আমাদের কাকাবাবু

ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ
কিন্তু কমিউনিস্ট পরিবারের অতীব শ্রদ্ধেয় কর্তা হিসেবে তাঁর গুণাবলীর প্রশংসা করার জন্য তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কোনও প্রয়োজন হয় না। কেন্দ্রীয় কমিটির অফিস কলকাতায় স্থানান্তরিত হবার পর যাঁদের সঙ্গে আমি কাজ করতাম তাঁদের অধিকাংশ কাকাবাবুকে অনেক কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং তাঁদের উপর বর্ধিত পিতৃসুলভ স্নেহ ও সেবা উপভোগ করেছিলেন। বয়ঃকনিষ্ঠ কমরেডদের প্রতি তাঁর স্নেহবর্ষণ উপভোগ করার অভিজ্ঞতা আমারও বারকতক হয়েছিল। তাঁদের অবশ্যই আরও বেশি সুযোগ হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই কলকাতায় অন্যান্য কমরেডদের মতো আমিও তাঁকে ‘আমাদের কাকাবাবু’ বলেই মনে করতাম।

‘ভারতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আবদুল গফফর খান’ ১৯৩৪ সালে আমার সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে কাকাবাবু সম্পর্কে এই বর্ণনাই দিয়েছিলেন আমার এক কংগ্রেস সোস্যালিস্ট সহকর্মী। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে, আমার ওই কংগ্রেস সোস্যালিস্ট সহকর্মীটি ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা নেতাকে ভারতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অসাধারণ নেতা বলে মনে করতেন।

এইভাবেই আমি প্রথম কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদের কথা শুনি, যাঁকে পরবর্তীকালে অন্যান্য কমরেডদের মতো, আমিও আদরের ‘কাকাবাবু’ বলে ডাকতে শুরু করি। তাঁর চেয়ে বয়সে ছোটো বেশ কয়েক প্রজন্মের কমিউনিস্টদের তিনি নিজের পরিবারের বয়ঃকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবেই দেখতেন। আমারও সৌভাগ্য হয়েছিল সেই বিরাট পরিবারের একজন কনিষ্ঠ সদস্য হবার। সঠিকভাবেই যার শ্রদ্ধেয় কর্তা মনে করা হত কাকাবাবুকেই। 

অবশ্য, ‘ভারতের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আবদুল গফফর খান’-এর কথা শুনবার পর তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হতে প্রায় এক দশক পার হয়ে গিয়েছিল। সেটা হয়েছিল ১৯৪৩ সালে, পাঞ্জাবের ভাকনাতে সারা ভারত কিসান সভার বার্ষিক অধিবেশনে। সেই থেকে শুরু করে ২৫ বছর যাবৎ তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রীয় কিসান কাউন্সিলের সভায় এবং সারা ভারত কিসান সভার বার্ষিক অধিবেশনগুলিতে দেখা হয়েছে।

সারা ভারত কিসান সভার ভাকনা অধিবেশনের কয়েক সপ্তাহ পরেই বোম্বাইতে [মুম্বাই] অনুষ্ঠিত হয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেস। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে এবং তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পার্টি কংগ্রেসেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। অবশ্য, তিনি যেহেতু বাংলার বাইরে খুব কমই যেতেন আর, আমিও বাংলাতে খুব কমই আসতাম, তাই এই স্মারক সংকলনে যাঁরা লিখবেন তাঁদের অনেকের মতো তাঁর ঘনিষ্ঠ হবার বিশেষ সুযোগ আমার হয়নি। তাঁর মৃত্যুর আগের বছর দশেক, যখন কলকাতায় সিপিআই(এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটির অফিস ছিল তখন এবং তারপর তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত প্রায়ই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হত। তখনও অবশ্য আমি পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় কেরালাতেই বেশি সময় কাটাতাম। তাই তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগটা ছিল খুবই সীমিত।

কিন্তু কমিউনিস্ট পরিবারের অতীব শ্রদ্ধেয় কর্তা হিসেবে তাঁর গুণাবলীর প্রশংসা করার জন্য তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কোনও প্রয়োজন হয় না। কেন্দ্রীয় কমিটির অফিস কলকাতায় স্থানান্তরিত হবার পর যাঁদের সঙ্গে আমি কাজ করতাম তাঁদের অধিকাংশ কাকাবাবুকে অনেক কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং তাঁদের উপর বর্ধিত পিতৃসুলভ স্নেহ ও সেবা উপভোগ করেছিলেন। বয়ঃকনিষ্ঠ কমরেডদের প্রতি তাঁর স্নেহবর্ষণ উপভোগ করার অভিজ্ঞতা আমারও বারকতক হয়েছিল। তাঁদের অবশ্যই আরও বেশি সুযোগ হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই কলকাতায় অন্যান্য কমরেডদের মতো আমিও তাঁকে ‘আমাদের কাকাবাবু’ বলেই মনে করতাম।

সকল কমরেডদের প্রতি এবং বিশেষ করে বয়ঃকনিষ্ঠ কমরেডদের প্রতি তাঁর এই স্নেহ মমতা কিন্তু বয়স্ক বা তরুণ যে কোনও কমরেডের রাজনৈতিক বিচ্যুতি বা সাংগঠনিক ব্যর্থতার প্রশ্নে আপসবিহীন অবস্থান গ্রহণ থেকে তাঁকে কখনই বিরত রাখতে পারেনি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হবার কারণে এবং কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তত্ত্বাবধানে কাজ করার সময় বিপুল অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের ফলে, মতাদর্শগত বা রাজনৈতিক বিচ্যুতির প্রশ্ন অথবা কমিউনিস্ট শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রশ্ন উঠলেই তিনি হয়ে উঠতেন অত্যন্ত কঠোর। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন ভারতের মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের অতুলনীয় বিবেকরক্ষক।

একটা বিশেষ ঘটনার কথা আমার মনে আসছে। বোম্বাইতে [মুম্বাই] পার্টির প্রথম কংগ্রেস চলাকালে আমরা সংবাদ পাই যে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহক কমিটি আন্তর্জাতিকটিকে বিলুপ্ত করার প্রস্তাব নিয়েছে। আমাদের কাছে সেই সংবাদ ছিল নিদারুণ আঘাতের শামিল। আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের আশঙ্কা হচ্ছিল যে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং আমাদের পার্টির পক্ষে এর প্রতিক্রিয়া হবে খুবই খারাপ। তিক্ততম মন্তব্যটা এসেছিল কাকাবাবুর কাছ থেকেই। তিনি সুনিশ্চিত ছিলেন যে এর ফলে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্য ও শৃঙ্খলা গুরুতরভাবে ব্যাহত হবে।

তারপর ৪৬ বছর চলে গেছে। দেখা যাচ্ছে আমাদের, এমন কি কাকাবাবুরও আশঙ্কা কত ভুল ছিল। তখন থেকে এ যাবৎ আন্তর্জাতিক আন্দোলনে অনেক কিছুই ঘটেছে। এখন আবার নতুন ভিতের ওপর আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্য গড়ে উঠছে। এখন আর কোনও একটি বিশ্ব পার্টি কেন্দ্র থাকছে না। সমস্ত কমিউনিস্ট পার্টিগুলির সমান মর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক এবং সমষ্টিগত সম্পর্ক গড়ে উঠছে এবং তার মাধ্যমে মানবজাতির সামনে এখনকার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে, খোদ মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে, গড়ে উঠছে ঐক্যবদ্ধ আন্তর্জাতিক আন্দোলন।

কিন্তু এই কারণে, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক বিলোপের সংবাদে সে-সময় আমরা যে-আশঙ্কা অনুভব করেছিলাম তার কি আমরা নিন্দা করতে পারি? এটা কি সত্যি নয় যে, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অস্তিত্বকালে শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক ঐক্য এবং বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতি যে আনুগত্যবোধ আমাদের মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল সেটা আমরা ভারতীয় কমিউনিস্টরা এবং প্রবাসে আমাদের কমরেডরা যে মূল্যবান ঐতিহ্যগুলি গড়ে তুলেছি তারই অঙ্গ? যে-পার্টি আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতি এই আনুগত্যবোধ গড়ে তুলেছে ‘আমাদের কাকাবাবু’ নিঃসন্দেহে ছিলেন তারই বিবেক-রক্ষক। আজ তাঁর জন্ম-শতবার্ষিকী পালনের কালে আমরা আন্তর্জাতিক সর্বহারার সংহতিবোধকে তুলে ধরার এবং আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার গ্রহণ করছি।


প্রকাশের তারিখ: ০৩-আগস্ট-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org