রবীন্দ্রনাথের ‘ন্যাশনালিজম’: নামের ভুল, বোঝার ভুল

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
আর যেসব বাঙালি লেখক ভাষার হ্যান্ডিকাপ-এ আটকে যান নি, তাঁরাও বড়ই কম জেনে বড় বেশি কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখতে হলে অনেক, অনেক বেশি প্রস্তুতি নিতে হয়। কথাটি সকলেরই মনে রাখা উচিত। তাঁদের ভুলে-ভরা ‘ভূমিকা'-র জন্যেই সাধারণ পাঠক বিপথে যান। বক্তৃতামালার মূল বিষয় সাম্রাজ্যবাদ, জাতিদম্ভ। এটি মাথায় রেখে, আজ, একশো বছর পরে, ন্যাশনালিজম পড়া উচিত।

[১৯১৭ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের ‘ন্যাশনালিজম’। ১৯১৬ থেকে ১৯১৭ এই সময়কালে আমেরিকা ও জাপানে রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি বক্তৃতা দেন, বইয়ের প্রথম দুটি প্রবন্ধ (Nationalism in The West ও Nationalism in Japan) সেই-বক্তৃতাগুলির লিখিত রূপ। ১৯১৬ সালের শেষের দিকে আমেরিকায় থাকার সময়েই শেষ প্রবন্ধটি (Nationalism in India) লেখেন রবীন্দ্রনাথ। বইয়ের শেষ অংশটি অর্থাৎ, ‘The Sunset of The Century’ শীর্ষক অংশটি নিজের-ই লেখা পাঁচটি কবিতার (‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের) তর্জমা। বলা বাহুল্য, বক্তৃতাগুলি যখন রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর নানা প্রান্তে দিচ্ছেন এবং লিখছেন তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) চলছে।

- মার্কসবাদী পথ ]


১৯১৭-য় বেরল রবীন্দ্রনাথের ‘Nationalism’। তাঁর প্রথম ইংরিজি বই, যেটি অনুবাদ নয়, মূল রচনা। অতীতে বইটি নিয়ে বিস্তর ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছে। বর্তমানেও তার পালা চোকেনি। হালে (২০১২) বইটির বাংলা অনুবাদও বেরিয়েছে। খুবই দুঃখর সঙ্গে বলতে হচ্ছে: তার প্রারম্ভিক-কথা ও প্রসঙ্গ-কথা— দুই-ই সেই একই ভুল বোঝার ‘ঐতিহ্য' বয়ে চলেছে। রবীন্দ্রনাথ যে ‘জাতিপ্রেম' বলতে সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্রজাতীয়তা (ন্যাশনাল শভিনিজম্) বুঝতেন— এই সহজ কথাটি প্রায় সকলেই ভুলে যান। জাতীয়তা ও জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত আধুনিক তত্ত্ব তাঁর জানা ছিল না— একথা বোঝা কি এতই কঠিন? ১৯৬১-তেই গোপাল হালদার স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন: 

...অবশ্য নেশন বলতেই রবীন্দ্রনাথ ধরে নিয়েছেন শভিনিজম বা সংকীর্ণ জাত্যভিমান বা স্বার্থান্ধ সাম্রাজ্যবাদ (“এ অন্ধতা নেশন-তন্ত্রের মূলগত ব্যাধি”—“বিরোধী-মূলক আদর্শ”, ১৩০৮, রচনাবলী ১০ম, পৃ. ৫৯২)। দ্বিতীয়ত রবীন্দ্রনাথ নেশনকে মানবসমাজের বিকাশের একটা বিশিষ্ট স্তর হিসাবে এ সময়ে মনে করতেন না, তিনি মনে করতেন—তা একমাত্র য়ুরোপীয় সমাজেরই একটা বিশিষ্ট রূপ। ধনিকতন্ত্রের সঙ্গেই নেশনের উদ্ভব, ধনিক-স্বার্থেই স্বার্থান্ধ জাতিপ্রেমে তার পরিণতি, এই সত্য রবীন্দ্রনাথের নিকট পরে অনেকটা প্রতিভাত হয়েছিল। “লোকহিত” (১৩২১ বাং) “লড়াইয়ের মূল” (১৩২১ বাং) প্রভৃতি ১৯১৪-এর প্রথম যুদ্ধারম্ভের সময়কার প্রবন্ধাবলীতে দেখতে পাই তিনি শ্রেণি-বৈষম্য সম্বন্ধেও অবহিত। “ন্যাশনালিজম্”-এর ইংরেজি বক্তৃতাসমূহ আরো দুই বৎসর পরে রচিত হয়েছিল।' (১৯৬১/২০১০ পৃ. ১২১) 

এতেও যদি কেউ না বুঝতে পারেন তার জন্যে গোপাল হালদার আরও একটি অনুচ্ছেদ যোগ করেছিলেন : 

এ প্রসঙ্গে বুঝবার কথা এই- রবীন্দ্রনাথের স্বাদেশিকতার অর্থ ন্যাশনালিজম্ নয়, রাষ্ট্রধর্ম নয়; তার লক্ষ্য ভারতীয় সমাজের বিকাশ, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য স্থাপন; এইজন্য, একদিকে প্রয়োজন যেমন ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির স্বরূপ-সন্ধান; অন্যদিকে তেমনি ভারতীয় সমাজের নবরূপায়ণ, ভারতীয় বৈচিত্র্যের মধ্যে জাতীয় ঐক্য-স্থাপন; এবং দেশপ্রেমের ভিত্তিতে বিশ্বপ্রেমের সাধনা। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, রাষ্ট্রিক মতামত ও রাষ্ট্রিক কর্ম সে সাধনার অনুষঙ্গ মাত্র। (ঐ) 

এর কয়েক বছর পর গদর দল-এর রবীন্দ্র বিরোধিতা প্রসঙ্গে চিন্মোহন সেহানবীশ লিখেছিলেন: 

আসলে সেদিন [১৯১৬] রবীন্দ্রনাথের ঐসব বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল ভারতবর্ষের মতো পরাধীন জাতির বিকাশোন্মুখ ‘জাতীয়তা' নয়—তাকেও অবশ্য তিনি তাঁর মতো করে সঠিক পথে পরিচালনায় সচেষ্ট হয়েছিলেন—তাঁর লক্ষ্য আসলে ছিল ইউরোপের সেই ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ' যা সাম্রাজ্যবাদেরই লক্ষণ। (১৯৭২ পৃ. ১৩৫) 

ঐ অনুচ্ছেদের শেষে চিম্মোহনবাবু একটি বাক্য যোগ করেছিলেন : ‘তাঁর সেদিনকার লেখার সতর্ক পাঠকের কাছে এ-কথা ধরা পড়তে বাধ্য।' 

  • চিন্মোহনবাবু একটু বেশি আশা করেছিলেন। অথবা ‘সতর্ক পাঠক’ প্রজাতিটি বড়ই বিরল। তাই আজও শুনতে হয় যে, প্রবাসী অগাস্ট-সেপ্টেম্বর ১৯০৮-এ প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের একটি রচনায় নাকি ন্যাশনালিজম-এর 'প্রাগ্‌ইতিহাস' নিহিত রয়েছে (রামচন্দ্র গুহ ২০০৯ পৃ. ১২)!

দুটি যে সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার—সেটি তিনি বোঝেন নি। আর ন্যাশনালিজম প্রসঙ্গে কান্ট, হার্ডার, ফিটে প্রমুখের তত্ত্ব আলোচনা আগাগোড়াই বেকার (অশোককুমার মুখোপাধ্যায় ২০১২ পৃ. ২-৩)। স্তালিন-এর কথা বাদ পড়ল কেন জানি না । 

ন্যাশনালিজম-এর পটভূমি নিয়ে চমৎকার আলোচনা আছে চিন্মোহন সেহানবীশের রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবীসমাজ (১৩৯২/১৮০৪ পৃ. ২৬-২৭)-এ। 

সেখানেও দেখানো হয়েছে : 

‘লড়াইয়ের মূল' প্রবন্ধে “সাম্রাজ্যবাদের শোষক চরিত্র বর্ণনা করলেও তাঁর তখনকার দিনের চিন্তা অনুযায়ী [রবীন্দ্রনাথ] শব্দ ব্যবহার করেছিলেন ‘জাতিপ্রেম' ও ‘Nationalism' ('my country right or wrong' মতে বিশ্বাসী অর্থে অর্থাৎ ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ' ও ‘সাম্রাজ্যবাদ' শব্দের সমার্থক হিসেবে)। (ঐ পৃ. ৯৬) 

আসলে বইটি নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝির জন্যে রবীন্দ্রনাথ নিজেই দায়ী। বই-এর নাম ন্যাশনালিজম না-দিয়ে তিনি যদি নাম রাখতেন 'ন্যাশনাল শভিনিজম' বা আরও সরাসরি, ‘ইম্পিরিয়ালিজম', তাহলে কোনো গোলই হতো না।

এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মত-অমতের উৎস খুঁজতে হবে ১৯০৮-এ নয়, বুয়র যুদ্ধ (Boer War, ১৮৯৯-১৯০২)-র সমকালে লেখা তাঁর কবিতায়। বিশেষ করে নৈবেদ্য, ৬৪ সংখ্যক কবিতায়, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ধিক্কার দিচ্ছেন ইংরেজ কবিদের, যাঁরা দক্ষিণ আফ্রিকার বুয়রদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ রাজশক্তিকে সমর্থন করতেন। এই কবিদের মধ্যে ছিলেন তখনকার প্রায় সব কেষ্টবিষ্টু—শুধু রাডইয়ার্ড কিপলিং নন, এ.সি. সুইনবার্ন, এমনকি, টমাস হার্ডিও। তুলনায় গৌণ কিছু কবি অবশ্য এই হিংস্র কবিদের বিরোধিতা করে কবিতা রচনা করেন: 

Where are the dogs agape with jaws afoam? 

Where are the wolves? Look, England, look at home.

নৈবেদ্য-তে সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক কবিদের তুলনা করা হয়েছে (রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে যা ঠিক আশা করা যায় না) কুকুরদের সঙ্গে: 

কবিদল চিৎকারিছে জাগাইয়া ভীতি 
শ্মশান কুক্কুরদের কাড়াকাড়ি-গীতি। (র-র ১:৯৯১) 

একই কবিতার আগের চরণ দুটিতে পাওয়া যায় ‘জাতিপ্রেম’ শব্দটি, ঐ ন্যাশনাল শভিনিজম অর্থে: 

জাতিপ্রেম নাম ধরি, প্রচণ্ড অন্যায় 
ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়। (র-র ১:৯৯১) 

তাহলে দেখা গেল রবীন্দ্রনাথের নামকরণের দোষে তাঁর ন্যাশনালিজম বইটিকে একশো বছর ধরেই ভুল বোঝা হচ্ছে। দু-চারজন বিরল ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সকলেই বইটি ভালো করে না পড়েই তাঁদের মতামত দিয়েছেন অবলীলাক্রমে। শুধু বাঙালির নয়, অন্য ভারতীয়দের ও সায়েবদের কারও কারও একটা বদ অভ্যেস আছে: কোনো লেখা পড়ার আগেই মনে মনে তার সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্ত করে ফেলা। অনেক সময়েই সেটি মলাটটুকু পড়ার ফল। ন্যাশনালিজম্-এর ক্ষেত্রে তেমনই ঘটে। 

দ্বিতীয় কথা: খুঁটিয়ে পড়তে হলে – সে কবিতাই হোক, গল্পই হোক বা কোনো বক্তৃতা-সংকলন – সেই রচনার পটভূমি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা চাই। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে, ইংরিজি লেখার গুণাগুণ বিচার করতে হলে তাঁর অতীতের বাঙলা লেখাপত্র-রও খবর রাখতে হয়। শুধু এক ঝলকে কোনো বই দ্যাখাই যথেষ্ট নয়। রবীন্দ্রনাথের মতো দীর্ঘজীবী ও বহুগ্রন্থ-কর্তার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন। শুধু ই. পি. টমসন নন, রামচন্দ্র গুহও যে ভয়ঙ্করী অল্পবিদ্যার পরিচয় দিয়েছেন, তার প্রধান কারণ: বিষয়টির পরিপ্রেক্ষিত ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকা, আর তা সত্ত্বেও ন্যাশনালিজম্-এর ভূমিকা লিখতে রাজি হওয়া। নিজের যোগ্যতার ওপর এঁদের অতি-আস্থা অবশ্যই সমালোচনার যোগ্য। 

আর যেসব বাঙালি লেখক ভাষার হ্যান্ডিকাপ-এ আটকে যান নি, তাঁরাও বড়ই কম জেনে বড় বেশি কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখতে হলে অনেক, অনেক বেশি প্রস্তুতি নিতে হয়। কথাটি সকলেরই মনে রাখা উচিত। তাঁদের ভুলে-ভরা ‘ভূমিকা'-র জন্যেই সাধারণ পাঠক বিপথে যান। বক্তৃতামালার মূল বিষয় সাম্রাজ্যবাদ, জাতিদম্ভ। এটি মাথায় রেখে, আজ, একশো বছর পরে, ন্যাশনালিজম পড়া উচিত। 

পরিশিষ্ট 

একবর্ণ বাঙলা না জেনেও ১৯৯১-এ ই. পি. টমসন ম্যাকমিলান-প্রকাশিত ন্যাশানালিজম, ১৯৯১-এর ভূমিকায় (তাঁর বাবা এডওয়র্ড টমসন অবশ্য বাঙলা শিখেছিলেন) বা ২০০৯-এ রামচন্দ্র গুহ কেমন অকুতোভয়ে ন্যাশনালিজম নিয়ে আলোচনা করেন, তার দোষ-গুণ বিচার করেন— দেখে তাজ্জব হতে হয়। বোধহয় সেলিব্রিটি হলে এমন অধিকার জন্মায়। রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেই ম্যাকমিলান থেকে তাঁর যে লেকচারস অ্যান্ড অ্যাড্রেসেস বেরিয়েছিল (এখনও পুনর্মুদ্রণ হয়ে চলে) সেটিরও প্রাককথন লিখেছিলেন এক সায়েব, অ্যান্টনি এক্স. সোরস্ (Anthony X. Soares)। এঁর সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই, কিন্তু ইনিও যে বাঙলা জানতেন না—সেটি নিশ্চিত। 

কেউ কেউ বলতে পারেন: এঁরা তো রবীন্দ্রনাথের ইংরিজি লেখা নিয়েই ইংরিজিতে লিখছেন। কথা সেটা নয়। কথা হলো : আইজায়া বার্লিন-এর মতো সবজান্তা লোক স্বভাবতই সব ব্যাপারে কথা বলবেন- এমন প্রত্যাশিত। খুঁটিয়ে পড়া বা জানা এঁদের স্বভাবে ছিল না, তাই চমকদার কথা বলে ও লিখে আমোদ পেতেন। রামচন্দ্র গুহ তাই বার্লিন-এর একটি বাণীকে তাঁর ভূমিকার শিরোভূষণ করেছেন। সেটি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের স্তুতি নয়, ব্যাজ (ডাহা নিন্দে)।  

মূল রচনার ব্যাপারে কিছু না জানলে কতরকম গণ্ডগোল হয় তার একটা নমুনা দিই। গুহবাবু লিখেছেন : In a letter written in 1885 to his friend Pramatha Chaudhuri, Tagore spoke of… (2009 p.xi)। প্রথম কথা, প্রমথ চৌধুরীকে রবীন্দ্রনাথের বন্ধু বলে ভাবা উদ্ভট। মূলে চিঠিটি শুরু হয় ‘ভাই প্রমথ’ দিয়ে, শেষে কবির স্বাক্ষর, ‘শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর' (চিঠিপত্র, ৫, ১৪০০ব. পৃ. ১৫০ ও ১৫১)। গুহবাবু যে সূত্র থেকে এই চিঠির খবর জেনেছেন সেখানে আদৌ ‘বন্ধু' শব্দটি ছিল না, এটি গুহবাবুরই আবিষ্কার। দ্বিতীয়ত, চিঠিটি ১৮৮৫-তে লেখা হতে পারে না, যদিও চিঠিপত্র খণ্ড ৫ পৃ. ১৫১-য় ছাপা হয়েছে ১৭ মাঘ ১৮৯১। ওটি আসলে হবে ১২৯১। গুহবাবুর সূত্রে আবার ১৮৯১-এ সন্তুষ্ট না থেকে লেখা হয়েছিল 1891 BS [Bengali Sal] পৃ. ৩০৫ টী. ১৬! ঐ চিঠির আগের ও পরের চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই তা বোঝা যায়। 


টীকা
 

১. প্রবাসী, ভারতীয় ও বঙ্গদর্শন, ভাদ্র ১৩১৫-য় প্রকাশিত প্রবন্ধটির নাম : ‘পূর্ব্ব ও পশ্চিম’(র-র ১৩:৪২০-৪২৮)। পরে এটি সমাজ বইটির অন্তর্গত হয়। রামচন্দ্র গুহ বাঙলা জানেন না, তাই পরের মুখে ঝাল খেয়ে তার নাম লিখেছেন East and West in Greater India, মূলে বৃহত্তর বা ক্ষুদ্রতর কোনো ভারত-এর কথাই নেই। 

আসলে Greater India নাম দিয়ে মাদ্রাজ থেকে রবীন্দ্রনাথের যে  প্রবন্ধ-সংকলনটি বেরিয়েছিল (এস. গণেশন, ১৯২১) তাতেই East and West in Greater India নামটি দেওয়া হয়েছিল। মূল প্রবন্ধটি পড়লে বুঝতে পারবেন : ন্যাশনালিজম-এর বিষয়বস্তুর সঙ্গে এটির অণুমাত্র যোগ নেই। এছাড়া পরিশিষ্ট দ্র. । 

২. ‘ইম্পীরিয়ালিজম্’ নামে রবীন্দ্রনাথ ১৯০৭-এ একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন (ভারতী, বৈশাখ ১৩১২ ব., রাজা প্রজা-র অন্তর্গত)। অর্থাৎ, ইম্পিরিয়ালিজম্ শব্দটি তাঁর কাছে অচ্ছুত ছিল না।

৩. এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্যে স্মিথ (Smith) ১৯৭৮ দ্র.। 

সংযোজন 

রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত কিছুকাল আগে একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, “আসলে এটি আন্তর্জাতিকতাবাদের সপক্ষে এক মহান ও আবেগপূর্ণ সওয়াল, যে-আন্তর্জাতিকতাবাদ-এর ভিত্তি আগ্রাসী/আক্রমণমুখী জাতীয়তাবাদের কুফল সম্পর্কে সজাগ ভাব” (Rabindranath Tagore's Ideal of Internationalim, Rabindranath Tagore Memorial Lectures for 1996. Kolkata: Tagore Research Institute, 2011, p. 29)। কথাটি আদৌ ঠিক নয়। ন্যাশনালিজম বক্তৃতামালায় আন্তর্জাতিকতাবাদের কথা একবারও আসে নি, যদিও আগ্রাসী/আক্রমণমুখী জাতীয়তাবাদের কুফল সম্পর্কে অবশ্যই অনেক কথা সেখানে আছে। রবীন্দ্রনাথের চেতনায় আন্তর্জাতিকতাবাদের সঞ্চার ঠিক কখন থেকে ঘটেছিল সে নিয়ে আরও খুঁটিয়ে খোঁজ করা দরকার। গোরা (১৯০৮) থেকে অবশ্যই নয়। সেখানে রয়েছে এক কাল্পনিক ও আদর্শায়িত ভারতবর্ষ-র কথা। ১৯১৮-য় শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম-এর নতুন নাম হলো বিশ্বভারতী। এখানে বিশ্ব আছে প্রথমে, পরে ভারত। ১৯২১-এ এই নামটি পাকাপাকিভাবে গৃহীত হয়। ৭ পৌষ ১৩২৪ থেকে ৮ পৌষ ১৩২৮-এর মধ্যে ঠিক কী ঘটল তা জানা নেই। বোধহয় নামকরণের পর নতুন প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে কার্যকর করা হবে তা ঠিক করতে ও সেইমতো ব্যবস্থা নিতে সময় লেগেছিল। নতুন প্রতিষ্ঠানের মটো ছিল : বিশ্ব যেখানে এক নীড় হয় বা হয়ে ওঠে, যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্। শুক্ল যজুর্বেদ (মাধ্যন্দিন শাখা ৩২/৮ ও অন্যত্র) আর অথর্ব বেদ, ২/১/১-এ এই চরণটি পাওয়া যায়। অথর্ববেদ-এ অবশ্য নীড়ম-এর জায়গায় আছে রূপম্। সে যাই হোক, একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই ওঠে: বৈদিক যুগে বিশ্ব বলতে ঠিক কী বোঝাত? এতগুলো মহাদেশ নিয়ে এখন যে ভূখণ্ডর কথা ভাবা হয় তার সম্পর্কে বৈদিক যুগের মানুষের কি আদৌ .কোনো ধারণা ছিল? 

ন্যাশনালিজম্ প্রসঙ্গে এই কথাগুলি অবান্তর, ঠিকই। কিন্তু তথ্য হিসেবে ঘটনাগুলি মনে রাখা ভালো। 

[ব্রহ্মচর্যাশ্রম থেকে বিশ্বভারতী-তে রূপান্তর—এ বিষয়ে বিস্তৃত খবর পাওয়া যাবে প্রশান্তকুমার পাল-এর রবিজীবনী, খণ্ড ৭-এ। 

বৈদিক রচনাটির উৎস দেওয়া আছে পম্পা মজুমদার, রবীন্দ্র-সংস্কৃতির ভারতীয় রূপ ও উৎস, পৃ: ২৭, ৪৪, ৫১৮-য়।


রচনাপঞ্জি 

অশোককুমার মুখোপাধ্যায়, প্রারম্ভিক-কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয়তাবাদ। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ, ২০১২। 

গোপাল হালদার, রবীন্দ্রনাথের স্বাদেশিকতা রবীন্দ্রনাথ : শতবার্ষিকী প্রবন্ধ-সংকলন গোপাল হালদার সম্পা.। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ২০১০ (প্রথম প্রকাশ ১৩৬৮/১৯৬১)। 
চিন্মোহন সেহানবীশ, রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও বাঙলাদেশ। রঘুবীর চক্রবর্তী সম্পা.। দি ওয়ার্লড প্রেস প্রাইভেট লিমিডেট, ১৯৭২। 
চিন্মোহন সেহানবীশ, রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবীসমাজ। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, ১৪০৪ (প্রথম প্রকাশ ১৩৯২) 
Guha, Ramchandra, Introduction, Nationalism Rabindranath Tagore, New Delhi: Penguine Books 2009. 
Smith, M. Van Wyk. Drummer Hodge: The Poetry of the Anglo-Boer War, 1899-1902 Oxford: Clarendon Press, 1978. 
Tagore, Rabindranath Lectures And Addresses Madras etc. Macmillan India 1988 (reprint) 
Tagore, Rabindranath, Nationalism New Delhi: Penguin Books 2009. 
Thompson, E.P. Introduction, Nationalism London: Macmillan/papermac, 1991. 


কৃতজ্ঞতা স্বীকার : তরুণ বসু, প্রদ্যুত দত্ত, শুভেন্দু সরকার, সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়, সন্দীপন সেন। 
প্রবন্ধটি ‘সংভরণ’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। পুনরায় মার্কসবাদী পথ-এ প্রকাশ করা হল। কৃতজ্ঞতা স্বীকার: শম্পা ভট্টাচার্য, সিদ্ধার্থ দত্ত।


প্রকাশের তারিখ: ০৮-আগস্ট-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org