বাতিল করতে হবে পঞ্চায়েতের বগটুই মডেল

রতন খাসনবিশ
তৃণমূলের পঞ্চায়েত শাসনে সর্বপ্রথম অকেজো করে দেওয়া হয়েছে গ্রাম সংসদকে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপরে আধিকারিকদের খবরদারিও এসেছে একই সঙ্গে। ক্ষমতাহীন সংসদ ও ক্ষমতাবান আধিকারিক যে ব্যবস্থায় হাত ধরাধরি করে চলতে পারে, রাজ্যে সেই ব্যবস্থারই উদ্ভব ঘটেছে। জনগণকে নিষ্ক্রিয় রেখে উন্নয়নের বিপুল অর্থ বিলি-বন্দোবস্ত করার রাস্তা খুঁজেছে তৃণমূলী পঞ্চায়েত। এই অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত যা ঘটাতে পারে তা হল পঞ্চায়েতকেন্দ্রিক ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন। রাজ্যে সেটাই ঘটছে। এই ফর্মুলায় পঞ্চাযেত কেন্দ্রিক উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বহু ভাদু শেখের উত্থান ঘটেছে ।

বগটুই গ্রামের নৃশংস গণহত্যার নেপথ্য নায়ক ছিল ভাদু শেখ। বগটুই গ্রামে ভাদু শেখের আছে এক বিশাল প্রাসাদ। ভাদু শেখের এই বিপুল সম্পত্তি কোথা থেকে এল, এ প্রশ্ন নিষ্প্রয়োজন। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতটি আছে ভাদু শেখের দখলে। জেলাস্তরে যাদের হাতে ক্ষমতা ভাদু শেখের সঙ্গে তাদের আছে সুসম্পর্ক। স্থানীয় প্রশাসন ভাদু শেখকে রীতিমতো সমীহ করে চলে। সুতরাং, গ্রাম জ্বালাবার এবং নির্বিচারে মানুষ খুন করার অধিকার ভাদু শেখের আছে। 

সংবিধানের ২৪৩খ ধারা অনুসারে গ্রামীণ ক্ষমতার উৎস হওয়ার কথা গ্রামসভা বা গ্রাম সংসদের। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতী আইন অনুসারে প্রতিটি বুথে নথিভুক্ত ভোটদাতারা সংশ্লিষ্ট  গ্রাম সংসদের সদস্য। সংবিধান অনুসারে গ্রামসভা বা গ্রাম সংসদের ক্ষমতা অনেকটা আইনসভার মতো। গ্রাম সংসদকে উপেক্ষা করে অথবা গ্রাম সংসদে সংখ্যাগুরুর মতের বিপরীতে গিয়ে কোনও নির্বাচিত সদস্য ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় কাজ করার অধিকার পায় না। 

বগটুই গ্রামেও নিশ্চয়ই একটি গ্রাম সংসদ আছে সংবিধান অনুসারে যার ক্ষমতা বিপুল। এই সংসদ ভাদু শেখের পাশে আছে, গ্রাম জ্বালাবার কাজে সংসদ সদস্যরা অংশগ্রহণ করেছেন, কয়েকটি বাড়িতে জোর করে ঢুকে নরহত্যা করেছেন তারা —  এমনটা ভাবাই যায় না। একটি সংসদ পুরোটাই ক্রিমিন্যালে বোঝাই, একটি সংসদে নথিভুক্ত সব সদস্যই অগ্নিসংযোগ ও নরহত্যা বিশারদ, একথা কোনও সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই স্বীকার করবেন না। বস্তুত, সংবিধানের ২৪৩খ ধারায় গ্রাম সংসদের হাতে অমিত ক্ষমতা দেওয়ার পিছনে এই চিন্তাই কাজ করে যে, সব মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ নয়। শুভ ও অশুভের মধ্যে তফাৎ সব মানুষই করতে পারেন। বগটুইয়ের গ্রাম সংসদ সিদ্ধান্ত করে ভাদু শেখের নরহত্যায় মদত দিয়েছে, এটা সম্ভব নয়। ভাদু শেখের প্রাসাদোপম বাড়ি স্থানীয় সংসদ অনুমোদিত, একথা ভাবাই যায় না। 

তাহলে ভাদু শেখের এই অমিত ক্ষমতার উৎস কী? 

এক কথায় বলা যায়, তার সমস্ত ক্ষমতার উৎস হল পঞ্চায়েতী রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন। স্থানীয় পুলিশ, সানগ্লাস শোভিত বিডিও, এডিএম ডেভেলপমেন্ট, দুর্বৃত্তায়নের শাখা-প্রশাখায় এদের প্রত্যকেরই একটি করে স্থান আছে। এবং খুবই সুশৃঙ্খল ভাবে এই মেশিনারিটি কাজ করে। লক্ষ্যণীয় যে, এই দুর্বৃত্তায়িত উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণ অর্থাৎ নথিভুক্ত ভোটদাতারা একেবারে কোণঠাসা। একথা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, সংসদ মিটিং করে বগটুইয়ের গণহত্যায় অনুমোদন দিয়েছে। এটি সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও  স্থানীয় গ্রাম সংসদের কোনও ভূমিকাই নেই।  গ্রামীণ রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ঘটছে গ্রামীণ ক্ষমতার উৎস হিসেবে যে গ্রাম সংসদের কথা ভাবা হয়েছিল তাকে পাশ কাটিয়ে। 

তৃণমূলের পঞ্চায়েত শাসনে সর্বপ্রথম অকেজো করে দেওয়া হয়েছে গ্রাম সংসদকে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপরে আধিকারিকদের খবরদারিও এসেছে একই সঙ্গে। ক্ষমতাহীন সংসদ ও ক্ষমতাবান আধিকারিক যে ব্যবস্থায় হাত ধরাধরি করে চলতে পারে, রাজ্যে সেই ব্যবস্থারই উদ্ভব ঘটেছে। জনগণকে নিষ্ক্রিয় রেখে উন্নয়নের বিপুল অর্থ বিলি-বন্দোবস্ত করার রাস্তা খুঁজেছে তৃণমূলী পঞ্চায়েত। এই অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত যা ঘটাতে পারে তা হল পঞ্চায়েতকেন্দ্রিক ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন। রাজ্যে সেটাই ঘটছে। এই ফর্মুলায় পঞ্চাযেত কেন্দ্রিক উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বহু ভাদু শেখের উত্থান ঘটেছে । 

পাথরখাদান, নদী খুঁড়ে বালি পাচার করা, গরু পাচার করা — এগুলি আসলে কুটির শিল্প, শিল্পহীন পশ্চিমবঙ্গে স্বাভাবিক নিয়মেই যা গড়ে উঠছে। এগুলোর ভিতরে ক্রিমিন্যাল কাজকর্ম অবশ্যই থাকে। বস্তুত ভাদু শেখও এই ধরনের ক্রিমিন্যাল কাজে স্থানীয় রিংলিডার। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতী দুর্বৃত্তায়নে মূল আধার কিন্তু এই বালি চুরি কিংবা গরু চুরি নয়। নানা সূত্রে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় প্রচুর অর্থের আগমন ঘটে। একেকটি জেলা পরিষদ অন্তত ৫০০ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে কাজ করে। পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতেও সরাসরি অর্থ আসে ফিনান্স কমিশনের দৌলতে। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়েই বহু প্রকল্প পঞ্চায়েত সমিতি কিংবা গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে হস্তান্তরিত করে থাকে। সরাসরি টাকা পাওয়া (ডিরেক্ট ডিভলিউশন) ছাড়াও গ্রাম পঞ্চায়েতের একটা মস্ত বড় কাজ হল এনরেগা বা ১০০ দিনের কাজ। ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প চাহিদা-নির্ভর প্রকল্প। এই খাতে যতটা প্রয়োজন তত পরিমাণে বাজেট বরাদ্দ করা কেন্দ্রীয় সরকরের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার মধ্যেই পড়ে। গ্রাম পঞ্চায়েত সে কারণেই যথেষ্ট শক্তিশালী।  ঠিকমতো কাজ করলে এই স্তরের পঞ্চায়েতে টাকার অভাব হওয়ার কথা নয়। যে সব পঞ্চায়েতে কাজ কম পশ্চিমবঙ্গে সেসব পঞ্চায়েতেও ৫ কোটি টাকার কমে অর্থবরাদ্দ  হয় না। 

পঞ্চায়েতী রাজনীতি যত বেশি দুর্বৃত্তায়িত হল এই স্তরে টাকা লুঠপাটের নতুন নতুন রাস্তা খুলে গেল। একজন গরু পাচারকারী সারা বছরে যা আয় করে একটা মাঝারি স্তরের গ্রাম পঞ্চায়েতে সেই পরিমাণ টাকা বরাদ্দ করা অসম্ভব নয়। যদি গ্রাম সংসদ অকেজো হয়ে যায়, যদি নির্বাচিত সদস্য এবং স্থানীয় আধিকারিক সমান দুষ্টুবুদ্ধিতে পঞ্চায়েত পরিচালনা করে তাহলে উঞ্ছবৃত্তি-নির্ভর স্থানীয় মাস্তান ও অন্যান্য হিস্যাদারদের খুশিতে রেখেও পঞ্চায়েত প্রধান গ্রামে একটি দোতলা বাড়ি বানাতেই পারেন। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগুলিতে এটাই ঘটছে। এবং এই বিনি পয়সার ভোজে প্রবেশ করার জন্যে যে টিকিট লাগে সেই টিকিট জোগাড়ে গ্রাম বাংলায় এত আলোড়ন, এত সঙ্ঘাত। 

মানুষের পঞ্চায়েত যারা গড়তে চান এরাজ্যের পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার এই অধঃপতন সম্পর্কে তাদের সর্বাগ্রে সচেতন হতে হবে। ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ যে গ্রাম সংসদ, এটি তাদের আন্তরিক ভাবে উপলব্ধি করতে হবে। সঙ্গে মনে রাখতে হবে আরও দুটি কথা। সব মানুষকে একসঙ্গে নীতিভ্রষ্ট করা যায় না। আর মানুষই ইতিহাস গড়ে। বগটুইয়ের ইতিহাস গড়বে বগটুইয়ের মানুষ, কোনও ভাদু শেখ নয়। 

পশ্চিমবঙ্গে এই আশঙ্কা করার কারণ আছে যে, সমস্ত মানুষকে নীতিভ্রষ্ট করার প্রকল্প আছে তৃণমূলের। তৃণমূলের উদ্ভাবনী ক্ষমতায় গ্রামের মানুষের জব কার্ড এখন হয়ে গেছে আদৌ কোনও কাজ না করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অনায়াসে কিছু টাকা পাওয়ার উপায়। গ্রামাঞ্চলে এই দুর্নীতি প্রায় একটা কাঠামোগত  রূপ ধারণ করেছে। একেকটি এলাকায় পঞ্চায়েত সদস্য টাকা ভাগাভাগির একটা রেট তৈরি করে দেয়, ওই রেট নিয়ে দর কষাকষি চলে এবং তারপর সমস্ত জব কার্ড হোল্ডার একজোট হয়ে না-হওয়া রাস্তার টাকা লুঠ করে, সামাজিক বনসৃজন প্রকল্প বাস্তবায়িত করার উদ্যোগ না নেওয়াই কেন ঠিক তা নিয়ে সহমত পোষণ করে। এই ধরনের নীতিহীনতা যদি সর্বগ্রাসী হয়ে ওঠে, তাহলে গ্রাম সংসদের মিটিং করেও তা শোধরানো যাবে না। পঞ্চায়েতকে ঘিরে তীব্র শ্রেণি সংগ্রাম আবশ্যক। পশ্চিমবঙ্গে যে মানুষেরা পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করে থাকেন, তাদের মতাদর্শের জগতে শুভ-অশুভকে ঘিরে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার উপাদন থাকে। শ্রেণি সংগ্রাম শাণিত করে সেই উপাদনগুলিকে। 


প্রকাশের তারিখ: ২৫-জুন-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org