কল্পলোকের দুয়ার খুলে দেওয়ার কাহিনি

বিজয় প্রসাদ
১৭৮৯ ও ১৮৪৮ সালের পরাজয় শ্রমজীবী মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁরা জানতেন ১৮৭১ সালের লড়াই আরও কঠিন হবে। শেষ অবধি তাঁদের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল সেই লড়াই; চরম নিষ্ঠুরতার নজির রেখে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে লক্ষাধিক মানুষকে খুন করে বুর্জোয়াশ্রেণি। হোটেল ডি ভিলায় উড়েছিল লাল পতাকা। ৭২ দিনের সেই হাতে-কলমে পরীক্ষা প্যারি কমিউন নামে সুপরিচিত ছিল। একে ‘কমিউন’ বলা হত কারণ ১৭৯২ সালে বিপ্লবীরা তাঁদের নগরগুলিকে এক একটি প্রশাসনিক-অঞ্চল (এনক্লেভ) হিসাবে গড়ে তুলেছিল; এখান থেকেই জন্ম নেয় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের নীতিসমূহ। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্যারিসের বিদ্রোহীরা তাঁদের নির্বাচিত সরকারের নাম রেখেছিল ‘প্যারি কমিউন’।

১৮৭১ সালে, ৭২ দিনের জন্যে প্যারিসের জনতা এমন একটা জগতে পৌঁছানোর দরজার অর্গল খুলে দিয়েছিলেন, এতদিন পর্যন্ত যে জগৎ ছিল কেবলমাত্র মানুষের কল্পনায়। ফ্রান্সকে একটা বিধ্বংসী যুদ্ধের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যে শাসকশ্রেণি, প্রুশিয়ার ক্রীতদাসত্বের অধীনে ঠেলে দিচ্ছিল যে শাসকশ্রেণি, তাদেরই মুখোমুখি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন প্যারিসের শ্রমজীবী জনতা। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজেদের চারপাশে ব্যারিকেড গড়ে তোলার, নিজস্ব গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নিজেদের সরকার প্রতিষ্ঠা করার। তাঁরা স্থির করেছিলেন, শাসকশ্রেণি এযাবৎ যে যে সমস্যার জন্ম দিয়েছে, সেইগুলি সমাধান করার চেষ্টা তাঁরা নিজেরাই করবেন। ১৮৭১ সালের ১২ এপ্রিল কার্ল মার্কস তাঁর বন্ধু কুগেলম্যানকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন, ‘‘প্যারিসের এই সকল জনতার মধ্যে কী নমনীয়তা, কী ঐতিহাসিক উদ্যম, আত্মবলিদানের কী ক্ষমতা! ছ’মাস ধরে প্রুশিয়ার বেয়নেটের তলায় অবদমিত হয়েও, ছ’মাস ধরে ক্ষুধা আর ধ্বংসের মধ্যে থেকেও তাঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের সেই ক্ষুধা আর ধ্বংসের কারণ যতটা না বহিঃশত্রুরা ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা। তারপরেও তাঁরা এমনভাবে রুখে দাঁড়িয়েছেন যেন ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে কখনও কোনও যুদ্ধই হয়নি, যেন প্যারিসের দুয়ারে কোনো শত্রু এসে হানা দেয়নি। মহত্বের এই নজির ইতিহাসে আর নেই।’’ 

১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের উত্তরাধিকারী হিসাবে, ১৮৪৮ সালের বিদ্রোহের উত্তরাধিকার নিয়ে প্যারিসের শ্রমজীবী জনতা রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই দুই সময়পর্ব এমন ছিল যেন শ্রমজীবী মানুষ কোনো পুণ্যলোকে পৌঁছে গিয়েছিলেন; তাঁরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন যে, দুনিয়ার শ্রমজীবী জনতার পরিকল্পিত, শ্রমজীবী জনতার শাসনে চলা একটা বিশ্ব তাঁরা গড়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু সেই দু’বারই তাঁদের হাত থেকে বিদ্রোহের ঝান্ডা কেড়ে নিয়েছিল একদল ঠগ, একটা ছোট গোষ্ঠী অথচ শ্রেণি হিসাবে ক্ষমতাধর — বুর্জোয়াশ্রেণি। তারা সেই কাজ করতে পেরেছিল বিদ্রোহী জনতাকে নিজেদের পক্ষে টেনে নিয়ে এসে, অথবা রাস্তায় নামা মানুষকে শ্রেণি-শত্রুদের (যাদের মধ্যে বুর্জোয়াশ্রেণিও ছিল) হাতে থাকা সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে সংগঠিত সশস্ত্র হিংসার মধ্যে দিয়ে দমন করার মাধ্যমে। ওই সময়পর্বগুলিতে হাজার হাজার মানুষের উদ্দীপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ক্ষমতাবান শ্রেণির পক্ষে সহায়ক শক্তি হয়ে উঠেছিল নেপোলিয়ান-১ ও নেপোলিয়ান-৩।

১৭৮৯ ও ১৮৪৮ সালের পরাজয় শ্রমজীবী মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁরা জানতেন ১৮৭১ সালের লড়াই আরও কঠিন হবে। শেষ অবধি তাঁদের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল সেই লড়াই; চরম নিষ্ঠুরতার নজির রেখে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে লক্ষাধিক মানুষকে খুন করে বুর্জোয়াশ্রেণি। হোটেল ডি ভিলায় উড়েছিল লাল পতাকা। ৭২ দিনের সেই হাতে-কলমে পরীক্ষা প্যারি কমিউন নামে সুপরিচিত ছিল। একে ‘কমিউন’ বলা হত কারণ ১৭৯২ সালে বিপ্লবীরা তাঁদের নগরগুলিকে এক একটি প্রশাসনিক-অঞ্চল (এনক্লেভ) হিসাবে গড়ে তুলেছিল; এখান থেকেই জন্ম নেয় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের নীতিসমূহ। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় প্যারিসের বিদ্রোহীরা তাঁদের নির্বাচিত সরকারের নাম রেখেছিল ‘প্যারি কমিউন’। 

প্যারিসের প্রতিটি প্রশাসনিক জেলায় কমরেডরা তৈরি করেছিলেন নাগরিক সমিতি (কমিটি অফ ভিজিলেন্স)। এই সমিতি থেকে চারজন সদস্যকে নির্বাচিত করে পাঠানো হয় সমগ্র কমিউনের জন্য গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে। প্যারিসের প্রতিনিধিসভার সদস্যরা এসেছিলেন কেবলমাত্র শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে থেকে; নির্দিষ্টভাবে বলা হলে, ১৮৭১ সালের আগে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছিল তার সাথে যুক্ত থাকা কমরেডদের মধ্যে থেকে। কেন্দ্রীয় কমিটি দাবি  জানায় নাগরিক সংস্থাগুলিতে আধিকারিকদের নির্বাচিত হতে হবে, নির্বাচিত সংগঠনগুলির অধীনস্থ থাকবে পুলিশ, নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গড়ে তুলতে হবে বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম হবে স্বাধীন, গণ জমায়েত করা যাবে অবাধে এবং শহরের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব থাকবে সশস্ত্র নাগরিকদের হাতে।

কমিউন শুরু হয়েছিল দেশপ্রেমের তরঙ্গ শীর্ষে, প্রুশিয়ার সেনার হাত থেকে প্যারিসকে বাঁচানোর একটা উপায় হিসাবে। কিন্তু, সাধারণ মানুষের মেজাজ আর বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির প্রভাব — এই দু’য়ের সম্মিলিত ফলাফল হিসাবে দ্রুততার সাথে তার মোড় ঘুরে যায় একটা বৈপ্লবিক, গণতান্ত্রিক চরিত্রের অভিমুখে। প্রসপর-অলিভিয়ের লিসাগারায় কমিউনের একটা বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি কমিউনের একজন সদস্য ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, যাঁরা কমিউনে উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন তাঁরা সকলেই ছিলেন ‘অপরিচিত’। ফলে কমিউন হয়ে উঠেছিল ‘সর্বজনীন, নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠীর নয়; সুতরাং ক্ষমতাশালী।’ যেদিন কমিউন গড়ে তোলার বৈপ্লবিক কাজ শুরু হয় ঠিক তার পরের দিন, ১৯ মার্চ তারিখে লিসাগারায় লেখেন, ‘‘হোটেল ডি ভিলার মাথায় লাল পতাকা উড়ল। ভোরের কুয়াশার সাথে একই সঙ্গে উবে গেল সেনাবাহিনী, সরকার ও প্রশাসন। বাস্তিলের গহ্বর থেকে, বাসফ্রোইয়ের অজ্ঞাত ঠিকানা থেকে তুলে এনে কেন্দ্রীয় কমিটিকে বসানো হল প্যারিসের সর্বোচ্চ আসনে, এবং সেটা করা হলো সমগ্র বিশ্বের চোখের সামনে’’। কেন্দ্রীয় কমিটির তরফে কমিউনের বিভিন্ন সমিতি নির্বাচনের কাজ করা হয়েছিল ২৭ মার্চ। লিসাগারায় লি‍‌খেছেন, নির্বাচিত সদস্যরা তার পরের দিনই স্ব স্ব পদে আসীন হলেন। দু’লক্ষ ‘হতশ্রী মানুষ’ হাজির হয়েছিলেন হোটেল ডি ভিলায়, তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্বপদে অভিষিক্ত করার জন্য; সেখানে একটানা বেজে যাচ্ছিল সেনাদলের ড্রাম, ব্যানার ঢেকে গিয়েছিল ফ্রিজিয়ান টুপিতে, বন্দুকের মাথায় বাঁধা ছিল এক টুকরো লাল কাপড়। তাঁদের সেই জমায়েতকে বিপুল চেহারা দিয়েছিল ব্যারাকের সৈনিকরা, গোলন্দাজরা, প্যারিসের প্রতি বিশ্বস্ত নাবিকরা। একটা বিপুলা নদীর হাজারো স্রোতধারা যেভাবে গড়িয়ে আসে, [প্যারিসের] সমস্ত পথ জুড়ে সেইভাবে জনস্রোত এসে পৌঁছেছিল প্লেস ডি গ্রাভ’র গণ জমায়েতে।

নির্বাচিত পদাধিকারীরাও পা মিলিয়েছিল সেই জনস্রোতে; তাঁদের কাঁধে বাঁধা ছিল লাল স্কার্ফ। বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনের পদগুলিতে নির্বাচিত পদাধিকারীদের জন্য ছিল সুনির্দিষ্ট কিছু শর্ত। তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল যে, তাঁরা যদি সাধারণ মানুষের চাহিদা মোতাবেক কাজ না করেন তবে তৎক্ষণাৎ তাঁদের নির্বাচিত পদ থেকে অবাধে সরিয়ে দেওয়া যাবে। গ্যাব্রিয়েল রাঁভিয়ে ছিলেন চিনামাটির পাত্রে ছবি আঁকিয়ে ও কমিউনের একজন নির্বাচিত পদাধিকারী। তিনি বলেছিলেন, ‘‘সাধারণ মানুষের নামে শপথ নিয়ে কমিউন ঘোষিত হয়।’’ সোল্লাসে সাধারণ মানুষ চিৎকার করে উঠেছিল, ভিভা লা

কমিউন। লিসাগারায় স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, ‘‘বেয়নেটের ডগায় টুপিগুলোকে গেঁথে দিয়ে ওড়ানো হচ্ছিল, বাতাসে পত্ পত্ করে উড়ছিল পতাকা। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিল সকলের হৃদয়; চোখ ভরে গিয়েছিল বাঁধ-না-মানা কান্নায়’’। প্রতিবিপ্লবের দালালরা ভার্সাই ছুটে গিয়েছিল তাঁদের প্রভুদের এই কথাগুলো জানাতে।

‘‘বাস্তবে আনন্দের জোয়ারে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল গোটা প্যারিস।’’ কমিউনের সর্বহারা চরিত্র প্যারি কমিউনের সনদ স্পষ্টভাবেই বুঝিয়ে দেয় যে, তার প্রশাসনের চরিত্র ছিল শ্রমিকশ্রেণির চরিত্র — পরিত্যক্ত কারখানাগুলি শ্রমজীবী মানুষ দখল করে নিয়ে কাজ চালু করে দেয়, শ্রমিকদের ওপর জরিমানা ধার্য করার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, বেকারিগুলিতে রাত্রিকালীন কাজ নিষিদ্ধ করা হয় এবং সামাজিক ব্যবহারের জন্যে চার্চের সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হয়। শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে এক ধরণের নিরাপত্তা হিসাবে কাজ করত যে বন্ধকী কারবারের দোকানগুলি, সেইগুলির রূপান্তর ঘটানো হয়েছিল। ‘‘এটা বেশ ভালোভাবেই বোঝা গিয়েছিল যে, বন্ধকী কারবারের দোকানগুলিকে বন্ধ করে দিলে তার জায়গায় নিয়ে আসতে হবে একটি সামাজিক সংগঠন, এমন একটি সংগঠন যে কিনা কাজ থেকে ছাঁটাই হওয়া শ্রমজীবী মানুষের অবলম্বন হয়ে ওঠার পক্ষে আন্তরিক নিশ্চয়তা দিতে পারবে।’’ প্যারি কমিউনের কমরেডরা (কমিউনার্ডস) এমনটাই লিখেছিলেন। শ্রমিকশ্রেণিভুক্ত প্রত্যেকটি মানুষ, প্রতিটি দরিদ্র কৃষক, এমনকি যাঁরা যাঁরা কমিউনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, তাঁরাও — সবাইকেই নতুন সমাজে জুড়ে নিতে হবে, এটাই ছিল কমিউনের মনোভাব। 

জন-নিরাপত্তা ব্যুরোর প্রধান ঘোষণা করেছিলেন, ‘‘যাঁরা আমাদের হত্যা করেছিল, সেইরকম বিরানব্বই জন মানুষের কাছে কমিউন রুটি পৌঁছে দিচ্ছে। ওই বিধবা মহিলারা কোনও দলেরই নয়। প্রতিটি দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের জন্যে রুটি আর অনাথ হয়ে পড়া প্রত্যেক মানুষের জন্যে যত্ন এই রিপাবলিকের কাছে মজুত আছে।’’ ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংমেনস্ অ্যাসোসিয়েশনের মাদাম আন্দ্রে লিও গ্রামের কৃষকদের প্রতি তাঁর ঘোষণাপত্রে লি‍‌খেছিলেন, ‘‘ভাই সকল, আপনারা ধোঁকা খাচ্ছেন। আমাদের স্বার্থ অভিন্ন। আমরা যা চাই, সেটা আপনারাও আশা করেন। যে মুক্তির স্বাদ (অ্যাফ্রান্সাইজমেন্ট) আমার চাহিদা, সেটা আপনাদেরও। মোটের ওপর প্যারিস যা চায় তা হল, কৃষকের হাতে জমি আর শ্রমিকের হাতে যন্ত্রপাতি।’’ 

প্যারি কমিউনের পতনের দু’দিন পরে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংমেনস্ অ্যাসোসিয়েশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কার্ল মার্কস বলেছিলেন, ‘‘মর্মবস্তুর দিক থেকে এটা ছিল একটা শ্রমিকশ্রেণির সরকার, আত্মসাৎকারী শ্রেণির বিরুদ্ধে উৎপাদনকারী শ্রেণির সংগ্রামের ফলাফল, অবশেষে খুঁজে পাওয়া এমন একটা রাজনৈতিক অবয়ব যার মধ্যে দাঁড়িয়ে শ্রমের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের কাজ করতে হবে।’’ বিভিন্ন বিভাগের যে সমস্ত আধিকারিকরা সম্রাটের আমলে অকর্মণ্য হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল, তাঁরাই এবার কাজের মানুষ হিসাবে নিজেদেরকে গড়ে‍‌পিটে নিলেন। জেফরিন ক্যামেলিনাট একজন ব্রোঞ্জ উৎপাদক ছিলেন, যিনি টাঁকশালকে ঠিক পথে চালিত করেন; অন্যদিকে অ্যালবার্টথিজ, যিনি একজন খোদাইকর, ডাক বিভাগের বিশৃঙ্খলাকে মিটিয়ে দিয়েছিলেন; (ক্যামেলিনাট পরবর্তীকালে, ১৯২৪ সালে, ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ছিলেন)। এর বাইরে আরও অনেক নাম আছে যাঁরা তাঁদের আবেগবিহীন চৈতন্যে চালিত হাতগুলিকেই এগিয়ে দিয়েছিলেন বুর্জোয়াশ্রেণির ফেলে যাওয়া, তালগোল পাকানো অবস্থাকে বদল করার জন্যে। এঁদের মধ্যে ছিলেন জন-সহায়তা বিভাগের ক্যামিল ট্রেইলার্ড, ডাক অফিসের জুলস্ ফন্টেইন,করব্যবস্থা বিভাগের মারিয়াস ফেইললেট ও আমেডি কম্বল্ট, জাতীয় মুদ্রণব্যবস্থার লুই গিলিয়াম ডিবক। 

জাতীয় গ্রন্থাগারকে সাধারণের ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন এলি রিক্লাস ও বেঞ্জামিন গ্যাস্তিনিউ; অন্যদিকে শিল্পীদের মহাসংঘের সার্বিক দায়িত্বে থাকা গুস্তাভে করবেট জনসাধারণের উপভোগের জন্য যাদুঘরের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তাঁদের সামান্য কয়েক মাসের কাজ সর্বহারার প্রশাসনিক দক্ষতার নিদর্শন রেখে গিয়েছিল। শুধুমাত্র গুটি কয়েক ব্যক্তির জন্যে নয়, সমগ্র সমাজের স্বার্থে বিভিন্ন বিভাগ পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তেল-কালি-মাখা হাতগুলোর কর্মক্ষমতার কথাই তুলে ধরেছিল তাঁদের সেইসব কাজ। কমিউনের সীমাবদ্ধতা ছিল এটাই যে, কমিউনের এই নেতৃবৃন্দ উঠে এসেছিলেন বহু ধরণের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন লুই অগস্ট ব্লাঁকির অনুগামী, কেউ বা পিয়ের জোসেফ প্রুঁধোর অনুগামী, অথবা লুই মিশেলের অনুগামী; একটা খুবই ছোট অংশের নেতারা ছিলেন মার্কসের অনুগামী ও আন্তর্জাতিকের সদস্য। নানান দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে কমিউনের সদস্যদের বেশ বড় মাপের একগুচ্ছ সংস্কারমূলক কাজ করতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু যেটার অভাব তাঁদের ছিল, তা হলো কার্যকলাপ চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে সামগ্রিকভাবে পরিকল্পিত একটা সুস্পষ্ট কর্মসূচি। এই ধরণের এক‍‌টি কর্মসূচির অভাব প্রবলভাবে অনুভূত হয় ব্যাঙ্ক অফ ফ্রান্সের দোরগোড়ায় পৌঁছে। লিসাগারায় স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, ‘‘১৯ মার্চ থেকেই ব্যাংক পরিচালকদের জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছিল মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পাওয়া মানুষের মতো, প্রত্যেকদিনই তাঁরা আশঙ্কা করছিল এই বুঝি ধনভাণ্ডার লুঠ হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ ফ্রাঁ যেন তার নিজের কবরের মধ্যেই বসেছিল।’’ ব্যাংকে সম্পদের পরিমাণ এতটাই বিপুল ছিল যে, ভার্সাইয়ে প্রতিবিপ্লবীদের ঘাঁটিতে নিরাপদ ঘেরাটোপে সেই সম্পদ পাচার করার কথা ব্যাংক পরিচালকরা কল্পনাও করতে পারেনি। পুরো বিষয়টাতে এতটাই প্রবল চাপ ছিল যে ব্যাংকের গভর্নর গুস্তাভে রাউল্যান্ড প্যারিস ছেড়ে পালিয়ে যান; গোটা ব্যাংকের দায়িত্ব সঁপে দেন তাঁর সহকারী আলেকজান্দ্রি ডি প্লাকের হাতে। 

কমিউনের নির্বাচিত নেতাদের সীমাবদ্ধতা ডি প্লাক বুঝতে পেরে‍ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই প্লাকের ছুঁড়ে দেওয়া তথ্য ও সংখ্যার প্রতি সম্ভ্রম দেখাত। তিনি তাঁদের ‘পাই পাই’ করে টাকা দিতেন; একই সাথে এটাও তাঁদের বুঝিয়েছিলেন যে, কমিউনের কাজ প্রসারিত করার ও ব্যর্থতা ছাপিয়ে কমিউনকে সাফল্যের সাথে প্রতিষ্ঠা করার মতো যথেষ্ট সম্পদ ব্যাঙ্কের আছে। ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংমেনস্ অ্যাসোসিয়েশনের একজন সদস্য ছিলেন চার্লস বেসলে; প্যারি কমিউন সরকারের সবচেয়ে পুরানো সদস্য হিসাবেও তাঁর পরিচিতি। তিনি ডি প্লাকের কাছে গিয়ে কথা বলেছিলেন। ডি প্লাক তাঁকে জানান যে, ‘আপনার দেশের ভাগ্য’ ব্যাংকে আটকে আছে এবং সেই সম্পদকে পবিত্র বলে মান্যতা দেওয়া উচিত, দখলে নিয়ে আসা চার্চের সম্পত্তি থেকে অধিকতর মূল্যবান বলে দেখা উচিত। একটা আত্মসমর্পণের চিরকুট নিয়ে বেসলে তাঁর কমরেডদের কাছে হোটেল ডি ভিলায় দ্রুত ফিরে আসেন। সেই চিরকুটে লেখা ছিল, ‘‘ব্যাংকই হলো দেশের ভাগ্য। ব্যাংক ছাড়া কোনো শিল্প হবে না, কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য হবে না। আপনারা যদি তা লঙ্ঘন করেন তাহলে ব্যাংকে রক্ষিত সমস্ত টাকাকড়ি নষ্ট-কাগজে পরিণত হবে।’’ 

ব্যাংক-কে দখলে নিয়ে আসার মতো, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার মতো ও তার সম্পদকে সমাজের ভালোর জন্যে ব্যবহার করার মতো স্নায়ুর জোর কমিউনের ছিল না। পরবর্তীকালে এঙ্গেলস লিখেছিলেন যে, ‘‘বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন যে প্রতিবন্ধকতা ছিল, নিশ্চিতভাবেই সেটা হলো পবিত্র সম্ভ্রম। সেই সম্ভ্রম নিয়েই তাঁরা ব্যাংক অফ ফ্রান্সের দোরগোড়ায় শ্রদ্ধাবনত চিত্তে দাঁড়িয়েই থাকল।’’ এ’রকমটা হওয়ার পিছনে প্রধান ব্যাখ্যা হলো যে, কমিউনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করেছিল কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের চেহারা। এই কারণে, আর্থিক সংস্থানগুলিকে যে গণতন্ত্রের অধীনস্ত রাখতে হয়, সেটা বোঝার ক্ষেত্রে তাঁরা যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলেন না। একই কারণে এটা বোঝার ক্ষেত্রেও তাঁদের সীমাবদ্ধতা ছিল যে, ধুকপুক করে চলতে থাকা বুর্জোয়াশ্রেণির হৃৎপিণ্ডটাকে উপড়ে নিয়ে শ্রমিকশ্রেণির হাতে সমর্পণ করতে হয়। 


রাষ্ট্রকে গুঁড়িয়ে দাও

ব্যাঙ্ক অফ ফ্রান্সের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার সাথে সাথে আরও যে বিষয়টি দেখা গিয়েছিল তা হলো ফরাসি রাষ্ট্রের কাঠামোগুলির প্রতি একটা আস্থা। ১২ এপ্রিলের‍ ‌চিঠিতে কুগেলম্যানকে মার্কস তাঁর নিজের সেইসব বক্তব্যগুলি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যেগুলি ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের উপরে তাঁরই লেখা লুই বোনাপার্টের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার রচনায় তিনি তুলে ধরেছিলেন— বিপ্লব ঘটানোর পরবর্তী প্রচেষ্টা ‘‘কোনওভাবেই আগের বারের মতো আমলাতান্ত্রিক মিলিটারি ব্যবস্থাকে এক হাত থেকে অন্য হাতে বদলি করার প্রসঙ্গ হবে না, বরং ওই ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয় হবে।’’ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শ্রেণির প্রশ্নে অনমনীয়তা পাথরের মতো জমাট বেঁধে গিয়েছিল; নানান দপ্তরের বিধি- নিয়মের মতোই ঘৃণ্য ছিল আধিকারিকদের অভ্যাসগুলিও। ওই বাহাত্তর দিনে সেই অবস্থার তেমন কোনও বদল ঘটানো যায়‍‌নি, এমনকি কমিউনও কোনও চেষ্টা করেনি। প্যারি কমিউনের পতনের পরে ইন্টারন্যাশনালের উদ্দেশ্যে মার্কস বলেছিলেন, ‘‘রেডিমেড রাষ্ট্রযন্ত্রকে দখল করে নেওয়া এবং নিজস্ব  প্রয়োজন মেটানোর জন্যে তাকে পরিচালিত করা, শুধুমাত্র এইটুকুই শ্রমিকশ্রেণির কাজ হতে পারে না।’’ 

তিনি সতর্ক করে এটাও বলেছিলেন যে, ওই রাষ্ট্রযন্ত্রই কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিবিপ্লবের ট্রোজান হর্স হয়ে উঠবে; কারণ,  নতুন সরকারে যতই সদিচ্ছা থাকুক না কেন, ওই রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করবে না। মার্কসের এই বক্তব্যটিকে এঙ্গেলস একটি পুস্তিকায় তুলে ধরেন ১৮৯১ সালে। সেই পুস্তিকায় এঙ্গেলসের লেখা মুখবন্ধটি মার্কসের বক্তব্যটিকে আরও ক্ষুরধার করে তুলেছিল। গোড়া থেকেই একটা কথা মেনে চলতে কমিউন বাধ্য হয়েছিল যে, শ্রমিকশ্রেণি একবার ক্ষমতায় চলে এলে পুরানো রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে তারা আর কাজ চালাতে পারে না। 

এ’কথাও কমিউন মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল যে, সবেমাত্র জয় করে নিয়ে আসা শ্রমিকশ্রেণির আধিপত্যটুকু যাতে আবার হারিয়ে না যায়, সেজন্যে একদি‍‌কে যেমন তাদের পরিহার করতে হবে ফেলে আসা সময়ের সমস্ত দমনমূলক ব্যবস্থা, যেগুলি একদিন তাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতো; অন্যদিকে, তাঁদের নির্বাচিত মন্ত্রী ও পদাধিকারীদের থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে হবে এ’কথা ঘোষণার মধ্যে দিয়ে যে, ব্যতিক্রমহীনভাবে নির্বাচিত সবাইকে যে কোনও মুহূর্তে প্রত্যাহার করে নেওয়া যাবে। অতঃপর, একটি শব্দবাহুল্যবর্জিত তাত্ত্বিক বক্তব্য উত্থাপন করে এঙ্গেলস তাঁর আলোচনা এই বলে শেষ করেছিলেন, “যত যাই হোক, বাস্তবে রাষ্ট্র হলো কোনও একটি শ্রেণিকে দমন করার জন্য অন্য এক শ্রেণির হাতে থাকা একটা যন্ত্র ব্যতীত আর কিছুই নয়;এবং রাজতন্ত্রের সাথে তুলনা করা হলেও, প্রকৃত প্রস্তাবে, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রেও এই বাস্তবতার বিন্দুমাত্র ব্যত্যয় ঘটে না।’’

দু’দশক পরে, ১৯১৭ সালের নভেম্বর বিপ্লব চলাকালীন, কমিউন প্রসঙ্গে মার্কসের বক্তব্য ভি আই লেনিন আবারও পড়েন; আগের সমাজের উত্তরাধিকার সূত্রে হাতে আসা রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে সম্ভাব্য বিপদ প্রসঙ্গে রচনায় মার্কসের সেই বক্তব্য তুলেও ধরেন। লেনিন লিখেছিলেন যে, সংসদীয় ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের সমস্ত পুরানো প্রতিষ্ঠানকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে এবং তার জায়গায় নিয়ে আসতে হবে সর্বহারার শাসনপ্রক্রিয়ার নয়া নয়া চেহারা। 

জার-সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ১৯০৫ সালের বিপ্লবের সময়ে রাশিয়ার শ্রমজীবী মানুষ প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও প্রশাসনের একটা অবয়ব গড়ে তুলেছিল, যাকে সোভিয়েত বলে অভিহিত করা হতো। কমিউন প্রসঙ্গে এবং রাশিয়ার ১৯০৫ সালের বিপ্লব প্রসঙ্গে রচনাগুলিতে ১৯০৮ সালে লেনিন লিখেছিলেন, ‘‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের করণীয় কাজগুলিকে মূর্ত চেহারায় তুলে ধরার প্রসঙ্গে কমিউন-ই ইউরোপের সর্বহারাশ্রেণিকে শিক্ষা দিয়েছিল।’’ সমাজতন্ত্র হলো বিপ্লবের এমন একটা স্তর যেখানে সামাল দিতে হয় গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের নানান চাহিদা পূরণের জন্য তাৎক্ষণিক সমস্ত প্রত্যাশা। কমিউনের কাঠামোর ওপরে সোভিয়েত গড়ে উঠেছিল, যদিও  কমিউন নিজেই একটা অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটিয়েছিল। 

লেনিন তাঁর ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ রচনায় কমিউনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলিকে প্রতিফলিত করেছিলেন। অতএব, স্থায়ী সেনাবাহিনীর উচ্ছেদ ঘটানো, প্রত্যাহার করে নেওয়া যাবে এমন শর্তে সমস্ত পদাধিকারীকে নির্বাচিত করা — ‘কেবলমাত্র’ পূর্ণতর গণতন্ত্রের হাত ধরে চুরমার হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে হঠিয়ে দিয়ে, তার জায়গায় কমিউন জন্ম নেয়। তবে, প্রকৃত প্রস্তাবে, এই ‘কেবলমাত্র’ শব্দটি নির্দেশিত করে এক সুবিপুল পরিবর্তনের — শিকড় গেড়ে বসে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলিকে হঠিয়ে দিয়ে একেবারে মূলগতভাবে ভিন্নতর চরিত্রের বিকল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে জায়গা করে দেওয়া। ‘পরিমাণগত পরিবর্তন যেভাবে গুণগত পরিবর্তনে রূপান্তরিত হয়’, এটা হলো তারই একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ। গণতন্ত্রকে ঠিক যেভাবে ধারণ করা যায়, সেইরকম পূর্ণাঙ্গ অবয়বে ও তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের সূচনা ঘটল, বুর্জোয়া শ্রেণি-চরিত্র থেকে তার রূপান্তর ঘটল সর্বহারা শ্রেণি-চরিত্রে; (কোনও একটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণিকে অবদমিত করে রাখার একটি বিশেষ শক্তি) রাষ্ট্র থেকে তার রূপান্তর ঘটল এমন একটা কিছুতে যেটা কোনোভাবেই যথাযথ রাষ্ট্র নয় — এগুলিই হলো গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন।

কমিউন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কার্ল মার্কস কুগেলম্যানকে লিখেছিলেন, ‘‘মহত্বের এই নজির ইতিহাসে আর নেই।’’ কিন্তু, এক্ষেত্রে তাঁর ভুল হয়েছিল। দমনমূলক সরকারকে হঠিয়ে দিয়ে, তার জায়গায় গণতান্ত্রিক চেহারার নয়া সরকার প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে যে বীরগাথা ও সৃষ্টিশীল প্রচেষ্টা, তারই নানান উদাহরণ ছড়িয়ে আছে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির লড়াই-সংগ্রামের পরতে পরতে। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে, হাইতির পুঁজিবাদী বাগিচা-মালিকদের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণি বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং বাগিচা-মালিকদের শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করে। তাঁরা শাসন পরিচালনা করার নতুন নতুন পথ সৃষ্টির জন্যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। ক্রীতদাসত্বে বাঁধা পড়া মানুষ দাসত্ববন্ধন থেকে পালিয়ে গিয়ে তাঁদের [স্বেচ্ছা] নির্বাসন ভূমিতে গড়ে তুলেছিল সকলের জন্যে সমানাধিকার বিশিষ্ট যে সমাজ, হাইতির ওই নতুন নতুন ধারার শাসনপ্রক্রিয়ার মধ্যে কিছু কিছু ছিল সেই সমাজের আদলে গড়ে তোলা। 

সর্বহারার বিদ্রোহের মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে প্রবণতা ছিল, সেই সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া সমৃদ্ধ করে এই ধরনের অভিজ্ঞতাগুলি। হাইতির বিপ্লব (১৮০৪) থেকে সাংহাই কমিউন (১৯২৭) একই সরলরেখায় চলা হাতে-কলমে পরীক্ষা। এই সমস্ত উদাহরণ আমাদের মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে যাতে সর্বহারার বিপ্লবের চলশক্তির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমরা স্পষ্ট ধারণা তৈরি করতে পারি, এবং সর্বহারার গণতন্ত্র আরও উন্নত স্তরে কীভাবে গড়ে তোলা যায়, সেই সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাতে পারি। থমকে যাওয়া বিপ্লবে শ্রমিকরা প্যারিসের দখল নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেখানকার ব্যাঙ্ক দখল করেনি। এমন কি তাদের শক্তির উল্লেখযোগ্য সমাবেশ ঘটিয়ে দ্রুততার সাথে ভার্সাই পৌঁছে বুর্জোয়াশ্রেণির সরকারকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার কাজও তারা করেনি। অ্যাডলফ থায়ার্সের সরকারকে ক্ষমতায় বসে থাকার সুযোগ দিয়ে প্যারি কমিউন নিজেই নিজের সর্বনাশ ডেকে নিয়ে এসেছিল। এই ঘটনায় মার্কস ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন; তখন সময়টা ছিল এপ্রিলের মাঝামাঝি, কমিউন প্রতিষ্ঠার পরে মাত্র কয়েক সপ্তাহ পার হয়েছে। তিনি কুগেলম্যানকে লেখেন — ওরা যদি পরাজিত হয়, তাহলে তার জন্য ওদের ‘দয়ালু প্রবৃত্তি’কেই একমাত্র দায়ী করতে হবে। [জোসেফ] ভিনোয় এবং অতঃপর প্যারিস ন্যাশনাল গার্ডের মধ্যে থাকা প্রতিক্রিয়াশীল অংশ যে মুহূর্তে নিজেদের পিছু হঠিয়ে নিতে বাধ্য হলো, তখনই (যত তাড়াতাড়ি সম্ভব) ওদের দ্রুতগতিতে ভার্সাইয়ে যাওয়া উচিত ছিল। বিবেকের দ্বন্দ্বে সঠিক সময়টা নষ্ট হলো। ওরা গৃহযুদ্ধ শুরু করতে চায়নি, যেন [ওরা ভেবেছিল] অনিষ্টকারী বিকৃত মস্তিষ্কের জীব ওই থায়ার্স প্যারিসকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু না করেই বসে আছে।

কমিউনের সক্রিয়তার অভাব থায়ার্সকে সু‍‌যোগ করে দিয়েছিল প্রতিক্রিয়াশীল সরকার ও সশস্ত্র সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ভার্সাই পালিয়ে যেতে। ভার্সাইয়ে পলায়মান দলবলকে প্যারিস ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া কমিউনার্ডদের উচিত হযনি; তাদের ওই শহরে আটকে রেখে দিলে সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ মানুষকে জয় করে নিয়ে আসা কমিউনের পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু সেইরকম কিছু ঘটেনি। অন্যান্য বিপ্লবীদের ওপরে এই অভিজ্ঞতা ছাপ ফেলেছিল। নভেম্বর বিপ্লবের পরে সদ্য জন্ম নেওয়া সোভিয়েতে শ্রমিক ও কৃষকরা [সম্মিলিতভাবে] লাল ফৌজ গড়ে তুলেছিল, যাতে প্রতিক্রিয়াশীল সেকেলে শ্রেণির বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদের অর্জিত ক্ষমতাকে রক্ষা করতে পারে। এটা সহজবোধ্য ছিল যে, বিপ্লবী শক্তি যদি তাদের প্রতিপক্ষকে ছত্রখান না করতে পারে, নিজস্ব শক্তি গড়ে না তুলতে পারে, তাহলে বিপ্লবের পতন ঘটবেই। প্যারি কমিউনের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে এই একটি মৌলিক শিক্ষা পাওয়া গিয়েছিল।

থায়ার্স ও তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল সরকার প্রুশিয়ানদের সাথে আলোচনা চালায় যাতে [প্রুশিয়ানদের হাতে] বন্দি ফরাসি সৈনিকদের ছাড়িয়ে আনতে পারে; যাতে নিজেদের সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে পারে ও প্যারিসের ওপর প্রত্যাঘাত হানতে পারে। কমিউনার্ডরা ব্যারিকেড গড়ে তুলেছিল, প্রতি-আক্রমণ ঠেকানোর প্রস্তুতিও নিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতি-আক্রমণ যেদিন নেমে এল, ২২মে ও ২৮মে’র মধ্যবর্তী সময়ে, তাঁরা শহরের দখল ধরে রাখতে পারল না। প্রতিটা রাস্তাই তখন হয়ে উঠেছিল যুদ্ধক্ষেত্র; কিন্তু প্রতিটা যুদ্ধেই কমিউনার্ডরা তাদের দখল থেকে লুপ্ত হয়ে যাওয়া শহরের গহন থেকে গহনতর কোণে পিছু হঠে যেতে বাধ্য হলো। 

বুর্জোয়াদের সেনাবাহিনী ছিল নৃশংস; যেখানেই দখল নিয়েছে সেখানেই তাঁরা কমিউনার্ডদের হত্যা করেছিল, রক্তস্রোতে রাস্তা ভিজিয়ে দিচ্ছিল। লিসাগারায় লিখেছিলেন, ভার্সাইয়ের সেনাদল ‘‘নিজেদের পরিণত করেছিল জহ্লাদদের একটা বিপুলাকার পল্টন রূপে।’’ কমিউনার্ডদের মহিলা বাহিনী মঁমার্তে নিজেদের দখল ধরে রেখেছিল বেশ কয়েক ঘণ্টা। জেনারেল জাস্টিন ক্লিনচ্যান্টের বা‍‌হিনী শেষ পর্যন্ত তাঁদের পরাস্ত করে। কমিউনার্ডদের ওই অঞ্চলের নেতাকে ধরে আনা হয় ভার্সাই বাহিনীর সামনে। ‘তুমি কে হে?’ সেনাবা‍‌হিনীর কম্যান্ডিং অফিসারের এই প্রশ্নে উত্তর ভেসে এসেছিল, ‘লেভিক, একজন রাজমিস্ত্রি, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।’ ক্রোধে অন্ধ হয়ে কম্যান্ডিং অফিসার চিৎকার করে, ‘একজন রাজমিস্ত্রি ফ্রান্সকে শাসন করতে চায়!’ লেভিকের মুখের মধ্যে গুলি করা হয়। 

বুর্জোয়াশ্রেণি এই ধরনের ঘৃণা পোষণ করত। ধৃত কমিউনার্ডদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পরে লাচাইস কবরস্থানে; সেখানে দেওয়ালের সামনে তাঁদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে খুন করা হয়। গ্যালি‍ফিটের মারকুইস [ইংল্যান্ডের অভিজাতদের উপাধি] জেনারেল গ্যাস্টন আলেকজান্দ্রে আগস্ট এই খুনে বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁকে আলজিরিয়াতে পাঠানো হয়। কমিউনার্ডদের ওপরে নৃশংসতার যে অনুশীলন ‍‌তিনি করেছিলেন, আলজিরিয়াতে সেই নৃশংস দক্ষতাই ব্যবহার করেন যাতে উত্তর আফ্রিকায় ফ্রান্স তার সাম্রাজ্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়। সেদিন সেই কবরস্থানে ‘দেওয়ালের গায়ে কমিউনার্ডদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো শরীরগুলো’ তাঁদেরই রক্তে ভেসে গিয়েছিল; যে দেওয়ালের গায়ে তাঁদের দাঁড় করান হয়েছিল, ওই গণহত্যার ১৫০ বছর পরে, আজও বুলেটের ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। 

এক সপ্তাহের মধ্যে ভার্সাইয়ের সেনাবাহিনী প্যারিসের ৪০ হাজার মানুষকে খুন করেছিল। লিসাগারায় লিখছেন, ‘‘এই বিপুল সংখ্যক দেহ দ্রুত কবর দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন ছিল; অতএব, তাঁদের দেহ দুর্গ-প্রাচীরে থাকা বদ্ধ কুঠুরিগুলোতে ভরে পোড়ানো হয়েছিল। কিন্তু, বাতাসের অভাবে দেহগুলির দহন অসম্পূর্ণ থাকে ও সেইগুলি পিন্ডে পরিণত হয়। অতঃপর, বাটস চৌমন্টে সেই অর্ধদগ্ধ দেহগুলোক ‍নিয়ে গিয়ে স্তূপাকৃত করে পেট্রল ঢেলে খোলা আকা‍শের নীচে পোড়ানো হয়।’’ রক্তস্নাত প্যারিসের রাস্তা পরিদর্শন করে অ্যাডলফ থায়ার্স ঘোষণাকরেছিলেন, ‘‘প্যারিসের মাটি ওদের মৃতদেহ দিয়ে ঢেকে গেছে। তবে আমরা আশা করতে পারি, যাঁরা নিজেদের প্যারি কমিউনের অনুগামী বলে ঘোষণা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল, সন্ত্রাসের এই ভয়াবহ দৃশ্য সেই সমস্ত রাজদ্রোহীদের কাছে একটা শিক্ষা হতে পারে।’’ 

সেই দিনটা ছিল ২৫ মে। তার তিনদিন পরে, ২৮ মে প্যারি কমিউনের পতন ঘটে। প্রতিটি পরাজয় শ্রমিকশ্রেণির কাছে একটা শিক্ষা। কমিউন মাত্র দু’মাস টিকে ছিল। কমিউনার্ডদের মৃতদেহের ওপরে ফ্রান্সের বুর্জোয়াশ্রেণি বিপুল আকারের একটা গির্জা বানিয়েছিল, নাম দিয়েছিল ‘স্যাক্রে কোওর’ (‘পবিত্র হৃদয়’)। ক্যাথলিক চার্চের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘প্যারি কমিউন যে পাপ করেছিল, তার প্রায়শ্চিত্ত করতে’ এটা গড়ে তোলা হলো। প্যারিসের বুকে আজকে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিপুল আকারের বাড়িটার নিচে চাপা পড়া সেই কদর্য ইতিহাসের কোনো উল্লেখ নেই। 

কমিউনের প্রতি বুর্জোয়াশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি ওই বিদ্রোহকে একটা পাপ হিসাবে গণ্য করে, এবং কমিউনার্ডদেরই দায়ী করা হয় তাঁদের নিজেদের মৃত্যুর জন্য। কিন্তু সেই বিদ্রোহ নিজেই নিজেকে হত্যা করেনি; তাকে হত্যা করেছিল প্রতিহিংসাপরায়ণ বুর্জোয়াশ্রেণি। কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে অর্জিত শ্রমিকশ্রেণির সার্বভৌম ক্ষমতাকে তাদের হাত থেকে হ্যাঁচকা মেরে ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল বুর্জোয়াশ্রেণি; তাঁরা চেয়েছিলেন কেবলমাত্র তাঁদের নিজস্ব কল্যাণের জন্যে তাঁদেরই শাসনব্যবস্থা

পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। গণতন্ত্রের পথে চলতে শুরু করা প্যারি কমিউনের অগ্রগমনকে রুদ্ধ করে দেওয়া হল, তাঁদের স্মৃতিকে মুছে ফেলার চেষ্টায় গির্জার নীচে চাপা দিয়ে দেওয়া হলো। 

কু‍‌গেলম্যানকে লেখা মার্কসের চিঠিগুলির একটা সংকলনের মুখবন্ধে লেনিন লিখে‍‌ছিলেন, ‘‘এ’কথা বলে মার্কস মূল্যায়ণ করতে পারতেন যে, কখনও কখনও ইতিহাসে এক একটা সময় এসে হাজির হয়েছিল যখন, কোনও ব্যর্থ কারণে হলেও, জনতার একটা সংগ্রাম প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল তাঁদেরই ভবিষ্যতের শিক্ষার জন্যে, তাঁদেরই পরের লড়াইয়ের প্রশিক্ষণের জন্যে।’’ কমিউনের শিক্ষা কেবলমাত্র প্যারিসের শ্রমিকদের জন্য নয়, বা ফ্রান্সের জন্যও নয়; বরং তা ছিল আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির জন্য একটা পাঠ, আমাদের আত্মশিক্ষার জন্য একটা পাঠ। সেই আত্মশিক্ষা হলো মানবতার দ্বিধা-দ্বন্দ্বগুলিকে কাটিয়ে তোলার পক্ষে, সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আমাদের নিজেদের লড়াই-সংগ্রামগুলির অভিমুখ। ১৯১১ সালে, বিদ্রোহের ৪০তম বার্ষিকীতে, প্যারি কমিউনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে লেনিন লিখেছিলেন, ‘‘সামাজিক বিপ্লবের প্রেরণা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে শ্রমজীবী মানুষের পরিপূর্ণ বন্ধনমুক্তির প্রেরণাই হলো কমিউনের কারণ। অতএব, এই চেতনার থেকে দেখলে, কমিউনের মৃত্যু নেই।’’

মন্তব্যসমূহ :

১. লুডউইগ কুগেলম্যানের প্রতি কার্ল মার্কস, ১২ এপ্রিল, ১৮৭১। কার্ল

মার্কস, লেটারস্ টু কুগেলম্যান [কুগেলম্যানকে লেখা পত্রাবলী],

ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স, নিউ ইয়র্ক, ১৯৩৪।

২. কার্ল মার্কস, লুই বোনাপার্টের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার, ১৮৫২। কার্ল মার্কস,

ফ্রান্সে শ্রেণিসংগ্রাম, ১৮৪৮-১৮৫০, ১৮৯৫।

৩. জ্যাকস রাউজারি, লা কমিউন ডি ১৮৭১ [১৮৭১ সালের কমিউন সম্পর্কে],

প্রেসেস উনিভারসিটেরেস ডি ফ্রান্স [ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস], প্যারিস,

২০১৪। জ্যাকস রাউজারি, প্যারিস লিব্রে ১৮৭১ [১৮৭১ সালে প্যারিসের

মুক্তি], এডিশন ডু সেউইল [প্রান্তিক প্রকাশনা], প্যারিস, ২০০৪।

৪. প্রসপর-অলিভিয়ের লিসাগারায়, হিস্টোরিই ডে লা কমিউন ডে ১৮৭১

[১৮৭১ সালের কমিউনের ইতিহাস], ১৮৭৬; অনুবাদক এলিনর মার্কস।

কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করেই রচনাটিতে যে সমস্ত উদ্ধৃতি ব্যবহার

করা হয়েছে তার বেশিরভাগটাই এই গুরুত্বপূর্ণ বইটি থেকে সংগৃহীত।

৫. ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস, মার্কসের লেখা ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ রচনাটির উপসংহার,

১৮৯১।

৬. ভি আই লেনিন, লেসেনস অফ দ্য কমিউন [কমিউনের শিক্ষা],

জাগ্রানিচয় গেজেট, সংখ্যা ২, মার্চ ১৯০৮।

৭. ভি আই লেনিন, লেটারস্ টু কুগেলম্যান [কুগেলম্যানকে লেখা পত্রাবলী]

বইয়ের মুখবন্ধ।

৮. ভি আই লেনিন, ইন দ্য মেমোরি অফ দ্য কমিউন [কমিউনের স্মৃতিতে],

রোবোচায়া গেজেট, সংখ্যা ৪-৫, এপ্রিল ১৯১১।


ভাষান্তর: জয়দীপ ভট্টাচার্য 


প্রকাশের তারিখ: ১৮-মার্চ-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org