|
উৎপাদনশীলতার সংকট ও পুঁজিবাদসাত্যকি রায় |
কিন্তু এই সাধারণ প্রক্রিয়াটি কার্যকরী হওয়া নির্ভর করে দুটি পূর্বশর্তের উপর। প্রথমত প্রযুক্তির বিস্তৃতি এবং দ্বিতীয়তঃ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির থেকে উদ্ভুত আয়ের বন্টন। লক্ষ্যণীয় যে আয় বৈষম্যের সঙ্গে এই দুটি শর্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থনীতিতে আয় বৈষম্য যদি বাড়তে থাকে তাহলে যে ধরনের জিনিস ধনীদের চাহিদায় যুক্ত হয় তা দেশে প্রযুক্তির বিস্তৃতি ঘটাতে বিশেষ সাহায্য করে না, বরং তা অনেক বেশি আমদানি নির্ভর হয়ে ওঠে। |
মানব সভ্যতার ইতিহাসে উৎপাদনশীলতার অগ্রগতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষ তাদের ব্যক্তিগত বা সামগ্রিক ব্যবহার্য সামগ্রীর সম্ভার ক্রমাগত বাড়িয়ে তোলে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানে আসলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি অর্থাৎ একক পরিমাণ উপকরণের ব্যবহারে ক্রমবর্ধমান মূল্য সংযোজন। মানুষের সভ্যতা যত এগিয়েছে সেই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। শ্রেণিবিভক্ত ব্যবস্থায় যেহেতু প্রয়োজনীয় ও উদ্বৃত্তের বিভাজনটি শাসক শ্রেণির স্বার্থে হয়ে থাকে তাই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি উদ্বৃত্তের সংযোজন হিসেবে প্রতিভাত হয়। যদি উৎপাদনের উপকরণের উপরে সামগ্রিক মালিকানা থাকে তবে প্রয়োজনীয় এবং উদ্বৃত্তের বিভাজনটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সেই ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উপস্থিত হয়। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদনশীলতার অগ্রগতির কথা বিবেচনা করলে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফসল বণ্টনের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এক অর্থে একই জিনিস অল্প সংখ্যক মানুষ দিয়ে তৈরি করার বাস্তবতাকে সূচিত করে। এবং সেটাই মানব সভ্যতার অগ্রগতির সূচক, এক কথায় সেটাই কাম্য। মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপাদনে কম সময় লাগলে তবে মানুষ প্রয়োজনীয়তার বাইরেও কিছু করার সময় পেয়ে থাকে। প্রশ্ন হল এই সঞ্চিত সময়ের উপরে সাধারণ মানুষের অধিকার থাকছে কী না! তার ওপরে নির্ভর করে উৎপাদনশীলতার গতি বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছবে কীনা। অতএব উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কখনোই মানব সভ্যতার সমস্যা নয় তা আসলে প্রয়োজনীয়তার পর্বের থেকে স্বাধীকারের পর্বে উত্তরণের এক অপরিহার্য পথ। এক্ষেত্রে প্রধান বাধাটি হল পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক। এই সম্পর্কে উৎপাদনের উপকরণের উপরে অল্প কিছু পুঁজিপতির ব্যক্তিগত মালিকানা থাকে এবং বেশিরভাগ মানুষের কাছে শ্রম বিক্রি করা ছাড়া বাঁচার অন্য কোন উপায় থাকে না। এই শ্রম শুধু মাত্র কায়িক শ্রম নয় মানসিক শ্রমও। কারখানার শ্রমিক থেকে লেখক বা অধ্যাপক বা গবেষক প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ শ্রম বিক্রি করে থাকেন। এক্ষেত্রে মানসিক ও কায়িক শ্রমের অনুপাতের বিভিন্নতা থাকার কারণে শ্রমের উপরে শ্রমজীবির অধিকারের বিভিন্নতা থাকলেও বিভিন্ন দক্ষতার শ্রম বিক্রি করেই এঁদের সকলকে বেঁচে থাকতে হয়। পুঁজিবাদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়া। মার্কস এ প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনা করেছিলেন এবং তার বক্তব্য ছিল, যে কোন একটি শিল্পক্ষেত্রে গড় মুনাফার চেয়ে বেশি মুনাফা করা অথবা প্রতিযোগী পুঁজিপতিকে পরাস্ত করে বাজারের বেশিরভাগ অংশটি দখল করার জন্য পুঁজিপতিরা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে থাকে। একক পিছু উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার ফলে এই ধরনের উদ্ভাবন পুঁজিপতিকে প্রতিযোগিতায় সুবিধে করে দেয়। সাধারণভাবে মনে করা হয় উৎপাদনশীলতা সর্বস্তরে বৃদ্ধি পেলে একক পিছু উৎপাদন খরচ কমে যায় ফলে জিনিসের একক পিছু দামও কমে। এর ফলস্বরূপ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায় এবং তার ক্রয় ক্ষমতা এই কারণে বেড়ে যায়। ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে তারা আগে যে জিনিসপত্র কিনছিল তার পরিমাণ বাড়াতে পারে অথবা নতুন ধরনের জিনিসের চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। উভয় ক্ষেত্রে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নতুন উদ্ভাবনের চাহিদা বাজারে তৈরি হয় যা পুঁজিপতিকে আবার নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে। শুধু তাই নয় পূর্বের নতুন প্রযুক্তি যখন ধীরে ধীরে ওই শিল্পের সাধারণ প্রযুক্তিতে পরিণত হয় তখন অতিরিক্ত মুনাফার জন্য পুঁজিপতিকে আবার নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হয় যাতে করে সে তার উৎপাদন খরচ, গড় উৎপাদন খরচের চেয়ে কমিয়ে আনতে পারে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির এই নিরন্তর প্রক্রিয়া শুধুমাত্র পুঁজির মুনাফারই বৃদ্ধি ঘটায় তাই নয়, তা শ্রমিকের প্রকৃত আয়ের বৃদ্ধি ঘটিয়ে থাকে এবং জিনিস কেনাবেচার বৃদ্ধির কারণে সরকারেরও কর আদায় বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই সাধারণ প্রক্রিয়াটি কার্যকরী হওয়া নির্ভর করে দুটি পূর্বশর্তের উপর। প্রথমত প্রযুক্তির বিস্তৃতি এবং দ্বিতীয়তঃ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির থেকে উদ্ভুত আয়ের বন্টন। লক্ষ্যণীয় যে আয় বৈষম্যের সঙ্গে এই দুটি শর্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থনীতিতে আয় বৈষম্য যদি বাড়তে থাকে তাহলে যে ধরনের জিনিস ধনীদের চাহিদায় যুক্ত হয় তা দেশে প্রযুক্তির বিস্তৃতি ঘটাতে বিশেষ সাহায্য করে না, বরং তা অনেক বেশি আমদানি নির্ভর হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়তঃ আয় বৈষম্য বাড়তে থাকলে অর্থাৎ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফসলের বেশিরভাগটাই যদি মুনাফায় রূপান্তরিত হয় তবে আয় বৃদ্ধির কারণে চাহিদা বৃদ্ধির গতি ক্রমাগত স্লথ হয়ে যায়। বিশ্বায়নের কারণে পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দেশের জাতীয় উৎপাদনে শ্রমের অংশ ক্রমাগত কমে যাওয়ায় আসলে শুধুমাত্র শ্রমিকের অংশকে কমিয়ে দিচ্ছে তাই নয় তা প্রকারান্তরে উৎপাদনশীলতার গতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আই এল ওর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে ১৯৯০ থেকে সারা পৃথিবীতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা যে গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছিল তা ২০০৮-৯ এর আর্থিক সংকটের পর ক্রমাগত কমে আসতে থাকে। শুধু তাই নয় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে শ্রমের উৎপাদনশীলতার ফারাক ক্রমাগত বেড়ে যায়। ১৯৯১ সালে উন্নত দেশের শ্রমিকরা গড়ে অনুন্নত দেশের শ্রমিকদের তুলনায় ১৪ গুন বেশি উৎপাদনশীল ছিল। ২০১৮ সালে দেখা যাবে যে শ্রমের উৎপাদনশীলতা উন্নত দেশগুলিতে উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে উন্নত দেশগুলিতে উৎপাদনশীলতার গতি বৃদ্ধির কারণে এই পার্থক্য বৃদ্ধি পেয়েছে এরকমটা নয়। এই পার্থক্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শ্রমের উৎপাদনশীলতার গতি বৃদ্ধি কমে আসা। গত তিন দশকে উন্নত দেশগুলিতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে বার্ষিক ৪৬ শতাংশ হারে। সেখানে অনুন্নত দেশগুলিতে শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে বার্ষিক ১৬ শতাংশ হারে। উৎপাদনশীলতার গতি বৃদ্ধির এই পার্থক্য যদি চলতে থাকে অনেকের মতে উন্নত দেশের শ্রমের উৎপাদনশীলতার অর্ধেকে পৌঁছাতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রায় ১৭৫ বছর লেগে যাবে। বিশ্বায়নের মধ্যে দিয়ে প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা সমান হয়ে আসার যে কল্প-রাজ্যটি নির্মাণ করা হয়েছিল তা আসলে সত্য নয় একথা সহজেই অনুমেয়। উন্নত দেশগুলি ঐতিহাসিকভাবে তাদের দেশে বিকশিত প্রযুক্তির উপরে তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্য নানা ধরনের সম্পত্তির অধিকার কার্যকরী রেখেছে। জ্ঞানের উপরে এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্তৃতিকেও সীমিত করে আনছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে যে বিশ্বায়নের যুগে যখন উৎপাদনশীল ক্রিয়া-কর্মের একটা বড় অংশ মূলত অনুন্নত দেশগুলিতে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে সস্তায় শ্রম ও কাঁচামালের সুযোগ নিতে তখন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার স্লথ হয়ে আসার প্রবণতাটি খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। আজকের পৃথিবীতে পুঁজিবাদের অতি-মুনাফার প্রধান রসায়নটি হল উন্নত দেশের প্রযুক্তির সঙ্গে সস্তা শ্রম ও কাঁচামালের সম্মেলন। অনুন্নত দেশগুলিতে শ্রমিকদের পূর্বতন অধিকার গুলিকে অস্বীকার করার মাধ্যমে শ্রমের দাম ক্রমাগত কমানো হচ্ছে এবং বিপুল পরিমাণ অরক্ষিত শ্রমিক আজকের পুঁজিবাদের উদ্বৃত্ত উৎপাদনের প্রধান উৎস হয়ে উঠছে। নানা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ধ্বংস করার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র এই পদ্ধতিকে সুনিশ্চিত করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে আজকের দিনের প্রধান প্রতিযোগিতা হল কত বেশি তারা শ্রম ও কাঁচামালের বাজারকে আন্তর্জাতিক পুঁজির কাছে সুলভ করে তুলতে পারে। কিন্তু মুশকিল হল সস্তা শ্রমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সীমিত। এই ধরনের শ্রমের উপরে নির্ভরশীলতা যত বাড়বে প্রাথমিকভাবে মুনাফা বৃদ্ধি পেলেও উৎপাদনশীলতার গড় বৃদ্ধির হার ক্রমাগত কমে আসবে । আবার অন্যদিকে বৈষম্য বৃদ্ধির ফলে চাহিদার গতি বৃদ্ধি কমে আসার জন্য বিনিয়োগে উৎসাহ সাধারণভাবে কমে আসছে এবং বিশেষত আমাদের মত দেশে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পুঁজিপতিদের বিনিয়োগ একেবারেই আশা ব্যঞ্জক নয়। এর ফলস্বরূপ স্বল্পমজুরি-স্বল্প বিনিয়োগ ও স্বল্প চাহিদার এক অর্থনৈতিক রেজিম তৈরি হচ্ছে যেখানে উৎপাদন ও তার বন্টনের এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে কিছু সুপারস্টার উৎপাদন সংস্থা যারা উচ্চ মানের প্রযুক্তির অধিকারী এবং তারা জ্ঞানের উপরও কর্তৃত্ব স্থাপন করছে, আর অপর মেরুটি নির্ভর করছে একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর ও ক্ষনিকের শ্রমসম্পর্ক নির্ভর এক গিগ অর্থনীতির উপর যেখানে শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে আনাটাই মূল্য সংযোজনের প্রধান উপায়। এই ধরনের শ্রম কখনোই দীর্ঘমেয়াদী ভাবে শ্রমের উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি ঘটাতে পারে না। অর্থাৎ মোটের উপর বলা যেতে পারে শ্রমিকের মজুরি যথাসম্ভব কমিয়ে এনে মুনাফা বৃদ্ধির যে ব্যবস্থাপনাটি পুঁজিবাদ বিশ্বায়নের যুগে নতুন করে নির্মাণ করছে সেটাই পুঁজিবাদে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির গতিকে ক্রমাগত পেছনের দিকে টেনে আনছে। প্রকাশের তারিখ: ২৮-সেপ্টেম্বর-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |