গালিলিও কবে সন্ত গালিলিও হবেন?

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
একেই বলে গরু মেরে জুতোদান। গল্পটা কিন্তু এখানেই শেষ হয় নি। জোন-কে পুড়িয়ে মারার প্রায় পাঁচশ বছর বাদে, ১৯০৪-এ ভাটিকান থেকে তাঁকে ভেনেরেবল (মাননীয়া) বলে ঘোষণা করা হলো। ১৯০৮-এ তিনি হলেন ব্লেসেড (আশীর্বাদধন্যা)। তার ক বছর পরে, ১৯২০-তে জোন হয়ে গেলেন পুরোদস্তুর সেন্ট— সন্ত জোন! (১৯২৩-এ এই নামে একটি অসাধারণ নাটক লিখেছিলেন জর্জ বার্নাড শ)। আমরা অপেক্ষা করে আছি: বিজ্ঞানী গালিলিওকে কবে ‘সন্ত গালিলিও’ বলে ঘোষণা করা হবে।

খবর পাওয়া গেল: গালিলেই (১৫৪৬-১৬৪২) অবশেষে ক্যাথলিক ধর্মমণ্ডলীর হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন। ১৯৮০-তে পোপ দ্বিতীয় জন পল ঐ বিজ্ঞানীর পুনর্বিচারের জন্যে একটি কমিশন বসিয়েছিলেন। ভাটিকান-এর গোপন মহাফেজখানায় অনেক পুরনো নথিপত্র তালাবন্ধ হয়ে ছিল। বারো বছর ধরে সেসব ঘেঁটে ঐ কমিশন অবশেষে রায় দিয়েছেন: ১৬৩৩-এ গালিলিও সুবিচার পান নি। পৃথিবীর ঘোরা-না-ঘোরার ব্যাপারে ধর্মীয় বিচারসভা ভুল করেছিল (যদিও তার মতলব নাকি খারাপ ছিল না!)। ভাটিকান-এ তাবড় ক্যাথলিক মুরুব্বি, বিজ্ঞানী ও নোবেল পুরস্কারজয়ীদের কাছে স্বয়ং পোপ-ই নাকি খবরটি ভেঙেছেন। (দ সানডে স্টেটসম্যান, ১ নভেম্বর ১৯৯২)

আরও খবর না-পাওয়া পর্যন্ত ঠিক বলা যাচ্ছে না: ধর্মভীরু ক্যাথলিকদের চোখে গালিলিও এবার পুরোপুরি রাহুমুক্ত হলেন কিনা। না-ধার্মিকদের অবশ্য এতে কিছুই যায় আসে না। তিনশ ষাট বছর ধরে যে এই প্রহসন চলল—  এটাই যথেষ্ট হাস্যকর। কাগজে মাঝে মধ্যেই উলটোপালটা খবর বেরয়। ইতিহাসের খুঁটিনাটি না জেনেই বা না বুঝেই কোনো কোনো বিজ্ঞান-লেখক ডাহা ভুল লিখে ফেলেন। যেমন, কয়েক বছর আগেই পথিক গুহ লিখেছিলেন: আড়াইশ বছর (!) বাদে ভাটিকান তার লজ্জাজনক ভুল (ফো পা) স্বীকার করেছে ( টেলিগ্রাফ, ৮ এপ্রিল ১৯৮৪)। কথাটা আদৌ ঠিক ছিল না। ১ নভেম্বর ১৯৯২-এর খবরটা (সূত্র: তানযুগ রোম, ৩১ অক্টোবর ১৯৯২) পড়লেই সেটা ধরা পড়ে।

এ তো গেল আংশিক অজ্ঞতা। জ্ঞানের অমাবস্যা কাকে বলে—  সেটা জানতে চাইলে আর একটা বই দেখা উচিত। নাম প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী, লেখক: শ্রীসুধাংশু পাত্র। কলকাতার বাণী শিল্প থেকে বেরিয়েছিল জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৩-তে। ধান ভানতে সেখানে গালিলিও-র গীত গাওয়া হয়েছে। প্রবল আবেগভরে লেখক বলেছেন:

হঠাৎ একদিন পৃথিবীর এককোণ থেকে এক আধপাগল মানুষ বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করলেন—  ‘সূর্য ঘোরে না, ঘোরে পৃথিবী।’ পৃথিবীর মানুষ হতভম্ব হয়ে একবার তাকাল তাঁর দিকে। ইংরাজী ১৬৩২ সাল। এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। পৃথিবী মেনে নিল না তাঁর কথা।  উঠল প্রতিবাদের তুমুল ঝড়, —  ‘গ্যালিলিও ধর্মবিরোধী কথা বলেছে, শাস্তি তাঁকে দিতেই হবে। নইলে দেবতার রোষাগ্নি নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে।’ কিন্তু গ্যালিলিও যে নিজের তৈরী দূরবীণ চোখে লাগিয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন গ্রহদের গতিবিধি। গ্যালিলিও বললেন, ‘না, ভুল তিনি করেন নি।’ মানুষ সহজে নিষ্কৃতি দিল না তাঁকে। নিয়ে গেল রাজদ্বারে। সব শুনে সেদিন ক্রুদ্ধ রাজা কারারুদ্ধ করলেন গ্যালিলিওকে। বললেন, ধর্মদ্রোহিতার অপরাধে গ্যালিলিওর হবে প্রাণদণ্ড। তবে তিনি যদি তাঁর ধারণাকে ভ্রান্ত বলে স্বীকার করেন তবে পাবেন মুক্তি। সেদিন প্রাণের ভয়ে গ্যালিলিও স্বীকার করলেন, ‘পৃথিবী ঘোরে না, ঘোরে সূর্য।’ (পৃ. ৮০)

এই সব মণিমুক্তোও ছাপা হয়, লোকেও পড়েন।

আসলে আঠেরো শতক থেকেই গালিলিওকে নিয়ে ক্যাথলিকরা ছুঁচো-গেলা অবস্থায় ছিলেন। না পারেন গিলতে, না পারেন উগরোতে। তাঁদের তরফের পণ্ডিতরা এতকাল ঐ অপকর্মর নানা সাফাই গেয়েছেন। ক্যাথলিক বিশ্বকোষ ও নব ক্যাথলিক বিশ্বকোষ-এ গালিলিও নিয়ে অনেকখানি লেখা আছে। সেগুলো পড়লেই তাঁদের করুণ অবস্থাটা বোঝা যায়। বিচারটা যে খুবই দুঃখের ব্যাপার, সমর্থনের আযোগ্য—  এসব কথাও সেখানে স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় বিচারসভার রায়টা এতকাল নাকচ করা হয় নি।

অথচ, ১৭৪৪ থেকেই দফায় দফায় খিড়কি দিয়ে গালিলিও-র পুনর্বাসন শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রথমে তাঁর সংলাপ বইটির সংশোধিত সংস্করণ বার করার অনুমতি দেওয়া হয়। ‘সূর্য স্থির, পৃথিবীই ঘুরছে’ এ-কথা বলার ব্যাপারে যে-নিষেধাজ্ঞা ছিল—  একটি হুকুমনামা (ডিক্রি জারি করে সেটা তুলে নেওয়া হয় ১৭৫৭-য় । ১৮২২-এ পোপ সপ্তম পিউস ভূভ্রমণবাদ নিয়ে লেখার অনুমতি দেন। ১৮৩৫-এ দেখা গেল, ক্যাথলিক ধর্মমণ্ডলীর নিষিদ্ধ গ্রহ সূচি-তে আর কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, কেপলার প্রমুখের নাম নেই (১৯৬৬ থেকে ঐ কুখ্যাত ‘গ্রন্থসূচি’ বেরুনোই বন্ধ হয়ে গেছে)। এইভাবে শনৈঃ শনৈঃ গালিলিও-র পুনর্বাসন-প্রক্রিয়া চলছিল। এবার কি তাতে দাঁড়ি টানা হলো?

কায়দাটা নতুন নয়। আর্ক-এর জোন (আনু. ১৪১২-১৪৩১)-এরও বিচার করেছিল এক ধর্মীয় বিচারকমণ্ডলী। তার মাথায় ছিলেন কোর্ট বলে এক বিশপ। অভিযোগ ছিল: মেয়েটি ডাইনি ও ধর্মদ্রোহী। দিনের পর দিন উনিশ বছরের এক কিশোরীকে হেনস্থা করেছিলেন বুড়ো বুড়ো সব ধর্মতাত্ত্বিক। তবু জোনকে দিয়ে কোনো কাল্পনিক ‘দোষ’ কবুল করানো যায় নি। তখন তাঁকে তুলে দেওয়া হয়েছিল ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে। তারা তাঁকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিল। ফ্রান্সের রাজা সপ্তম শার্ল অবশ্য ঐ রায় বাতিল করানোর জন্যে দুবার চেষ্টা করেছিলেন—  কোনো সৎ, মানবিক উদ্দেশ্যে নয়, নেহাতই নিজের অবস্থা পোক্ত করার জন্যে। তাতেও কোনো ফল হয় নি। পরে পোপ তৃতীয় কাল্লিস্তুস একটি কমিশন বসান। ১৪৫৬-য় তাঁরা জানালেন: জোন-এর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগুলো জালিয়াতি ও ছলচাতুরী করে আদায় করা। তখন জোন পুনর্বাসিত হলেন।

একেই বলে গরু মেরে জুতোদান।

গল্পটা কিন্তু এখানেই শেষ হয় নি। জোন-কে পুড়িয়ে মারার প্রায় পাঁচশ বছর বাদে, ১৯০৪-এ ভাটিকান থেকে তাঁকে ভেনেরেবল (মাননীয়া) বলে ঘোষণা করা হলো। ১৯০৮-এ তিনি হলেন ব্লেসেড (আশীর্বাদধন্যা)। তার ক বছর পরে, ১৯২০-তে জোন হয়ে গেলেন পুরোদস্তুর সেন্ট—  সন্ত জোন! (১৯২৩-এ এই নামে একটি অসাধারণ নাটক লিখেছিলেন জর্জ বার্নাড শ)। 

আমরা অপেক্ষা করে আছি: বিজ্ঞানী গালিলিওকে কবে ‘সন্ত গালিলিও’ বলে ঘোষণা করা হবে। 

পোপ দ্বিতীয় জন পল বলেছেন, এই পুনর্বাসনকে ‘বিজ্ঞান ও ধর্মবিশ্বাসের মহান পুনর্মিলন’ বলে দেখা হচ্ছে। কিন্তু, হে প্রাজ্ঞ মহামান্য, সে তো হওয়ার নয়! সত্য আর মায়ার চিরশান্তিপূর্ণ সহাবস্থান অসম্ভব।

এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। ১৯৮১-তে এ-যুগের বিস্ময়বিজ্ঞানী স্টিফেন ডবলিউ হকিং ভাটিকান-এর আমন্ত্রণে একটি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্ব (কসমোলজি) বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে কিছু পরামর্শ নিতে চেয়েছিলেন—  ক্যাথলিক ধর্মমণ্ডলী। সম্মেলনের শেষে বিজ্ঞানীরা পোপ দ্বিতীয় জন পল-এর দর্শন লাভের অনুমতি পান। পোপ তাঁদের বলেন: মহাবিস্ফোরণ (বিগ ব্যাং)-এর পরে মহাবিশ্বের বিবর্তন নিয়ে চর্চা করায় কোনো আপত্তি নেই! কিন্তু খোদ মহাবিস্ফোরণ নিয়ে অনুসন্ধান করাটা বিজ্ঞানীদের পক্ষে উচিত হবে না, কারণ সেটি হলো জগৎ সৃষ্টির মুহূর্ত, সুতরাং ঈশ্বরের কীর্তি। হকিং লিখেছেন:

আমি তখন খুশি হয়েছিলুম যে তিনি (= পোপ) জানতেন না ঐ সম্মেলনে ঠিক তার আগেই আমার বক্তৃতার বিষয় কী ছিল—  দেশ-কাল সীমাবদ্ধ কিন্তু তার কোনো বেড়া নেই। অর্থাৎ, তার কোনো শুরু নেই, জগৎসৃষ্টিরও কোনো মুহূর্ত নেই। গালিলিও নিয়তির ভাগী হওয়ার কোনো বাসনা আমার ছিল না, তাঁর সঙ্গে আমি খুবই একাত্ম বোধ করি। অংশত তার কারণ এই যে, ঘটনাচক্রে তাঁর মৃত্যুর ঠিক তিনশ বছর পরে আমার জন্ম।

(আ ব্রিফ হিসট্রি অফ টাইম, নিউ ইয়র্ক: ব্যান্টাম বুকস, ১৯৮৯, পৃ. ১২২)

ক্যাথলিক ধর্মমণ্ডলী যদি সসম্মানে গালিলিও-র পূর্ণ পুনর্বাসনও করেন, মহাবিস্ফোরণের প্যাচ থেকে তারা বেরবেন কী করে? হকিং ও তাঁর সহকর্মীরা ঘোর নাস্তিক। তাদের চুলের ডগা ছোঁয়ার ক্ষমতা কোনো ধর্মপ্রতিষ্ঠানের নেই। সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসীরা এ-বাবদে কী করবেন? 


ঋণ: কামারের এক ঘা, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
কৃতজ্ঞতা: শম্পা ভট্টাচার্য, সিদ্ধার্থ দত্ত


প্রকাশের তারিখ: ০৮-জানুয়ারি-২০২৩

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org