলোচনা করব। যে-শ্রমিককে পুঁজি এবং শ্রম দুই-ই জোগাড় করে তুলতে হচ্ছে, সেই স্ব-নিযুক্ত শ্রমিকের উন্মেষের সাথে সাথে যদি আর্থিক বিপন্নতা বাড়তে থাকে তাহলে সেই ব্যক্তিগতকরণকে ‘সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের’ রাজনীতির ঘেরাটোপে নিয়ে আসা সহজ। তাঁর বিপন্নতা যেমন সত্য এবং তাঁর পুঁজির পরিচয়ে কিংবা শ্রমের পরিচয়ে রাজনৈতিক বিকল্পের সীমিত-সন্ধানও তেমনই সত্য। তাই ছোটো বিড়ি ব্যবসার সাথে যুক্ত পরিবারের মুসলিম পরিচয়ের কারণে তাঁকে ‘বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেব’ শাসানো কিংবা তাঁকে ‘শুধুমাত্র মুসলিম’ এই পরিচয়েই আবদ্ধ রাখা, এইটেই দক্ষিণ-পন্থার উপজীব্য। লেখার দুটি অংশে বাংলায় রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দক্ষিণ-পন্থার উন্মেষের ক্ষেত্রে আর্থ-সামাজিক ভিত্তিরূপে এই ‘স্বনিযুক্ত শ্রম এবং স্ব-আয়োজিত পুঁজির’ শ্রেণিকেই সামনে রাখব। আরও স্পষ্টভাবে, রাজ্যের অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রের পুঁজির এবং শ্রমের অবস্থানের সাথে এই উন্মেষের একটি সম্ভাব্য-সম্পর্ক নিরূপণই এই লেখার উপজীব্য। [সুধী পাঠককে অনুরোধ, এই নিরুপণ আসলে প্রবণতার একটি পাঠ। একে ‘কার্য-কারণ’ রূপে দেখবেন না। এই পাঠ প্রবণতাগুলির সূত্রে রাজনৈতিক চিন্তনে প্রশ্ন-উদ্রেক করাই উদ্দেশ্য, উত্তর দেওয়ার না। সেই উত্তর পেতে ফিল্ডে, শহরে, গ্রামে-গঞ্জে এবং পার্টি-সাংগঠনিক রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার কোনও বিকল্প নেই।] ২। অসংগঠিত পুঁজি এবং ব্যক্তিগত-ক্ষুদ্র-পুঁজি: উদারবাদের সংকট এবং ব্যক্তি-পুঁজির প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালের লোকসভার একটি প্রশ্নোত্তর সামনে রাখা যাক। কমরেড সন্তোষ-কুমার (এম-পি), প্রশ্ন রেখেছেন, দেশের অসংগঠিত শ্রমের এবং শ্রমিকের সংখ্যা এবং তাঁর বণ্টনের কিছু উত্তর চেয়ে [মূল প্রশ্ন]5। সেই উত্তরে আমরা দেখতে পাই, যে সামান্য অংশ কেন্দ্রীয় ই-শ্রম পোর্টালে সংযোজিত তাঁর সংখ্যা, ২৯ কোটি। বাংলায় সেই সংখ্যা, ২.৬ কোটি, যা গোটা দেশের প্রায় ৯%। ভারতের অসংগঠিত কর্মী-শ্রমিকের আসল সংখ্যা যথেষ্ট বেশি। ‘ই-শ্রম’ তাঁদের কিয়দংশকেই তুলে ধরে, কিন্তু রাজ্যের সেই ৯-১০ অনুপাত তাতে বিঘ্নিত নয়। সংগঠিত ক্ষেত্রের পুঁজির (Organised) অসংগঠিত শ্রমিকের পরিমাণ বৃদ্ধি রাজ্যের ক্ষেত্রে নতুন নয় (কাপুর এবং কৃষ্ণপ্রিয়া, ২০১৯)। এর বাইরেও রাজ্যের অর্থনীতিতে একটি বড়ো অংশের অসংগঠিত পুঁজির এবং সেই সূত্রে অসংগঠিত শ্রমিকের একটি বড়ো অংশ শিল্প-সেবাক্ষেত্রে নিযুক্ত। পুঁজি এবং শ্রম, দুই-ই যেখানে অসংগঠিত। চিত্র ১, এই স্ব-নিযুক্ত পুঁজির সার্বিক আয়তনের এবং প্রয়োজনের দিকটিই তুলে ধরে। ন্যাশানাল স্যাম্পল সার্ভে কৃত সমীক্ষা থেকে দেখতে পাই, ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজ্যের অসংগঠিত শিল্পক্ষেত্রে স্ব-নিযুক্ত প্রতিষ্ঠান (যেখানে কোনও শ্রমিককে নিয়োগ না-করে, স্ব-নিযুক্তিই (Own account Enterprises) থেকেছে) তাঁর পরিমাণ ৮৮% (২০১০-১১), ৯১.১% (২০১৫-১৬), এবং ৯১.৫% (২০২২-২৩)।6 অর্থাৎ, অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯২ শতাংশ-ই শ্রমিক নিয়োগে সক্ষম নয়। প্রথমত, সর্বভারতীয় এবং রাজ্যের একটি তুলনায় দেখা যাচ্ছে, ২০২২-২৩ সালে, রাজ্যের স্ব-শ্রম প্রতিষ্ঠানগুলির গড় মূল্য সংযোজন (গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড) জাতীয় গড়ের তুলনায় যথেষ্ট কম। গ্রামে (ছ-হাজার টাকার কিছু বেশি) এবং শহরে প্রায় দশ-হাজার টাকার মাসিক মূল্য সংযোজন, এই বিপন্নতার প্রাথমিক লক্ষণ (চিত্র ২)। এই দ্বিতীয় বিপন্নতার আর্থিক সংকটটি কী? স্বল্প বিনিয়োগ। গ্রামাঞ্চলে এবং শহরে গড় বিনিয়োগের পরিমাণ, সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় আড়াই-গুণ কম (সারণি ৩)। এই বিপন্নতার একটি আর্থিক পরিভাষা রয়েছে। লো-লেভেল ইক্যুয়িলিব্রিয়ম ট্র্যাপ। স্বল্প বিনিয়োগ জন্ম দিচ্ছে স্বল্প আয়ের এবং স্বল্প আয়ের থেকে স্বল্প বিনিয়োগের জন্ম। এই-ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থী অর্থনীতির একটি সহজ সুরাহা, ঋণের। তাই রাজ্যের বাজেটে এবং কেন্দ্রের বাজেটে, সর্বক্ষণ, ছোটো পুঁজির প্রতিষ্ঠানকে সহজ ঋণে পৌঁছে দেওয়ার একটি চেষ্টা দেখা যায়। মুশকিল হল, এই পুঁজির ঋণের সূত্রে বিনিয়োগ বেড়ে উঠলেও (আদপেই তা হয় না), গড় মূল্য সংযোজনের একটি বড়ো অংশই সেই ঋণ মেটাতে কেটে যাবে।
তৃতীয়ত, একটি সর্বশেষ প্রবণতার উল্লেখ এখানে প্রয়োজন। রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলগুলির ভিত্তিতে আয় বিপন্নতার এবং সামগ্রিক স্বনিযুক্ত-প্রতিষ্ঠানের বণ্টনের একটি তুলনামূলক অনুপাত। এই অনুপাতটি নিয়ে একটু বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। অনুমান করা যাক রাজ্যের সামগ্রিক স্ব-নিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের কুড়ি শতাংশ রাজ্যের দক্ষিণ-সমতলের জেলাগুলিতে অবস্থিত। এবার যদি শুধুমাত্র বিপন্ন স্ব-নিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বণ্টন দেখি, সেখানে যদি দেখা যায়, রাজ্যের সামগ্রিক বিপন্ন প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ এই অঞ্চলে, তার অর্থ, বিপন্নতার বণ্টন এই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠানের বণ্টনের চেয়ে বেশি। 7 সারণি ৪, থেকে আঞ্চলিক প্রবণতাটি পরিস্ফুট। উত্তর-পার্বত্য, দক্ষিণ-সমতল, এবং কেন্দ্রীয় মধ্য-সমতলের জেলাগুলিকে আপাতত আলোচনায় রাখা হল না। এই অংশে (উত্তর-পার্বত্য ব্যতিরেকে) যদিও প্রতিষ্ঠানের বণ্টন এবং বিপন্ন প্রতিষ্ঠানের বণ্টন প্রায় সমান (অনুপাত ১-এর কাছাকাছি। পূর্ব-সমতলের জেলাগুলির (মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর, নদীয়া এবং বীরভূম) ক্ষেত্রে এই অনুপাত ১.২। পশ্চিম-সমতলের (পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া) জেলাগুলির ক্ষেত্রেও এই অনুপাতটি ১.২।
সূত্রঃ লেখককৃত। ASUSE-2022-23.
অর্থাৎ এই অঞ্চলগুলিতে বিপন্ন নয় এরকম নিজ-শ্রমের প্রতিষ্ঠানের চেয়ে-ও বিপন্ন প্রতিষ্ঠানের হার বেশি। প্রথমত, এই দুটি অঞ্চলেই যদি আবার নির্বাচনী পাটিগণিতটিও ঝালিয়ে নেওয়া যায়, ২০১১ সালে, বিজেপির পূর্ব-সমতলে ভোটের শেয়ার ছিল ৫.৩% এবং তা ২০১৬ সালে এসে দাঁড়ায়, ১১.৪%, এবং ২০২১ সালে ৩৬%। পশ্চিম-সমতলের ক্ষেত্রে, এই বৃদ্ধি, ৩.১ % থেকে ৭.৯% (২০১১-২০১৬) এবং ২০২১ সালে (৭.৯% থেকে ৪৩.৮%)। ৩। শেষ কিছু কথা এই স্থানীয় স্ব-নিযুক্ত পুঁজির এবং বিপন্নতার সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক স্তরে আরএসএস-বিজেপির মতো সংগঠনের উত্থানের কারণকে একমাত্রিকভাবে জুড়ে নেওয়া অনুচিত। লেখার উদ্দেশ্য একেবারেই তা নয়। বরং এই অঞ্চলগুলিতে, যে অ্যাকাডেমিক-রাজনৈতিক গবেষণার সাম্প্রতিক কিছু বিশ্লেষণ সামনে এসেছে, সেই বিশ্লেষণের সাথে শ্রেণি-রাজনৈতিক একটি আখ্যানও যেভাবে যুক্ত তাকে মান্যতা দেওয়াই লক্ষ্য। সেই বিশ্লেষণেরও আগে, একটি প্রাথমিক এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের প্রয়োজন আছে। জাতি-বর্ণ বিভেদের বিরুদ্ধে রাজনীতির একটি ব্যাকরণ আছে। সেই ব্যাকরণে, ভারতীয় উপমহাদেশের ক্ষেত্রে, ব্রাহ্মণ্যবাদী-মনুবাদী হিন্দু প্রকরণের বিরোধিতা যেরকম একটি দিক, তেমনই রাজ্য-রাষ্ট্রের চালনার প্রতিটি স্তরে, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, অনগ্রসর জাতি-বর্ণের মানুষের প্রতিনিধিত্ব-ও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই দুটি দিকের সম্মেলন আসলে একটি বৃহৎ পরিবর্তনের লক্ষ্যে। সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যকে পেরিয়ে জাতিভিত্তিকভাবে অনগ্রসর মানুষকে জীবনের এবং জীবিকার লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়া। এই শেষ লক্ষ্যটি থেকে বিস্মৃত হয়ে গেলে, প্রতিনিধিত্ব সত্ত্বেও, মনুবাদী রাজনীতির শিকার হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বহু অংশেই, সাম্প্রতিক অতীতে, নির্বাচনী কৌশলের সূত্রে নীতিশ কুমারের এই স্খলন এখনও সুধী পাঠকের, মনে আছে এই আশা রাখছি। এই এক-ই সংযোজন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুর সাংবিধানিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সাথেও যুক্ত। নির্বাচনী পাটিগণিতের বাইরে সেই ক্ষমতায়ন। ‘রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক’, ‘ক্লায়েন্টেল’, এই তাবৎ শব্দবন্ধ আসলে এক বড়ো অংশের মানুষকে তাঁর একটিমাত্র পরিচয়ে নিবদ্ধ করে রাখার চেষ্ঠা। অর্থাৎ, মালদায় আমার কোনও বন্ধু সকাল থেকে উঠে তাঁর সংখ্যালঘু মস্তিস্কে চা খায়, কাগজ পড়ে, দোকানে যায়। আর আমি আমার বর্ণহিন্দু মস্তিষ্কে চা খাই, কাগজ পড়ি, দোকানে যাই। এই এক-ই কাজকে শুধুমাত্র আমাদের ধর্ম আলাদা তাই আমাদের কর্ম আলাদা রূপে দেখলে, হিন্দুত্ববাদের ছায়ায় দাঁড়ানো হয়ে যাবে। অবশ্যই আমার মালদায়, দিনাজপুরে, কলকাতায় থাকা বন্ধু, যে ধর্মসূত্রে মুসলিম, তাঁর জীবনে এবং যাপনে আরএসএস এবং বিজেপি যে পরিমাণ দুর্বিষহ করে তুলেছে, তাকে প্রতিরোধ করতেই হবে। কিন্তু সেই প্রতিরোধ, সে-মুসলিম বলেই, কিংবা বৌদ্ধ বলে নয়। সে-মানুষ বলে। আর দেশে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার আছে বলে। গরীব মানুষ তাঁর সারাদিনের যাপনে, নুন-পান্তা জোগাড়ের ফাঁকে, সামান্য সময়ই ধর্মের চিন্তা করে। সেই চিন্তাও, তার নুন-পান্তা জোগাড়ের চিন্তায়, সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর চিন্তায়, প্রাইভেটের মাস্টারের টাকা সময়ে দিতে পারবে কি না, সেই চিন্তায় ঈশ্বরকে ডাকা। ধর্ম, তাকে এটুকুই ধারণ করে ছিল। তাই সেই সময় সে ভোটব্যাংকের মতো ভাবে না। সে তৃণমূল-বিজেপির মতো ভাবে না। সে গরীবের মতো-ই ভাবে। দলিতের অপমান, আদিবাসীর অপমান, মুসলমানের অপমান, কোথাও লুকিয়ে আছে তাঁকে শুধুমাত্র একমাত্রিক ভাবে দলিত বা মুসলমান করে রাখাতেই, তাঁর ব্যক্তি অধিকারকে, পরিচয়কে বারংবার একটি পরিচয়ে দেখার, এবং রাষ্ট্রের ভাষাতে, দেখিয়ে দেবার। তা ব্যক্তি মানুষের অপমান, অপমান সমষ্টিরও। প্রশ্ন হল, শুরুতে আলোচ্য এই পুঁজির বিপন্নতার সামনে, বাংলার মতো রাজ্যে কীভাবে এই চক্রবৃদ্ধি হারে হিন্দু-দক্ষিণপন্থার উন্মেষ? সম্ভবত তা শুধুমাত্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক নয়। তার উপকরণ এবং উপঢৌকন সাংস্কৃতিক হতেই পারে, তাঁর উদযাপন সামাজিক (মুখ্যমন্ত্রীর যেখানে সেখানে মাশা-আল্লাহ, ইনশাল্লাহ, কিংবা ডহরবাবুর বাড়ির লোক, ইত্যাদি শব্দ ছুঁড়ে দেন), কিন্তু ভিত্তিটি, অর্থনৈতিক বিপন্নতার। সফল-পুঁজির এবং বিফল-পুঁজির, লাগাতার চলতে থাকা সংলাপের। এই স্থানীয় পুঁজির, ক্ষুদ্র এবং নিজস্ব পুঁজির একটি সংলাপ আছে সামগ্রিক কর্পোরেটের সাথে। সেই সংলাপ পুঁজির সাথে পুঁজির নয়, পুঁজির সাথে শ্রমের-ই। আশা এটুকুই, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, কিংবা, উত্তর প্রদেশের কৃষিজাত পুঁজি এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধাচারণ করেছে। বাংলা, এখনও অপেক্ষার। প্রকাশের তারিখ: ১৪-মার্চ-২০২৫ |
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |
||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||