|
হো চি মিন প্রসঙ্গেএম বাসবপুন্নাইয়া |
এখানে হো চি মিন ও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি একটা সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত ভূমি সংক্রান্ত রণকৌশল উদ্ভাবনে তাঁদের পাকাপোক্ত মার্কসবাদী বিচক্ষণতার নিদর্শন দেখিয়েছেন। এখানেই আমাদের থামা উচিত এবং একটা বিতর্কে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত নয়। ভিয়েতনামী প্রকাশনা থেকে আমার এই উদ্ধৃতি-সংকলনটি ইতিমধ্যেই দীর্ঘ হয়ে গেছে এবং তা আর ভারাক্রান্ত করা চলে না। গণশক্তির পাঠকদের কাছে আমাকে ক্ষমা করতে অনুরোধ করছি যদি আমি ‘হো চি মিন, একজন মানুষ, একটি জাতি, একটি যুগ, একটি লক্ষ্মন’ শীর্ষক কমরেড ফ্যাম ভান দং এর পুস্তিকাটি থেকে কয়েকটি প্রামাণ্য মন্তব্য উল্লেখ করি। |
ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৯০ সালের ১৯শে মে থেকে ১৯৯১ সালের ১৯শে মে পর্যন্ত যে জন্মশতবর্ষ পালন করছে, সেই জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দৈনিক গণশক্তির সম্পাদক অনিল বিশ্বাস একটি বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশের জন্য হো চি মিন সম্পর্কে আমাকে একটি প্রবন্ধ লিখতে বলেছেন। ভিয়েতনামী কমিউনিস্ট পার্টি তিনটি অমূল্য দলিল প্রকাশ করেছে এবং নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ভারতে ভিয়েতনাম দূতাবাস থেকে তা পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমটির শিরনাম ‘যে মানুষটি একটি জাতিকে গড়েছেন’। দ্বিতীয়টির নাম ‘হো চি মিন, ভিয়েতনামের জাতীয় বীর ও মহান সংস্কৃতিবান’। তৃতীয় দলিলটি লিখেছেন হো চি মিনের বিশিষ্ট অনুগামী ও ঘনিষ্ঠ সহকর্মী কমরেড ফ্যাম ভান দং যাঁর বর্ণনায় ‘হো চি মিন, একজন মানুষ, একটি জাতি, একটি যুগ, একটি লক্ষ্য’। উল্লিখিত বই তিনটি আমার লেখার জন্য বলতে গেলে কিছুই বাকি রাখেনি, কেননা তাতে আছে প্রয়াত হো চি মিনের প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্যময় দিক, একজন অসাধারণ মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ও সর্বহারার একনিষ্ঠ আন্তর্জাতিকতাবাদী হিসাবে তাঁর অনন্য ও বিশ্ব-ঐতিহাসিক ভূমিকা। এমন একটা বিষয়ে লেখার চেষ্টা করতে আমার সাহস হয় না এবং তাও আবার একটি প্রবন্ধে যার জন্য বিশেষ সংখ্যাটি আরো বেশি স্থান দিতেও পারে। আমি এখানে যা করতে চাই, তা হলো কিছুটা নির্লজ্জ ধরনের 'চৌর্যবৃত্তি' অর্থাৎ ভিয়েতনামী কমিউনিস্ট পার্টির উল্লিখিত তিনটি রচনা থেকে কিছু কিছু কথা ও অনুচ্ছেদের পুনরুল্লেখ। হো চি মিন জন্মেছিলেন ১৮৯০ সালের ১৯মে তারিখে আর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। ঊনসত্তর বছর পূর্ণ করে আশির গোড়ায় কয়েকমাস বেঁচেছিলেন। সেই ‘১৯০৮ সালের গ্রীষ্মে’ তিনি স্কুলের পাঠ চুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন সায়গনে। মধ্য ভিয়েতনামে তাঁর জন্মস্থানের অভিজ্ঞতার চেয়ে সেখানটাও কোনোভাবেই তাঁর কাছে ভাল ঠেকে নি। তিনি দেখেছিলেন ‘সর্বত্রই জনগণ একই নির্যাতন ও শোষণ, একই দুঃখদুর্দশা ও অবজ্ঞায় জর্জরিত। পশ্চিমী দেশগুলিতে জনগণ কীভাবে স্বাধীন ও শক্তিশালী হয়েছিল তা দেখার আগ্রহই সেখানে যাবার জন্য সবচেয়ে বেশি পেয়ে বসেছিল হো চি মিনকে, যাতে ফিরে এসে ফরাসী ঔপনিবেশিকদের বিতাড়িত করায় স্বদেশবাসীকে সাহায্য করতে পারেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তে জাতীয় মুক্তির জন্য আমাদের জনগণের সংগ্রামে উন্মোচিত হলো এক নতুন সম্ভাবনা’। ১৯১১ সালের ৫ জুন তারিখে তিনি মধ্য সায়গন ছেড়ে চলে গেলেন এবং একটি ফরাসী কোম্পানির জাহাজে ‘রান্নাঘরের কাজে সাহায্যকারীর চাকরি’ জোগাড় করলেন। ‘ফরাসী দেশে জীবিকার জন্য একজন পাচক হিসাবে, লেহাডার পোর্টের কাছে সাঁত-আদ্রেসে একজন মালী হিসাবে তিনি দৈহিক পরিশ্রম করেছেন। ব্রিটেনে একটা স্কুলে বরফ-ঝাড়ুদার ছিলেন, লন্ডনের একটা হোটেলে চুল্লি ধরানো ও পরিচারকের কাজ করতেন।’ তিনি ভ্রমণ করেছেন প্রচুর। প্রথমে ফরাসী দেশে, কিন্তু সেখানে বেশি দিন থাকেন নি। ইউরোপের অন্য অনেক দেশে, টিউনিসিয়া, কঙ্গো, দাহোনি, সেনেগাল, রিইউনিয়ন, গ্রেট ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশে তিনি ঘুরেছেন। ভিয়েতনামী কমিউনিস্ট পার্টি থেকে যথার্থভাবেই বলা হয়েছে, ‘রুশ অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অভ্যুদয় দুনিয়াকে কাঁপিয়েছিল। বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণী, শ্রমজীবী মানুষ ও নিপীড়িত জাতিগুলিকে তা জাগিয়েছিল এবং সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মানব ইতিহাসে একটা নতুন যুগ, দুনিয়া-জোড়া পুঁজিবাদের ভাঙন ও সমাজতন্ত্রের বিজয়ের যুগকে তা উন্মোচিত করেছিল। হো চি মিনের জঙ্গী জীবনে অক্টোবর বিপ্লব একটা নির্ধারক প্রভাব ফেলেছিল। বিপুল উদ্দীপনার সাথে এবং আমাদের দেশে ও পৃথিবীতে বিপ্লবের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের গভীর বিশ্বাসে তিনি রুশ অক্টোবর বিপ্লবের পথ অনুসরণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।’ এটা সত্যিই এক রোমাঞ্চকর কাহিনী: ‘১৯২১ সালের ডিসেম্বরে মার্সাইলে ফরাসী কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস হয়েছিল পার্টি গঠনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য। সেখানে সভাপতিমন্ডলীতে নির্বাচিত হয়েছিলেন হো চি মিন।’ ঐ একই ভিয়েতনামী পুস্তিকাটিতে আরো দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়, ‘১৯২২ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত ফরাসী কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে ঔপনিবেশিক প্রশ্নে সর্বসম্মতভাবে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং এই প্রশ্নকে পার্টির পরবর্তী জাতীয় কংগ্রেসের আলোচ্যসূচীর অঙ্গ করার প্রস্তাব হয়। ...এই কংগ্রেসে আবারো হো চি মিন সভাপতিমন্ডলীতে নির্বাচিত হন।’ তিনি সত্যিই ছিলেন ফরাসী কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।’ এতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় প্রয়াত হো চি মিন কী মেজাজের ছিলেন এবং জাতীয় মুক্তি, সমাজতন্ত্র ও সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার সংগ্রামে কত যথার্থভাবে হো চি মিনের নাম এক বিশিষ্ট বিশ্ব-বন্দিত চরিত্রে পরিণত হয়েছে। একজনকে মহিমান্বিত করার জন্য আমি এ কথা বলছি না, ‘ব্যাক্তিপূজা’র একটা ধরন গড়ায় আমি ঝুঁকছি, এমন ভ্রমাত্যক ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু আমি হো চি মিনকে তাঁর প্রাপ্য ও ন্যায়সঙ্গত স্বীকৃতিই দিচ্ছি, সামাজিক নিপীড়ন ও শ্রেণী শোষণ থেকে মানবমুক্তির লক্ষ্যে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য। ২১ জানুয়ারিতে মহান লেনিনের মৃত্যুর সময় হো চি মিন মস্কোয় ছিলেন ও অশ্রুভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে ঐ বিষণ্ণ দিনগুলির কথা বলতে গিয়ে হো চি মিন লিখেছেন, ‘১৯২৪ সালের জানুয়ারিতে একদিন যখন আমরা হোটেলের নিচের তলায় যথারীতি প্রাতভোজনে লিপ্ত ছিলাম, তখন শুনতে পেলাম, লেনিন শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন। এটা যে সত্য, তা আমাদের কেউ ভাবতে পারেনি, কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, মস্কোয় সোভিয়েত অফিসগুলিতে অর্ধ-নমিত পতাকা উড়ছে। আমরা সবাই বিচলিত হলাম। লেনিন আর নেই! তিনি যখন জীবিত ছিলেন, তখন তাঁর সাথে দেখা করার সুযোগ পাইনি, সেটা আমাকে সারা জীবন দুঃখ দেবে।’ একজন উপদেষ্টা প্রতিনিধি হিসাবে হো চি মিন যোগদান করেছিলেন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের পঞ্চম কংগ্রেসে। বড় বড় শহুরে দেশগুলি থেকে অংশগ্রহণকারীদের বক্তৃতা শুনে দাঁড়িয়ে উঠলেন এবং সজোরে বললেন, ‘আমার সাহসের জন্য দয়া করে আমায় ক্ষমা করবেন, কিন্তু আমি না বলে পারছি না’। বড় বড় শহুরে দেশগুলির অংশগ্রহণকারীদের বক্তৃতা শুনে তিনি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের উদ্যোগ ও বৈপ্লবিক আক্রমণের উপর জোর দেন। তিনি আরো বলেন, ‘উপনিবেশগুলির দিকে সমস্ত অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই আমার বক্তৃতার লক্ষ্য। উপনিবেশগুলিই বড় বড় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে খাদ্য ও জনবল জোগায়, তাদের উপরই বেশি নির্ভর করে বিশ্ব সর্বহারার ভাগা। আমরা যদি সেই শক্তিগুলিকে পরাজিত করতে চাই, তাহলে প্রথমে ও সর্বাগ্রে তাদের উপনিবেশ থেকেই তাদের বঞ্চিত করতে হবে।’ হো চি মিন আরো মন্তব্য করেন, ‘বড় বড় শহুরে দেশগুলির নেতাদের বক্তৃতা শুনে আমার মনে হয়েছিল, তাঁরা লেজে আঘাত ক'রেই সাপকে মারতে চেয়েছিলেন। আপনারা সবাই জানেন, সাম্রাজ্যবাদের গরল ও জীবনীশক্তি এখন উপনিবেশগুলির উপরেই কেন্দ্রীভূত, শহুরে দেশগুলির উপর নয়।’ এটাই হলো জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সংগ্রামের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য যোগসূত্রের সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ধারণা। ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির লেখাগুলিতে বলা হয়েছে, হো চি মিন ‘মস্কোতে পঞ্চম কমিন্টার্ন কংগ্রেসে ফরাসী কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন’ এবং তিনি ‘কৃষক, যুব, মহিলা ও সাহায্যদানের সংগঠনগুলির অন্যান্য আন্তর্জাতিক সভা-সমিতিতে যোগদানের সুযোগ নিতেন।’ এই পঞ্চম কমিন্টার্ন কংগ্রেসেই হো চি মিন ‘উপনিবেশগুলিতে বিপ্লব প্রসঙ্গে লেনিনের মতামতের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি কমিন্টার্নের পূর্বাঞ্চল বিভাগে দক্ষিণ ব্যুরোর প্রধান হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন, কৃষক আন্তর্জাতিকের সভাপতিমন্ডলীতে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং চীন, ব্রহ্মদেশ, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনস ও ইন্দোচীনে কৃষক আন্দোলনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।’ সেই ১৯২৪ সালেই এরকম ছিল হো চি মিনের উন্নত অবস্থান এবং পৃথিবীর কয়েকজন সর্বোচ্চ মার্কসবাদী-লেনিনবাদীর মধ্যে একজন হিসাবে তাঁর রাজনৈতিক মর্যাদা এবং তা অক্ষুণ্ণ রয়েছে আজো। সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনামের সরকারী কমিউনিস্ট প্রেস থেকে আমরা জানতে পারি, ‘১৯৩৮ সালের অক্টোবরে যখন একটা নতুন বিশ্বযুদ্ধ নিকটবর্তী, তখন হো চি মিন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে যাত্রা করেন চীনে এবং সেখানে ভ্রমণ করেন উত্তর থেকে দক্ষিণে। কুমিং, য়ুনান, কোয়েইলিন ও কোয়াংসি-তে তিনি আবার নিজেকে নিয়োজিত করলেন ভিয়েতনামী বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণের কাজে।’ ‘১৯৪১ সালের ২৮ জানুয়ারিতে হো চি মিন গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকলেন ভিয়েতনামে।’ এটাই সব নয়। ভিয়েতনামী নেতাদের সাম্প্রতিক লেখাগুলিতে বলা হয়েছে, প্রয়াত শ্রদ্ধেয় হো চি মিন ‘ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, জার্মানি আক্রমণ করবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে এবং জাপান যুদ্ধ শুরু করবে প্রশান্ত মহাসাগরে। তিনি বলেছিলেন, দেশ থেকে ফরাসী ও জাপানীদের উভয়কেই তাড়ানোর জন্য একটি মঞ্চ (ভিয়েতনাম ইনডিপেনডেন্স লিগ বা সংক্ষেপে ভিয়েতমিন) গঠন একান্ত প্রয়োজনীয় এবং বিশ্ব বিপ্লব ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী সংগ্রামের অপরিহার্য অঙ্গ হিসাবেই ভিয়েতনাম ও ইন্দোচীনে বিপ্লবের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।’ হো চি মিনকে ও ১৯৩৮-১৯৪২ সময়কালের বছরগুলিতে তখনকার বিশ্বের চলতি ঘটনাবলীর উপর তাঁর বৈপ্লবিক উপলব্ধিকে ভাষায় বর্ণনা করতে আমি অক্ষম। ‘১৯৪৫ সালে ভিয়েতনাম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের স্বাধীনতা ঘোষণায় হো চি মিন আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র ও ফরাসী বিপ্লবের ঘোষণাপত্র উভয়ই উদ্ধৃত করেছিলেন। তিনি শুরু করেছিলেন, ‘সব মানুষই সৃষ্ট হয়েছিল সমানভাবে, তাদের জীবন, স্বাধিকার ও সুখের অন্বেষণের মতো কয়েকটি অনপনেয় অধিকার দিয়েছিলেন তাদের স্রষ্টা।’ হো চি মিন আরো বলেন, ‘মানব ও নাগরিক অধিকারসমূহের উপর ১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লবের ঘোষণাপত্রেও বলা হয়েছে, সব মানুষই স্বাধীন হয়ে ও সমান অধিকার নিয়ে জন্মেছে এবং চিরকালই থাকবে স্বাধীন হয়ে ও সমান অধিকার নিয়ে। এ সব হলো অনস্বীকার্য সত্য।’ ১৯৪৫ সালে প্রথম বিজয়ী ভিয়েতনামী বিপ্লবের পরে ১৯৪৬ সালে ফরাসী দেশে গিয়ে হো চি মিন আবারো পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘এই অত্যন্ত মানবিক লক্ষ্যের প্রতি ভিয়েতনামী আনুগত্য আমি শ্রদ্ধার সাথেই ঘোষণা করছি। প্যারিস জন্ম দিয়েছিল ১৭৮৯ বিপ্লবের মহান আদর্শগুলিকে। এমন কি, গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময়েও প্যারিস এ সবের প্রতি অনুগত থেকেছে।’ অবশ্য ১৯৪৬ সালে হো চি মিনের এইসব উক্তি ও উচ্চাশা ফলপ্রসূ হয়নি, কেননা ফ্রান্সে যে রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠেছিল, তা উদ্যত হয়েছিল ইন্দোচীন উপদ্বীপকে পুনরায় জয় করতে। কিন্তু হো চি মিনের প্রাসঙ্গিকতা ও নির্ভুলতা প্রশ্নাতীত থেকে গেছে এবং জাতীয় মুক্তি, স্বাধীনতা ও সামাজিক মুক্তির জন্য যুদ্ধে দীর্ঘ বিশ বছরের প্রচন্ড ও ব্যাপক আত্মাহুতির পর হয়েছে বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়। ভিয়েতনামের তিনটি উল্লিখিত বইয়ের একটিতে বলা হয়েছে, পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির অষ্টম প্লেনামে কৃষিজমির ফ্রন্টে একটা নতুন রণকৌশলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কী সেই সিদ্ধান্ত ও তার অপরিমেয় তাৎপর্য? পুরোটা উল্লেখ করলে দাঁড়ায় ‘জমিদার শ্রেণীতে আরো পৃথকীকরণের জন্য প্লেনাম সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, জমিদারদের জমি বাজেয়াপ্ত করা ও তা কৃষকদের মধ্যে বিলি করার ধ্বনিটি সাময়িকভাবে মুলতুবি রাখা উচিত এবং সাম্রাজ্যবাদীদের ও বিশ্বাসঘাতকদের জমি বাজেয়াপ্ত করা ও তা গরিব কৃষকদের মধ্যে বিলি করা, জমির খাজনা ও ঋণের সুদ কমানো, যৌথ জমির পুনর্বণ্টন, ক্রমে ক্রমে কৃষকের হাতেই জমি দেওয়া, এমন সব ধ্বনিই তোলা উচিত।' ভাসা-ভাসাভাবে পড়লে একজন ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন যে, পরিবর্তিত ভূমিসংক্রান্ত রণকৌশলটি তেমন কিছু ব্যাপার নয়, কেননা ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তি যুদ্ধের একটা বিশেষ স্তরের জন্যই তা করা হয়েছিল। আমার বক্তব্য এই যে, উক্ত রণকৌশলগত পরিবর্তনটি হলো প্রদত্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থায় উদ্ভূত বাস্তব পরিবেশে, ভিয়েতনামী জাতীয় মুক্তি যুদ্ধের সময়ে বাস্তব পরিবেশে, ভিয়েতনামী জাতীয় মুক্তি যুদ্ধের সময়ে বাস্তব অবস্থায় সৃজনশীল মার্কসবাদ-লেনিনবাদ প্রয়োগের ফল। এখানে হো চি মিন ও ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি একটা সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত ভূমি সংক্রান্ত রণকৌশল উদ্ভাবনে তাঁদের পাকাপোক্ত মার্কসবাদী বিচক্ষণতার নিদর্শন দেখিয়েছেন। এখানেই আমাদের থামা উচিত এবং একটা বিতর্কে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত নয়। ভিয়েতনামী প্রকাশনা থেকে আমার এই উদ্ধৃতি-সংকলনটি ইতিমধ্যেই দীর্ঘ হয়ে গেছে এবং তা আর ভারাক্রান্ত করা চলে না। গণশক্তির পাঠকদের কাছে আমাকে ক্ষমা করতে অনুরোধ করছি যদি আমি ‘হো চি মিন, একজন মানুষ, একটি জাতি, একটি যুগ, একটি লক্ষ্মন’ শীর্ষক কমরেড ফ্যাম ভান দং এর পুস্তিকাটি থেকে কয়েকটি প্রামাণ্য মন্তব্য উল্লেখ করি। লেখক লেনিনের উক্তি উদ্ধৃত করেছেন, ‘যেখানে বিপ্লবী তত্ত্ব নেই, সেখানে বিপ্লবী আন্দোলন নেই’ এবং সজোরে বলেছেন, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ও অন্যান্যদের মতাদর্শকে অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করে এবং কর্মে তা সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করেই হো চি মিন একজন বিশ্ববিখ্যাত সর্বহারা বিপ্লবী হয়েছেন। ‘দুটি চোষণাঙ্গযুক্ত জোঁকের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদকে তুলনা’ করতে হয়েছিল হো চি মিনকে। এটা শুধুই একটা ধারণা নয়, ব্যাপক ও গভীর বহুমাত্রিক মূল্যসহ একটা দৃষ্টিকোণও বটে, যা শোষক হিসাবে সাম্রাজ্যবাদের স্বভাবকে খুলে ধরে, যেমন অতীতে, তেমনি বর্তমানে ও ভবিষ্যতেও, কেননা বিশ্ব বিপ্লবের বিকাশকে সামলানোর জন্য যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে সে পথ খোঁজে। কমরেড ফ্যাম ভান দং লিখেছেন, ‘আমি মনে করি, জাতীয় জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে উত্তরণ ইত্যাদির উপর হো চি মিনের নিবন্ধ... তিনটি মুক্তির নিবন্ধ – জাতীয় মুক্তি, সামাজিক মুক্তি ও মানবমুক্তি – পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ও পরিপূর্ণভাবে সংহত।’ হো চি মিনের হাতে প্রতিষ্ঠিত, গঠিত ও লালিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ভিয়েতনামের জনগণকে ‘ত্রিশ বছরে ফরাসী ও মার্কিন আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুটি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যাতে প্রতিভাত হয়েছে বিপুল সমাবেশ, সংগঠন ও পরিচালনার কর্মকান্ড ..... তাতে হো চি মিন একই প্রক্রিয়ায় তিনটি প্রধান কাজ সমাধা করার জন্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টিকে ও ভিয়েতনামীদের।’ ‘বিপ্লবী লক্ষ্যে কমিউনিস্ট পার্টির নির্ধারক ভূমিকা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন হো চি মিন’ এবং এমন একটি পার্টিই তিনি গড়েছিলেন ভিয়েতনামে। ‘পার্টি সম্পর্কে মৌলিক নীতিসমূহ যেমন, সুসঙ্গতি ও চিন্তার ঐক্য, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, আত্ম-সমালোচনা ও সমালোচনা, কমরেডদের মধ্যে পারস্পরিক প্রীতি, জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ইত্যাদিকে হো চি মিন তাঁর অন্তরে সারাজীবন ধরেই পবিত্র বিষয় বলে মনে করতেন এবং তাঁর মতোই যেন প্রত্যেকে বুঝতে পারে, সেজন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, যাতে একটা বিশাল শক্তিকে সৃষ্টি করা যায় ও উন্নত দক্ষতা অর্জিত হয়।’ হো চি মিন ও তাঁর জীবন সম্পর্কে প্রবন্ধে কমরেড ফ্যাম ভান দং মন্তব্য করেছেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটিয়েছে এবং পৃথিবীতে একটা বিরাট শক্তি হয়ে উঠেছে। তা সত্ত্বেও তাঁরা সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব পরিষ্কারভাবে দেখাতে, জনগণের আস্থা অর্জন করতে ও তাদের আকূল প্রত্যাশা পূর্ণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশে একটা গুরুতর সঙ্কট দেখা দিয়েছে। নেতৃত্বের অল্প-বিস্তর গুরুতর ভুলগুলিই প্রধানত তার কারণ যেসব ভুল জনগণকে হতাশ করেছে ও তাদের বিচ্ছিন্নতাবোধকে জাগিয়েছে আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াকে দিয়েছে তাদের অন্তর্ঘাতী কার্যাবলী বাড়ানোর সুযোগ’। ঐ রচনারই লেখক বলেছেন, ‘অর্থনীতি ও জাতিসমূহের জীবনের আর্ন্তজাতিকীকরণ ইতিহাসের একটা নতুন বৈশিষ্ট্য। বিশ্বজনীন চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী সমস্যাবলীর, বিশেষ করে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নিরক্ষরতা, ব্যাধি, ড্রাগের নেশা ইত্যাদির মতো অন্যান্য বিপদের মোকাবিলাতেও বিনিময় ও সহযোগিতা ত্বরান্বিত করতে তা জাতিগুলিকে সক্ষম করে।’ ১৯৫৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নেহরুর নেতৃত্বাধীন তদানীন্তন ভারত সরকারের কাছ থেকে নৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তার সন্ধানে হো চি মিন এদেশ সফর করেছিলেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল হো-কে দেখার, শোনার ও সাক্ষাৎ করার। তিনি দেহে ছিলেন কৃশ এবং বৈপ্লবিক চিন্তায় ও কর্মে ছিলেন অতিকায়। হো চি মিন সম্পর্কে আমার এই প্রথম অনুভূতি আমার উপর একটা স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। হো চি মিন ও তাঁর গৌরবময় বিপ্লবী জাতীয় মুক্তি যুদ্ধের প্রতি দৃঢ় সমর্থনে সব সময়েই অটলভাবে দাঁড়িয়েছে আমাদের পার্টি সিপিআই(এম)। সে ঘনিষ্ঠ ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক বজায় রাখে ভিয়েতনামী কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। যথার্থভাবেই বলা হয়েছে, হো চি মিন ‘ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সোভিয়েত, চীন ও ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির ও দুনিয়ার সর্বত্র অন্যান্য ভ্রাতৃপ্রতিম, কমিউনিস্ট ও শ্রমিক পার্টিগুলির সংহতির সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। যখন তারা ঐক্যবদ্ধ ছিল আর যখন তারা মতানৈক্য ও দ্বন্দ্বে বিভক্ত, সব সময়েই নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে হো চি মিন অত্যন্ত অধ্যবসায়ের সাথে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্যের জন্য যুক্তি ও ভাবাবেগ উভয় দিকের সঙ্গতি রেখেই কাজ করে গেছেন।’ বইটির লেখক বলছেন, ‘এসব নীতি হলো মূলত হো চি মিনের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা যা পেয়েছি অর্থাৎ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ, সমাজতান্ত্রিক পথ, পার্টির নেতৃত্ব, সর্বহারার একনায়কত্ব, সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র ও সর্বহারার আন্তর্জাতিকতা।’ আরো জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র হলো আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্রের ও চরম নৈরাজ্যবাদী গণতন্ত্রের বিপরীত। এটা হলো পার্টির নেতৃত্বে শ্রমজীবী জনগণের অকৃত্রিম গণতন্ত্র, এটাকে অবিরাম উন্নত ও বর্ধিত করতে হয়, প্রত্যেক ব্যক্তির, সমষ্টির ও জাতির অসীম সম্ভাবনাকে কার্যকরী করার এটা হলো চালিকা শক্তি। এর সারমর্মকে বুর্জোয়া বহুত্ববাদের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো যায় না। সর্বহারার একনায়কত্ব ও জীবনের সমস্ত কর্মকান্ডে নিয়ম ও শৃঙ্খলার সঙ্গে এটা নিবিড়ভাবে যুক্ত। জনগণের সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্যের বিরুদ্ধে যেকোনো ধ্বংসাত্যক কাজকে তা মোকাবিলা করবে দৃঢ়তার সাথে।’ সংক্ষেপে, এটাই হো চি মিনের ও তিনি ভিয়েতনামের যে কমিউনিস্ট পার্টিকে গড়েছেন, লালন করেছেন, শিক্ষিত ও ইস্পাতদৃঢ় করেছেন, তার বৈপ্লবিক সারাংশ। বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এটা একটা গৌরবময় অধ্যায় হয়ে রয়েছে, যে অধ্যায়কে কখনো নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘গণশক্তি’ পত্রিকার ‘হো চি মিন জন্মশতবার্ষিকী সংখ্যা’য় ১৯৯০ সালে। প্রকাশের তারিখ: ১৯-মে-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |