|
প্যালেস্তাইন: গণহত্যার অর্থনীতিসমন্বয় রাহা |
এখানেই থামেননি আদানি। মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়! সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছেন ইজরায়েলের হাইফা বন্দরে। ২০২২ সাল থেকে Adani Ports and Special Economic Zone (APSEZ) ভূমধ্যসাগরের প্রান্তে মধ্য-পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত এবং আন্তর্জাতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাইফা বন্দরের ৭০% মালিকানা কিনে নেয়। ইজরায়েলের অর্থনীতিতে আনুমানিক ৫৬% আমদানি-রপ্তানি হয় এই বন্দরের মাধ্যমে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে গণহত্যার বাজারে এই বন্দরের ভূমিকা কতখানি। এবং এর থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যাবে আদানির মুনাফার পরিমাণ। |
ঠিক যেসময়ে এই লেখা পড়ছেন, আপনি নিশ্চিত থাকুন সেই সময়ে প্যালেস্তাইনে রক্ত ঝরছে। ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্সের (IDF) দ্বারা একবিংশ শতাব্দীর দুনিয়া এক বিকৃত সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের সাক্ষী থাকছে, প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে। যে আগ্রাসনের ব্লু-প্রিন্ট সেই ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসে ৬৭ শব্দের চিঠিতে তৈরি হয়েছিল। যা ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত। এই আগ্রাসনকে গোটা পৃথিবীর কাছে দেখানো হয়েছে কখনও ইহুদি-মুসলিম সমস্যা হিসেবে বা কখনও জঙ্গি দমন অভিযান হিসেবে কিংবা কখনও এর নাম হয়েছে প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল ‘যুদ্ধ’। সচরাচর যেটা দেখানো হয়নি তা হল, নির্লজ্জ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। সুচতুরভাবে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে আসলে পুরো ভূখণ্ডটিই প্যালেস্তাইন আর প্যালেস্তাইন আরবদের। মহাত্মা গান্ধি ১৯৩৬ সালে হরিজন পত্রিকায় ‘The Jews in Palestine’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন—“ফ্রান্স যেমন ফরাসিদের। ইংল্যান্ড যেমন ব্রিটিশদের। প্যালেস্তাইন তেমনই আরবদের।” অথচ ধীরে ধীরে সুপরিকল্পিতভাবে এবং সংগঠিতভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকেই ইহুদিদের মন জয় করতে, তাদের জায়নবাদী রাজনীতির সুযোগ নিতে প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে ইহুদিদের। ১৯১৭ সালে এই ভূখণ্ডে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশ ছিল ইহুদি। ১৯৪৭ সালে যে সময়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জে প্যালেস্তাইন ভাগের প্রস্তাব নেওয়া হচ্ছে ততদিনে, মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে ইহুদিদের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে প্রথমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং পরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাহায্যেই এই অনুপ্রবেশ ঘটানোর কাজ চলেছে। এর ফলশ্রুতিতেই বর্তমানে গোটা পৃথিবীর একমাত্র ‘সেট্লার কলোনি’—প্যালেস্তাইন। ইজরায়েল গোটা বিশ্বের হাতে গোনা রাষ্ট্রগুলির একটি, যাদের সংগ্রহে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে এবং এই অত্যাধুনিক বোমারু বিমান সংগ্রহে রাখা ইজরায়েলের সামরিক কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই যুদ্ধবিমান তৈরির পেছনে অন্তত ১৬০০ সংস্থা রয়েছে বিশ্বের ৮টি রাষ্ট্র জুড়ে। যার মূল সংস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন। ইজরায়েলের সামরিক খাতে অন্যতম বিনিয়োগকারী হল ইটালির লিওনার্দো এস পি এ। যারা মূলত যুদ্ধে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার, মিলিটারি প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বোমারু বিমান, আকাশপথে হামলা আটকানোর সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি এবং সাইবার সুরক্ষার কাজ করে। এদের আরেকটি কাজ দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা আরও বেশ কয়েকটি সংস্থার সাথে যৌথ উদ্যোগে সামরিক বাজারে বিনিয়োগ করা। একই সাথে জাপানের সংস্থা ফানুক সমরাস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে রোবোটিক পদ্ধতির ব্যবহার করে থাকে, তারাও এই আগ্রাসনে ইজরায়েলি বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়েছে। মূলত গাজা, ওয়েস্ট ব্যাংক ভূখণ্ডে প্যালেস্তিনীয়দের উপর অবৈধ নজরদারি চালানোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা এবং সাইবার প্রযুক্তির ব্যবহার করে থাকে ইজরায়েল। এই নাগরিক স্বাধীনতা-বিরোধী কর্মযজ্ঞে ইজরায়েলের মূল অংশীদার হচ্ছে মাইক্রোসফ্ট, গুগ্লের মূল সংস্থা অ্যালফাবেট, আমাজন। এরা নিজেদের গোটা ক্লাউড সিস্টেম এবং প্রযুক্তি ইজরায়েল সরকারকে দিয়েছে শুধুমাত্র প্যালেস্তিনীয়দের উপর নজরদারি করবার জন্য। এই প্রত্যেকটা সংস্থার প্রধান কার্যালয়ই মার্কিন মুলুকে। যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থা আইবিএম; ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্স এবং ইজিরায়েলি গোয়েন্দা গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ বাহিনীর প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবস্থা করেছে। গাজা এবং ওয়েস্ট ব্যাংক অঞ্চলে বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্ত সাধারণ মানুষের আসা-যাওয়া এর মাধ্যমে নজরে থাকবে। মার্কিন মুলুকে অবস্থানকারী পালান্টির টেকনোলজি ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইজরায়েলি আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে ইজরায়েলকে সমর্থনের হাত বাড়িয়েছে। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে ইজরায়েলের কাছে। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিনির্ভর হোয়ার ইজ ড্যাডি, ল্যাভেন্ডার, গসপেল ব্যবস্থাও তুলে দিয়েছে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে। ল্যাভেন্ডারের কাজ হল প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডে যারা লড়ে যাচ্ছে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে, তাদের চিহ্নিত করা। হোয়ার ইজ ড্যাডি প্রযুক্তি সেইসব চিহ্নিত যোদ্ধাদের ঘরবাড়ি চিহ্নিত করে তাদের বাসস্থান বা বাংকারে আঘাত হানতে সক্ষম, একটি প্রযুক্তি। ২০২৪-এর ৮ এপ্রিলের টাইমস অফ ইন্ডিয়া জানাচ্ছে আগ্রাসনের শুরু থেকে, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ব্যবস্থার উপর অতিমাত্রায় নির্ভর ছিল ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী। এখনও এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইজরায়েলি প্রশাসন চালিয়ে যাচ্ছে। Make America Great Again—স্লোগান দেওয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বপ্ন গাজা স্ট্রিপ, ওয়েস্ট ব্যাংক অঞ্চল জুড়ে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা। হাজার হাজার মানুষের লাশের উপর তৈরি হবে এই শিল্প। তার জন্য দরকার অসামরিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ। সেই কাজও এগোচ্ছে সমানতালে। ক্যাটারপিলার, লিওনার্দোর মালিকানাধীন রাদা ইলেকট্রিক ইন্ডাস্ট্রিজ, দক্ষিণ কোরিয়ার এইচ ডি হুন্ডাই, সুইডেনের ভলভো গ্রুপ-এর তৈরি অত্যাধুনিক বুলডোজার প্যালেস্তাইন ভূখন্ডে দখল করা এলাকায় ঘরবাড়ি ধ্বংস করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সাথে নতুন স্থাপত্য নির্মাণের কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে তাদের প্রযুক্তি। এখন পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রে অন্যতম পরিচিত নাম হল এআরবিএনবি। যারা থাকার জন্য ঘরবাড়ি, হোটেল ভাড়া দেয়। দখল করা এলাকায় গড়ে উঠবে এআরবিএনবি-র সম্পত্তি। নতুন পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার জন্য দরকার বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র। তার ব্যবস্থাও আছে। বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে এসেছে আমেরিকার ড্রামন্ড, সুইজারল্যান্ডের গ্লেনকোরকে কোম্পানি। বিদ্যুতের জন্য যে পরিমাণ কয়লার প্রয়োজন তা জোগান দেবে এরা, সেই কয়লা আসবে কলোম্বিয়া থেকে। ইজরায়েলের সবচেয়ে বড়ো খাদ্যসংস্থা তনুভা-র প্রধান অংশীদার হল চীনের ব্রাইট ডেয়ারি এন্ড ফুড। যারা ইজরায়েলের দখল করা প্যালেস্তাইন ভূখণ্ডের জমি থেকে লাভের গুড় নিজের ঘরে তুলছে। কৃষিক্ষেত্রে সেচের কাজের জন্য প্রযুক্তির সরবারাহ করছে নেটাফিম। যার ৮০ শতাংশ শেয়ারের মালিক মেক্সিকোর অরবিয়া অ্যাডভান্স কর্পোরেশন। এখানেই শেষ নয়। বিপুল ব্যয়বহুল এই আগ্রাসন চালানোর জন্য ইজরায়েলের প্রয়োজন প্রচুর অর্থ। ঋণখেলাপি হওয়া সত্বেও তার জোগান আসছে ফ্রান্সের বিএনপি পরিবাস, ইংল্যান্ডের বার্কলের কাছ থেকে। সদ্য প্রকাশিত সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের রিপোর্ট দেখাচ্ছে মার্কিন মুলুকের মূলত দুটি বহুজাতিক ক্ষেত্রে লগ্নিকারি সংস্থার পুঁজি আলোচিত সংস্থাগুলোতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। সেই দুটি হল—বিশ্বের বৃহত্তম লগ্নিকারি ব্ল্যাকরক এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম লগ্নিকারি সংস্থা ভ্যানগার্ড। এই আগ্রাসন ঐতিহাসিকভাবে কর্পোরেট পুঁজি দ্বারা চালিত। যা একটি চরম বিদ্বেষমূলক গণহত্যার অর্থনীতির উদাহরণ তৈরি করেছে। যা বিনিয়োগকারীদের কাছে লাভজনক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৩-এর অক্টোবর থেকে গত বছর অব্দি ইজরায়েলের এই আগ্রাসনের জন্য সামরিক খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ শতাংশ অর্থাৎ ৪৬.৫ বিলিয়ন ডলার। যা গোটা বিশ্বের দেশগুলির মাথাপিছু সামরিক ব্যয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমা সংস্থা যেমন আলিয়াঞ্জ, এএক্সএ-এর মতো সংস্থা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। তেল আভিবের স্টক এক্সচেঞ্জ ১৭৯% বেড়ে, এই সময়কালে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে। যা বাজারে যুক্ত করেছে ১৫৭.৯ বিলিয়ন ডলার। তাইম, বিশ্বের ধনীদের লাভের বাজারে মোদীর বন্ধু আদানি, আম্বানি বাদ থাকে কেন? আদানির সাথে ইজরায়েলের সম্পর্কের প্রথম নজির আমরা পাই ২০১৮ সালে। আদানির কোম্পানি Adani Defence & Aerospace এবং ইজরায়েলের অন্যতম বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের কোম্পানি Elbit System Ltd. একসাথে গাঁটছড়া বাঁধে। বর্তমানে যার নাম Adani Elbit Advanced Systems India Ltd. (AEASIL), যার কারখানা হায়দ্রাবাদের Adani Aerospace Park-এ গড়ে উঠেছে। প্রাথমিকভাবে কয়েকশো কোটি টাকার লগ্নির বিনিময়ে এই কারখানা গড়ে ওঠে। এখান থেকে মূলত ইজরায়েলি প্রযুক্তির ব্যবহারে হার্মেস-৯০০ ও হার্মেস-৪৫০ ড্রোন তৈরি হয়। সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এই ড্রোন নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে হামলা করতেও সক্ষম। যা ব্যবহার হচ্ছে প্যালেস্তাইন আগ্রাসন প্রকল্পে। এখানেই থামেননি আদানি। মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়! সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছেন ইজরায়েলের হাইফা বন্দরে। ২০২২ সাল থেকে Adani Ports and Special Economic Zone (APSEZ) ভূমধ্যসাগরের প্রান্তে মধ্য-পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত এবং আন্তর্জাতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাইফা বন্দরের ৭০% মালিকানা কিনে নেয়। ইজরায়েলের অর্থনীতিতে আনুমানিক ৫৬% আমদানি-রপ্তানি হয় এই বন্দরের মাধ্যমে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে গণহত্যার বাজারে এই বন্দরের ভূমিকা কতখানি। এবং এর থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যাবে আদানির মুনাফার পরিমাণ। মোদীর আরেক বন্ধু মুকেশ আম্বানি; তাঁর জিও নেটওয়ার্ক শুরুই হয়েছে ইজরায়েলি প্রযুক্তির উপর নির্ভর করে। যে ইজরায়েল নজরদারি প্রযুক্তিতে গোটা বিশ্বে কুখ্যাত। পেগাসাসের মতন নজরদারি চালানোর প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা আমাদের নিশ্চিত মনে আছে। সেই দেশেরই সাইবার প্রযুক্তির উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল আম্বানির রিলায়েন্স। কয়েকদিন আগেই আম্বানি নিজের ব্যবসার স্বার্থে ছুটে গেছিলেন ট্রাম্পের কাছে, কাতারে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে গোটা বিশ্বের বহুজাতিক সংস্থার মালিকদের সাথে ইজরায়েলের সম্পর্ক। তাদের অর্থনীতির সম্পর্ক এবং আগ্রাসনের সম্পর্ক। এভাবেই বিশ্বের বহুজাতিক সংস্থাগুলির সহায়তায় ইজরায়েল গড়ে তুলেছে তার গুপ্ত অস্ত্র ভাণ্ডার। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে Israel’s Secret Weapon নামে একটি তথ্যচিত্র সম্প্রচার করে বিবিসি। সেখান থেকেই উঠে আসে বিভিন্ন চমকপ্রদ তথ্য। সামনে আসে মোরদেখাই ভানুনু-র নিজের জীবন অভিজ্ঞতার কথা। যিনি ছিলেন একজন ইজরায়েলি। ছেলেবেলায় মা-বাবার হাত ধরে মরোক্কো থেকে চলে আসেন ইজরায়েলে। সেখানেই লেখাপড়া। তারপর নিয়ম মত সেনাবাহিনীতে কাজ। সব শেষে তিনি নিযুক্ত হন দিমোনা নামক এক জায়গায়। যাকে ইজরায়েলি প্রশাসন গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরে টেক্সটাইল কারখানা হিসেবে। দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে ভানুনু বুঝতে পারেন এই কারখানা আসলে পারমাণবিক বোমার জন্য প্লুটেনিয়াম তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি নীতির কারণে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ঠিক করেন প্রমাণ সহ কাজ ছাড়বেন এবং দেশত্যাগ করবেন। গোপনে কিছু ছবি এবং তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপরে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে বসবাস করতে থাকেন। সানডে টাইমস-এর সাংবাদিক পিটার হুনাম জানতে পারেন তাঁর কথা। গোপনে ভানুনু-কে লন্ডনে সানডে টাইমস-এর অফিসে আনা হয়। সেখানে তিনি হানি ট্র্যাপে পরে ইজরায়েলি সেনার হাতে বন্দি হন এবং পরবর্তীকালে ইজরায়েলে নিয়ে গিয়ে ‘বিচার’ হয় তাঁর। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় তিনি সূর্যের আলো ঢোকেনা ৬/৯ ফুটের ঘরে বন্দি ছিলেন। ইজরায়েলি প্রশাসন বারংবার আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে ভানুনু-কে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে চেয়েছে। বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখাতে চেয়েছে। কিন্তু ততদিনে বিশ্ব জেনে গেছে ইজিরায়েলের গোপন অস্ত্র ভাণ্ডারের কথা। ৮০–৯০-এর দশকেই ইজরায়েলের হাতে ছিল ১০০–২০০ পারমাণবিক বোমা। নিউট্রন ও থার্মোনিউক্লিয়ার বোমাও। এগুলো দিয়ে পুরো আরব দুনিয়া ধ্বংস করা সম্ভব। তখন বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেন ইজরায়েল সম্ভবত বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম পারমাণবিক ভাণ্ডার। সেখানে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র, মাইন ও মাঝারি-পাল্লার মিসাইলও আছে। দিমোনা প্লান্টে প্লুটেনিয়াম উৎপাদিত হয়, যোদাফাত ও জাকারিয়াহ অঞ্চলে অস্ত্র সংরক্ষিত থাকে এবং হাইফায় আছে পারমাণবিক সাবমেরিন। এখনও পর্যন্ত ইজরায়েল খুব সম্ভবত একমাত্র রাষ্ট্র, যার পারমাণবিক অস্ত্রের সঠিক হিসেব International Atomic Energy Agency (IAEA)-র কাছেও নেই। অথচ শুধুমাত্র এই পারমাণবিক অস্ত্র রাখার ভুয়ো অভিযোগে একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইরাক আক্রান্ত হয়েছে। এই সপ্তাহ খানেক আগে ইরান আক্রান্ত হয়েছে। একই ধুয়ো তুলে সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত এসেছে বারংবার। এই আগ্রাসনের সময়েই ভেসে উঠেছে গাজায় ত্রাণ শিবিরে ইজরায়েলি আক্রমণের ছবি। দীর্ঘ অপুষ্টির শিকার হওয়া শিশু বা সদ্যোজাতর ছবি। পরবর্তীকালে এই দৃশ্য ফুটে উঠেছে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড জারা-র বিজ্ঞাপনে। কখনও ফ্যাশন শো-এর র্যাম্প ওয়াকে বা কখনও কেএফসি-র বিজ্ঞাপনে। মৃত শিশু যেন পণ্য হয়ে উঠেছে! ইজরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলা ছিন্নভিন্ন করেছে প্যালেস্তাইনকে। আগুনে পুড়েছে শরীর। কখনও শরীর থেকে চামড়া টেনে তুলে নেওয়া হয়েছে, কখনও খুবলে নেওয়া হয়েছে চোখ। আবার কখনও কবর থেকে শরীর তুলে তার কিডনি, চামড়া, চোখ পাচার হয়েছে। এভাবেই ব্যবসার প্রয়োজনে ইজরায়েলে গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বৃহৎ স্কিন ব্যাংক। লুঠেরা আগ্রাসী পুঁজি আদতে কোনো বিধিনিষেধ মানেনা। প্রয়োজনে সে একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানতে পারে। প্রয়োজনে প্যালেস্তাইনের মতন একটা ভূখণ্ডের, গোটা জাতিকে নিকেশ করার দিকে যেতে পারে। গোটা বিশ্বজোড়া উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনীতি এভাবেই নিজের আগ্রাসী ভূমিকা চালাচ্ছে। আর তার দোসর হিসেবে রয়েছে এদেশের বিজেপি সরকার, তার প্রধানমন্ত্রী মোদী। তাঁর সাথে রয়েছেন আদানী-আম্বানির মতন আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির মালিকেরা। তাই পালটেছে ভারতের বিদেশনীতি। আরব রাষ্ট্রগুলির বাইরে যে ভারত প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল; সেই ভারত বর্তমানে সরাসরি ইজরায়েলের পক্ষ নিয়েছে। এভাবেই গড়ে উঠেছে ট্রাম্প-মোদী-নেতানিয়াহুর অক্ষ। যার ফলাফল প্যালেস্তাইন। একটি গণহত্যার অর্থনীতি। তথ্যসূত্র প্রকাশের তারিখ: ১০-জুলাই-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |