ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি

রতন খাসনবিশ
যেভাবে মোদীর পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে তৃণমূল নেত্রী ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, যেভাবে ধান্দাবাজ স্থানীয় নেতারা হিন্দুত্বের একটি দিদি-উদ্ভাবিত ভাষ্য দিয়ে মোদী বিরোধিতার অক্ষম চেষ্টা করছেন, তাতে মনে হয় এই রাজনীতির দিন ফুরিয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে আসছে এক পালটা রাজনীতির ঢেউ, বামপন্থীদের অ্যাজেন্ডা যেখানে প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। সারা ভারতের রাজনীতিও একটি পরিবর্তনের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সব কা সাথ সব কা বিকাশ-এর কথা আর বলছেন না। ভোটের শেষ পর্বে এসে তিনি তাঁর তুরুপের তাসটি বের করেছেন। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সমস্যা কোনও কিছুই নয়। ভারতের মূল সমস্যা হল সাম্প্রদায়িক বিভাজন-সৃষ্ট, স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করলে যার অর্থ দাঁড়ায় একটি বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত মানুষেরাই ভারতের সব সমস্যার উৎসবিন্দু। এটিকে বিদায় জানাতে না পারলে অর্থাৎ দেশকে মুসলমান-মুক্ত করতে না পারলে, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানকোনও সমস্যারই সমাধান হবে না। 

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সমস্যার এই ধরনের সমাধান সূত্রটি আমাদের কাছে নতুন নয়। পাকিস্তান নিজেকে হিন্দুশূন্য করেছে। তবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সমস্যা সেখানে তীব্রতর হয়েছে। পাকিস্তানি মৌলবাদীরা এখনও কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর মতোই সব সমস্যার সমাধান খুঁজছেন ধর্মাশ্রিত রাজনীতির মধ্যে। আর সেটা করতে গিয়েই দেশটি ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর সঙ্কটে নিমজ্জিত হচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে মোদীর মুখে একবারও শোনা গেল না অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কথা, শোনা গেল না দারিদ্রের চাপে জর্জরিত মানুষেরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন সেসবের কথা। পাকিস্তানে আটার দাম বৃদ্ধি পেলে সেখানকার মৌলবাদীরা যেভাবে আরও বেশি আল্লা আল্লা জুড়ে দেয়, তাদেরই অনুকরণে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী সারা ভারত জুড়ে ধর্মাশ্রিত রাজনীতির চাষ নিবিড়তর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাকিস্তানি মৌলবাদীরা কিছুতেই রাজনৈতিক রণক্ষেত্র থেকে বিদায় নেবেন না। ভারতে নরেন্দ্র মোদী তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। সমস্যা এটাই যে, মোদীকে এই রাজনীতি করতে হয় এমন একটা দেশে দাঁড়িয়ে যেখানে সাম্প্রদায়িক বিভাজন যাতে রাজনীতির ইস্যু না হয়, তার জন্য একটি প্রবল অনুশীলন বিদ্যমান ছিল। মোদীর চ্যালেঞ্জ হল, রাজনীতির এই ভাষ্যটিকেই অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া। এই উপমহাদেশে পাকিস্তানে রাজনীতির যা গতি, মোদী চান সেখানেই ভারতকে টেনে নিয়ে যেতে।

মোদীর এই রাজনীতি ভারত গ্রহণ করবে না এই জন্যে যে, এখানে প্রধান যে ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু নামে চিহ্নিত, সেই সম্প্রদায় একটি বহুত্ববাদী সম্প্রদায়। আসামের প্রত্যন্ত প্রান্তে যারা স্থানীয় দেবতাকে হিন্দু দেবতা হিসাবে চিহ্নিত করেন, তাঁদের সঙ্গে থাঞ্জাভুরের তামিল কৃষকের হিন্দুত্ববোধ কোনওভাবেই মেলানো যায় না। হিমালয়ের প্রত্যন্ত প্রান্তে মেষপালকদের যে হিন্দুধর্ম, উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের সঙ্গে তাঁর কোনও মিল নেই। আদি শঙ্করাচার্য থেকে শুরু করে বহু ধর্মগুরু তাঁদের অভিজ্ঞতায় এটা বুঝতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিক্রিয়া হিসাবে আদি শঙ্করাচার্যের কাছে আমরা পেয়েছি কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদ। আর চৈতন্যদেবের কাছে পেয়েছি একটি উদার ধর্ম, যেখানে যবন হরিদাসেরও স্থান আছে। 

ভারতের এই বাস্তবতা মোদী কিংবা অমিত শাহ বুঝতে চান না। পাকিস্তানি মৌলবাদীদের অনুকরণে তাঁরা এখানে হিন্দু ধর্মকে দাঁড় করাতে চান এমন একটি স্থানে, ধর্ম হিসাবে হিন্দু ধর্ম কোনওদিনই যেখানে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতে পারে না। প্রবল মুসলিম বিদ্বেষের অনুশীলন সত্ত্বেও মোদী ভারতীয় রাজনীতির সেই মাত্রায় উত্তরণ ঘটাতে পারছেন না, গোলওয়ালকার যা চেয়েছিলেন, সাভারকার যা চেয়েছিলেন। আমাদের অনুমান ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি, হিন্দু ধর্মকে অবলম্বন করে মোদী যা গড়ে তুলেছেন, ভারতের মানুষ সেটা প্রত্যাখ্যান করছেন। নির্বাচনী রাজনীতির ফলাফলে এটাই প্রমাণিত হবে। 

এরাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস যে রাজনীতি করে, চিরদিনই তাতে ছিল একটা চটজলদি সমাধান সূত্র খোঁজবার প্রবণতা। সিপিআই(এম) বা বামফ্রন্টের রাজনীতির বিপরীতে কী রাজনীতি করা যায়, এনিয়ে প্রণব মুখার্জিদের সংশয় ছিল। দেশভাগের আগে থেকে কংগ্রেস যে রাজনীতি করে সে রাজনীতি ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি নয়। পশ্চিমবঙ্গে প্রণব মুখার্জিদের তাই দায়িত্ব ছিল, বাম-বিরোধী রাজনীতি করার বাধ্যবাধকতা যেন এই রাজ্যে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির হাত শক্ত না করে। মমতা ব্যানার্জি এই বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি অর্জন করেন তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করে। তৃণমূল নিয়ে এল এমন এক রাজনীতি বিজেপি যেখানে অচ্ছুৎ নয়। আর এই রাজনীতি এখন বিজেপি-বিরোধিতার জন্য মুসলিম মৌলবাদীদের তোষণ করে, রাজনৈতিক নেতাকে মন্দিরে বা মসজিদে গিয়ে গড়াগড়ি খেতে বাধ্য করে। রাজনৈতিক চেতনার অগভীরতা থেকেই সমস্যাটি দেখা দিয়েছে, এটা বললে সবটা বলা হবে না। কার্যসিদ্ধির জন্য যা ইচ্ছা তাই করা যায়, এই রাজনীতিটির পিছনে আছে এই ধরনের এক মতাদর্শ। মতাদর্শ যেখানে এই ধরনের নিম্নমাত্রা অর্জন করে, সেখানে রাজনীতির নামে সবই হতে পারে। মিড ডে মিলের টাকা চুরি থেকে আমফানের ত্রিপল লুঠ হতে পারে। অর্ধেক বিড়ি ভাগ করে খাওয়া স্থানীয় লুম্পেন এই রাজনীতির দৌলতে মার্সিডিজ গাড়ি হাঁকাতে পারে। কিন্তু যে কোনও উপায়ে কার্যসিদ্ধি করার এই রাজনীতির পরিণাম দাঁড়িয়েছে আরও করুণ। এক প্রতিযোগিতামূলক ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির জন্ম হয়েছে এই বাংলায়। 

মোদীর অ্যাজেন্ডাকে ঘুরিয়ে দিয়ে রাজনীতিকে তার প্রয়োজনীয় জায়গায় ফিরিয়ে আনা, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ইস্যুগুলি যেখানে প্রবলতর হয়ে দেখা দিতে পারে, পশ্চিমবঙ্গ উদগ্রীব হয়ে আছে এই রাজনীতির কুশীলবদের আগমনের জন্য। যেভাবে মোদীর পিছনে ধাওয়া করতে গিয়ে তৃণমূল নেত্রী ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন, যেভাবে ধান্দাবাজ স্থানীয় নেতারা হিন্দুত্বের একটি দিদি-উদ্ভাবিত ভাষ্য দিয়ে মোদী বিরোধিতার অক্ষম চেষ্টা করছেন, তাতে মনে হয় এই রাজনীতির দিন ফুরিয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে আসছে এক পালটা রাজনীতির ঢেউ বামপন্থীদের অ্যাজেন্ডা যেখানে প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। সারা ভারতের রাজনীতিও একটি পরিবর্তনের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। উত্তর ভারতের রাজনীতি মোদী ও মোদী-বিরোধী শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে। মোদী যেখানে পাকিস্তানি রাজনীতি অনুসরণের চেষ্টা করছেন, উত্তর ভারতে সেখানে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়াচ্ছে ফসলের ন্যায্য দাম, অগ্নিবীর নামে সেনাবাহিনীর স্থায়ী নিয়োগ হরণ এবং কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পে চরম সঙ্কট, যা নিয়োগ সমস্যার তীব্রতা বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। নরেন্দ্র মোদীকে মোকিবিলা করতে হচ্ছে এই রাজনীতিকে, ধর্মীয় মেরুকরণ যে রাজনীতির মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। 

মোদী বলছেন, আগামী ৬ মাসে ভারতের রাজনীতিতে একটি সূদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটে যাবে। আমাদের অনুমান, কথাটি ঠিক। পাকিস্তানি রাজনীতির অনুকরণে ভারতের রাজনীতি পুনর্গঠিত হবে কিনা, অতি দ্রুত এদেশের মানুষ এই প্রশ্নে তাঁদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবেন। মানুষের সিদ্ধান্ত যাঁরা শিরোধার্য করতে পারবেন না, ভারতের রাজনীতি তাঁদের অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে।

আরও পড়ুন:
দ্বিমেরু রাজনীতির যুগ শেষ হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গে
বামপন্থাই বাঁচাতে পারে সঙ্কট-জর্জর ভারতবর্ষকে


প্রকাশের তারিখ: ৩১-মে-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org