রাজ‍্যে গত দেড় দশকে নারী নিরাপত্তা 

অনিতা অগ্নিহোত্রী
পার্কস্ট্রিট থেকে কামদুনি, তেহট্ট থেকে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক হত‍্যা— শাসকদলের মুখ‍্য ও তাঁর পারিষদরা ভিকটিম শেমিং, প্রতিবাদীদের নকশাল বলে চিহ্নিত করা, এবং সাক্ষ‍্য প্রমাণ লোপের বিপুল ষড়যন্ত্রে নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছেন। তেহট্টের কিশোরীর হত‍্যার ঘটনায় তার ধর্ষকের সঙ্গে অ‍্যাফেয়ার আছে কিনা, সে অন্তঃসত্ত্বা ছিল কিনা ইত‍্যাদি মন্তব‍্য করেছেন স্বয়ং মুখ‍্যমন্ত্রী। আর এভাবেই মথুরা কেস-পরবর্তী ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশোধন থেকে রাজ্যকে পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে দিয়েছেন।

বাংলা কি মেয়েদের জন্য নিরাপদ? এর চেয়েও গভীর প্রশ্ন, বাংলার মেয়েদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার? মেয়েদের নিরাপত্তা কি সরকারের প্রাথমিকতা? নিরাপত্তার দায়িত্ব পরিবারের, সমাজের, শিক্ষা ও কর্ম প্রতিষ্ঠানের এবং সর্বোপরি রাজ‍্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের, তার অধীনস্থ পুলিশের। কিন্তু আক্রান্ত নারী সমাজে গুরুত্বপূর্ণ না হলে বা উপর থেকে নির্দেশ না এলে পুলিশ স্বত:প্রণোদিত হয়ে কিছুই করে না। ঘরে বা বাইরে প্রত‍্যক্ষ হিংসার কথা ধরলে বাংলার স্থান ভারতের শীর্ষ চারটি রাজ্যের মধ্যে। ২০১৮ থেকে মেয়েদের বিরুদ্ধে ৩০ হাজার হিংসার ঘটনা দিয়ে আরম্ভ করে প্রতিবছর বেড়ে চলেছে সংখ‍্যা। একই সঙ্গে কনভিকশন বা শাস্তি প্রদানের হার নেমেছে ৩.৭ শতাংশে। ২০১৭ থেকে ২০২৩-এর মধ‍্যে নিষ্পত্তি না হওয়া মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। এই ক্ষেত্রেও বাংলা ভারতের শীর্ষে। রাজ‍্যের করুণ অবস্থা! কিন্তু শাসকদের চোখে তা পড়ে না। কারণ আইনের শাসন বলবৎ রাখায় সরকার থেকে দল কারোরই কোন আগ্রহ নেই।

গত পনের বছরে মেয়েদের নিরাপত্তার উপর সবচেয়ে বড় আঘাত করেছেন শাসক দলের নেতা নেত্রীরা। পার্কস্ট্রিট থেকে কামদুনি, তেহট্ট থেকে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক হত‍্যা— শাসকদলের মুখ‍্য ও তাঁর পারিষদরা ভিকটিম শেমিং, প্রতিবাদীদের নকশাল বলে চিহ্নিত করা, এবং সাক্ষ‍্য প্রমাণ লোপের বিপুল ষড়যন্ত্রে নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছেন। তেহট্টের কিশোরীর হত‍্যার ঘটনায় তার ধর্ষকের সঙ্গে অ‍্যাফেয়ার আছে কিনা, সে অন্তঃসত্ত্বা ছিল কিনা ইত‍্যাদি মন্তব‍্য করেছেন স্বয়ং মুখ‍্যমন্ত্রী। আর এভাবেই মথুরা কেস-পরবর্তী ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশোধন থেকে রাজ্যকে পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে দিয়েছেন। যেখানে বাবাও তৃণমূল, ছেলেও, সেখানে কাকে দোষ দেওয়া হবে— এই ধরণের মন্তব্য শুনে বোঝা যায় যে বিপুল আসন পেয়ে নির্বাচিত হলে সরকার মেয়েদের প্রতি তার উত্তরদায়িত্ব-কে ময়লা গামছার মত খুলে রেখে দিতে পারে।

বাংলায় মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় চ‍্যালেঞ্জ হল এক দুর্নীতি পরায়ণ দলতন্ত্র, যারা শাসকদলের চাকা কে চালায়, সেই জন্য কোন শাস্তির পরোয়া করে না। সমান্তরাল ভাবে শাসকদল পুলিশকে ক্রমাগত হস্তক্ষেপের মাধ‍্যমে দলের বশংবদ তৈরি করে রাখে।

জাতীয় মহিলা কমিশনের পক্ষ থেকে পার্কস্ট্রিট ঘটনার তদন্তে এসে দেখেছিলাম, ছুটির জন্য কোর্ট বন্ধ বলে কোর্টের নির্দেশ পাওয়া যায়নি এই অজুহাতে আক্রান্ত মহিলার শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছিল চার দিন পর। এর ফলে জরুরি সাক্ষ‍্য প্রমাণ লুপ্ত হওয়ার ষোল আনা কারণ ছিল। অথচ এক্ষেত্রে কোর্টের নির্দেশের কোন প্রয়োজন ছিলনা। তা বাংলার ডিজি জানলেও কলকাতা পুলিশের শীর্ষ কর্তারা জানতেন না। এটা অসম্ভব মনে হয়েছিল।



রাষ্ট্রনীতিবিদ দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বিশ্লেষণ করেছেন, বর্তমান সরকারের শাসন চলে ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেমে। যেখানে অঞ্চল ভিত্তিক বাহুবলী ও ব‍্যবসায়ী তোলাবাজরা সরকারের প্রতিনিধি। দুর্নীতি যেখানে শাসনের মূল চালিকা শক্তি, সেখানে মেয়েরা স্বাভাবিক ভাবেই আক্রমণের শিকার এবং প্রতিকারের প্রত‍্যাশা তাদের জন্য সুদূর। তবু ও নিরাপত্তার অভাব কেবল হিংসার কারণে ঘটে বললে ছবিটা স্পষ্ট হবে না। অধিকাংশ মেয়ে কাজ করেন অসংগঠিত ক্ষেত্রে, যেখানে তাঁরা পুরুষ কর্মীদের চেয়ে কম মাইনে পান। অধিকাংশই ন‍্যূনতম মজুরি পান না, যেসব কাজ মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট, সেখানে মজুরি যথেষ্ট কম। স্থায়ী পদে কাজ করলেও, চটকল শিল্পে ৯০ শতাংশ মেয়ে ভাউচারে টাকা পান, অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির ব‍্যবস্থা থাকলেও স্বাক্ষরিত হয় না। কর্মক্ষেত্রে আর্থিক শোষণ, ইচ্ছাকৃত হয়রাণি মেয়েদের নিরাপত্তার ধারণাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাজ করা, শৌচাগারে যাবার সুযোগ টুকুও না পাওয়া, এগুলিও নিরাপত্তার অভাব হয়ে দেখা দেয়।

📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে

বাংলায় কাজের বাজারে আসা মেয়েদের গড় ভারতের গড়ের চেয়ে কম।  মেয়েরা কেন আরও বেশি সংখ্যায় কাজের ক্ষেত্রে আসে না, তার হিসেব নিতে গেলে দেখা যায় কর্মরতা শ্রমজীবী মেয়েদের জন্য কোন পরিকাঠামোই নেই। কেন্দ্রের আইন এবং প্রকল্প আছে। তবুও মায়েদের ছোট শিশুকে ঘরে ছেড়ে বা পিঠে বেঁধে কাজে আসতে হয়। না আছে শিশুর ক্রেশ, না দুধ খাওয়ানোর ঘর, পোশাক বদলের ঘর। শৌচাগার তো প্রায় কোথাওই নেই। হকার, নির্মাণ কর্মী, অ‍্যাপ ক‍্যাব, টোটো চালক মহিলা ও ট্রান্স কুইয়ারদের জন্য শহরে ও টয়লেটের একান্ত অভাব। ব্যবসায়ী মেয়েদের পণ‍্য নিয়ে ভেন্ডার কামরায় উঠতে দেওয়া হয় না। তাঁরা ওঠেন জেনারেল কামরায় এবং দুর্বব‍্যবহারের  শিকার হন। মেয়েদের শোষণ এখন বাংলায় শাসন চর্যার অংশ। তাই ২০২৪ এ সন্দেশখালি ব্লকের ঘটনায় শোষণ, মজুরি ফাঁকি, শারীরিক লাঞ্ছনার মত দীর্ঘদিন ধরে ঘটে চলা ঘটনার কথা বলতে এগিয়ে এলেন মেয়েরা, তা-ও স্থানীয় বাহুবলীকে পুলিশ সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর, তাই নিয়ে দমনের রাজনীতি চালাল শাসক দল, মুখ‍্য বিরোধী দল করল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পরিমাণ বাড়িয়ে মেয়েদের আশীর্বাদ অর্জন করল বর্তমান সরকার। নির্বাচনের পর শাসকের কন্ঠে শোনা গেল— সন্দেশখালির লড়াইয়ের ভিত্তি ছিল মিথ‍্যাচার।

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি তো আছেই। ২০১৩ র আইন সত্ত্বেও বাংলায় অধিকাংশ সরকারি  ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আইসিসি গঠন হয়নি, এলসিসি গঠন হয়নি। প্রতিটি রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠানকে সরকার বাধ‍্য করতে পারেন কমিটির মেম্বারদের নাম, এবং অভিযোগ গুলির উপর পদক্ষেপ সম্বন্ধিত তথ‍্য দিতে। কিন্তু করে না। এছাড়া অভিযোগ করলেই সেই মেয়েকে দৃষ্টির সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়ার শাস্তি প্রায় অনিবার্য। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মেয়েরা আছেন, আছেন ট্রান্স কুইয়ার মানুষ, তাঁদের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই কমিটি গুলিতে। অফিসের পরিসরের বাইরে খোলা আকাশের নীচে যাঁদের কাজ করতে হয়, সেই ইঁট ভাটা শ্রমিক বা নির্মাণ শ্রমিক মেয়েদের যে কি বিপুল লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়, তার কোন পরিমাপ নেই। সেখানে কোন কমিটিই কাজ করেনা।

বাংলার মেয়েদের জন্য কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা আজ বড় প্রয়োজন। অথচ সারা বছর এদিকে সরকারের দৃষ্টি নেই, নির্বাচনের সময় তো নয়ই। ভাতা দিলেই যেখানে মানুষ খুশি, অধিকার নিয়ে সেখানে সরকারের মাথা ব‍্যথা থাকবে কেন? কৃষিজীবী মেয়ে কিন্তু জমির নথি তাঁর নামে নেই। মৎস্যজীবী কিন্তু নৌকোর লাইসেন্স নেই, সমুদ্র সাথী প্রকল্পের টাকা পান না। গৃহশ্রমিক মেয়েদের, সাফাই কর্মী মেয়েদের, মৎস্যজীবী মেয়েদের শ্রমিক আইডেনটিটি কার্ড নেই। দৈনিক মজুরি তে সাফাই কর্মী করে রাখা হয়েছে অনেক মেয়েকে, চুক্তি ও করা হয়নি। অ‍্যাপ ক‍্যাব ও টোটো চালক মেয়েরা  স্ট‍্যান্ডে জায়গা পান না। চা বাগানের মেয়েরা ন‍্যূনতম মজুরি পান না, বকেয়া পি এফ পাননা। অতিরিক্ত কাজের চাপ ও কর্মক্ষেত্রে হয়রানি একটা বড় সমস্যা নার্স ও মেডিকেল রিপ্রেসেনটেটিভ মেয়েদের জন্য। হয়রানি, চাপ না সইতে পারলে বদলি, ছাঁটাই। নার্সরা দক্ষতা অনুযায়ী পে স্কেল পান না। মেডিকেল অ‍্যাসিস্টান্ট সুপারভাইজাররা ১৪ স্কেল পান, নার্সরা সেখানে পান ৯। 

পূর্ণ পরিকাঠামো, আইন অনুযায়ী মজুরী ও পি এফ, পরিবহন ব‍্যবস্থা ছাড়া শ্রমজীবী মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে বা পথে নিরাপদ নন। তাঁরা এই নিরাপত্তার অধিকার চান, কেবল এককালীন দয়ার দান নয়। কিন্ত তাঁদের নিরাপত্তার অধিকার আজ বাংলার সরকারের প্রাথমিকতা নয়। এর উপর আছে গার্হস্থ্য হিংসা এবং বাইরে, পথে বা কর্মক্ষেত্রে আক্রমণ। কামদুনির অপরাধীরা সরকারের গাফিলতিতে জামিন পেয়েছে। দীর্ঘ গণ আন্দোলনের পর আর জি কর হাসপাতালের তরুণী ডাক্তারের হত‍্যা বিচার পায়নি। কারণ কেন্দ্র ও রাজ‍্যের সম্মিলিত হস্তক্ষেপে তদন্তের ভিত্তিই নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সন্তান হারা  পিতামাতা কোর্ট থেকে জমায়েতে ঘুরছেন। সরকারের প্রখর রাজনীতি একটি ‘অরাজনৈতিক’ আন্দোলনকে  শূন্যতায় নিক্ষেপ করেছে। এটাই হবার ছিল। এরপরেও প্রকাশ্য দিবালোকে কলেজের ভিতর এক আইনের ছাত্রী আক্রান্ত হয়েছে এবং সে ক্ষেত্রেও ঘটনাটিকে ক্রাইম বলে চিহ্নিত করতে শাসক নেতাদের মধ‍্যে দ্বিধা ছিল। মেয়েদের সমর্থনের জন্য গর্বিত অথচ তাদের নিরাপত্তার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন এই সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনে নামার কোন বিকল্প নেই। গ্রাম ব্লক জেলাস্তরে মেয়েদের সংগঠনগুলিকে  শক্তিশালী করে তোলা সারা বছরের কাজ হোক। 

মেয়েদের নিরাপত্তার কথা নির্বাচনী ইশতেহারে জায়গা করে নিক।


প্রকাশের তারিখ: ০৮-মার্চ-২০২৬

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org