|
কবিতার সলিল এবং ‘শপথ’রজত বন্দ্যোপাধ্যায় |
তবু, সলিলের কবিতা আমাদের ভালো লাগে কেন? কারণ, তাঁর কবিতার সহজ চলন আমাদের আকর্ষণ করে। কঠিন বাস্তব যেমন তাঁর কবিতায় ধরা পড়ে ঠিক তেমনই-তাঁর হতাশা, ব্যর্থতা, প্রেম, যন্ত্রণা তারও প্রতিফলন আমরা সেখানে দেখতে পাই। মনে পড়ে যায় পাবলো নেরুদা-র কথা, ‘যে কবি বাস্তববাদী নন তিনি মৃত। আর যে কবি শুধুই বাস্তববাদী, তিনিও ততোধিক মৃত।’ বোধহয় সেইজন্যই সলিল চৌধুরীর কবিতা সময়কে অতিক্রম করে আজও আমাদের আলোড়িত করে। |
কবি ও কবিতা নিয়ে অজস্র উক্তি আছে। কেউ মনে করেন যে, সারা জীবনের অভিজ্ঞতা ও ক্ষণমুহূর্ত কবিতায় এসে মিলিত হয়। আবার কারো কাছে কবিতা রক্ত, কল্পনা ও মননের সম্মিলন। কেউ বা কবিতায় ‘শব্দের অভিযান’ প্রত্যক্ষ করেন, আবার অনেকের কাছে কবিতা যেন ‘ডকুমেন্টারি ভ্যালু’ নিয়ে উপস্থিত হয়। বিভিন্ন উক্তির মধ্যে আপাত-বিরোধিতা থাকলেও কবিতা যে মানুষের সঙ্গে মানুষের সংলাপ, যার মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় আমাদের অন্তর্লোক— এই সত্যকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। কবিতার ভাষা ও শরীর বদলে যায়, এমন কি, ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে কবিতার নিজস্ব ‘’উপভাষা’ও। কবিতার ঘর-সংসার নিজের ছন্দেই চলতে শুরু করে। সহজ ভাষায় লেখা কবিতাও তখন পাঠকের মনে আকাঙ্ক্ষিত অভিঘাত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। সলিল চৌধুরীর কবিতায় আমরা সেই অভিঘাতকে অনুভব করতে পারি। কখনও তা মৃদু, আবার কখনও-বা তীব্র। তিনি যখন লেখেন— “যখন অসহ্য হয় শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে মনে হয় এইবার ফেটে যাবে দম তখন আমার হয়ে শ্বাস ফেলে আমার কলম”। “আমার সময় নেই আজগুবি গল্প ফেঁদে সিম্বলিক কবিত্ব সাধার। অতএব ব্রাদার আমাকে মার্জনা কোরো আমি কোনো কবি নই তোমাদের দলে।” “আমাদের স্বপ্ন দেখা কতযুগ আগে শুরু হয়েছিল কত উত্তরাধিকার পার হয়ে কতনা অগ্রগতি কত ক্ষয়ক্ষতি শেষে আজকে এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়ে চেয়ে দেখি ষড়যন্ত্র বিদ্যুতের চমকানি অন্ধকার রাতে আজও হেনে যায়-- আজও মনে কেঁদে যায় অপূর্ণ একটি আশা--আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে, কত লক্ষ মুখ বেয়ে কত অশ্রু ঝরে গেছে কত নদী রক্তে লাল হয়ে গেছে কত ঘাম কত শ্রম অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের সমুদ্রের তীরে, আজও যারা কাজ করে, তারা ঢেলে গেছে কে তার হিসেব রাখে! সম্পদের পাহাড়ের আড়াল তৈরি হয়ে যুগ থেকে যুগান্তরে বণিকের রাজদন্ড হাত থেকে হস্তান্তরে হওয়ার পিছনে সেই-ই-- শ্রমজীবী মানুষের হাত।” ১৯৮২-তে লিখছেন এই কবিতা, তাঁর সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে। মনে পড়ে যায় ১৯৫০-এর আশেপাশে লেখা ‘একটি সম্পূর্ণ মহাকাব্য’-র পঙক্তি— “আমি শান্তি চাই। একথা যখন বলি- আমার এই শীর্ণ দুটো বাহু দিয়ে সারা পৃথিবীকে আলিঙ্গন যখন করি আমার পূর্বপুরুষের আমি হই উত্তরাধিকারী আমার গান তখন সূর্য হয়ে ওঠে।” আবার ‘মহাকাব্যের দলিল’-এর শেষে কবি যখন উচ্চারণ করেন— “এ দেশের মাটি এ দেশের জল এ দেশের যত কারখানা কল এ দেশের ক্ষেত মাঠ প্রান্তর এ দেশের মাটি কোটি অন্তর এ দেশের নদী তরুলতা বন এ দেশের ঘরে যত ভাইবোন দৃপ্ত আশার নবযৌবন সকলের হয়ে করো বিঘোষণ আর কোনোদিন এদেশে কখনো স্বৈরাচারের পিশাচিনী তার অট্টহাস্য হাসবে না” আমাদের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ১৯৪৮-এ তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে লেখা সলিলের অবিস্মরণীয় কবিতা ‘শপথ’। এক তাৎপর্যপূর্ণ সমাপতন। “দাড়ি টিকি ভাই ভাই লড়াইয়ের ময়দানে জাতিভেদ নাই।” ১৯৪৮-এর অক্টোবর মাসে তেভাগা অঞ্চল সুন্দরবনের কাকদ্বীপের চন্দনপিঁড়ি গ্রামের কৃষকবধূ অহল্যা অন্তঃস্বত্তা অবস্থায় পুলিশের হাতে নিহত হলেন। তেভাগা আন্দোলন ও এই ঘটনা মনে রেখে রচিত হল গান, কবিতা, নাটক, ছোটগল্প। সুকান্ত ভট্টাচার্য, বিষ্ণু দে, পূর্ণেন্দু পত্রী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, বিনয় রায় প্রমুখের কবিতা ও গান, অনিল ঘোষের নাটক, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প; বাংলার সাংস্কৃতিক মননে তেভাগার লড়াই যেন এক ঝড়ের সূচনা করল। এই প্রেক্ষিতেই সলিল রচনা করলেন ‘শপথ’। এই কবিতা পড়া বা বলার সময় এই ইতিহাস স্মরণে রাখতে হবে, অনুভব করতে হবে কৃষকের জীবন-যন্ত্রণা। “ভারতবর্ষ, তন্দ্রা ক্রমশ ক্ষয় অহল্যা! আজ শাপমোচনের দিন; তুষার জনতা বুঝি জাগ্রত হয়— গা-ঝাড়া দেবার প্রস্তাব দ্বিধাহীন। অহল্যা, আজ কাঁপে কী পাষাণকায়! রোমাঞ্চ লাগে পাথরের প্রত্যঙ্গে; রামের পদস্পর্শ কি লাগে গায়? অহল্যা, জেনো আমরা তোমার সঙ্গে!” সলিলের কবিতায় আন্তর্জাতিকতাবোধে নতুন পৃথিবীর মানচিত্র যেন রক্ত দিয়ে আঁকা হয়। কর্মকার, হাপর, ইস্পাত— সলিল ইঙ্গিত দেন শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর। উঠে আসে লালফৌজ, স্তালিনগ্রাদ-এর নাম। মনে রাখতে হবে,অল্প কয়েক বছর আগেই পরাভূত হয়েছে ফ্যাসিবাদ। সচেতনভাবেই সলিল ‘ফ্যাসিস্ট দস্যু’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন। একটি কবিতার জন্ম হয়। প্রকাশের তারিখ: ২৮-জুন-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |