‘রেড অ্যালার্ট’ এবং রেগা

চন্দন দাস
তৃণমূলের লুটের কারণে পশ্চিমবঙ্গে রেগার কাজ বন্ধ করেছে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকার। বরাদ্দর টাকার দাবিতে তৃণমূল রাজ্যে কোনও আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেনি। গত তিন বছর রাজ্যে রেগার কাজ বন্ধ। টাকা বেঁচে যাচ্ছে মোদী সরকারের। রাজ্য সরকারকে কিছু টাকা দিতে হয় রেগার জন্য। তাও সাশ্রয় হচ্ছে মমতা-সরকারের। কিন্তু ক্ষতি কার? উত্তর সোজা— গ্রামীণ গরিবের।

সেদিন ১ মে ছিল না। তবু ইকনমিক টাইমস লিখেছিল, ‘মে ডে।’

তারা আরও লিখেছিল, ‘ব্লাড ইন দ্য স্ট্রীট’, ‘সেনসেক্স স্লটারড।’ টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘রেড অ্যালার্ট!’

সেদিন ১৪মে ছিল। ২০০৪। লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল তার চব্বিশ ঘন্টা আগে। ভারতের তথাকথিত বৃহৎ মিডিয়া আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। শেয়ার বাজার-কেন্দ্রিক ফাটকা পুঁজির অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছিল। কারণ, বামপন্থীরা ৬০টি আসনে জয়ী হয়েছিল। সিপিআই(এম)-এর শক্তি ৩৪ থেকে বেড়ে হয়েছিল ৪৪। কেন্দ্রে তৈরি হয়েছিল সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চার সরকার। সিপিআই(এম) বাইরে থেকে সেই সরকারকে সমর্থন করেছিল। সেই সরকারের প্রথম পদক্ষেপ দেখা দেয় ২৩ মে— ‘বিলগ্নীকরণ মন্ত্রক’ তুলে দেওয়া হয়েছিল সেদিন।

রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলিকে সরকারি উদ্যোগে তুলে দেওয়ার জন্য আলাদা মন্ত্রক বানিয়েছিল বাজপেয়ী-নেতৃত্ববাধীন বিজেপি সরকার। যে সরকারের শরিক ছিল তৃণমূল। মমতা ব্যানার্জি সেই সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন। শিল্প, কারখানায় সরকারি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা আসলে আরএসএস-এর নীতি। তা নিয়ে ‘গুরুজী’ গোলোয়ালকারের বক্তব্যও আছে। বামপন্থীদের চাপে সংযুক্ত মোর্চার সরকার সেই দপ্তরটি তুলে দেয়।

তার তিন দিন পরে অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়েছিল। দিনটি ছিল ২৭মে। সেই অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচিতে জাতীয় কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প চালুর ঘোষণা ছিল। সেই অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সিপিআই(এম)-র মত নির্দিষ্ট হয়েছিল পার্টির ২৫ মে’র পলিটব্যুরো বৈঠকে। সেই ঐতিহাসিক পলিটব্যুরোর বৈঠক বসেছিল কলকাতায়, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ ভবনে।

সিপিআই(এম) সহ বামপন্থীরা যে কটি বিষয় অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছিল ‘কর্মসংস্থান আইন’ ছিল তার অন্যতম। প্রতিশ্রুতি ছিল ন্যূনতম ১০০ দিনের কাজের আইনী বৈধতা দেওয়া হবে। সরকারের প্রকল্পেই এই কাজ দেওয়া হবে ন্যূনতম মজুরিতে। এই সংক্রান্ত আইন লোকসভায় পেশ হয় ২০০৫-এর ২৩আগস্ট লোকসভায় গৃহীত হয়। পরের দিন, ২৪আগস্ট রাজ্যসভায় পেশ হয়। আইনে পরিণত হয় ‘এনআরইজিএ’।

কিন্তু তখনই শাসক শ্রেণির মনোভাব সম্পর্কে সতর্ক করতে ‘পিপল্‌স ডেমোক্রেসি’তে সিপিআই(এম)-এর পক্ষ থেকে লেখা হয়, ‘‘শেষ পর্যন্ত এই বিলটি সংসদের দুই কক্ষেই গৃহীত হয়েছে। এটি স্বাগত জানানোর মতই পদক্ষেপ। স্বাধীনতার পর এই প্রথম কর্মসংস্থানের আইনী নিশ্চয়তার সুযোগ করে দিল কেন্দ্রীয় সরকার। কাজের অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে এটি একটি পদক্ষেপ। সিপিআই(এম) বরাবরই পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইনের কথা বলে এসেছে। এটি মোটেও তা নয়। পার্টি বলেছিল গ্রাম-শহর উভয়কেই এর আওতায় আনা হোক। বছরে ন্যূনতম ১৮০দিন কাজের নিশ্চয়তা থাকুক। হয়নি। তবু পার্টি রাজি হয়েছে। কারণ, এই অবস্থায় সূচনা হিসাবে এটি চালু হোক বলে পার্টি মনে করছে। দেশজুড়ে সমস্ত বেকারদের জন্য এটি সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে জারি রাখতে হবে সংগ্রাম।’’

পার্টি লিখেছিল, ‘‘একে লঘু করার সবরকম চেষ্টা হয়েছে। প্রতিহত করা গেছে সিপিআই(এম) সহ বামপন্থীদের প্রতিরোধে।’’

২০১৪-র নভেম্বরে রেগায় কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ সঙ্কোচন নিয়ে সূর্য মিশ্রর বক্তব্য এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। বামফ্রন্ট সরকারের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী তখন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। মিশ্র বলেছিলেন, ‘‘গত বছর সাড়ে ৪ কোটি মানুষ রেগায় কাজ পেয়েছিলেন। গড়ে গোটা দেশে ৪৫ দিন কাজ হয়েছিল। তার ভিত্তিতেই এবার ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, গোটা দেশে ১০০দিনের কাজের প্রকল্পে ৬৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। কিন্তু চলতি আর্থিক বছরে কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্পে ৩৩ হাজার কোটি টাকার সংস্থান রেখেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে চিঠি দিয়েছে লেবার বাজেট কত ছাঁটাই হবে। ৬৪ হাজার কোটি টাকার চাহিদা। আর ৩৩ হাজার কোটি টাকার সংস্থান! কোনও আশঙ্কা নয়, নথিতেই ফল পাওয়া যাচ্ছে।’’ মিশ্র সেদিন মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘‘একই কেন্দ্রীয় সরকার এবার ৫ লক্ষ কোটি টাকা কর্পোরেট ক্ষেত্রকে ট্যাক্স ছাড় দিয়েছে। এর কারণ কী?’’

এটি প্রশ্ন নয়। উত্তর। কোন পথে দেশ চালাতে চান নরেন্দ্র মোদী, রেগা প্রকল্প নিয়ে তাঁর মনোভাব কী, তাই স্পষ্ট হয়েছিল মিশ্রর বক্তব্যে। বিলগ্নী, উদারীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই এবং রেগার অধিকার রক্ষা, সম্প্রসারিত করার দাবিতে লড়াই আসলে সম্পৃক্ত। সেই লড়াই বামপন্থীরাই লড়ছে। পশ্চিমবঙ্গে একটি ন্যারেটিভ লাগাতার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হচ্ছে যে, বিজেপি’র বিরুদ্ধে লড়ছে তৃণমূল। শুধু তৃণমূল। কিন্তু রেগার ইতিহাস, বর্তমান বলছে তৃণমূল এবং বিজেপি একই দিকে, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মানুষের বিরুদ্ধে লড়ছে। রেগা তার প্রমাণ। রেগার ক্ষেত্রেও বিজেপি’র মিশনই কৌশলে প্রয়োগ করেছেন মমতা ব্যানার্জি।

প্রমাণ? জয়রাম রমেশের চিঠিতে ছিল। তিনি তখন কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী। কেন্দ্রের সরকার দ্বিতীয় ইউপিএ-র। রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। তৃণমূলের কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক। জয়রাম রমেশ ২০১১-র ৩০শে নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রীকে লিখেছিলেন,‘‘সংবিধানের ২৪৩ (জি) ধারা পঞ্চায়েতকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা এবং কতৃত্ব দিয়েছে যাতে তা স্ব-শাসিত সংস্থা হিসাবে কাজ করতে পারে। এই উপলব্ধিকে মনে রেখে, ২০০৫-র এমজিএনআরজিএ আইনে পঞ্চায়েতকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’’ রমেশের চিঠিতে ছিল সতর্কতাও, ‘‘সংবিধানের ২৪৩ (জি) ধারায় নির্দিষ্ট ভূমিকা যাতে কোনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী।’’

মমতা ব্যানার্জি সেই নির্দেশকে পাত্তাই দেননি। রাজ্যের পঞ্চায়েতের ক্ষমতা, রেগা পরিচালনার দায়িত্ব ততদিনে আমলাদের কবজায় তুলে দেওয়া শুরু হয়েছে। আর আমলাদের সহযোগিতায় প্রকল্প থেকে দেদার লুটে মজে উঠেছে তৃণমূল। বিজেপি’র পরিচালিত পঞ্চায়েতগুলিতেও তা চলেছে।

তৃণমূলের লুটের কারণে পশ্চিমবঙ্গে রেগার কাজ বন্ধ করেছে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকার। বরাদ্দর টাকার দাবিতে তৃণমূল রাজ্যে কোনও আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেনি। গত তিন বছর রাজ্যে রেগার কাজ বন্ধ। টাকা বেঁচে যাচ্ছে মোদী সরকারের। রাজ্য সরকারকে কিছু টাকা দিতে হয় রেগার জন্য। তাও সাশ্রয় হচ্ছে মমতা-সরকারের। কিন্তু ক্ষতি কার? উত্তর সোজা— গ্রামীণ গরিবের। সেই গ্রামীণ গরিব কারা? রাজ্যের গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের রিপোর্ট বলছে, এখন পশ্চিমবঙ্গে জবকার্ডধারী পরিবার আছে ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ৫৭ হাজার ১৫ টি। তার মধ্যে তফসিলি জাতির পরিবার আছেন ৩৪ লক্ষ ৪২ হাজার ৩৮৩ টি, আদিবাসী পরিবার আছে ৯ লক্ষ ৪০ হাজার ৬৭৪ টি। অন্যান্য ৯২ লক্ষ ৭৩ হাজার ৯৫৮ টি পরিবারের একাংশ অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির। তাঁদের মধ্যে মুসলিম পরিবার আছে। তার বাইরেও আছেন মুসলিম পরিবার, যারা ওবিসি’র আওতায় নেই। অর্থাৎ রেগার কাজ বন্ধ হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশ সামাজিক, আর্থিক, শিক্ষাগত ভাবে পিছিয়ে থাকা অংশ।

এই ক্ষেত্রে একটি তথ্য বেশ চমকপ্রদ। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালের থেকে কত বেশি পরিবারকে রেগার জবকার্ড দিয়েছে তৃণমূলের সরকার? তথ্যই কথা বলুক। ২০১০-১১ আর্থিক বছরে পশ্চিমবঙ্গে রেগার জবকার্ডধারী পরিবার ছিল ১ কোটি ১০ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৫৬ টি। অর্থাৎ ১৪ বছরে বেড়েছে ৩৩ লক্ষের কিছু বেশি। কিন্তু তফসিলি, আদিবাসী পরিবার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কম। ২০১০-১১-তে রাজ্যে রেগার জবকার্ডধারী তফসিলি পরিবার ছিল ৩১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৪৩৪ টি। অর্থাৎ সাড়ে ১৪ বছরে বেড়েছে মাত্র ২ লক্ষ ৯৭ হাজারের কিছু বেশি। ২০১০-১১-তে রেগার জবকার্ডধারী আদিবাসী পরিবার ছিল ৮ লক্ষ ৬০ হাজার ৮৩০ টি। সাড়ে ১৪ বছরে বেড়েছে মাত্র ৮০ হাজারের কাছাকাছি। অর্থাৎ গত সাড়ে ১৪ বছরে খুবই সামান্য তফসিলি জাতি, আদিবাসী পরিবার বেড়েছে রেগার আওতায়।

কিন্তু রহস্য লুকিয়ে আছে ওই তথ্যেই। গত সাড়ে ১৪ বছরে রাজ্যে রেগায় জবকার্ডধারী পরিবার বেড়েছে ৩৩ লক্ষের কিছু বেশি। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগণায়। সেখানে জবকার্ডধারী পরিবার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১০-১১-তে ছিল ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার ৭১৫। ২০২৫-২৬-এ হয়েছে ১৪ লক্ষ ১ হাজার ৮৪৫। এই জেলায় ২০০৮ থেকে জেলা পরিষদ চালায় তৃণমূল। এই জেলার মধ্যে ডায়মন্ডহারবার লোকসভা কেন্দ্র। তৃণমূলের দুর্নীতির অন্যতম ধারক এই জেলা। অথচ দক্ষিণ দিনাজপুরের ছবি কী? রাজ্যের অন্যতম পিছিয়ে থাকা জেলা। সেই জেলায় ২০১০-১১-তে জবকার্ডধারী পরিবার ছিল ২ লক্ষ ৯৬ হাজার ৪৯৩ টি। সাড়ে ১৪ বছর পর জবকার্ডধারী পরিবার দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ৭৭ হাজার ৭৭৬!

দক্ষিণ ২৪ পরগণায় দ্বিগুণ হয়। দক্ষিণ দিনাজপুরে কমে যায় জবকার্ডধারী!

পাশাপাশি দুই জেলা— দুই মেদিনীপুর। সাড়ে ১৪ বছরে পশ্চিম মেদিনীপুরে জবকার্ডধারী বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার। আর পূর্ব মেদিনীপুরে ৬ লক্ষ ৬০ হাজার ৫৯০ থেকে মমতা-শুভেন্দু শাসনে জবকার্ডধারী পরিবারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ লক্ষ ১৮ হাজার ১৪৯। কোন মন্ত্র বলে পশ্চিম মেদিনীপুরে ২৬ হাজার বাড়ে আর পূর্ব মেদিনীপুরে বৃদ্ধি পায় দশ গুণ বেশি— প্রায় ২লক্ষ ৬০ হাজার! 

রেগাকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়ে তার উদ্দেশ্য, কার্যকারিতা নষ্ট করেছে তৃণমূল। অজুহাত শক্ত হয়েছে তৃণমূলের। এই তথ্যও প্রতিষ্ঠা করা যাবে না যে, ‘মুসলমানদের তোষণ’ করেছেন মমতা ব্যানার্জি। কারণ সংখ্যালঘু নিবিড় মুর্শিদাবাদে এই সময়ে জবকার্ডধারী পরিবার বেড়েছে ২ লক্ষ ২৩ হাজারের কিছু বেশি। অথচ দক্ষিণ ২৪ পরগণার কাকদ্বীপ, ফলতা, সাগর, কুলপির মতো ব্লকে, যেখানে সংখ্যালঘু কম আছে, সেখানেও জবকার্ডধারী প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

তৃণমূল চুরি করেছে। তৃণমূল-শাসনে ক্ষতিগ্রস্ত, প্রতারিত হয়েছেন তফসিলি জাতি, আদিবাসী, ওবিসি, সংখ্যালঘুরা। রেগা তার আরও একটি আয়না।

রেগার কাজ চালুর এই ইতিহাসের বিবরণ দেওয়ার কারণ একটিই। কয়েকটি প্রবণতা, বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করা। প্রথমত, ‘বিলগ্নীকরণ’-এর রাজনৈতিক অর্থনীতি মেনে চলার অভিমুখ থেকে কিছুটা উল্‌টো পথে দেশকে চালনা করার চেষ্টার যে লড়াই চলছিল তখন, ‘রেগা’ তার একটি উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, রেগা একটি আইন, কাজের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। এটি কোনও প্রকল্প নয়। তৃতীয়ত, প্রথম থেকেই শাসকের একটি অংশ এই আইন চালু করায় গড়িমসি করার চেষ্টা করেছে। যত দেশ দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকেছে, যত বামপন্থীদের শক্তি কমেছে, তত রেগাকে গুরুত্বহীন করার চক্রান্ত, অপপ্রয়াস বেড়েছে। চতুর্থত, বামপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধিতে আতঙ্কিত অংশ, যারা ২০০৪-এর মে’ তে শেয়ার বাজারের কৃত্রিম ধ্বসকে ‘রেড অ্যালার্ট’ বলে চিহ্নিত করেছিল, তারা লাগাতার প্রচার করেছে বিলগ্নীর পক্ষে এবং রেগা একটি দুর্নীতিময় প্রকল্প বলে। সেই সুরেই সংসদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, ২০১৫-তে রেগাকে বিদ্রূপ করে বলেছিলেন, ‘গর্ত খোঁড়ার প্রকল্প’। ২০১৫-তে পঞ্চমত, আইনটি চালুর সময় থেকেই তা রক্ষা করার জন্য লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা উচ্চারিত হয়েছে। আর সংগ্রামের সেই আহ্বান এসেছে বামপন্থীদের শিবির থেকেই।

তবে রেগা’ কে কেউ অস্বীকার করতে পারেনি। প্রমাণ? রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ২০১৫-র মার্চে সঙ্ঘ দাবি করেছে যে, রেগা প্রকল্পে মানুষ ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়ে পড়ছে। এতে টাকা কমিয়ে স্বনিযুক্তি প্রকল্পে বরাদ্দ হোক। কাজের অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি সঙ্ঘের দর্শনের বিরোধী। তাই তারা কোনদিন রেগা প্রকল্পকে মানতে চায়নি। কিন্তু করোনা মহামারীর পরে, ২০২১-এর আগস্টে সঙ্ঘের ‘স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ’ দাবি করে, ‘রেগায় বরাদ্দ বাড়ানো হোক।’ এখন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের নীতি হলো, রেগা থেকে বরাদ্দ কমানো। রেগাকে দুর্বল করা।

সেদিনের আশঙ্কা আজ বিপজ্জনক বাস্তবে পরিণত হয়েছে। সেদিন পিপল্‌স ডেমোক্রেসির শিরোনাম ছিল— ‘গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন— জনগণের জয়; রক্ষা করুন একে।’ আজ এই আহ্বান সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। রেগা রক্ষা করা, মজুরি বাড়ানো, কাজের দিনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর দাবিতে সংগ্রাম আজ উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


প্রকাশের তারিখ: ০১-মে-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org