বিপদসঙ্কুল যাত্রা - প্রথম পর্ব

মোসাব আবু তোহা
বোমায় উড়ে যাওয়া স্কুলটার দিকে যে রাস্তাটা গেছে, সেই ধুলোমাখা রাস্তায়– বুক-ফাটানো একটা দৃশ্য– আমাদের স্বাগত জানাল। কাঁথা-কম্বল আর গ্যাসের ক্যানেস্তারা নিয়ে লোকজন ছুটে পালাচ্ছে সব। কয়েকটা ঘোড়া আর গাধার গা থেকে রক্ত ঝরছে গলগল করে। একটা ঘোড়ার লেজটা তো প্রায় খসেই পড়বে এখুনি। এক ছোকরা– যতই সে তার তেষ্টা মেটানোর চেষ্টা করছে– যতই জল সে খাচ্ছে, ঘাড়ের কাছের একটা ফুটো দিয়ে ততই জলটা বেরিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা আমার কাছে একটা ছোরা খুঁজেছিল। আমার কাছে একটা ছোরা থাকলে গলাটা সম্পূর্ণ কেটে ফেলে তাকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারতাম!

এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ফিলিস্তিনীয় কবি মোসাব আবু তোহা-র বয়স একত্রিশ। উচ্চশিক্ষার জন্যে শুরুতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘মাস্টার অব ফাইন আর্টস ইন পোয়েট্রি’ ডিগ্রি লাভ করেন ২০২৩ সালে। নভেম্বরে যখন গাজায় ইজরায়েলি হামলা শুরু হয়, সপরিবারে ছিলেন গাজাতেই। বিপর্যস্ত গাজায় প্রথমে বাড়ি ছেড়ে রিফিউজি ক্যাম্পে। পরে সেই ক্যাম্প ছেড়ে অন্য ক্যাম্পে। শেষে গাজা ছেড়ে যাওয়ার সরকারি ছাড়পত্র পেলে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে দেশান্তরের চেষ্টা। রাফা সীমান্ত পেরোনোর আগে চেকপয়েন্ট থেকে ইজরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার। নিয়ে যাওয়া হয় ডিটেনশন সেন্টারে। চলে যারপরনাই নির্যাতন। কবি আবু তোহা-র মুক্তির দাবি উঠতে থাকে পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকেই। অবশেষে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ইজরায়েল। এখন আছেন মিশরের কায়রোতে। গত ২৫ ডিসেম্বর সেখানে বসেই লিখেছেন এই সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। লেখাটি প্রকাশিত হয় ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকায়, ১-৮ জানুয়ারি ২০২৪ সংখ্যায়। ‘আনসেফ প্যাসেজ’ শিরোনামে। মূল ইংরেজি থেকে ভাষান্তর করেছেন সৌম্যজিৎ রজক

 
যুদ্ধটা যখন গাজা ভূখণ্ড অব্দি এসে পৌঁছল, তখনও আমরা গাজা ছেড়ে যেতে চাইনি। আমরা মানে আমি আর আমার স্ত্রী। বাবা, মা, ভাই, বোনদের সঙ্গেই থেকে যেতে চেয়েছিলাম। গাজা ছেড়ে যাওয়ার অর্থ তো ওঁদেরকে ছেড়ে যাওয়া। তা আমরা চাইনি। যদিও আমাদের তিন বছরের ছেলে মোস্তাফার বিদেশী পাসপোর্ট ছিল, এবং ততদিনে বিদেশী পাসপোর্ট হোল্ডারদের জন্যে মিশর সীমান্ত খুলেও দেওয়া হয়েছিল। তবুও যাইনি। থেকে গেছিলাম। গাজার উত্তর দিকে বেইত লহিয়ায় আমাদের কামরাটা ছিল তিন তলায়। উপরের আর নিচের তলায় ভাইয়েদের পরিবারগুলো। একতলায় থাকতেন বাবা, মা। বাবা বাগানে মোরগ আর খরগোশদের যত্ন নিতেন। পছন্দের বইগুলোর একটা লাইব্রেরি ছিল আমার।

 এক সময় ইজরায়েল প্রচারপত্র ছড়াতে শুরু করল আমাদের মহল্লায়। হুঁশিয়ারি দিল, এলাকা খালি করতে বলল। আর আমরা গিয়ে উঠলাম জাবালিয়া রিফিউজি ক্যাম্পে। একটা দু’কামরার ভাড়া বাড়িতে। রীতিমতো ঠাসাঠাসি ক'রে। ক'দিনের মধ্যেই জানতে পারলাম, আমাদের বাড়িটা বোম মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপর ক্যাম্পেও বোমাবর্ষণ শুরু হ'ল। আমাদের দোর থেকে একশ' মিটারের মধ্যেই ডজন খানেক লোক মারা পড়ল। এসবের মধ্যেই এক সময় বাবা, মা-ও আমাদেরকে থেকে যেতে বলা ছেড়ে দিলেন। শরণার্থী শিবিরের বাড়িটাও যখন আর নিরাপদ থাকল না, আমরা আবার সরে গেলাম। এবার রাষ্টসঙ্ঘের রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি (ইউ এন আর ডব্লু এ)-র একটা স্কুলঘরে উঠলাম। মারাম, আমার স্ত্রী, আরও অনেক মহিলা ও শিশুদের সঙ্গে একটা ক্লাসরুমে ঘুমত। আর আমি ঘুমোতাম বাইরে। বাকি পুরুষদের সঙ্গে। সারারাত হিম পড়ত গায়ে। একবার স্কুলের ভেতর থেকে একটা খানখান করা আওয়াজ শুনতে পেলাম, যেন টেবিল থেকে একটা চায়ের কাপ পড়ে ভেঙে গেল!

এখন যখন মারাম আর আমি আমাদের গাজা ছেড়ে চলে আসার সিদ্ধান্তটা নিয়ে কথা বলি, তখন বুঝতে পারি, এই সিদ্ধান্তটা কেবল ওর আর আমার কথা ভেবে নিইনি আমরা। আসলে আমাদের তিনটে বাচ্চার জন্যেই চলে আসার কথা ভাবতে হয়েছিল আমাদের। গাজায় বাচ্চারা তো বাচ্চাই নয় ঠিক। আমাদের আট বছরের ছেলেটা, য়াজান, বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজের খেলনাগুলো কুড়িয়ে আনার কথা বলেছিল। অথচ এ-বয়সে তো ওর ছবি আঁকতে শেখার কথা ছিল। ফুটবল খেলতে শেখার, পরিবারের লোকেদের হাসি-হাসি ছবি তুলে দিতে শেখার কথা ছিল। বোমা পড়লে লুকোনোর কায়দা শিখছে ছেলেটা।

নভেম্বরের ৪ তারিখ গাজা ছাড়ার ছাড়পত্র পেলাম আমরা। রাফা সীমান্ত পেরোনোর অনুমতি পেল যারা, তাদের লিস্ট বেরোল, আমাদেরও নাম উঠল তাতে। পরদিন বেরিয়ে পড়লাম। তিরিশ কিলোমিটারের এই যাত্রাপথে ফিলিস্তিনীয় জনতার স্রোতে মিশে হাঁটতে শুরু করলাম। দক্ষিণের দিকে। যারা গাধার পিঠে বা টুকটুকে ছিল, যারা আমাদের থেকে দ্রুত এগিয়ে যেতে পেরেছিল, কিছুক্ষণ পরে তাঁদের দেখতে পেলাম ফের। আমাদের দিকেই ফিরে আসছিল ওঁরা।  আমাদের এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হ'ল, সেই জানাল, সালাহ্ আল-দিন রোডে– আমাদের জন্যে নিরাপদ ছিল যে রাস্তাটা–উত্তর দক্ষিণ বরাবার সেই হাইওয়েটায় ইজরায়েলিরা চেকপয়েন্ট বসিয়েছে। সেখানে গুলির আওয়াজ শুনে সে আর এগোতে সাহস পায়নি। ফিরে এসেছে। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে মারাম আর আমিও স্কুলবাড়িটায় ফিরে এলাম।

আমাদের ছয় বছরেরে মেয়ে যাফ্ফা আর ছোট ছেলে মোস্তাফার গা পুড়ে যাচ্ছিল জ্বরে, ফলে ওরা ঠিক করে হাঁটতেও পারছিল না। আমার দিদিরা আমাদের যেতে বারণ করেছিল। মারামও বলল, ‘যাব না ওঁদের ছেড়ে!’ পরিবারের জন্যেই থেকে যেতে চেয়েছি আমরা, পরিবারের জন্যেই চেয়েছি চলে যেতে।

তারপর, নভেম্বরের ১৫ তারিখ, সেদিন আমি স্কুলবাড়িটার তিন তলায় দাঁড়িয়ে আছি। চায়ে চুমুক দিতে যাব, এমন সময়, বিস্ফোরণের ভীষণ শব্দটা কানে এল। আর পাগলের মতো চেঁচামেচি। এক ধরণের গোলা– স্মোক বোম্ব বলি আমরা– স্কুলবাড়িটার ঠিক বাইরেই পড়েছিল। বালি দিয়ে দিয়ে আগুনটা নেভানোর চেষ্টা করছিল লোকজন।

মুহূর্তেই আরেকটি স্মোক বোম্ব ফাটল মাথার উপরে, আকাশে। আকাশটা ছেয়ে গেল সাদা ধোঁয়ার মেঘে। ছুটে ভেতরে ঢুকে গেলাম আমরা, কাশতে লাগলাম, দরজা জানলাগুলো দমাদম বন্ধ করতে লাগলাম। মারাম ভেজা কাগজ তুলে দিতে থাকল আমাদের হাতে আর আমরা সেগুলো নাকে, মুখে চেপে ধরতে থাকলাম। নিঃশ্বাস– কেবল নিঃশ্বাসটুকু নেওয়ার জন্যে।

সে রাতে বোমা আর ট্যাঙ্কের শব্দ শুনলাম আরও। কোনোক্রমে ঘুমোতে পারলাম। পরের কয়েকদিন গলার ভেতরটায় যেন আঁটকে ছিল গ্যাস। ডায়রিয়ায় ভুগলাম খুব। অথচ একটা পরিষ্কার বাথরুমও পেলাম না কোথাও। ওয়াক উঠছিল।

আমি বাড়ির লোকেদের মজা করেই বলেছিলাম, ১৭ তারিখ আসছে, আমার একত্রিশতম জন্মদিন।  বিশেষ সে-দিনটাতেই শান্তি ফিরে আসবে, দেখো। ১৭ তারিখটা এল। আর আমি পড়লাম অস্বস্তিতে। মা-কে জিজ্ঞেস করলাম, "আমার কেক কোথায়?" কেকটা বানিয়ে দেবে, মা বলল, একবার ওই বাড়িটায়— গুঁড়িয়ে যাওয়া বাড়িটায় আমাদের— ফিরে যেতে পারলেই বানিয়ে দেবে।
......…

নভেম্বরের ১৮ তারিখ ইজরায়েলি বোমায় অন্য একটি স্কুলের দু’টো ক্লাসরুম গুঁড়ো হয়ে গেল। ওই স্কুলটায় মারামের ঠাকুরদা-ঠাকুমা আর কাকারা ছিলেন। আমার শ্যালক আহমদ সেইদিন ওঁদের বৃহত্তর পরিবারের বহু সদস্যেরই মৃত্যুসংবাদ পেয়েছিল।  আমার মা, বাবা তো আমাদের এই আশ্রয়টা ছেড়ে না-যাওয়ার জন্যে জেদাজেদি করছিলেনই, কিন্তু, এই খবরটা শুনে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মারামের আত্মীয়দের খুঁজতে গেলাম।

বোমায় উড়ে যাওয়া স্কুলটার দিকে যে রাস্তাটা গেছে, সেই ধুলোমাখা রাস্তায়– বুক-ফাটানো একটা দৃশ্য– আমাদের স্বাগত জানাল। কাঁথা-কম্বল আর গ্যাসের ক্যানেস্তারা নিয়ে লোকজন ছুটে পালাচ্ছে সব। কয়েকটা ঘোড়া আর গাধার গা থেকে রক্ত ঝরছে গলগল করে। একটা ঘোড়ার লেজটা তো প্রায় খসেই পড়বে এখুনি। এক ছোকরা– যতই সে তার তেষ্টা মেটানোর চেষ্টা করছে– যতই জল সে খাচ্ছে, ঘাড়ের কাছের একটা ফুটো দিয়ে ততই জলটা বেরিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা আমার কাছে একটা ছোরা খুঁজেছিল। আমার কাছে একটা ছোরা থাকলে গলাটা সম্পূর্ণ কেটে ফেলে তাকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারতাম!

ভেতরে মারামের ঠাকুরদা-ঠাকুমাকে মেঝেতে বসে থাকতে দেখে আমরা হাঁপ ছাড়লাম। ওর কাকারা জিনিসপত্র গোছগাছ করছিলেন। তারই মধ্যে একজন দক্ষিণের দিকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন। মারামের ঠাকুরদা ঠাকুমা তাকে না-যাওয়ার জন্যে কাকুতি মিনতি করছিলেন তাঁকে।

পরদিন ভোরবেলা, পাঁচটায় উঠে পড়েছিলাম। মেঘলা আকাশ। ঝড় আসছিল একটা। সকলে ঘুমোচ্ছিল। আমি একটা আঢাকা বালতি থেকে এক বোতল জল ভরলাম। ওজু করে বসলাম ফজরের নামাজ পড়তে। তারপর, ওই সাড়ে ছ'টা নাগাদ, মারামের এক কাকা এলেন আমাদের ঘরে। তিনি গাজা ছেড়ে দক্ষিণে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ওঁর ভাইয়েদের সঙ্গে। ‘আর কেউ আসতে চাইলে, আমরা হাসপাতালের গেটে থাকব’, ভদ্রলোক জানিয়ে গেলেন।

এবার যখন আমি মারামকে জিজ্ঞেস করলাম, সেও যেতে চায় কি-না, মারাম আর ‘না’ বলল না। বলল, ‘ব্যাগ সব গোছানোই আছে।’

মারাম তার বাবা মা-কে আমাদের সিদ্ধান্তটা জানাল। মেয়ে আলিঙ্গন করতেই ওঁরা কেঁদে ফেললেন। এরপর আমরা দু'জনেই গেলাম তিনতলায়।  সেখানে বারান্দায় মাদুর পেতে বসেছিলেন আমার বাবা, মা। আমার দুই দিদি ও তাদের বরেদের সাথে ব'সে ওঁরা সকালের কফিটা খাচ্ছিলেন তখন। ওঁদের সামনে ঝুঁকে, খানিকটা ফিশফিশ করেই বললাম, আমরা চলে যাওয়ার চেষ্টা করব এবার। মায়ের মুখটা ফ্যাকাশে মেরে গেল। আমাদের তিন সন্তানের দিকে– নিজের নাতিপুতিদের দিকে– তাকালেন আমার মা। চোখে তখন জল।

ইচ্ছে করেই আমি কাউকে আলিঙ্গন করিনি। ওঁদের ছেড়ে যে চলে যাচ্ছি, এটা আমি বিশ্বাস করতে চাইছিলাম না কিছুতেই। বাবা, মাকে চুমু খেলাম, দিদি জামাইবাবুদের সঙ্গে হাত মেলালাম শুধু, যেন আমি– এই তো ক’দিনের জন্যে–ছোটখাটো ট্যুরেই যাচ্ছি কোনও। কোনও অপরাধবোধ হচ্ছিল না আমার, আমি যেটা টের পাচ্ছিলাম সেটা একটা প্রবল অন্যায়ের বোধ। কেন আমরা চলে যেতে পারি, অথচ ওঁরা পারে না? আমাদের কপাল ভালো, মোস্তাফা জন্মেছিল মহান আমেরিকায়। এতে কি বাকিরা মানুষ হিসেবে আমাদের চেয়ে কম হয়ে গেল একটু? সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্যতা কি একটু কমে গেল ওঁদের‍, ওঁদের বাচ্চাদের? আমি খালি ভাবছিলাম, যখন চলে যাব, ওঁদের আর ফোন করতেও পারব না হয়তো! এমনকি ওঁরা বেঁচে আছে না মরে গেছে‍, সেই খোঁজটুকু নেওয়াও সম্ভব হবে না। এখান থেকে আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপই, আসলে, ওঁদের থেকে দূরে ঠেলে দেবে আমাদের।
.........…

বউ হওয়ার আগে মারাম আমার প্রতিবেশী ছিল। আল-শাটি রিফিউজি ক্যাম্পে আমার জন্ম। আমার যখন আট বছর–২০০০ সালে– বাবা আমাদের বাড়িটা বানালেন বেইত লহিয়ায়। ক্যাম্প থেকে উঠে এলাম আমরা। মারাম আমার চেয়ে এক বছরের ছোট, পাশের বাড়িটাতেই থাকত ওরা। ওকে এতটাই ভালোবাসতাম যে প্রতিবছর নতুন ক্লাসে ওঠার পরই আগের ক্লাসের বইগুলো ওকে দিয়ে দিতাম। যাতে ওকে নতুন বই আর কিনতে না হয়।

একদিন মারাম আমাকে দেখতে পেল, তিনতলা থেকে দূরবীন চোখে দূরে উঁকিঝুঁকি মারছিলাম আমি। আমাদের জানালা থেকে ইজরায়েলের সীমানাটা দেখা যেত। মারাম ওর ছোট বোনকে পাঠিয়ে দিয়েছিল আমার কাছে। কোনও মেয়েকে খুঁজছি কি-না জানতে।

‘তোর কী রে তাতে’, পুচকে মেয়েটা কাটিয়ে দিয়েছিলাম সেদিন। যদিও মারামের আমার প্রতি দুর্বলতার কথা জানতাম তখন থেকেই। ছোট সেই বোনের হাত দিয়েই, তারপর, শুরু হল আমাদের চিঠি চালাচালি। ২০১৫ সালে, আমার যখন বাইশ, বিয়ে করলাম আমরা।

দক্ষিণের দিকে যে সকালে যাত্রা শুরু করলাম, মারাম একটা হিজাব পরেছিল‍। শেয়ালের মাথা আর দু'টো হাতাওয়ালা একটা ইয়াফার কম্বল সাথে নিয়েছিল সে, যাতে প্রয়োজনে সেটাকে গায়ে গলিয়ে নিতে পারি আমরা। এক লিটার জল ছিল আমাদের কাছে। যতক্ষণে সমস্ত বাক্স-প্যাঁটরা জড়ো ক'রে আমরা হাসপাতাল গেটে গিয়ে পৌঁছোলাম– মারামের ছোট ভাই ইব্রাহিমের সঙ্গে— ততক্ষণে ওঁদের কাকারা বেরিয়ে গিয়েছেন।

গাধার গাড়ির চালক এক কিশোরকে দেখতে পেয়ে হাঁকলাম, ‘দক্ষিণে যাবে ভায়া?’

দক্ষিণের দিকে যাওয়ার রাস্তা সম্পর্কে ছেলেটার ধারণা ছিল না কোনও। তবু জিজ্ঞেস করল, ‘কত দেবেন?’

একশ’ ইজরায়েলি শেকেল, আমি বলেছিলাম। মানে ওই সাতাশ মার্কিন ডলারের মতন আর কী! মা-কে হুইলচেয়ারে বসিয়ে এসেছিল আরেকটি যুবক। ভাড়াটা ভাগাভাগি ক'রে গাড়িতে সঙ্গী হল তারা।

বোমায় গুঁড়িয়ে যাওয়া সারসার বাড়ি আর দোকানগুলোকে পাশ কাটিয়ে গাধার গাড়িটা এগিয়ে চলল। অগুনতি মানুষের একটা নদীতে পরিণত হয়েছে যেন রাস্তাটা। দক্ষিণবাহী নদী। অনেকেরই হাতে শ্বেত পতাকা, যাতে দূর থেকে বোঝা যায় যে তাঁরা অসামরিক নাগরিক মাত্র। ইব্রাহিম গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল হঠাৎ। একটা লাঠি তুলে নিয়ে তাতে নিজের সাদা স্যাণ্ডো গেঞ্জিটাকে বেঁধে নিল।

ভিড়ের মধ্যে আমি রামিকে দেখলাম। লোকটা আমার সঙ্গে ফুটবল খেলত এককালে। বছর দশেকেরও আগেই হবে! আমাকে দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলল সে। আমাদের গাড়িতে ওর সত্তরোর্ধ বুড়ো বাপটার একটু জায়গা হবে কি-না জানতে চাইল। আমরা খানিক জায়গা ক'রে দিলাম। উনি চড়ে বসলেন।

প্রায় তিরিশ কিলোমিটার যাত্রাপথে আল-কুয়েত স্কোয়ার পেরিয়ে এলাম। দূর থেকে একটা ইজরায়েলি চেকপয়েন্ট চোখে পড়ল। সৈন্যরা সেখানে ট্যাঙ্ক আর বালির ব্যারিকেড গড়ে বিপুল পদাতিক স্রোত নিয়ন্ত্রণ করছে। রাস্তাটা আঁটকানোর হলে ওরা ট্যাঙ্কটাকে রাস্তার উপর দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল।

শত শত লোক– আবালবৃদ্ধবনিতা– রাস্তার উপর সেই ট্যাঙ্কের সামনে গিজগিজ করছিল। এ-রকমেরই অন্য একটা দৃশ্যের কথা মনে করতে পারি আমি– নাকবা– ১৯৪৮-এ যখন লাখ-লাখ ফিলিস্তিনীয়কে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করেছিল জায়নবাদী মিলিশিয়াগুলো, সেসময় থেকেই ফিলিস্তিনের মানুষেরা পায়ে হেঁটে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে সপরিবারে। যেটুকু যা বেঁচে আছে, সেইসব বোঁচকাবুঁচকি কোনোমতে আগলাতে আগলাতে। দেখেছি ছবিতে।

বাচ্চারা ভীষণই ভয় পেয়ে গেছিল। মোস্তাফা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, সে কি ফের ফিরে যেতে পারে না উত্তরে! ঠাম্মির কাছে। ঠাম্মি ওকে কত আদরে বিছানায় শুইয়ে দিত, আহা! ছেলেটাকে কী জবাব দেব, বুঝতে পারছিলাম না। আমরা ওঁকেই দেখতে যাচ্ছি, বললাম অবশেষে, একটু ধৈর্য ধরো!

ট্যাঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছতেই আমি আমাদের বৈধ ছাড়পত্রগুলোর তাড়া তুলে ধরলাম হাতে। সবার সামনে মোস্তাফার নীল-রঙের মার্কিন পাসপোর্টটা। ট্যাঙ্কের উপর থেকে একজন সেপাই চোঙা ফুঁকছিল, আরেকজন একটা মেশিনগান তাক্ করে রেখেছিল। জীবনের প্রায় পুরোটাই আমি গাজায় কাটিয়েছি। কিন্তু এটাই আমার প্রথম ইজরায়েলি সেনা দর্শন। ওদের দেখে ভয় করেনি আমার। তবে করবে শিগগিরই।

ভিড়ের মধ্যে, আমাদের সামনের দিকে, মারামের কাকাদের দেখতে পেয়ে আহ্লাদ হল আমাদের। ইব্রাহিম চিৎকার করে ডাকল খুব। ওঁদের মধ্যে একজন, আমজাদ, সোৎসাহে প্রত্যুত্তর দিলেন। চেঁচিয়েই। ‘তোমরা পেরেছ’!

লাইনটা এগোচ্ছিল খুবই ধীরে ধীরে। মারামের এক জ্যেঠা, ফায়েজ, নব্বই বছরের মা-কে– মারামের ঠাকুমাকে–হুইলচেয়ারে ঠেলতে ঠেলতে এগোচ্ছিলেন। বয়স্কদের আগে যাওয়ার বন্দোবস্ত করতে তিনি সেপাইদের রাজি করিয়ে ফেললেন। বয়স্কদের সাহায্য করার জন্য তাঁদের সাথে একজন ক'রে যাবে‌। বিস্মিতই হলাম। তবে দু'টো লোক মিলে একটা হুইলচেয়ার ঠেলে এগোনোর চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। ‘থামো’, চেঁচিয়ে উঠল এক ক্রুদ্ধ সেপাই। আচমকাই চালিয়ে দিল গুলি, মাটিতে।

খানিকটা ধুলো আর হাওয়া উড়ে গেল। বাচ্চাকাচ্চাগুলো সিঁটকে গেল ভয়ে। একটা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হ'ল লাইনে। ট্যাঙ্কটাকে আবার দাঁড় করিয়ে দেওয়া হ'ল রাস্তার উপরে। প্রায় মিনিট কুড়ি থম্ মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে হ'ল।

আমরা চেকপয়েন্টটা পেরোতে যাব, এমন সময়, অকস্মাৎ একটি সেপাই চিৎকার ক'রে নির্দিষ্ট কয়েকজনকে চিহ্নিত করতে শুরু করল। তাদের ডেকে ডেকে লাইনের বাইরে বেরিয়ে, একটা নির্দিষ্ট জাযগায় এসে দাঁড়াতে বলল। পুরোটাই খামখেয়াল মাফিক।

‘তুমি, ওই যে ছোঁড়া, হলুদ জ্যাকেট, হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগ! মালপত্র নামিয়ে এদিকে এসে দাঁড়াও!’

‘এই যে সাদা চুল, বাচ্চা ছেলেটার হাত ধ'রে, তুমি,  তুমি! ওকে ছেড়ে এদিকে এসে দাঁড়াও!’

আমকে আর ডাকবে না‍, মনে হল। একহাতে মোস্তাফাকে, আরেক হাতে মোস্তাফার নীল পাসপোর্টটা ধরেছিলাম আমি। তখনই আচমকা সেপাইটা ডাকল, ‘পিঠে কালো ব্যাগ, লাল চুলো ছেলেটাকে ধ'রে আছ, ইউ ইয়ং ম্যান– চলো, বেরিয়ে এসো। ছেলেটাকে রেখে এদিকে এসে দাঁড়াও!’

তৎক্ষণাৎ ঠিক করলাম, আমাদের পাসপোর্টগুলো দেখাব ওদের। মারামের কাছে আমার ফোনটা ছিল। আর ওর নিজের পাসপোর্টটা। ‘আমি ওদের সবটা খুলে বলব– বলব, আমরা রাফাহ্ সীমান্ত পেরিয়ে যেতে চাইছি, আরও বলব, আমাদের খোকা আসলে তো মার্কিন নাগরিক’– মারামকে বললাম। যদিও কয়েক পা এগোতে না এগোতেই একজন সেপাই আমাকে থামতে বলল। এতই ঘাবড়ে গেলাম যে পেছন ফিরে মোস্তাফাকে দেখতেও ভুলে গেলাম। ছেলেটা কাঁদছিল, শুনতে পেয়েছিলাম।

হাঁটু মুড়ে ব'সে থাকা জোয়ান ছেলেদের লম্বা লাইন। আমিও ভিড়ে গেলাম তাতেই। দু'জন বয়স্ক মহিলা, দেখে মনে হ'ল, আটক হওয়া ছেলেদের মুক্তির অপেক্ষা করছিলেন। একটা সেপাই ওঁদের ধমক দিল, ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে চলে যেতে আদেশ করল। "এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে গুলি ক'রে দেব, চলো চলো, ফোটো!" আমার ঠিক পেছনেই যে যুবকটি ছিল, গজগজ করছিল। "আমাকে কেন তুলল ওরা? আমি চাষবাস করি।" খানিকটা আশ্বস্ত করতে চাইলাম তাকে। বললাম,  ভয় নেই, কয়েকটা প্রশ্ন করেই ছেড়ে দেবে।
......…

আধ ঘন্টা পরে, সহসাই, আমার পুরো নামটা ধ'রে কে যেন ডাকল। পরপর দু'বার। ‘মোসাব মোস্তাফা হাসান আবু তোহা!’ অবাক কাণ্ড! যখন ওরা আমাকে লাইন থেকে বের করেছিল, পরিচিতিপত্রটা দেখেনি তখন! তাহলে নামটা জানল কী করে?

একটা ইজরায়েলি জিপের দিকে নিয়ে গেল। বন্দুকের নলটা আমার দিকে তাক্ করা। আই.ডি নম্বর জানতে চাইলে, যত জোরে সম্ভব, আমি মুখস্ত বললাম।

‘বেশ। বাকিদের পাশে বসে পড়!’

আমরা জনা দশেক তখন বালিতে হাঁটু গেড়ে আছি। এক তাড়া টাকা, সিগারেট, মোবাইল, ঘড়ি, মানিব্যাগ এ'সব এক জায়গায় রাখা। আমাদের মহল্লারই একজনকে, আমার বাবার চেয়ে সামান্যই ছোট, চিনতে পারলাম। বললেন, ‘ওরা ওদের কামানের সামনে বন্দিদের মানব-ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে না, এটাই আসল কথা, বুঝলে!’ সম্ভবনাটা আর মাথা থেকে বেরোল না আমার, আতঙ্ক বাড়তে থাকল।

দু’জন দু’জন করে দেয়ালের সামনে ফাঁকা জায়গাটায় এসে দাঁড়াতে বলা হ'ল। তিন জন সেপাই। হাত-মাইকে একজন জামাকাপড় খুলে ফেলার নির্দেশ দিল। বাকি দু'জন আমাদের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছিল। একে একে সব খুলে ফেললাম আমি, জাঙ্গিয়াটুকু ছাড়া। পাশেরজনও তাই করল।

বাকিটুকুও খুলে ফেলতে বলল সেপাইটি। আঁত্কে উঠলাম। দু'জন দু'জনের দিকে তাকালাম। সেপাইগুলো কী করতে পারে ভেবে– জান বাঁচাতে– আমরা বাকিটুকুও খুলে ফেললাম।

‘ঘুরে দাঁড়া!’

প্রথমবার, আমার জীবনে এই প্রথমবার, কোনও অচেনা ব্যক্তি আমাকে এভাবে দেখছে– সম্পূর্ণ ন্যাংটো– এভাবে।

হিব্রুতে কীসব বলাবলি করছে ওরা নিজেদের মধ্যে, বেশ ফুর্তিতেই, মনে হল। ওরা কি আমার রোমশ শরীরটা নিয়ে খিল্লি করছে? আমার কপালের, ঘাড়ের দাগগুলো– ষোলো বছর বয়সে ধারালো ছুরিতে কাটা দাগগুলো– ওরা বোধহয় দেখতে পাচ্ছে। একজন সেপাই আমার ট্র্যাভেল ডকুমেন্টগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন করল। ‘এই আমাদের পাসপোর্ট’, কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘আমরা রাফাহ্ সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলাম।’

‘চোপ, কুত্তীর বাচ্চা!’

ওরা আমাকে জামাকাপড় পরার অনুমতি দিল।  যদিও জ্যাকেটটা পরতে দিল না। মানিব্যাগটা কেড়ে প্লাস্টিকের হাতকড়া দিয়ে হাত দু'টো পিছমোড়া করে বেঁধে দিল। ইউ এন আর ডব্লু এ-র আমার যে পরিচিতিপত্র, সেটার কথা তুলল একজন। বললাম, ‘আমি একজন শিক্ষক।’ আবার খিস্তি করল সে।

ওরা আমার চোখ বেঁধে দিল। কব্জিতে একটা ব্রেসলেট পরিয়ে দিল। তাতে একটা নম্বর খোদাই করা ছিল। ইজরায়েলিগুলোর কেমন লাগত, যদি ওদেরকেও এভাবে স্রেফ সংখ্যা দিয়ে চেনানো হত! মনে হল।

এমন সময় কে একটা আমার ঘাড়ের পেছনটা খামচে ধরল। আর ঠেলতে লাগল। যেন ভেড়াদের জবাই করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি কারও সাথে একটা কথা বলতে চাইলাম, কেউ সাড়াই দিল না। দুনিয়াটা ভারি ঠাণ্ডা আর কর্দমাক্ত। পৃথিবীটা ধ্বংসের স্তূপেই যেন-বা আকীর্ণ।

হাঁটুতে ধাক্কা মারল একটা, তারপর টেনে দাঁড় করানো হল, ফের হাঁটু মুড়ে আমাকে বসতে বলল ওরা। আরবিতে প্রশ্ন করা হল, ‘নাম কী? আইডি নম্বর?’ 

আরেকজন সেপাই ইংরেজিতে বলল, ‘তুই তো অ্যাক্টিভিস্ট। হামাস, রাইট?’

‘আমি? কিছুতেই নই, কসম্! ২০১০-এ, ইউনিভার্সিটি যাওয়া শুরু করার পর থেকে আমি মসজিদে যাওয়াও ছেড়ে দিয়েছি। শেষ চার বছর তো মার্কিন মুলুকেই কাটিয়েছি। সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে এম এফ এ ডিগ্রি অর্জন করেছি সেদেশে।’

লোকটা বিশ্বাস করল না।

‘আমরা কয়েকজন হামাস সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছি়। তারা বলেছে, তুইও তাদেরই একজন।’

‘মিথ্যে বলেছে ওরা’, আমি প্রমান চাইলাম।

কানের তলায় থাপ্পড় মারল একটা। ‘তুই যে হামাস নোস, তুই-ই প্রমান কর।’

চারপাশ অন্ধকার তখন আমার। ভয়াবহ। আমি যা নই, কীকরে তার প্রমান দেব, দিতে হয়? অতঃপর আবার ওরকম ঠেলতে ঠেলতে কোথাও একটা নিয়ে যাওয়া হল আমায়। কী করতাম তখন? আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে ওরা?

জুতো খুলতে বলা হল। আমাদের একটা গ্রুপকে কোথাও একটা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ‍আলাদা করে। বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছিল পিঠে। ঝাপটা মারছিল কনকনে হাওয়া।

‘আমাদের মেয়েদের ধর্ষণ করেছিস তোরা’, কেউ একটা বলল। ‘খুন করেছিস আমাদের শিশুদের।’ কথাটা শেষ হতে না হ'তেই ঘাড়ে গর্দানে কিল-ঘুষি, পাছায় দমাদ্দম লাথি শুরু হল। ভারি বুট পায়ে। দূরে কামান গর্জে উঠছে, বাতাসে বয়ে আসা সে শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।

একজন একজন করে একটা ট্রাকে তোলা হ'ল আমাদের। ঠেসে দেওয়া হ'ল। আমার কোলের উপর একজন হুমড়ি খেয়ে পড়ল। লোকটা নিথর। তবে কি ওরা কোনও লাশ ছুঁড়ে দিল আমার গায়ে? এটাও কি অত্যাচারেরই কোনও কায়দা? ‘এই, বেঁচে আছো’, ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম।

‘আছি, ভাই!’ জানাল কোনোমতে। যাক, আশ্বস্ত হলাম একটু!

ট্রাকটা থামল যখন, কিছু আওয়াজ শুনতে পেলাম। গুলিরই আওয়াজ যেন! নিজের শরীরটারই অস্তিত্ব আর টের পাচ্ছিলাম না।কফিনের কথা আমার মনে পড়ছিল খুব, সেনাদের গায়ের গন্ধে। এরচেয়ে হার্টঅ্যাটাক, এক্ষুণি হার্টের অ্যাটাকে মরে যাওয়া শ্রেয়। মনে হচ্ছিল।
......…

পরবর্তী এই স্টপেজটিতে, ফের হাঁটু মুড়ে বসতে হ'ল আমাদের। সন্দেহ হ'ল, ইজরায়েলি মিলিটারিরা কি আটক বন্দিদের ছবি দেখাতে চাইছে দুনিয়াকে! আমার ঠিক পাশেই, আচানক্, কেঁদে কঁকিয়ে উঠল এক তরুন, ‘নো হামাস, নো হামাস!’ বেধড়ক লাথির আওয়াজ তারপর শুধু। যতক্ষণ না ছেলেটার কন্ঠস্বর সম্পূর্ণ নিভে গেল।

আরেকজন লোক, বোধহয় তাকেই বলল, ‘আমি আমার মেয়ে আর পোয়াতি বউটার কাছে যেতে চাই, প্লিজ!’

আমার চোখদু’টো ঝাপসা হয়ে এল। মারামের কথা, ছানাগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। চেকপয়েন্টের ও-পারে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা। একটা কম্বল, এমনকি যথেষ্ঠ কাপড়চোপড়ও নেই ওদের কাছে। কয়েকজন মহিলা-সেপাইয়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। হাসি-ঠাট্টা করছে নিজের মধ্যে।

আচমকা কে একটা ঘুষি মারল তলপেটে। উড়ে গিয়ে,খানিকটা দূরে, মাটিতে আছড়ে পড়লাম। শ্বাস রোধ হয়ে এল‌। আর্তনাদ করে উঠলাম আরবিতে। মা-গো।

হাঁটু মুড়ে বসতে বাধ্য করা হ'ল ফের। নাকে, মুখে ভারি বুটের লাথি পড়তে থাকল। মনে হচ্ছিল, আমি শেষ, যদিও দুঃস্বপ্ন কিছু বাকি থেকে গেছিল তখনও।

এমনই মারধোর খেয়েছি যে ট্রাকে ফিরে মনে হল, এই বাহু, এই হাতগুলো না-‍থাকলেই বরং ভালো হ'ত। এত ব্যথা! যা মনে হ'ল, নব্বই মিনিট মতোই হবে, চলল গাড়িটা। থামল। ট্রাক থেকে এক জায়গায় নামানো হ'ল আমাদের। ধাক্কা দিয়েই ফেলে দেওয়া হ'ল। একজন সেপাই প্লাস্টিকের হাতকড়াটা খুলে দিল। ‘দু'টো হাতই বেড়ার উপরে রাখ’, আদেশ করল।

এবার সে আমার হাতগুলো সামনের দিকে বাঁধল। খানিকটা স্বস্তি পেলাম। পনেরো মিটার মতো হাঁটিয়ে নিয়ে গেল। অবশেষে দেশি-ফিলিস্তিনীয়-আরবিতেই একজন কথা বললেন আমার সঙ্গে। লোকটা আমার বাবার বয়সী।

শুরুতে ওঁকে ঘৃণাই করেছি। কোলাবরেটর-ই মনে হয়েছিল। তবে পরে শুনলাম, নিজেকে শওয়িশ পরিচয় দিলেন ভদ্রলোক। (‘শওয়িশ' পূর্ব-জেরুজালেমের দামাস্কাস-গেট-এর সুপ্রাচীন এক ফিলিস্তিনীয় পরিবার। পরবর্তীকালে বাস্তুচ্যুত, অভিবাসিত।) শওয়িশ বংশোদ্ভূত লোকটি আমাদের মতনই বন্দি, তবে জেলারদের কাজকম্ম করে দেন ব'লে সামান্য কিছু স্বাধীনতা পান। বললেন, ‘তোমাকে কিছু সাহায্য করতে দাও।’

লোকটি আমাকে কিছু নতুন কাপড় পরতে দিলেন। বেড়ার ভেতরে হাঁটতে দিলেন। চোখে ফেটি বাঁধা ছিল, মাথাটা তুলতেই, একটা ঢেউ-খেলানো ধাতব ছাদের আবছা আভাস পেলাম। একটা ডিটেনশন সেন্টারেই আনা হয়েছে আমাদের। সেনারা আমাদের চারপাশে পায়চারি করছে, নজর রাখছে। শওয়িশ ভদ্রলোকটি যোগা-ম্যাটের মতন একটা জিনিস বিছিয়ে দিলেন আমার জন্যে, একটা কম্বলও দিলেন। বাঁধা হাতদু’টোকে মাথার পেছনে বালিশের মতো রাখলাম। ঘাড় থেকে কনুই অব্দি টনটন করছিল ব্যথায়, যদিও দেহে খানিকটা উষ্ণতা ফিরে এল। প্রথম দিনটা ফুরল এভাবে।


প্রকাশের তারিখ: ২৬-ফেব্রুয়ারি-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org