ইউক্রেনে নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি

সুচিক্কণ দাস
সেক্ষেত্রে কিয়েভে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়ে মস্কোর ওপর হামলার ছক আরও এগিয়ে আনার জন্য ন্যাটোর আদত ছক (কিয়েভ থেকে মস্কো পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছতে সময় লাগে ৯ মিনিট) পুরোপুরি ভেস্তে যাবে। আসলে রাশিয়ায় ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্যই হল ন্যাটোর এই ছক ভেস্তে দেওয়া। এই লক্ষ্যেই ২০১৪ সালে কিয়েভের নির্বাাচিত সরকারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল মার্কিন মদতপুষ্ট কমলা বিপ্লবের জন্য। পরে ন্যাটো জোটের সেই একই ছক বেলারুশে পণ্ড হয়ে যায়।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর যা আসছে তাতে মনে হয়, শীতের শেষে এবং বসন্তের শুরুতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আর এক দফা ভারী যুদ্ধ বাধবে। আরও দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানি - এক কথায় পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী জোট, নির্দিষ্টভাবে বললে ন্যাটো জোট, আরও বেশি অস্ত্রশস্ত্র যুগিয়ে, যার মধ্যে রয়েছে আধুনিকতম ট্যাঙ্ক, এই যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে চাইছে। কিন্তু পশ্চিম জোটের এত তৎপরতা কেন? খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, শীতের মধ্যেই একটানা অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু রণনীতিগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে রুশ বাহিনী। ফলে তাদের ঠেকাতে হলে ইউক্রেনকে আরও অস্ত্র না যুগিয়ে ন্যাটো জোটের উপায় নেই। যদিও তারা সম্ভবত একথা জানে যে, এই যুদ্ধে ইউক্রেন জিতবে না। কিন্তু ন্যাটো জোটের ভাবনা সম্ভবত এরকম যে, যদি জোটের খরচে ওয়ার অফ অ্যাট্রিশন বা শক্তিক্ষয়ের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে এককভাবে যুদ্ধের খরচ চালাতে গিয়ে রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। তাতে সেদেশে অস্থিরতা বাড়বে। এর জেরে দেশের ভেতর থেকে পুতিন বিরোধী কোনও চক্রকে মদত দিয়ে শেষ পর্যন্ত রাশিয়াকে বাগে এনে ফেলা যাবে। 


১। পশ্চিম রণাঙ্গন—  খেরসন 

ইউক্রেন যুদ্ধের এখনকার পরিস্থিতি ঠিক কী, সেদিকে একবার নজর দেওয়া যাক। মানচিত্রের দিকে তাকালে আমরা দেখব, পশ্চিমে কৃষ্ণসাগরের তীরের ক্রিমিয়া থেকে পূবে একেবারে লুগানস্ক পর্যন্ত একটা অর্ধচন্দ্রাকার এলাকা জুড়ে এই যুদ্ধ চলছে। মোটের ওপর এই রণাঙ্গনকে তিন ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়। রাশিয়ার অধীনে থাকা ক্রিমিয়া সংলগ্ন মেলিটোপোল–খেরসনকে ঘিরে একটা রণাঙ্গন। নীপার নদীর দুই পাড় জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে খেরসন ও সংলগ্ন এলাকা। এখানে  প্রথম দিককার কিয়েভ অভিযান থেকে পিছিয়ে এসে নীপারের পূর্ব পাড়ে ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছে রুশ বাহিনী। এবং এখানে প্রস্তুতি রয়েছে স্থায়ী প্রতিরক্ষা শক্তপোক্ত করে  দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার। খেরসনের পশ্চিম পাড়ের পিছনেই রাশিয়ার মূল ভূমি। তাই এখন থেকে পিছনোর কথা ভাবে না রুশ সেনারা। নীপারের উল্টোদিকে খেরসনের একাংশে রয়েছে ইউক্রেন বাহিনী। বসন্তে বরফ গলে গেলে এখান থেকে শুরু হতে পারে রুশ বাহিনীর কিয়েভমুখী অভিযান। স্বভাবতই তাতে মরণপণ বাধা দেবে ন্যাটোর মদতপুষ্ট ইউক্রেন বাহিনী। ফলে সংঘাত তীব্রতর হবে।

২। মধ্য রণাঙ্গন—  ঝাপোরিঝঝিয়া 

দ্বিতীয় রণাঙ্গণ নীপারের আরও ওপর দিকে, পূব দিক ঘেঁষে ঝাপোরিঝঝিয়াকে ঘিরে। এখানেই রয়েছে ঝাপোরিঝঝিয়া পরমাণু কেন্দ্র। ইউরোপের সবচেয়ে বড় পরমাণু কেন্দ্র। এই কেন্দ্রে জল পাঠাতে হয় কাখোভা বাঁধ থেকে। আবার রাশিয়ার অধীন ক্রিমিয়ার যেহেতু নিজস্ব মিষ্টি জলের উৎস নেই, তাই ক্রিমিয়া অঞ্চলে জল সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য কাখোভা বাঁধের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি। একেবারে হিসাব কষেই গত বছর যুদ্ধের শুরু থেকেই  ঝাপোরিঝঝিয়া পরমাণু কেন্দ্র ও কাখোভা বাঁধ নিজেদের দখলে রেখেছে রুশ সেনা। ফলে এই দুটি গুরুত্বপূ্র্ণ কেন্দ্র দখলের জন্য লাগাতার হামলা চালাচ্ছে ইউক্রেনের বাহিনী। তারা মাঝে মাঝেই হামলা চালাচ্ছে পরমাণু কেন্দ্রের আশপাশে যাতে দুর্ঘটনার ভয়ে রুশ সেনা সেখান থেকে সরে যায়। তাহলেই ইউরোপের সবচেয়ে বড় পরমাণু কেন্দ্রটি ইউক্রেন তথা ন্যাটোর দখলে চলে আসবে। পশ্চিমী শক্তিও তাই বার বারে চাপ দিচ্ছে রাশিয়ার ওপর এই পরমাণু কেন্দ্র ছেড়ে দেওয়ার জন্য। যদিও এপর্যন্ত যতগুলি হামলা এই পরমাণু কেন্দ্রকে ঘিরে হয়েছে সেজন্য কারা দায়ী তা বলেনি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন। এবং একথাও বলেনি যে রাশিয়া এই কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, মার্কিনী চাপে আসল কথাটা বলতে পারছে না ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন। ফলে এই রণাঙ্গণে ঘোরতর যুদ্ধ বাধার সম্ভাবনা কম। তবে এই পরমাণু কেন্দ্র ও বাঁধ ঘিরে চলবে ওয়ার অফ নার্ভস। পরমাণু বিপর্যয়ের গুজব ছড়িয়ে রুশ সেনাকে এলাকা ছাড়তে বলবে ইউক্রেনের সেনা। আবার রুশ বাহিনী স্ট্র্যাটেজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রদুটি হাতছাড়া করতে চাইবে না। যতটা না সামরিক, তার চেয়ে এই ফ্রন্টের লড়াইটা অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক। 

৩। পূর্ব রণাঙ্গন— লুগানস্ক, ডনেৎস্ক

চলতি শীতের মধ্যে এই ফ্রন্টই হয়ে পড়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই অঞ্চলে পিছনে লুগানস্ক, সামনে সামনে ডনেৎস্ক। দুটো এলাকাই গত বছর গণভোটের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে। মানে পিছনের দিকের তো বটেই, এই অঞ্চলে সামনের দিকের রুশ প্রতিরক্ষা রীতিমতো শক্তপোক্ত। এই স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভান্টেজ থেকে অভিযান চালিয়ে সম্প্রতি নুনের খনির শহর সোলেডার দখল করে ফেলেছে  রুশ সেনা। এর জন্য অবশ্য মূল্য চোকাতে হয়েছে যথেষ্ট। সামনে ৯ কিলোমিটার দূরেই বাখমুট এলাকা। উৎকৃষ্ট মদ উৎপাদন কেন্দ্র। তবে এর রণনীতিগত গুরুত্ব অন্যত্র। বাখমুট এলাকা রুশ সেনাদের দখলে এলে রাশিয়ার রস্টভ-অন-ডন শহর থেকে বাখুমট ছুঁয়ে টানা কিয়েভ পর্যন্ত রাস্তা রুশ বাহিনীর সামনে উন্মুক্ত হয়ে যাবে। ফলে ঝাপোরিঝঝিয়াকে মাঝখানে রেখে একদিকে খেরসনের দিক থেকে,অন্যদিকে বাখমুটের দিক থেকে—  দুদিক থেকে কিয়েভের দিকে যদি এগোতে শুরু করে রুশ সেনার দুটি বাহু, সেক্ষেত্রে সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়তে হবে ইউক্রেনের বাহিনীকে। এটা সামরিকভাবে রীতিমতো কঠিন চ্যালেঞ্জ। ঠিক এভাবেই স্তালিনগ্রাডের যুদ্ধে লালফৌজের সাঁড়াশি আক্রমণের সামনে পড়তে হয়েছিল ভন পলাসের বাহিনীকে। ন্যটোর এখনকার কমান্ডারদের হিসাবে এই বিষয়টা রয়েছে। রুশ বাহিনী এখন দ্রুত চাইছে বাখমুটের নিয়ন্ত্রণ। সোলেডার ও বাখমুটের মধ্যেকার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা লাইনগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে এগোতে চাইছে রুশ সেনা। সেকারণে এখানে প্রতিদিনই লড়াই তীব্র হচ্ছে এবং একটু একটু করে এগোচ্ছে রাশিয়ার বাহিনী। ফলে এদিককার যুদ্ধের খুব বেশি বিশদ খবর পাওয়া যাচ্ছে না পশ্চিমী মাধ্যমে। 

৪। ডনবাস ক্রিসেন্ট

আসলে ডনেৎস্ক, লুগানস্ক, মারিয়ুপোল, ক্রামাটর্সক, স্লোভিয়ানস্ক, ইয়েনাকিইয়েভো, ঝাপোরিঝঝিয়া, মাইকোলায়েভ— সবটা মিলিয়ে ডনবাস এলাকা। এই গোটা এলাকার ওপরেই পূর্ণ কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায় রুশ সেনা। এভাবে নয়া নাৎসি জেলেনস্কিদের কর্তৃত্ব ইউক্রেনে খর্ব করতে পারলে, এই অঞ্চলের জনগণকে সঙ্গে নিতে পারলে এবং রুশ সেনাবাহিনীর অগ্রসর ঘাঁটি হিসাবে এলাকাগুলিকে গড়ে তুলতে পারলে, সবসবময়ই রুশ বাহিনীর পাল্লার মধ্যে থেকে যাবে কিয়েভ। সেক্ষেত্রে কিয়েভে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়ে মস্কোর ওপর হামলার ছক আরও এগিয়ে আনার জন্য ন্যাটোর আদত ছক (কিয়েভ থেকে মস্কো পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছতে সময় লাগে ৯ মিনিট) পুরোপুরি ভেস্তে যাবে। আসলে রাশিয়ায় ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্যই হল ন্যাটোর এই ছক ভেস্তে দেওয়া। এই লক্ষ্যেই ২০১৪ সালে কিয়েভের নির্বাাচিত সরকারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল মার্কিন মদতপুষ্ট কমলা বিপ্লবের জন্য। পরে ন্যাটো জোটের সেই একই ছক বেলারুশে পণ্ড হয়ে যায়। 

গোটা ডনবাস অঞ্চল যদি রুশ সেনা দখলে আনতে পারে তাহলেই ন্যাটোর মদতপুষ্ট ইউক্রেন বাহিনীকে প্রায় অর্ধচন্দ্রাকারে ঘিরে ফেলতে পারবে রুশ সেনা। সেই অর্ধচন্দ্রের পশ্চিমপ্রান্তে রয়েছে খেরসন, যার হিন্টারল্যান্ড আবার ক্রিমিয়া। এই অর্ধচন্দ্রাকার এলাকা খেরসন থেকে শুরু করে ঝাপোরিঝঝিয়া, লুগানস্ক, ডনেৎস হয়ে পূর্বপ্রান্তে পৌঁছেছে একেবারে সোলেডার হয়ে বাখমুটে। এই এলাকাতেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ইলঝুম শহর। বাখমুট থেকে খারকভের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। বাখমুটের পর রুশ বাহিনীর পরবর্তী স্বাভাবিক লক্ষ্য হবে খারকভ। খারকভ দখল হলে সেখান থেকে রুশ শহর বেলেগরোড–এর দূরত্ব মাত্র ৮০ কিলোমিটার, যেখানে সাধারণ গাড়িতে পৌঁছনো যায় পৌনে দুঘণ্টায়। অতএব রুশ বাহিনীর হাতে যদি পুরো খারকভের দখল চলে আসে তাহলে একেবার রুশভূমি ও হিন্টারল্যান্ড বেলেগরোড থেকে খারকভ হয়ে খেরসন পর্যন্ত বিস্তৃত রণাঙ্গণ রুশ সেনার দখলে চলে আসবে।  সেটাই রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযানের মূল পরিকল্পনা। পূর্ব রণাঙ্গনে সোলেডার ও বাখমুট রুশ দখলে চলে যাওয়ার স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব এটাই। সম্ভবত সেই লক্ষ্যে এগোচ্ছে রুশ সেনা। এবং ন্যাটোর সেনানায়করাও সোলেডারে পরাজয়ের কারণে বড়সড় পশ্চাদপসরণের আশঙ্কা বিষয়ে সচেতন। তাই মুখে তাঁরা যতই বলুন, সোলেডার স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, আসলে শীতের যুদ্ধে তাঁরা হেরে বসে আছেন। অতএব কামান লাও, বন্দুক লাও, ট্যাঙ্ক লাও বলে হাঁক পাড়ছেন। 


প্রকাশের তারিখ: ০৬-ফেব্রুয়ারি-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org