আমাদের প্রত্যাঘাত গড়ে তুলবে এক নতুন চেতনা

পার্থ মুখার্জি
আমাদের প্রজ্ঞা অনুশীলনে কোনও ফারাক রাখা চলবে না। নৈতিকতা ও অনৈতিকতার মাঝখানে দেওয়াল তুলে মানুষকে প্রত্যক্ষ করাতে হবে বিকল্পের ধারণা।... সে লড়াই লড়তে হবে আমাদের প্রত্যেককে। আক্রমণ যতই ভয়াবহ হোক, যতই তীব্র হোক— আমাদের প্রত্যাঘাত গড়ে তুলবে এক নতুন চেতনা।

১৯৭৭ সালের একুশে জুনের পর আমরা পেরিয়ে এসেছি ৪৯-বছর। এরই মাঝে ৩৪-বছর সিপিআই(এমে)-এর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার তাদের একগুচ্ছ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক-সামাজিক অর্থনৈতিক গতিতে অবশ্যই একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ রেখেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ক্ষেত্রে দেশে দেশে উপনিবেশ-বিরোধী মনোভাব তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দানা বাঁধতে আরম্ভ করে শ্রমিক আন্দোলন। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পরবর্তী ক্ষেত্রে কংগ্রেস সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্ট খাদ্য আন্দোলন, ১৯৬৬-র খাদ্য ও কেরোসিনের দাবিতে গড়ে উঠেছিল গণ‌আন্দোলন। ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। এই ইতিহাস চর্চার গভীরে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট ৩৪-বছরের বামফ্রন্ট সরকারের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা সম্ভব হবে না।

আলোচনার সুবিধার্থে ৩৪-বছরকে যদি তিন ভাগে ভাগ করি— ১) সময়, ২) ভৌগোলিক স্থান এবং ৩) সামাজিক সুযোগ। সময়— যাকে ইংরেজিতে বলা যায়, ‘টাইম ফ্রেম’, যে সময়ে বামফ্রন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তারপরের জরুরি অবস্থা, নৈরাজ্য, শিক্ষায় ‘কমল বনে’ মত্ত হাতির দাপাদাপি— সবমিলিয়ে ছিল এক দুঃসময়। সেই অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলোর মতো জনগণের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ‘সেই সময়ের’ প্রতি সুবিচার করেন বামপন্থীরা। আর জনগণই সেই ইতিহাসের জনক।  দ্বিতীয়ত: ভৌগোলিক অবস্থান— যাকে বলে ‘Space Dimension’, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি কেউ ৩৪-বছর পূর্বের নৈরাজ্যকে অস্বীকার করেন, শুধু ওই প্রায় সাড়ে তিনদশকের মূল্যায়ন করতে যান, তাহলে তা ভুল ঐতিহাসিক মূল্যায়নে পর্যবসিত হবে। তৃতীয়ত, সামাজিক সুযোগ— যাকে বলে ‘Social Opportunity’, ৩৪-বছরে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীরা রচনা করে গিয়েছেন একটি গৌরব জনক ইতিহাস। বিশেষ করে গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্য লাভ করা।

ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে ভারতের সর্বমোট চাষযোগ্য জমির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ছিল ৩.৫ শতাংশের মতো জমি। অথচ, সারা দেশের ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে যে পরিমাণ জমি বন্টন করা হয়েছিল, তার ২১ শতাংশই আমাদের রাজ্যে। ১৯৯৩-এর ২৮ এপ্রিল দেশের সংসদে যখন পঞ্চায়েত-কে আদর্শ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, তখন যোজনা কমিশনের তরফেও পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত-কে সফলতম বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। শিশু মৃত্যুর হার, বনসৃজন ও ক্ষুদ্র শিল্প সমবায় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে বর্ধিত হয় শ্রেণিচেতনা। 

ভূমি সংস্কার এই কর্মসূচি রাজ্যে কৃষি অর্থনীতিকে যেমন সবল করেছিল, পাশাপাশি এই জমির নীতির সাফল্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল শিল্প। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস্, বক্রেশ্বর বিদ্যুৎ প্রকল্প, সেক্টর ফাইভ পাশাপাশি ছোট-বড় শিল্প গড়ে তোলায় বামফ্রন্টের নীতি জনগণের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মনে রাখতে হবে ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল— যে সময় ভেঙে পড়েছে বার্লিনের প্রাচীর, বিলুপ্ত হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন, মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। ফলে পুঁজিবাদ ভয়ংকর এক নেকড়ে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে। স্বাধীনতার পরবর্তীতে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত যে অর্থনীতি (মিশ্র অর্থনীতি), আমাদের দেশে গৃহীত হয়েছিল— তাও ছিল পুঁজিবাদেরই পথ, কিন্তু তার মধ্যে সরকারি পদক্ষেপের ইতিবাচক দিকগুলি ১৯৯১ পরবর্তী ক্ষেত্রে ‘বাজারি অর্থনীতির’ জোয়ারে ভেসে যায়। এই প্রবল দক্ষিণপন্থী মোড়ের মাঝখানে স্বাধীনোত্তর ভারতে বাংলার প্রতি যে সীমাহীন বঞ্চনা, যা মাশুল সমীকরণ নীতি ও শিল্প লাইসেন্স নীতির মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হয়ে ছিল। তারই সুযোগে বাংলায় শিল্পায়নের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। শুরু হয় চক্রান্ত। নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে ধ্বংসাত্মক আন্দোলন। যার পেছনে শুধু জাতীয় স্তরে চক্রান্ত ছিল তাই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও তা ছড়িয়েছিল তার জাল বিস্তার। কমিউনিস্ট উৎখাত করার চক্রান্ত নতুন কিছু নয়। ১৯৭০ সালে ময়নিহানের ‘A Dangerous Place’  গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন কমিউনিস্ট সরকারকে পরাস্ত করতে কেরালা এবং বাংলায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে অর্থনৈতিক লেনদেন করা হয়েছিল। পিটার ব্লিচের ডায়েরিতে অস্ত্র বর্ষণের ঘটনাতে ডেনমার্ক, ব্রিটেন, তাইওয়ানের একটি চক্র সাম্রাজ্যবাদের হয়ে কাজ করেছিল। 

ফলতঃ কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে শুধু ৩৪-সাল কেন, আজও সেই চক্রান্ত অবিরত চলেছে। পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাতের প্রশ্নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে চক্রান্ত হয়েছে। আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পাশাপাশি বিগত ৩৪-বছরে শিল্পায়নের প্রশ্ন, তার জমিনীতি-সহ সিপিআই(এম) তার নিজস্ব সমালোচনামূলক আত্মমূল্যায়নও করেছে। মনে রাখতে হবে বিগত ১৫ বছরে তৃণমূল জমানার নৈরাজ্য, খুন, পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে অকুতোভয় বামপন্থীরা নজরকাড়া লড়াই চালিয়েছেন। বর্তমানে উগ্র হিন্দুত্বের প্রচারে এবং তৃণমূলের প্রতি অসম্ভব ঘৃণাকে ব্যবহার করে যে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো তার বিরুদ্ধে লড়াই। লড়াই অনেকখানি বৌদ্ধিক-স্তরে ও আর এখানেই মার্কসবাদীদের প্রধান কাজ। সেই কর্তব্য পালনে শেক্সপিয়ারের ভাষায়, ‘To be or not to be— that is the question’।

এই নয়া ফ্যাসিবাদী সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গেই আক্রান্ত হয়েছে মানুষের রুটি রুজি। চলছে বুলডোজার। প্রহেলিকাময় এই ধ্বংসে অনেকে উৎসাহিত হচ্ছেন। বলা যেতে পারে এই ধ্বংসের প্রক্রিয়াকে ‘Creative Destruction’। অজগর হরিণকে যেমন গ্রাস করে ধীরে ধীরে সংগোপনে নিঃশব্দে, হিপনোটাইজ করে রাখে। এই ভাবেই জনগণকে মোহিত করে রাখে, তাই বর্তমান সময়ে বৌদ্ধিক-স্তরে আমাদের চিকনত্ব অর্জন করতে হবে। এদের এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে পালটা শ্রেণি আধিপত্য গড়ে তুলতে হবে। আজকের দিনে এটাই নতুন বাস্তবতা।

বর্তমানে বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ও রাজ্যে আছে। শুধু অর্থনৈতিকভাবে মানুষকে আক্রমণ করছে তা নয়, বিপন্ন করেছে সয়ম্ভরতাকে। চূড়ান্ত বিপদের মুখে সার্বভৌমত্ব। এর সঙ্গে আক্রান্ত হচ্ছে বামপন্থা,  এবং অবশ্যই তা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের মোড়কে। 

আমরা বাংলার মানুষ। এই বাংলাতেই হয়েছে নবজাগরণ, রামমোহন বিদ্যাসাগর ডিরোজিও প্রভৃতি মনীষীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। এই বাংলায় জন্মেছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত। মৌলবাদীদের আক্রমণ থেকে রবীন্দ্রনাথ নজরুলও ছাড় পাচ্ছেন না। এর বিরুদ্ধে বৌদ্ধিক-স্তরে যুদ্ধ করার জন্য শুধু সদিচ্ছা থাকলেই হবে না, নিজেদেরও আদর্শগত দিক থেকে আরও বলিয়ান হতে হবে। মনে রাখতে হবে, সংগঠন সংগ্রামের হাতিয়ার। এই সংগঠনের জোরেই একদিন বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই বাম সরকার আজ না থাকলেও, এখানকার ইতিবাচক সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদে যে শিকড় তৈরি হয়েছিল, তাকে আরও উন্নততর স্তরে নিয়ে যেতে হবে। 

আমাদের প্রজ্ঞা অনুশীলনে কোনও ফারাক রাখা চলবে না। নৈতিকতা ও অনৈতিকতার মাঝখানে দেওয়াল তুলে মানুষকে প্রত্যক্ষ করাতে হবে বিকল্পের ধারণা। একদিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যা অর্জন করেছি তাই আমাদের জীবন ধারণে সম্ভব। কঠিন কাজ, সাংস্কৃতিক লড়াই সেটা। সে লড়াই লড়তে হবে আমাদের প্রত্যেককে। আক্রমণ যতই ভয়াবহ হোক, যতই তীব্র হোক— আমাদের প্রত্যাঘাত গড়ে তুলবে এক নতুন চেতনা। তাই উপযোগী সংগঠন উপযোগী চেতনা ও গভীর দায়িত্ববোধ পালন করতে হবে।


প্রকাশের তারিখ: ২১-জুন-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org