|
রাজনীতিবিদ সীতারামের অভাব বোধ করবে বিরোধী পক্ষসি পি চন্দ্রশেখর |
দলের প্রতি এবং দলের মতাদর্শের প্রতি তাঁর আনুগত্যে কোনও ফাঁক ছিল না। মতাদর্শে স্থিতধী থেকেও তিনি একথা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতীয় রাজনীতির পরিসরে সক্রিয় গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সঙ্গে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখাতে হবে। নতুন নতুন মিত্র খোঁজা, তাদের সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের একটা অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্য বোঝানো, যে কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত রয়েছে বামপন্থীদের নীতিসমূহ ও মূল্যবোধ– এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইয়েচুরির সামগ্রিক লক্ষ্য। |
হঠাৎ করে পথচলাটা থেমে গেল। থেমে গেল বড্ড বেশি তাড়াতাড়ি। তবে এই সময়ের মধ্যেই এদেশে জরুরি অবস্থার পরবর্তী পর্বে বামপন্থীদের রূপান্তর, এবং সেই প্রক্রিয়ায় ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন ভাষ্য তৈরি করা ও তার অনুশীলনে সীতারাম ইয়েচুরি রেখে গেলেন তাঁর বিপুল অবদান। সীতা (বন্ধুমহলে তিনি এই নামেই পরিচিত ছিলেন) ছাত্র থেকে পার্টির রাজনীতিতে স্নাতক হয়েছিলেন। জরুরি অবস্থার সময়কার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাই ছিল সেই স্নাতক হওয়ার পথে তাঁর রাজনৈতিক পুঁজি। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে, এই কথাটা তিনি গভীরে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন। দেশে একদলীয় শাসনের আধিপত্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। ফলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র এবং বামপন্থীদের রণনীতি ও রণকৌশল নিয়ে আলোচনায় খুব দ্রুতই মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। রাজনৈতিক জীবনে বহু গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশি উত্তাল, ঝোড়ো ও নজরকাড়া পর্বে তিনি ছিলেন ওই ইউনিয়নের সভাপতি। ছিলেন ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিট ব্যুরোর সদস্য, পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান, পার্টির সাধারণ সম্পাদক, পার্টির সাপ্তাহিক পত্রিকা পিপলস ডেমোক্রেসি ও দলের তাত্ত্বিক পত্রিকা দ্য মার্ক্সসিস্ট-এর সম্পাদক। এবং রাজ্যসভার সদস্য। এছাড়া আরও কত কী বিষয় ছিল, যেখানে তিনি তাঁর অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু হায়, সে সব আর হল না। সিপিআই(এম)-র সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলিতে পৌঁছে যাওয়া এবং তারপর দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়া, এসবই রাজনীতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এবং তাঁর কাজের ধরনকে প্রভাবিত করেছিল। দলের প্রতি এবং দলের মতাদর্শের প্রতি তাঁর আনুগত্যে কোনও ফাঁক ছিল না। মতাদর্শে স্থিতধী থেকেও তিনি একথা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতীয় রাজনীতির পরিসরে সক্রিয় গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির সঙ্গে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখাতে হবে। সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ভারতের রাজনীতি যখন স্বৈরাচারের দিকে বাঁক নিল, এবং এই পর্বে যেসব শক্তি সংখ্যাগুরুদের অ্যাজেন্ডায় মদত দিয়ে একদলীয় শাসন ও আধিপত্যে ফেরাটা নিশ্চিত করতে চাইছিল, সেই পরিস্থিতিতে তাঁর নমনীয়তা সংক্রান্ত উপলব্ধি আরও জোরদার হয়েছিল। নতুন নতুন মিত্র খোঁজা, তাদের সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের একটা অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্য বোঝানো, যে কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত রয়েছে বামপন্থীদের নীতিসমূহ ও মূল্যবোধ– এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইয়েচুরির সামগ্রিক লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পার্টির তরফে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসাবে তাঁর অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তিনি যা শিখেছিলেন, সেগুলিকেই তিনি প্রয়োগ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। সারা বিশ্বে বামপন্থীদের যা কিছু সাফল্য ও ব্যর্থতা তা থেকে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন সেই সব উপকরণ, যেগুলিকে কাজে লাগিয়েই ভারতে কী করতে হবে সে বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছিলেন। এই সব দায়িত্বগুলি সত্যিই খুবই ভারবহ। চূড়ান্ত ভদ্র, মুগ্ধ করার মতো বালকসুলভ এক আকর্ষণ, সুরসিক এবং অন্যদের সম্পর্কে তীক্ষ্ণ বোধ, এসব গুণে গুণান্বিত সীতা অনায়াসেই পার্টির ভিতরে ও বাইরে তাঁর অনুরাগীদের জড়ো করে ফেলতে পারতেন। জেএনইউ-তে সেন্টার ফর ইকনমিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্ল্যানিং-এ এমএ-র প্রথম ব্যাচে (১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫) খুবই অল্প সংখ্যক ছাত্র ছিল। তাঁদের মধ্যে সীতা শুধুমাত্র সবচেয়ে উজ্জ্বল ছাত্রই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এমন ছাত্র যিনি সবার মুখে হাসি ফোটাতে পারতেন। এই সব গুণের সঙ্গে এসে মিশেছিল তাঁর প্রখর বুদ্ধি, এবং তার ছাপ পাওয়া যেত তাঁর অ্যাকাডেমিক কেরিয়ারের রেজাল্টে। ঝোড়ো ও উথাল-পাতাল রাজনীতির জন্য সেই কেরিয়ারও তিনি বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল তীক্ষ্ণ। বিশ্ব তথা ভারতের ইতিহাস, কমিউনিস্ট ঐতিহ্য থেকে বলিউডের সঙ্গীত, ছোটোবেলায় শেখা সংস্কৃত শ্লোক– এধরনের সমস্ত আলোচনায় তাঁর সেই প্রখর স্মৃতিশক্তির পরিচয় পাওয়া যেত। এই সব গুণগুলিই কমিউনিস্ট নেতা হিসাবে তাঁর নিজস্ব স্টাইল গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। এই গুণগুলির জন্যই তিনি পার্টির ক্যাডারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্তরে সংযোগ ও সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। পার্টি পরিবারের প্রতিটি সদস্যের সম্পর্কে তিনি খোঁজ রাখতেন। সবার জন্যই ছিল তাঁর সমান উদ্বেগ। এবং পরিস্থিতির ডাকে সাড়া দিয়ে সহানুভূতি জানানোর জন্য তিনি সবমসয় সবার পাশে থাকতেন। যখন পার্টি সীতাকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল, তখন একথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে তাঁর দক্ষতার জোরেই তিনি হয়ে উঠবেন একজন আদর্শ সাংসদ, আয়ত্ত করবেন রাজ্যসভার নিয়মকানুন, বাগ্মী হিসাবে তাঁর কুশলতার পরিচয় দেবেন, এবং যেসব ইস্যু তিনি বেছে নেবেন সেই ধরনের বহু বিষয়ে তিনি মিত্রদের নিজের পক্ষে জয় করে আনতে পারবেন। এই কাহিনি চালু রয়েছে যে, মানুষকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা এবং যে পটভূমি থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন– সেসব বিবেচনা করে ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরা প্রায়ই একথা বুঝে উঠতে পারতেন না যে, কেন তাঁর মতো দক্ষ একজন ব্যক্তিত্ব বিরোধী বেঞ্চে বসে বামপন্থীদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেষি করছেন। সিপিআই(এম)-র প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক হরকিষেণ সিং সুরজিৎ ছিলেন সীতার অন্যতম পরামর্শদাতা। নানা বিষয়ে দক্ষতা ছিল তাঁর। এটা মোটেই অবাক করার মতো বিষয় নয় যে, সীতা সুরজিতের কাছ থেকে সেসব শিখেছিলেন। এবং সেই গুণাবলি কাজে লাগিয়েই বিরোধী জোট গড়ে তোলার কাজে তিনি নিজেই একটি শক্তি হয়ে উঠেছিলেন। পক্ষপাতহীন ও স্বাধীন অংশগ্রহণকারী হিসাবে সবাই তাঁকে বিশ্বাস করতেন। বিরোধী জোট গড়ে তোলার কাজে তিনি বুঝতেন অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের কোথায় সমঝোতা করা দরকার এবং কোথায় অবশ্যই তা করা উচিত। আর এই কাজে যথেষ্ট দক্ষ ছিলেন সীতা। ভারতে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই ধরনের জোট ক্রমশ বেশি বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই কারণেই শুধুমাত্র সিপিআই(এম) ও বামপন্থীদের বৃত্তেই তাঁর অভাব অনুভূত হবে না, তাঁর অভাব অনুভূত হবে বৃহত্তর রাজনৈতিক জগতেও। আমরা যারা তাঁর বন্ধু, আমরাও তাঁর অভাব বোধ করব। একজন ব্যক্তি যিনি জনজীবনে এত কিছু বদলে দিয়েছেন এবং নিজে এতকিছু অর্জন করেছেন, অথচ ঘনিষ্ঠ বৃত্তে রয়ে গেছেন সেই একই সীতা হয়ে– তেমন একজনের শূন্যতা আমাদেরও ঘিরে থাকবে। সংক্ষেপিত, শিরোনাম মার্কসবাদী পথের প্রকাশের তারিখ: ১৪-সেপ্টেম্বর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |