|
দুই ভিয়েতনাম সংযুক্তিকরণের ৫০ বছরদীপক নাগ |
মার্কিন রাষ্ট্রপতি নিকসন ভিয়েতনামিকরণের নামে তার পুতুল সরকারের দ্বারা দক্ষিণ ভিয়েতনামিদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। উত্তর ভিয়েতনামও পালটা জবাব দেয়। ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির ফলে রাষ্ট্রপতি নিকসন পদত্যাগ করায় জেরাল্ড ফোর্ড আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তারপর থেকেই কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত আমেরিকা দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে ধীরে ধীরে সেনা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। |
ভিয়েতনাম বিপ্লব সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটা নতুন পথের সন্ধান দিয়েছে। ভিয়েতনামে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রধান কারিগর বাক হো বা হো চি মিন একমাত্র নেতা যিনি ফ্রান্স, চীন, জাপান, ইংল্যান্ড ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে জয়ী হয়েছেন। এশিয়ার বুকে অবস্থিত ছোট ভিয়েতনামের আয়তন মাত্র ৩,৩১,২১০ বর্গ কিলোমিটার। হো চি মিন ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে খুব অল্প বয়সেই লেনিনের নেতৃত্বে গঠিত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সভায় অংশগ্রহণ করেন। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছাড়াও তিনি ছিলেন ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি ও ইন্দোচিন কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। সম্ভবত চীনের কমিউনিস্ট পার্টিরও তিনি সদস্য ছিলেন। চার্লস ফেন-এর কথায়: ‘একটা কথা আমাদের ভুললে চলবে না— মাও, স্তালিন, গান্ধি অথবা নেহরুর নাম তাঁদের নিজের দেশের বাইরে মানুষের কাছে পরিচিতি লাভ করার অনেক আগেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে হো চি মিনের নাম ছড়িয়ে পড়ে’। সংগ্রামের আর এক নাম: ভিয়েতনাম ভিয়েতনামের উন্নত কৃষি ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্যই বারবার বিদেশীরা ভিয়েতনাম দখল করার চেষ্টা করেছে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে চীন ভিয়েতনাম দখল করে ৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেখানে রাজ করে। ৪০ থেকে ৪৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই ভিয়েতনামে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। ৯৩১ সালে ভিয়েতনাম চীনাদের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করে। ১৩ শতকে মঙ্গোলরা মোট তিনবার ভিয়েতনাম আক্রমণ করেছে। ১৫ শতকে চীনা শাসকেরা আবার ভিয়েতনাম দখল করে। কিন্তু মানুষের অবিরাম বিদ্রোহের ফলে ১৪২৮ সালে চীনারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ১৭ ও ১৮ শতকে দুটো রাজবংশ ভিয়েতনামের দুই অংশে রাজত্ব করে। ত্রিন রাজারা উত্তর ভিয়েতনামে এবং নগুয়েন রাজবংশ দক্ষিণ ভিয়েতনামে ক্ষমতাসীন হয়। অনেক লড়াইয়ের পর নগুয়েন নহান হুয়ে, নগুয়েন লু এবং তে সন ভ্রাতৃদ্বয় গোটা ভিয়েতনামকে একত্রিত করে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫১৬ সাল থেকে পর্তুগিজদের সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টান পাদ্রিরা ভিয়েতনামে এসে ঘাঁটি গাড়ে। ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে (১৮৫৮) ফরাসিরা সায়গন আক্রমণ করে তার দখল নেয়। ১৮৮২ সালে ভিয়েতনাম ফরাসিদের অধীন একটা সংরক্ষিত রাজ্যে পরিণত হয়। ফরাসিরা ভিয়েতনামকে তিনটি ভাগে ভাগ করে। দক্ষিণ ভিয়েতনাম (নাম বো) হয় ‘কোচিন চায়না’। উত্তর ভিয়েতনাম (বাক বো)-এর নাম হয় ‘টনকিন’। আর মধ্য ভিয়েতনামকে (ত্রাং বো) ফরাসিদের হাতে ‘আন্নাম’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই তিনটি অঞ্চলের সঙ্গে সিয়াম ও কাম্পুচিয়াকে যুক্ত করে পুরো এলাকাটিকে ফরাসিরা ‘ইন্দোচীন’ নামে চিহ্নিত করে। আজ থেকে প্রায় হাজার দুয়েক বছর আগে থেকেই ভারতের সঙ্গে ভিয়েতনামের একটা যোগাযোগ ছিল। ভিয়েতনাম সরকার থেকে প্রচারিত এক তথ্য থেকে জানা যায় যে, এখনও ভিয়েতনামে প্রায় শ-দুয়েক হিন্দু মন্দির আছে। তাছাড়া মেকং বদ্বীপ অঞ্চলে কাম্পুচিয়ার অঙ্কোরভাটে বিষ্ণু মন্দির এবং অঙ্কোর থামে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব খুবই স্পষ্ট। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে লড়াই কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করার বাস্তব পরিস্থিতি এবং এখনই ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যে গড়া ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে বিপ্লবীদের মধ্যে নানা আলোচনার পর ১৯৩০ সালে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের ওপর ভিত্তি করে নগুয়েন আই কুয়োকের নেতৃত্বে ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টি (পরে ইন্দোচাইনিজ কমিউনিস্ট মাটি) গঠিত হয়। নগুয়েন আই কুয়োক আসলে হো চি মিনের ১৬৯টি ছদ্মনামের মধ্যে একটি ছদ্মনাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চীন, ভিয়েতনাম, ভারত সহ পৃথিবীর নানা দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তিসংগ্রাম তীব্র আকার ধারণ করে। তবে ফ্রান্স চলে যায় নাৎসি বাহিনীর দখলে। কিন্তু জাপান অতি দ্রুততার সঙ্গে ভিয়েতনামের দখল নেবার চেষ্টা চালায়। কমিউনিস্ট পার্টি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী জাতীয় যুক্তফ্রন্টকে আরও সম্প্রসারিত ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলে। জন্ম নেয় ‘ভিয়েতনাম ডকলাপ ডং মিন’ বা সংক্ষেপে ‘ভিয়েত মিন’ নামে গেরিলা বাহিনী। ১৯৪৫ সালে সোভিয়েতের কাছে জাপান ও ফ্যাসিবাদী জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ১৯৪৫ সালে ফরাসি ও চাটুকার সামন্ততান্ত্রিক বাহিনীকে পরাজিত করে সফল আগস্ট বিপ্লবের মাধ্যমে ভিয়েতনামে একটা স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ২ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৫ সালে হ্যানয়ে হো চি মিন অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১০ লক্ষ মানুষের সামনে শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু তখনও ৩০ হাজার ফরাসি আর ৭২ হাজার জাপানি সেনা ভিয়েতনামে ঘাঁটি গেঁড়ে বসে আছে। হো চি মিন তখনও ফরাসি, জাপানি এমনকি ভিয়েতনামি জনগণের কাছেও পরিচিত নাম ছিল না। সবাই বিপ্লবী নগুয়েন আই কুয়োকের নামই শুনে এসেছেন। ফরাসি সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ— এমনকি ভিয়েতনামিরাও জানতেন যে ১৯৩৩ সালে চীনের ফেলে নগুয়েন মারা গেছেন। বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিও তাঁর স্মরণসভা করেছে। পঙ্গপাল বনাম হাতির লড়াই হো চি মিন ভেবেছিলেন একটা যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করতে পারলে তিনি ফরাসি সরকারকে ভিয়েতনামের বাস্তব পরিস্থিতিটা বোঝাতে পারবেন। চিয়াং কাই সেকের চীনকে দূরে রাখাই তখন ভিয়েতনামের প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি চাইছিলেন যদি প্রযোজন হয় তবে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের’ নিয়মটি মেনে নিয়ে ফরাসি সরকার ভিয়েতনামকে স্বীকৃতি দিক। এবং এবিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটা চুক্তি হোক। ৬ মার্চ, ১৯৪৬ স্বাক্ষরিত হয় ভিয়েতনাম-ফরাসি চুক্তি। চুক্তিতে ফরাসিরা ভিয়েতনামকে গণপ্রজাতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেয়। তবে উত্তর ভিয়েতনামে চীনা সেনার পরিবর্তে ১৫ হাজার ফরাসি সেনার থেকে যাওয়ার শর্ত চাপান হলো। কিন্তু শান্তিচুক্তি করার পরেও ফরাসি সরকার ভিয়েতনাম-বিরোধী চক্রান্ত চালিয়ে যেতে থাকে। ব্যক্তিগত মান-অপমানের কথা চিন্তা না করে হো চি মিন প্যারিস গেলেন ফরাসি সরকারের সঙ্গে কথা বলার জন্য। প্যারিস যাওয়ার পথে ১ জুন তিনি ভারতে পৌঁছোন। কলকাতায় আসার পর গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে সরকারি ভাবে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ৮ তারিখ তিনি হোটেল থেকে পায়ে হেঁটে ডেকার্স লেনে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দপ্তরে এসে কর্মীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। প্যারিসে তাঁকে খুবই অপমানের সম্মুখীন হয়ে দেশে ফিরে আসতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জাপানের শক্তি কমে গেলেও ব্রিটিশ, চীন ও ফরাসি সেনারা ভিয়েতনামের দখল নেবার জন্য তাড়াহুড়ো শুরু করে দেয়। ১৯৪৬ সালের নভেম্বর মাসে উপনিবেশবাদীরা চুক্তির সমস্ত শর্ত এবং আন্তর্জাতিক আইন ভেঙে রাতারাতি গায়ের জোরে হাইফং শহরের দখল নিয়ে নেয়। হ্যানয় দখল করার জন্য ওরা একযোগে আক্রমণ চালায়। ১৮ ডিসেম্বর হো চি মিন প্রতিরোধ যুদ্ধের ডাক দেন। শুরু হলো ‘পঙ্গপাল বনাম হাতির লড়াই’। এর আগে থেকেই জেনারেল গিয়াগের সঙ্গে পরামর্শ করে হো চি মিন একাধিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেন। ফরাসি ও আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জেতা সম্ভব কিনা সেবিষয়ে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলে হো চি মিন তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেন: ‘হ্যাঁ আজ এটা পঙ্গপালের সঙ্গে হাতির লড়াই; কিন্তু আগামীকাল হাতির মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী’। আসলে তিনি বলতে চান, হাতি যতই বড়ো আর শক্তিশালী হোক না কেন হাজার হাজার পঙ্গপাল যদি তাকে লাগাতার একসঙ্গে আক্রমণ করে, তবে সে বেঁচে থাকতে পারে না। ১৯৪৯ সালে চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরের বছর চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আরও কয়েকটি বন্ধুদেশ গণতান্ত্রিক ভিয়েতনামকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৫৩ সালে কোরিয়াতে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ফ্রাঙ্কো-মার্কিন বাহিনী পাহাড়ি অঞ্চল দিয়েন বিয়েন ফু-তে ছত্রী বাহিনী নামিয়ে এক দুর্ভেদ্য এলাকা গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু গেরিলা বাহিনী ৫৫ দিন অবিরাম যুদ্ধ চালিয়ে দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সেনাবাহিনীকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়। ১৯৫৪ সালের ২১ জুলাই জেনেভা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে ২৭৭২ দিনের অসম যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। ফরাসিরা ইন্দোচীনে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য জেনেভাতে আলোচনায় বসে। বৈঠক চলে ২৬ এপ্রিল থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত। ভিয়েতনাম গণতান্ত্রিকের প্রতিনিধিরা অখণ্ড ভিয়েতনামের দাবি করেন। কিন্তু সোভিয়েত প্রতিনিধি মলোটভ এবং চিনের চৌ এনলাই চাইছিলেন কৌশলগত কারণে আপাতত শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রযোজন। অনেক দর কষাকষির পর চৌ এনলাই এবং হো চি মিন ফ্রান্সের শর্তানুযায়ী ভবিষ্যতে সংযুক্তিকরণের পথ খোলা রেখে ১৭ অক্ষরেখা বরাবর ভিয়েতনামকে দু’ভাগে ভাগ করার ব্যাপারে সম্মতি দেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের হাতে পরাজিত হওয়ার পর ফরাসি সাম্রাজ্যবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশগুলোকে শোষণ করার জন্য আমেরিকা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যদিও জেনেভা চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল কম্বোডিয়া (কাম্পুচিয়া), লাওস এবং ভিয়েতনামের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং ওইসব দেশের অভাবরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার গ্যারান্টি। ১৯৫৬ সালের জুলাই মাসের মধ্যে একটা সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দুই ভিয়েতনামের সংযুক্তিকরণ করার কথা হয়। এই বিষয়টাকে কার্যকরী করার জন্য ভারতকে চেয়ারম্যান করে এবং পোল্যান্ড ও কানাডাকে সদস্য করে একটা নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ শান্তির পক্ষে রাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ম্যানিলাতে আমেরিকা ‘সিয়াটো’ নামে কমিউনিস্ট-বিরোধী এক যুদ্ধজোট গড়ে তোলে। এই জোটে ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও পাকিস্তান যোগ দেয়। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে দমন করাই ছিল এই জোটের উদ্দেশ্য। দক্ষিণ ভিয়েতনামকে এই জোটের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে কমিউনিস্ট বিরোধী কার্যকলাপ চালানোর জন্য আমেরিকা এই অঞ্চলে স্বায়ীভাবে ঘাঁটি গাড়ার সুযোগ পায়। সেই সময় দক্ষিণ ভিয়েতনামের শাসনকর্তা দিলেন বাও দাই। কমিউনিস্ট বিরোধী হলেও তাঁকে আমেরিকার ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না। আমেরিকা গায়ের জোরে তাঁবেদার বিশপ ন্যু-র জাপানে বসবাসকারী পশ্চিমী শিক্ষায় শিক্ষিত ভাই নো দিন দিয়েন-কে বাও দাইয়ের প্রধানমন্ত্রী পদে বসিয়ে দেয়। শাসনকাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি না থাকায় জেনেভা চুক্তির তিন সপ্তাহ পরেই বাও দাই বাধ্য হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিলেন। দিয়েম হলেন দক্ষিণ ভিয়েতনামের স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তবে ১৯৫৬ সালের ৪ মার্চ দিয়ে একটা লোকদেখানো নির্বাচন করেন। ব্যাপক রিগিং-এর কারণে সেটা হয় নির্বাচনের নামে একটা প্রহসন মাত্র। বকলমে আমেরিকার হাতে চলে গেল দক্ষিণ ভিয়েতনামের শাসনভার। আমেরিকার প্রশ্রয়ে ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষের ওপর দিয়েমের অত্যাচার চরম আকার ধারণ করে। তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে দুই ভিয়েতনামেই গেরিলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। ১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ ভিয়েতনামে ‘পিপলস রেভোল্যুশনারি’ নামে এক পার্টি প্রতিষ্ঠা হয়। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ক্যাথলিক দিয়েম ও তাঁর ভাই ন্যূ কয়েক হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু-ভিক্ষুনিদের জেলে পোরে। অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু আগুনে আত্মাহুতি দিয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। আমেরিকা বিপদের গন্ধ পেয়ে দিয়েমের বিশ্বস্ত সহযোগী ত্রান কিম টুয়েনকে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত করায়। ১ নভেম্বর এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে টুয়েন ক্ষমতা দখল করলেও তিন মাসের মধ্যেই তাঁর শাসনের অবসান হয়। তারপর জেনারেল নুয়েন খান, জেনারেল কাউকি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। কাউকি ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেন। দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সাহায্য