অক্টোবরের দিনগুলি

নাদেঝদা ক্রুপস্কায়া
বলশেভিক পার্টি, অত্যন্ত সুচিন্তিত পরিকল্পনার সঙ্গেই অক্টোবরে ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি নিয়েছিল। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে; কিন্তু পার্টির সংযমী মন তাকে অকালপ্রসূত বলে বিবেচনা করেছিল। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপার ছিল, আর সে সত্যটা ছিল এই যে, মানুষ তখনও একটা অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত ছিল না। কেন্দ্রীয় কমিটি তাই তা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিল। যে বিদ্রোহীদের রক্ত টগবগ করছিল, তাঁদের সংযত করার কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু, বলশেভিকরা তাঁদের কর্তব্য করেছিলেন; যদিও তা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কেন না তাঁরা বুঝেছিলেন অভ্যুত্থানের সঠিক সময় বেছে নেওয়াটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

সর্বহারার পার্টি– বলশেভিক পার্টি, অত্যন্ত সুচিন্তিত পরিকল্পনার সঙ্গেই অক্টোবরে ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি নিয়েছিল। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে;  কিন্তু পার্টির সংযমী মন তাকে অকালপ্রসূত বলে  বিবেচনা করেছিল। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপার ছিল, আর সে সত্যটা ছিল এই যে, মানুষ তখনও একটা অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুত ছিল না।  কেন্দ্রীয় কমিটি তাই তা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিল। যে বিদ্রোহীদের রক্ত টগবগ করছিল, তাঁদের সংযত করার কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু, বলশেভিকরা তাঁদের কর্তব্য করেছিলেন; যদিও তা’ ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কেন না তাঁরা বুঝেছিলেন– অভ্যুত্থানের সঠিক সময় বেছে নেওয়াটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

পরিস্থিতি বদলে গেল কয়েক মাস পরেই, ‘ইলিচ’ (লেনিন) যখন বাধ্য হয়েছিলেন ফিনল্যান্ডে লুকিয়ে থাকতে; ১২ আর ১৪ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে তিনি চিঠি লিখলেন কেন্দ্রীয় কমিটিকে, আর পেট্রোগ্রাদ ও মস্কো কমিটিকে, যাতে তিনি লিখেছিলেন, “শ্রমিক ও সৈন্যদের সোভিয়েতগুলির ডেপুটিদের সংখ্যাগুরু অংশ যখন হাতে, বলশেভিকরা তখন ক্ষমতা দখল করতে পারে এবং তা’ অবশ্যই করতে হবে”। পরে তিনি দেখালেন, অন্য সময় ছেড়ে  ঠিক ঐ সময়ই কেন ক্ষমতা দখল যথাযথ। পেট্রোগ্রাদের আত্মসমর্পন কমিয়ে দেবে সাফল্যের সম্ভাবনা। ব্রিটিশ ও জার্মান সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে আলাদা করে শান্তিস্থাপনের কথাবার্তা চলছিল। ইলিচ লিখলেন, “জয়লাভের জন্যই– অন্য জাতি(দেশ)গুলির সঙ্গে শান্তি-প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করা”।

অভ্যুত্থানের মূহুর্তটি কেমন করে ঠিক করতে হবে আর কি ভাবে তার প্রস্তুতি নিতে হবে, সে প্রশ্নে তিনি বিস্তারিত ভাবে লিখলেন কেন্দ্রীয় কমিটিকে। “সফল হবার জন্য - ষড়যন্ত্রের উপর নয়, একটি পার্টির উপরেও নয়, বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে অগ্রগামী শ্রেণীর উপর। এটাই হচ্ছে প্রথম পয়েন্ট। বিপ্লবে-তরঙ্গায়িত মানুষজনের উপরেই  বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। এটা হ’লো দ্বিতীয় পয়েন্ট। বর্ধমান বিপ্লবী ইতিহাসের এমন এক চূড়ান্ত মুহূর্তের উপর ভর করতে হবে, যখন জনতার আগুয়ান অংশের সক্রিয়তা তুঙ্গে, যখন শত্রু-বাহিনীর দোলাচলতা জোরালো এবং বিপ্লবের বন্ধুদের একাংশেরও মধ্যেকার দুর্বলতা, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার অভাব সবচেয়ে জোরালো। সেটা হ’লো তৃতীয় পয়েন্ট”।

চিঠির শেষাংশে ইলিচ নির্দেশ করলেন যে, যা করতে হবে তা মার্কসীয় পথে অভ্যুত্থানকে পরিচালনা করার উদ্দেশ্যেই,- অর্থাৎ, এক  শিল্প কর্মের মতন করে। “মার্কসীয় পথে অভ্যুত্থানকে পরিচালনা করার উদ্দেশ্যেই, অর্থাৎ, এক  শিল্পকর্মের মতন করে, একই সাথে, একটি মুহূর্তও নষ্ট না করে, সংগঠিত করতে হবে অভ্যুত্থানকারী-বাহিনীর মূল-কেন্দ্রের কর্মী-বাহিনী, ছড়িয়ে দিতে আমাদের শক্তিকে, আলেক্সান্দ্রিস্কি থিয়েটারকে [জারের বাহিনীর জন্য তৈরি থিয়েটার] ঘিরে বিশ্বস্ত সেনাদলকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলিতে মোতায়েন করতে হবে”; দখল নিতে হবে পিটার ও পল দুর্গ, সরকার ও তার সাধারণ কর্মীদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং ক্যাডেট ও স্যাভেজ ডিভিশনের[জারের অনুগত ককেশিয়ান অশ্বারোহী বাহিনীর] বিরুদ্ধে আমাদের এমন সব সেনাদলকে চালিত করতে হবে যাঁরা শহরের কেন্দ্রে শত্রু-সেনাকে এগোতে দেবার বদলে বরং মরতে রাজি থাকবে; শেষ দুঃসাহসী লড়াইয়ের জন্য আমাদের সশস্ত্র শ্রমিকদের আহ্বান জানাতে হবে; টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল করে সেখানে আমাদের মূল-কেন্দ্রের বিপ্লবী কর্মীদের বসাতে হবে – যাঁরা টেলিফোনে যোগাযোগ রাখবেন সমস্ত ফ্যাক্টরি, বিভিন্ন দলে ভাগ হওয়া আমাদের সব সেনা-দল এবং সশস্ত্র লড়াইয়ের সব পয়েন্টগুলির সঙ্গে, ইত্যাদি। 

“অবশ্য, এ সবই দৃষ্টান্ত হিসাবে, শুধু বিশদে বুঝিয়ে দেবার জন্য যে, অভ্যুত্থানকে এক শিল্পকলা হিসাবে না দেখলে – মার্কসবাদের প্রতি, বিপ্লবের প্রতি অনুগত থাকা অসম্ভব”। (লেনিন রচনা সংকলন, ২৬ খন্ড, পৃ.– ৪, ৮-৯।)

আসল জায়গা থেকে অপসারিত হয়ে ফিনল্যান্ডে থাকার জন্য, ইলিচ ভীষনভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন, পাছে অভ্যুত্থানের সবচেয়ে সুবিধাজনক মুহূর্তটি গুলিয়ে যায়। পেট্রোগ্রাদ শহর সম্মেলনকে ৭ই অক্টোবর চিঠি লেখার সঙ্গে সঙ্গে তিনি লিখলেন কেন্দ্রীয়  কমিটি, মস্কো কমিটি, পেট্রোগ্রাদ কমিটি, এবং পেট্রোগ্রাদ ও মস্কো সোভিয়েতের সমস্ত বলশেভিক মেম্বরদের কাছে। উত্তর অঞ্চলের সোভিয়েতগুলির কংগ্রেসের বলশেভিক প্রতিনিধিদের কাছে চিঠি লিখলেন ৮ই অক্টোবর, আর বেজায় চিন্তিত থাকলেন যে চিঠি পৌঁছালো কি না। ৯ তারিখে, তিনি নিজেই বেআইনীভাবেই হাজির হলেন – ওয়াইবর্গ জেলায়, সেখান থেকেই অভ্যুত্থানের প্রস্তুতির পরিচালনা করতে থাকলেন।

অভ্যুত্থান ছাড়া, ওই এক গত মাসে ইলিচ অন্য কোন কিছুই ভাবেননি, অন্য কোন কিছুর জন্যই বাঁচেননি। তাঁর মনোভাব, তাঁর গভীর বিশ্বাস তিনি চালান করতেন কমরেডদের মধ্যে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হ’ল উত্তর অঞ্চলের সোভিয়েতগুলির কংগ্রেসের, বলশেভিক প্রতিনিধিদের প্রতি, ফিনল্যান্ড থেকে লেখা তাঁর শেষ চিঠিটি। সেটি এখানে দেওয়া হ’লঃ

“সশস্ত্র অভ্যুত্থান হ’ল এক বিশেষ ধরণের রাজনৈতিক সংগ্রাম, যা বিশেষ ধরণের নিয়ম-কানুনের মধ্যে করতে হয় এবং যেটা নিয়ে গভীর মনোযোগের সঙ্গে বিবেচনা করে দেখতে হয়। এক অসাধারণ লক্ষনীয়ভাবে কার্ল মার্কস তা প্রকাশ করেছিলেন, যখন তিনি লিখলেন, ‘যুদ্ধের মতই অভ্যুত্থানও এক শিল্পকর্ম’।

এই শিল্পের প্রধান নীতিগুলির মধ্যে, মার্কস নিচেরগুলি চিহ্নিত করেনঃ

১) অভ্যুত্থান নিয়ে কখনও খেলা করবেন না; যখন শুরু করবেন, তখন দৃঢ়তার সঙ্গে স্পষ্ট উপলব্ধিতে আনতে হবে যে শেষ পর্যন্ত অবশ্যই যেতে হবে।

২) নির্ণায়ক মুহূর্তে, নির্ধারক স্থানে বাহিনীর সর্বোৎকৃষ্ট অংশকে জমায়েত করতে হবে, নইলে যে শত্রুদের সুবিধা আছে আরো ভালো প্রস্তুতি ও সংগঠনের, তারা অভ্যুত্থানকে ধ্বংস করে দেবে।

৩) একবার যখন অভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে, তখন অবশ্যই আপনাদের সর্বাধিক দৃঢ়প্রতিজ্ঞায়, সমস্ত উপায়ে, বিনা ব্যর্থতায় আক্রমণাত্মক হতে হবে। রক্ষণাত্মক সংগ্রাম প্রতিটি অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে মৃত্যুর সমান।

৪) যে সময়ে শত্রুবাহিনী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, সেই সময়েই শত্রুকে চমকে দিয়ে, মুহূর্তটিকে হাতের মুঠোয় নিতে হবে।

৫) প্রতিদিন সাফল্যের চেষ্টা অবশ্যই আপনাদের করতে হবে এমন কি তা ছোট হ’লেও (কেউ তা এক ঘন্টাও বলতে পারে, যদি তা’ একটি শহরের ক্ষেত্রে হয়), এবং যে কোন মূল্যে নৈতিক অগ্রগতি রক্ষা করতে হবে।

সশস্ত্র অভ্যুত্থান সম্বন্ধে এ পর্যন্ত জানা বিপ্লবী-নীতির প্রধান নায়ক দাতোঁর [দাতঁ – ফরাসী-বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নায়ক] কথায় মার্কস সব বিপ্লবের শিক্ষার সার-সংক্ষেপ করেনঃ দুঃসাহসী হও, দুঃসাহসী হও, নিরন্তর দুঃসাহসী হও।

১৯১৭-র অক্টোবরে রাশিয়াতে এর প্রয়োগের মানে হ’ল, যেমন হঠাৎ তেমনই  যত দ্রুত সম্ভব, একই সঙ্গে সমস্ত বাহিনীর আক্রমণ চালাতে হবে পেট্রোগ্রাদ, এবং যা করতে হবে বিনা ব্যর্থতায় আভ্যন্তরীণ দিক থেকে ও সীমান্তে, শ্রমিক-শ্রেণীর কোয়ার্টার্স থেকে আর ফিনল্যান্ড থেকে, রিভেল থেকে আর ক্রনস্টাড থেকে; ১৫ থেকে ২০ হাজার ‘বুর্জোয়া গার্ড’ (অফিসারদের স্কুল)-এর চেয়েও বেশি সংখ্যায় আমাদের জমায়েত করতে হবে বিশাল উৎকর্ষতার সেনাদলকে, ‘ভেন্ডিয়ান ট্রুপস’কে (যা কশাকদের অংশ), ইত্যাদি। 

আমাদের তিন প্রধান শক্তি – নৌ-বাহিনী, শ্রমিকগণ এবং সেনা-ইউনিটগুলিকে এমন ভাবে অবশ্যই সংযুক্ত করতে হবে যাতে বিনা ব্যর্থতায় ও যে কোন ত্যাগের মূল্যে দখলে রাখতে পারেঃ ক) টেলিফোন এক্সচেঞ্জ; খ) টেলিগ্রাফ অফিস; গ) সর্বোপরি  সেতুগুলি।

সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলির দখল এবং সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে অংশগ্রহণের জন্য বাহিনীর সবচেয়ে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ যাঁরা (আমাদের “শক-ব্রিগেড” আর যুব-কর্মীগণ, অধিকন্তু – নাবিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ যাঁরা) এঁদের অবশ্যই ছোট ছোট দলে ভাগ করতে হবে; যেমন ধরুনঃ

“পেট্রোগ্রাদকে ঘিরে ধরে বিচ্ছিন্ন করা; নৌ-সেনারা, শ্রমিকরা আর সেনাদলগুলির সম্মিলিত আক্রমণে এর দখল নিতে হবে; এটা এমন এক কাজ যাতে দরকার হবে শিল্প-জ্ঞান আর ত্রিগুণ ঔদ্ধত্য।

শত্রুদের ‘কেন্দ্রগুলি’ (সামরিক শিক্ষাকেন্দ্র, টেলিগ্রাফ অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, ইত্যাদি)  আক্রমণ ও ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যে সবচেয়ে ভালো শ্রমিকদের, রাইফেল ও বোমায় সশস্ত্র করে ছোট ছোট দল তৈরী করতে হবে।  এঁদের রণধ্বনিই হতে হবেঃ শত্রুকে এগোতে দেওয়ার চেয়ে বরং শহীদ হব!’

“আসুন আশা করি – লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত যখন নেওয়াই হয়েছে, নেতৃবৃন্দ সফল ভাবেই কাজে লাগাবেন দাতোঁ ও মার্কস-এর কর্মনীতিগুলি।

রাশিয়ার বিপ্লব আর বিশ্ব-বিপ্লবের সাফল্য নির্ভর করে দুই বা তিনদিনের যুদ্ধের উপর।”(পৃ. ১৫১ -৫৩, রচনা সঙ্কলন, ২৬শ খন্ড।)

২১ তারিখে চিঠিটি লেখা হয়েছিল, ২২শেই ইলিচকে দেখা গিয়েছিল পেট্রোগ্রাদে। পরের দিন ছিল কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং। সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রস্তাবটি সেখানে পেশ করা হ’ল। জিনোভিয়েভ ও কামেনেভ ভোট দিলেন বিরুদ্ধে এবং দাবি করলেন কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনারি অধিবেশন ডাকা হোক। কামেনেভ আবার কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে পদত্যাগের কথা ঘোষণা করল। লেনিন দাবি করলেন যে ওঁদের উপর পার্টির কঠোরতম শাস্তি আরোপ করা হোক।

সুবিধাবাদী সমস্ত প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে, এগিয়ে চলল অভ্যুত্থানের নিবিড় প্রস্তুতি। ২৬শে অক্টোবর, পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েতের কার্যকরী কমিটি বিপ্লবী সামরিক কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাশ করল। পার্টি সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির এক বর্ধিত সভা হ’ল ২৯শে অক্টোবর। একই দিনে এক সভায়, অভ্যুত্থান পরিচালনা করার জন্য স্তালিন, স্যের্দলভ, জেরিঝিন্সকি এবং অন্যান্যদের নিয়ে এক বিপ্লবী সামরিক কেন্দ্র গঠন করল কেন্দ্রীয় কমিটি।

শুধু কার্যকরী কমিটি নয় সামগ্রিকভাবে পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েত প্রস্তাবিত বিপ্লবী সামরিক কমিটিকে সমর্থন করল ৩০শে অক্টোবর। পাঁচদিন পরে, রেজিমেন্টাল কমিটিগুলির সভা স্বীকৃতি দিল যে, পেট্রোগ্রাদ বিপ্লবী সামরিক কমিটিই হবে পেট্রোগ্রাদে সামরিক ইউনিটগুলির নেতৃত্বকারী সংগঠন; এবং একটি প্রস্তাব পাশ করল এই মর্মে যে বিপ্লবী সামরিক কমিটির অনুমোদন ছাড়া অন্য কারো নির্দেশ পালন করা হবে না।

ইতিমধ্যে, ৫ই নভেম্বর, বিপ্লবী সামরিক কমিটি [বি.সা.ক.]সামরিক ইউনিটগুলির কমিসার নিয়োগ করল। পরের দিন, ৬ই নভেম্বর, অস্থায়ী সরকার সিদ্ধান্ত নিল যে, বি.সা.ক.-র বিরুদ্ধে মামলা করা হবে, আর সামরিক ইউনিটগুলির কমিসারদের গ্রেফতার করা হবে। শীত-প্রাসাদে ডাকা হ’ল সামরিক শিক্ষার্থীদের [ক্যাডেটদের]। কিন্তু, তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে। সামরিক ইউনিটগুলি দাঁড়ালো বলশেভিকদের পক্ষে। সোভিয়েতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে শ্রমিকরা। বি.সা.ক কাজ করছিল কেন্দ্রীয় কমিটির সরাসরি পরিচালনায়, যার বেশির ভাগ সদস্য - স্তালিন, স্যের্দলভ, মলোটভ, জেরিঝিন্সকি এবং বুবনভ সহ – সকলেই বি.সা.ক.-র সদস্য। শুরু হ’ল অভ্যুত্থান।

৬ই নম্ভেম্বর, লেনিন তখনও আত্মগোপনে, ওয়াইবর্গ জেলায় আমাদের পার্টি সদস্য মার্গারিতে ফোফানভার ফ্ল্যাটে। তিনি জানতেন, অভ্যুত্থান ঘটতে চলেছে; ওরকম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে না থাকতে পেরে তিনি অস্থির হচ্ছিলেন। মার্গারিতের মারফত তিনি দু’টি বার্তা পাঠালেন যে, অভ্যুত্থানে আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। ঐ সন্ধ্যায়, ওঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন এক ফিনল্যান্ডীয় কমরেড – ইনো রাহজা।  ইনো, যিনি ছিলেন ফ্যাক্টরিগুলি ও পার্টি-সংগঠনগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, যাঁর মাধ্যমেই ইলিচ পার্টি-সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন,- তিনি ইলিচকে বললেন, - শহরে যে গার্ডরা পাহারা দিচ্ছেন, তাঁদের সংখ্যা দ্বিগুন করা হয়েছে। শ্রমিকদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য, অস্থায়ী সরকারের নির্দেশে নেভা নদীর উপরকার ব্রীজটি তুলে দিয়েছে, এবং সেগুলিকে সেনাদের দল পাহারা দিচ্ছে।  অভ্যুত্থান নিশ্চিতভাবেই শুরু হয়েছে। স্তালিনকে ডেকে পাঠিতে চাইছিলেন ইলিচ। ইনো বলেন যে সেটা প্রায় অসম্ভব। কেননা, স্তালিন বোধহয় আছেন বিপ্লবী সামরিক কেন্দ্র – স্মোলনিতে। সম্ভবতঃ ট্রাম চলছে না। ওঁর কাছে পৌঁছতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। ইলিচ তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি নিজেই যাবেন। “যেখানে যাই বলে তুমি চাও না, আমি সেখানেই যাচ্ছি। বিদায়, ইলিচ।”- এ রকম একটা চিরকুট, মার্গারিতের জন্য লিখে রেখে, তিনি দ্রুত চলে গেলেন।

সে রাতে ওয়াইবর্গ জেলা অভ্যুত্থানের জন্য অস্ত্র-সজ্জিত হচ্ছিল। জেলা কমিটির কাছে শ্রমিকদের একটার পর একটা দল আসছিল, অস্ত্র আর নির্দেশ নিতে। আমি সে রাতে ইলিচের সঙ্গে দেখা করতে ফোফানোভার ফ্ল্যাটে গিয়েছিলাম। শুনলাম তিনি স্মোলনিতে চলে গেছেন। যে লরি আমাদের লোকদের তরফে স্মোলনিতে পাঠানো হচ্ছিল, ঝেনিয়া ইয়েগোরোভা (ওয়াইবর্গ জেলা পার্টি কমিটির সম্পাদিকা) আর আমি তাতেই উঠে পড়লাম। ইলিচ নিরাপদে স্মোলনিতে পৌঁছালো কিনা , এই নিয়ে আমি খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম। এখন আমার মনে পড়ছে না যে, আমি ইলিচকে স্মোলনিতে সত্যিই দেখেছিলাম, নাকি শুধু জেনেছিলাম তিনি ওখানেই আছেন। সে যাই হোক, আমি জানি, আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলিনি; কেননা, অভ্যুত্থান পরিচালনার কাজে তিনি তখন সম্পূর্ণ মগ্ন ছিলেন আর যখন কোন কাজ করেন, কখনোই তা আধা-খ্যাঁচড়া করেন না।

 অতিব্যস্ত কাজের কেন্দ্র স্মোলনি ছিল তখন অত্যুজ্জ্বলভাবে আলোকিত। সারা দেশ থেকে নির্দেশ নিতে আসছিল – রেড-গার্ডরা, কারখানাগুলির প্রতিনিধিরা আর সৈন্যরা। টাইপ-রাইটার করেই চলেছে খটখট, টেলিফোন বাজছে, আমাদের মেয়েরা বাছাই করছে টেলিগ্রামগুলি; বিপ্লবী সামরিক কমিটির লাগাতার অধিবেশন চলছিল দোতলায়। বাইরে চৌমাথায় সাঁজোয়া গাড়িগুলি ধকধক করছিল, বন্দুক উঁচিয়ে প্রস্তুত ছিল। যদি ব্যারিকেড দরকার হয়ে পড়ে, তাই গাদা করা ছিল জ্বালানি কাঠ। প্রবেশ-পথে ছিল বন্দুক আর মেশিনগান, দরজায় ছিল সান্ত্রী।

২৫শে অক্টোবর সকাল দশটায় (নতুন ক্যালেন্ডারে ৭ই নভেম্বর) পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েতের বিপ্লবী সামরিক কেন্দ্র, “রাশিয়ার নাগরিকদের প্রতি” বলে যে ইস্তাহারটি প্রকাশ করলো, যাতে বলা হয়েছিল, “অস্থায়ী  সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়েছে পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েতের শ্রমিক ও সৈন্যদের প্রতিনিধিদের হাতে; পেট্রোগ্রাদের সর্বহারা ও গ্যারিসনের মাথার উপরে আছে বিপ্লবী সামরিক কেন্দ্র।

“যে কারণে জনগণ লড়াই করেছেন, অবিলম্বে গণতান্ত্রিক শান্তি প্রস্তাব পেশ, জমিদারদের জমির মালিকানার বিলোপ,  উৎপাদনের উপর শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ এবং সোভিয়েত সরকার গঠন, এসবই সুনিশ্চিত করা হচ্ছে।

“শ্রমিক-সৈন্য-কৃষকদের বিপ্লব জিন্দাবাদ!” (পৃ. ২০৭, রচনা সঙ্কলন, ২৬শ খন্ড।)

যদিও এটা নিশ্চিত হয়েছিল যে, বিপ্লব বিজয়ী হয়েছে, তবুও, একটার পর একটা সরকারী অফিস দখল করা, গার্ড-ডিউটি সংগঠিত করা, ইত্যাদির মাধ্যমে,- বি.সা.ক. তাদের কার্যকলাপ আগের মতই তীব্রভাবে চালিয়ে গেল।

বেলা আড়াইটার সময়, শ্রমিকগণ ও সৈন্যগণের ডেপুটিদের পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সভা হ’ল। পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েত হৈ-হৈ করে জয়ধ্বনি দিল এই রিপোর্ট পেয়ে যে, অস্থায়ী সরকার আর বেঁচে নেই, কিছু মন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছে, বাকিরা তাদের পালা আসার জন্য অপেক্ষা করছে, প্রাক-সংসদ খারিজ হয়েছে এবং রেলওয়ে স্টেশনগুলি, বড় পোস্ট ও টেলিগ্রাফ অফিস আর স্টেট-ব্যাঙ্ক দখল করা হয়েছে। শীত-প্রাসাদে অভিযান হয়েছে। এটা যদিও দখল করা হয়নি, কিন্তু এর ভাগ্যে তালা পড়ে গেছে, এবং সৈন্যরা আশ্চর্যজনক বীরত্ব দেখাচ্ছে। অভ্যুত্থান ছিল রক্তপাতশূন্য।

সোভিয়েতের সভায় লেনিনের উপস্থিতি অভিনন্দিত হ’ল তুমুল ভাবে। ইলিচের যেমন বৈশিষ্ট্য- বিজয় নিয়ে তিনি কোন লম্বা ভাষণ দিলেন না। উলটে বললেন – সোভিয়েত-শক্তির সামনের কর্তব্যগুলি, যেগুলি ঐকান্তিক আগ্রহে মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বললেন, রাশিয়ার ইতিহাসে এক নতুন যুগ শুরু হয়েছে। সোভিয়েত সরকার বুর্জোয়াদের ছাড়াই চলবে। জমির উপর ব্যক্তি-মালিকানা লোপ করার আইন জারি করা হবে। শিল্পের উপর শ্রমিকদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করা হবে। সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম শুরু করা হবে। রাষ্ট্রের পুরানো কল-কব্জা ভেঙে গুঁড়িয়ে, নতুন কর্তৃত্ব - সোভিয়েত সংগঠনগুলির কর্তৃত্ব স্থাপিত হবে। আমাদের আছে গণসংঠনগুলির শক্তি, যা দূর করবে সমস্ত বাধাই। আজকের কাজ হ’ল – শান্তি নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসা। সেটা করার জন্য পুঁজিকে পরাস্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সর্বহারা, যাঁদের মধ্যে বিপ্লবী অস্থিরতার চিহ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে, তাঁরাই সাহায্য করবে আমাদের শান্তি অর্জনে।

সৈন্য ও শ্রমিকদের ডেপুটিদের পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েতে সদস্যদের ক্ষেত্রে এই বক্তৃতা একেবারে সঠিক লক্ষ্যে আঘাত করল। হ্যাঁ, আমাদের ইতিহাসে এক নতুন যুগ শুরু হ’ল বটে। মানুষের সংঠনগুলির শক্তি ছিল অপরাজেয়। জনগণ জাগছে, আর বুর্জোয়াদের শক্তি ধরাশায়ী। আমরা জমির মালিকদের কাছ থেকে জমি নেব, আইন দেব শ্রমিকদের হাতে, আর, সব কিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হ’ল – আমরা শান্তি অর্জন করব। বিশ্ব-বিপ্লব আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে। ইলিচ ঠিকই বলেছেন। হাততালির তুফান দিয়ে ওঁর ভাষণ অভিনন্দিত হ’ল। 

সেই সন্ধ্যায় সোভিয়েতগুলির দ্বিতীয় কংগ্রেসের উদবোধন হওয়ার ছিল।  সেটা ছিল সোভিয়েতের শক্তি ঘোষণা আর, বিপ্লবের বিজয়কে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবার জন্য। 

প্রতিনিধিরা যেমন পৌঁছতে লাগল তাদের মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়া হ’ল। শ্রমিকদের সরকারকে নির্ভর করতে হবে কৃষকদের ওপরে, তাদেরকে সরকারের সমর্থনে সমবেত করতে হবে। সম্মিলিতভাবে দাঁড়াতে হবে তাঁদের পিছনে। যে পার্টির কৃষকদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের কথা, তা হ’ল সোস্যালিস্ট রিভলউশনারি পার্টি। ধনী কৃষক ও কুলাকদের মতাদর্শ বিদ্যমান ছিল এই দক্ষিনপন্থী সমাজবাদী-বিপ্লবীদের পার্টির মধ্যেই। কৃষক জনতার মতাদর্শধারী বাম সোস্যালিস্ট রিভলউশনারিরা ছিল পাতি-বুর্জোয়াদের প্রতিনিধির আদর্শ নমুনা, যারা দুলছিল বুর্জোয়া আর সর্বহারাদের মধ্যে। সোস্যালিস্ট রিভলউশনারিদের পেট্রোগ্রাদ কমিটির নেতা ছিল নাতানসন, স্পিরিদোনোভা আর কামকভ। প্রথম দেশান্তরী হবার সময় ইলিচের দেখা হয়েছিল নাতানসনের সঙ্গে। ১৯০৪-এর সেই সময়ে নাতানসন বেশ ভালোভাবেই মার্কসবাদীদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, শুধু একটি বিশ্বাস ছাড়া;  নাতানসনের বিশ্বাস - সোস্যাল-ডেমোক্র্যাটরা কৃষকদের ভূমিকাকে ছোট করে দেখছে। স্পিরিদোনোভা ছিলেন তখন এক জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। ১৯০৬-এর প্রথম বিপ্লবের সময়ে, তখন তিনি ১৭ বছরের কিশোরী মাত্র; তামবভ গুবের্নিয়াতে কৃষক আন্দোলন দমন করেছিল লুঝেনোভস্কি; তাকে গুপ্ত-হত্যা করেছিলেন স্পিরিদোনোভা। পাশবিকভাবে অত্যাচারিত হবার পরে, শাস্তিমূলক দাসত্বের জন্য পাঠানো হয় সাইবেরিয়া; ফেব্রুয়ারি বিপ্লব পর্যন্ত সে ওখানেই থাকে। জনগণের বলশেভিক মেজাজের জোরদার প্রভাব পড়েছিল – বাম সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারিদের  [এস.আর-দের = সমাজবাদী বিপ্লবীদের]  উপর। অন্যান্যদের তুলনায় এরা বলশেভিকদের পক্ষে জোরালোভাবে ঝুঁকেছিল। ওরা দেখেছিল যে, বলশেভিকরা সর্বান্তঃকরণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল জমির মালিকদের কাছ থেকে জমি বাজেয়াপ্ত করে কৃষকদের কাছে তা হস্তান্তরিত করতে।  জমির সমান স্বত্বের প্রথা চালু করায় বিশ্বাস ছিল বাম সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারিদের। বলশেভিকরা অনুধাবন করেছিল যে, দরকার হ’ল  সমাজতান্ত্রিক পথে কৃষির সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ। যাই হোক, ইলিচ বিবেচনা করেছিলেন যে, এই মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হ’ল, জমির মালিকদের জমি বাজেয়াপ্ত করা। অভিজ্ঞতাই দেখিয়ে দেবে এরপর পুনর্নির্মান কোন দিকে মোড় নেবে। এবং তিনি তাঁর মস্তিষ্ককে লাগালেন জমি-ডিক্রির খসড়া তৈরিতে।

এম. ভি. ফোফানোভার স্মৃতিচারণে ভারি আকর্ষণকারী একটা ব্যাপার আছে। তিনি লিখছেন,- “আমার মনে আছে, ভ্লাদিমির ইলিচ একবার বললেন , কৃষক ডেপুটিদের সারা-রাশিয়া-সোভিয়েতের মুখপত্র ইজভেস্তিয়ার পুরানো সংখ্যা এনে দিতে; কাজটা আমি অবশ্যই করলাম। ভ্লাদিমির ইলিচ দু’টো দিন ঐ নিয়ে পড়ে থাকলেন। সকালে আমাকে বললেন,- ‘মনে হয়, এই এস.আর.-দের আগাপাস্তালা আমি পড়েছি। পড়ার বাকি রইল, কৃষক ভোটদাতাদের ম্যান্ডেট (আদেশ)’। দু’ ঘন্টা পরেই আমাকে ভিতরে ডেকে, আনন্দের সঙ্গে একটা কাগজের উপর (আমি দেখলাম ওটা ১৯শে আগস্টের ‘পিজান্ট ইজভেস্তিয়া’) চাপড় মেরে বললেন, ‘এই দেখ রেডিমেড, বাম এস.আর.দের সঙ্গে চুক্তি। ইয়ার্কি না, এতে সই আছে ২৪২ জন লোকাল ডেপুটির। আমাদের জমি-সম্পর্কিত আইনের ভিত্তি হিসাবে এটাকেই আমরা ব্যবহার করব আর দেখব, বাম এস.আর.-রা একে খারিজ করার সাহস দেখায় কিনা’। গোটাটাই নীল পেন্সিলে দাগ দেওয়া পেপারটা তিনি আমাকে দেখালেন, আর বললেন - ‘ব্যাপারটা হচ্ছে – একটা উপায় খোঁজা, যা দিয়ে পরবর্তীকালে ওদের সামাজিকীকরনের আইডিয়াটাকে আমাদের ধাঁচে এনে, একটা নতুন চেহারা দিতে পারি’।

মার্গারিতে ছিলেন পেশায় একজন কৃষি-বিজ্ঞানী, এবং তাঁর কাজে তাঁকে এই সব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।  সে জন্যই তাঁর সঙ্গে নিজের থেকেই এ বিষয়ে ইলিচ কথা বলেন।

বাম সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারিরা কি কংগ্রেস ছেড়ে চলে যাবে?

সোভিয়েতগুলির সারা-রুশ কংগ্রেস উদ্বোধন হ’ল ২৫শে অক্টোবর (নতুন রীতিতে, ৭ই নভেম্বর)। ঐ সন্ধ্যায়, কংগ্রেস সংগঠিত করার ব্যাপার ছিল, সভাপতি-মন্ডলী নির্বাচন ও তাঁদের ক্ষমতার সীমা নির্দেশ করা। ৬৭০ জন প্রতিনিধিদের মধ্যে মাত্র ৩০০ জন বলশেভিক। ১৯৩ জন সোস্যাল রেভলিউশনারি এবং ৬৮ জন মেনশেভিক। প্রকাশ্যে প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়ে বলশেভিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছিল দক্ষিণপন্থী সোস্যাল রেভলিউশনারিরা, মেনশেভিকরা আর বুন্দিস্টরা। “সোভিয়েতে প্রতিনিধিত্ব করা অন্য পার্টি ও ফ্যাকশনগুলিকে অন্ধকারে রেখে সামরিক ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতা দখল পরিচালনা করেছে বলশেভিকরা”,- এই মর্মে প্রতিবাদ-ঘোষণা করছিল তারা; পরে তারা ওয়াক-আউট করে। থেকে গেল বাম সোস্যাল রেভলিউশনারিরা, যাঁরা ছিলেন সোস্যাল রেভলিউশনারি প্রতিনিধিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ (১৯৩-এর মধ্যে ১৬৯)। সবশুদ্ধ পঞ্চাশ জন প্রতিনিধি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে যান। সেই উদ্বোধনী রাত্রে উপস্থিত ছিলেন না ভ্লাদিমির ইলিচ। 

সোভিয়েতগুলির ২য় কংগ্রেস যখন উদ্বোধন হ’ল, শীত-প্রাসাদে তখন ঝড় বইছিল। নাবিকের ছদ্মবেশে কেরেনিস্কি পালিয়েছিলেন একদিন আগেই, এবং মোটর গাড়ি নিয়ে দ্রুত চলে গেলেন পেশকভে। পেশকভের বিপ্লবী সামরিক কমিটি ওঁকে গ্রেফতার করেনি, যদিও দাইবেঙ্কো ও ক্রাইলেঙ্কোর সই করা আদেশ ছিল।

পেট্রোগ্রাদের বিরুদ্ধে ‘ধর্মযুদ্ধ’ সংগঠিত করার জন্য কেরেনিস্কি মস্কোর জন্য যাত্রা করল, যেখানে সৈন্য আর শ্রমিকরা ক্ষমতা হস্তগত করে ফেলছিল। কিশকিনের নেতৃত্বে, অন্য মন্ত্রীরা শীত-প্রাসাদের ট্রেঞ্চে লুকালো, মিলিটারি ক্যাডেট ও মহিলা শক ব্রিগেডের সুরক্ষাধীনে; ওই বাহিনী দু’টিকে এই উদ্দেশ্যেই জড়ো করা হয়েছিল। শীত-প্রাসাদ দখল করা নিয়ে, দক্ষিণপন্থী সোস্যাল রেভলিউশনারিরা, মেনশেভিকরা আর বুন্দিস্টরা রাগে পাগল হয়ে, কংগ্রেসে মৃগী রুগীর মত করছিল। এরলিখ ঘোষণা করল যে, কয়েকজন টাউন-কাউন্সিলর, নিরস্ত্র অবস্থায়, গুলিতে নিহত হবার ঝুঁকি নিয়ে প্যালেস স্কোয়ারে যাবে, কেননা শীত প্রাসাদে কামান দাগা হচ্ছে।  কৃষক ডেপুটিদের সোভিয়েত, মেনশেভিকরা আর এস.আর.-গ্রুপ ঠিক করল, ওরাও যোগ দেবে। বিরতি দেওয়া হ’ল  মেনশেভিকরা আর এস.আর.-গ্রুপ ওয়াক আউট করার পর। বেলা ৩-১০এ, অধিবেশন শুরু হ’ল, তখনই কংগ্রেসকে জানান হ’ল যে শীত প্রাসাদ দখলে আছে, মন্ত্রীদের গ্রেফতার করা হয়েছে, অফিসার ও ক্যাডেটদের নিরস্ত্র করা হয়েছে, এবং পেট্রোগ্রাদের বিরুদ্ধে   কেরেনিস্কি যে তৃতীয় বাইসাইকেল ব্যাটেলিয়ন পাঠিয়েছিল – তারা অবস্থান বদল করে যোগ দিয়েছে বিপ্লবী জনতার সঙ্গে। যখন আর কোন সন্দেহই রইল না যে বিজয় অর্জন করা গেছে এবং বাম সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারি দল কংগ্রেস ছাড়ছে না, ভ্লাদিমির ইলিচ তখন স্মোলনি ছাড়লেন; আগের রাতে তিনি ঘুমোননি বললেই চলে সারারাত অভ্যুত্থানের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তিনি ঘুমোতে চলে যান, স্মোলনির অদূরে পেস্কিতে, বঞ্চ-ব্রুয়েভিসেচদের বাড়িতে। সেখানে ওঁর জন্যই একটা কামরা ছেড়ে দেওয়া হ’ল। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তিনি ঘুমোতেই পারলেন না। পরে, এমন নিঃশব্দে তিনি উঠলেন, অন্যরা যাতে জেগে না যায়,আর – যে বিষয়ে খুঁটিনাটি তিনি আগেই ভেবে রেখেছিলেন, লিখতে বসে গেলেন - সেই জমির ডিক্রি ।

২৬শে অক্টোবর (৮ই নভেম্বর) সন্ধ্যায়,  কংগ্রেসের অধিবেশনে জমি-ডিক্রির সমর্থনে  ইলিচ বলেনঃ আওয়াজ উঠেছে যে এই ডিক্রি আর নির্দেশ নাকি সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারিরা রচনা করেছে। হ’ল টা কি তাতে ? এটা কোন বিষয় হোলো যে কারা এটা রচনা করেছে? একটি গণতান্ত্রিক সরকার হিসাবে আমরা ব্যাপক জনসাধারণের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করতে পারিনা। এমনকি আমরা দ্বিমত হ’লেও না। বাস্তবে ডিক্রিটি প্রয়োগ করে, স্থানীয় ক্ষেত্রে এটাকে মেনে নিয়ে, অভিজ্ঞতার আগুনে, কৃষকরা নিজেরাই বুঝবেন যে সত্যিটা কোথায় লুকিয়ে আছে ...... জীবনই হ’ল সবচেয়ে ভাল শিক্ষক এবং জীবনই আমাদের দেখিয়ে দেয় কোনটা সঠিক। এই সমস্যার সমাধান একদিক থেকে করতে দিন কৃষকদের,আমরা করব অন্যদিক থেকে।  বিপ্লবী সৃস্টি-কর্মের সাধারণ স্রোতে, রাষ্ট্রের আকারের বিস্তার ঘটাতে, জীবনই আমাদের বাধ্য করবে এক জায়গায় মিলতে .... বিগত আট মাসে আমাদের বিপ্লবে কৃষকরা কিছুটা শিখেছেন; ওঁরা নিজেরাই চান ভূমি-সমস্যার সব প্রশ্নগুলির সমাধান করতে। সে জন্য আমরা এই খসড়া আইনের সব রকম সংশোধনীর বিরুদ্ধে। এর মধ্যে আমরা বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাই না, কেন না আমরা একটা ডিক্রি লিখছি,- কর্মসূচী রচনা করছি না।  (পৃ. ২২৮-২৯, রচনা সংকলন, ২৬ খন্ড)

ঐ সব কথায় আমরা ইলিচকে খুঁজে পাই গোটাটাই হীন আত্মগর্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একজন ইলিচ (‘কে বলেছে’ - এটা কোন ব্যাপারই না, যতক্ষণ পর্যন্ত কথাটা থাকছে সঠিক), সাধারণ সদস্যদের মতামতকে বিবেচনার মধ্যে আনা, বিপ্লবী সৃস্টি-কর্ম-শক্তির সপ্রসংশ উপলব্ধি করা, এটা পরিষ্কার ভাবে বোঝা যে জনগণের প্রত্যয় উৎপাদন হয় শুধু মাত্র অনুশীলন ও অভিজ্ঞতায়, জীবনের কঠিন সত্যই তাদের দেখিয়ে দেয় যে বলশেভিকদের দৃষ্টিকোণই ঠিক ছিল।

লেনিনের পেশ করা জমি সংক্রান্ত আইনের প্রস্তাবটি গৃহীত হ’ল। ষোলটা বছর কেটে গেল তারপর। জমিদারদের মালিকানা বিলুপ্ত হয়েছে, মালিকানার পুরানো অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, ধাপে ধাপে, চাষ-বাসের নতুন চেহারা তৈরি হয়েছে – যৌথচাষ, যা এখন কৃষি জোতের বেশির ভাগ অংশকেই যুক্ত করেছে। ছোট-খামারের পুরানো রীতি আর ছোট-মালিকানার মনোভাব এখন অতীতের বিষয়। সৃষ্টি হয়েছে সমাজতান্ত্রিক কৃষি-কর্মের এক শক্তিশালী ভিত্তি। 

২৬শে অক্টোবর (৮ই নভেম্বর) সান্ধ্য অধিবেশনে গৃহীত হ’ল – শান্তি আর জমির ডিক্রি। এস.আর.-দের সঙ্গে এই প্রশ্নে সহমতে পৌঁছানো গেল। সরকার গঠনের প্রশ্নে অবস্থাটা পৌঁছালো চরমে। বাম এস.আর.-রা কংগ্রেস ছাড়ল না, কেননা, ওরা বুঝতে পেরেছিল যে ওদের এই কাজ ক্ষতিগ্রস্ত করবে – কৃষকদের উপর ওদের প্রভাবকে; কিন্তু, বলশেভিকদের দুঃসাহসী অভিযান, ক্ষমতা দখল, ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নে - দক্ষিণপন্থী এস.আর. এবং মেনশভিকদের চিৎকার ও কংগ্রেস থেকে ওয়াক-আউট ওদের খুবই প্রভাবিত করেছিল।  দক্ষিণপন্থী এস.আর. ও অন্যদের বেরিয়ে যাবার পরে, বাম এস.আর.দের নেতা কামকভ ঘোষণা করল যে তাঁদের রায় সংযুক্ত গণতান্ত্রিক সরকারের পক্ষে, এবং এই ধরনের সরকার গঠনের জন্য তাঁরা সাধ্যমত সব কিছু করবেন। যারা কংগ্রেস ছেড়ে গেছে, তাদের এবং বলশেভিকদের মধ্যে, বাম এস.আর.-রা মধ্যস্থতা করতে চাইল। বলশেভিকরা এই আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি, কিন্তু ইলিচ সঠিকভাবেই বুঝেছিলেন যে এই ধরনের আলোচনা থেকে কিছুই বেরোবে না। বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করেছে এজন্য নয় যে ফাঁদে রাজহাঁস-বানমাছ-কাঁকড়া ধরে সোভিয়েতের ঠেলাগাড়িতে তুলবে, বা এমন সরকার গড়বে যে সবটা গুটিয়ে এনে কাজটা করতেই পারবে না। ইলিচের মতে, বাম সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারিদের সঙ্গে সহযোগিতা সম্ভব।

২৬শে অক্টোবর কংগ্রেস শুরু হবার কয়েক ঘন্টা আগেই এই প্রশ্নে বাম এস.আর.-দের সঙ্গে আলোচনা হয়ে গিয়েছিল। যে পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে সম্মেলনটা হয়েছিল, তা আমার মনে আছে। একটা ছোট্ট ঘর, ঘন লাল কাপড়ে মোড়া একটা লম্বা বেঞ্চ মতন, যাতে হেলান দেয়া যেতে পারত। একটা ওরকম বেঞ্চে বসেছিল স্পিরিদোনোভা। পাশেই ইলিচ দাঁড়িয়ে আন্তরিক ও ভদ্রভাবে যুক্তি-তর্ক করছিলেন। বাম সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারিদের সঙ্গে কোন ঐক্যমতে পৌঁছানো গেল না। ওরা সরকারে যোগ দিতে চাইল না। ইলিচ প্রস্তাব করলেন, সমাজতন্ত্রী মন্ত্রী হিসাবে, শুধু বলশেভিকদেরই নিয়োগ করা হোক ।

২৬শে অক্টোবরের কংগ্রেস অধিবেশন রাত ৯টায় শুরু হয়। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। জমি-ডিক্রি পেশ করার সময়কার ইলিচের বক্তৃতা আমার মনে আছে। তিনি বলছিলেন শান্তভাবে। শ্রোতারা শুনছিলেন আবিষ্ট মনোযোগ নিয়ে। ডিক্রিটি পড়ার সময়, কিছু দূরে বসা এক প্রতিনিধির মুখের ভাব দেখে আমি অবাক হলাম। তিনি ছিলেন বয়স্ক মতন দেখতে একজন কৃষক। জোরালো আবেগে তাঁর মুখটা হয়ে উঠে ছিল মোমের মতন। এক অদ্ভুত আলোয় তাঁর মুখটা জ্বলজ্বল করছিল।  

সীমান্তে যে মৃত্যুদন্ড চালু করেছিলেন কেরেনিস্কি, তা বাতিল করা হ’ল। শান্তি, জমি ও শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ডিক্রি গৃহীত হ’ল। এবং, জন-কমিসারদের বলশেভিক কাউন্সিল গঠন করা হলঃ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান - ভ্লাদিমির উলিয়ানভ (লেনিন); আভ্যন্তরীণ ব্যাপার সংক্রান্ত কমিসার – এ.আই.রাইকভ; কৃষি – ভি.পি.মিলিউতিন; শ্রম – এ.জি. শ্যাপনিকভ; সামরিক ও নৌ-বাহিনী  সংক্রান্ত ব্যাপারের কমিটিতে – ভি.এ. ওভশেয়েঙ্কো(আন্তোনভ), এন.ভি. ক্রাইলেঙ্কো এবং পি. ওয়াই. দাইবেঙ্কো; শিল্প ও বাণিজ্য – ভি. পি. নোগিন; শিক্ষা – এ. ভি. লুনাচারস্কি; অর্থ – আই.আই. স্কোরতশভ (স্তেপানভ); বৈদেশিক বিষয় – এল. ডি. ব্রন্সটাইন (ট্রটস্কি);  বিচার – জি. আই. অপোকভ; খাদ্য সরবরাহ – আই. এ. তিয়োডরোভিচ; ডাক ও তার – এন. পি. আভিলভ (গ্লেবভ); জাতীয়তা বিষয়ক কমিসারিয়েটের চেয়ারম্যান - জে. ভি. জুগাশভিলি (স্তালিন) । যোগাযোগ বিষয়ক পথ-পদ্ধতি সংক্রান্ত কমিসারের পোস্টটি খালি রাখা হয়েছে। এইনো রাহজা বর্ণনা করেন যে, জন-কমিসারদের তালিকা নিয়ে যখন বলশেভিকদের গ্রুপে আলোচনা হচ্ছিল, তিনি তখন এক কোণে বসেছিলেন। একজন মনোনীত প্রতিনিধি প্রতিবাদ করলেন এই বলে যে, ঐ ধরনের কাজের ব্যাপারে ওঁর কোন অভিজ্ঞতা নেই।  ভ্লাদিমির ইলিচ হাসিতে ফেটে পড়ে বললেন,- “আপনার কি মনে হয়, আমাদের কারও এই ব্যাপারে অভিজ্ঞতা আছে?” কারোর কোন অভিজ্ঞতা অবশ্যই ছিল না। কিন্তু, ভ্লাদিমির দেখালেন, জন-কমিসার হ’ল এক নতুন ধরনের মন্ত্রী, রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপের এটা বা অন্য কোন শাখার সংগঠক ও ম্যানেজার, যে জনগণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।

নতুন ধরনের প্রশাসনের সমস্যা নিয়ে ভ্লাদিমির ইলিচের মন কর্মস্থলে সর্বদাই নিমগ্ন ছিলো । তিনি ভাবতেন, কি ভাবে সরকারের কলকব্জা, আমলাতান্ত্রিকতার কলঙ্কমুক্ত করে সংগঠিত করবেন, যা ঝুঁকে থাকবে জনগণের দিকে, তাঁদের সাহায্য সহযোগিতা সংগঠিত করবে, এবং নিজেরাই নিজেদের কাছে দেখাবে যে তারা, এই কাজে প্রশাসনিক কর্মীদের নতুন ধরনের কাজের ট্রেনিং দিতে সমর্থ। সোভিয়েতগুলির দ্বিতীয় কংগ্রেসে,  শ্রমিক-কৃষকদের সরকার গঠন সম্পর্কিত প্রস্তাবে এইভাবে প্রকাশিত হয়েছে :

“রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের ভার ন্যস্ত করা হয়েছে কমিশনগুলির উপর, যাদের বিন্যাস, - শ্রমিক, নাবিক, সৈন্য, কৃষক এবং কর্মচারীদের গণসংগঠন গুলির সঙ্গে নিবিড় ঐক্যের মাধ্যমে, কংগ্রেসে ঘোষিত কর্মসূচীর বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করবে। সরকারী ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে উক্ত কমিশনগুলির চেয়ারম্যানদের কলেজিয়ামের উপর, অর্থাৎ , জন-কমিসারদের কাউন্সিল।” (পৃ. ২৩০,  রচনা সংকলন, ২৬ খন্ড)

আমার মনে আছে, ফোফানোভার ওখানে যখন কয়েক সপ্তাহ ছিলেন, তখন ইলিচের সঙ্গে  আমার এই বিষয়ে কিছু কথা হয়েছিল। আমি তখন প্রবল উৎসাহে কাজ করছিলাম ওয়াইবর্গ জেলায়। নিবিড় নিরীক্ষণ করছিলাম জনগণের বিপ্লবী কার্যকলাপ আর, জীবনরীতিতে যে বৈপ্লবিক বদল আসছিল। ভ্লাদিমির ইলিচের সঙ্গে দেখা করে আমি বলতাম জেলার জীবনের কথা। আমার মনে আছে জন-আদালতের একটা চিত্তকর্ষক বৈঠক, যেখানে আমি হাজির ছিলাম। ১৯০৫-এর বিপ্লবের সময়ে কোন কোন জায়গায় এরকম আদালত বসেছিল; একটা বিষয়ে সোর্মোভোতে একটা হয়েছিল। সুগুরিন, একজন শ্রমিক, ছিল সোর্মোভোর স্থানীয় লোক; প্যারিসের কাছে লঁজুম্যু পার্টি স্কুলে ছাত্র হিসাবে আলাপ হয়েছিলো; ওঁর সঙ্গেই আমি ওয়াইবর্গ জেলায় কাজ করছিলাম। ওয়াইবর্গ জেলায় এরকম আদালত সংগঠিত করার পরামর্শ সুগুরিনই দেয়। প্রথম আদালত বসল গণভবনে। জায়গাটা ছিল ঠাসা, - মেঝের উপর কাঁধে কাঁধ দিয়ে দাঁড়িয়ে, বেঞ্চ আর জানালায় বসে। এখন আমার ঠিক মনে নেই আদালতের সামনে ঠিক কি ‘কেস’ এসেছিল। শব্দের ঠিকঠাক মানে ধরলে, ওগুলো কোন অপরাধই ছিল না। সুগুরিনকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করছিল এমন দু’টি সন্দেহজনক চরিত্র।  কালো মতন এক পাহারাদারের “বিচার” হচ্ছিল,- তার বাচ্চা ছেলেকে স্কুলে যেতে না দিয়ে, মেরে-ধরে কাজ আদায় করার জন্য। জনতার মধ্য থেকে শ্রমজীবী নারী-পুরুষ কয়েকজন গরম গরম বক্তৃতা দিল। “আত্মরক্ষাকারী” তার ভুরু থেকে ঘাম মুছছিল; তারপর, গাল বেয়ে চোখের জল নেমে আসা অবস্থায় সে প্রতিজ্ঞা করল যে, আর কখনও সে তার ছেলের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না। ঠিক-ঠিক বলতে গেলে ওটা কোন আদালতই নয়, নাগরিকদের আচরণের উপর জননিয়ন্ত্রণ মাত্র; আমরা দেখছিলাম সর্বহারাদের নৈতিকতা গড়ে ওঠার চিত্র। এই “আদালত” সম্পর্কে ভ্লাদিমির ইলিচ খুবই আগ্রহী ছিলেন, বিস্তারিত জানবার জন্য আমাকে প্রশ্ন করতেন।

বেশির ভাগ সময়ে আমি বলতাম শিক্ষা সংক্রান্ত কাজ-কর্মের ধরন সম্পর্কে। আমি ছিলাম জেলা পরিষদের শিক্ষা-বিভাগের দায়িত্বে। বাচ্চাদের স্কুলগুলি গ্রীষ্মে বন্ধ থাকত, আর আমি বেশির ভাগ সময়ে ব্যস্ত থাকতাম রাষ্ট্রনৈতিক(রাজনৈতিক) শিক্ষা নিয়ে। এ ব্যাপারে, নেভস্কায়া জাস্তাভা জেলায় রবিবারের সান্ধ্য স্কুলের পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা আমার খুবই কাজে লেগেছিল। অবশ্য, সেটা ছিল এক অন্য সময়, যখন বিনা বাধায় আমরা কাজে যেতে পারতাম।  

গোটা চল্লিশ কারখানা থেকে প্রতিনিধিরা আসতেন প্রতি সপ্তাহে; এটা সেটা ব্যবস্থা নেবার উপায় পদ্ধতি নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম। সিদ্ধান্ত যাই-ই আমরা নিতাম, লেগে পড়তাম সঙ্গে সঙ্গেই। যেমন আমরা ঠিক রলাম, নিরক্ষরতা দূর করব। কারখানার প্রতিনিধিরা, প্রত্যেকে তাঁর নিজের নিজের কাজের জায়গায় নিরক্ষরদের নাম লেখানোটা সংগঠিত করলেন, স্কুলের জায়গা জোগাড় করলেন এবং ফ্যাক্টরি ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে আদায় করে প্রয়োজনীয় তহবিলও গড়ে তুললেন। এই ধরনের প্রত্যেকটা স্কুলের সঙ্গে একজন করে শ্রমিক প্রতিনিধিকে জুড়ে দেওয়া হত, যিনি দেখতেন – ব্ল্যাকবোর্ড, চক, এবিসিডির বই, ইত্যাদি,- স্কুলের জরুরী জিনিসগুলি আসছে কি না। সঠিক শিক্ষা-পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, শ্রমিকদের এ ব্যাপারে বক্তব্য কি, এসব দেখার জন্য একজন বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করা হত। এইসব প্রতিনিধিদের আমরা বুঝিয়ে দিতাম এবং ফিরতি-রিপোর্ট দিতে বলতাম। সৈন্যদের স্ত্রী-দের জড়ো করে শিশুভবনগুলির অবস্থা আলোচনা করতাম, শিশুভবন নিয়মিত পরিদর্শনের জন্য  ওঁদের সংগঠিত করতাম, ওঁদের শেখাতাম এবং ওঁদের মধ্যে নানা দৃষ্টান্তমূলক কাজ করতাম। জেলার গ্রন্থাগারিকদের জড়ো করতাম, আর শ্রমিকদের সঙ্গে তাঁদের নিয়ে আলোচনা করতাম - জনসাধারণের জন্য গ্রন্থাগারগুলির কাজের ধরণ। শ্রমিকদের উদ্যোগে আমরা জোরালো আবেগ এনে দিতাম। শিক্ষা-বিভাগের চারপাশে গুরুত্বপুর্ণ শক্তি সমাবেশ ঘটাতাম। ইলিচ সে সময়ে বলতেন, এই হ’ল কাজের ঠিক সেই রীতি যা আমাদের সরকারি অফিস ও ভবিষ্যৎ মন্ত্রীদের অবলম্বন করতে হবে, কাজের এই রীতি  শ্রমজীবী নারী-পুরুষদের কমিটিগুলির ছাঁচে তৈরি, যাঁরা ছিলেন ব্যাপারগুলির গহীনে এবং জনগণের জীবনের অবস্থা ও তাঁদের কাজ এবং যা কিছু যা তাঁদের মনকে আন্দোলিত করছে – এমন সব কিছুর সঙ্গে পরিচিত। ভ্লাদিমির ইলিচ ব্যগ্র ছিলেন এই সমস্ত ব্যাপারে আমাকে টেনে বের করতে, তাতে তাঁর বিশ্বাস ছিল যে সরকার পরিচালনার কাজে আমি সঠিক মানুষজনকে নিয়োগ করতে পারব।  পরে তাঁর কিছু জোরালো বক্তব্য ছিল, “পচা” আমলাতন্ত্র কীটের মত নিঃশব্দে ধীরে ধীরে খেয়ে সবদিকে রাস্তা বের করেছে। ফলে, জন-কমিসারগণ এবং কমিশারিয়েটের বিভাগীয় ম্যানেজারগণ,- যাঁদের প্রায়ই বোর্ড আর কমিশনের মধ্যে অদল-বদল হোতো,- তাঁদের দায়িত্ব বাড়ানোর প্রশ্ন এল, প্রশ্ন এল তখন একক পরিচালনার। আশাতীতভাবে ইলিচ, জন-কমিশারদের কাউন্সিলের অধীনে এক কমিশনের মেম্বার হিসাবে নিয়োগ করলেন আমাকে, এই প্রশ্ন সযত্ন পরীক্ষার জন্য যে কমিশন গঠিত হয়েছিল। তিনি বললেন, আমাদের অবশ্যই সাবধান হতে হবে যাতে, কোনভাবেই একক পরিচালনা, কমিশনগুলির উদ্যোগ ও স্বাধীন কার্যকলাপকে অগ্রাহ্য করে না বসে অথবা জনগণের সঙ্গে বন্ধনকে দুর্বল না করে; একক পরিচালনাকে সংযুক্ত করতে হবে জনগণের সঙ্গে কাজ করার সামর্থ্যর সঙ্গে। এক নতুন ধরনের রাষ্ট্র গড়ে তুলতে ইলিচ চেষ্টা করতেন সকলের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে।

সোভিয়েত গভর্ণমেন্ট, যার শীর্ষে এখন ইলিচ, মুখোমুখি হলেন এক  নতুন ধরনের রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিষ্ঠার কাজে, যা পৃথিবী এর আগে কখনও দেখেনি, যার ব্যাপক জনগণের সমর্থনের উপর আস্থা সহকারে নির্ভর করবে; কাজটা হ’ল – সমাজতন্ত্রের পথে - সমগ্র সমাজ কাঠামো এবং সমস্ত মানবিক সম্বন্ধগুলিকে এক নতুন ধাঁচে গড়া।  কিন্তু, সবার আগে সোভিয়েত-শক্তিকে রক্ষা করতে হবে, বলপ্রয়োগে উৎখাতের আর, ভিতর থেকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার জন্য শত্রুদের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে। শক্তিশালী করতে হবে আমাদের সৈনিকদের।

৯ থেকে ১৫ই নভেম্বরের দিনগুলি ছিল সোভিয়েতের সর্ব-অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। সর্বহারাদের প্রথম রাষ্ট্র – প্যারি-কমিউনের অভিজ্ঞতার কথা নিবিড় অধ্যয়নের ফলে, ইলিচ মনে গেঁথে নিলেন যে, স্বীকৃত শত্রুদের প্রতি শ্রমিক জনগণের এবং শ্রমিকদের সরকারের সদয় মনোভাব দেখানোর কি ধ্বংসাত্মক পরিণাম হয়েছিল প্যারি কমিউনের ভবিষ্যতের উপর। জনগণ বা নিজের বেশি সদয় মনোভাব দেখানোর ভয়ে, ইলিচের সব সময়েই ব্যাপারগুলোতে কড়া হবার ঝোঁক ছিল।

অক্টোবর বিপ্লবের শুরুতে এই ধরনের ক্ষমার একটু বাড়াবাড়ি ছিল। কেরেনিস্কি এবং বেশ কিছু মন্ত্রীকে পালাতে দেওয়া হয়েছিল, যে ক্যাডেটরা শীত-প্রাসাদ রক্ষা করছিল - তাদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়, কেরেনিস্কির আগুয়ান সৈন্যদের যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন – সেই জেনারেল ক্রাসনভকে গৃহবন্দী করে ছেড়ে দেওয়া হয়।

একদিন আমি যখন স্মোলনির একটা ওয়েটিং-রুমে সেনাদের কোটের একটা স্তূপের উপর বসেছিলাম, তখন ক্রাইলেঙ্কো আর জেনারেল ক্রাসনভের বাক্যালাপ শুনতে পেলাম; গ্রেপ্তার করে ওদের পেট্রোগ্রাদে ধরে আনা হয়েছিল। ওরা দু’জনে একসঙ্গে এল, বিশাল একটা ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছোট টেবিলের উপর বসল এবং শান্ত সহজভাবে বাক্যালাপ চালাতে থাকল। আমার মনে আছে, ওদের কথাবার্তার শান্ত ধরন দেখে আমি অবাক হয়ে গেছিলাম। ১৭ই নভেম্বর সেন্ট্রাল এক্সিকিউটিভ মিটিং-এ বলার সময়, ইলিচ বললেন, “ক্রাসনভের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করা হয়েছে। তাকে শুধুমাত্র গৃহবন্দী করা হয়েছে। আমরা  গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে। কিন্তু এটা যদি চলতেই থাকে, তা হ’লে আমাদের কী করতে হবে?” (পৃঃ ২৫২,  রচনা সংকলন, ২৬ খন্ড)

পেস্কভের কমরেডদের দ্বারা ছাড়া পেয়ে, কেরেনিস্কি পরিচালনা করল পেট্রোগ্রাদের উপর এক আক্রমণ; ক্যাডেটরা ছাড়া পেয়ে, বিদ্রোহ করল ১১ই নভেম্বর, আর ক্রাসনভ, গৃহবন্দিত্ব থেকে পালিয়ে, জার্মান সরকারের সাহায্যে, লক্ষ লোকের শ্বেত-সেনা (‘হোয়াইট-আর্মি’) সংগঠিত করল। 

সাম্রাজ্যবাদের ব্যাপক হত্যালীলায় ক্লান্ত মানুষেরা চাইছিল রক্তপাতহীন বিপ্লব, কিন্তু শত্রুরা তাদের বাধ্য করল যুদ্ধ করতে। সমগ্র সমাজব্যবস্থার সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠনে সম্পূর্ণ মগ্ন থাকায়, বিপ্লবের স্বার্থের দিকে তাঁর মনোযোগ ঘোরাতে বাধ্য হলেন ইলিচ।

৯ই নভেম্বর কেরেনিস্কি সফল হল গ্যাটচিনা দখল করতে। পেট্রোগ্রাদ প্রতিরক্ষার কাজে কি অসাধারণ ব্যস্ত তিনি  [লেনিন] ছিলেন, তার প্রাণবন্ত বর্ণনা পোডোভস্কি দিয়েছেন এক প্রবন্ধে - “অভ্যুথানের দিনগুলিতে লেনিন” (ক্রাসনায়া গাজেটা, নভেম্বর ৬, ১৯২৭)। তিনি বিবরণ দিয়েছেন যে, কেমন করে লেনিন এরিয়া স্টাফ হেডকোয়ার্টারসে এলেন এবং পরিস্থিতির উপর এক রিপোর্ট দাবি করলেন। ম্যাপে আমাদের সেনাদের বিন্যাসের অবস্থান ও শত্রুসেনাদের বিন্যাসের সম্ভাব্য অবস্থান দেখিয়ে দেখিয়ে, আন্তোনভ ওভসেয়েঙ্কো ব্যাখ্যা করা শুরু করলেন অপারেশনের সাধারণ পরিকল্পনা। কাছ থেকে লেনিন ম্যাপটা দেখলেন। একজন রণনীতিবিদ ও সেনাপতির তীক্ষ্ণতা ও মনোযোগ নিয়ে, তিনি ব্যাখ্যা চাইলেন, কেন এই পয়েন্টে গার্ড দেওয়া হয়নি, ওখানটা কেন অরক্ষিত, অন্যটার বদলে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হ’ল কেন, সাহায্যের জন্য কেন ডাকা হ’ল না – ক্রনস্তাদ, ওয়াইবর্গ, হেলসিংফরসকে, এই রকম আরো কিছু প্রশ্ন। বিভিন্ন নোটগুলির তুলনা করতেই এটা পরিস্কার হ’ল যে,- আমরা কতকগুলি মারাত্মক ভুল করেছিলাম; পেট্রোগ্রাদের বীভৎস পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী, জরুরী ভিত্তিতে আমরা সাড়া দিতে পারিনি, না পেরেছি ওর প্রতিরক্ষার জন্য উপায় ও শক্তিগুলিকে সংহত করতে”।

৯ তারিখের সন্ধ্যায় প্রাইভেট লাইনে হেলসিংফরসের সঙ্গে ইলিচ কথা বললেন এবং ব্যবস্থা করলেন যাতে পেট্রোগ্রাদের মুখে দু’টি ডেস্ট্রয়ার আর যুদ্ধ-জাহাজ – ‘রেসপাব্লিকা ‘পাঠান যায়।

আন্তোনভ ওভসেয়েঙ্কোর সঙ্গে ভ্লাদিমির ইলিচ গেলেন পুটিলভ কারখানায় দেখতে যে, অস্ত্র-সজ্জিত ট্রেন,- যা দরকার ছিল বিশ্রীভাবে, সেটা যথেস্ট দ্রুততার সঙ্গে তৈরি হচ্ছে কিনা। তিনি কথা বললেন সেখানকার শ্রমিকদের সঙ্গে। স্টাফ-হেডকোয়ার্টার্স স্থানান্তরিত হ’ল স্মোলনিতে; আর, এর প্রত্যেকটি কাজে লেনিন গভীর আগ্রহে লক্ষ্য রাখলেন, সাহায্য করলেন – জনগণের ক্রিয়া-কান্ডকে সংগঠিত করতে। মজুরদের সংগঠনগুলির, জেলা-সোভিয়েতগুলির, ফ্যাক্টরি কমিটিগুলির ট্রেড-ইউনিয়নগুলির এবং সামরিক ইউনিটগুলির প্রতিনিধিদের এক সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন লেনিন; আর তারপরেই, পোডোভস্কি লেনিনের কাজের গুণাবলী উপলব্ধি করতে শুরু করেন।  “এখানেই আমি দেখলাম লেনিনের শক্তি কোথায় নিহিত আছে”,- তিনি লিখলেন। “এক জরুরি সময়কালে, শক্তি ও উপায়গুলির কেন্দ্রীভবনকে রাখলেন তীব্রতার তুঙ্গে। আমরা আমাদের শক্তির বাজে খরচ করছিলাম, পরিকল্পনা ছাড়াই আমাদের সেনা জোগাড় করে কাজে লাগিয়ে দিচ্ছিলাম, যার ফলে আমাদের প্রচেষ্টার প্রভাব অনেকটাই নষ্ট হয়ে যেত, আর জনগণের ক্রিয়া-কান্ড, উদ্যোগ আর দৃঢ়-প্রতিজ্ঞার ধার অনেকটাই ভোঁতা করে ফেলত। জনগণ অনুভব করেনি যে সুন্দরভাবে বিন্যস্ত একটা মেশিনের সমস্ত অংশগুলিকে এক সঙ্গে রাখতে পারে, সুদৃঢ় ইচ্ছা আর সুসম্বদ্ধ পরিকল্পনা। প্রতিরক্ষার জন্য অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত প্রচেষ্টা চালানোর ধারণাটা লেনিন ভালোভাবেই উপলব্ধির মধ্যে রেখেছিলেন। সম্মেলনে এই ধারণার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় লেনিন তুলে ধরলেন এক বোধগম্য পরিকল্পনা,- অংশগুলি থাকে একটা অখন্ড মেশিনে, তেমনি, প্রত্যেকে তার কারখানা বা ইউনিটে একটা নিজস্ব জায়গা পাবে।  ঠিক ঐ সম্মেলনেই, প্রত্যেকেই মনশ্চক্ষে দেখতে পেলেন তাঁর পরবর্তী কাজের বাস্তব পরিকল্পনা, এবং অনুভব করলেন যে তাঁর কাজকে সূত্রবদ্ধ করতে হবে প্রজাতন্ত্রের সমগ্র যৌথ-সত্তার সঙ্গে। যার ফলে, সে দায়িত্ব অনুভব করল যা, সে মুহূর্ত থেকে সর্বহারার একনায়কত্ব তার উপর আরোপ করল। জনগণকে আকর্ষণ করার জন্য, এ কথা তাদের ভালভাবে উপলব্ধি করানোর জন্য যে,- কোন নেতা তাদের জন্য কোন কাজ করে দেবে না, নতুন পথে যদি তারা নিজেদের জীবন গড়তে চায়, যদি নিজেদের রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে চায়, তবে নিজেদের দু’টো হাত নিয়ে তাদেরই কাজের জায়গায় নেমে আসতে হবে। নিরন্তর লেনিন এটা অর্জন করার জন্য চেষ্টা করেছেন, এবং এটাই হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে নিজেকে দেখিয়েছেন জনগণের সত্যিকারের নেতা হিসাবে, একজন নেতা যিনি সমর্থ হয়েছিলেন       জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী বিষয়গুলির মোকাবিলা করা ও তাদের সমস্যার সমাধানের দিকে তাদের নিজেদেরই পা বাড়াতে, অসচেতনভাবে নেতার অনুসরণ করা নয়, বরং নিজেরাই সচেতন থাকবে যে কী তারা করছে”। এ ব্যাপারে পোডোভস্কি একদম ঠিক। তিনি পারতেন জনণকে ঠিক সময়ে হুঁশিয়ার করে দিতে, তাদের সামনে বাস্তব লক্ষ্য তুলে ধরতে। পেট্রোগ্রাদের শ্রমিকরা শহর রক্ষার জন্য উৎসাহিত হলেন। কেরেনিস্কির সেনাদের মোকাবিলা করার জন্য , জোয়ান আর বুড়ো সকলেই সীমান্তে পাড়ি দিলেন। কসাকরা, আর যাদের ডেকে আনা হয়েছিল প্রদেশ থেকে – তাদের কেউই লড়াইয়ের ব্যাপারে আন্তরিক ছিল না। পেট্রোগ্রাদের শ্রমিকরা তাদের মধ্যে বিক্ষোভ জাগালেন, তাদের যুক্তি-তর্ক দিয়ে বোঝালেন। কেরেনিস্কি যে কসাক ও সেনাদের জড়ো করেছিল, সহজেই  তারা তাদের বন্দুক, রাইফেল সঙ্গে নিয়েই, সীমান্ত ছেড়ে চলে গেল। কেরেনিস্কির সীমান্ত-বাহিনী ভেঙ্গে পড়ছিল। তা সত্বেও, শহর রক্ষা করতে গিয়ে,  পেট্রোগ্রাদের শ্রমিকদের অনেকেই প্রাণ হারালেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ভেরা স্লুতস্কায়া, যিনি ছিলেন ভাসিলিওস্ত্রোভস্কি জেলার সক্রিয় পার্টি-কর্মী।  তিনি সীমান্তে গিয়েছিলেন একটা লরিতে চেপে, আর, তাঁর মাথাটাই উড়ে গিয়েছিল কামানের গোলায়। সারা জেলা হাজির হয়েছিল তাঁর শবযাত্রায় । ১১ই নভেম্বর, কেরেনিস্কি সর্বশক্তি নিয়ে পেট্রোগ্রাদের রাস্তায় মার্চ করছিলেন; যে ক্যাডেটদের প্যারোলে শীতপ্রাসাদ থেকে  মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তারা তখন ঠিক করল যে কেরেনিস্কিকে সাহায্য করবে; তারা একটা বিদ্রোহ সংগঠিত করল। স্মোলনিতে চলে যাবার আগে, আমি তখনও ইলিচের পরিবারের সঙ্গে পেট্রোগ্রাদ জেলায়। আমরা যেখানে থাকতাম সেখান থেকে দূরে নয়, পাভলভস্কোয়ে মিলিটারি স্কুলের কাছে লড়াই শুরু হ’ল খুব সকালেই। ক্যাডেটদের বিদ্রোহের খবর শুনে, রেড-গার্ড আর ওয়াইবর্গ জেলার কারখানা থেকে শ্রমিকরা বেরিয়ে এল তাদের দমাতে। লড়াইয়ে বন্দুক ব্যবহৃত হয়েছিল আর, কেঁপে উঠেছিল আমাদের বাড়িটা। আমাদের চারপাশের লোকেরা ছিল মৃত্যু ভয়ে ভীত। খুব সকালে আমি যখন জেলা পরিষদে যাবার জন্য বাড়ি ছাড়ছিলাম, ভয়ে চিৎকার করতে করতে পাশের বাড়ির গৃহস্থালি-সহায়িকা দৌড়ে এল আমার কাছে,- “তোমার দেখা উচিত ওরা কি করছে। আমি এইমাত্র দেখলাম, আলপিনের ডগায় মাছির মতন একজন ক্যাডেটকে বেয়নেট-বিদ্ধ হতে!” রাস্তায় আমার সঙ্গে দেখা হ’ল ওয়াইবর্গ জেলার নতুন একদল রেড-গার্ডের সঙ্গে, তারা আরও একটা কামান নিয়ে আসছে। দ্রুত দমন করা হ’ল ক্যাডেটদের বিদ্রোহ।

একই দিনে, পেট্রোগ্রাদ গ্যারিসনের রেজিমেন্টাল প্রতিনিধিদের সম্মেলনে লেনিন ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন,-  “কেরেনিস্কির চেষ্টাটা, কর্নিলভের অভিযানের মতই জঘন্য। এটা একটা দুঃসময় যাচ্ছে। খাদ্য সরবরাহের উন্নতি ও যুদ্ধের কষ্ট দূর করার জন্য, বেশ জোরদার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আমরা বসে থাকতে পারি না, একদিনের জন্যও  কেরেনিস্কির বিদ্রোহ আমরা সহ্য করতে পারি না। যদি কর্নিলভওয়ালারা আবার নতুন করে আক্রমণ সংগঠিত করে, তবে জবাব পাবে ঐ ক্যাডেটদের বিদ্রোহের মতই। ত্রুটির দায়িত্ব ক্যাডেটদের নিজেদেরই। আমরা ক্ষমতা হাতে নিয়েছি প্রায় বিনা রক্তপাতে। হতাহত কিছু হয়ে থাকলে তা শুধু আমাদের দিকেই হয়েছে ....... শ্রমিক-সৈন্য-কৃষকদের আকাঙ্ক্ষায় এই সরকার সৃষ্টি হয়েছে, কর্নিলভওয়ালাদের কোন অপমান সে সহ্য করবেনা। (পৃ. ২৩৬, ঐ)

৮ই নভেম্বর যারা দ্বিতীয় কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, সেই দক্ষিণপন্থী সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারিরা [স.বি.], মেনশেভিকরা আর অন্যান্য উপদলগুলি মিলে,- মাতৃভূমি উদ্ধার ও বিপ্লবের জন্য একটা কমিটিই সংগঠিত করল; ওরা ভেবেছিল – সোভিয়েত-শক্তির বিরোধী সবাইকেই এর চারপাশে জড়ো করবে। এই কমিটিতে ছিল,- সেন্ট্রাল টাউন কাউন্সিলের ন’জন, প্রাক-সংসদের পুরো সভাপতিমন্ডলী, শ্রমিক ও সেনাদের সারা-রাশিয়া সোভিয়েতে আর  কৃষক ডেপুটিদের তিনজন করে প্রতিনিধি, স.বি. ও মেনশেভিকদের উপদলগুলি, সেন্ট্রোফ্লোট এবং প্লেখানভের ইউনিটি গ্রুপের দু’জন। ওদের অন্ধকারে রেখে যে বলশেভিকরা “দুঃসাহসিক অভিযান” চালিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের হাত থেকে দেশ ও বিপ্লবকে ওরা রক্ষা করবার আশা করছিল। কিন্তু ওরা বেশি কিছু করতে পারেনি। “শান্তির জন্য”, “জমির জন্য” স্লোগান দু’টি এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে জনগণ প্রবল উৎসাহে  বলশেভিকদের পাশে দ্বিধাহীনভাবে জড়ো হ’ল। মস্কোতে যে জননিরাপত্তা কমিটি গড়া হয়েছিল, তারা যোগ দিল ঐ মাতৃভূমি ও বিপ্লব রক্ষা কমিটির পেট্রোগ্রাদ কমিটিতে। মস্কো টাউন-কাউন্সিলের উদ্যোগে ওটা গড়ে উঠেছিল,- যার শীর্ষে ছিল দক্ষিণপন্থী সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারি রুদনেভ। মস্কোর জন-নিরাপত্তা কমিটি খোলাখুলি দাঁড়ালো প্রতি-বিপ্লবের পাশে।

সাহায্যের জন্য দরকার ছিল মস্কোতে সেনাদল পাঠানোর কিন্তু, এটা করা গেলনা,- রেল-কর্মচারীদের সারা-রাশিয়া কার্যকরী সমিতির অবস্থানের জন্য। কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল যারা, সেই বিক্ষুব্ধ উপদলের সমর্থনে দাঁড়াল রেলওয়েমেন্স এক্সিকিউটিভ কমিটি, আর ওখানে শ্রমিকদের কোন প্রভাব ছিল না। রেলওয়েমেন্স এক্সিকিউটিভ কমিটি ঘোষণা করল যে, গৃহযুদ্ধ যেটা শুরু হয়েছে, তা’তে তারা “নিরপেক্ষ অবস্থান” নেবে এবং কোন পক্ষের সেনাদলকেই যেতে দেবে না। এই  “নিরপেক্ষতা” আদতে আঘাত করল বলশেভিকদের এবং মস্কোর সাহায্যে সেনাদল পাঠাতে বাধা দিল। রেলওয়েমেন্স এক্সিকিউটিভদের অন্তর্ঘাত ভেঙে দিল রেল-শ্রমিকগণ, যাঁরা নিজেরাই মস্কোর সাহায্যে সেনাদল পরিবহণের দায়িত্ব নিলেন। ১৬ই নভেম্বর, পেট্রোগ্রাদের বিপ্লবী সামরিক কমিটি, মস্কোতে এক সেনাদল পাঠাল। অবশ্য, ওই সেনাদল মস্কোতে পৌঁছবার আগেই, শ্বেত-সেনাদের প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়া গিয়েছিল। 

সবচেয়ে কঠিন সময়ে, পেট্রোগ্রাদে যখন সবে ক্যাডেটদের বিদ্রোহ দমিত হয়েছে, মস্কোতে লড়াই চলছে, তখনই, - পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বেশ কিছু সদস্য দোলাচলে ভুগতে শুরু করলেন। তাঁরা বিশ্বাস করছিলেন যে, কিছু সুবিধা [প্রতিপক্ষকে] দেওয়া উচিত, পরিস্থিতি হতাশাব্যঞ্জক। তাঁদের দোদুল্যমানতা লক্ষণীয়ভাবে ফাঁস হ’ল রেলওয়েমেন্স এক্সিকিউটিভের সঙ্গে আলোচনার সময়। ৯ই নভেম্বর, এক প্রস্তাব পাশ করে এঁরা আহ্বান জানালেন সব সমাজবাদী দলগুলিকে নিয়ে সরকার গঠনের,- বলশেভিক থেকে পপুলার সোস্যালিস্ট পর্যন্ত - সবাইকে; সম্মতি প্রকাশ করল যে তাঁরা এ-ব্যাপারে মধ্যস্থতা করবে। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে প্রথমে আলোচনায় ঢুকলো শুধু রেলওয়েমেন্স এক্সিকিউটিভের বামশাখা। এখানে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অধিকার দিল আই. বি. রামেনেভ এবং জি. ওয়াই. সোকোলনিকভ-কে।  মেনশভিক ও দক্ষিণপন্থী বিপ্লবী সমাজবাদীরা প্রথমে এই আলোচনায় যোগ দেয়নি। পরে যখন জেনেছে, তারা যেমন ভেবেছিল, কেরেনিস্কির আক্রমণের ফলে কোণঠাসা এবং মস্কো বিষয়ের অবস্থা, আর,  দোদুল্যমানতা শুরু হয়েছে খোদ কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যেই, তারা তখন একটা মাত্রা পর্যন্ত বেহায়া হয়ে উঠল। রেলওয়েমেন্স এক্সিকিউটিভের মিটিং-এ তারা এল ১২-১৩ নভেম্বর, দাবি করল যে, সোভিয়েতকে ক্ষমতা পরিত্যাগ করতে হবে; অক্টোবর অভ্যুত্থানের জন্য যারা দোষী,সরকারে অংশগ্রহণ করা থেকে তাদের বাদ দিতে হবে, সরিয়ে দিতে হবে সবার আগে লেনিনকে; চের্নভ বা আভসেন্তিয়েভের নেতৃত্বে এক নতুন সরকার গঠন করতে হবে। কামেনেভের নেতৃত্বে বলশেভিক প্রতিনিধিরা সভা ছাড়েননি, তার দ্বারা, মেনশভিক ও দক্ষিণপন্থী বিপ্লবী সমাজবাদীদের প্রস্তাবের উপর আলোচনাকে চালিয়ে যেতে দিল। পরের দিন ১৪ই  নভেম্বর, কেন্দ্রীয় কমিটির এক সভা ডাকা হ’ল, যেখানে লেনিন দাবি করলেন, যারা কালেদিন ও কর্নিলভের পক্ষে চলে গেছে, সেই রেলওয়েমেন্স এক্সিকিউটিভের সঙ্গে আলোচনা এখুনি ভেঙে দেওয়া হোক।  কেন্দ্রীয় কমিটি এ বিষয়ে প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। জন-কমিসারদের পরিষদ থেকে নোগিন, রাইকভ, ভি. মিলিউতিন এবং থিওডরোভিচ ইস্তফা দেন ১৭ই তাঁরা কারণ দেখান যে, তাঁদের বিবেচনায় – সমস্ত সোস্যালিস্ট পার্টিগুলিকে নিয়ে সরকার গঠন করা দরকার। অন্য কমিসারদের মধ্যেও বেশ কিছু সংখ্যক তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন। কামেনেভ, রাইকভ, জিনোভিয়েভ, নোগিন এবং, মিলিউতিন কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে তাঁদের পদত্যাগ ঘোষণা করলেন। অক্টোবর বিপ্লবের বিজয়ের পরেই তাঁরা সব পার্টিকে নিয়ে জোট-সরকার গড়ার পক্ষে দাঁড়াল। কেন্দ্রীয় কমিটি দাবি করল যে তাঁরা পার্টি-শৃঙ্খলার কাছে নতি স্বীকার করুক। এই পয়েন্টে, রাগে, ঘেন্নায় ইলিচ কঠিন লড়াই করলেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে ফেরা নিয়ে জিনোভিয়েভ এক বিবৃতি প্রকাশ করলেন। এই ঘটনাকে বেশ দ্রুতই শেষ করে দিতে পার্টিকে সমর্থন করলেন,-   বলশেভিকদের আরো বিজয় এবং ওঁদের এই আচরণকে - কেন্দ্রীয় কমিটি ও সরকারী পদ থেকে ইস্তফা দেওয়াকে – পেট্রোগ্রাদ ও মস্কোর  সংগঠনগুলি তীক্ষ্ণতার সঙ্গে অননুমোদন করল। এই সব কান্ড যে কোন মানুষের ভাবনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতে – চোদ্দ বছর আগের পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে, ১৯০৩ সালে। পার্টি তখন সবেমাত্র গড়ে উঠতে শুরু করেছে। ইসক্রার সম্পাদকমন্ডলীতে, মার্লোভের যোগ দিতে অস্বীকার, পার্টিতে এক গভীর সঙ্কট সৃস্টি করল, আর ইলিচের অত্যন্ত কষ্টের কারণ হয়েছিল।  এবারে কেন্দ্রীয় কমিটি ও কমিসারের পদ থেকে কিছু কমরেডের ইস্তফা সাময়িক অসুবিধা সৃষ্টি করল। এই ঘটনাকে দ্রুত শেষ করে দিতে সাহায্য করল - বিপ্লবী আন্দোলনকে আরো উচ্চতায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। একসঙ্গে হাঁটার সময় ইলিচ সব সময়ই বলতেন, ওঁর মনে কি আছে। এই ঘটনা কিন্তু একবারও উল্লেখ করেননি। কীভাবে এক সমাজতান্ত্রিক জীবনধারা গড়ে তুলবেন, দ্বিতীয় কংগ্রেসে পাশ হওয়া প্রস্তাব করে ফলবতী করবেন, এই সমস্যাতেই ওঁর মন স্থিত ছিল। সারা-রাশিয়া সেন্ট্রাল এক্সিকিউটিভ কমিটি, শ্রমিক ও সেনাদের পেট্রোগ্রাদ সোভিয়েত, এর সঙ্গে সীমান্ত থেকে আসা সেনাদের প্রতিনিধিদের মিলিত সভায়, ১৭ই নভেম্বর ইলিচ ভাষণ দিলেন। তাঁর বক্তৃতায় বুকভরা আত্নবিশ্বাস ছিল – নিশ্চিত বিজয়ের উপর, বলশেভিকরা যে লাইন নিয়েছিল – তার সঠিকতার উপর,  আত্মবিশ্বাস - জনতার সমর্থনের উপর।

কেরেনিস্কি সরকারের অপরাধী-সুলভ জাড্যতা, দেশ ও বিপ্লবকে নিয়ে গিয়েছিল ধ্বংসের কিনারায়; সত্যিই, বিলম্ব ডেকে আনে – মৃত্যুকে। ব্যাপক জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা মিটাতে পারে – এমন আইন প্রবর্তন করে, জীবনের নতুন ধরনের বিকাশের পথে, নতুন সরকার যুগ-সন্ধিক্ষণের চিহ্ন রেখেছে। –স্থানীয় সোভিয়েতগুলি – স্থানীয় পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে, সরকার যে বুনিয়াদী নীতিগুলি প্রবর্তন করল,  সেগুলিকে পরিমিত করতে, প্রসারিত করতে ও সম্পূরক অংশ জুড়তে পারবে। জনগণের সৃষ্টিমূলক জীবন্ত প্রচেষ্টা নতুন জনজীবনের উপাদান। শ্রমিকদেরই তাদের কারখানা নিয়ন্ত্রণ করতে দাও, গ্রামদেশে তাদের উৎপাদিত দ্রব্যের সরবরাহ হোক – বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে খাদ্য-শস্য আনুক। প্রতিটি পণ্য, প্রতি পাউন্ড পাঁউরুটির হিসাব থাকা উচিত, কেন না সর্বোপরি, সমাজতন্ত্র মানে হ’ল হিসাব করা। উপর থেকে আইন করে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করা যায় না। সরকারি আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রবৎ চলন এর মননের সঙ্গে বেমানান; জীবন্ত নির্মাণমূলক সমাজতন্ত্র হ’ল ব্যাপক জনগণের নিজেদেরই সৃষ্টি। (খণ্ড ২৬, পৃ. ২৫৪-৫৫, ঐ)

কথাগুলি চমৎকার।

 “ক্ষমতা আমাদের পার্টির হাতে, যার আছে ব্যাপক জন-মানুষের সর্থন ও আস্থা। কিছু কমরেড এমন অবস্থান নিয়েছে, যার সঙ্গে বলশেভিকবাদের কোন মিল নেই। কিন্তু, মস্কোর শ্রমজীবী মানুষ অনুসরণ করবে না- রাইকভ আর নোগিনের নেতৃত্বকে”,- ইলিচ বললেন। (ঐ, পৃঃ ২৫৬)  

তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করেন নিচের কথাগুলি দিয়েঃ

‘সেন্ট্রাল এক্সিকিউটিভ কমিটি দায়িত্ব দিচ্ছে – জন-কমিসারদের পরিষদকে, - আভ্যন্তরিক বিষয়ের ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ের কমিসারদের, পরবর্তী সভায় মনোনীত করার, এবং কোলিগায়েভকে কৃষি-বিষয়ক জন-কমিসারের পদটি দিতে চাচ্ছে”। (ঐ, পৃ. ২৫৯)  কোলিগায়েভ ছিলেন বাম বিপ্লবী সমাজবাদী। তিনি প্রস্তাবিত পদটি গ্রহণ করলেন না। বাম বিপ্লবী সমাজবাদীরা তখনও দায়িত্ব ঝেড়ে  ফেলছেন।

মেনশভিক ও দক্ষিণপন্থী বিপ্লবী সমাজবাদী ও অন্যরা বিক্ষোভ দেখাল অন্তর্ঘাতের জন্য। আগেকার সরকারী কর্মচারিরা অস্বীকার করল বলশেভিকদের অধীনে কাজ করতে এবং অফিসে এল না। ১৭ই নভেম্বর লেনিন বললেনঃ “ওরা বলছে, আ্মরা বিচ্ছিন্ন। বুর্জোয়ারা আমাদের চারপাশে মিথ্যা ও কুৎসার আবহাওয়া সৃষ্টি করেছে। কিন্তু, আমি একজন সেনাকেও দেখিনি যে সোভিয়েতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরকে সোৎসাহে প্রশংসা করেনি। একজন কৃষকও দেখিনি যে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে”। (ঐ, পৃ. ২৬২)

এবং এটাই লেনিনকে বিজয়ের আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছিল।

২১শে নভেম্বর, কামেনেভের জায়গায়, ইয়াকভ স্বের্দলভ নির্বাচিত হন সারা-রাশিয়ার কেন্দ্রীয় কার্যকরী সমিতির চেয়ারম্যান। তিনি ছিলেন ইলিচের দ্বারা মনোনীত। পছন্দটা ছিল খুবই আনন্দের। স্বের্দলভ ছিলেন কঠোর দৃঢ়তার এক মানুষ। সোভিয়েত শক্তির জন্য সংগ্রামে, প্রতিবিপ্লবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অপরিহার্য। উপরন্তু, এক নতুন ধরনের রাষ্ট্র সংগঠিত করার কাজটা ছিল প্রকান্ড। স্বের্দলভ ছিলেন একেবারে ঠিক সে ধরনেরই সংগঠক।

দু’বছর পর, ১৯১৯-এর ১৮ই মার্চ, - প্রকান্ড কাজটা – যে সময়ে দেশের ভালর জন্য যা ছিল খুই জরুরী, সম্পূর্ণ করার পর, স্বের্দলভ প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যু প্রসঙ্গে, সারা-রাশিয়া সেন্ট্রাল এক্সিকিউটিভ কমিটির এক বিশেষ সভায়, লেনিনের বক্তৃতা,  শ্রমিক-শ্রেণীর স্বার্থে নিবেদিত-প্রাণ একজন রক্ষকের উদ্দেশ্যে, ইতিহাসে এক চমৎকার স্মৃতিচারণ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছে। লেনিন বলে,  “বিপ্লব ও তার বিজয়ের পথে”, -লেনিন বলেন, “সর্বহারা বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য বৈশিষ্টগুলি প্রকাশে, অন্য অনেকের চেয়ে, কমরেড  স্বের্দলভ, অনেক সম্পূর্ণতার সঙ্গে সফল হয়েছিলেন। এই বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্থায়ী বৈশিষ্ট্য এবং বিজয়ের শর্ত সব সময়ই থেকেছে - সর্বহারা জনগণের ও শ্রমজীবী জনতার সংগঠন। লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী জনগণের এই সংগঠনই যা বিপ্লবের আর বিজয়ের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ শর্ত গঠন করে ... এই হ’ল সে বৈশিষ্ট্য যা কমরেড ওয়াই.এম.স্বের্দলভ -এর মত মানুষকে সামনে নিয়ে আসে, যিনি ছিলেন সবাইকে ছাপিয়ে যাওয়া একজন সংগঠক। “একজন স্বচ্ছ পেশাদার বিপ্লবী” হিসাবে ইলিচ বর্ণনা করেন স্বের্দলভের, সর্বান্তঃকরণে বিপ্লবের স্বার্থে নিবেদিত, গোপনে বেআইনী কার্যকলাপে দীর্ঘ কয়েক বছরে তিনি ইস্পাত-দৃঢ় হয়েছিলেন, একজন মানুষ যিনি কখনও জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেননি, কখনও রাশিয়া ছেড়ে যাননি, একজন বিপ্লবী যিনি “শ্রমিকদের কাছে প্রিয় হতে সফল” একমাত্র নেতা। বাস্তব-কাজের সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিচিত একজন সর্বোৎকৃষ্ট নেতাই শুধু ছিলেন না, অগ্রগামী সর্বহারাদেরও একজন নেতা ছিলেন ..... এ পর্যন্ত যার জন্য আমরা গর্ববোধ করেছি, এটা তাঁর প্রশংসনীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা – যার কাছে আমরা ঋণী। তিনি আমাদের পূর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছেন,- প্রকৃত সংগঠিত, পারস্পরিক সহযোগিতায় দলবদ্ধ কাজের, সর্বহারা বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যথাযুক্ত মূল্যবান সংগঠিত সর্বহারা জনগণ, যাদের ছাড়া – অসংখ্য বাধার বা যে কষ্টগুলি এখন পর্যন্ত আমরা মোকাবিলা করতে বাধ্য হচ্ছি , তার একটিও পার হতে পারতাম না”।  ইলিচ  স্বের্দলভের চরিত্রাঙ্কন করেন এভাবে যে, এমন একজন সংগঠক যিনি নিজের জন্য অর্জন করেছিলেন এক “অনাক্রম্য খ্যাতি”, রাশিয়ায় “সমগ্র সোভিয়েত শক্তির” সংগঠক, এবং “পার্টির কাজ - যা এই সোভিয়েতগুলিকে তৈরি করেছে এবং প্রকৃত-প্রস্তাবে সোভিয়েত শক্তিকে বাস্তবায়িত করেছে” – তারই সংগঠক । (২৯ খন্ড, পৃ.৭০-৭৪)

অক্টোবর বিপ্লব বদলে দিল বিপ্লবী সংগ্রামের পরিবেশ।  সংগ্রামের এই পরিবেশের চাহিদা হ’ল এমন মানুষের, যাঁর থাকবে অধিকতর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, অতিশয় অদম্যতা, ভ্লাদিমির ইলিচের প্রিয় শব্দে -  অধিকতর “অদম্য মানসিক শক্তি”, সংগঠন করার অধিকতর লক্ষ্য। ইলিচ প্রায়ই বলতেন,- “সমাজতন্ত্র নির্মাণের মূল উপাদান হ’ল সংগঠন”। এটা কোন দুর্ঘটনা নয় যে ঘটনাক্রম সামনে এনে দিল সে সব মানুষদের, যাঁরা দায়িত্ব কাঁধে নিতে ভয় পান না, আগেকার গোপন জীবনকালের অবস্থায় যাঁদের সামর্থে খিল ধরে গিয়েছিল; অনবরত গ্রেপ্তার আর নির্বাসন তাঁদের সাংগঠনিক প্রচেষ্টাকে শূন্যে পৌঁছে দিয়েছিল, যখন গোপনীয়তার জন্য নিজেদের আত্নগোপনে রাখতে হয়েছিল। এমন একজন মানুষ হ’লেন স্তালিন, পার্টি ও অক্টোবর বিজয়ের এক অসাধারণ সংগঠক। এটা উদ্দেশ্যহীন ছিল না যে, দ্ব্বিতীয় কংগ্রেসে জনকমিসার-প্রার্থীদের যখন মনোনয়ন চলছিল, ইলিচ প্রস্তাব করেন, জাতি-বিষয়ক কমিসারিয়েটের চেয়ারম্যানের পদে স্তালিনকে নিয়োগ করা হোক। ইলিচ বছরের পর বছর চেষ্টা করেছেন অ-রুশ জাতিগুলির মুক্তির জন্য, তাদের সার্বিক বিকাশের সুযোগ দেবার জন্য; বিগত কয়েক বছর ধরে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে জন্য আগের থেকে আরো কষ্টকর লড়াই চালিয়েছেন তিনি। আমার মনে আছে, এই প্রশ্নের উপর কোন রকম চাপ সৃষ্টি করে এমন সব ছোটখাট বিষয়েও তিনি কেমন  ব্যথা পেতেন, যেমন তিনি একদিন ক্রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, যখন আমি তাঁকে বললাম যে, মুল্যবান ঐতিহাসিক স্মারকগুলি পোল্যান্ডের অধিবাসীদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে কিনা – এই প্রশ্নে শিক্ষা বিভাগীয় কমিসারিয়েট কিছু দ্বিধাগ্রস্ত। বৃহৎ শক্তির উৎকট স্বাদেশিকতাকে তাঁর সমস্ত আত্মা দিয়ে ইলিচ ঘৃণা করতেন। তিনি প্রবল আবেগের সঙ্গে এছাড়া কিছুই চাইতেন না যে, দুর্বলতর জাতিগুলিকে পীড়ন করার সাম্রাজ্যবাদী নীতির ক্ষতিপূরণ করবে,-  ‘সমস্ত জাতিগুলির সম্পুর্ণ মুক্তি’ - সোভিয়েত সাধারণতন্ত্রের এই নিজস্ব নীতির দ্বারা। এ নীতি হল - ওদের কল্যাণের জন্য কমরেডসুলভ উৎকণ্ঠার। জাতীয়তার প্রশ্নে স্তালিনের দৃষ্টিভঙ্গি তিনি ভালোই জানতেন, ক্র্যাকাউ-তে এ বিষয়ে যেমন তিনি প্রায়ই আলোচনা করেছেন। এই বিষয়ে বিগত বছরগুলিতে আলোচনায় যা সুচিন্তিতভাবে বেরিয়ে এসেছে, তাতে তিনি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে স্তালিন সসম্মানে, শুধু কথায় নয়, কাজে সে দায়িত্ব পালন করবেন। জাতিগুলিকে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিতে হবে। কাজটা ছিল জটিল, এই জন্য যে, তীব্র শ্রেণী-সংগ্রামের মধ্যেই সে অধিকার প্রয়োগ করতে হবে। জাতিগুলির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার করার কাজটা সংযুক্ত করতে হবে সর্বহারা একনায়কত্বের জন্য সংগ্রামের সঙ্গে এবং সোভিয়েত শক্তি বাস্তবায়িত করার কাজের সঙ্গে। এই প্রশ্নটি আবার ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত সর্বহারার আন্তর্জাতিক সংগ্রাম ও গৃহযুদ্ধের প্রশ্নের সঙ্গে। জাতীয় ফ্রন্টে প্রয়োজন এমন একজন মানুষের, যাঁর থাকবে উদার মন, গভীর আত্মবিশ্বাস এবং সংগঠিত করার বাস্তব সামর্থ। এই কারণেই ইলিচ প্রস্তাব করেন স্তালিনের নাম।  

সমস্ত পার্টি-কর্মীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়াবহ হয়ে দেখা দিল কাজ করার নতুন পন্থা শেখার সমস্যা, নেতৃত্ব দেওয়ানোর সমস্যা, বিগত দিনের বিপ্লবী বিরোধিতার থেকে বেরিয়ে এসে সমর্থ আর সমাজতন্ত্রের অনমনীয়  নির্মাণকারী হবার সমস্যা। 

বাসা বদলে আমি আর ইলিচ গেলাম স্মোলনিতে। আমাদের একটা ঘর দেওয়া হয়েছিল, যেটা আগে কোন মহিলার দখলে ছিল। একটা শয্যার জন্য এটাকে দু’ভাগ করা হ’ল। ঢোকার রাস্তা ছিল ‘ওয়াশ-রুম’ দিয়ে। একটা ‘লিফট’ নিয়ে যেত উপরতলায়, যেখানে ইলিচের একটা নিজস্ব অফিস ঘর ছিল। এর মুখোমুখি বাইরের অফিস ছিল, যেটা ‘ওয়েটিং রুম’ হিসাবে ব্যবহৃত হত। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসত প্রতিনিধির পর প্রতিনিধি, যাদের বেশির ভাগই ছিল ‘ফ্রন্ট’ থেকে আসা। উপরে তাঁর কাছে যখন  যেতাম, প্রায়ই দেখতাম তাঁকে বাইরের ঘরে। ঘরটা থাকত সেনাদের ভিড়ে ঠাসা, সবাই দাঁড়িয়ে, শুনছেন ইলিচের কথা, যিনি বলতেন জানালা দিয়ে। স্মোলনিতে সর্বদাই  মানুষের ভিড় লেগে থাকত, যেন চুম্বকের আকর্ষণে মানুষ আসতেন ইলিচ কাজ করতেন ঐ হৈ-চৈ করা পরিবেশেই। স্মোলনি থাকত মেশিনগান রেজিমেন্টের পাহারায়, সেই ওয়াইবর্গ জেলায় রেজিমেন্ট যারা ১৯১৭-র গ্রীষ্মে ছিল সম্পূর্ণভাবে শ্রমিকদের প্রভাবে। এরাই প্রথম, যারা ১৯১৭-র ৩রা জুলাই বেরিয়ে এসেছিল, ব্যগ্র ছিল অভ্যুত্থানে যোগ দিতে। কেরেনিস্কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, বিদ্রোহীদের সতর্ক করার জন্য কয়েকজনকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে। ওদের নিরস্ত্র করে, ‘মার্চ’ করিয়ে নিয়ে যাওয়া হ’ল চৌমাথায়, সেখানে ওদের জনসমক্ষে পদাবনতি ঘটানো হ’ল। এরপরে, মেশিনগান-চালকরা অস্থায়ী সরকারকে ঘৃণা করতে লাগল এত খারাপভাবে – যা আগে কখনও করেনি। অক্টোবরে তারা সোভিয়েত শক্তির পক্ষে লড়াই করল, পরে স্মোলনির ‘গার্ড’-এর দায়িত্ব নিল। ঝেলতিশেভ নামে একজন মেশিনগান-চালককে, যে ছিল উফা-র কৃষক,  বলা হ’ল লেনিনের দেখাশোনা করতে। সে ভীষণভাবে লেগে থাকত ইলিচের সাথে, স্মোলনিতে থাকা ক্যান্টিন থেকে ওঁর খাবার এনে দিত। ঝেলতিশেভ ভালোরকম সরল-সাদাসিধা ছিল। যে কোন জিনিস দেখেই সে অবাক হয়ে যেত। এমন কি যে স্পিরিট-ল্যাম্পটা ছিল, তাও তাকে অবাক করে দিয়েছিল। একবার আমি একটা ঘরে গিয়ে দেখি, সে মেঝের উপর বসে, তার সামনে থাকা জ্বলন্ত স্পিরিট-ল্যাম্পে স্পিরিট ঢালছে। এমনকি, জলের কল, চীনেমাটির বাসনপত্রও তাকে অবাক করে দিত। যে মেশিনগান-চালকরা স্মোলনিতে গার্ড দিত, তারা একদিন ছোট-ছোট বাক্সের একটা গাদা দেখতে পেল, যেগুলি স্মোলনি-ইনস্টিটিউটে থাকা আগেকার মহিলারা  ব্যবহার করত।  ওর ভিতরে কি আছে – জানার জন্য কৌতূহলী হয়ে, বেয়নেট দিয়ে সেগুলো খুলে ফেলল। ওরা দেখল যে ভিতরে কিছু ডায়েরি, ছোট-খাট কিছু জিনিস, গয়না আর রিবন। প্রতিবেশী বাচ্চাদের কাছে ওরা সেগুলো বিলিয়ে দিল। ঝেলতিশেভ একদিন আমার জন্য নিয়ে এল একটা তুচ্ছ জিনিস, একটা ছোট গোল আয়না, যাতে ইংরাজীতে খোদাই করা ছিল –“নায়গ্রা”। আমি সেটা এখনও আমার কাছে রেখে দিয়েছি। ইলিচ কখনো-সখনো ঝেলতিশেভের সাথে একটা-দু’টো কথা বলতেন। ও তৈরি থাকত ইলিচের জন্য পৃথিবীর যে কোন জিনিস করতে। ট্রটস্কিকেও ঝেলতিশেভের দেখশোনা করতে হ’ত; উনি পরিবার নিয়ে থাকতেন আমদের উল্টোদিকে, যেখানে আগে ইনস্টিটিউটের হেড-মিস্ট্রেস থাকতেন। কিন্তু ও ট্রটস্কিকে পছন্দ করতো না। ও একবার আমাকে লিখল, “উনি বসের মতো আচরণ করেন”।

ও এখন থাকে বাশকির সাধারণতন্ত্রের এক যৌথ খামারে। ওর একটা বড় পরিবার আছে। রোগে ভুগছে এখন। ইলিচের সম্পর্কে নানা কথা স্মরণ করে, আমাকে মাঝে মাঝে চিঠি লেখে।

আমি সারাদিন কাজে থাকতাম, প্রথমে ওয়াইবর্গ জেলা পরিষদে, তারপর শিক্ষা-কমিসারিয়েটে। বেশির ভাগ সময়েই, নিজের উপায় নিজেই করার জন্য ইলিচকে ছেড়ে রাখতে হ’ত। ঝেলতিশেভ ইলিচকে এনে দিত রেশনের বরাদ্দ খাবার আর রুটি। কখনো কখনো মারিয়া ইলিনিচনা বাড়ি থেকে খাবার এনে দিত, কিন্তু, প্রতিদিন তাঁর খাবারের যত্ন নেবার কেউ ছিল না, কেন না আমি তো খুব কমই বাড়িতে থাকতাম। করোতকেভ নামে এক যুবক সম্প্রতি আমাকে লেনিন সম্পর্কে এক ঘটনার কথা বলল। সে তখন বারো বছরের বালক। ওর মা, যিনি স্মোলনির অফিস পরিস্কার করতেন, ও থাকত তাঁর সঙ্গেই। একদিন ওর মা শুনতে পেলেন, কেউ একজন ক্যান্টিনের দিকে হেঁটে যাছেন। তিনি দেখলেন, একটা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ইলিচ নিজেই নিয়ে খাচ্ছেন এক টুকরো কালো রুটি আর হেরিং মাছ। সেই মহিলাকে দেখে লেনিন কিছুটা হতচকিত হলেন; একটু হেসে বললেন,- “জানো, আমার খুব খিদে পেয়েছিল”।  করোতকোভ চিনত ভ্লাদিমির ইলিচকে। বিপ্লবের ঠিক পরে পরেই একদিন, ইলিচ সিঁড়ি  বেয়ে নিচে নেমে আসছিলেন, যখন করোতকোভের মা সেটা পরিস্কার করছিলেন। তিনি ইলিচকে দেখে, সিঁড়ির রেলিং-এ ঝুঁকে পড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মহিলাটি সে সময়ে জানতেন না যে, লোকটি কে! ইলিচ থামলেন, এবং কথা বললেন।  তিনি মহিলাটিকে বললেন, “আচ্ছা, কমরেড, আগের পুরানো সরকারের আমলের চেয়ে, সোভিয়েত শক্তির আমলে, আগের থেকে ভালো কিছু দেখছেন কি?” জবাব দিলেন, “ওঃ, ওসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার কাজের জন্য মজুরি পাচ্ছি”। পরে, যখন তিনি জানতে পারলেন যে উনি ছিলেন লেনিন, তিনি কিছুতেই ব্যাপারটা সামলে উঠতে পারেননি। যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন, গল্প করতেন যে লেনিনকে তিনি কেমন জবাব দিয়েছিলেন। তিনি এখন বৃদ্ধ বয়সের পেনশন-ভোগী। তাঁর ছেলে এখন স্মোলনির ‘ফরওয়ার্ডিং ডিপার্টমেন্ট’-এ কাজ করে, কলা ও শিল্প  কর্মশালা থেকে একটা ডিগ্রিও নিয়েছে।

তারপর, অবশেষে, একজন ফিনীশিয় মহিলা বাটমানের মা, ব্যাপারটা হাতে নিলেন। তিনি তাঁর ছেলেকে খুবই ভালোবাসতেন, এবং এ জন্য গর্ববোধ করতেন যে তাঁর ছেলে দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসে প্রতিনিধি ছিল, আর, জুলাইয়ের দিন গুলিতে তিনি ইলিচকে আত্মগোপনে সাহায্য করেছিলেন। শিগগিরি তিনি বাড়িটা করে তুললেন পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল, যেমনটি ইলিচ পছন্দ করতেন, এবং  ঝেলতিশেভ, সাফাইকারীগণ, পরিবেশন-কারিনীদের ফেললেন শক্তি-পরীক্ষার মধ্যে। বাইরে যাবার সময় আমি নিশ্চিন্ত থাকতাম যে ইলিচের দেখাশোনা এবার যথাযথ হবে আর খাবারও দেওয়া হবে। বিকেল গড়াতে, আমি যখন কাজ থেকে আসতাম, ইলিচ ব্যস্ত না থাকলে, আমরা স্মোলনির আশেপাশে ঘুরতাম আর কথাবার্তা বলতাম। ঐ সব দিনগুলিতে, খুব কম লোকই ইলিচকে চিনতেন, এবং তাঁর যাবার সময় কেউই মনোযোগ দিতেন না।

এটা অবশ্য সত্যি যে, ওঁকে বাইরে যেতে দেখলে, এ ব্যাপারে মেশিন-গান-চালকরা উদ্বিগ্ন থাকতেন এবং দেখতেন যে স্মোলনি এলাকাতে যেন শত্রুতাপূর্ণ কেউ না থাকে। একবার তারা দৌড়ে গেল এক ডজন কি ঐ রকম সংখ্যক ঘরের বৌয়ের দিকে, যারা এক কোণে জড়ো হয়েছিল আর লেনিনকে লক্ষ্য করে  জোরে জোরে হাসাহাসি করছিল। স্মোলনির কম্যানডান্ট – ম্যালকভ, পরের দিন আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেনঃ “আমরা কিছু মহিলাকে গত কাল গন্ডগোল করছিল বলে ধরেছি। ওদের নিয়ে আমি কি করবো? তুমি কি একবার ওদের দেখবে?” এটা দেখা গেল যে তাদের মধ্যে অধিকাংশই পালিয়ে গেছে, এবং বাকি যারা ছিল তারা রাজনীতি থেকে অনেক দূরে সরে যাওয়া এমন এক অজ্ঞ দঙ্গল, আমি হেসে বললাম যে ওদের যেতে দাও। ছাড়া পেয়ে, ওদের মধ্যে একজন ফিরে এসে, ম্যালকভের দিকে আঙুল দেখিয়ে ফিস-ফিস করে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “ওটা কি লেনিন?” আমি একটু হেসে, বিদায় দিলাম।

আমরা স্মোলনিতে ছিলাম ১৯১৮-র মার্চ পর্যন্ত। তারপর আমরা বাসা বদলে মস্কোতে গেলাম।

 নাদেঝদা ক্রুপস্কায়ায় স্মৃতিচারণ লেখা হয়েছিল বিভিন্ন পর্বে, প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৩-এ।

এই স্মৃতিচারণার দ্বিতীয় অংশ (১৯০৮-১৭) যখন লেখা হচ্ছে তখন লেনিন রচনাবলীর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

সে-কারণেই তার সূত্র উল্লেখও রয়েছে। এখানে ‘অক্টোবর ডেস’ পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।

অনুবাদ : প্রদীপ দাশগুপ্ত


প্রকাশের তারিখ: ২২-অক্টোবর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org