ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে প্রাকৃতিক দৃশ্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য

নবারুণ চক্রবর্তী
ঋত্বিকের ছবিতে প্রাকৃতিক দৃশ্য অবশ্যই পুঁজিবাদ ও পাশ্চাত্য যন্ত্রসভ্যতার অন্ধকারাচ্ছন্নতার বিরোধী, তবে কোনো সরল জটিলতাহীন মায়াময় অতীতে ফিরে যাওয়ার প্রগতি বিরোধী আহ্বান ঋত্বিক জানাননি। বরং, মানবসভ্যতা ও প্রকৃতির মধ্যে অনুভূতিগত যোগাযোগের দিকে তাকিয়ে সম্প্রদায়গত বিভাজন ও পরিসরের মধ্যে যে এত হিংসা, দ্বেষ, আর যাতনা লুকিয়ে আছে, তারই মধ্যে অখণ্ডতা খুঁজতে চেয়েছেন, চেয়েছেন বিভাজনের পরেও টিকে থাকা অখণ্ডতার স্মৃতিকে উস্কে তুলতে। স্মৃতি ঘটনাচক্রে অনন্ত শক্তিশালী, বিভাজিত রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে অখণ্ডতার স্মৃতিকে হাতিয়ার করেছেন ঋত্বিক।

প্রাকৃতিক দৃশ্য সাহিত্য, চিত্র, চলচ্চিত্রসহ শিল্পের প্রায় প্রতিটি প্রকাশভঙ্গিতেই বিশেষ অর্থকরণের জন্য ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা চলে, ফরাসী বিপ্লবের পরবর্তীতে ইংরেজ রোমান্টিক পর্বের বেশিরভাগ কবি ও গদ্যকারেরা যন্ত্রসভ্যতার অনুষঙ্গে চলে আসা জটিলতার মোকাবিলায় প্রকৃতির দিকে মুখ ঘোরানোর স্লোগান দিয়েছিলেন, জন্ম হয়েছিল প্যান্থেইজম বা প্রকৃতি-পুজোর। ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে অবশ্য প্রাকৃতিক দৃশ্যের ব্যবহার আদ্যোপান্তভাবে রাজনৈতিক বার্তাবাহী। প্রকৃতিপ্রেমের সরলতা থেকে অনেক ধাপ এগিয়ে, ঋত্বিক প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ভারতীয় উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় - বিশেষত সাম্রাজ্যের সমাপ্তিতে দেশ বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে অর্থ প্রদান করেছেন। সৃষ্টি করেছেন শৈল্পিক প্রতিবাদের এক নতুন অধ্যায়। 

