মানুষের মার্কস (পর্ব ৩)

জুলিয়ান বোরচার্ডট
একটি জিনিস একই সঙ্গে উপযোগী এবং মানবিক শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদিত সামগ্রী হওয়া স্বত্বেও পণ্য হিসাবে বিবেচিত নাও হতে পারে। নিজের শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদিত সামগ্রী দিয়ে যে ব্যক্তি নিজেরই চাহিদা মেটায়, সেই শ্রম ব্যবহার-মূল্য তৈরি করলেও পণ্য উৎপাদন করে না। পণ্য উৎপাদন করতে হলে শুধু ব্যবহার-মূল্য তৈরি করলে চলে না, অন্যের জন্য ব্যবহার-মূল্য অর্থাৎ সামাজিক ব্যবহার-মূল্যও নির্মিত হতে হয়।

মুখবন্ধ
সাধারণ অর্থে যাকে পাঠকমহল বলে সেখানে তো বটেই, এমনকি মার্কসবাদীদের মধ্যেও মার্কসের লেখা ‘পুঁজি’-র কদর যতটা, সচেতন চর্চা তার তুলনায় কিছুটা কমই। রাজনৈতিক অর্থনীতির আলোচনায় মার্কসের কলমে মানবসমাজের ইতিহাস, চিরায়ত সাহিত্য, সমকালীন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং আইনের বহুবিধ প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব যেমন ঐ বইটিকে যত্ন করে ঘরের তাকে সাজিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি, তেমন না পড়ে ফেলে রাখার অজুহাতও। অনেকেই সে বাধা পেরিয়ে সকলের সুবিধার্থে মার্কসের লেখা’কে সহজ করে লিখতে চেয়েছেন। কার্ল কাউটস্কি’র মতো মার্কসবাদী পণ্ডিত’ও সে কাজে হাত দিয়েছিলেন, পুঁজির প্রথম খণ্ডের সরল সংস্করণ (পিপল’স এডিশন অফ মার্কস’স ক্যাপিটাল) করতে গিয়ে তিনি এবং এক্সটাইন জার্মান ভাষায় ৭০০ পৃষ্ঠার একটি বইও লিখে ফেলেন। ‘পুঁজি’র তিনটি খণ্ডকে একত্রে সরল ভাষায় করার কাজে তাদের দু হাজার পৃষ্ঠা প্রয়োজন বলে স্বীকার করে নেন। সেই ইতিহাস মাথায় রেখেই জার্মান লেখক জুলিয়ান বোরচার্ডট নিজেকে কুড়ি বছর সময় দিয়েছিলেন, তারই ফলশ্রুতি পিপল’স মার্কস। মূল বইটি ১৯১৯ সালের এপ্রিল মাসে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বইটি, ১৯২১ সালে তারই ইংরেজি অনুবাদ প্রকশিত হয় লন্ডন থেকে, অনুবাদ করেন স্টিফেন এল ট্রাস্ক। বাংলা ভাষান্তরের জন্য আমরা সেই ইংরেজি সংস্করণটিকেই ব্যবহার করছি।


দ্বিতীয় পর্বের পরে...


পণ্য প্রধানত একটি বাহ্যিক বস্তু, যা তার গুণাবলির কারণে মানুষের কোনও-না-কোনও একটি প্রয়োজন মেটায়। লোহা, কাগজ ইত্যাদি প্রতিটি প্রয়োজনীয় জিনিসকেই গুণগত এবং পরিমাণগত— দুই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে হয়প্রত্যেক জিনিসেরই অনেকরকম গুণ থাকে এবং সে-কারণে সেগুলি নানাভাবে কাজে আসতে পারে। জিনিসের উপযোগিতাই তাকে এক ব্যবহার-মূল্য প্রদান করে। কিন্তু এ-উপযোগিতা বাতাসে ভাসমান কোনও অনির্দিষ্ট বিষয় নয়। পণ্যের ভৌত গুণাবলির দ্বারা নির্ধারিত হওয়ায়, পণ্য থেকে আলাদাভাবে এর কোনও অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তাই লোহা, গম, হীরা ইত্যাদি পণ্যের উপাদানগুলি নিজেরাই নিজেদের জন্য একটি ব্যবহার-মূল্য ধারণ করে।

প্রথমত, এক ধরনের ব্যবহার-মূল্য অন্য ধরনের ব্যবহার-মূল্যের সঙ্গে যে-পরিমাণগত অনুপাতে বিনিময় হয়, সেই সম্পর্ক হিসাবে বিনিময়-মূল্য আবির্ভূত হয়। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য নিয়মিতরূপে অন্য একটি পণ্যের যে নির্দিষ্ট পরিমাণের সঙ্গে বিনিময় হয়— এটিই তার বিনিময়-মূল্য। এ-সম্পর্ক সময় ও স্থানভেদে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। এ-কারণে বিনিময়-মূল্যকে কিছুটা আকস্মিক ও সম্পূর্ণ আপেক্ষিক একটি বিষয় বলে মনে হয় কঁদিয়াক যেমনটি বলেছিলেন; বিনিময় মূল্য কেবল পণ্যের সঙ্গে আমাদের চাহিদার সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সুতরাং পণ্যের মধ্যে অন্তর্নিহিত কোনও বিনিময়-মূল্যের ধারণাকে অসম্ভব বলেই মনে হয় বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিচার করা যাক।

ধরা যাক একটি নির্দিষ্ট পণ্য, যেমন এক টন গমের বিনিময় হচ্ছে নির্দিষ্ট পরিমাণ জুতার পালিশ, রেশম বা সোনা ইত্যাদির সঙ্গে— অর্থাৎ বিভিন্ন অনুপাতে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে। এক্ষেত্রে গমের একাধিক বিনিময়-মূল্য রয়েছেকিন্তু যেহেতু নির্দিষ্ট পরিমাণ জুতার পালিশ, রেশম, সোনা ইত্যাদি এক টন গমের বিনিময়-মূল্যকেই প্রকাশ করে তাই ঐ সকল পণ্যেরও একটি সমান বিনিময়-মূল্য থাকতে হবে। অতএব প্রথমত এ-সিদ্ধান্তে আসা যায় যে একই পণ্যের বৈধ বিনিময়-মূল্যগুলো এক অভিন্ন বিষয়কেই প্রকাশ করে; এবং দ্বিতীয়ত, বিনিময়-মূল্যের পিছনে অবশ্যই এমন কিছু র‍য়েছে যার বাহ্যরূপটি বিনিময়-মূল্যেই প্রকাশিত হয়

এবার দুটি পণ্যের কথা ধরা যাক, যেমন গম ও লোহা। এ-দুটি পণ্য যে অনুপাতেই বিনিময় হোক না কেন, সে সম্পর্ককে সবসময়ই এমন এক সমীকরণের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব, যেখানে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গম আরেকটি নির্দিষ্ট পরিমাণ লোহার সমান হবেধরা যাক, এক টন গম দুই টন লোহার সমান। এ সমীকরণের অর্থ কী? এর অর্থ হল এক টন গমের মধ্যে এবং দুই টন লোহার মধ্যে এক সাধারণ গুণ একই পরিমাণে বিদ্যমান র‍য়েছে তাই এ-দুটি জিনিস আরেকটি তৃতীয় জিনিসের সমান, যা নিজে এ-দুটির কোনওটিই নয়। বিনিময়-মূল্যের দৃষ্টিতে এ-দুটির প্রতিটিকেই সেই তৃতীয় জিনিসে রূপান্তরিত করা সম্ভব হতে হবে।

পণ্যের ঐ সাধারণ গুণ কোনও প্রাকৃতিক বা ভৌত বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। পণ্যের ভৌত গুণাবলি তখনই বিবেচনায় আসে যখন সেগুলি পণ্যকে আমাদের জন্য উপযোগী করে তোলে, অর্থাৎ যখন তারা পণ্যকে ব্যবহার-মূল্য দেয়। বিনিময়ের সময় পণ্যের ব্যবহার-মূল্য কার্যত উপেক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে একটি ব্যবহার-মূল্য অন্য যে কোনও ব্যবহার-মূল্যের মতোই গণ্য হয়, যদি তা সঠিক অনুপাতে পাওয়া যায়। এমন প্রসঙ্গেই ১৬৯৬ সালে অতীতের অর্থনীতিবিদ বার্বোঁ লিখেছিলেন: যে দুটি পণ্যের বিনিময়-মূল্য সমান, তাদের যে কোনও একটি অপরটির ন্যায়ই উপযোগীসমান বিনিময়-মূল্যের জিনিসগুলির মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই এবং পার্থক্য খুঁজে বের করার কোনও সুযোগও নেই। ৫ পাউন্ড মূল্যের সিসা বা লোহার বিনিময়-মূল্য ৫ পাউন্ড মূল্যের রুপা বা সোনার সমান।

ব্যবহার-মূল্যের দৃষ্টিতে পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য হল গুণগত বৈচিত্র্য; বিনিময়-মূল্যের দৃষ্টিতে কেবল পরিমাণগত পার্থক্যই থাকতে পারে।

পণ্যের ব্যবহার-মূল্যকে বিমূর্ত হিসাবে বিবেচনা করলে, পণ্যকে একটিমাত্র দিক থেকেই দেখা যায়— শ্রমের ফলাফল হিসাবে উৎপাদিতকিন্তু শ্রমজাত উৎপাদন সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্য একটি পরিবর্তনেরও মধ্য দিয়ে যায়। যদি তার ব্যবহার-মূল্যকে উপেক্ষা করি, তবে এর ভৌত উপাদান ও আকারকেও উপেক্ষা করতে হবে যা তাকে ব্যবহার-মূল্য দিয়েছিল। সে দৃষ্টিভঙ্গিতে পণ্য আর কোনও টেবিল, বাড়ি বা সুতা কিংবা কোনও দরকারি জিনিসই নয়, এর সমস্ত নির্দিষ্ট গুণাবলি লুপ্ত হয়ে গেছে। আর কোনও ছুতোর, রাজমিস্ত্রি বা তাঁতির কিংবা কোনও নির্দিষ্ট উৎপাদনশীল শ্রমিকের শ্রমজাত উৎপাদনও নয়। এখন পণ্য কেবলই মানবিক সাধারণ শ্রমের ফলাফল, বিমূর্ত মানবিক শ্রম— অর্থাৎ মানুষের শ্রমশক্তি ব্যয়ের ফলাফল, সেই ব্যয়ের নির্দিষ্ট রূপ নির্বিশেষে বিবেচ্য ঐ শ্রমশক্তি একজন ছুতোর, রাজমিস্ত্রি বা তাঁতি কার শ্রম মারফত ব্যয় হয়েছে সেটি সম্পূর্ণই অপ্রাসঙ্গিক।

এমন বিবেচনায় শ্রমজাত সমস্ত উৎপাদিত পণ্য কেবল এটুকুই প্রমাণ করে যে তাদের উৎপাদনে মানবিক শ্রমশক্তি ব্যয় হয়েছে এবং সে সকল পণ্যের ভিতরে সেই শ্রম সঞ্চিত র‍য়েছে

এ কারণেই কোনও পণ্যের বিনিময়-মূল্য ঠিক ততটুকুই, যতটা বিমূর্ত মানবিক শ্রম তার মধ্যে মূর্ত রয়েছে। এ-মূল্যের পরিমাণ কীভাবে মাপা যাবে? সে মূল্য-সৃষ্টিকারী উপাদান অর্থাৎ শ্রমের পরিমাণ দিয়েই, যা তার মধ্যে নিহিত। শ্রমের পরিমাণ তার স্থায়িত্ব দিয়ে মাপা হয় এবং শ্রমের সময় অর্থাৎ ঘণ্টা, দিন ইত্যাদি নির্দিষ্ট মানদণ্ড দ্বারা

এবার কোনও পণ্যের মূল্য যদি তার উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রমের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয়, তবে মনে হতে পারে যে যত বেশি অলস ও অদক্ষ, তার উৎপাদিত পণ্যের মূল্য তত বেশি হবে, কারণ তার নির্মাণে বা উৎপাদনে তত বেশি সময় লেগেছে। কিন্তু মূল্যের সারবস্তু যে শ্রম, তা হল সমজাতীয় মানবিক শ্রম, অর্থাৎ একই ধরনের মানবিক শ্রমশক্তির ব্যয়। সমাজের মোট শ্রমশক্তি, যা যে কোনও মুহূর্তে বিদ্যমান সকল পণ্যের মোট মূল্যে মূর্ত হিসাবে থাকে, তাকে মানবিক শ্রমশক্তির এক সমজাতীয় সমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যদিও তা অসংখ্য ব্যক্তির শ্রমশক্তি নিয়েই গঠিত। এ সকল ব্যক্তিদের প্রত্যেকের শ্রমশক্তি ততটুকুই সমান, যতটুকু তা সমাজের গড় শ্রমশক্তির প্রতিনিধিত্ব করে এবং সেভাবেই কাজ করে অর্থাৎ কোনও পণ্য উৎপাদনে গড় হিসাবে বা সামাজিকভাবে যতটুকু কাজের ঘণ্টা প্রয়োজন ঠিক ততটুকু সময় হিসাব করলে

সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় কেবল সেই কাজের ঘণ্টা, যা বিদ্যমান স্বাভাবিক উৎপাদন অবস্থায় এবং সে সময়ে প্রচলিত গড় দক্ষতা ও তীব্রতায় যে কোনও ব্যবহার-মূল্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, বাষ্পচালিত তাঁত প্রবর্তনের পর ইংলন্ডে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুতাকে কাপড়ে রূপান্তর করতে আগের তুলনায় সম্ভবত অর্ধেক শ্রমই যথেষ্ট হয়ে পড়ে হাতে কাপড় বোনা ইংরেজ তাঁতি এ রূপান্তরে আগের মতোই সময় নিত; কিন্তু তার কাজের এক ঘণ্টার স্বতন্ত্র শ্রমের ফলাফল এখন মাত্র আধা ঘণ্টা সামাজিক শ্রমেরই প্রতিনিধিত্ব করত, এর ফলে উৎপাদিত কাপড়ের মূল্য তার আগের মূল্যের অর্ধেকে নেমে আসত।

সুতরাং যে কোনও পণ্যের উৎপাদনে সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় শ্রমের পরিমাণ বা কাজের ঘণ্টাই তার বিনিময়-মূল্য নির্ধারণ করে। প্রতিটি স্বতন্ত্র পণ্য এক্ষেত্রে তার নিজস্ব শ্রেণির একটি গড় নমুনা মাত্র। তাই যেসব পণ্য সমান পরিমাণ শ্রমের প্রতিনিধিত্ব করে বা একই পরিমাণ কাজের ঘণ্টায় উৎপাদিত হতে পারে, তাদের মূল্য সমান। এক পণ্যের মূল্যের সঙ্গে অন্য পণ্যের মূল্যের অনুপাত হল এক পণ্যের উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টা ও অন্য পণ্যের উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টার অনুপাতের সমান। মূল্যের নিরিখে বিবেচনা করলে, নির্দিষ্ট পরিমাণ জমাটবদ্ধ কাজের ঘণ্টা ছাড়া পণ্য আর কিছুই নয়

এভাবেই বলা যায় যে কোনও পণ্যের মোট মূল্য অপরিবর্তিত থাকে, যদি তার উৎপাদনে সামাজিকরূপে প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টা অপরিবর্তিত রয়ে যায় কিন্তু শ্রমের উৎপাদনশীলতায় প্রত্যেকটি পরিবর্তনের সঙ্গে ঐ গড় সময়ও পরিবর্তিত হয়। শ্রমিকদের গড় দক্ষতা, বিজ্ঞানের বিকাশের মাত্রা এবং কারিগরি উদ্দেশ্যে তার প্রয়োগযোগ্যতা, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সংগঠন, উৎপাদনের উপায়সমূহের পরিধি ও কার্যকারিতা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ইত্যাদি বিভিন্ন পরিস্থিতির উপর শ্রমের উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে। বছরের অনুকূল আবহাওয়ার সময় প্রযোজ্য একই পরিমাণ শ্রম প্রতিকূল পরিস্থিতির তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ গমের মাধ্যমে মূর্ত হয়। একই পরিমাণ শ্রম সম্পদে সমৃদ্ধ খনি থেকে তুলনামূলকরূপে ফাঁকা খনির চাইতে বেশি পরিমাণ ধাতু নিষ্কাশন করে, এগুলি সবই সংশ্লিষ্ট উদাহরণ

পৃথিবীপৃষ্ঠে হীরে বিরল সামগ্রী, তার আবিষ্কারে সাধারণত অনেক পরিমানে কাজের ঘণ্টার প্রয়োজন হয়। ফলে অল্প পরিমানেও প্রচুর শ্রম মূর্ত থাকে। একই পরিমাণ শ্রম বেশি সমৃদ্ধ খনি পেলে অনেক বেশি পরিমাণ হীরে উৎপাদন করত, তার মূল্যও কমে যেত। কার্বনকে যদি সামান্য শ্রমের বিনিময়েই হীরেতে রূপান্তরিত করা সম্ভব হত, তবে তার মূল্য ইটের চেয়েও কম হতে পারত। সাধারণভাবে বলা যায় শ্রমের উৎপাদনশীলতা যত বেশি, কোনও পণ্যের উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টা ততই কম, তার মধ্যে শ্রমের সঞ্চয়ও ততটাই কম এবং তার মূল্য সে অনুসারেই কম। বিপরীতভাবে, শ্রমের উৎপাদনশীলতা যত কম, কোনও পণ্যের উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টা ততটাই বেশি এবং সে পণ্যের মূল্যও তেমনই বেশি।

কোনও একটি জিনিসের ব্যবহার-মূল্য থাকা স্বত্বেও তার মূল্য নাও থাকতে পারে। এমনটি ঘটে যখন মানুষের তরফে কোনোরকম শ্রম ব্যয় ব্যতীতই সেটি আমাদের উপকারে আসে। যেমন বায়ু, উর্বর ভূমি, প্রাকৃতিক চারণভূমি, জঙ্গল থেকে সংগ্রহযোগ্য জ্বালানীর কাঠ ইত্যাদি।

একটি জিনিস একই সঙ্গে উপযোগী এবং মানবিক শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদিত সামগ্রী হওয়া স্বত্বেও পণ্য হিসাবে বিবেচিত নাও হতে পারে। নিজের শ্রমের বিনিময়ে উৎপাদিত সামগ্রী দিয়ে যে ব্যক্তি নিজেরই চাহিদা মেটায়, সেই শ্রম ব্যবহার-মূল্য তৈরি করলেও পণ্য উৎপাদন করে না। পণ্য উৎপাদন করতে হলে শুধু ব্যবহার-মূল্য তৈরি করলে চলে না, অন্যের জন্য ব্যবহার-মূল্য অর্থাৎ সামাজিক ব্যবহার-মূল্যও নির্মিত হতে হয়।

সর্বশেষে যা বলা যায় তা হল উপযোগিতা না-থাকলে কোনও জিনিসের মূল্য থাকতে পারে না। যদি কোনও জিনিস নিরর্থক হয় তবে তার মধ্যে নিহিত শ্রমও নিরর্থক। ঐ অবস্থায় তাকে শ্রম হিসেবে গণ্য করা চলে না আর তাই অমন শ্রম কোনও মূল্যও তৈরি করতে পারে না।

(পুঁজি-র ১ম খণ্ড, ১ম ও ২য় অধ্যায় থেকে সংকলিত)

মূল জার্মান - জুলিয়ান বোরচার্ডট (১৯১৯)

ইংরেজি ভাষান্তর – স্টিফেন এল ট্রাস্ক (১৯২১)

বাংলা ভাষান্তর – সৌভিক ঘোষ

 


প্রকাশের তারিখ: ৩০-মে-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org