রেকর্ড ফলন, অথচ বেড়েই চলেছে দাম, কমছে সংগ্রহ

সুবোধ বর্মা
মানুষের পাতে প্রোটিনের বড়ো উৎস হল ডাল। গত বছরে সবরকম ডালের দাম বেড়েছে লাফ দিয়ে। বেড়েছে চাল ও গমের দামও। অন্যদিকে সরকারি সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হচ্ছে না। মজুত কম থাকায় রেশনে ও মিড ডে মিল প্রকল্পে খাদ্যশস্যের সরবরাহ অনিয়মিত। মজুত কম থাকায় সরবরাহের মাধ্যমে খোলা বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে সরকারি পরিকাঠামোর অভাবের কারণে কৃষকরা ফসল বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীদের। সবমিলিয়ে রেকর্ড উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও খোলা বাজারে চাল-গমের দাম বেড়েই চলেছে। এমনিতেই চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। অন্যদিকে রেশন ব্যবস্থা ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে। তার ওপর খোলা বাজারে চড়া দামের বোঝা মানুষের ঘাড়ে চেপে বসেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের জনগণ একটা ভয়ঙ্কর স্ববিরোধিতার দ্বারা তাড়িত হচ্ছেন। সেই একই বিষয়টি এবছর আবারও আরও অনেক বেশি জোরে ধাক্কা দিয়েছে। খাদ্যপণ্য, বিশেষত চালগমের মতো দানাশস্যের উৎপাদন প্রতি বছরেই ‘রেকর্ড’ ছুঁয়ে ফেলছে। অথচ খাদ্যশস্যের খুচরো দাম একটানা বেড়েই চলেছে। তাছাড়া, খাদ্যশস্যের সরকারি সংগ্রহ বাড়ছে তো না-ই, এমনকী কমছে। এবং ভালো লাভ না-পাওয়ায় কৃষকেরা ক্রমাগত অস্থির হয়ে উঠছেন। 

এবছর (২০২৩-২৪) ধানের ফলন বেড়ে হয়েছে ১,৩৭৬ লক্ষ টন, যা একটা নতুন রেকর্ড। গত এক দশকে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ, যা সত্যিই অভূতপূর্ব। অন্যদিকে, এবছর গমের উৎপাদন পৌঁছে গেছে ১১২৯ লক্ষ টনে। এটাও একটা রেকর্ড। গত একদশকে গমের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ (সরকারের ইউনিফায়েড পোর্টাল ফল এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস থেকে নেওয়া তথ্য)। 

এটা প্রত্যাশিত যে ফলন যদি এতটাই অপর্যাপ্ত হয়, তাহলে সরকারের হাতে ভালো পরিমাণে খাদ্যশস্য মজুত থাকবে। সরকারি সংস্থাগুলি বেশি বেশি করে শস্য সংগ্রহ করবে, এবং আইনত সরকার যেগুলি কার্যকর করতে বাধ্য সেই গণবণ্টন ব্যবস্থা (পিডিএস) এবং গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর প্রকল্প, যেমন স্কুলের বাচ্চাদের জন্য মিড ডে মিল, এবং আইসিডিএস-এর (ইন্টিগ্রেটেড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট স্কিম) অধীন অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পে আরও বেশি চাল ও গমের যোগান দেওয়া হবে।

কৃষকেরা সরকারি সংগ্রাহক সংস্থা ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া এবং বিভিন্ন রাজ্য স্তরের সরকারি সংগ্রহকারী সংস্থাকে তাদের উৎপন্ন ফসল বিক্রি করে থাকেন। ভালো পরিমাণে সংগ্রহ মানে সরকারি খুব ভালো এমএসপি বা ন্যূনতম সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা করবে। সংক্ষেপে, রেকর্ড পরিমাণ ফসল উৎপন্ন হওয়ার মানে সমাজের সবচেয়ে অভাবী অংশের কাছে ফসল ও টাকার স্রোত পৌঁছে যাবে। এতে খোলা বাজারেও দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকব। কারণ সাধারণত এমএসপি-র নিরিখেই খোলা বাজারে ফসলের দাম নির্ধারিত হয়। এমনটা হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ বহু মানুষই গণবণ্টন ব্যবস্থার আওতায় পড়েন না। তাদের সংখ্যাটা কয়েক কোটি। কারণ এখন যারা ভরতুকি দরে খাদ্যশস্য পান তাদের সংখ্যাটা নির্ধারিত হয়ে আছে ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে। 

কিন্তু দুঃখের বিষয় হল বাস্তবে এমনটা মোটেই ঘটছে না। এর পরের অংশে আমরা সেটাই দেখব।

দাম বেড়েই চলেছে

উপভোক্তা বিষয়ক সরকারি দপ্তরের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, গমের খুচরো দাম বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। অন্যদিকে সংখ্যাতথ্য মন্ত্রক থেকে পাওয়া উপভোক্তা মূল্য সূচকের তথ্য বলছে, গত বছরে গমের দাম বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। আবার বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু পাইকারি বাজারে ব্যবসায়ীরা বেশি দাম দেওয়ার কারণে, দাম বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। চালের দাম বেড়েছে এর চেয়েও বেশি। প্রায় ১৩ শতাংশ। উপভোক্তা বিষয়ক দপ্তরের তথ্য থেকে একথা জানা গেছে। 

মানুষের পাতে প্রোটিনের বড়ো উৎস হল ডাল।  গত বছরে ডালের দাম বেড়েছে লাফ দিয়ে। ছোলার ডালের দাম বেড়েছে ১৭ শতাংশ, তুর/অড়হর ডালের দাম বেড়েছে ২৭ শতাংশ, বিউলির ডালের দাম বেড়েছে ১৩ শতাংশ, মুগ ডালের দাম বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। গত কয়েক বছর ধরে ডালের চাহিদা বাড়া সত্ত্বেও, ভারতকে নির্ভর করতে হয় ডালের আমদানির ওপর। কারণ এলোমেলো সরকারি নীতির কারণে ডালের উৎপাদনে রয়েছে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। ২০২৩-২৪ সালে তুর/অড়হর ডালের উৎপাদন পৌঁছে যায় ৩৩.৮৫ লক্ষ টনে, যা আগের বছরের উৎপাদন ৩৩.১২ লক্ষ টনের চেয়ে সামান্য বেশি।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এর আগে অড়হর ডালের উৎপাদন ছিল আরও অনেক বেশি। ২০২০-২১ সালে ৪৩.১৬ লক্ষ টন, ২০২১-২২ সালে ৪২.২ লক্ষ টন। ২০২১-২২ সালে ছোলার ডালের উৎপাদন পৌঁছে যায় ১৩৫.৪৪ লক্ষ টনে এবং ২০২২-২৩ সালে এই ডালের উৎপাদন ছিল ১২২.৬৭ লক্ষ টন। কিন্তু ২০২৩-২৪ সালে এই ডালের উৎপাদন কমে হয় ১১৫.৭৬ লক্ষ টনে। এবারে বিউলির ডালের উৎপাদন ২০২৩-২৪ সালে কমে হয় ২৩ লক্ষ টন। অথচ  ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ সালে এই ডালের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ২৭.৭৬ ও ২৬.৩১ লক্ষ টনে। এবছর মুগ ডালের উৎপাদনও কমে হয়েছে ২৯.১৬ লক্ষ টন। গত বছর এই ডালের উৎপাদন ছিল ৩৬.৭৬ লক্ষ টন।

সংগ্রহ কমছে, মজুতও কমে আসছে

২০২৪ সালের জুন মাসে কেন্দ্রীয় পুলে গম মজুত ছিল ২৯৯.০৫ লক্ষ টন, যা জুন ২০২৩-এর তুলনায় ৫ শতাংশ কম। ২০২৩-এর জুনে গম মজুত ছিল ৩১৩.৮৮ লক্ষ টন। এই তথ্য জানিয়েছে ফুডগ্রেন বুলেটিন। এই বুলেটিন প্রতি মাসে খাদ্য ও গণবণ্টন দপ্তর প্রকাশ করে। কয়েক বছর আগে, ২০২১ সালের জুন মাসে গম মজুদ ছিল ৬০২.৯১ লক্ষ টন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে গমের মজুত কমে আসে ৭৫.০২ মেট্রিক টনে যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সবচেয়ে কম যা মজুত রাখতে হয় সেটা হল ৭৪.৬০ লক্ষ টন। ২০২৪ সালের এপ্রিলে মজুত ছিল তার চেয়ে সামান্য বেশি। সেই থেকে সংগ্রহের ফলে মজুত বেড়েছে, তবে আমরা আরও দেখতে পাব যে, তেড়েফুঁড়ে সংগ্রহে না-নামায় মজুত পর্যাপ্ত হতে পারেনি। ইতিমধ্যে, ২০২৪ সালের জুনে ধানের মজুত ছিল ৩২৫.১৮ লক্ষ টন, যা ২০২৩ সালের জুনের মজুত ২৬২.২৩ লক্ষ টনের অনেক বেশি।  

সংগ্রহের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সংকটের উৎস। এবছর গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩১০ লক্ষ টন। কিন্তু খাদ্য ও গণবণ্টন দপ্তরের কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যে জানা যাচ্ছে, এখন গম সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬০.৭১ লক্ষ টন। এবং বেশির ভাগ সংগ্রহের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এই সংগ্রহ মোটামুটি ভাবে গত বছরের সংগ্রহের সমান (২৬২ লক্ষ টন) এবং ২০২১-২২ সালের চেয়ে বেশি। সেবছর গমের সংগ্রহ কমে হয়েছিল মাত্র ১৮৭ লক্ষ টন। অথচ তার আগের বছরে, অর্থাৎ ২০২০-২১ সালে গম সংগ্রহ পৌঁছেছিল ৪৩৫ লক্ষ টনে। 

কেন এই রকম ওঠাপড়া? এর একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল, সরকারি (প্রধানত রাজ্যস্তরের সরকারি সংস্থাগুলি) সংগ্রহের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। উদাহরণ স্বরূপ, অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সংগ্রহ কেন্দ্র। যদি বেশি বেশি সংগ্রহ কেন্দ্র চালু করা হয় এবং সেগুলি ভালোভাবে কাজ করে, তাহলে কৃষকদের পক্ষে সেখানে বিক্রি করা সুবিধা হবে। অন্যদিকে, সংগ্রহ কেন্দ্রগুলি যদি দূরে হয়, যারা ছোটো কৃষক এবং যাদের সঙ্গতি কম, তারা কম দামে ব্যবসায়ীদের কাছে গম বিক্রি করে দেবে। কারণ পকেটের পয়সা খরচ করে সরকারি কেন্দ্রে ফসল নিয়ে যাওয়াটা তাদের পড়তায় পোষাবে না। সংগ্রহের চলতি মরশুমে, সরকারি তথ্য অনুযাযী, ২১,০৮০টি সংগ্রহ কেন্দ্র খোলার ‘পরিকল্পনা করা হয়েছিল’। অথচ মাত্র ১২,১৯৭টি কেন্দ্রে ‘লেনদেন হয়েছে’। অর্থাৎ এই কেন্দ্রগুলি ফসল সংগ্রহ করেছে। স্বাভাবিকভাবে, এ হল অকার্যকর সংগ্রহ।

২০২৪ সালের মে মাসের ফুডগ্রেন বুলেটিন অনুযায়ী, মে মাসের শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশ সংগ্রহ করেছে মাত্র ৪৮.৩৮ লক্ষ টন। অথচ গত বছর তারা সংগ্রহ করেছিল ৭০.৯৭ লক্ষ টন এবং ২০২১-২২এ ১২৮.১৬ লক্ষ টন। লক্ষ করার মতো বিষয় হল, মধ্যপ্রদেশের আগেকার মুখ্যমন্ত্রী এখন কেন্দ্রের কৃষি মন্ত্রক সামলাচ্ছেন। এবছর উত্তরপ্রদেশ গম সংগ্রহ করেছে ৯.২৭ লক্ষ টন, গত বছরের চেয়ে ২.২ লক্ষ টন বেশি। অথচ ২০২১-২২ সালে এই রাজ্য সংগ্রহ করেছিল ৫৬.৪১ লক্ষ টন গম। 

গণবণ্টন ব্যবস্থা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা

চাল-গম সংগ্রহ কম মানে গণবন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিলির জন্য কম খাদ্যশস্য পাওয়া যাবে। এর মানে খোলা বাজারে বিক্রির জন্য মজুত থেকে খাদ্যশস্য ছেড়ে দিয়ে তার সাহায্যে দামকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজে সরকার খুব বেশি নড়াচড়া করার সুযোগ পাবে না। গত বছর সরকার তার মজুত ভাণ্ডার থেকে ১০০ লক্ষ টন গম খোলা বাজারে বিক্রি করেছিল গমের দামে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার লক্ষ্যে। এতে কিছুটা সুবিধা হয়েছিল। তবে এবছর ব্যপারটা আদৌ সেরকম কিছু ঘটবে কিনা তা আগাম কিছুই বলা যায় না। শিল্প লবি বার বার চাপ দিচ্ছে গম আমদানি করার জন্য। যদিও সরকার জানিয়েছে এখন গম আমদানির ওপর যে ৪০ শতাংশ আমদানি শুল্ক জারি আছে তা থাকবে। ফলে আমদানির সম্ভাবনা আপাতত নেই। 

কয়েক বছর আগে খাদ্যশস্যের কেন্দ্রীয় পুলে গমের ভাণ্ডারে টান পড়ায়, রেশনে সরকার গমের বদলে মোটা দানাশস্য অথবা চাল দিয়েছিল। তবে বেশির ভাগ মানুষের এটা পছন্দ হয়নি। তাঁরা অভিযোগ করেছিলেন যে, যে-বাজরা রেশনে দেওয়া হয়েছে তার মান খুবই খারাপ। তাছাড়া গমটাই বেশির ভাগ লোক বেশি পছন্দ করেন।

কিন্তু বড়ো ছবিটা আরও বেশি উদ্বেগজনক: কৃষকেরা বাধ্য হচ্ছেন বেসরকারি ব্যবসায়ীদের কাছে ফসল বিক্রি করতে। কখনও ভালো দাম পাওয়ার কারণে। আবার কখনও বা সংগ্রহের পরিকাঠামো আলগা থাকার কারণে। এর ফলে সরকারি পরিচালিত পুরো ব্যবস্থাটাই ক্ষয়ের মুখে পড়বে। এর জেরে প্রথমে মার খাবে গণবণ্টন ব্যবস্থা। শেষ পর্যন্ত ধাক্কাটা এসে পড়বে খোলা বাজারের ওপর। 

নতুন রূপে যে সরকার এসেছে তারা মাথার ওপর ঝুলে থাকা এই সংকট সম্পর্কে অবহিত কি-না, কিংবা এটাকেই তারা দেখছে কি-না তাদের লক্ষ্যপূরণের একটা সুযোগ হিসাবে, যে-লক্ষ্য তারা পূরণ করতে পারেনি তিন কৃষি আইন বাতিলের কারণে– সে-নিয়ে জল্পনা চলতেই থাকবে। 

অনুবাদ: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ২৭-জুন-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org