প‍্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি, প্রকৃত অর্থ

টিম মার্কসবাদী পথ
পশ্চিমের কোনও সরকার খুব সহজেই দাবি করতে পারে: ‘আমরা তো প‍্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছি।’ সংক্ষিপ্ত এই বাক‍্যটি অনেকটা রাজনৈতিক সেফটি ভলভের মতো। জনমনের চাপ কমায়। মিডিয়াকে সন্তুষ্ট করে। অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু মূল নীতি থেকে যায় অপরিবর্তিত। অনেকটা রোগীকে শুধু যন্ত্রণা উপশমের ওষুধ দেওয়ার মতো, কিন্তু মূল রোগের হচ্ছে না কোনও চিকিৎসা।

ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগালের পর রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ ফ্রান্স। প‍্যালেস্তাইনকে দিয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। একইসঙ্গে স্বীকৃতি দিয়েছে বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, অ্যান্ডোরা এবং সান মারিনো-র মতো দেশ। এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে স্বাধীন প‍্যালেস্তাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের সংখ্যা ১৫৬। যার অর্থ, রাষ্ট্রসঙ্ঘের তিন-চতুর্থাংশের বেশি সদস‍্য-রাষ্ট্র!


১৫৬টি দেশ কোন সালে স্বীকৃতি দিয়েছে তার চিত্র। সূত্র- লে মঁদে

 নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। পশ্চিমের শক্তিগুলির এই পদক্ষেপ শুধু সংখ‍্যার দিক থেকে নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবের দিক থেকেও বহন করে এক অতুলনীয় গুরুত্ব।

পাশাপাশি, জোরের সঙ্গে বলা দরকার, বহুদিন আগেই তাদের এই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত ছিল। ইজরায়েলের ক্রমবর্ধমান বর্বরতা, বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে চরম ঔদ্ধত্যের সঙ্গে প্রকাশ‍্যে তার উপনিবেশবাদী লক্ষ্যের কথা ঘোষণা, বিপরীতে প‍্যালেস্তিনীয় জনগণের সাহসী অদম‍্য প্রতিরোধ এবং বিশ্বজুড়ে প্রত‍্যয়ী সংহতি আন্দোলনের অবিরাম পদক্ষেপের মুখে এখন তারা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ‍্য হয়েছে। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষের বিস্ফোরণ যখন রাস্তায়, তখন সরকারগুলি তাদের ভাবমূর্তি, বিশ্বাসযোগ্যতার অবশেষটুকু রাখতে মরিয়া। নিজেদেরকে তাই তুলে ধরতে চাইছে ‘সৎ মধ্যস্থতাকারী’ এবং ‘আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষক’ হিসেবে। 

এটা ঠিক, প্রতিটি নতুন স্বীকৃতি আসলেই একধরনের প্রতীকী ও নৈতিক অর্জন। যা স্বাধীন প‍্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের ধারণাকে দেয় নতুন প্রাণশক্তি। তাৎক্ষণিকভাবে প্রতীকী হলেও, তা বহন করে গভীর অর্থ। আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে প্রতিফলিত করে প‍্যালেস্তিনীয়দের দীর্ঘ লড়াইকে। আবার এও ঠিক, এই স্বীকৃতি কেবল কাগজে লেখা ঘোষণা নয়। নিছক প্রেস-বিবৃতির একটি বাক‍্য নয়। বা কূটনীতির নথিতে লেখা লাইন নয়। 

পশ্চিমের কোনও সরকার খুব সহজেই দাবি করতে পারে: ‘আমরা তো প‍্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছি।’ সংক্ষিপ্ত এই বাক‍্যটি অনেকটা রাজনৈতিক সেফটি ভলভের মতো। জনমনের চাপ কমায়। মিডিয়াকে সন্তুষ্ট করে। অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু মূল নীতি থেকে যায় অপরিবর্তিত। অনেকটা রোগীকে শুধু যন্ত্রণা উপশমের ওষুধ দেওয়ার মতো, কিন্তু মূল রোগের হচ্ছে না কোনও চিকিৎসা। 

প‍্যালেস্তিনীয়রা বিলক্ষণ জানেন, এই কথাগুলো বহুবারই ব‍্যবহার হয়েছে অপরাধকে আড়াল করার জন‍্য। তাঁরা জানেন, পশ্চিমের বক্তব্য যতটা শক্তিশালী, তাদের কাজ ঠিক ততটাই সীমিত। কেবল স্বীকৃতি ঘোষণাই গাজার বোমাবর্ষণ থামায় না। বন্ধ করে না ওয়েস্ট ব‍্যাঙ্কের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ। তুলে দেয় না জেরুজালেমের অবরোধ। আগের মতোই চলতে থাকে দমনপীড়ন-নিপীড়ন। পশ্চিমের দেশগুলি নানা সম্মেলনে ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ নিয়ে বারবার কথা বলে। কিন্তু তার জন‍্য নেয় না কোনও কার্যকর পদক্ষেপ। অনেকটা মেঝের ফাটল আড়াল করতে কার্পেট পেতে রাখার মতো। ফাটল থেকে যায় ফাটলের মতোই, বরং আরও বাড়তে থাকে। 

প্রশ্ন তাই থেকেই যায়, এই স্বীকৃতি কি প‍্যালেস্তিনীয়দের দৈনন্দিন যন্ত্রণার সীমারেখাকে আদৌ অতিক্রম করতে পারবে? স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণার দিনই ব্রিটিশ সরকার ইজরায়েলি প্রেসিডেন্টকে লন্ডনে অভ্যর্থনা জানিয়েছে। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞে একইরকমভাবে ব‍্যবহৃত হচ্ছে ব্রিটিশ সমরাস্ত্র। যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র থেকে গোলাবারুদ। একদিকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি সমর্থন ঘোষণা, অন‍্যদিকে ইজরায়েলকে অস্ত্র সহায়তা অব্যাহত রাখা— তাহলে এ-ধরনের স্বীকৃতি বাস্তবে কী ফল দেবে!  কূটনীতির মসৃণ ভাষণে মানবাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রতিধ্বনি শোনা গেলেও, বাস্তব নীতিতে প্রাধান্য পাচ্ছে কৌশলগত স্বার্থ, সামরিক ব্যবসা ও ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানই প‍্যালেস্তাইনের স্বীকৃতিকে সীমাবদ্ধ করে রাখে শুধু প্রতীকী পদক্ষেপে।

এই স্বীকৃতির প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিফলিত হবে, যখন স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলি তা বাস্তবে প্রয়োগ করবে। কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করবে। গণহত্যা বন্ধ, দখলদারির স্থায়ী অবসান, গাজার পরিকাঠামো পুনর্গঠন এবং মানবিক সহায়তায় সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া এই স্বীকৃতি থাকবে অন্তসারশূন্য হয়ে। আশু প্রয়োজন দ্বিরাষ্ট্র-ভিত্তিক সমাধানের পথে দ্রুত অগ্রগতি এবং নিস্পতি— যাতে প্রতীকী স্বীকৃতি ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না-থেকে বাস্তবে প্রতিফলিত হয় প‍্যালেস্তাইনের রক্তাক্ত ভূখণ্ডে।


প্রকাশের তারিখ: ২৪-সেপ্টেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org