পুঁজির প্যাঁচে পরিবেশ

বাসব বসাক
দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর শান্ত সমুদ্রতট জুড়ে আজও দেখা যায় গাঙচিলের মেলা। আজও সমুদ্রতট সাদা হয়ে থাকে গাঙচিলের বিষ্ঠায় যার স্থানীয় নাম গুয়ানো। এক সময় এই গাঙচিলের বিষ্ঠাও লুট করতে ছাড়ে নি ইংরেজ বনিকরা। কেননা ওই নাইট্রোজেন পূর্ণ গুয়ানো চাষের জমিতে সার হিসাবে অত্যন্ত কার্যকর। ১৮৩৫ সাল থেকেই ইংল্যান্ডে শুরু হয় গুয়ানো আমদানি। হিসাব বলছে ১৮৪১ এ যেখানে পেরু থেকে বস্তায় ভরে জাহাজে ক’রে নিজেদের দেশে ইংরেজরা নিয়ে গেছিল ১৭০০ টন গুয়ানো সেখানে মাত্র ছ’বছরেরর ব্যবধানেই তারা আমদানি করে ২২০০০ টন গুয়ানো। ইতিমধ্যে ১৮৫৬ তে ময়দানে নামে আমেরিকা। এইভাবে ক্রমে শুধুমাত্র গুয়ানোর জন্য তারা দখল করে ৯৪ টি দেশ। এক সময় ইংল্যান্ডও আমেরিকা গুয়ানোর জন্য পরস্পর যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়ে যা ইতিহাসে গুয়ানো যুদ্ধ নামে পরিচিত। পরে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার আবিষ্কার হলে গুয়ানো আমদানি বন্ধ হয়। এ ভাবেই মুনাফার নেশায় উন্মত্ত পুঁজিবাদ ক্রমশঃ হয়ে উঠেছে সর্বাত্মক ধ্বংসের পূজারী।

পৃথিবীর গভীর, গভীরতর অসুখ এখন।

 সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অধীনস্থ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি পরামর্শদাতা গোষ্ঠী (ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ্, সংক্ষেপে আইপিসিসি) দীর্ঘ প্রায় চার বছরের গবেষণালব্ধ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত যে সর্বশেষ মূল্যায়ন রিপোর্টটি ২০২২ সালে পেশ করেছে সেটি যারপরনাই উদ্বেগজনক। সেই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ১৭৫০ এর পর থেকে উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী অন্যতম গ্রিন হাউজ গ্যাস কার্বন ডাই অক্সাইড ৪৭% বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে বাতাসের গ্যাসীয় উপাদানের প্রতি ১০ লক্ষ ভাগের ৪১০ অংশ ভাগ (পার্টস পার মিলিয়ন বা পিপিএম); মিথেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮৬৬ পিপিএম; ১৯৫০ এর তুলনায় ১৫৬% বেড়ে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ বর্তমানে হয়েছে ৩৩২ পিপিএম। কেবল ২০১৯ সালেই কার্বন ডাই অক্সাইডের ঘনত্ব যে পরিমাণে বেড়েছে তা গত বিশ লক্ষ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফলে হু হু ক’রে বেড়ে চলেছে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা, অতি দ্রুত গলে যাচ্ছে হিমবাহ ও মেরু প্রদেশের জমাট বাঁধা বরফ, লাফিয়ে বাড়ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা, আমাদের মত দেশে কমছে গড় বৃষ্টিপাত, বাড়ছে তাপপ্রবাহ, বাড়ছে সর্বাত্মক দূষণ। আর এসবের সম্মিলিত ফলস্বরূপ আজ বিপন্নতার শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছে সভ্যতা। আইপিসিসির এই ষষ্ঠ জলবায়ু মূল্যায়ন রিপোর্টটিকে তাই অভিহিত করা হয়েছে বিপন্ন পৃথিবীর দলিল হিসাবে। কিন্তু এহেন বিপন্নতার দায় কার? আইপিসিসি অবশ্য এই প্রথম তাদের রিপোর্টে স্বীকার করেছে জলবায়ুর এমন সর্বনাশা পরিবর্তনে ও বেলাগাম উষ্ণায়নের দায় মানুষেরই। জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমিত ব্যবহার, নির্বিচার অরণ্য হত্যা, অপ্রতিরোধ্য গতিতে নগরায়ন, সীমাহীন দূষন – এসব কিছুর দায় মানুষকে নিতে হবে বৈকি! কিন্তু সে দায় কি ব্যক্তিমানুষের? নাকি সমাজের? নাকি আরও স্পষ্ট ক’রে বললে প্রত্যেক ব্যক্তিমানুষ যে সমাজ ব্যবস্থার দাবার বোড়ে সেই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকদের?

দায় কার?

গত শতাব্দীর ছ’য়ের দশকে প্রতিবাদী পরিবেশবিদ্ রাচেল কার্সন সঠিক ভাবেই উল্লেখ করেছিলেন যে “আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গতিময়তা, বিপুল পরিমান ভোগলিপ্সা এবং অতি সহজে অতি দ্রুত মুনাফা অর্জনই একমাত্র আরাধ্য দেবতা”। আসলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত আছে আজকের পরিবেশ সংক্রান্ত যাবতীয় সঙ্কট ও বিশ্বজনীন দূষণের বীজ। মনে রাখা দরকার যে, আপামর মানুষের জীবন ধারনের জন্য আবশ্যিক অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের সনাতন চাহিদা পূরণ কখনোই এমন সর্বগ্রাসী পরিবেশ সঙ্কটের কারণ হতে পারে না। বরং মোহময় বিজ্ঞাপনের দ্বারা সযত্ন-সৃজিত অলীক চাহিদার স্বর্ণমৃগের পিছনে মানুষকে ছুটতে যখন বাধ্য করা হয়, তখনই চূড়ান্ত অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় প্রকৃতি ও পরিবেশকে। এরই নাম ভোগবাদ। বিজ্ঞাপনের ভাষায় ‘আপনা পেয়াস বুঝাও; বাকি সব বাকওয়াস হ্যায়’। এই ভোগবাদী দর্শনের প্রচার ও প্রসারই হ’ল পুঁজিবাদের মূল চালিকা শক্তি। কেননা মানুষকে মোহমুগ্ধ ক’রে মিথ্যা চাহিদা তৈরি করতে না পারলে আপাত-অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আবিশ্ব বাজার তৈরি হবে কোন পথে? 

পুঁজিবাদের জন্ম 

ঐতিহাসিকরা মনে করেন আজ থেকে আনুমানিক দশ-বারো হাজার বছর আগে প্রথম কৃষিকাজ করতে শিখেছিল মানুষ। আদিম মানুষ হয়তো কৃষিকাজ শেখার আগের পর্বে প্রকৃতিতে আপন খেয়ালে বেড়ে ওঠা গম জাতীয় বুনো উদ্ভিদের বীজ সংগ্রহ ক’রে তাদের ক্ষুণ্নিবৃত্তি করত। এক সময় তারা চিনতে শিখলো ওই বিশেষ উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক জল হাওয়া আলো মাটির মত প্রাকৃতিক শর্তাবলী; বুঝল বীজ থেকে নতুন উদ্ভিদ জন্মানোর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি। সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকেই সে শ্রমের সাহায্যে ফসল উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করার কৌশল রপ্ত করল। আর এইভাবে জন্ম নিল কৃষি। প্রাথমিকভাবে মানুষ উৎপাদন করেছে তার নিজের, পরিবারের, বড়জোর তার বাসভূমির আর পাঁচজনের জন্য। যেটুকু উদ্বৃত্ত তা জমা হত গোষ্ঠীপতি বা জমিদারদের গোলায়। কিন্তু ইউরোপে সপ্তদশ শতকের শেষ পর্বে শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে উৎপাদনের উন্নততর যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই ক্রমশঃ গোটা উৎপাদন ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন শুরু হল। মনুষ্য নির্ভরতার জায়গায় ক্রমে বাড়তে লাগলো যন্ত্র নির্ভরতা; এবং স্বভাবতই গোটা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকের জায়গায় উঠে এল ওইসব যন্ত্রের মালিকরা। কার্ল মার্কসের কথায় "...the forces of nature are appropriated as agents of the labour process only by means of machines and only by the owners of machines." এইভাবে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার গর্ভে জন্ম নিল এক পুঁজিনির্ভর সমাজব্যবস্থা; যে নতুন ব্যবস্থায় উৎপাদনের উদ্দেশ্যই গেল বদলে।যে ব্যবস্থায় উৎপাদনের এক এবং একমাত্র লক্ষ্যই হয়ে দাঁড়াল মুনাফা। এহেন নতুনতর ব্যবস্থার পটভূমিতে মানুষ ও প্রকৃতির আন্তঃক্রিয়ার মাঝে জন্ম নিল এক ধরনের চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতা। কেননা এই ব্যবস্থায় উৎপাদিত পণ্যের ব্যবহারিক মূল্যের পাশাপাশি জন্ম নিল বিনিময় মূল্য – যে বিনিময় মূল্য নির্ধারনে প্রকৃতির ন্যূনতম কোন ভূমিকা রইলো না। যেহেতু মুনাফাই এই ব্যবস্থার চালিকা শক্তি, তাই বিশ্বজোড়া বাজার দখলই হয়ে দাঁড়ালো পুঁজিবাদের প্রধান লক্ষ্য। সেই সঙ্গে উন্নততর প্রযুক্তি যেহেতু উৎপাদনের জিওনকাঠি, তাই প্রকৃত সম্পদের উৎস হিসাবে মানুষ ও প্রকৃতি – উভয়কেই কার্যত অস্বীকার করতে চাইল পুঁজিবাদ। পাশাপাশি শিল্প স্থাপনের জন্য গড়ে উঠল বড় বড় শহর। অন্যদিকে কৃষিক্ষেত্র বৃহৎ মালিকানাধীন হয়ে পড়ায় কৃষি শ্রমিকরা দলে দলে ভিড় করল শহরগুলোতে। তারা পরিণত হল সস্তা শিল্প শ্রমিকে। এর ফলে খাদ্যের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি তথা মাটি থেকে আহৃত ও আত্তীকৃত উপাদান কায়িক শ্রম এবং মল-মূত্র বা মৃতদেহ হিসাবে পুনরায় মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রাকৃতিক মিথস্ক্রিয়া (মার্কস যাকে বলেছেন মেটাবলিজম) তা ভীষণভাবে বাধাপ্রাপ্ত হল। কার্ল মার্কস একেই বলেছেন বাস্তুতান্ত্রিক ফাটল। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হল প্রকৃতি ও পরিবেশের মারাত্মক অবক্ষয়। অবশ্য কার্যত ষোড়শ শতাব্দী থেকেই শুরু হয়েছিল ইউরোপীয় বণিকদের দখলদারির অভিযান।

কলম্বাসের চিঠি

ইউরোপের উদীয়মান বানিয়াদের প্রতিনিধি হয়ে কলম্বাস যে দিন আমেরিকার মাটিতে পা ফেলেছিলেন সেদিনই তিনি বুঝেছিলেন এ মাটিতে সোনা ফলবে। তাঁর লেখা চিঠিতে তিনি তাঁর লোভের কথা গোপনও করেন নি, ‘এখানকার পর্বত আর সমভূমি, বুগিয়াল আর প্রান্তর এত অপূর্ব আর কৃষিকাজ ও পশুপালনের অনুকূল এবং গ্রাম ও শহর গড়ে তোলার জন্যে এত সমৃদ্ধ যে না দেখলে বিশ্বাসই হয় না’। তারপর ১৫০০ শতাব্দী থেকে বিশ্বের নানা প্রান্তে ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপনের সূত্র ধরেই গণহারে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের সূচনা হয়। কেননা উপনিবেশ স্থাপনকারীরা শুধু মুনাফা বোঝে। তাদের মুনাফার চূড়ান্ত খিদে মেটাতে একে একে শেষ হতে থাকে অরণ্য, খনি অথবা বেভার, ভাল্লুক বা হরিণের মত প্রাণীরা। শুরু হয়ে যায় প্রকৃতির দেদার লুট। স্থানীয় জনজাতির মানুষও লোহার কুঠারের মাথা, সিল্কের রুমাল বা গাদা বন্দুকের বিনিময়ে একদিকে দেদার হত্যা করতে থাকে ওইসব প্রাণী আর অন্যদিকে ক্রমশঃ ভুলতে থাকে তাদের সাবেক জীবনচর্যা। আর সামান্য উপহারের বদলে ইউরোপীয় বণিকরা পশু চামড়া ও লোমের ব্যবসায় ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে ইউরোপে। বেভার কোট ক্রমে হয়ে ওঠে ইউরোপীয় আভিজাত্যের প্রতীক। আর ওই মৃত বেভারের চামড়া ফরাসি বণিকদের হাতে তুলে দেওয়ার স্বত্ব নিয়ে শুরু হয় স্থানীয় উপজাতিদের মধ্যে যুদ্ধ। মাঝখান থেকে একদিন অবলুপ্তির পথে চলে যায় বেভারের মত প্রাণীরা। একটি হিসাব বলছে দু’শ বছরের শাসনে ইংরেজরা আমাদের দেশ থেকে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করেছে তার পরিমাণ আজকের দিনের অঙ্কে ৪৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। সেই বিপুল অর্থ তারা ব্যবহার করেছে নিজের দেশে শিল্প স্থাপনে অথবা নতুন নতুন উপনিবেশ দখল ক’রে নয়া উদ্যমে লুট চালাতে। সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে। নাইজেরিয়ার শেল কোম্পানির ওয়েবসাইট খুললেই দেখা যাবে স্থানীয় ওগোনি সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট কবি প্রয়াত কেন-সারোউইয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য। কিন্তু যে কথাটা অনুচ্চারিত আছে তা হল ১৯৯৫ সালে ওই শেল কোম্পানি তাদের তেলের খনি অন্যায় ভাবে সম্প্রসারণ করতে গিয়ে ওগোনি উপজাতিদের বাধার মুখে পড়ে। কবি কেন ওগোনি উপজাতিদের জল জমি জঙ্গলের লড়াইয়ে তাদের পাশে দাঁড়ান। অবরুদ্ধ এলাকা শেলের জন্য অবরোধ মুক্ত করতে নামে মিলিটারি। মিলিটারির গুলিতে প্রাণ হারান জনজাতি গোষ্ঠীর ন’জন মানুষ। তাদের মধ্যে ছিলেন কবি কেনও। আমাদের রাজ্যেও অনেকটা একই রকম ঘটনা ঘটতে দেখছি আমরা দেউচা পাচামিতে।

পক্ষীবিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ

দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর শান্ত সমুদ্রতট জুড়ে আজও দেখা যায় গাঙচিলের মেলা। আজও সমুদ্রতট সাদা হয়ে থাকে গাঙচিলের বিষ্ঠায় যার স্থানীয় নাম গুয়ানো। এক সময় এই গাঙচিলের বিষ্ঠাও লুট করতে ছাড়ে নি ইংরেজ বনিকরা। কেননা ওই নাইট্রোজেন পূর্ণ গুয়ানো চাষের জমিতে সার হিসাবে অত্যন্ত কার্যকর। ১৮৩৫ সাল থেকেই ইংল্যান্ডে শুরু হয় গুয়ানো আমদানি। হিসাব বলছে ১৮৪১ এ যেখানে পেরু থেকে বস্তায় ভরে জাহাজে ক’রে নিজেদের দেশে ইংরেজরা নিয়ে গেছিল ১৭০০ টন গুয়ানো সেখানে মাত্র ছ’বছরেরর ব্যবধানেই তারা আমদানি করে ২২০০০ টন গুয়ানো। ইতিমধ্যে ১৮৫৬ তে ময়দানে নামে আমেরিকা। এইভাবে ক্রমে শুধুমাত্র গুয়ানোর জন্য তারা দখল করে ৯৪ টি দেশ। এক সময় ইংল্যান্ডও আমেরিকা গুয়ানোর জন্য পরস্পর যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়ে যা ইতিহাসে গুয়ানো যুদ্ধ নামে পরিচিত। পরে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার আবিষ্কার হলে গুয়ানো আমদানি বন্ধ হয়। এ ভাবেই মুনাফার নেশায় উন্মত্ত পুঁজিবাদ ক্রমশঃ হয়ে উঠেছে সর্বাত্মক ধ্বংসের পূজারী। 

ব্যক্তিমানুষের ঘাড়ে দায় চাপানোর কৌশল

জলবায়ু পরিবর্তন থেকে সর্বব্যাপী দূষণের নেপথ্যে যে এই প্রচলিত ব্যবস্থাটাই – এই সত্য যত প্রকট হয়ে উঠছে ততই পুঁজিবাদ মরিয়া হয়ে উঠছে যেনতেনপ্রকারেণ সেই সত্য থেকে আমাদের নজর ঘোরাতে। এই নজর ঘোরানোর কাজটা শুরু হয়েছিল সেই ১৯৫৩ সালে যখন প্যাকেজিং শিল্পে সদ্য প্লাস্টিকের আবির্ভাব হচ্ছে। সেই সময় আমেরিকা জুড়ে শুরু হয় আমেরিকাকে সুন্দর রাখো ('Keep America Beautiful') নামে এক প্রচারাভিযান। যার মূল কথা ছিল কাচের বোতলের বদলে ব্যবহার করো প্লাস্টিকের বোতল। বলাই বাহুল্য এই প্রচারের নেপথ্যে ছিল প্যাকেজিং শিল্পের মাথারাই। অনেক পরে ২০১১ তে বৃটেনকে ছিমছাম রাখো ('Keep Britain Tidy') নামে একই রকম প্রচার দেখেছি ইংল্যান্ডে। এখানেও নেপথ্যে যথারীতি ইম্পিরিয়াল টোবাকো, ম্যাকডোনাল্ড বা রিগলের মত বহুজাতিক কোম্পানি। যখন প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে মানুষের কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করল তখন দূষণের সব দায় সুকৌশলে ব্যক্তিমানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে কসুর করে নি পুঁজিবাদ। ১৯৭১ এর ২২ এপ্রিল দ্বিতীয় বসুন্ধরা দিবসের প্রাক্কালে আমেরিকান ক্যান কোম্পানি বহু অর্থ ব্যয় করে হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা আয়রন কোডিকে দিয়ে সে দেশের দূরদর্শনের জন্য একটি মহার্ঘ্য বিজ্ঞাপন তৈরি করে, যেখানে দেখা যায় প্লাস্টিকের ফেলে দেওয়া আবর্জনায় অবরুদ্ধ এক নদীর বাঁকে আটকে যাওয়া নৌকায় দাঁড়িয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখে নাটকীয় ঢঙে কোডি বলছেন কিছু মানুষের আজও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের প্রতি গভীর ও অনুরাগপূর্ণ শ্রদ্ধা আছে, যা একসময় এই দেশে ছিল। কিন্তু কিছু মানুষের তা নেই। মানুষই দূষণ শুরু করে। মানুষই পারে তাকে রুখে দিতে”। ব্যাস। সবটুকু দায় দিব্যি চাপিয়ে দেওয়া গেল মানুষের ওপর। সেই সঙ্গে উপরি পাওনা হিসাবে কিছু মানুষের মনে এই সর্বাত্মক দূষণের জন্য জাগিয়ে তোলা গেল এক ধরনের অপরাধবোধও। আসল অপরাধী থেকে গেল আড়ালেই। যেমন আড়ালে পাঠিয়ে দেওয়া গেল আরও অনেক প্রশ্ন - কেন এখন পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে ১০ লক্ষ প্লাস্টিক বোতল বিক্রি হয়? কারা বানায় সে সব বোতল? কেন সমুদ্রে জমা হয় ৯০ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য? কেন বহুজাতিক কোম্পানিগুলি ঘোষণার তুলনায় পুনর্নবীকৃত প্লাস্টিক তৈরি করে অতি নগন্য? বরং আপনার আমার সব রোষ গিয়ে পড়লো বাজারের সেই মাছ বিক্রেতার ওপর যে কিনা আমারই সুবিধার কথা ভেবে পলিপ্যাকে মাছের টুকরোগুলো ভরতে যাচ্ছিল। অথবা আমি আপনি কাপড়ের ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে বীরদর্পে বাজারে গিয়ে মনে মনে পুলকিত বোধ করলাম এই ভেবে যে, হোক না বিদুরের শস্য দানা, তবু তো কিছু করছি আমরা এই হেজে মজে যাওয়া প্রকৃতির জন্য। আমরা কি করে জানব একখানা বড়োসড়ো কাপড়ের টোটে ব্যাগ বানানোর পরিবেশগত অভিঘাত ২০০০০ প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ বানানোর অভিঘাতের সমান।

প্রযুক্তির প্যাঁচ

নজর ঘোরানোর দ্বিতীয় পন্থাটি হল প্রযুক্তিসর্বস্ব সর্বসুখবাদ। কার্বন উদগীরণ বাড়ছে, বাড়তে দাও। আমরা এমন প্রযুক্তি আমদানি করে ফেলেছি বা করতে চলেছি যে, অতিরিক্ত কার্বন আর কোনো সমস্যাই নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় খুব সম্প্রতি সোলটেয়ার পাওয়ার নামে এক কোম্পানি এক নতুন যন্ত্র বাজারে এনে বেশ আলোড়ন ফেলে দেয়। তারা ইস্পাত নির্মিত এক অভিনব টাওয়ার সদৃশ যন্ত্র বাজারে ছাড়ে, যে যন্ত্র কোনো বড় অফিসে বসালে সেই অফিসের কর্মচারীদের নিঃশ্বাস বায়ুর কার্বন ডাই অক্সাইড দিব্যি শুষে নিতে পারে। এহেন টাওয়ারের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষনের ক্ষমতা প্রতি ৮ ঘন্টায় ১ কেজি। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য ওই একই সময় কালে এখন জীবাশ্ম জ্বালানির দহনের ফলে বিশ্বজুড়ে বাতাসে মেশে ৩২ বিলিয়ন কেজি কার্বন ডাই অক্সাইড। আসল কথাটা বলে ফেলেছেন এক মার্কিন ক্যান প্রস্তুতকারক বহুজাতিক সংস্থার সিইও উইলিয়াম মে, ‘আমাদের মনে করতে হবে জাতি হিসাবে সমাধান প্রধানত আসবে প্রযুক্তির পথেই। আমরা উৎপাদন কমানোর সর্বতো বিরোধী ("We must comprehend as a nation that the solutions also lie to very large degree, in technology...We oppose any reduction in productivity,')।মানে প্রযুক্তির বড়ি গেলানোটা, চিকিৎসার পরিভাষায় যাকে বলে প্লাসিবো, নজর ঘোরানোর নয়া পয়জার।

পরিবেশের আমরা ওরা

শিল্পায়ন পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় এই শতাব্দীর শেষে উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বেঁধে রাখতে হলে (যা এখন কার্যত অসম্ভব) গড় কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন গড়ে বছরে জনপ্রতি ২ টনের মধ্যে বাঁধতেই হবে।  কিন্তু এখনই বিশ্বের ধনীতম ১% গড়ে জনপ্রতি উদগীরণ করে চলেছে ৭০ টনেরও বেশি। একা বিল গেটস তাঁর নিজস্ব জেট প্লেন উড়িয়ে নির্গমন করছেন বছরে গড়ে ৭৫০০ টন আর রোমান আব্রাহামোভিচ তাঁর সুবিশাল ইয়টে চেপে বাতাসে ফুঁকে দিচ্ছেন ৩৪০০০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড। একইভাবে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যেও কার্বন উদগীরণের প্রশ্নে বিস্তর ফারাক। ২০১৮-র হিসাব অনুযায়ী আমেরিকা, কানাডা ও কাতারে জনপ্রতি বার্ষিক উদগীরণ যেখানে যথাক্রমে ১৯.৩, ২০.৬ ও ৬৬.২ টন; সেখানে চিনের গড় মাত্র ৯.৭ টন আর ভারতের আরও কম ২.৭ টন। আমেরিকায় যেখানে চারচাকার মোটর আছে প্রতি হাজার জনের মধ্যে প্রায় ৮০০ জনের সেখানে বছর দশেক আগেও ভারতে এই সংখ্যাটা ছিল ৭ জন; এখন যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৩ জনে।

যে পথে পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে

‘দ্য এন্ড অব নেচার’ গ্রন্থের প্রণেতা বিল ম্যাককিবেন ২০০৫ এর নভেম্বরে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে কিছুটা মজা করেই লিখেছিলেন এক অনিবার্য ভবিষ্যৎ বাণী। তিনি লিখেছিলেন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কি যে হতে চলেছে (‘I wonder what will happen’) ভাবতে ভাবতে আমরা এক সময় সংশয়াবিষ্ট চিত্তে ভাবতে শুরু করেছি সত্যিই কি এমনটা ঘটতে পারে কখনো (‘Can this really happen?’)। আর এখন হতাশায় মূহ্যমান আতঙ্ক তাড়িত আমরা ক্রমশঃ বুঝতে পারছি আমাদের ভবিষ্যৎ উল্কার বেগে ছুটে চলেছে এক অন্ধ গহ্বরের দিকে যেখানে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে আর নিস্তার নেই আমাদের (‘‘Oh Shit” era)। আসলে প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটার মধ্যেই নিহিত আছে পরিবেশ ধ্বংসের বীজ। কার্ল মার্কস কবেই লিখেছিলেন ‘কোনো দেশ যত আধুনিক শিল্পের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে উন্নয়নের পথে হাঁটবে তত দ্রুত তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠবে’। এক শ্রেণির মানুষের অশ্লীল সম্পদ বৃদ্ধি আর অন্যদিকে আপামর জনতার ক্রমশ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়ে পড়ার যে চরম বৈষম্য সেই বৈষম্যের অবসানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সঙ্কট মুক্তির পথ। বেলজিয়ান দার্শনিক ইনগ্রিড রোবেইনস দাবি তুলেছেন দূর করতে হবে এই বৈষম্য। তাঁর মতে দারিদ্রসীমা যেমন নির্ধারণ করা হয় দেশে দেশে, তেমনিই নির্ধারিত হোক সম্পদের সীমাও যে সীমার উর্ধে সম্পত্তি বৃদ্ধি গণ্য হবে অপরাধ হিসাবে। কার্বন ট্যাক্সের ফক্কিকারির আড়ালে সম্পদের অবাধ লুন্ঠন নয়, চাই সম্পত্তি কর। কিন্তু চলতি ব্যবস্থায় সেটা কখনোই সম্ভব নয়। এই ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রেখে জলবায়ু ও পরিবেশে সঙ্কটের মুক্তির পথের খোঁজ সফল হবে না কোনোদিনই।  ম্যাথু টি হুবার সম্প্রতি তাঁর নতুন বই 'ক্লাইমেট চেঞ্জ এ্যাজ ক্লাস স্ট্রাগলঃ বিল্ডিং সোসালিজম্ অন এ ওয়ার্মিং প্ল্যানেটের একেবারে সূচনায় উল্লেখ করেছেন, "এই সুনির্দিষ্ট ক্ষমতার লড়াই আসলে বস্তুগত উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রন ও মালিকানার সম্পর্ক জনিত এক শ্রেণি সংগ্রাম যা প্রকৃতির সঙ্গে এবং জলবায়ুর সঙ্গেও আমাদের সামাজিক ও বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্কের নির্ণায়ক। (This particular power struggle over the relations of ownership and control of the material production that underpins our social and ecological relationship with nature and the climate itself.)"। তাই বদলাতে হবে ব্যবস্থাটাকেই, যে আওয়াজ ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার, গ্রিন নিউ ডিল রাইজিং বা এক্সটিঙ্কশন রেবেলিয়নের মত একাধিক সংগঠনের মাধ্যমে ইতিমধ্যেই তুলেছে নয়া প্রজন্ম – জলবায়ু নয়, ব্যবস্থা বদলাও। এটাই হল আসল কথা। নান্য পন্থা।


প্রকাশের তারিখ: ০৪-জুন-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org