|
পিডিজি'র ঐতিহ্যই এম এস নাম্বুদিরিপাদ |
|
প্রমোদ দাশগুপ্ত আর আমাদের মধ্যে নেই। ফলত যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা এক অর্থে অপূরণীয়। কিন্তু আমরা যারা তাঁর সাথে এতকাল কাজ করেছি এবং সারা দেশের যে লক্ষ লক্ষ মানুষ বিগত এক সপ্তাহকাল ধরে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, শহর কলকাতার বুকে তাঁর অন্ত্যেষ্টিতে নজিরবিহীন শোক সমুদ্র সৃষ্টিতে যার পরিসমাপ্তি ঘটে সেই সংখ্যাহীন মানুষের সততা নিষ্ঠা ভালবাসা আর গভীর আত্মপ্রত্যয় দিয়ে এই বিপুল শূন্যতাকে ভরিয়ে তুলতেই হবে। আমাদের পিডিজি আজ থেকে প্রায় ছয় দশক আগে তাঁর বাল্যকালে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে অংশ নিয়ে যে কাজ শুরু করেছিলেন আ-মৃত্যু তিনি সেই কাজেই শামিল ছিলেন। বালক বয়সেই তিনি সে সময়কার অনেক ছেলেমেয়েদের মত জীবন বিপন্ন করে বিপ্লবী অনুশীলন দলে যোগ দিয়ে ঘৃণ্য ইংরেজ রাজত্বের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন এবং অচিরেই তৎকালীন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সংগঠন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একজন অগ্রগামী কর্মী হয়ে উঠলেন। তিনি হয়তো একজন সাধারণ কংগ্রেস কর্মী হয়ে থাকতেন বা ভবিষ্যতে একজন কংগ্রেসী মন্ত্রীও হতেন কিন্তু তা আদপেই ঘটেনি কারণ তিনি যৌবনেই এসত্য অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, যথার্থ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা তখনই ফলপ্রসূ হতে পারে যদি তার সাথে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের চিন্তার মিলন ঘটানো যায় এবং আমাদের নিজের দেশের শ্রমিক-কৃষক ও সর্বস্তরের মেহনতী মানুষের মধ্যে কষ্টকর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের আদর্শের দ্বারাই একমাত্র তা করা সম্ভব। এই বাস্তব অনুভূতি তাকে বাংলাদেশের আমাদের প্রিয় প্রবীণ বিপ্লবী কাকাবাবুর নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টিতে অনিবার্যভাবেই টেনে নিয়ে এলো। সেই তখন থেকেই কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্যরূপে তিনি পার্টিকে একটা যথার্থই বিপ্লবী সংগঠনে পরিণত করার কাজে অক্লান্তভাবে সমস্ত রকমের তৎপরতা গ্রহণ করে এসেছেন, সেই সাথে আপসহীনভাবে পার্টির 'বাম ও দক্ষিণ' বিচ্যুতির স্বরূপ উদ্ঘাটন করে গেছেন। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে যখন দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ মাথা চাড়া দিয়েছিল সে সময় তার বিরুদ্ধে সংগ্রামে পি ডি জি'র ভূমিকা শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় সারা দেশের মানুষ বিশেষভাবেই স্মরণ করবেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ থেকে সম্পূর্ণত সরে এসে ১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-তে রূপান্তরিত করার পথ-পদ্ধতি গ্রহণে তিনি অন্যতম প্রধান নায়কদের একজন। সি পি আই (এম)-র মধ্যেও মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিশুদ্ধতা রক্ষার সংগ্রামে তিনি অপ্রতিহত ছিলেন, শুধু দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের বিরোধিতাই নয় তিনি বামপন্থী সুবিধাবাদ ও বিচ্যুতির বিরুদ্ধেও অনলস সংগ্রামী ছিলেন। ষাটের দশকের শেষ থেকে গোটা সত্তরের দশক ধরে নকশালপন্থী মতবাদ ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তাঁর গৌরবময় সংগ্রাম কিছুদিন আগের দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মতই একান্ত স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মার্কসবাদ ও লেনিনবাদের আদর্শের প্রতি অবিচল ও একনিষ্ঠ থেকে যখনই যে রাজনৈতিক লাইন গৃহীত হয়েছে তাকে সর্বতোভাবে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে পরিণত করেছেন; পার্টি সংগঠন এবং তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে সাধারণ মানুষের গণ-সংগঠন তৈরি করা এবং দেশের সংগ্রামী গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজে পিডিজি সব সময়েই বিশেষভাবে দৃষ্টি দিয়ে এসেছেন। প্রয়োজনে পার্টিকে একা চলার মতোও প্রস্তুত রেখেছিলেন, আবার সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনায় ব্যাপক ঐক্য গড়ে তোলার কাজেও সর্বশক্তি দিয়ে সব রকমের সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন। গণ-সংগঠন ও সংহত যুক্তফ্রন্ট গঠন করা যে পার্টি সংগঠনের দৃঢ়তা ও পরস্পর সংশক্তি যুক্ত কাজের যোগ্যতার উপর বিশেষভাবেই নির্ভরশীল এই সত্য উপলব্ধিতে তিনি দলের নেতৃত্ব ও জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তুলতে পেরেছেন। সমস্ত রকমের বিচ্যুতি এমনকি পার্টির অভ্যন্তরীণ নানা বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে কমরেড পিডিজি পার্টির মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির কাজে সদা সচেতন ছিলেন। আমরা যাঁরা এক বছর আগে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের পার্টি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছি তারা তাঁর 'এ সংগ্রাম ঐক্যের সংগ্রাম'- এই আহ্বান স্মরণ করতে পারি, যদিও সেই সম্মেলনে সে সময় একটা আন্তঃ পার্টি সংগ্রাম ঘটেছিলো তথাপি শেষ পর্যন্ত বিজয়ওয়াড়া পার্টি কংগ্রেসে যথার্থ অর্থেই একটা 'ঐক্যের কংগ্রেসে' রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়েছিলো। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ, শ্রমিক-শ্রেণী এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের মেহনতী জনগণের মধ্যে ঐক্য, ভারতে ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় সমগ্র সংগ্রামী গণতান্ত্রিক শক্তিকে একতাবদ্ধ করা, সিপিআই(এম) দলকে আরও সংহত করা, আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা দেশে ও বিশ্বে গণতন্ত্র ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অধিকতর একনিষ্ঠ হওয়ার মাধ্যমেই আমরা আমাদের প্রয়াত কমরেডের স্মৃতির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান দেখাতে পারবো। প্রকাশের তারিখ: ২৯-নভেম্বর-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |