আমিষ ‘আউট’, প্রসাদ ‘ইন’– মিড ডে মিলের রাজনীতি: ১ম পর্ব

অরিজিৎ মুখার্জি
ভারতের খাদ্যাভ্যাসের প্রেক্ষাপটে, এবং বিপুল পরিমাণে সরবরাহের কথা মাথায় রেখে দেখলে ডিমই এককভাবে সবচেয়ে কার্যকরীভাবে সব থেকে বেশি প্রোটিনের যোগান দেওয়ার মত খাবার। একটা ডিমে ছয় গ্রাম প্রোটিন থাকে; পাশাপাশি আসে মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক ডিএইচএ (DHA), অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন বি-১২ এবং হিম (heme) আয়রন (যা শরীর সবচেয়ে সহজে নিতে পারে)। এগুলোর কোনোটাই অন্য উপায়ে, বিশেষ করে আরো কম খরচে উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবারের মধ্যে পাওয়া সম্ভব নয়। বিকল্প থাকলেও বাস্তবে সেগুলো ডিমের সমান নয়। উদ্ভিদজাত প্রোটিন হলে, আপনাকে পরিমাণে বেশি খেতে হবে, তার সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান - কোনটা কী মেশাচ্ছেন, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কাজেই, খরচ বেড়ে যায়, দরকার হয় আরো সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার - গণখাদ্য কর্মসূচীতে এই ধরণের লাক্সারি থাকে না।

আমাদের দেশের মিড-ডে মিল প্রকল্প নিয়ে আমরা গুরুগম্ভীর স্টাইলে এমন কথা বলতেই পারি যা শুনলে মনে হবে পুরো ব্যাপারটাই বেশ পরিপাটি আর প্রশাসনিক দক্ষতার শিখর। যেমন ধরুন, চাইলে শুরু করা যেতে পারে সুপ্রীম কোর্টের ২০০১ সালের রায়ের কথা বলে, যেখানে খাদ্যের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, বলা হয়েছিল সরকারি স্কুলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্যে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা সরকারের দায়। শুনে মনে হতে পারে গোটা বিষয়টাই সুশৃঙ্খল, সাজানো গোছানো, পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক, এবং সাংবিধানিক ব্যাপার।

বাস্তবে, এই প্রকল্পের রূপ ঠিক সেরকম নিখুঁত নয়।

বিচারব্যবস্থা আর নিয়মনীতির গন্ডি পেরিয়ে এসে তাকালে দেখতে পাব যে এই মিড-ডে মিল প্রকল্পের একটা আলাদা অস্তিত্ব রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই; আর তার সঙ্গে জুড়ে থাকা আরো অজস্র অনুষঙ্গ; স্কুলের উপস্থিতির খাতায়; বেঁচে থাকা কিছুটা খাবার ভরা একটা বাক্স বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে থাকা ছোট্ট হাতের মুঠোয়; সারাদিন অভুক্ত থেকেও ক্ষিদে না পাওয়ার ভান করে থাকা সেইসব মায়েদের মুখে।

প্রিভিলেজড আমি অবাক চোখে দেখি যে আজও, এই "ভিকসিত" ভারতেও, অভাবী পরিবারের লক্ষ লক্ষ শিশুর ক্ষেত্রে এই এক বেলার মিড-ডে মিলই তার সারাদিনের একমাত্র নিশ্চিত পেটভরা খাবার। এই খাবার বন্ধ করার কথা বলা বা পরিমাণ কমানোর কথা বলা মানে আপনি শুধু নীতিই বদলাচ্ছেন না, বরং একটা পরিবারের টিঁকে থাকার সূক্ষ্ম ভারসাম্যটাকেও নষ্ট করছেন। 

অক্ষম রাগ হয় যখন এই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও একজন শিক্ষিকাকে বলতে শুনি -

“না খাওয়ার জ্বালা জানেন? দেখেছেন না খেতে পেলে কেমন লাগে? কোনোদিন বাড়িতে রান্না হয়নি বলে সকাল থেকে পেট চেপে স্কুলে গেছেন, দুপুরের ভাতটুকুর ভরসায়? আমি দেখেছি। দুপুরে স্কুলে ভাত না থাকলে স্কুলে আসার বিলাসিতা না করে তাকে কারখানায় যেতে হতো দুটো পয়সা রোজগারের জন্য, এমন শিশু আমি দেখেছি। আমি দেখেছি শিশুর মিড ডে মিলের থালা থেকে মাকেও এক গ্রাস লুকিয়ে মুখে তুলতে, কারণ বাড়িতে রান্না হয়নি। কত অভাবে সন্তানের থালা থেকে মা তুলে খায়, জানেন? কপাল ভালো আপনাদের যে এইসব জানতে হয় না।

যেদিন ইশকুলে ডিম হয়, সেদিন "আজ কিন্তু ডিম" শোনার পর বাচ্চাদের "ইয়েএএএ" বলে লাফিয়ে ওঠা, দেখেছেন কখনো? বরাদ্দ একটা ডিম, সেটাই লুকিয়ে ব্যাগে ভরে নেওয়া, তাহলে বাড়িতে কোলের ভাইটাও এক কামড় পাবে, দেখেছেন?”

মিড-ডে মিলে ডিম দেওয়া বা না-দেওয়ার তর্কের শুরু এইখান থেকেই। নীতি বা পদ্ধতির নথিতে নয়; ছোট ছোট এই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে।

তবুও, অদ্ভুত সব আপত্তি ভেসে আসে পরিচিত স্টাইলে। অনেক ক্ষেত্রে চেনা মুখ থেকেই।

"ও, তার মানে ওরা শুধু স্কুলে খেতেই আসে? পড়াশোনা করতে আসে না?”

বেশ দৃঢ় ভাবেই কথাটা বলেন আপনি। তখন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখতে পাই, যে এই তীব্র ক্ষিদের জ্বালা আপনাকে ভোগ করতে হয়নি কখনও। আপনার এই একটা কথা নীরবে সমস্ত বাস্তবতাকে উল্টে দেয়।

আপনি ভুলে যান, যে ক্ষিদের জ্বালা সহ্য করে অপুষ্টিতে ভোগে যে শিশুর শরীর, তার জন্যে শুরুতেই ইস্কুলের পড়াশোনা করার প্রশ্নটা উঠে আসে না। আরও তাৎক্ষণিক একটা ঘাটতি রয়েছে তার শরীরে। এই চাপা ক্ষিদে তার কাছে শুধুমাত্র ডিস্ট্র্যাকশন নয়; তার বাস্তবতা। এই অবস্থায় খাবারটা তার কাছে ইনসেন্টিভের চেয়েও বড় কিছু; তার শিক্ষার ভিত তৈরী করার প্রথম উপকরণ ওই এক বেলার পেটভরা খাবার। 

মিড-ডে মিলের একটা ডিম ঠিক এইখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শুধু স্বাদ বা সংস্কৃতির নিরিখে নয়; বরং পুষ্টির দিক থেকে; একই সঙ্গে, প্রকল্পের "সুউচ্চ" আদর্শের বাস্তবায়নের দিক থেকেও।

ভারতের খাদ্যাভ্যাসের প্রেক্ষাপটে, এবং বিপুল পরিমাণে সরবরাহের কথা মাথায় রেখে দেখলে ডিমই এককভাবে সবচেয়ে কার্যকরীভাবে সব থেকে বেশি প্রোটিনের যোগান দেওয়ার মত খাবার। একটা ডিমে ছয় গ্রাম প্রোটিন থাকে; পাশাপাশি আসে মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক ডিএইচএ (DHA), অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন বি-১২ এবং হিম (heme) আয়রন (যা শরীর সবচেয়ে সহজে নিতে পারে)। এগুলোর কোনোটাই অন্য উপায়ে, বিশেষ করে আরো কম খরচে উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবারের মধ্যে পাওয়া সম্ভব নয়। বিকল্প থাকলেও বাস্তবে সেগুলো ডিমের সমান নয়। উদ্ভিদজাত প্রোটিন হলে, আপনাকে পরিমাণে বেশি খেতে হবে, তার সঙ্গে বিভিন্ন উপাদান - কোনটা কী মেশাচ্ছেন, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কাজেই, খরচ বেড়ে যায়, দরকার হয় আরো সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার - গণখাদ্য কর্মসূচীতে এই ধরণের লাক্সারি থাকে না।

বৈজ্ঞানিকভাবে দেখলেও এটা রকেট সায়েন্স নয়।

ডিমপিছু খরচ তুলনামূলকভাবে কম। অথচ পুষ্টিগুণ প্রচূর। আপনি পনীর বা সয়াবীনের কথা ভাবতেই পারেন - কিন্তু মাথায় রাখবেন যে আপনাকে ইতিমধ্যেই বলে দেওয়া হয়েছে - মাথাপিছু বরাদ্দ সেই দশ টাকা সতেরো পয়সা। কাগজে কলমে সয়াবীনকে শস্তা মনে হতে পারে, পুষ্টিকরও মনে হতে পারে। কিন্তু আবারও ভাবতে হবে যে সয়াবীন প্রসেসড খাবার, এবং হজমযোগ্যতাও তুলনামূলকভাবে কম। পুষ্টির দিকে দিয়ে ডিমের সমকক্ষ হলেও পনীরের ক্ষেত্রে খরচ বেড়ে যায়। এই তথ্যগুলো সহজেই আপনি বাজারে ডিমের দাম, সয়াবীনের বড়ির দাম, পনীরের দামের মধ্যে তুলনা করে বা নিউট্রিশন সংক্রান্ত ডেটাবেজ ঘেঁটে যোগাড় করতে পারবেন।




মিড-ডে মিলের মত বড় পরিসরে অসংখ্য শিশুকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার মত প্রকল্পে এই ধরণের ছোটখাটো পার্থক্যও শেষ অবধি বড় আকার নিতে পারে। কাজেই, এখানে ক্ষেত্রে প্রশ্নটা আমিষ নিরামিষ নিয়ে বিশ্বাসের নয়। প্রশ্নটা বরাদ্দ খরচের মধ্যে সুষম খাবারের ব্যবস্থা করার।

(পরবর্তী পর্ব আগামীকাল) 


প্রকাশের তারিখ: ২৮-জুন-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org