ঋত্বিকের বড় হয়ে ওঠা অবিভক্ত বাংলায়, ঔপনিবেশিক ভারতে, তবে, ঔপনিবেশিক আধুনিকতা বা মর্ডানিটির যে ছোঁয়া শহর কোলকাতার গায়ে লেগেছিল, তা থেকে অনেক দূরে, ঐতিহ্য যেখানে স্থির হয়েছিল অনেক কাল যাবৎ, সেই গ্রামীণ নদীমাতৃক পূর্ববঙ্গে, প্রকৃতির কাছাকাছি, যেখানে সাম্রাজ্যের ও যন্ত্রসভ্যতার মুঠো থেকেছে আলগা, বরাবর। অবিভক্ত বাংলা তাঁর শিল্পবোধের প্রাণকেন্দ্রে রয়ে যাওয়ার মূল কারণ সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিতে থেকে যাওয়া প্রাকৃতিক পরিসর। সাধারণভাবে, সৃষ্টিশীলতা, শিল্প ও অবিভক্ত বাংলার যৌথ স্মৃতির যোগাযোগের নিরিখেই তাঁর ছবিতে প্রাকৃতিক দৃশ্যের প্রাসঙ্গিকতা, তবে আমার মনে হয় প্রাকৃতিক দৃশ্য ক্ষমতাকে প্রশ্ন করবার ক্ষেত্রেও বাঙ্ময়তা অর্জন করেছে। আশিস রাজাধক্স দেখিয়েছিলেন ঋত্বিকের ছবি মিথকে ভেঙে ফেলার জন্য প্রযুক্ত হয়েছে। মিথ বলতে আশিস বুঝেছিলেন: এমন কিছু ধারণার সমাহার যা সময়ের মধ্যে দিয়ে প্রশ্নাতীত সত্যিতে রূপান্তরিত হয়েছে, এমন কিছু ছবি যা নির্দিষ্ট সংস্কৃতি পরিসরে সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্পূর্ণ সমর্থন পেয়েছে। ব্রেখট বলবেন এই মিথ প্রশ্নের মুখে পড়ে যখন আধিপত্যকারী দৃষ্টিকোণ ও আধিপত্যকারীর মধ্যে সম্পর্ক রচনায় নিয়োজিত হয় শিল্প। আমার মনে হয় প্রাকৃতিক দৃশ্যের ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে ঋত্বিক তাঁর চলচ্চিত্রে জাতীয় উন্নতি ও প্রকৃতি-বিচ্ছিন্নভাবে সভ্যতার অগ্রগতির যে মিথ ঔপনিবেশিকতা ও তৎপরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে নিহিত আছে, তাকে আক্রমণ করেছেন। পাশাপাশি সেই আক্রমণের নিশানা হয়ে দাঁড়িয়েছে সীমান্ত, যান্ত্রিক সময়, এবং সেই সাথে ঔপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ শোষণের চলমানতার অনুষঙ্গে, শ্রেণি, লিঙ্গ, ও অন্য নানাবিধ বিভাজন রেখা, যা জাতিরাষ্ট্রের দেহে অদৃশ্যভাবে কার্যকর থাকে।

দেশভাগের পরবর্তীতে হাজার হাজার উদ্বাস্তুর সাথে ঋত্বিক দেখেছিলেন কীভাবে চিরকালের চেনা মাতৃভূমি চোখের নিমেষে রাজনৈতিক ও আরো অনেকানেকভাবে অচেনা হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষের হৃদয়বিদারক দেশভাগের বেদনার গ্রহীতাদের মধ্যে ব্যক্তি ঋত্বিক নিজেও আছেন। এই বোধ অবশ্যই কেবল বস্তুগত জমি, বাস্তুভিটা, অর্থ ও মানবসম্পদ হারানোর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়নি। একই সাথে খোলা আকাশ, সোনালী ধান, নদী, মাছ, আরো অনেকানেক হারানোর বোধে সম্পৃক্ত হয়ে আছে প্রকৃতি। এই চেনা পরিবেশের সাথে আবাল্য যে সংযোগ দেশভাগের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তার ফলশ্রুতিতেই কোমলগান্ধার ছবিতে অনসূয়াকে ভৃগু সেই ট্রেন লাইনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখাচ্ছে দূরের দিগন্ত, বলছে ওই পারে আমার দেশ। দেশ আর আমির মাঝখানে এখানে চলে আসে বহমান সময়ের প্রতীক নদী, যা আবার রাষ্ট্রের সাথে সংশ্লিষ্ট সীমান্তও বটে। ভৃগু কার্যত অস্বীকার করতে চায় রাষ্ট্রীয় বিধি, সীমান্ত না পেরোবার নির্দেশ, আর সেখানেই প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিস্তৃতি প্রশ্ন করতে চায় বিভাজনকে, জুড়ে থাকবার স্মৃতিতে ডুব দিয়ে ঋত্বিকের চরিত্রেরা যে দৃশ্যপটে নিজেদের স্থাপন করে সেখানে বিভাজন হয়ে পড়ে অবান্তর। এক্ষেত্রে প্রশ্ন করবার মাধ্যম অ্যাফেক্ট, আর যে বিভাজনকে প্রশ্ন করা হচ্ছে তা যতটা জাতিরাষ্ট্রের ততটাই অতীত ও বর্তমানের মধ্যেকার। দুই বিভাজন পেরিয়ে যেতেই,অবিভক্ত বাংলার দৃশ্যপটের ব্যবহার। পেরিয়ে যাওয়া যদি বাস্তবে না'ও হয় অন্তত শিল্পের বিকল্প সময়-পরিসরে তার সাফল্য আছে। আছে‌ পেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে। 

ঋত্বিকের নাগরিক ছবিতেও উমা ও রামু দেশভাগ পরবর্তী কোলকাতায় দিন গুজরানের অবসরে আনন্দময় এক ভবিষ্যতের দিন বুনতে থাকে। এই কল্পনার সার সংগ্রহ করা হচ্ছে অবশ্য সবুজে ভরপুর ফেলে আসা স্মৃতি থেকে। স্মরণ ও কল্পনা উভয়েরই বিষয় হয়ে ওঠে প্রকৃতি। দাঙ্গা ও দেশভাগ পরবর্তী কোলকাতায় দাঁড়িয়ে এই অপরূপ মায়াময় ভবিষ্যতের ছবি ঋত্বিক আঁকছেন ১৯৫২ সালে - অতীত চিত্রিত হচ্ছে, জুড়ে যাচ্ছে ভবিষ্যতের সাথে, আর এই স্মরণ ও কল্পনা দুটি ক্রিয়ারই তর্জনী উত্থিত বর্তমানে স্থানচ্যুত জনতার প্রতি ঘটে চলা নিপীড়নের বিরুদ্ধে, শহরে তাদের বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধে। ঠাঁইনাড়া অস্তিত্ববোধের কমতিটুকু পূরণ করতে ফেলে আসা ও কল্পিত সময় পরিসর ভূমিকা পালন করতে থাকে এ ছবিতে।

অযান্ত্রিক ছবি যদি সরাসরি দেশভাগের ক্ষতকে বহন নাও করে থাকে, বৃহত্তর বিহার প্রদেশের প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপটে আধিপত্যকারী সভ্যতার সংজ্ঞার বিপক্ষে গিয়ে মানুষ, প্রকৃতি ও যন্ত্রের সম্পর্ক ঘিরে আবর্তিত হয় এই ছবি। যন্ত্র এ ছবিতে মানবিক গুণাবলী অর্জন করে। পাশাপাশি, প্রকৃতি আর আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার যুগপৎ উপস্থিতি জেমস ক্লিফোর্ডের মর্ডানিস্ট কোলাজের কথা মনে করিয়ে দেয় - নিঃসঙ্গ জনজাতির মহিলা দাঁড়িয়ে থাকেন কারখানার দরজায়, বিমলের জগদ্দল চলতে থাকে রুক্ষ ছোটনাগপুরের পথ ধরে। যে বাচ্চাটি জগদ্দলের বাতিল হর্ণটা নিয়ে খেলছে, বিমলকে সে মনে করিয়ে দিতে থাকে প্রাক-আধুনিক সময়ে যন্ত্রের সাথে মানুষের বিচিত্র সম্পর্ক, যে সম্পর্কের রেশ আমাদের অধুনা সময়েও কৃত্রিম মেধা ও মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এভাবেই অযান্ত্রিক আমরা লক্ষ্য করে থাকব, হয়ে ওঠে মানুষের প্রকৃতি বিচ্ছিন্নতা ও যন্ত্র-নির্ভরশীল জীবনের গাথা। 

ঋত্বিকের ছবিতে প্রাকৃতিক দৃশ্য অবশ্যই পুঁজিবাদ ও পাশ্চাত্য যন্ত্রসভ্যতার অন্ধকারাচ্ছন্নতার বিরোধী, তবে কোনো সরল জটিলতাহীন মায়াময় অতীতে ফিরে যাওয়ার প্রগতি বিরোধী আহ্বান ঋত্বিক জানাননি। বরং, মানবসভ্যতা ও প্রকৃতির মধ্যে অনুভূতিগত যোগাযোগের দিকে তাকিয়ে সম্প্রদায়গত বিভাজন ও পরিসরের মধ্যে যে এত হিংসা, দ্বেষ, আর যাতনা লুকিয়ে আছে, তারই মধ্যে অখণ্ডতা খুঁজতে চেয়েছেন, চেয়েছেন বিভাজনের পরেও টিকে থাকা অখণ্ডতার স্মৃতিকে উস্কে তুলতে। স্মৃতি ঘটনাচক্রে অনন্ত শক্তিশালী, বিভাজিত রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে অখণ্ডতার স্মৃতিকে হাতিয়ার করেছেন ঋত্বিক। 

সুবর্ণরেখা ছবির গোড়ায় বাউলের দল এই অখণ্ড মানচিত্রের বাহক, তাদের ধর্মনিরপেক্ষ জীবন ও সীমান্তভেদী গান দিয়ে শুরু হয়ে এ ছবি আমাদের নিয়ে আসবে সীতার আপাত বালখিল্য কিন্তু অতলস্পর্শী প্রশ্নে: কোলকাতার পথে যাত্রা করে সে জিজ্ঞেস করে বসবে ঈশ্বরকে সেখানে নীল পাহাড় আছে? আছে ফুল পাখি প্রজাপতি? নতুন বাড়ির খোঁজে যাত্রা করে এই প্রশ্নে আমাদের মনে পড়তে বাধ্য Poetics of Space বইতে ব্যাচেলার্ডের উক্তি: "whenever life seeks to shelter, protect, cover or hide itself, the imagination sympathises with the being that inhabits.” ঘর খোঁজার পথের এই কল্পনায় হারানো ঘরের স্মৃতিকে কীভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন ঋত্বিক, বুঝতে পারা যায় রবি ঠাকুরের গানের অদ্ভুত ব্যবহারে। সীতা গায় : "আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়..." যে গান ক্রমশ আমাদের অন্তরায় শোনাবে: ওরে  যাব না আজ ঘরে রে ভাই, যাব না আজ ঘরে /ওরে, আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ নেব রে লুট ক'রে"। চেনা গান, অচেনা অর্থ। পরিচিত ঘর ছেড়ে বাহিরকে ঘর করে নেওয়ায় উদ্বাস্তু জীবনের কথা চিরন্তনতায় পর্যবসিত করেছেন ঋত্বিক, এই গান প্রায় থিম সঙের মতো পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে পরেও - বিনু, সেই বাচ্চা ছেলেটি সে আবার এই গান গেয়ে ঈশ্বরকে পরে জিজ্ঞেস করবে নতুন ঘর কি মা যেমন বলেছেন তেমন হবে? ঈশ্বর এবার উত্তর দেবে, জানাবে, হ্যাঁ। স্মৃতির ঘর, কল্পনার ঘর আর বাস্তবের ঘর হয়তো সমাপতিত হয় না ছবিতে, কিন্তু বাস্তবকে কল্পনাশ্রয়ী স্মৃতির কাছাকাছি নিয়ে আসবার এই ইতিবাচক প্রকল্প কি বৈপ্লবিক নয়? কল্পনার ঘরের বীজতলা যদি হয় ফেলে আসা ঘরের আর ঘরোয়া বাহিরের স্মৃতি, অকল্পনীয় দূরত্ব সত্ত্বেও বিভাজিত দেশের মানচিত্রের মধ্যে কি ঢুকে পড়ে না সীমান্তহীন পৃথিবীর স্বপ্ন? পড়ে। নেতি'র নটবরেরা বলবেন, সীমান্ত অপরিবর্তনীয়। এও ঠিক যে স্বপ্ন বাস্তবিক পরিবর্তন আনে না, তবে স্বপ্ন পরিবর্তনের সূচনা বিন্দু বটে। 

অন্যদিকে, রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি ঋত্বিক ব্যবহার করেছেন লোকসঙ্গীত, যে গান স্বভাবতই প্রকৃতির সামীপ্যবর্তী। দেশভাগ সংক্রান্ত তিনটি ছবিতেই লোকসঙ্গীতের ব্যবহার করা হয়েছে, মেঘে ঢাকা তারা এবং কোমলগান্ধারে বোধহয় তা বেশি প্রকট। শুরু থেকে কোমলগান্ধার ছবিতে নেপথ্য সঙ্গীত হিসাবে বাজতে থাকে: "আমের তলায় ঝুমুর ঝুমুর"। পূর্ববঙ্গীয় বিয়ের গান। ছবিতে এমন কোনো গ্রাম্য বিয়ের দৃশ্য অবশ্যই নেই। বরং এই গান ব্যবহার করা হচ্ছে দেশ অথবা নাটকের দল বিভাজিত হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সংযুক্তির বার্তা দিতে। আবার, মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে রণেন রায়চৌধুরীর "মাঝি তোর নাম জানি না" ব্যবহার করা হয়েছে। যে অসংখ্য মানুষ নদীর বা সীমান্তের একটি দিকে দাঁড়িয়ে অজ্ঞাত পরিচয় কিন্তু সমমনোভাবাপন্ন ব্যক্তিদের ডেকে নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি করার ইচ্ছে সত্ত্বেও, পেরে উঠলেন না, তাঁদের আন্তরিক বেদনা প্রকাশিত হয়েছে এই গানে। বেদনার ভাষা গানের কার্যত প্রশ্ন ছুঁড়তে চায়, কিন্তু সবসময় সেই প্রশ্ন কার প্রতি নিবদ্ধ তা জানা নেই, ঋত্বিকের চরিত্রের মতোই "I accuse..." বলে তা থেমে যেতে বাধ্য। ব্যক্তি চরিত্রের 'অজানা' অবশ্যই সার্বিকভাবে এই সমস্ত ছবির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অতীত ও দেশভাগ পরবর্তী রাজনৈতিক বর্তমানের মধ্যে সম্পর্কের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না। ভাটিয়ালির তালবিহীন ঢালা সুর বরং মাঝির দুই দেশের মাঝে চলাচলের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে চায় দুই তীর, যা ইতোমধ্যেই আলাদা আলাদা দেশের অংশ। 

পাশাপাশি, এও লক্ষ্য করতে হবে ঋত্বিকের প্রায় সমস্ত ছবিতেই নদীকেন্দ্রিক ভূখণ্ডের বিশেষ ভূমিকা আছে। প্রাকৃতিকভাবে নদী ও ভূমি বাংলা বদ্বীপে স্বভাবতই সংযুক্ত। সভ্যতার অসুস্থতার কারণে তা বিভাজিত করা - পৃথগন্ন বলে চিহ্নিত করা, দেবযানী ভট্টাচার্য ব্যাখ্যা করেছিলেন ঔপনিবেশিক প্রকল্প হিসাবে:  "Landmasses in bays and coastal areas have a different relation with water. The landmass flows, moves, and challenges the fixities of cartography, ownership and territorial sovereignty." আমার মনে হয়, ভাটিয়ালি গান, প্রকৃতি পর্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত, প্রাকৃতিক দৃশ্য --- এই সমস্ত উপাদানকে একত্রিত করে ঋত্বিক প্রকৃতপ্রস্তাবে সাম্রাজ্যবাদ ও তার হুঁকোবরদার জাতিরাষ্ট্রের মানচিত্রায়ন, এলাকাগত ক্ষমতায়ন ও বিভাজনের প্রকল্পের গালে সজোর চপেটাঘাত করেছেন, আর তা করবার জন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য ও তার ইঙ্গিতকে ঋত্বিক করে‌ তুলেছিলেন সংযুক্তির বার্তাবাহী। বিভাজিত ভূখণ্ড তাঁর চলচ্চিত্রে যেন নিজেই বিষয়ী হয়ে কাঁটাতার মুছে ফেলতে চায়। বহুলাংশে তা কল্পনাশ্রয়ী হতে পারে, হতে পারে আশাবাদী, তবে তা খুলে দেয় অপার সম্ভাবনার রাজত্ব। এখানেই ঋত্বিকের ছবিতে অখণ্ডতার স্মৃতি খণ্ডিত বর্তমানকে প্রভাবিত করে আসলে জন্ম দিয়েছে এক নতুন পরিবেশচেতনা এবং বিকল্প ইতিহাসবোধ, পরিবেশাশ্রয়ী এক বিশিষ্ট "অতীতরতি", যা আধিপত্যবাদী সত্যাশ্রয়ী ইতিহাস ও ছিন্নভিন্ন মানচিত্রের সাথে চিরন্তনভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। যা চায় নতুন ইতিহাস লিখতে, সংযুক্তির ইচ্ছেপোষণের ইতিহাস।


প্রকাশের তারিখ: ১৪-জানুয়ারি-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org