থিয়েটারের রাজনীতি: জনম ও সফদার

শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার

‘মেশিন’ ছিল এই প্রক্রিয়ার ফসল।” মাত্র ১৩ মিনিটের নাটক, অথচ তার ক্যানভাসটি ছিল সুবিস্তৃত। হিন্দি কবি মনমোহন বলেছিলেন, ‘মনে হল কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটেল গ্রন্থটিকে কেউ যেন ১ মিনিটের নিবন্ধে নামিয়ে এনেছে।’ এরপর আর থেমে থাকেনি জনম। শ্রমিক আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে নির্মিত নাটক ও তার ভাষা সফদারদের থিয়েটারকে এক স্বতন্ত্র রূপ দিল। এই ধারাতেই পরবর্তী সময়ে একের পর এক নাটকের জন্ম।

থিয়েটার ও রাজনীতি

পণ্ডিতেরা বলেন প্রাচীন গ্রীসে থিয়েটারের জন্ম। ওঁরা আবার এটাও বলেন, গণতন্ত্রের সূতিকাঘরও প্রাচীন গ্রীস। প্রথম দিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ঐন্দ্রজালিক ক্রিয়াকাণ্ডের সূত্রেই থিয়েটারের আত্মপ্রকাশ। পরে সেখান থেকে বিযুক্ত হয়। যে সমস্ত পরিসরে এথেন্সে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের অনুষ্ঠানগুলি আয়োজিত হত, সেই পরিসরগুলি একই সাথে ছিল নাট্যানুষ্ঠানেরও স্থল। ফলে বলা যায়, শিশুকাল থেকেই থিয়েটার ও রাজনীতি এভাবে পরস্পর সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এই সম্পর্ক তখন থেকেই দ্বিমুখী। কখনও থিয়েটারের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিষয়ে বার্তাপ্রদান হয়েছে। আবার কখনও উল্টোদিক থেকে রাজনীতি চেয়েছে থিয়েটারকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা তার মধ্য দিয়ে নিজের স্বার্থ পূরণ করতে। সংগঠিত ধর্মকে যদি রাজনৈতিক অভিব্যক্তিরই একটি অংশ বলে গণ্য করি, তবে থিয়েটার ও রাজনীতি ধর্মীয় পরিসরে আদি থিয়েটারের দিন থেকেই পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে আছে। অন্য পণ্ডিতেরা বলবেন, সব কিছুর সূত্রপাত গ্রীসে খুঁজতে যাওয়া কেন? অন্য কোথাও সমান্তরালে বা তার আগেই এদের আত্মপ্রকাশ হয়ে থাকতেই পারে। তর্কের খাতিরে সেই বক্তব্যকে সত্য বলে মেনে নিলেও এটা অনস্বীকার্য যে থিয়েটার ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক এই একই পথরেখা ধরেই এগিয়েছে। ইংরেজতে যাকে বলে লাভ এন্ড হেট রিলেশন, সেই যুগপৎ অনুরাগ ও বীতরাগের সম্পর্কেই থিয়েটার ও রাজনীতি সম্পর্কিত হয়ে আছে। কখনো দ্বন্দ্বে কখনো ছন্দে গাঁথা এই সম্পর্ক। সমাজে শ্রেণিশাসন আরো সংহত হওয়ার পর থিয়েটার ও রাজনীতির সম্পর্কটা বিচিত্রধর্মী হয়েছে। কখনো শাসকেরা চেয়েছে থিয়েটারকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বা ব্যবহার করতে, কখনো ভাষাহীন শোষিত থিয়েটারের মধ্য দিয়ে নিজের অবদমিত কথাকে ব্যক্ত করেছে। যারা সরাসরি রাজনৈতিক থিয়েটার না করে বিশুদ্ধ থিয়েটারের চর্চা করে বলে দাবি করে, তারাও জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে যে বিবৃতিটি রাখে সেটিও মর্মবস্তুর দিক থেকে রাজনৈতিকই। 

সফদার ও জনম- আত্মপ্রকাশ

সফদার বা তাদের সংগঠন জনম হঠাৎ করে একদিন ‘চলো নাটক করা যাক’ বলে থিয়েটারে আসেনি। কিংবা এমনটাও নয় যে সফদার বা ওর বন্ধুরা থিয়েটারের একটা প্রাথমিক নেশার মধ্যেই ছিল যার সূত্র ধরেই জনম-এর জন্ম। তাদের মূল তাগিদ প্রকৃতপক্ষে ছিল রাজনীতির। গত শতকের ছয়ের দশকের শেষে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মতাদর্শগত বিভাজনের সূত্রে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী ছাত্রদের একটি অংশ নতুন ছাত্র রাজনীতির পথ খুঁজছিল। একদিকে ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের সংগ্রামী অনুপ্রেরণা, অন্যদিকে ভারতের শাসক কংগ্রেস সরকারের জনবিরোধী নীতি সম্পর্কে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্বের মধ্যে আপোষকামী মনোভাব, তাদেরকে চালিত করছিল একটি নতুন সংগঠনের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোলনের সংগ্রামী পথ নির্ধারণের। ছাত্রদের নিত্যদিনের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন, রাজনৈতিক মতাদর্শের চর্চা এবং নতুন নতুন অংশের ছাত্রদের সাথে মিত্রতাবদ্ধ হওয়া- এই কাজগুলি করতে গিয়েই ছাত্রকর্মীদের মধ্যে নাটক, গণসঙ্গীত চর্চার জন্যে সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী তৈরি করার তাগিদ অনুভূত হল। ১৯৭০ ত্রিবান্দ্রামে সর্বভারতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোলনের সংগ্রামী পথ অনুসন্ধানের প্রক্রিয়াটি ভারতের ছাত্র ফেডারেশন বা এসএফআই গঠনের মধ্য দিয়ে রূপ পেলো। এই একই সময়ে মেধাবী, অনুসন্ধিৎসু ছাত্র সফদার দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এসএফআই কর্মী সফদারের রাজনৈতিক সক্রিয়তা কেন্দ্রীভূত হল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর কাজকর্মেই। ক্রমে তারা অনুভব করল, রাজনীতির যে বার্তাটি তারা নাটক, গণসঙ্গীতের মধ্য দিয়ে পৌঁছে দিতে চায়, সেটা শুধুমাত্র ছাত্র আন্দোলনের পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একে বেশি বেশি করে নিয়ে যেতে হবে বৃহত্তর জনসাধারণের মধ্যে। বিশেষ করে দেশের শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে। এই আগ্রহ থেকেই তারা নিজেদের সংগঠিত করে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা দিল্লি গণনাট্যের শাখায়। কারখানার গেটে, বিভিন্ন ইউনিয়নের অনুষ্ঠানে, রাজনৈতিক বিক্ষোভের স্থলে গণসঙ্গীত ও নাটক পরিবেশন করাই হল তাদের মূল কাজ।  ছাত্র আন্দোলনে তারা যে সংশোধনবাদী অংশটির সাথে সংস্রব ছিন্ন করে পৃথক সংগঠনের পতাকাতলে সংগঠিত হয়েছিল তখন, দিল্লি গণনাট্যের নেতৃত্ব ছিল সেই রাজনীতিরই অনুসারী। এসএফআই-এর সাথে যুক্ত তরুণ সংস্কৃতিকর্মীরা তখন গণনাট্যে আসায় প্রবীণদের সংখ্যাধিক্যে থাকা নিষ্ক্রিয় গণনাট্য সংগঠনে নবীন প্রাণের সঞ্চার হয়। উদ্দেশ্য যেহেতু তাদের ছিল শুধুমাত্র থিয়েটার করা নয়, ফলেই কিছুদিন পরই রাজনীতিগত সমস্যার উদ্রেক হতে শুরু করল। সংগঠনে দু’টি ধারার প্রতিনিধিদের প্রায় সম-অংশগ্রহণে সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি হয় এবং দু’টি ধারারই ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনের আমন্ত্রণে একইভাবে অংশ নেওয়া হলেও, মতাদর্শের প্রশ্নটি থিয়েটারের ভাষা ও বিষয় নির্ধারণে একটি মতভেদের জায়গা তৈরি করতে থাকে। এমনকী অনুষ্ঠানের ধরন নিয়েও মতের অমিল হতে শুরু করে। সফদার ও তার বন্ধুরা চাইত অনুষ্ঠান সংগ্রামী চরিত্রের হোক। চাইত বেশি বেশি করে শ্রমজীবী জনতার কাছে নিজেদের অনুষ্ঠান নিয়ে যেতে। নিজেদের সংস্কৃতিচর্চাকে আন্দোলন সংগ্রামের ঘনিষ্ঠ সহযাত্রী করতে। বিরুদ্ধপক্ষের মত ছিল, সংগঠনকে বিশুদ্ধ শিল্পচর্চার দিকে নিয়ে যাওয়া। অনুষ্ঠানগুলিকে দিল্লির শহুরে সাংস্কৃতিক পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা এবং এভাবে একটি পেশাদারি চরিত্রের সংগঠন হয়ে ওঠা। ক্রমে মতপার্থক্য ঘনীভূত হয়ে এমন জায়গায় গেল যে একদিন সফদার ও তাদের বন্ধুদের আক্ষরিক অর্থেই গলাধাক্কা দিয়ে এবং তাদের নাট্যসামগ্রী গণনাট্য দপ্তরের দোতলার জানালা দিয়ে নিচে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, তাদের গণনাট্য থেকে বের করে দেওয়া হল। একই সংগঠনের পতাকা তলে বেশিদিন আর থাকা যাবে না সেটা সফদাররা আঁচ করছিল। ফলে দেরি না করেই তারা গড়ে তোলে নিজেদেরকে সংগঠিত করে নতুন সংগঠনে। আত্মপ্রকাশ করে জন নাট্য মঞ্চ বা  ‘জনম’, যা এখন জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত হয়ে গেছে। এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাস থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, সফদারের নাটকে আসা এটা একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। আবার জনম-এর আত্মপ্রকাশও রাজনৈতিক মতাদর্শের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই। ফলে রাজনীতি ও থিয়েটার সফদারদের কাছে কোনো আলাদা বিষয় ছিল না কখনওই। 

থিয়েটারের ভাষা ও রাজনীতি

জন নাট্য মঞ্চের বয়স ৫০ বছর অতিক্রম করেছে। সফদারের মৃত্যুরও ৩৪ বছর হবে এবার। জন নাট্য মঞ্চের ৫০ বছরের ইতিহাসে আলো ফেললে আমরা দেখবো কীভাবে রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিত তাদের থিয়েটারের ভাষাকে গড়ে-পিটে নিয়েছিল।  এই ভাষার প্রশ্নটিও বহুমাত্রিক। এটা কখনও থিয়েটারের আঙ্গিক ঘিরে, কখনও নাট্য বিষয় নির্বাচনে, কখনও নাটকের বুননে ঐতিহ্য ও পরম্পরার সাথে সংলাপ নির্মাণ ঘিরে। কখনও আবার থিয়েটার ও রাজনীতির জগতের সক্রিয় আন্দোলনকর্মীদের মধ্যেকার মতবিনিময়ে। কখনো কুশীলবদের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রস্তুতি নির্মাণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে থিয়েটারের ভাষা সংক্রান্ত  আলোচনা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গোটা বিষয়টি হয়েছে একটি সমষ্টিগত সাংগঠনিক তার্কিকতার সংস্কৃতির মধ্যে। সমষ্টিগত চর্চার এই বিষয়টিও ভীষণভাবেই রাজনৈতিক। গোড়ার দিকে, বলা বাহুল্য, সমস্ত বিষয়ই অনেকটাই অস্পষ্ট ও ঢিলেঢালা ছিল।  মূল তাগিদ ছিল রাজনৈতিক বিষয়ভিত্তিক নাটক নিয়ে শ্রমজীবী জনতার মধ্যে যাওয়া। রাজপথের আন্দোলনে তারা কখনও হাজির হয়েছে পোস্টারধর্মী পথনাটক নিয়ে, আবার কখনও শ্রমিক মহল্লা বা কারখানার গেটে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে ফ্লাড লাইটের আলোয় মঞ্চনাটক করত তারা। এক রাতে পরপর দু’বার অভিনীত হত নাটক কারখানার দু’টি শিফটের মজুরদের সামনে। অনুষ্ঠান শেষ হত ভোরে। ১৯৭৪ সালে উত্তরপ্রদেশে নির্বাচনী প্রচারে নাট্যাভিনয় করতে গিয়ে বিচিত্র পরিস্থিতিতে নিত্যনতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনা করে অনুষ্ঠান করতে হয়েছে। একটি শহরে বামবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি জনম-এর নাট্যাভিনয়কে ভাড়াটে নারীদের চটুল নৃত্যের অনুষ্ঠান বলে সারা শহরময় প্রচার করে দেয়, যার জেরে বিকৃতরসলোলুপ জনতার ভিড় জমে যায় অনুষ্ঠানস্থলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নাটকীয়ভাবে ফৈজের কবিতা আবৃত্তি করে জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে জনম-এর শিল্পীরা। এমন অভিজ্ঞতাও রয়েছে আলোর অভাবে বাসের হেডলাইটের আলো মঞ্চে ফেলে পরিবেশিত হয়েছে নাটক। আবার কোথাও পর্যাপ্ত অভিনয়ের জায়গা না পেয়ে লাগোয়া বাড়ির একাধিক ব্যালকনিকে অভিনয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল হওয়ার পরও তিনি পদত্যাগ করতে অস্বীকার করার পর জনম একটি ছোট্ট নাটিকা তৈরি করেছিল ‘কুর্সি কুর্সি কুর্সি’ নামে। সেখানে দেখা যায় একজন শাসক নির্বাচনে হেরে গিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে চাইলেও চেয়ারটি তার পেছনে আটকেই থাকছে। হাজার শক্তি প্রয়োগ করেও ছাড়ানো যাচ্ছে না। এই নাটক অভিনীত হয়েছিল কয়েকদিন ধরে বোটক্লাবের উদ্যানে মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে ভিড় জমানো সরকারি কর্মচারীদের সামনে। এখানে দু’টি বিষয় লক্ষ্যণীয়। জনগণকে মঞ্চে ডেকে আনা হচ্ছে না। অস্থায়ী মঞ্চ নিয়ে পৌঁছে যাওয়া হচ্ছে জনতার দরবারে। কোনো সুনির্দিষ্ট আঙ্গিকে নিজেদের বেঁধে রাখছে না কুশীলবরা। এমনকী অভিনয় পরিসরকেও রূপান্তরযোগ্য করে নেওয়া হচ্ছে পরিস্থিতির প্রয়োজনে। 

জরুরি অবস্থা ও পরবর্তী দিন- নতুন থিয়েটার ভাষার সন্ধান

১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি হলে স্তব্ধ হয়ে যায় জনম-এর কার্যকলাপ। সরকারি বিধিনিষেধের পরিস্থিতিতে কীভাবে পরিচালিত হবে সংগঠন তা নিয়েও গভীর ভাবনা চিন্তা হয়েছে তখন । সরাসরি প্রতিবাদের শিল্প নিয়ে জনতার দরবারে যাওয়া অসম্ভব। পরবর্তীতে একটি সাক্ষাৎকারে সফদার বলেছেন, ওই পরিস্থিতিতে সংগঠনের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। অথচ ভিন্নধারায় কাজ করা সম্ভব ছিল। জনম সদস্য সুধন্ব দেশপাণ্ডের বই ‘হাল্লা বোল’-এ বলা হয়েছে সফদারের একটি নোটের কথা, যেখানে লেখা ছিল ওই পরিস্থিতিতে কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া নিয়ে তাঁর ভাবনার বিষয়গুলি। সফদার ভেবেছিল দেশবিদেশের প্রগতিশীল চিরায়ত সাহিত্যের উপাদানগুলি থেকে নাটক তৈরি করা কিংবা প্রাচীন নাট্য সাহিত্যের সম্ভারগুলিকে প্রগতির ইঙ্গিতবাহী প্রযোজনা হিসাবে উপস্থাপিত করার কথা, যা সরকারের বিধিনিষেধের আওতায় হয়ত পড়বে না। একইসঙ্গে এই সময়পর্বকে সংগঠনের সদস্যদের প্রশিক্ষণে মনোনিবেশ করার কথাও ভেবেছিল যাতে সাংগঠনিক কাঠামোটিকে টিকিয়ে রাখা যায় মুক্ত অঙ্গনের অনুষ্ঠানের অবর্তমানেও। আত্মগোপন পর্বে একটি বিপ্লবী দল যেভাবে প্রকাশ্য কাজকর্ম অব্যাহত রাখে বা অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাঠামো অটুট রাখার উদ্যোগ নেয়, সফদারের নোটে বর্ণিত ভাবনাটিও অনুরূপ।

জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পর নাট্যাভিনয়ে কোনো সরকারি বিধিনিষেধ না থাকলেও পুরোনো ধাঁচে নাটক অভিনয় করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। জনম-এর অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষকসভা, ছাত্র সংগঠনগুলি। এদের প্রত্যেকের তখন আর্থিক দৈন্য, কাজকর্ম তখনো অনেকটাই গোপনেই করতে হয়। কর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা আদালতে, যা চালাতে তাদের নিজেদেরই তখন বিপুল অর্থের প্রয়োজন। আবার নিজেদের পুনর্গঠনের কাজে গতি আনতে তারা চাইছিল জনম তাদের নাটক নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াক। অথচ জনম-এর পূর্ণদৈর্ঘ্যের খরচবহুল নাটকের অনুষ্ঠান আয়োজন তাদের সাধ্যাতীত। তখনই সফদারদের মাথায় আসে ছোট নাটক যা সহজে, কম খরচে প্রযোজনা করা যায় এবং যার আনুষঙ্গিক আয়োজন ন্যূনতম। নাটকের বিষয় ও আঙ্গিক নিয়ে তারা গভীর চর্চা শুরু করে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলির কার্যালয়ে ঘুরে ঘুরে নাট্যবিষয় অনুসন্ধান করা এবং একইসাথে নাট্যাঙ্গিক নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাবনা।  এক বয়স্ক কমিউনিস্ট নেতার মুখে গাজিয়াবাদের হেরিগ-ইন্ডিয়া কারখানার একটি স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক ধর্মঘট ও তার পরিণামে ছ’জন শ্রমিকের বেসরকারি রক্ষীদের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা নাটক তৈরির কথা ভাবলো। একইসঙ্গে দিল্লি শিল্পাঞ্চলের পরিবেশ, অপরাধজগৎ, শাসক ও রাজনীতির ভূমিকা, এসবকিছুর পাশাপাশি তৎকালীন জনতা সরকারের সদ্য আনা শ্রমিক বিরোধী আইন —সবকিছুকে একটি নাটকের মধ্যে ধরার সুকঠিন কাজটি তারা হাতে নিল। এই প্রক্রিয়াতেই জন্ম হয় ঐতিহাসিক ‘মেশিন’ নাটকের। সুধন্ব দেশপাণ্ডে তার বইয়ে এই পর্বের কথা বলেছেন :

“যখন জনম সিদ্ধান্ত নিল এই বিষয়গুলি নিয়ে নাটক উপস্থাপন করবে, তখন এটা স্পষ্টভাবেই ঠিক হল যে (ক) নাটক সহজে উপস্থাপনযোগ্য হতে হবে, (খ) বিষয়বস্তুকে একটি নির্দিষ্ট কারখানায় সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ ভাবে গোটা শ্রমিক শ্রেণির সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হবে, (গ) ব্যবস্থা হিসেবে কোনো ব্যক্তি মালিককে নয়, পুঁজিবাদকে নিশানা করা হবে, (ঘ) পুঁজিপতি শ্রেণির অমানবিক চরিত্র উদঘাটন করতে হবে, (ঙ) বোঝাতে হবে একজন মালিক দয়ালু বা নৃশংস যাই হোন না কেন, পুঁজিবাদের অবসান ঘটাতেই হবে। সমস্যাকে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে, সামগ্রিকভাবে আবার সুনির্দিষ্টভাবে এবং একইভাবে স্থানীয় চেহারায় বোঝার জন্যে সফদার সহ আরো দু’একজন বেশ কয়েকজন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীর সাথে দেখা করেন। তখনকার শ্রমিক ও সিআইটিইউ কর্মী, বর্তমানে দিল্লি সিপিআইএম-এর সম্পাদক কে, এম তিওয়ারির মনে আছে, সফদার ও আরো কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তাঁর আলোচনার কথা। ওঁর মনে আছে বিস্তারিত বিষয় নিয়ে ওদের নানা প্রশ্নের তিনি উত্তর দিয়েছিলেন। যোগেন্দ্র শর্মাও তখন একজন সিআইটিউ কর্মী। তাঁরও স্মৃতিতে রয়েছে সফদার ও ওর বন্ধুদের সঙ্গে গাজিয়াবাদের শিল্প পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কথা। মাথায় গিজগিজ করতে থাকা এই অনুসন্ধানমূলক আলোচনা এবং সঙ্গে নাটকের আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু নিয়ে দলের ভেতরে অসংখ্য আলোচনা— এই সবকিছুকে সম্বল করে একদিন রাকেশ সাক্সেনা ও সফদার বসে পড়লেন নাটক লিখতে এবং সফদার যেভাবে বলেছে ভ্যান এরভেনকে, ‘সত্যি কথা বলতে কী, নিজে থেকেই কিছু একটা বেরিয়ে আসতে থাকল। আমরা প্রায় অনায়াসে সংলাপ বলতে শুরু করেছিলাম’।

‘মেশিন’ ছিল এই প্রক্রিয়ার ফসল।”

মাত্র ১৩ মিনিটের নাটক, অথচ তার ক্যানভাসটি ছিল সুবিস্তৃত। হিন্দি কবি মনমোহন বলেছিলেন, ‘মনে হল কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটেল গ্রন্থটিকে কেউ যেন ১ মিনিটের নিবন্ধে নামিয়ে এনেছে।’

এরপর আর থেমে থাকেনি জনম। শ্রমিক আন্দোলনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে নির্মিত নাটক ও তার ভাষা তাদের থিয়েটারকে এক স্বতন্ত্র রূপ দিল। এই ধারাতেই পরবর্তী সময়ে একের পর এক নাটকের জন্ম। ‘হাল্লা বোল’ নাটকের যে অভিনয় করতে গিয়ে সফদারের মৃত্যু সেই নাটকের উৎসে রয়েছে আরেকটি নাটক ‘চাক্কা জ্যাম’, যা তৈরি হয়েছিল দিল্লির শিল্পাঞ্চলে ১৯৮৮ সালে সিআইটিউ-র ডাকা সাতদিনের শিল্প ধর্মঘটের প্রেক্ষিতে। সেই নাটকের গল্প, গঠন, ভাষা সমস্তই উঠে এসেছিল শিল্পাঞ্চলের রুক্ষ বাস্তব থেকে এবং সেই ধর্মঘটের সময়ে আক্ষরিক অর্থেই ওই নাটকের বিভিন্ন সংলাপ শ্রমিক মহল্লায় শ্লোগানে পরিণত হয়েছিল।

নাট্যবিতর্ক- সফদার ও জনম

সফদারদের নাটককে অনেকেই বাদল সরকার তৃতীয় ধারার নাটকের সমধর্মী মনে করেন। ফলে অনেকেই ধরে নেন, সফদার বা জনম মঞ্চ-নাটকের বিরোধী। সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভাবা হয় যে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রচারমূলক নাটকই জনম-এর চর্চার বিষয়। এর বাইরে বিশ্বের চিরায়ত নাট্যসাহিত্য বা প্রাচীন ভারতীয় নাটকের ঐতিহ্য বা লোকায়ত পরম্পরা সম্পর্কেও সফদাররা অনাগ্রহী ছিল। এই ধারণা সম্পূর্ণই ভ্রান্ত। জনম-এর দশ বছর পূর্তিতে লেখা নিবন্ধে সফদারের কথাগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

“সমকালীন ভারতীয় পথনাটক সমানভাবেই আমাদের লোকায়ত ও শাস্ত্রীয় নাটক এবং পশ্চিমী নাট্যকলা থেকে উপাদান গ্রহণ করেছে। ……আমাদের মতে মঞ্চনাটক ও পথনাটকের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের বিষয়টি একটি আজগুবি কথা। দু’টিই সমভাবে জনগণের সম্পদ। এটা সত্যি, যে মঞ্চনাটকগুলি পলায়নবাদী, নৈরাজ্যবাদী ও পুনরুত্থানবাদীদের দখলে রয়েছে, তার সাথে জনগণের পথনাটকের একটি দ্বন্দ্ব বাস্তবেই রয়েছে। যেমনটা রয়েছে প্রগতিশীল মঞ্চনাটক ও প্রতিক্রিয়াশীল মঞ্চনাটক  অথবা গণতান্ত্রিক পথনাটক ও সংস্কারপন্থী বা সরকারি পথনাটকের মধ্যে। আবার পথনাটককে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন বা চলমান পোস্টার বলে বাতিল করাটাও সমভাবে আজগুবি বিষয়।” পথনাটকের রাজনৈতিক দিকটিতে যে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রচারের দিক ছাড়াও ভিন্নতর মাত্রা রয়েছে সেটার কথা মনে রেখেই সফদারের একটি অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক নোটে পথনাটকের মহত্তর দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ ছিল, ‘সাংস্কৃতিক দিক থেকে বঞ্চিত মানুষের কাছে সুস্থ বিনোদন পৌঁছে দেওয়া’। 

তবে পথনাটক সম্পর্কে সাধারণ্যে তুচ্ছতার মনোভাব গড়ে ওঠার জন্যে সফদার নিজেদেরকেও দায়ী করেছিল। ১৯৮৩ সালে লিখিত একটি নোটে সফদারের বক্তব্য ছিল, ‘পথ নাটককে শ্লোগানবাজির নামান্তর বলে নিন্দার চোখে দেখানোর এই যে প্রায় একটা সর্বজনীন মত, সেটার জন্যে কি শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠিত নাট্যব্যক্তিত্বদের ছকবন্দি মানসিকতাই দায়ী? এটার জন্যে অংশত, আমার মতে প্রধানত দায়ী, যে বেপরোয়া তুচ্ছতা নিয়ে আমাদের বেশিরভাগ নাট্যকর্মী পথ নাটকের চর্চা করি সেটা। আমাদের মধ্যে কেউ কি পথ নাটকের সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ ও ভাষা আবিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছে? আমাদের মধ্যে ক’জন পথ নাটকের বিশেষ ধরন ও বাধ্যতার কথা মনে রেখে নিজেদের প্রশিক্ষিত এবং প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছে? বলতে দ্বিধা নেই, সেটার সংখ্যা খুব বেশি নয়। আমাদের নাটকগুলো খাপছাড়া, মলিন, বিনোদনহীন, বাঁধাধরা এবং নিস্তেজ। আমরা যখন গান গাই তখন আমরা বেসুরে গাই। আমরা যখন নাচি, তখন বেতালে পা পড়ে। আমরা যখন কথা বলি তখন রাস্তার আওয়াজ ভেদ করে আমাদের গলা শোনাতে পারি না। আমরা ক্লিশে এবং ছকে বাঁধা। আমাদের চরিত্রগুলি হাস্যাস্পদ, আমাদের কৌতুকগুলিও রসকষহীন। আমাদের দেখে বিরক্তিই জাগে। হ্যাঁ, এটাও ঠিক, আমরা সংখ্যায় বিপুল পরিমাণে বাড়ছি। কারণ আমরাই একমাত্র (লেখা অস্পষ্ট, সম্ভবত লোকজন) যারা পথে অভিনয়কে নিয়ে গিয়েছি এবং আমাদের দর্শকশ্রোতারা খিদে নিয়ে প্রতীক্ষায় রয়েছে।… আমাদের কাজকর্মে একটা তুচ্ছতা ও দায়সারা মনোভাবের প্রবণতা রয়েছে। অনেক সময়েই ভাবা হয়, পথ নাটক যে কেউ করতে পারে। অনুশীলন, প্রশিক্ষণ কিংবা শৃঙ্খলা— এগুলির প্রয়োজন নেই। এটা একটা ক্ষতিকর প্রবণতা। কঠোর শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে নেওয়ার মানসিকতা যার নেই, তার জন্যে পথনাটক নয়। পথনাটক বিষয়টিকে যারা মূলগতভাবেই শিল্পমূল্যহীন ভাবে তাদের চেয়েও পথনাটকের বেশি ক্ষতি করে তারা যারা কোনও ধরনের প্রতিভা ছাড়াই এবং সেই ঘাটতিকে পূরণ করার ঐকান্তিক আগ্রহ ছাড়াই পথনাটকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’

ঐতিহ্য বা পরম্পরার সাথে সম্পর্কিত হওয়া নিয়েও সফদারের অবস্থান খুবই স্পষ্ট ছিল যা তার রাজনীতি থেকেই এসেছে। পাকিস্তান সফরের সময়ে একটি আলোচনায় অংশ নিয়ে সফদারের অভিমত ছিল এ রকম, ‘পরম্পরা আছে তো ঠিকই। কিন্তু প্রত্যেকটি চিন্তাশীল মানুষকে পরম্পরার সাথে একটা সমালোচনামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। সমস্ত ধরনের পশ্চাৎপদ চিন্তা ও অন্ধ কুসংস্কারও পরম্পরার অংশ। এমন আদর্শ যা আমাদের পেছনের দিকে টানে। পরম্পরাকে আবিষ্কার করতে গিয়ে এর দাস হয়ে যাওয়াটা অসম্ভব নয়। প্রদর্শন শিল্পের ক্ষেত্রে এমন অনেক আঙ্গিক আছে যেগুলো প্রাণবন্ত এবং পরম্পরার অংশ। ফলে এই আঙ্গিকগুলি ব্যবহার করা যেতেই পারে, কিন্তু সৃজনশীল ভাবে কিছু পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়ে। কোনো কোনো আঙ্গিক আছে যাকে তার বিষয়বস্তু থেকে আলাদা করা যায় না। এখানেই সতর্ক থাকতে হয়। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ভারতে এই ব্যাপারটি সর্বনাশ ঘটিয়েছে। “শেকড়ের কাছে যেতে হবে” কথাগুলি আমাদের বহু বিপদও ঘটিয়েছে। আজকাল সঙ্গীত নাটক আকাদেমির মত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ফোর্ড ফাউন্ডেশনের মত সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠান এই কথাগুলি বলছে যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট নয়।’

সফদারের স্বপ্ন ছিল শ্রমজীবী মানুষের জন্যে একটি বিকল্প সুস্থ বিনোদনের পরিসরও তৈরি করা। দিল্লির শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের জন্যে বিনোদন ছিল একমাত্র বম্বের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র এবং তাদের মধ্যে টিকে থাকা পরম্পরাগত সাংস্কৃতিক বিষয়গুলি। জীবন জীবিকার সংগ্রামে জর্জরিত এই মানুষগুলির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের বার্তা পৌঁছে দেওয়া যেমন একজন বামপন্থী সংস্কৃতিকর্মীর দায়িত্ব, ঠিক তেমনি যে বিকৃত ও পশ্চাদপদ ধ্যানধারণায় ভরপুর বিনোদনের সামগ্রীতে শ্রমজীবী মানুষেরা ডুবে থাকে সর্বক্ষণ তাদের সামনে একটি সুস্থ বিকল্প তুলে ধরারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের সংস্কৃতি দিয়ে তাদের এই ক্ষুধা নিবারণ হবে না। আবার শ্রমজীবী মানুষের মধ্য থেকেই সংস্কৃতি আন্দোলনের কর্মীদের তুলে আনা, তাদেরকে আধুনিক শিল্পসংস্কৃতির নানা শাখায় শিক্ষিত করে তোলা এটাও বামপন্থী সংস্কৃতি আন্দোলনের বিচার্য বিষয় হওয়া উচিত। একইসঙ্গে, সফদারকে নাড়া দিত বামপন্থী সংস্কৃতি আন্দোলনের কর্মীদের জীবনধারণের প্রশ্নটিও। একটা সময়পর্বে এসে জননাট্য মঞ্চেও গোড়ার দিকের কর্মীদের মধ্যে জীবন জীবিকার অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা গ্রাস করে। এই সংকটের জায়গায় সেই সময়ে কিছুই করণীয় ছিল না। করার সামর্থ্যও ছিল না। উল্লেখ করা যেতে পারে, গণনাট্য আন্দোলনেও একটা সময়ে এই প্রশ্নগুলি নানা মানুষের তরফে উত্থাপিত হয়েছে। গণনাট্যের পরিসরেও এর উত্তর ছিল না। সম্ভবত এখনও নেই। এই সমস্ত কিছু নিয়েই সফদারের সুবিস্তৃতত পরিকল্পনা ছিল। এই মর্মে একটি নোট পার্টি নেতৃত্বের কাছে পেশ করাও হয়েছিল। সুধন্ব দেশপান্ডের বইয়ে সফদারের একটি কথোপকথন উদ্ধৃত হয়েছে, 

‘কিছু জমি আমরা কিনে নেবো। এর একটা অংশ আমরা রেখে দেবো বাগান করার জন্যে। সব্জি চাষ করব আমরা। একটা ছুতোরের কর্মশালা থাকবে। একটা বিদ্যুতের কর্মশালা। ভিডিও নির্মাণের সরঞ্জাম। একটা ভিডিও সম্পাদনার ঘর। আমার অনেক বন্ধু আছে এই জগতের। আমি ওদের অনুরোধ করব আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যে। তারপর আমরা স্থানীয় শ্রমিক যুবকদের প্রশিক্ষিত করব। নিজেদের জীবন কাহিনি বলার জন্যে শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব ব্যবস্থাপনা থাকা জরুরি। যাদের শেখাব তাদের মধ্য থেকে কিছু কিছু ছেলে নিজেরাই প্রশিক্ষক হয়ে উঠবে। জনম-এর সবাই আমরা একসাথে থাকব। এটা একটা কমিউনের মত হবে। আমরা নাটক করব, এখনের মত নয় যে শুধু সন্ধ্যাবেলাতেই আমরা মিলিত হব। আমরা সারাদিন নাট্যকলার চর্চায় থাকব। নিজেদের প্রশিক্ষিত করব। আরো বেশি বেশি করে শিখব। সুদক্ষ নাট্যকর্মী হয়ে উঠব আমরা। সারাদেশের পথ নাটক কর্মীদের আমরা প্রশিক্ষণ দেবো।’

লাহোরের একটি কর্মশালায়ও সফদার এই ভাষাতেই ওর ভাবনার কথা বলেছিল :

‘আমরা এখন একটা পরিকল্পনা সামনে রেখে ভাবনাচিন্তা করছি, সেটা প্রকৃতপক্ষে যথেষ্টই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কোনও এক শ্রমিক মহল্লায় আমরা নিজেদের নাট্যশালা গড়ে তুলব। আমরা এর জন্যে তহবিল  সংগ্রহ করছি এবং এটা গড়ে উঠতে অন্তত দু’ আড়াই বছরের মত সময় লাগবে। প্রচুর টাকা সংগ্রহ করতে হবে, এক দু’লাখ নয়, দশের গুণিতকে লক্ষ টাকা প্রয়োজন। আমাদের ভাবনা রয়েছে দিল্লির কোনও শ্রমিক মহল্লায় আমরা ১৯৯০ নাগাদ বা তার দুয়েক বছরের মধ্যে একটি নাট্যশালা গড়ে তুলব যেখানে সব ধরনের মঞ্চের ব্যবস্থা থাকবে— প্রসেনিয়াম, তিনদিক খোলা মঞ্চ, চতুর্দিক খোলা বৃত্তাকার মঞ্চ। তারপর থেকে আর আমরা অপেশাদার হিসেবে কাজ করব না, সকলেই পেশাদার নাট্যকর্মী অথবা সর্বক্ষণের নাট্যকর্মী হবে এবং এই নাট্যশালায় আমরা একটি রেপার্টরি তৈরি করব যা প্রধানত শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে তার কর্মকাণ্ডকে সীমিত রাখবে। এই নাট্যশালায় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও থাকবে যেখানে সারা দেশের নাট্যকর্মীরা, পথনাটক কর্মী সহ, আসবে কর্মশালায় যোগ দিতে। আমরা অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকেও আমন্ত্রণ জানাবো কর্মশালা আয়োজনের জন্যে। সেখানে আমরা সব ধরনের নাটকের চর্চা করতে চাই। উদাহরণ স্বরূপ, আমরা গ্রীক ট্রাজেডি এবং শেক্সপিয়ারীয় নাটক শ্রমিকদের জন্যে করতে চাই।’

পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি সুধন্বের ওই বই সম্পর্কিত সাক্ষাৎকারে বলেছেন সফদারের ওই নোটের কথা। পার্টি কংগ্রেস থেকে ফিরে আসার পর তাঁর সফদারের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। বৃন্দা কারাত বলেছেন, ‘সেই সময়ে পার্টিতে জমা দেওয়া ওর নোটটি আমার স্পষ্ট মনে আছে। ওটা ছিল একটা স্বপ্নদর্শী ভাবনা। আমার গভীর অনুরাগ ও সহানুভূতি ছিল ওর ভাবনার বিষয়ে, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল জনম-এর জন্যে তখনও ওর প্রয়োজন রয়ে গিয়েছিল। আমি ওকে বলেছিলাম সবগুলিই একসাথে হতে পারেই এবং এ নিয়েই তখন আমরা আলোচনা করতাম। ও আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করত, দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত তৈরির জন্যে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরি করাটা ভীষণ জরুরি। আলোচনা অসমাপ্ত থেকে গেল।’

সফদারের এই স্বপ্নটি হয়ত এখনও অধরা রয়ে গেছে। তবে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দল এখনও বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সন্দর্ভে নিজেদের থিয়েটারের ভাষাকে আরো শাণিত করা, এ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, এ তাদের অব্যাহত রয়েছে। সফদারের হত্যার পর মলয়শ্রী হাসমি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সফদার নেই, কিন্তু ওর পথটা রয়ে গেছে। সেই পথে চলতে চলতেই ওর সাথে আমাদের বারবার দেখা হবে।’ সফদার থিয়েটারের রাজনীতি ও রাজনীতির থিয়েটারের পথ এখন আরও অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর চর্চাই এই সময়ের বামপন্থী সংস্কৃতি আন্দোলনের পাথেয় হওয়া উচিত।  

  

 


প্রকাশের তারিখ: ০২-জানুয়ারি-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org