করার মিথ্যা অজুহাতে আমেরিকা উত্তর ভিয়েতনামের ওপর অবিরাম বোমা বর্ষণ করতে থাকে। ১৯৬৮ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত মার্কিনিরা ছাব্বিশ লক্ষ টন বোমা বর্ষণ করে এবং সাড়ে পাঁচ লক্ষ মার্কিন ও তার সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর সাত-আট লক্ষ সেনা দিয়েও ভিয়েতনামের মুক্তিযোদ্ধাদের দমন করতে পারেনি। উত্তর ভিয়েতনামের প্রায় চার হাজার যুদ্ধবিমান এবং প্রচুর সেনার জীবনের বিনিময়েও মার্কিনিরা ভিয়েতনামের চূড়ান্ত ক্ষতি করতে পারেনি। ৭ এপ্রিল, ১৯৬৬ রাষ্ট্রপতি জনসন নিঃশর্ত শান্তি আলোচনার কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে আমেরিকা ভিয়েতনামের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা ৩১ জানুয়ারি, ১৯৬৮-তে ‘টেট আক্রমণ’ শুরু করে। প্রতিহিংসাপরায়ণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মার্চের ১৬ তারিখ ‘মাই লাই গণহত্যা’ নামক পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম ঘৃণ্য অপরাধটি সঙ্ঘটিত করে। ছোটো ছোটো চারটি গ্রামে সক্ষম পুরুষদের অনুপস্থিতির সুযোগে সকাল ৭.৩০ মিনিট নাগাদ ১০০ জন মার্কিন সেনা সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে ৫০৪ জন নারী ও শিশুদের হত্যা করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই সারা পৃথিবীজুড়ে মার্কিন বিরোধী নিন্দার ঝড় শুরু হয়। শেষপর্যন্ত মার্কিনিরা ১৯৬৮ সালে প্যারিস শান্তি বৈঠকে যোগ দিতে রাজি হয়। কিন্তু তবুও দীর্ঘদিন ধরে টালবাহানা চলে। অবশেষে ১৯৭৩ সালের ২৭ জানুয়ারি প্যারিস শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নয়টি অধ্যায়ে মোট ২৩টি ধারা সম্বলিত এই চুক্তিতে প্রথমেই ১৯৫৪ সালের জেনেভা চুক্তিকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়। চুক্তিতে আমেরিকা ও ভিয়েতনামের পারস্পরিক সার্বভৌমিকতা ও অখণ্ডতাকে স্বীকার করে নিয়ে উভয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার কথা বলা হয়। কম্বোডিয়া ও লাওসের স্বাধীনতার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ থাকে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি নিকসন ভিয়েতনামিকরণের নামে তার পুতুল সরকারের দ্বারা দক্ষিণ ভিয়েতনামিদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে। উত্তর ভিয়েতনামও পালটা জবাব দেয়। ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির ফলে রাষ্ট্রপতি নিকসন পদত্যাগ করায় জেরাল্ড ফোর্ড আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তারপর থেকেই কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত আমেরিকা দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে ধীরে ধীরে সেনা তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ২ জুলাই, ১৯৭৬ সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রে কৃত্রিমভাবে ভাগ করা উত্তর ও দক্ষিণ— দুই ভিয়েতনাম আবার যুক্ত হয়। জন্ম নেয় ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র। শেষ প্রতিরোধ যুদ্ধের আক্রমণে সায়গনে রাষ্ট্রদূত ভবনের ছাদ থেকে হেলিকপ্টার করে আমেরিকার সেনা ও কর্মকর্তাদের উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেনা-বিমানে তোলা হয়। তাঁরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। সত্যি হয় চাচা হো-র স্বপ্ন: ‘পাহাড়গুলো আমাদের থাকবে চিরদিন, নদীরাও সব থাকবে; থাকবে চিরদিন আমাদের মানুষেরা; মার্কিন হানাদারদের হারিয়ে, আবার আমরা গড়ে তুলবো আমাদের দেশ আরও দশগুণ সুন্দর করে।’ প্রকাশের তারিখ: ২৭-জানুয়ারি-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |