নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে নয়া পপুলার ফ্রন্টের কর্মসূচি

প্রভাত পট্টনায়েক
আজ ফ্রান্স চূড়ান্ত দফার নির্বাচনে। নব্য ফ্যাসিবাদের মোকাবিলায় কমিউনিস্টরা-সহ একজোট বামপন্থীরা। গড়েছেন নয়া পপুলার ফ্রন্ট। উপস্থিত করেছেন একটি সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মসূচি, যা সর্বতোভাবে নয়া উদারবাদের বিরোধী শুধু নয়, বরং পুরোদস্তুর নতুন এবং আগ্রহ-উদ্দীপক। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, বিশেষ করে এই ব্যাপারটা উন্নত অর্থনীতিতে ঘটছে বলে, ভাবনার যুদ্ধে এই কর্মসূচি এক নতুন শুরুর ইঙ্গিত বহন করছে।

ফ্রান্সের নির্বাচনে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্বাচনে উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানকে সাহায্য করার জন্য সুন্দর দৃশ্যপট নির্মাণ করেছেন। আর, বামপন্থী চারটি দল, কমিউনিস্টরা, সোশ্যালিস্টরা, গ্রিন পার্টি, আর জ্যাঁ লুক মেলেশোঁর দল আনবোড ফ্রান্স— সকলে মিলে নয়া পপুলার ফ্রন্ট বানিয়ে মেরিন লে পেনের ছুঁড়ে দেওয়া ফ্যাসিবাদী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।

এই অগ্রগতির এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। নয়া পপুলার ফ্রন্ট মনে করিয়ে দিচ্ছে ১৯৩০ সালে ইউরোপ জুড়ে পর্যায়ক্রমিকভাবে শক্তিশালী হতে থাকা, বিশেষ করে জার্মানি দখল করে ফেলা ফ্যাসিবাদের প্রেক্ষাপটে, ফ্রান্সে তৈরি হওয়া পপুলার ফ্রন্টকে। ম্যাক্রোঁ সোজাসুজি নয়া উদারবাদী। তাঁর সমর্থন পাওয়ার সম্ভবনা খুবই কম এ মুহূর্তে। পাশাপাশি আছেন উগ্র দক্ষিণপন্থীরা, যাঁরা তাঁদের নামের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ভাবেই অর্থনৈতিক বিষয়ে অস্পষ্ট— তাঁরা সঠিক সময়ে একচেটিয়া পুঁজির সাথে খোলামেলা বোঝাপড়া করবার আগে এখন কিছুটা নিমরাজি হয়ে বড় ব্যবসাগুলোকে সাহায্য করবেন বলছেন। অন্যদিকে নয়া পপুলার ফ্রন্ট উপস্থিত হয়েছে স্পষ্টতই বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে। একথা ঠিক তাঁদের ইউক্রেন যুদ্ধ বিষয়ে মার্কিন বক্তব্য সোশ্যালিস্টদের সঙ্গে নেওয়ার সুবাদে মেনে নিতে হচ্ছে, মেলেশোঁর গাজা গণহত্যা বিষয়ক অবস্থানও মানতে হবে, তবুও নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে তাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থান খুবই স্পষ্ট।

তাঁদের কর্মসূচি বলছে মাস মাইনের বৃদ্ধির কথা, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধিতে লাগাম দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা, ম্যাক্রোঁর অবসরের বয়সসীমা ৬৪ করার প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা, কারণ সরকারের পেনশন খাতে ব্যয়বরাদ্দ বেড়ে যাবে। মূলতঃ তাঁরা বলছেন পরিবেশ-বান্ধব পরিবর্তনের স্বার্থে ও জনগণের সাহায্যার্থে লগ্নির কথা। এই কর্মসূচি পালন করতে কত খরচ হতে পারে সে হিসাব নয়া পপুলার ফ্রন্ট ইতোমধ্যেই করেছে।‌ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বারা অনুমোদিত কোষাগারীয় ঘাটতির পরিমাণ না বাড়িয়ে, বরং বাড়তি লাভবান হচ্ছে এমন কোম্পানির উপর ট্যাক্স চাপানোর পক্ষপাতী তাঁরা, চাইছেন, ম্যাক্রোঁর বন্ধ করে দেওয়া সম্পদ-কর আরেকবার চালু করতে। এঁরা বলছেন ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার অসংখ্য ছিদ্র বন্ধ করতে আর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের একটা উর্ধ্বসীমা রাখতে, যাতে বাড়তি অংশটুকু অন্তত সরকার পেতে পারে।

এইসমস্ত দাবিই এত বছর ধরে নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা প্রস্তাব করে আসছে এবং মূল ধারার সংবাদমাধ্যমগুলো শুধু ফ্রান্সে নয়, বিশ্বজুড়ে, এমনকি ভারতেও যা প্রচার করে আসছে, তার সরাসরি বিরোধী। যখন প্রস্তাব উঠেছিল সবদেশই নিদেনপক্ষে ২৫ শতাংশ কর কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর উপর চাপাক, যাতে বিভিন্ন কর-কাঠামোর সুযোগ নিয়ে পুঁজি দেশান্তরে যাত্রা করতে না পারে, তখন বেশিরভাগ সরকারই বিশ্বায়িত লগ্নি পুঁজির দাসত্ব করার জন্য হয় এ প্রস্তাবের সরাসরি বিরোধিতা করে না হলে গয়ংগচ্ছ নীতি গ্রহণ করে। শেষ পর্যন্ত চুক্তি হয়েছিল ১৫ শতাংশ কর চাপানোর, ঘটনাক্রমে সেটা যদিও বেশিরভাগ দেশের আগে থেকেই কার্যকর কর্পোরেট করহারের চেয়ে কম, এই প্রসঙ্গেই বাড়তি লাভবান কোম্পানির উপর কর চাপানোর প্রস্তাব বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করেছে। পাশাপাশি, সাধারণভাবে সম্পদ-কর প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েই থাকে, কারণ কর চাপানো কঠিন আর যে রাজস্ব পাওয়া যায় তা কর চাপানোর খরচের চেয়ে কম। এই যুক্তিতেই ভারতেও যে সম্পদ-কর আগে কার্যকর ছিল তা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছিল। গড়িমসি করে সম্পদ-কর চাপানো আর কম রাজস্ব পাওয়া— সম্পদ-কর প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য দেওয়া অপযুক্তি ছাড়া কিছু নয়। নয়া পপুলার ফ্রন্ট এই মিথ্যাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এবং তাঁরা সম্পদ-কর পুনরায় চালু করার প্রস্তাব করছেন।

অন্যান্য সব রাজনৈতিক পক্ষও সম্প্রতি সম্পদ-কর কার্যকর করার দাবি করেছে, বিশেষ করে রাজস্ব সংগ্রহের জন্য। আমেরিকার শেষ নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট পার্টির দু'জন বার্নি স্যাণ্ডার্স এবং এলিজাবেথ ওয়ারেন এই দাবি করেন, কিন্তু মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেহেতু ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপক্ষে তাদের মনোনয়নই গ্রহণ করেনি, সেকারণে তাদের প্রস্তাব সংসদীয় স্তরেই থেকে যায়। খুব সম্প্রতি, বিশ্ব অসাম্য তথ্যসম্ভারের সঙ্গে যুক্ত ফরাসী অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি ভারতে সম্পদের অসাম্যের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পদ-কর পুনরায় চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যে দাবি বামপন্থী দলগুলো ঢের আগে থেকেই জানিয়ে আসছে।

পাশাপাশি, নয়া পপুলার ফ্রন্টের দাবি হল উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের উপর ট্যাক্স বসানো, যা যে কোনও গণতান্ত্রিক সমাজেই থাকা উচিত। সত্যি বলতে কী, এ ধরণের কর বিশেষ কোনো গুণাবলীর জন্য প্রাপ্ত অর্জন হিসাবে লভ্যাংশকে বুঝবার পুঁজিবাদী দর্শনের সাথে খুবই সঙ্গতিপূর্ণ, যা উত্তরাধিকার সূত্রে না পাওয়াই উচিত বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে, উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের কর সংক্রান্ত আইন আলাদাভাবে থাকতে পারে, ঠিকই, কিন্তু এটি সম্পদ করের একটি দরকারি সংযোজন'ও বটে। এদেশে যখন একজন পরিচিত কংগ্রেসী উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ-কর চালু করার দাবি জানান (বামপন্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে যে কথা বলে আসছে), কোনও সংবাদ সংস্থা দেখায়নি যে তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সম্ভব হলে প্রায় তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে প্রস্তাবটিকে সাম্প্রদায়িক-ফ্যাসিবাদী কায়দায় দুমড়ে মুচড়ে দাবি করেছিলেন যে কংগ্রেস আসলে হিন্দু মহিলাদের গয়না নাকি মুসলমানদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে চায়। নয়া পপুলার ফ্রন্ট সত্যি বলতে কী শুধু উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে কর নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের উর্ধ্বসীমা নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব করছে, সে বিষয়টি এ প্রসঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই বিষয় বলা চলে জনস্বার্থে ব্যয়বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি সম্পর্কেও। আমরা নিজেদের দেশেও দেখছি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষময় ফলাফল। এসব অবশ্যই নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের দাবির প্রতি সমর্থনসূচক পদক্ষেপ, যার ফলে এসব পরিষেবা অকারণে মহার্ঘ হয়ে গেছে। বস্তুত, কৃষকদের ঋণগ্রস্ত হয়ে যাওয়ার এবং ঋণ শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করার এক মুখ্য কারণ দেখা যায় হঠাৎ ঘাড়ে চাপা বিপুল স্বাস্থ্য খরচ।

অন্যদিকে, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধিতে লাগাম টানা আসলে মুদ্রাস্ফীতিতে জর্জরিত জনতাকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা। এই প্রস্তাব আসলে পুঁজিবাদী রক্ষণশীলতা যা আর্থিক ও কোষাগারীয় নীতির সমস্ত যন্ত্র ব্যবহার করে, তা সম্পূর্ণত ভেঙে বেরিয়ে আসার পথ। এইসব নীতি অর্থনীতি ও নিয়োগ সংক্রান্ত সমস্ত কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়। বর্ধিত বেকারত্বই মুদ্রাস্ফীতির একমাত্র সমাধান বলে পুঁজিবাদ মনে করে। বেকারত্ব বাড়ানোর চেয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ করা মুদ্রাস্ফীতির অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য সমাধান। অতীতে ভারতের মাটিতে এসব কথা বামপন্থীরা বারবার বলেছেন, এখন ঘটনাচক্রে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তির কর্মসূচিতে এসব দাবি স্থান পাচ্ছে।

দশকের পর দশক ধরে বিশ্বায়িত পুঁজির মুখপাত্রেরা আবর্জনা ছড়িয়েছেন, দাবি করে গেছেন এই ময়লা ছড়ানো ছাড়া আর নাকি উপায়ান্তর নেই। বিপরীতে নয়া পপুলার ফ্রন্টের কর্মসূচি নিয়ে এসেছে দমকা বাতাস। অবাক হওয়ার কিছু নেই, ফ্রান্সের বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যম এবং একদল রাজনীতিবিদ— একেবারে নয়া উদারবাদী থেকে উগ্র দক্ষিণপন্থী পর্যন্ত সকলেই— নয়া পপুলার ফ্রন্টের অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে খুব সমালোচনা শানাচ্ছেন— ফ্রান্সের অর্থনীতি নাকি ধ্বংস হয়ে যাবে এই কর্মসূচি রূপায়ণ করলে— এসব ভয় তাঁরা মানুষকে দেখাচ্ছেন। তারপরেও, নয়া পপুলার ফ্রন্ট এখনো পর্যন্ত জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী বেশ ভালো অবস্থানেই আছে। উগ্র দক্ষিণপন্থীরা ৩১ শতাংশ জনসমর্থন পেলে নয়া পপুলার ফ্রন্ট ২৬-২৮ শতাংশ জনসমর্থন পেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে, সেক্ষেত্রে ম্যাক্রোঁ'র পার্টি ২০ শতাংশ জনসমর্থনের নিচে নেমে যাবে।

ফ্রান্সের বামপন্থীরা যে নিজেদের মধ্যেকার মতামতের পার্থক্য দূরে সরিয়ে রেখে, ফ্যাসিবাদকে হারাতে নেমেছেন, সেটা স্বাগত জানান উচিত। স্যোশাল ডেমোক্র্যাট নেতা গ্লুকসম্যান, জ্যাঁ লুক মেলেশোঁর বিরুদ্ধে তাঁর বহুকালের তিক্ততা সরিয়ে রেখে নয়া পপুলার ফ্রন্ট'কে সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে মেলেশোঁ কথা দিয়েছেন যে যদি নয়া পপুলার ফ্রন্ট জয়ী হয়, এবং অন্যরা যদি না চায়, সেক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবেন না। ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া এবং মতাদর্শগত পার্থক্যগুলো সরিয়ে রেখে নয়া পপুলার ফ্রন্ট যেভাবে উগ্র দক্ষিণপন্থার ক্ষমতায় আসার পথে বাধা সৃষ্টি করছে, তা সত্যিই অনন্য।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে আরো লক্ষ্যণীয় বিষয় হল এমন একটি সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মসূচির গ্রহণ করা হয়েছে যেটি সর্বতোভাবে নয়া উদারবাদের বিরোধী শুধু নয়, বরং সম্পূর্ণতই নতুন এবং আগ্রহ-উদ্দীপক। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, বিশেষ করে ব্যাপারটা উন্নত অর্থনীতিতে ঘটছে বলে, ভাবনার যুদ্ধে এই কর্মসূচি এক নতুন শুরুর ইঙ্গিত বহন করছে।

(ছবি: ১৪ জুন, প্যারিসে নয়া পপুলার ফ্রন্ট গঠনের সাংবাদিকদের মুখোমুখি ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ফাবিয়েন রোসেল।)

ভাষান্তর: নবারুণ চক্রবর্তী


প্রকাশের তারিখ: ০৭-জুলাই-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org