ভারতীয় বিপ্লব সম্পর্কে আমাদের ধারণা

পি সুন্দরাইয়া
যা হোক, এটা সব সময়ে মনে রাখা দরকার যে, শাসকশ্রেণি রা কখনো স্বেচ্ছায় তাদের ক্ষমতা পরিত্যাগ করে না।  তারা জনগণের ইচ্ছাকে লঙ্ঘন করে বেআইন ও হিংসার সাহায্যে জনগণের ইচ্ছার উল্টোটা করতে চেষ্টা করে। সে জন্য বিপ্লবী শক্তিগুলির হুঁশিয়ার থাকা দরকার এবং এমনভাবে কাজকর্মের ধারা স্থির করা দরকার যাতে তারা সমস্ত রকম অবস্থার মোকাবিলা করতে পারে, পারে দেশের রাজনৈতিক জীবনের যে কোন বাঁক ও মোড়ের সম্মুখীন হতে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এই কথাই বলে যে, যে-কোনো বিপ্লবের  মূল প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রক্ষমতা অধিকার করার প্রশ্ন। কোনো একটি বিশেষ স্তরে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে শ্রেণি  প্রভুত্ব করে রাষ্ট্র হল তাদের হাতের দমনমূলক যন্ত্র সেই কারণেই বিপ্লবের স্তর ও রণনীতি নির্ধারিত হয়ে থাকে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র দ্বারা— কোন শ্রেণি  বা শ্রেণিগুলির কাছ থেকে কোন শ্ৰেণি বা শ্ৰেণিগুলি ক্ষমতা অধিকার করবে তার দ্বারা ৷

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশের রাজনৈতিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে কংগ্রেস নেতাদের হাতে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। এবং একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। এই রাষ্ট্র হলো বৃহৎ বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে বুর্জোয়া-জমিদারদের শ্রেণিশাসনের যন্ত্র ।

ভারতের বৃহৎ বুর্জোয়ারা জমিদারদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে আছে এবং বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সহযোগিতা করে চলেছে। ধনবাদী জমিদারতন্ত্র সমেত সামন্তবাদী এবং আধা-সামন্তবাদী কোনো জমিদারতন্ত্রকেই এই রাষ্ট্র অবলুপ্ত করতে পারে না এবং এই রাষ্ট্র কৃষি মজুরদের মধ্যে জমি বিলি করতে ও আমাদের দেশে যে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক আধিপত্য রয়েছে তাকে নিঃশেষ করতে পারে না।

জনগণের বৈপ্লবিক আন্দোলন যদি তাদের শাসনকে উৎখাত করার পর্যায়ে উন্নীত হয় এমনকি তখনও বৃহৎ বুর্জোয়ারা জমিদার ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে তাদের গাঁটছড়াকে শিথিল করবে না, বরং তারা তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে তবু তাদের সাথে মোর্চা ও সহযোগিতাকে পরিত্যাগ করবে না এবং বিপ্লবী শক্তির সাথে যোগ দেবে না। একদিকে বৃহৎ বুর্জোয়া ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের চাপ এবং অপরদিকে জনগণের শক্তিশালী বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের চাপ—এই দুয়ের মাঝে যখন ছোট ও মাঝারি বুর্জোয়ারা পড়ে তখন তারা বৃহৎ বুর্জোয়া ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের দিকে না গিয়ে জনগণের শিবিরে যোগ দেয়।

এই কারণেই আমরা মনে করি, বৃহৎ বুর্জোয়ার নেতৃত্বে বর্তমানের বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্রকে অপসারিত করে তার জায়গায় শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত এবং অ-বৃহৎ বুর্জোয়াদের নতুন জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিস্থাপিত করতে হবে । বিপ্লবের প্রধান আঘাত পরিচালিত হবে বৃহৎ বুর্জোয়া পরিচালিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এবং জমিদারতন্ত্রকে অবলুপ্ত করে, বিদেশী, পুঁজি ও ভারতীয় বৃহৎ বুর্জোয়াদের সমস্ত সংস্থা বাজেয়াপ্ত করে বিপ্লব তার প্রধান গতিপথে এগিয়ে চলবে।

স্বাধীনতার ২৬ বছর

২৬ বছর ধরে কংগ্রেস কেন্দ্রে ক্ষমতা অধিকার করে আছে। তার সব ধরনের ভূমিসংস্কার আইন সত্ত্বেও শতকরা পাঁচ ভাগ জমিদার পরিবারের হাতে শতকরা চল্লিশ ভাগ পর্যন্ত জমি কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে এবং গ্রামীণ জনগণের মধ্যে ভূমিহীন ও গরিব মানুষের সংখ্যা সত্তর ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে ।

শিল্পোন্নতি তিনগুণ বেড়েছে এবং কয়েকটি প্রয়োজনীয় ও বুনিয়াদি শিল্প গড়ে উঠেছে - কংগ্রেসীদের এই দাবি সত্ত্বেও দেশে এখনো স্বনির্ভর শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠেনি। সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি ও বিদেশী সহযোগিতা বিরাট পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশী সম্পত্তিগুলিকে বাজেয়াপ্ত করতে এবং তার ফাঁসকে অবলুপ্ত করতে সরকার অস্বীকার করছে।

একচেটিয়া ও বৃহৎ ব্যবসায়ী পরিবারগুলি প্রচুর পরিমাণে সম্পত্তি কেন্দ্রীভূত করেছে। বেসরকারী ক্ষেত্রে ব্যবসায়ের মোট সম্পত্তির শতকরা প্রায় ত্রিশ ভাগ দশটি বড় ব্যবসায়ী পরিবার নিয়ন্ত্রণ করে এবং টাটা ও বিড়লারা তাদের সম্পত্তির পরিমাণ ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৭১ সালে ১০৭ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৮১ কোটি টাকা করেছে। দশ হাজার থেকে পনেরো হাজার কোটির অবাধ কালো টাকা—যা প্রতি বছর এক হাজার কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা করে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে— দেশে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি চালু করেছে। বৃহৎ ব্যবসায়ীদের কর লাঘব করা এবং কৌশলে তাদের কর ফাঁকি দেওয়া এবং জনগণের ব্যবহারোপযোগী প্রতিটি প্রয়োজনীয় পণ্যের উপর প্রচণ্ড পরিমাণ কর চাপানোর ফলে সরকারকে ঘাটতি অর্থনীতির আশ্রয় নিতে হচ্ছে এবং আমাদের ভাগ্যে জুটছে ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি ও সর্বব্যাপক কালোবাজারি।

দ্রুতগতিতে বেড়ে ওঠা বেকার সংখ্যা যার মধ্যে চল্লিশ লক্ষ ম্যাট্রিক মানোত্তীর্ণ শিক্ষিত রেজিস্টার্ড বেকার রয়েছে, গণ- নিরক্ষরতা, বয়স্কদের মধ্যে শতকরা ২৫ জনের সপ্তম এবং অষ্টমমান পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা, চিকিৎসার এবং বাসস্থানের অকিঞ্চিৎকর সংযোগ প্রভৃতি আমাদের জনগণের ভাগ্যে জুটছে। 

এই সমস্ত ঘটনা আমাদের পার্টির এই সুচিন্তিত যুক্তিকেই প্রমাণ করে যে, বৃহৎ বুর্জোয়ার নেতৃত্বে যে বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই রাষ্ট্র বিপ্লবের সমাজতান্ত্রিক স্তরে পৌঁছানোর পূর্বশর্ত হিসাবে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কোনো কাজকেই সমাধা করতে পারে না। সুতরাং জাতীয় বুর্জোয়া ও বর্তমানের কংগ্রেস দলের ভিতরের প্রগতিশীল অংশের সাথে শ্রমিকশ্রেণির মোর্চার দ্বারা ভারতীয় বিপ্লব একটি উত্তরণ-কালীন স্তর হিসাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্তরে পৌঁছাতে পারে বলে যে কথা বলা হয়ে থাকে তা অবাস্তব প্রমাণিত হয়েছে। এটি একটি দেউলিয়া তত্ত্ব। শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত এবং ছোট ও মাঝারী বুর্জোয়াদের নিয়ে শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে ব্যাপক জনগণতান্ত্রিক মোর্চা গঠন করে, জমিদারতন্ত্র ও বৃহৎ বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ করে, বর্তমান রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে এবং নতুন রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রক্ষমতাকে অবশ্যই অধিকার করতে হবে

সরকারের বৈদেশিক নীতি

ভারতের শাসকশ্রেণিগুলি  অন্যান্য অনেক সদ্য স্বাধীন দেশের শাসকশ্রেণিগুলির মতো নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে জোট নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেছে। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বিদ্যমান থাকায় এই দেশগুলির শাসক শ্রেণিগুলি দুটি শিবিরের মধ্যে দর কষাকষি করে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য সুবিধা আদায় করতে পারছে এবং সাম্রাজ্যবাদী কৌশল ও চাপের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করতে পারছে। কিন্তু তাদের শ্রেণিচরিত্রের কারণে তারা সাম্রাজ্যবাদের সাথে সহযোগিতার নীতি কখনই পরিত্যাগ করতে পারে না এবং সমাজতান্ত্রিক জগতের সাথে বন্ধুত্বকে আরো ঘনিষ্ঠ করার নীতি অথবা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ও শান্তির বৈদেশিক নীতি বরাবরের জন্য অনুসরণ করতে পারে না । গত ২৬ বছরের ইতিহাস আরো একবার এই কথা প্রমাণ করেছে ।

বৃহৎ বুর্জোয়া সমেত ভারতীয় বুর্জোয়াদের সাথে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত বিদ্যমান রয়েছে আমাদের পার্টি সে সম্পর্কে অবহিত আছে। আমরা মনে করি, বিশ্ব ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাধারণ সংকট যত গভীরতর হবে এই সংঘাতগুলি তত বেশি বৃদ্ধি পাবে সাম্রাজ্যবাদীদের বিচ্ছিন্ন করতে এবং গণতান্ত্রিক প্রগতির জন্য জনগণের সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে এই ধরনের প্রত্যেকটি মতপার্থক্য, ফাটল, সংঘাত ও দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করার জন্য আমাদের পার্টি সাগ্রহ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। শাসক কংগ্রেস দলের সাথে কোনোরকম কুশলী ঐক্য অথবা যুক্তফ্রন্ট গঠনের মোহ না রেখেই বিশ্বশান্তির জন্য উপনিবেশবাদ-বিরোধী প্রতিটি বিষয়েই, সাম্রাজ্যবাদের সাথে দ্বন্দ্বের প্রতিটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়েই এবং যা আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীন বৈদেশিক নীতিকে শক্তিশালী করবে এই রূপ প্রত্যেকটি প্রশ্নে সরকারী অনুসৃত নীতিকে শ্রমিকশ্রেণি  অকুণ্ঠ সমৰ্থন জানাবে ৷

সংসদীয় পথ

কোনো কোনো বামপন্থী দল মনে করে যে, বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান গণ-আন্দোলনের ধাক্কায় সংসদে গরিষ্ঠতা লাভ করে জনগণ বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্রের কাছ হতে ক্ষমতা দখল করতে পারে। তারা ক্ষমতা দখলের শান্তিপূর্ণ পথে এবং শান্তিপূর্ণ সমাজতান্ত্রিক উত্তরণে বিশ্বাস করে ।

আমাদের পার্টি কর্মসূচীতে বলা হয়েছে :

আমাদের পার্টি শান্তিপূর্ণ উপায়ে জনগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে এবং সমাজতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটাতে চেষ্টা করে ।... যা হোক, এটা সব সময়ে মনে রাখা দরকার যে, শাসকশ্রেণি রা কখনো স্বেচ্ছায় তাদের ক্ষমতা পরিত্যাগ করে না।  তারা জনগণের ইচ্ছাকে লঙ্ঘন করে বেআইন ও হিংসার সাহায্যে জনগণের ইচ্ছার উল্টোটা করতে চেষ্টা করে সে জন্য বিপ্লবী শক্তিগুলির হুঁশিয়ার থাকা দরকার এবং এমনভাবে কাজকর্মের ধারা স্থির করা দরকার যাতে তারা সমস্ত রকম অবস্থার মোকাবিলা করতে পারে, পারে দেশের রাজনৈতিক জীবনের যে কোন বাঁক ও মোড়ের সম্মুখীন হতে

চিলির সাম্প্রতিক দুঃখজনক ঘটনা ইতিহাসের পুরনো দিনের ঘটনাই আমাদের আর একবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। 

আমাদের দেশে ১৯৫৯ ১৯৬৯ সালে কেরালায় এবং ১৯৬৭ ১৯৭০ সালে পশ্চিমবাংলায় নির্বাচিত বাম মোর্চার সরকারগুলিকে কেন্দ্রীয় সরকার ভেঙে দিয়েছে, যে সরকারগুলিতে কমিউনিস্টরা উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করেছিলরাজ্যপাল রাষ্ট্রপতির শাসনের মাধ্যমে নিজেদের শাসন চাপিয়ে নেবার জন্য তারা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে বারে বারে সংবিধানের আইনগুলিকে লঙ্ঘন করেছে১৯৭২ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তারা নির্বাচনকে সর্বাত্মক সাজানো নির্বাচনে পর্যবসিত করার কৌশল অবলম্বন করেছিলদমনমূলক নীতি চালু করা, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার বামপন্হী দলগুলির সকল প্রকার গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করা, নাগরিক স্বাধীনতাকে অস্বীকার করা, নিরাপত্তামূলক আটকের আশ্রয় নেওয়া, জরুরী অবস্থা ভারতরক্ষা আইন জারি করা তাকে জিইয়ে রাখা, বামপন্হী দলগুলির সভ্য সমর্থকদের তাদের শক্তিশালী স্থান থেকে সমূলে বিতাড়িত করা, শাসক শ্রেণির বিরোধী শত শত মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করাএই সমস্তই হচ্ছে ভারতে কংগ্রেস সরকারের কাজসুতরাং সংসদীয় গণতন্ত্রের বিপদ শাসকশ্রেণির পক্ষ থেকেই আসছে

তবুও আমাদের পার্টি মনে করে যে, সংসদীয় গণতান্ত্রিক সংস্হাগুলিকে রক্ষা করা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণকারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য, কিছু পরিমাণে রাষ্ট্রের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার জন্য এবং শান্তি, গণতন্ত্র সামাজিক প্রগতির সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে এই সমস্ত সংসদীয় ব্যবস্হা জনগণের কাছে কিছুটা সংযোগ এনে দিয়েছে

আমাদের পার্টি নকশালবাদীদের এই তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করে যে, সংসদে অংশ গ্রহণ করা কমিউনিস্টদের পক্ষে নিষিদ্ধ, কারণ এর পরিণতি পার্লামেন্টারি ক্রেটিনিজম1 আমাদের পার্টি তাদের এই তত্ত্বকেও অস্বীকার করে যে, সংসদকে বর্জন করা এবং ব্যক্তিগত সশস্ত্রপনার দ্বারা সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি করাই বিপ্লবের পথএটা ছেলেমানুষী এবং এর দ্বারা বিপ্লবী শক্তির মধ্যে শুধুমাত্র বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি করা হয় এবং শাসকশ্রেণির হাতের খেলার পতুল হতে হয়সশস্ত্র বিপ্লব তখনই সম্ভব এবং সার্থক হবে একমাত্র যখন ব্যাপক জনগণ বিপ্লবে অংশ নেবে দেশের বাস্তব অবস্হা বিপ্লবের উপযোগী হবে এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে একটি সচেতন শক্তিশালী শ্রমিকশ্রেণির পার্টি যখন সংগঠিত করা যাবে বিষয়ে আমরা মার্কসিবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বের প্রতি অনুগতবিদ্রোহ বিপ্লব একটি আর্ট——যা আয়ত্ত করতে হয় 

আমাদের বিপ্লবের পথ 

অনেক বছর ধরে আলোচনার পর এবং বিশেষ করে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে এমন কি ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিও ১৯৫১ সালে কতকগুলি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল, যেগুলি “কর্মনীতিতে” বিস্তারিতভাবে উল্লিখিত আছে। এই কর্মনীতি ১৯৬৮ সালে কোচিন কংগ্রেসে আমাদের পার্টি পুনরায় গ্রহণ করেছে। এর প্রধান বিষয়গুলি হলো :

ভারতে বিপ্লবের পথ রাশিয়ার পথ হতে পারে না। যেহেতু ভারতের অর্থনীতি নিশ্চিতভাবেই কৃষিপ্রধান ও পশ্চাৎপদ সেই কারণে কৃষি আন্দোলনের একান্ত প্রয়োজনীয়তাকে ছোট করে দেখা কখনই উচিত হবে না। সুতরাং শহর ও শিল্পাঞ্চলে রাজনৈতিক সাধারণ ধর্মঘট আমাদের বিপ্লবের প্রধান অস্ত্র নয় এবং সেই কারণে বর্তমান রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করার জন্য দেশব্যাপী বিদ্রোহ সৃষ্টি করার কাজে একমাত্র সাধারণ ধর্মঘটই যথেষ্ট নয়।

আমাদের বিপ্লবের পথ চীনের পথও হতে পারে না। যে পথ হলো পার্টিজান যুদ্ধের পথ - যা মুক্তাঞ্চল সৃষ্টি করবে এবং শেষ পর্যন্ত শহরকে মুক্ত করবে। সুতরাং কৃষকদের পার্টিজান যুদ্ধ ভারতীয় বিপ্লবকে নিশ্চিত করার প্রধান অস্ত্র হতে পারে না।

চীনের ঐক্যবদ্ধ ও ভালো যোগাযোগ ব্যবস্হা ছিল না এবং  চীন বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মধ্যে বিভক্ত ছিল। এই সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রাধান্যের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্র এবং সৈন্য সামন্ত ছিল ; তারা সব সময়েই পরস্পরের সাথে বিবদমান থাকতো, যার ফলে তারা কোনো সময়েই বিপ্লবের কেন্দ্রগুলির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ও কেন্দ্রীভূত হতে পারতো না। কিন্তু ভারতের অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ, সুসংহত এবং দূরবর্তী যোগাযোগ ব্যবস্থা যার ফলে শাসকশ্রেণিগুলি খুব সহজেই এবং দ্রুত গেরিলা বাহিনী এবং তার কেন্দ্রগুলির বিরুদ্ধে তাদের বিরাট বাহিনীকে কেন্দ্রীভূত করতে পারে । 

কিন্তু সাথে সাথে চীনের মতো ভারতও একটি বিরাট দেশ এবং তার বিরাট কৃষক জনসংখ্যা আছে। সেই জন্য চীনবিপ্লবের সাথে অনেক বিষয়েই তার মিল থাকব ।

ভারতীয় বিপ্লবের বিজয়ের জন্য

কৃষকদের পার্টিজান যুদ্ধকে অন্যান্য প্রধান অস্ত্রের সাথে- যেমন শ্রমিকশ্রেণির ধর্মঘট, সাধারণ ধর্মঘট এবং শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে শহরাঞ্চলে যে অভ্যুত্থান হবে সেই সকলকে যুক্ত করতে হবে। বিপ্লবের প্রধান দুটি প্রতিপাদ্য বিষয় হলো : কৃষকদের পার্টিজান যুদ্ধ এবং শহরাঞ্চলে শ্রমিক শ্রেণির অভ্যুত্থান ।

এখানে প্রথমত এই কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই লক্ষ্যকে আশু বাস্তব অবস্থার সাথে কখনই গুলিয়ে ফেলা চলবে না। গভীর অর্থনৈতিক দুরবস্হা, গভীর রাজনৈতিক অসন্তোষ, অনেক বিরাট বিরাট গণ-আন্দোলন এবং তার প্রচণ্ড রাজনৈতিক প্রভাব হওয়া সত্ত্বেও এই লক্ষ্য হচ্ছে অনেক দূরবর্তী ভবিষ্যতের। কারণ আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ব্যাপ্তি ভীষণভাবে অসম, বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির ঐক্য এখনও গড়ে ওঠেনি, এবং সংগঠন, জনসাধারণ ও গণ-সংগঠনের মধ্যে ঐক্য, শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী ও গণফ্রন্ট গড়ে তোলার কাজ এখনও অত্যন্ত নিচুস্তরে।

দ্বিতীয়ত, পার্টিজান যুদ্ধের দুটি স্তর আছে। একটি হচ্ছে আংশিক দাবি আদায়ের জন্য এবং প্রয়োজন হলে অস্ত্রের সাহায্যে তাকে রক্ষা করতে হবে । দ্বিতীয়টি হচ্ছে মুক্তির জন্য, শাসকশ্রেণি র উচ্ছেদের জন্য এবং ক্ষমতা অধিকার করার চেষ্টার জন্য। তেলেঙ্গানা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এই শিক্ষা লাভ করেছি যে, এই আন্দোলন নিজামের বিরুদ্ধে পার্টিজান মুক্তিযুদ্ধে উন্নীত হয়েছিল। প্রথমে উচ্ছেদ ও বেগার খাটানোর বিরুদ্ধে সাধারণ অর্থনৈতিক আন্দোলন হিসাবে শুরু করে, অত্যাচারের মুখে মিছিল বিক্ষোভ দিয়ে শুরু করে কৃষকেরা তাদের আংশিক দাবি আদায়ের জন্য অস্ত্র তুলে নিয়েছিল এবং তারা নিজামের শাসনকে উচ্ছেদ করার জন্য লড়াই করেছিল। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পরে এই সংগ্রাম আর নিজামের বিরুদ্ধে ছিল না, এই সংগ্রাম ছিল ম্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরদ্ধে। যে জমি তারা দখল করেছিল সেই জমিকে রক্ষা করার উদ্দেশ্য নিয়েই তেলেঙ্গানার সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালিত হওয়া উচিত ছিল - নেহরুর শাসনকে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, কারণ ঐ সময় সমগ্র দেশের পরিস্থিতি তার উপযোগী ছিল না।

মুক্তিসংগ্রাম গোটা দেশ জুড়েই হবে, দেশের মাত্র কোনো কোনো অঞ্চলে তা শুরু করা যায় না। দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত এক একটি বিরাট অঞ্চল জুড়ে মুক্তি আন্দোলন শুরু করতে হবে যাতে শাসকশ্রেণি তাকে দমন না করতে পারে এবং যাতে সফল না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন উত্তরোত্তর শক্তিশালী হতে পারে।

তৃতীয়ত, পার্টিজান যুদ্ধকে কোনো সময়েই ব্যক্তি সন্ত্রাসের সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবে না, যেমন নকশালবাদীরা করে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এই কথাই বলে যে, ব্যক্তিসন্ত্রাস জনগণের পার্টিজান যুদ্ধ শুরু করার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সেই কারণেই এটা বিপ্লবের পক্ষে ক্ষতিকর এবং তাকে সর্বদাই পরিত্যাগ করা উচিত।

বিজয়ের পথ

আমাদের পার্টি মনে করে যে, একমাত্র শ্রমিকশ্রেণি  ও তার বিপ্লবকে বিজয়ী করতে। 

শুধুমাত্র নিজের দাবি আদায়ের সংগ্রাম করে নয়, সমস্ত শোষিত শ্রেণি , বিশেষ করে, কৃষকদের দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে এবং সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা হিসাবে কাজ করেই শ্রমিকশ্রেণি তার নেতৃত্ব অর্জন করতে পারে।

শ্রমিকশ্রেণি  এই কর্তব্য পালন করতে পারবে একমাত্র যখন প্রধান প্রধান শিল্পের শ্রমিকেরা ঐক্যবদ্ধ ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে সংগঠিত হতে পারবে এবং সমস্ত জনগণের প্রতি তার কর্তব্য সম্বন্ধে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হবে।

কৃষি মজুর ও গরিব কৃষকদের উপর নির্ভর করে, মাঝারি কৃষকদের সাথে ঘনিষ্ঠ মোর্চা গড়ে, ধনী কৃষকদের নিজের দিকে জয় করে, ঐক্যবদ্ধ গণ-ফ্রন্টের ও গণ-আন্দোলনের ভিত্তি হিসাবে শ্রমিক শ্রেণিকে অবশ্যই শ্রমিক-কৃষক মোর্চা গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিক শ্রেণিকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে এবং বলিষ্ঠভাবে কৃষকদের দাবির নেতৃত্ব নিতে হবে এবং নিজে সংগ্রাম করে কৃষকদের সংগ্রামকে সাহায্য করতে হবে ।

দুর্ভাগ্যবশত যে সমস্ত স্থানে ট্রেড ইউনিয়ন শক্তিশালী, এমনকি তার আশেপাশেও, কার্যত কোনো কৃষক আন্দোলন নেই এবং যে সমস্ত স্থানে কৃষক আন্দোলন আছে তারাও শ্রমিকশ্রেণি ও তার আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন।

অধিকন্তু অন্যান্য শ্রেণি , মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে ছাত্র ও যুবকদের সাথে শ্রমিকশ্রেণি এবং তার সংগঠিত অগ্রগামী বাহিনীকে কাজ করতে হবে এবং মুক্তির জন্য, জমি ও খাদ্যের জন্য, কাজ ও শান্তির জন্য গ্রাম ও শহরের সমস্ত মানুষের সংগ্রামকে নেতৃত্ব দিতে হবে ।

সর্বশেষে, এই সমস্ত কিছুই অর্জন করা সম্ভব হবে একমাত্র শ্রমিকশ্রেণির অগ্রগামী বাহিনী হিসাবে একটি শ্রেণি-সচেতন, সুসংগঠিত এবং কেন্দ্রীভূত শ্রমিকশ্রেণির পার্টি গঠনের দ্বারা। জনগণের মধ্যে এই পাটির থাকবে সুগভীর ও সুদৃঢ় ভিত্তি, লৌহকঠিন শৃঙ্খলা। এই পার্টি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বে সমৃদ্ধ হবে এবং আত্মসমালোচনা ও আন্তঃপার্টি গণতন্ত্রের ভিত্তিতে নিজের ভুল সংশোধন করবে। এই পার্টির থাকবে এমনই সুশিক্ষিত কর্মীবাহিনী যারা বিপ্লবী শক্তিকে ধ্বংস করার শাসক শ্রেণির অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করবে, জনগণের স্বার্থের কাছে নিজের স্বার্থকে বিসর্জন দেবে এবং জনগণের স্বার্থের জন্য নিজের জীবন বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত থাকবে ।


[1. পার্লামেন্টারি ক্রেটিনিজম- এর অর্থ কী?
পালামেন্টারি ক্রেটিনিজম  কথাটি মার্কস ও এঙ্গেলসের লেখায় প্রায় পাওয়া যায়। জার্মানিতে বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব নামক রচনায় এঙ্গেলস লিখেছিলেন : ‘পালামেন্টারি ক্রেটিনিজম’ হল চিকিৎসাতীত এক রোগ, এক ব্যাধি, যার দুর্ভাগা শিকারেরা এই সোল্লাস বিশ্বাসে আচ্ছন্ন যেন গোটা বিশ্ব, তার ইতিহাস, তার ভবিষ্যৎ গতি নির্ধারিত হচ্ছে ঠিক সেই প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাধিক্য ভোটে, যে-প্রতিষ্ঠানটি তাদের সভ্য হিসাবে পেয়ে সম্মানিত হবার সুযোগ পেয়েছে। 
লেনিন  পালামেন্টারি ক্রেটিনিজম  অর্থে  বুঝিয়েছেন, পার্লামেন্টারি সংগ্রামই হচ্ছে রাজনৈতিক সংগ্রামের একমাত্র যা সর্বাবস্থায়ই প্রধান রূপ, এই রকম ধারণা।
-সম্পাদক, দেশহিতৈষী ]

দেশহিতৈষী সাপ্তাহিক ১ লা মার্চ ১৯৭৪ সংখ্যায় প্রকাশিত


প্রকাশের তারিখ: ০২-নভেম্বর-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org