|
রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন: সন্ত্রাস ও গণতন্ত্রের লড়াইনন্দন রায় |
ক্ষমতায় আসার ছ’মাসের মধ্যেই পঞ্চায়েতের হাত থেকে উন্নয়নমূলক যাবতীয় কাজকর্ম কেড়ে নিয়ে তার দায়িত্ব দেওয়া হল ডিএম, এসডিও এবং বিডিওদের হাতে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত গ্রামের জনপ্রতিনিধিদের পঙ্গু করে দেওয়ার এই ছিল আনুষ্ঠানিক সূচনা। রাজ্য সরকার এবং পঞ্চায়েত একই দলের দ্বারা পরিচালিত হবে— এই ছিল নেত্রীর নির্দেশ। যেখানে তা হবে না, সেখানকার মানুষ তাদের কৃতকর্মের ফলভোগ করবে। এমনকি অর্থ কমিশনের যে টাকা সাংবিধানিকভাবে পঞ্চায়েতের প্রাপ্য, সেই টাকাও দেওয়া হল না। তখনও মোদী দিল্লিতে আসেনি। নেত্রীকে সংবিধান লঙ্ঘনের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়েছিল কে? আজ যখন মোদীর ‘ডাবল ইঞ্জিনের সরকার’-এর ধারণাকে নিন্দা করে তিনি গলা চড়িয়ে মঞ্চ প্রকম্পিত করেন, তখন তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত নয় কি যে খোদ তিনিই প্রথম ‘ডাবল ইঞ্জিনের’ ধারণাটি আমদানি করেছিলেন? |
১৯৭৮ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু প্রথম ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেন। সফল নির্বাচনের পরে মহাকরণের অলিন্দ থেকে ঘোষণা করলেন যে, তাঁর সরকার মহাকরণ থেকে গ্রামের শাসন চালাবে না, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করে গ্রামের মানুষ নিজেরাই নিজেদের শাসন চালাবেন। এই ঘোষণাটির তাৎপর্য অসীম। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগষ্টের সন্ধিক্ষণে মধ্যরাতে জওহরলাল নেহরু যে বিখ্যাত ‘নিয়তির সাথে অভিসার’-এর বক্তৃতা দিয়েছিলেন, জ্যোতি বসুর বক্তৃতা তার চেয়ে গুরুত্বে কিছু কম নয়। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মানে হচ্ছে নিজের হাতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ভার, অর্থাৎ তৃণমূল স্তর পর্যন্ত গণতন্ত্রের বিস্তার। গণতন্ত্রের মানে কী? খুব সোজা কথায় এর মানে হচ্ছে, এমন একটি ব্যবস্থা যা গড়ে উঠবে অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ এক নির্বাচনের মাধ্যমে, যেখানে এক ‘সমতল মাঠে’ সব দলই সমান সুবিধা পাবে। এবং গরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে গঠিত হবে পঞ্চায়েত। সে পঞ্চায়েতের যাবতীয় কাজের মধ্যে গোপনীয়তার কোনও বালাই থাকবে না, সব কাজই হবে প্রকাশ্যে, জনতার চোখের সামনে, গ্রামসভার মিটিংয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুসারে। একে বলা হয় স্বচ্ছতা। কোনও কাজ করতে গেলে পঞ্চায়েত আধিকারিকদের মধ্যে থাকতে হবে দায়বদ্ধতা। সে দায়বদ্ধতা প্রধান অথবা সভাপতির প্রতি নয়। কাজ নির্বাহ করার নিয়মের প্রতি, আইনের প্রতি। যত বেশি স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতার অনুশীলন হবে, তত বেশি দুর্নীতির অবসান ঘটবে। পরস্পর-বিরোধী দলগুলির একে অন্যকে রাজনৈতিক আক্রমণের অধিকার অবশ্যই থাকবে। কিন্তু কেউ কাউকে চোর বলার সুযোগ পাবে না। আজকে এই কথাগুলি শুনলে কেমন যেন ‘সোনার পাথরবাটি’র মত অলীক মনে হয়। অথচ পঞ্চায়েত সংক্রান্ত আইনগুলিতে এসব কথাই বলা আছে, এবং আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, এই আইনগুলি প্রতিবিপ্লবী পরিবর্তনের পরেও পরিবর্তিত হয়নি। মনে রাখা দরকার যে, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত গঠন কোনও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড নয়। প্রতিষ্ঠিত উদারবাদী বুর্জোয়া কাঠামোর মধ্যেই এই আইন পাশ হয়েছিল সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলে। কিন্তু সেই সময়ে এই আইন প্রয়োগ করা হয়নি। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে এই আইনের উপযুক্ত সংশোধন করে। এবং প্রথম রূপায়ণ করে, যাতে গণতন্ত্র তৃণমূল স্তর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। গণতন্ত্র প্রসারে মানুষের যেমন স্বার্থ আছে, তেমনি বামপন্থীদেরও স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু তৃণমূল অথবা বিজেপির স্বার্থের তুলনায় বামপন্থীদের স্বার্থের চরিত্র একেবারেই আলাদা। তৃণমূলের স্বার্থ ব্যক্তিগত ও দলগত ক্ষমতার বিস্তার, যাতে তারা সংঘবদ্ধ লুঠ চালাতে পারে। আর বিজেপির স্বার্থের অন্তঃস্থলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতাদর্শের রূপায়ণ। একমাত্র বামপন্থীদেরই কোনও শিলীভূত (hardened) দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। সমাজের গরিষ্ঠ অংশের মানুষের, অর্থাৎ কারখানায় অথবা চাষের মাঠে খেটে খাওয়া শ্রমজীবি মানুষের স্বার্থই তাদের স্বার্থ। এই স্বার্থের সেবা সবচেয়ে ভালভাবে করা যায় মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশে। তাই সন্ত্রাসবিদ্ধ পরিবেশে নয়, বামপন্থার সবচেয়ে ভাল বিকাশ হতে পারে একমাত্র গণতান্ত্রিক পরিবেশেই। সেইজন্য বামপন্থীরা হচ্ছে সবচেয়ে আপসহীন গণতন্ত্রী। কমিউনিষ্ট মানেই অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা আর হিংস্র সশস্ত্র বিপ্লব, এসব নেহাৎই দক্ষিণপন্থীদের প্রচার। পৃথিবীর ইতিহাস বলছে কমিউনিষ্টদের ওপরে হিংস্রতা চাপিয়ে দিলেই একমাত্র কমিউনিষ্টরা অস্ত্র ধারণ করে। দুই ২০১১ সালের তৃণমূলের উত্থান এক একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের জঠরে। এবং তার উদ্দেশ্য ছিল বামপন্থার ভেক ধরে পশ্চাদপদ এক সামাজিক ব্যবস্থা, যাকে পরাজিত করে বামপন্থার উত্থান, তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। তাই ৩৪ বছরে বামপন্থীদের যা কিছু অর্জন তার ধ্বংসসাধন করাটা ছিল প্রাথমিক কাজ। স্বৈরতন্ত্রের মানে হচ্ছে গণতন্ত্রের পিছু হঠা। আমরা এর বেশি ব্যাখ্যায় যাব না। বরং দৃষ্টি নিবদ্ধ করব গ্রামীণ স্বায়ত্বশাসনের যে ব্যবস্থা বামপন্থীরা প্রতিষ্ঠিত করেছিল, কীভাবে সে ব্যবস্থাকে তৃণমূল কংগ্রেস প্রহসনে পরিণত করেছে। এই ধরনের স্বায়ত্ত্বশাসন কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বিভাজন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এজন্য সামাজিক ও প্রশাসনের কায়েমি স্বার্থের ক্ষমতার ও অন্যান্য সুবিধের অনেকটাই ছাঁটাই করতে হয়েছিল। ফলে সুবিধা-বঞ্চিতরা ক্ষুব্ধ হয়েছিল তো বটেই। আমলাতন্ত্রের এবং গ্রামীণ কায়েমি স্বার্থের ষড়যন্ত্রকে সাময়িকভাবে পরাজিত করা গিয়েছিল গ্রামীণ জনতার সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তাই বাম-জমানায় অনুষ্ঠিত প্রাথমিক পঞ্চায়েত নির্বাচনগুলি ছিল প্রকৃতই গণতন্ত্রের উৎসব। মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এলেন এক রামধনু জোটের নেত্রী হয়ে। জোট রাজনীতি কিন্তু গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রয়োগ ছাড়া কার্যকর হয় না। অমর্ত্য সেন একে বলেছেন Government by Discussion। কিন্তু স্বৈরতন্ত্রে এসব চলে না। ক্ষমতার ভাগাভাগি তার মোটেও পছন্দ নয়। তাই একাধারে বামপন্থীদের নিকেশ করা এবং সাথে সাথে নিজেদের জোট সঙ্গীদেরও নিকেশ করা শুরু হল। প্রথমে নিকেশ করা হল মাওবাদীদের, যারা তৃণমূলীদের সমভিব্যহারে জঙ্গলমহলে কয়েকশো বামপন্থী কর্মীর মৃতদেহ নেত্রীকে উপহার দিয়েছিল। তারপর নিকেশ করা হল কংগ্রেস, এসইউসিআই প্রভৃতি দলগুলিকে। এবারে নেত্রীর নজর পড়ল পঞ্চায়েতের দিকে। ২০১১ সালে যখন তৃণমূল ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করল, তখন চারটি বাদে বাকি সব জেলা পরিষদ এবং অর্ধেকের সামান্য বেশি পঞ্চায়েত সমিতি ও গ্রাম পঞ্চায়েত ছিল বামপন্থীদের দখলে। মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় আসার ছ’মাসের মধ্যেই সরকারি আদেশবলে পঞ্চায়েতের হাত থেকে উন্নয়নমূলক যাবতীয় কাজকর্ম কেড়ে নিয়ে তার দায়িত্ব অর্পিত হল ডিএম, এসডিও এবং বিডিওদের হাতে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত গ্রামের জনপ্রতিনিধিদের পঙ্গু করে দেওয়ার এই হল আনুষ্ঠানিক সূচনা। রাজ্য সরকার এবং পঞ্চায়েত একই দলের দ্বারা পরিচালিত হবে এটাই ছিল নেত্রীর নির্দেশ। যেখানে তা হবে না সেখানকার মানুষ তাদের কৃতকর্মের ফলভোগ করবে। এমনকি অর্থ কমিশনের যে টাকা সাংবিধানিকভাবে পঞ্চায়েতের প্রাপ্য, সেই টাকাও দেওয়া হল না। তখনও নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতা থেকে অনেক দূরে। তাকে সংবিধান লঙ্ঘনের প্রাথমিক শিক্ষা দিয়েছিল কে? আজ যখন মোদীর ‘ডাবল ইঞ্জিনের সরকার’-এর ধারণাকে নিন্দা করে মুখ্যমন্ত্রী গলা চড়িয়ে মঞ্চ প্রকম্পিত করেন, তখন তাকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত নয় কি যে খোদ তিনিই প্রথম ‘ডাবল ইঞ্জিনের’ ধারণাটি আমদানি করেছিলেন? বামফ্রন্টের আমলে সাত বার পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল। এমন কখনও হয়নি যে অন্তত ৪০ শতাংশের মতো গ্রাম পঞ্চায়েত বিরোধীদের দখলে যায়নি। ওইসব পঞ্চায়েতের সঙ্গে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অসহযোগিতা করা হয়েছে অথবা প্রাপ্য অনুদান দেওয়া হয়নি– এমন কোনও কথা বিরোধীদের মুখে শোনা যায়নি। আরও কথা আছে। বাম আমলের সাত বার পঞ্চায়েত নির্বাচনের মধ্যে পাঁচ বার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসন জয় সীমাবদ্ধ ছিল ০.৭ থেকে সাড়ে পাঁচ শতাংশের মধ্যে। ১৯৮৮ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন আসন ছিল ৮ শতাংশ। কিন্তু তখনো মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ বিরোধীরা করেনি। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ৩৪ শতাংশ আসনেই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ জয়ী হয়েছে তৃণমূল। যেখানে বামফ্রন্টের আমলে ২০০৮ সালের শেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই হার ছিল ৫.৫৭ শতাংশ, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন ২,৮৪৫ জন— সেখানে ২০১৮-তে জয়ী হয়েছেন ২০,১৫৯ জন তৃণমূল প্রার্থী। বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যে থেকে এবং বুর্জোয়া হিগেমনি (hegemony) বা বুর্জোয়া প্রভাব বলয়ের মধ্যে থেকেও বামপন্থীরা গণউদ্যোগ বিকশিত করার প্রচেষ্টা নিলে গণতন্ত্রের শিকড় পরিব্যাপ্ত হয়। কিন্তু পার্টি-উদ্যোগ প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা নিলে গণউদ্যোগ ব্যাহত হয়। সুতরাং বামপন্থীদের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত? লক্ষ্য এটাই হওয়া উচিত যে, গণউদ্যোগ কোনওভাবেই খর্ব না করে পার্টিকে তার আদর্শগত নেতৃত্ব কায়েম করতে হবে– যুদ্ধটা হিগেমনি বা প্রভাব বলয় বিস্তারের লড়াই, পার্টি লাইন ‘নামিয়ে’ দেওয়ার যুদ্ধ এটা নয়। যুদ্ধটাকে এইভাবে দেখলে, অর্থাৎ দলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই হিসাবে দেখলে ‘পার্টি লাইন’ জেতে। কিন্তু পার্টি হেরে যায় প্রভাব বলয়ের বিস্তারের লড়াইয়ে। শ্রমজীবি জনতার স্বার্থই বামপন্থীদের স্বার্থ, এই স্বার্থ ব্যতিরেকে তাদের কোনও hardened দলীয় বা ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই, একথা আমরা আগেই বলেছি। এই জন্যেই তারা তৃণমূল অথবা বিজেপির মতো ক্ষমতাপ্রিয় বা দুর্নীতিপ্রবণ নয়। বাম আমলে কাতার দিয়ে যেসব মানুষ প্রতি সন্ধ্যায় দলীয় অফিসে ভিড় করতেন নানা সমস্যা সুরাহার আশায়, সেই মানুষই নিঃশব্দে সরে যান দল সঙ্কটে পড়লে। কারণ বামপন্থী মতাদর্শের প্রভাব বলয়ে আকৃষ্ট হয়ে তারা আসেননি। তা-ই যদি হত, যদি নিজের অবস্থার সামান্য উন্নতির সঙ্গে তারা বাম মতাদর্শের যোগসুত্রটির সঙ্গতি আবিষ্কার করতে পারতেন, তবেই একমাত্র তারা সেই মতাদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করতেন, পলকে যা মিলিয়ে যেতে পারত না। বহু দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের পুনরাবিষ্কার করে, বহু প্রত্যাখানের অপমান সয়ে, বহু রক্ত অঞ্জলি দিয়ে বামপন্থীরা মনে হয় এই উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছেন। তিন গত বেশ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার আগুনের মধ্য দিয়ে পথ চলে চলে বামপন্থীরা বুঝতে পেরেছেন যে, গণতন্ত্রের ব্যাপক প্রসারই হচ্ছে সেই গ্যারান্টি যা সুনিশ্চিত করতে পারে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির পরিসরে তাদের প্রাসঙ্গিকতা। এবং প্রাসঙ্গিকতা বজায় থাকলে তবেই না প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এই দু’টি আবশ্যিক শর্ত পূরণ হলে নিজেদেরকে মানুষের কাছে আস্থার যোগ্য হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব। এই প্রক্রিয়াটি স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে ঘটবে না। একমাত্র মানুষের জীবন ও জীবিকার দাবিগুলি নিয়ে লাগাতার লড়াই করে যেতে হবে। এর কোনও শর্টকাট রাস্তা নেই। এই দাবিগুলির পিছনে কেবল শ্রমজীবি শ্রেণিগুলির সমাবেশই যথেষ্ট নয়, শাসক শক্তিগুলি ছাড়া অন্যান্য সমস্ত শক্তিগুলির, বিশেষত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমাবেশ ঘটাতে হবে। টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রি করার কেলেঙ্কারি যত উদ্ঘাটিত হয়েছে ততই মধ্যবিত্তের গা বাঁচিয়ে চলার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে। কারণ এতে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তৃণমূল তাদের মেধার অহংকার ঘুচিয়ে দিয়ে শ্রমিক-কৃষকের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে বিজেপিও তো তৃণমূলের বিরোধিতা করছে। তবে বিজেপির সঙ্গে নয় কেন? বস্তুত, বামপন্থীদের তরফ থেকে এই প্রশ্নের সঠিক মোকাবিলা করতে না পারার জন্যই ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এমন চমকপ্রদ সাফল্য পেয়েছিল। সেই সময়ে বামপন্থীরা যে বিজেপির থেকে ভিন্ন গোত্রের রাজনীতির ধারক, সেকথা জনমনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। এ রাজ্যে প্রতিবিপ্লবের আক্রমণ দুমুখো— শারীরিক আক্রমণ, খুন, জখম, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার দায়ভার তৃণমূলের। কারণ তার হাতেই আছে ক্ষমতা, আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব। আর বিজেপির আক্রমণ মানুষের মগজে, তারা ছাড়া তৃণমূলের বিরুদ্ধে রক্ষাকর্তা কেউ নেই — এই কথাটা মানুষের মগজে গেঁথে দেওয়া। বিজেপি’র থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখানোর জন্য বামপন্থীদের কয়েকটি গুণ থাকতে হবে। প্রথমত, will to sacrifice— ত্যাগ স্বীকারের ইচ্ছাশক্তি। এই ত্যাগ স্বীকার মানুষের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য। দ্বিতীয়ত, will to power— ক্ষমতা দখলের সংকল্প। এই ক্ষমতা দখল জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তৃতীয়ত, বামপন্থীদের যাবতীয় কর্মকাণ্ডে একটা জনমুখী চরিত্র থাকতে হবে। এবং চতুর্থত, যাই ঘটুক না কেন, জনগণের থেকে কখনই বিচ্ছিন্ন না হওয়া। এগুলিই হল বামপন্থার সঞ্জীবনী। সুখের কথা, বামপন্থীরা এই পথেই দ্বিধাহীন পদক্ষেপে এগোচ্ছেন। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, মাফিয়া সর্দারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যে বিশাল লুম্পেন বাহিনী পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রতিটি স্তরে বামপন্থীদের ওপরে প্রতিদিন সন্ত্রাস নামিয়ে আনছে, তারা বিনা যুদ্ধে রণাঙ্গন থেকে পালিয়ে যাবে না। এটা তাদেরও রুটিরুজির লড়াই। আর বামপন্থীদের কাছে এই লড়াইটা হল গ্রামস্তর পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রসারের লড়াই। সন্ত্রাস আর গণতন্ত্র দুই বিপরীত শক্তি। দুটি একই সাথে থাকতে পারে না। এবারে কে জয়ী হবে তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। —মতামত লেখকের নিজস্ব প্রকাশের তারিখ: ০৩-জুলাই-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |