|
রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে ভারত ও চীননিরুপমা রাও |
|
রবীন্দ্রনাথ প্রথম চীন সফরে গিয়েছিলেন ১৯২৪ সালে। ছিলেন ৪৯ দিন। তার শতবর্ষ অতিক্রান্ত। ২০১১, কবির ১৫০-তম জন্মবার্ষিকী পালনের প্রস্তুতির ব্যস্ততায় এই নিবন্ধটি লিখেছিলেন ভারতের প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরুপমা রাও। সেবছরটা ছিল তাঁর স্মরণীয় চীন সফরেরও ৮৭-বছর পূর্তি।
রবীন্দ্রনাথ চীনে পৌঁছেছিলেন ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা বহন করে, যা তাঁর কাছে দু’টি দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের মর্মবস্তু বলে প্রতিভাত হয়েছিল। যতটুকু জানা যায়, তাঁর এই সফর চীনের অভিজাত বুদ্ধিজীবীবর্গকে অভিভূত করেছিল। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মুগ্ধ হয়েছিলেন কবির বাগ্মিতা এবং প্রাচ্য সভ্যতার শক্তির স্বপক্ষে তাঁর আবেগঋদ্ধ সওয়ালে। যদিও আরেকটি অংশ, বিশেষ করে ১৯১৯ সালে ৪ মে’র আন্দোলনের আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত চীনের অগ্রণী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির তরুণ ছাত্রসমাজ রবীন্দ্রনাথের আধুনিক সভ্যতার সমালোচনাকে প্রত্যাখান করেছিল তীব্রভাবে (১৯১৯ সালের ৪ মে’র আন্দোলন আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মোড়বদলের ঘটনা। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষে প্যারিস শান্তি সম্মেলনে ভার্সাই চুক্তির খসড়া তৈরির সময়ে চীনের জাপ অধিকৃত সিংটাও অঞ্চলে জাপানের অধিকার অব্যাহত রাখা নিয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হওয়ার খবর বেজিঙয়ে এসে পৌঁছলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে ব্যাপক গণবিক্ষোভ গড়ে ওঠে। এই বিক্ষোভ গোটা চীন জুড়ে সাধারণ ধর্মঘট ও অভ্যুত্থানের চেহারা নেয়। এই আন্দোলন বিজ্ঞান, গণতন্ত্র এবং জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে চীনের সমাজের ব্যাপক পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল। এক শক্তিশালী ও স্বাধীন চীনের আত্মপ্রকাশের স্বার্থে এই আন্দোলন গুরুত্ব আরোপ করেছিল চীনের আধুনিকীকরণ ও পাশ্চাত্যায়নে। এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু বুদ্ধিজীবী ও ছাত্ররা পরবর্তীতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে আসীন হয়ে চীন বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন– অনুবাদক)। চীনে জনপ্রিয়তা ১৯২৪ সালের এপ্রিলে চীনে পৌঁছনোর অনেক আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ সেখানে একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য হতেন। ১৯১৫ সালেই কবির নোবেলজয়ী কাব্যগ্রস্থ গীতাঞ্জলী-র অনুবাদ করেছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা চেন দু শিউ। জনগণতান্ত্রিক চীনের গোড়ার দশকগুলিতে চীনে রবীন্দ্রনাথের সমতুল্য মর্যাদা পাওয়া কবি গুয়ো মোরুও ১৯১৪ থেকে ১৯২০ সময়পর্বে জাপানে পাঠরত থাকার সময়ে রবীন্দ্রনাথের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। চীন ও ভারতের মত দুই মহান সভ্যতার মধ্যে পারস্পরিক কল্যাণ-নির্ভর বিনিময়মূলক সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন গভীরভাবে বিশ্বাসী। কয়েক শতাব্দী ধরে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা চীন ও ভারতের মধ্যেকার যাতায়াতের পথটি আবার উন্মুক্ত করে দেওয়ার স্বপক্ষে তিনি সওয়াল করেন। তাঁর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বভারতী ভারতে চীন-বিদ্যার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। ভারতের প্রথম চীন-ভারত সাংস্কৃতিক সমিতি গঠন, তারপর শান্তিনিকেতনে চীনা ভবন-এর প্রতিষ্ঠা এই ক্ষেত্রে ভিত্তিপ্রস্তরের ভূমিকা পালন করেছিল। তান উন-শানের মতো শিক্ষক ও পণ্ডিত চীনা ভবন-কে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে যে অবদান রেখে গিয়েছেন, তা চীন সভ্যতা ও তার আধুনিক অগ্রগতি সম্পর্কে ভারতের উপলব্ধি তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন সম্মুখদর্শী চিন্তক। ১৯২৪ সালে চীনের একটি বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আশা রাখি আপনাদের মধ্যে থেকে একজন স্বপ্নদর্শীর উত্থান ঘটবে, যিনি ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দেবেন এবং সমস্ত মনান্তরকে অতিক্রম করে যুগ যুগ ধরে প্রশস্ত হতে থাকা ভাবাবেগের গিরিখাতের মাঝে সেতু নির্মাণ করবেন।’ এই বলিষ্ঠ বার্তা তিনি ভারত ও চীনের জনগণের সামনে হাজির করে পারস্পরিক সম্পর্ককে গভীরতর করার আহ্বান জানান। ‘একটি অভূতপূর্ব সুখী ও সুন্দর সম্পর্কের সতত উন্মোচনের’ প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, মানবজাতির ৪০ শতাংশের বাসভূমি হিসেবে ভারত ও চীনকে এমন একটি উচ্চতায় নিজেদের আন্তঃসম্পর্ককে উন্নীত করতে হবে, যার মাধ্যমে তারা বিশ্ব সভ্যতা ও ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করতে সক্ষম হবে। তাঁর মতে, বসুধৈব কুটুম্বকম (গোটা বিশ্ব একটি পরিবার) এবং শিজিয়ে দাতং (এক মহান মৈত্রীর বিশ্ব) আদর্শে অনুপ্রাণিত দু’টি সভ্যতার বাহক দেশগুলি মৌলিক কোনও সংঘাত নেই। প্রবন্ধ সম্ভবত যে বিষয়টি অনেকেরই অজানা তা হল, চীন সম্পর্কে প্রশংসামুখর হওয়ার বাইরে চীনের জনগণের দুর্দশা নিয়েও রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত পীড়িত ছিলেন। ১৮৮১ সালে যখন তিনি সবে কুড়ি বছর বয়সে পা দিয়েছেন, তখনই মূলত ব্রিটিশ ভারতে চাষ হওয়া আফিমের বাণিজ্য চীনের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ করে তিনি নিবন্ধ রচনা করেন। সেই প্রবন্ধের শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘চীনে মরণের ব্যবসা’। চীনে জাপ আগ্রাসনের পর একই সহানুভূতি ব্যক্ত করে তিনি তাঁর জাপানী কবি বন্ধু ইয়োনে নগুচিকে এক চিঠিতে লেখেন, ‘চীনের দুর্দশার খবর পেয়ে আমি হৃদয়ে তীব্র আঘাত অনুভব করেছি।’ আমি মনে করি, আজ যখন আমরা সমগ্র এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্যে অগ্রসরমান হতে চাইছি তখন এশিয়ার আত্মপরিচয়ের অনন্যতা সম্পর্কে রবীন্দ্র-ভাবনার বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। সহজাতভাবেই তিনি এমন একটি এশীয় চেতনাকে তুলে ধরেছিলেন যেখানকার পরম্পরায় রয়েছে শান্তিপূর্ণ জীবন, নানাধরনের মতাভিমতের আদান প্রদানে উৎসাহ প্রদান, ধর্মান্তরণকে এড়িয়ে বিভিন্ন ধর্মের শান্তিপূর্ণ আত্মীকরণ এবং মেরুকরণের ভ্রুকুটিহীনে একটি নিরপেক্ষ সমুদ্রপথে অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রকৃত অর্থেই অভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি শান্তিময় পরিসর। এই দৃষ্টিভঙ্গি সংজ্ঞায়িত হয় ধর্মনিরপেক্ষতা ও পারস্পরিক স্বার্থের পরিপূরকতার মধ্য দিয়ে। এই বাণিজ্যিক ভারসাম্য-পরিপুষ্ট হয়েছিল অন্তর্জাগতিক ঐক্যের ধারণার দ্বারা। অজন্তার গুহা বা চীনের ডুনহুয়াংয়ের ম্যুরালগুলিতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রাজকীয় শোভাযাত্রা বা মৃত্যুশয্যায় শায়িত বুদ্ধকে ঘিরে শোকাকুল মানুষের চিত্ররূপ দেখলেই সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের আদর্শগত ঐক্যটি বুঝতে পারা যাবে। অষ্টম শতকে গৌতম সিদ্ধার্থ নামের একজন ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে চীনের জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থার প্রধান হিসেবে মনোনীত করা হয়। এই উদারতা ও সহনশীলতা, একজন বিদেশি বা বহিরাগতদের সম্পর্কে অনাপত্তি, এই উদ্যমী চেতনা এবং আগলহীন বাণিজ্য বিশ্বের ইতিহাসে অতুলনীয়। আমার ধারণা, রবীন্দ্রনাথ আমাদের অতীতকে ভবিষ্যতের একটি সাধারণ পথনির্দেশক হিসেবে মান্য করার কথা বলে আসলে এই দিকটিকেই বুঝিয়েছিলেন। ঐক্যের দৃষ্টিভঙ্গি রবীন্দ্রনাথের এই উদার আহ্বান তখন তাৎক্ষণিকভাবে বা সফর থেকে ফিরে আসার অব্যবহিত পর কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পেলেও, সময়ের বহমানতায় এগিয়ে এসে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে এখন ভবিষ্যদ্বাণীপূর্ণ মনে হয়। সেই সময়ে চীনে তাঁর শেষ ভাষণে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আমার পক্ষে যা সম্ভব ছিল তা আমি করেছি। আমার অনেক বন্ধু হয়েছে।’ তবে এটা শুধুমাত্র একজন কবি ও তাঁর গুণগ্রাহীদের মধ্যেকার বন্ধুত্ব নয়, নানা দিক থেকেই এর মধ্য দিয়ে ভারত ও চীনের মৈত্রীর সম্পর্কের পুনঃস্থাপন এবং এর বিপুল সম্ভাবনার উপলব্ধি সূচিত হয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, এর ঠিক তিনদশক পর এই সভ্যতাজাত মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়েই পঞ্চশীল নীতি-র সূচনা করেছিল ভারত ও চীন। জটিল কূটনীতি ও স্বার্থসর্বস্ব নির্জলা রাজনীতির আধুনিক পৃথিবীতে এই নীতিমালার দৃঢ়তা এটাই দেখায় যে, কোনো কিছু প্রাচীন হলেই তাকে অতীতের গর্ভে বন্দি করে রাখলে চলবে না। নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথের সময়ের তুলনায় ভারত ও চীন উভয়েই দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে অনেকটাই আধুনিক ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে। যদিও ভারত তার স্বভাবসিদ্ধ ধীরগতির ক্রমপরিবর্তনের রাস্তা ধরে হেঁটে আধুনিকতার পথে বারবারই পিছিয়ে পড়ে। সে যাইহোক, ভারত ও চীন দু’টি দেশই নিশ্চয়ই নিজেদের অতীত সংযোগকে স্মরণে রেখে, অতীতের দ্বারা ভারাক্রান্ত বা অতিমুগ্ধ না হয়েও, অতীতকে সম্মান করার মত পরিণতি অর্জন করেছে। পূর্ব এশীয় শিখর সম্মেলনের আওতাধীন আন্তঃএশীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে নালন্দার অতীত গৌরবের পুনরুদ্ধার সম্পর্কিত কর্মতৎপরতা এই অভিমুখকেই সূচিত করছে। একশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ এশীয় ঐক্যের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটাই এই অঞ্চলে গোষ্ঠীনির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়নের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। চীন বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ১৯২৪-র সফরেই শেষ হয়ে যায় নি। দুই অবিনাশী সভ্যতা হিসেবে ভারত এবং চীন সম্পর্কিত ধারণাকে দেখা নেহরুর মত০ নেতাদেরও চালিকা শক্তি ছিল। ১৯৬২ সালের দুঃখজনক সীমান্ত সংঘর্ষের ঘটনা অবধি, ভারত ও চীনের মধ্যেকার ভ্রাতৃত্বমূলক সহযোগিতার ধারণাটি কখনও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি। ১৯৬০-এর দশক ও ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে তৈরি হওয়া বিচ্ছেদ রবীন্দ্রনাথের প্রেরণাদায়ী কথাগুলি এবং ভারত-চীন সম্পর্ক নিয়ে ভূ-সভ্যতা কেন্দ্রিক ধারণার প্রতি তাঁর বিশ্বাস থেকে বিচ্যুতি ছাড়া কিছু নয়। গবেষক প্যাট্রিসিয়া ওবেরয় ওয়েস্টফেলীয় সার্বভৌমত্বের কথা বলেছেন, যেখানে জাতিরাষ্ট্র সীমানানির্ভর বন্ধনের দ্বারা সংজ্ঞায়িত। তিনি লিখছেন, ‘এর মধ্য দিয়েই এলো কেন্দ্র-প্রান্ত, মূলভূমি-প্রান্তভূমির ধারণা এবং প্রতিরক্ষার স্বার্থে যুক্তিগ্রাহ্য বলপ্রয়োগের বিষয়।’ তিনি লিখেছেন, সাম্প্রতিক কালে সীমান্ত অঞ্চলগুলি যেভাবে ভূ-রাজনীতির উপদ্রুত এলাকায় পরিণত হয়েছে, তার পরিবর্তে তাকে সভ্যতা সমূহের মিলনের ‘একটি ঘূর্ণায়মান দরজা হিসেবে তৈরির স্বপক্ষেই’ সম্ভবত থাকতেন রবীন্দ্রনাথ। যার ফলে অন্তহীন দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের পরিবর্তে আন্তঃসীমান্ত সংযোগের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা ত্বরাণ্বিত হবে, তেমন ধরনের আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার কথাই বলতেন রবীন্দ্রনাথ। একইভাবে ভারত ও চীনের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান প্রদান সভ্যতার সংঘাতের তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটাই এশিয়ার জন্যে একটি প্রয়োজনীয় আদর্শ, যার নতুন করে আবার উত্থান হচ্ছে। আমরা চাই আমাদের মহাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে উদার, স্বচ্ছ, ভারসাম্যবাহী এবং ন্যায়সঙ্গত সংলাপের ধরন এবং সহযোগিতার প্রতিকল্প।
ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ০৯-মে-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |