বাল্মীকির রাম, ফিরে দেখা - ২

সুকুমারী ভট্টাচার্য
তাহলে এই সেই যুগ, যখন নারী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বঞ্চিত, স্বাধীন বৃত্তির অধিকারও তাঁর নেই, পণ্য-দ্রব্য রূপে পরিগণিত, একা তারই দোষে বর্ণসংকর হয়, এবং তার চেয়ে পাপিষ্ঠ কেউই নেই। বিদেশী আক্রমণের ফলে আরো প্রবল হলো বর্ণসংকরের আতঙ্ক। বার্ডোসানেস নামে এক সিরিয় গ্রন্থকার রচনা করেন 'বুক্ অব্ দ্য লস্ অব্ দ্য কান্ট্রিস্' ১৪০ খ্রিস্টাব্দে। তাতে তিনি লিখেছেন কুষানেরা নিজেদের স্ত্রীদের রক্ষিতার মতো দেখত, তাদের কাছে কোনো যৌন আনুগত্য প্রত্যাশা করত না। তাহলে হয়তো আক্রমণ-পরম্পরার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জাতির দাম্পত্য সম্পর্কের শিথিলতার প্রভাবে আর্যাবর্তের সমাজ জীবনে কিছু শৈথিল্য দেখা দিয়ে থাকবে, যে-আতঙ্কে নারীজাতিকে মোটামুটি অন্তঃপুরে বন্দিত্বের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে, তাকে সন্দেহ করা অত্যন্ত ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়।'

কী সেই ভাব? যে-সীতাকে না দেখতে পেয়ে বনে বনে হা হুতাশ করে বেড়িয়েছিলেন রাম, তাঁকে দেখতে পেয়েই কী বললেন? ‘যুদ্ধে শত্রুকে জয় করেছি, তোমাকেও মুক্ত করেছি, ভদ্রে। পৌরুষ দিয়ে যা করবার ছিল তা আমি করেছি। বৈরভাবের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছি, ধর্ষণ প্রমার্জনা করেছি। শত্রু এবং অপমান এক সঙ্গেই শেষ করেছি। আজ আমার পৌরুষ প্রকাশিত হয়েছে, আমার শ্রম আজ সফল হয়েছে। প্রতিজ্ঞা থেকে আজ উত্তীর্ণ হয়েছি, নিজের প্রভুত্ব ফিরে পেয়েছি, (৬/১১৫/১-৪)। একথা শুনে সীতার চোখ দুটি মৃগীর মতো উৎফুল্ল হয়ে উঠল ‘জল ভরে এল চোখে’ (৬/১১৫/১০)। তারপর, তা দেখেও রাম বলতে লাগলেন, ‘তোমার কুশল হোক, জেনে রাখ, এই যে যুদ্ধের পরিশ্রম, বন্ধুদের বীরত্বের সাহায্যে যা থেকে উত্তীর্ণ হয়েছি, তা তোমার জন্যে নয়। আমার চরিত্র মর্যাদা রক্ষা করার জন্যে এবং প্রখ্যাত আত্মবংশের কলঙ্ক মোচন করার জন্যেই তা করেছি। তোমার চরিত্র সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে। আমার সামনে তুমি আছ, চক্ষুপীড়াগ্রস্তের সামনে প্রদীপ যেমন পীড়াদায়ক হয় তেমনই। তাই জনকাত্মজা, এই দশদিক পড়ে আছে, যেখানে ইচ্ছা তুমি চলে যাও আমি অনুমতি দিলাম তোমাকে- তোমাকে আর আমার কোনো প্রয়োজন নেই। কোন সদ্বংশজাত তেজস্বী পুরুষ বন্ধুত্বের লোভে পরগৃহবাস করেছে যে স্ত্রী, তাকে ফিরিয়ে নেবে? রাবণের কোলে বসে পরিক্লিষ্ট, তার দুষ্ট দৃষ্টিতে দৃষ্টা তুমি, তোমাকে গ্রহণ করে আমি আমার উজ্জ্বল বংশের গৌরব নষ্ট করব? যে জন্যে যুদ্ধজয় করেছি, তা পেয়েছি, তোমার প্রতি আমার অভিলাষ নেই, যেখানে খুশি চলে যাও তুমি: বুদ্ধিমান্ আমি তোমাকে বলছি, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব বা বিভীষণ এদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করে নাও। তোমার মতো দিব্যরূপা মনোরমা নারীকে দেখে, রাবণ নিজগৃহে খুব বেশিদিন চুপচাপ সহ্য করেনি' (৬/১১৫/১৫-২৪)।

এর উত্তরে বাল্মীকি রামায়ণে সীতা বললেন, ‘তুমি যেমন ভাবছ, মহাবাহু, আমি তেমন নই। নিজের চরিত্র দিয়ে আমাকে বিশ্বাস কর, এই শপথ কর।’ (৬/১১/৬)। Gorresio সংস্করণের রামায়ণে এবং মহাভারতের বনপর্বের অন্তর্গত রামোপাখ্যানে একটু অন্য পাঠ আছে। দু'জায়গাতেই রাম সীতাকে বলছেন : ‘যাও বৈদেহী, তুমি মুক্ত। যা করণীয় ছিল তা আমি করেছি। আমাকে স্বামী পেয়ে তুমি রাক্ষসের বাড়িতে বুড়ো হয়ে যাবে এটা হয় না, তাই রাক্ষস (রাবণ)-কে হত্যা করেছি। আমার মতো ব্যক্তি ধর্ম ও অধর্মের ভেদ জেনেও পরহস্তগতা নারীকে কেমন করে এক মুহূর্ত ধারণ করবে? তুমি সচ্চরিত্রই হও আর অসচ্চরিত্রই হও, মৈথিলী, তোমাকে আমি ভোগ করতে পারিনে, (তুমি) যেন কুকুরে চাটা ঘি।’ (৩/২৭৫/১০-১৩)।

এখানে কতগুলি লক্ষণীয় ব্যাপার আছে: পুরো কথোপকথনে রাম বা সীতা কেউই অপরকে প্রিয় সম্ভাষণ করেননি, স্বামী-স্ত্রী বলেও উল্লেখ করেননি। সীতা ‘মহাবাহু’ বলেছেন রামকে, রাম সীতাকে ‘বৈদেহী’, ‘মৈথিলী’, ‘ভদ্রা’ সম্বোধন করেছেন। রাম স্পষ্টই বলেছেন সীতার চরিত্র ভালো হলেও তাঁকে গ্রহণ করা যায় না, কারণ সে ‘পরহস্তগতা’ হয়েছিল, অতএব কুকুরে চাটা ঘি দিয়ে যেমন যজ্ঞীয় কর্ম করা যায় না, তেমনি সীতাকে তিনি ‘পরিভোগ’ করতে পারেন না। প্রাচীন ভারতবর্ষে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের মূলমন্ত্র উচ্চারিত হলো, ‘পরিভোগ’। খুব নির্মমভাবে সীতাকে বলেছেন রাম যে, সীতা উদ্ধারের জন্যে তিনি মোটেই যুদ্ধ করেননি, করেছেন ইক্ষ্বাকু কুলের রাজবধূ রাক্ষসের বাড়িতে বুড়ো হয়ে গেলে তাঁর বংশ-মর্যাদা হানি হয়, তাই। লক্ষ্মণ বনগমনের পূর্বে সুমিত্রাকে প্রণাম করতে এলে সুমিত্রা বলেন, ‘রামকে দশরথ মনে করবে, সীতাকে আমি (সুমিত্রা, জননী) মনে করবে।’ এখন সীতাকে পরিত্যাগ কালে রাম অনায়াসে বলছেন লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, সুগ্রীব, বিভীষণ যাকে ইচ্ছা পতিত্বে বরণ কর। বিধবা নারীর পক্ষেই শুধু শাস্ত্রের বিধান ছিল, দেবরকে বরণ করা। তবে কি রাম বলতে চান, সীতার পক্ষে তিনি মৃত? স্বামী পরিত্যক্তা নারী কি বিধবার তুল্য? আর সুগ্রীব, বিভীষণ? বানর, রাক্ষসকেও সীতা গ্রহণ করতে পারেন? এ অপমান করবার অধিকার রাম কোথা থেকে পেলেন? শূর্পণখাও রামকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, তবে কি রামও কুকুরে চাটা ঘি? সীতার জন্যে এত যে বিলাপ তা কি শোকোচ্ছ্বাস না পরিভোগ-বঞ্চিত কামুকের আর্তনাদ? বহুপত্নীক দশরথের পুত্র রাম একপত্নীক, সীতাকে নিয়েই তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু এটা এমন কিছু বড় কথা নয়, কারণ লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্নও একপত্নীকই ছিলেন। বরং রামের অভিষেক প্রসঙ্গে একটা উক্তি আছে মূল বাল্মীকি রামায়ণে; তখন রামের ‘পরমা স্ত্রীরা’ হৃষ্টা হলেন, (বহুবচন, স্ত্রিয়ঃ) (২/ ৯/১২)। যদি ধরে নিই, সেকালে রাজপুত্রদের বহু বিবাহের বিধি ছিল, তাই রামের আরো পত্নী ছিল, সীতা মহিষী ছিলেন বলেই অশ্বমেধ যজ্ঞ করবার সময়ে রাম আর বিয়ে না করে সোনার মহিষী দিয়েই যজ্ঞীয় প্রয়োজন সাধন করেছিলেন, তবু একথাটা থেকে যায়, যে চার রাজপুত্রই একপত্নীক ছিলেন, এ গৌরব একা রামের নয়। সীতাকে ভালোবাসতেন একথা বৈশিষ্ট্য পেল সীতা হরণের পরে রামের উন্মাদপ্রায় আচরণে এবং ঠিক সেই কারণেই বহুদিন অদর্শনের পরে প্রথম দর্শনে ‘গচ্ছ বৈদেহি, মুক্তা ত্বম্’ বেশি রকম বিসদৃশ লাগে। পরে দেবতারা সীতাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করবার পর রাম বলেন, তিনি ঠিকই জানতেন, শুধু লোকাপবাদের ভয়ে ওইসব কথা বলেছিলেন। তখন প্রশ্ন ওঠে প্রথমত, বাল্মীকি ওইসব কথার ভূমিকায় বলেছিলেন রাম ‘হৃদয়ান্তর্গতভাব’ বলেছেন। দ্বিতীয়ত, সন্দেহ হয়ে থাকলে সীতাকে জিজ্ঞাসা করলেই তো পারতেন। তৃতীয়ত, হনুমান্ দেখেছিলেন, সীতাকে প্রলোভন এবং ভয় দেখানো সত্ত্বেও সীতা অবিচলিতা ছিলেন। চতুর্থত, সন্দেহের প্রশ্ন উঠলে সীতাও রামের বিশ্বস্ততা সম্বন্ধে প্রশ্ন করতে পারতেন। পঞ্চমত, সন্দেহ হলেই স্ত্রীকে ত্যাগ করতে হবে, এমন কথা কোনো শাস্ত্রে নেই। ষষ্ঠত, ত্যাগ করার জন্যে বানর রাক্ষস ছোটভাই সকলের সামনে কুকুরে- চাটা ঘি বলবার প্রয়োজন ছিল না। সপ্তমত, ত্যাগ করে সকলের সামনে তিন দেবর, বানররাজ, রাক্ষসরাজকে, সম্ভাব্য পতিরূপে উল্লেখ করার কোনো প্রয়োজন বা অধিকার তাঁর ছিল না। অষ্টমত, চক্ষু-ব্যাধিগ্রস্ত লোকের পক্ষে প্রদীপ যেমন অসহ্য, তেমনি অসহ্য সীতা রামের দৃষ্টিতে। ব্যাধিটি কার। দোষটা কার?

রামের মর্মস্তুদ কথা শুনে সীতা বললেন, ‘আমার গাত্র যে স্পর্শ করা হয়েছে তখন তো আমি বিবশা দুর্বল বলে প্রবলের বশে যেতে বাধ হয়েছিলাম। স্বেচ্ছায় আমি সেটা ঘটাইনি, এখানে অপরাধ দৈবের। আমার অধীন যেটা, আমার হৃদয়, সেটা তো তোমাতেই সমর্পিত। দেহটা পরের অধীনে গেলে অসহায় আমি কি করব? হে মানদ, তোমার সঙ্গে এক সঙ্গে বেড়ে উঠেছি। তাও যদি তুমি না জেনে থাক, তাহলে চিরদিনের মতোই আমি অভিশপ্তা।... লঘুচিত্ত মানুষের মতো তুমি আমার নারীত্বকেই সামনে রাখলে, জনকের সামনে পৃথিবী থেকে উত্থিত হয়েছিলাম সে কথাটা, আর, হে চরিত্রজ্ঞ আমার চরিত্রের বহুতর যে নিদর্শন ছিল তাকে কোনো প্রাধান্য দিলে না। স্বীকার করলে না যে আমার বালিকা বয়সেই তুমি আমার পাণিগ্রহণ করেছিলে, আমার ভক্তি, চরিত্র এসব পিছনে ফেলে দিলে’। (৬/১১৬/৬, ৯, ১০, ১৫, ১৬)। বালিকা- বয়সে বিবাহের উল্লেখের তাৎপর্য হলো, সীতার যৌবন কেটেছে রামের সান্নিধ্যে, তাতে কখনোই কি কিছু সন্দেহের লেশমাত্র পেয়েছেন রাম? আর একটা বড় তাৎপর্য আছে দেহ ও মনের পার্থক্যে। যে দেহটাকে পরের স্পর্শ থেকে বাঁচানোর বল বা সামর্থ্য ছিল না সেইটেই বড় হয়ে উঠল? যে-মনটা আকৈশোর অবিচলভাবে রামের উদ্দেশ্যে সমর্পিত থেকেছে, তার কোনো মূল্য নেই? আগেই বলেছি, রামের সঙ্গে বনে আসার কোনো দরকারই ছিল না সীতার। শুধু রামকে ছেড়ে থাকা তাঁর পক্ষে দুঃসহ ছিল বলেই জোর করে সঙ্গে এসেছিলেন। এসব তুচ্ছ হয়ে গেল, শুধু তার গায়ের জোরটা রাবণের চেয়ে কম ছিল বলে? লক্ষ্মণকে সীতা চিতা প্রস্তুত করতে বললেন, কারণ, রামের প্রেম ও বিশ্বাস থেকে যখন বঞ্চিত হয়েছেন, তখন বেঁচে থাকার কি সার্থকতা আছে? বাল্মীকি বলেছেন, চিতা নির্মাণের ব্যাপারে রাম কোনো আপত্তি করলেন না দেখে লক্ষ্মণ চিতা নির্মাণ করলেন। চিতা তিনবার প্রদক্ষিণ করতে করতে সীতা বললেন, ‘রামের থেকে আমার মন যখন সরে যায়নি তখন অগ্নি আমাকে সর্বতোভাবে রক্ষা করুন।’ বৈদিক যুগ থেকে আত্মশুদ্ধি প্রমাণের এই উপায়টি প্রবর্তিত ছিল, একে বলে ‘সত্যক্রিয়া’। নিজের শুদ্ধির প্রমাণ দিতে দেবতাদের আহ্বান করা। প্রথমে অগ্নি পরে অন্য দেবতাদের আহ্বান করলেন সীতা। তাঁরা এসে সীতাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করলেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সীতার অগ্নিপ্রবেশের কারণ যে রামের সীতা- চরিত্রে সংশয়, এ সম্বন্ধে প্রায়ই বলা হয় যে প্রজাদের সংশয় নিরসনের জন্যেই রাম সীতাকে নিষ্পাপ জেনেও সন্দেহ ব্যক্ত করেন। এর উত্তরে দুটি কথা বলা যায়, প্রথমত, বাল্মীকির মতে রাম ‘হৃদয়ান্তর্গতভাব’ প্রকাশ করেছেন, সেভাব হলো সীতার নিষ্পাপতায় রামের অবিশ্বাস, আর দ্বিতীয়ত, লঙ্কায় অযোধ্যার প্রজা একজনও ছিলেন না লক্ষ্মণ ছাড়া, এবং লক্ষ্মণ কখনোই সীতা-চরিত্রে সন্দিহান ছিলেন না। দেবতারা সীতাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করার পর রাম বললেন, ‘লোকসমাজে সীতার অগ্নি প্রবেশের প্রয়োজন অবশ্যই ছিল, (কারণ) ইনি রাবণের অন্তঃপুরে দীর্ঘকাল বাস করেছেন’ (৬/১১৮/১৩)। আরো বললেন, ‘ত্রিলোকের প্রত্যয়ের জন্যে সত্যব্রত আমি এঁর হুতাশনে প্রবেশ উপেক্ষা করেছিলাম’ (৬/১১৮/১৭)।

প্রমাণের পরে অযোধ্যায় ফিরে এলেন....। কিছুকাল আনন্দে কাটল। সীতাকে সন্তান-সম্ভবা জেনে রাম তাঁর ‘দোহদ’ বা সাধ পূরণ করতে চাইলে সীতা বাল্মীকির আশ্রম দেখতে চাইলেন, রাম সম্মত হলেন। ইতিমধ্যে প্রজারা বলাবলি করত লাগল, ‘পূর্বকালে রাবণ যাঁকে বলপূর্বক হরণ করে কোলে বসিয়েছিল, সেই সীতার সম্ভোগে রামের কেমন সুখ হয়? আমাদের স্ত্রীদেরও এমন আচরণ সহ্য করতে হবে। রাজারা যেমন আচরণ করেন প্রজারা তারই অনুবর্তন করে’ (৭/৪৩/১৭, ১৩)। শুনে রাম চিন্তা করে সীতকে নির্বাসন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, কিন্তু বললেন ‘আমার অন্তরাত্মা জানে যে সীতা শুদ্ধা এবং যশস্বিনী' (৭/৪৫/১০)। ভাইদের ডেকে বললেন, ‘অপবাদ ভয়ে ভীত আমি নিজের প্রাণ দিতে পারি, পুরুষর্ষভ তোমাদেরও ত্যাগ করতে পারি, জনকাত্মজাকে তো বটেই' (৭/৪৫/১৪, ১৫)। সংস্কৃত পাঠটির মধ্যে একটা যেন পর্যায় বিভাগ আছে—সবচেয়ে দামি মানুষের নিজের প্রাণ, তারপর বীর ভাইরা, তারপর স্ত্রী—‘কিং পুনর্জনকাত্মাজাম্'-এর মধ্যে একটা তাচ্ছিল্য নিহিত আছে।

এখানে ভেবে দেখতে হবে, স্ত্রীকে বনবাসে দেওয়ার সপক্ষে কোনো শাস্ত্র নেই। দ্বিতীয়ত, অগ্নিসাক্ষী করে যার পাণিগ্রহণ করেছেন তাকে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ ছাড়া ত্যাগ করা যায় না, তেমন অপরাধে ত্যাগ সকল শাস্ত্রকার সমর্থন করেন না। তৃতীয়ত, যে ইক্ষ্বাকুকুলের সম্মানের জন্য লঙ্কার যুদ্ধ, সেই ইক্ষ্বাকুকুলের ভাবী সন্তান যাঁর গর্ভে তাঁকে ত্যাগ করা অত্যন্ত গর্হিত। চতুর্থত, বাল্মীকির আশ্রম দেখতে চেয়েছিলেন সীতা অন্তঃসত্ত্বা নারীর দোহদ বা সাধ হিসাবে, সেই আশ্রমে রাম তাঁকে পাঠালেন ছলনাকে আশ্রয় করে, এ এক মর্মান্তিক বিদ্রুপ সীতার প্রতি। রাম তাঁর জ্ঞাতসারে সীতাকে চিরতরে বিসর্জন দিচ্ছেন। তাঁদের দাম্পত্যের অন্তিমপর্বে স্ত্রীকে একটি মিথ্যা বলে বিদায় দিলেন। বনে সীতা লক্ষ্মণকে বললেন, ‘আমার এই দেহটি নিশ্চয় শুধু দুঃখের জন্য সৃষ্টি হয়েছিল, লক্ষ্মণ’ (৭/৪৮/৩)। বললেন, ‘ধর্মে সুপ্রতিষ্ঠিত সেই রাজাকে বোলো, রাঘব তুমি যথার্থই জান, যে সীতা শুদ্ধা, পরম ভক্তিমতী, তোমার মঙ্গলে নিবিষ্টাচিত্তা, সেই আমাকে তুমি সমাজে অযশের ভয়ে ত্যাগ করলে। (৭/৪৮/১২,১৩)

এ ত্যাগ দ্বিতীয়বার। প্রথম পরিত্যাগ এবং দেবতাদের দ্বারা সীতার শুদ্ধি ঘোষণার সাক্ষী ছিলেন রাম, লক্ষ্মণ দুজনেই। সীতার কথাগুলি লক্ষণীয়, ‘ধর্মে সুসমাহিত (বা সুপ্রতিষ্ঠিত) রাজাকে জানিও, লক্ষ্মণ, যে তিনি যথার্থই (বা স্পষ্টই, ‘তত্ত্বেন') জানেন যে প্রজাদের অভিযোগ মিথ্যা, তিনি জানেন সীতার একনিষ্ঠতা, রাম সম্বন্ধে তাঁর হিতৈষণা, তথাপি লোকাপবাদের ভয়ে তিনি নির্দোষ অন্তঃসত্ত্বা নারীকে বনবাস দিচ্ছেন। নিত্যদিন প্রেমের একনিষ্ঠতা নিয়ে যে নারী স্বামীর সহচারিণী ছিলেন, তাঁকে ত্যাগ করবার আগে প্রজাদের কাছে নিজে একবার বলাও দরকার মনে করলেন না যে সীতা লঙ্কায় অগ্নিশুদ্ধা, রাম ও লক্ষ্মণ তার সাক্ষী। সমস্ত কর্তব্য শুধু ভ্রান্ত সন্দেহে সন্দিহান প্রজাদের প্রতি, দীর্ঘদিন নিষ্কলুষ অন্তঃশুদ্ধা সঙ্গিনীর প্রতি কোনো কর্তব্য নেই?

এর কিছুদিন পরে এক ব্রাহ্মণের বালকপুত্র অসময়ে মারা যায়। রাজপুরোহিতরা রামকে বলেন, রাজ্যে কেউ পাপ করেছে, যার ফলে এই অঘটন ঘটল। খোঁজ করতে দেখা গেল শম্বুক নামে এক শূদ্র সশরীরে দেবত্ব পাবার জন্য তপস্যা করছে, সে নিজেই সেকথা স্বীকার করল (৭/৬/২)। ‘সেই শূদ্রটি কথা বলতে বলতেই উজ্জ্বল খড়গ কোষ থেকে বের করে তার মুণ্ড ছেদ করলেন রাঘব।’ তখন দেবতারা সাধুবাদ দিয়ে রামকে বললেন, ‘রাম তুমি দেবতাদের কার্যসাধন করলে, তোমার জন্য এই শূদ্র স্বর্গভাক্ হতে পারল না।’ (৬৭/২, ৪, ৭, ৮)

সীতা বিসর্জনের কিছু দিন পরে রাম অশ্বমেধ যজ্ঞ করবেন ঠিক করলেন। সীতার স্বর্ণমূর্তি গড়িয়ে পাশে বসিয়ে যজ্ঞ সমাধা হলো। বাল্মীকির আশ্রমে সীতার যে যমজ পুত্র জন্মেছিল, লব ও কুশ তারা ততদিনে কিশোর। বাল্মীকি তাদের নিজের রচনা রামায়ণ কাহিনী গাইতে শিখিয়েছেন। বাল্মীকির আজ্ঞায় যজ্ঞের সময় ব্রহ্মচারীর বেশে তারা সমবেত জনতাকে রামকাহিনী শুনিয়ে শুনিয়ে বেড়াচ্ছিল। রাম দেখতে পেয়ে ডেকে তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করে জেনে বাল্মীকিকে বলে পাঠালেন, সীতা যেন প্রকাশ্য রাজসভায় এস নিজের শুচিতা প্রমাণ করেন। বাল্মীকি রাজি হয়ে বললেন, ‘লোকাপবাদভীত হে মহাব্রত রাম- তুমি অনুমতি করলেই সীতা তোমার প্রত্যয় উৎপাদন করবেন। আমি কখনো মিথ্যাবাক্য বলেছি বলে মনে পড়ে না। এ দুটি তোমারই পুত্র’ (৭/৯৬/১৭/১৯)। আর বললেন, ‘আমি বহু সহস্র বৎসর তপস্যা করেছি। মৈথিলী যদি দুষ্টা হন তো আমি যেন সেই দীর্ঘ তপস্যার ফল না ভোগ করি। মনে, কথায়, বাক্যে কখনো পাপ করিনি, মৈথিলী যদি নিষ্পাপ হন তবেই যেন তার ফল ভোগ করি’ (৭/৯৬/২০, ২১)। বাল্মীকির কথাগুলি শপথ, অর্থাৎ বাল্মীকি নিজের সমস্ত তপস্যার ফল বন্ধক রেখেছেন। সীতার শুচিতার প্রমাণ হিসাবে কায়মনোবাক্যে নিষ্পাপ বাল্মীকি এই নিষ্পাপতার সমস্ত পারলৌকিক পুরস্কার ও পুণ্য থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে রাজি আছেন, যদি সীতার মধ্যে কোনো পাপ থাকে। শুধু রামায়ণের রচয়িতা নন, শুদ্ধাচারী নিষ্পাপ তপস্বী, যিনি সুদীর্ঘকাল তপস্যার দ্বারা বহু পুণ্য অর্জন করেছেন তিনি রামকে বলছেন, “সীতা নিষ্পাপ না হলে আমি যেন সারাজীবনের কঠিন সাধনার পুণ্যফল না পাই।' এই শপথই তো যথেষ্ট হওয়া উচিত ছিল রামের পক্ষে। হলো না।

এবার নিজের ছেলেদের সামনে, অযোধ্যার কৌতূহলী সন্দিগ্ধ জনতার সামনে, ঋষি পুরোহিতদের সামনে, রামের অশ্বমেধ যজ্ঞে আমন্ত্রিত বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে আজন্ম শুদ্ধাচারিণী সীতাকে তৃতীয়বার পরীক্ষা দিতে হলো। প্রথমবার লঙ্কায়, রামের প্রত্যাখ্যানের পরে, দ্বিতীয়বার সন্তানসম্ভবা অবস্থায় শুধুমাত্র জনশ্রুতির ভয়ে, তৃতীয়বার এইবার রাজসভার মধ্যে রাজনন্দিনী রাজকুলবধূ সীতা পরীক্ষা দিতে এগিয়ে এলেন। গুরুজনদের ও স্বামীকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করবার পর তিনি বললেন : ‘যদি রাম ভিন্ন অন্য কাউকে মনেও চিন্তা না করে থাকি, যদি মনে কাজে কথায় রামকেই অভ্যর্থনা করে থাকি, এসব কথা যদি সত্য বলে থাকি, তাহলে দেবী ধরিত্রী আমাকে স্থান দিন’ (৭/৯৭/১৪,১৬)। একথা বলার পরই পৃথিবী দুভাগ হলো এবং দেবী বসুন্ধরা সিংহাসনে উপবিষ্ট অবস্থায় আবির্ভূত হয়ে সীতাকে কোলে নিয়ে অন্তর্হিত হলেন।

সীতা যে কথাগুলি বললেন তার মধ্যে কতগুলি কথা লক্ষ্য করা উচিত। যে শুচিতা প্রতিপাদন রাম চাইছিলেন সীতা তিনটি উক্তির দ্বারা তা সাধন করলেন। এ তাঁর শেষ সত্যক্রিয়া এবং তিনি যে প্রার্থনা করলেন শপথের সঙ্গে তা সফল হলো অর্থাৎ, তাঁর শুচিতা প্রমাণিত হলো এবং ধরিত্রী তাঁকে স্থান দিলেন। প্রাচীন পরিপ্রেক্ষিতে রামের চেয়ে জন্মস্বত্ত্বে সীতা অধিক গৌরবের অধিকারিণী; এক দেবীর কন্যা। অথচ রামায়ণে বারবার রাম সগৌরবে ইক্ষ্বাকু বংশের কথা বলেন, ধরিত্রীকন্যা সীতার কথা কোথাও উল্লেখ করেন না। আরো লক্ষ্য করার বিষয়, রাম বা তাঁর প্রজারা স্থূল ধরনের শুচিতার কথা বারবার বলেন অর্থাৎ, পরপুরুষের সংস্পর্শ। সীতার শপথ তার চেয়ে অনেক উঁচু স্তরের; মনে, কথায়, কাজে রাম ভিন্ন আর কাউকে স্থান দেননি, এই তাঁর শপথ। লঙ্কাতেও বলেছিলেন, ‘অবলা বলে দেহটাকে রাক্ষসের স্পর্শ থেকে রক্ষা করতে পারিনি, কিন্তু যে মনটা আকৈশোর তোমার উপর একনিষ্ঠ থেকেছে তার কোনো দাম দিলে না তুমি?’ আজও সেই কথাই বললেন, ‘মনেও যদি কখনো আর কাউকে ভেবে থাকি...। একথাগুলি দাম্পত্য প্রেমের অনেক উচ্চতর মানদণ্ড থেকে বলা, রাম ও প্রজারা শুধু দেহের শুচিতা নিয়েই উদ্বিগ্ন ছিলেন, সীতা যে অন্তরের শুচিতায় উজ্জ্বল, সেকথা এখানে প্রতিপন্ন হলো।

এখন অযোধ্যার প্রজাদের রাম বলতে পারতেন, ‘লঙ্কায় দেবতারা স্বয়ং অগ্নিশুদ্ধা সীতার শুচিতা প্রতিপাদন করে গেছেন, আমরা দুই ভাই তার সাক্ষী এবং আমরা মিথ্যাবাদী নই, তা তোমরা মানো’। দ্বিতীয়ত, পরের প্রজন্মের লোকেরা তো আবার কোনো কারণে সন্দিহান হয়ে বলতে পারত যে সীতা শুচিতার প্রমাণ দিন আবার ; এ তো বারেবারেই ঘটতে পারত। তৃতীয়ত, বাল্মীকির শপথের পরে রাম সমস্ত অযোধ্যাকেই বলতে পারতেন, এই তপস্বীর বাক্যই চূড়ান্ত প্রমাণ বহন করে যে সীতা নিষ্পাপ, সেটা বললে প্রজাসাধারণ নিশ্চয়ই আশ্বস্ত হতো, কিন্তু খুব সম্ভব রাম নিজের প্রজারঞ্জকতার প্রমাণ দিয়ে ধর্মভীরু রাজার খাতিরটা পাবার চেষ্টা করছিলেন। এটা পাবার উপায়, নির্দোষ সীতার প্রকাশ্য অসম্মানে। এবং বাল্মীকির কথাকেই চূড়ান্তভাবে প্রামাণ্য বলে না স্বীকার করা, বরং বাল্মীকিকেও এই বিরাট জনসমাবেশে অপমান করা।

এবার সীতা আর কিছুতেই রামের ফাঁদে পা দিলেন না। বললেন না যে, যদি শুচি হয়ে থাকি তো দেবতারা এসে সেকথা প্রমাণ করুন। বললেন, যদি কায়মনোবাক্যে একমাত্র রামকেই জীবনে জেনে থাকি, তাহলে দেবী বসুমতী স্থান দিন। মৃত্তিকার কন্যা মৃত্তিকাতে বিলীন হয়ে যেতে চাইলেন। চাইলেন না শুচি প্রতিপন্ন হয়ে আবার সিংহাসনে রামের পাশে মহিষী হয়ে বসে রাজপুত্রদের জননীর সম্মান পেতে। এটা শুধু অভিমানে নয়, আতঙ্কে এবং আত্মসম্মান রক্ষায় বলা কথা। আতঙ্ক, পুনর্বার এমন পরীক্ষা দেওয়ার সম্ভাবনার, সেটাকে প্রতিহত করলেন এবং নারী হিসেবে নিজের ধর্মনিষ্ঠতা প্রমাণ করে এবার মানুষ হিসেবে নিজের সম্মান রক্ষার জন্য পৃথিবী থেকে সরে যেতে চাইলেন। স্ত্রী হিসেবে তাঁর শুচিতা শেষবার প্রমাণিত হলো কিন্তু তার মানবিক মর্যাদার সম্মান রক্ষা করার জন্যে তো কেউ ছিল না। স্ত্রীকে সবরকম অসম্মান থেকে রক্ষা করা স্বামীর একান্ত কর্তব্য, রামায়ণে স্ত্রীকে চরমতম অসম্মানে ঠেলে দেওয়াই রামের ভূমিকা। তাই পরম অনীহা এবং জুগুপ্সায় তিনি জীবন সম্বন্ধে সম্পূর্ণ বীতশ্রদ্ধ হয়ে সরে গেলেন। লক্ষায় রাম বলেছিলেন, ‘তোমার শুচিতায় আমি সন্দিহান, তোমাকে ভোগ করতে পারি না।‘ এবার সীতা বিনা কথায় বললেন, ‘আমি শুচি, কিন্তু আমি তোমার ভোগ্যবস্তু নই আর। স্ত্রীর কর্তব্য যা তার অনেক বেশিই করেছি, কোনো মূল্য পাইনি তার, ইক্ষ্বাকু বংশই তোমার চিন্তাকে আচ্ছন্ন করে আছে, সেই বংশের দু'টি উত্তরাধিকারী দিয়ে গেলাম। ধর্ম-ক্রিয়ায় স্বর্ণসীতা দিয়েই কাজ চলবে। শুচিত্ব প্রমাণিত হলে আমাকে তোমার প্রয়োজন থাকবে, কিন্তু তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই! এই একবার সীতা সমস্ত নারী জাতির হয়ে আত্মসম্মান রক্ষা করলেন। এর পরে রাম আবার বিলাপ করলেন, বসুমতীকে কটু কথা বললেন সীতাকে প্রত্যর্পণ না করার জন্যে, কিন্তু সত্যিকারের শুচিতার যে একটা অলঙ্ঘনীয় তেজ আছে তা এবার তাঁকে ‘চড়া দাম’ দিয়ে বুঝতে হলো। বুঝতে হলো, নারীকে অকারণে সন্দেহ করলে এবং সে সন্দেহের ভিত্তিতে দণ্ড দিলে সে দণ্ড ফিরে এসে লাগে।

এরপর বেশ কিছুকাল রাজত্ব করার পরে ব্রহ্মা এসে রামকে জানালেন যে বিষ্ণুরূপে তাঁর স্বর্গে ফিরে যাবার সময় হয়েছে। তখন তিনি ধীরে ধীরে সরযূর জলে নেমে গেলেন এবং দেবতারা তাঁকে স্বর্গে নিয়ে গেলেন, সেখানে তিনি বিষ্ণু, সীতা লক্ষ্মী।

স্বভাবতই রাম উপাখ্যানে কতগুলো প্রশ্ন জাগে। প্রথমত, বালী বধ বিষয়ে। স্পষ্টতই ক্ষত্রিয় বীরের পক্ষে কাজটা গর্হিত, এক বানররাজাকে আড়ালে লুকিয়ে থেকে হত্যা করা, এটা কোনো নীতিতেই সমর্থন করা যায় না। উত্তরে যদি বলি, সীতাকে খুঁজে পাবার জন্যে সুগ্রীবের সাহায্য অত্যাবশ্যক ছিল, তাহলেও প্রশ্ন ওঠে যে এতে রামের বীরত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জাগে। সম্মুখ সমরে তাহলে বালীকে হারাবার শক্তি বা সে শক্তি সম্বন্ধে আত্মবিশ্বাস রামের ছিল না। এটা এক যশস্বী ক্ষত্রিয়বীরের পক্ষে গ্লানিকর। কাজটা কাপুরুষোচিত, সম্পূর্ণ স্বার্থ প্রণোদিত। এবং আরও কলঙ্ককর হলো, বালীকে নিজের প্রজা বলে শাসন করেছেন বলা, বানর মাংস অভক্ষ্য তবুও বালী হত্যাকে মৃগয়া বলা এবং আনুষঙ্গিক বিস্তর কুযুক্তির অবতারণা করা।

গুহকের আতিথ্য গ্রহণ না করার মধ্যেও বর্ণ-বৈষম্যের প্রশ্ন ওঠে। ফলাহারী ঋষিরাও অন্যের দেওয়া ফল খেতে পারেন, বনবাসকালে রাম বেশ কয়েকবার মুনিঋষির আতিথ্য নিয়েওছেন। গুহক চণ্ডাল, তাই তার কাছে শুধু পশুর খাদ্যই গ্রহণ করলেন।

অন্ধমুনি বৈশ্য, তাঁর স্ত্রী শূদ্রা (২/৫৭/৬৩)। তিনি নিজেকে ‘বানপ্রস্থী’ বলছেন কী করে? তাহলে শম্বুকের সাধনাও তো অশাস্ত্রীয় হয় না? এই শম্বুককে রাম বধ করেছেন এবং ব্রাহ্মণের অকাল মৃত পুত্রকে বাঁচাতে। তাহলে প্রাণের মূল্য রাম রাজত্বে বর্ণগতভাবে আপেক্ষিক, ব্রাহ্মণ-পুত্রের প্রাণ শূদ্রের প্রাণের চেয়ে দামি? এটা মেনে নেওয়া হয়েছে সমস্ত প্রক্ষিপ্ত অংশে। রামরাজ্যে চণ্ডালের সঙ্গে বন্ধুত্ব শুধু কথায়? যে ফল-জল ব্রাহ্মণদের কাছে নেওয়া যায় তা চণ্ডাল বন্ধুর কাছে নেওয়া যায় না? শুদ্র শম্বুক তপস্বী, কৃচ্ছ্রসাধনে রত কিন্তু সাধারণ এক ব্রাহ্মণ বালকের তুলনায় তার প্রাণের মূল্য কিছু নেই।

বালীকে বধ করা, শম্বুককে হত্যা করা ছাড়াও যেটি আমাদের বেশি ভাবায় তা হলো সীতা প্রত্যাখ্যান। সুন্দরকাণ্ডে সীতাহরণের পরে রামের যে বিলাপ তার ভাব সম্পূর্ণতই বিরহার্ত প্রেমিকের, কিন্তু সে কি শুধু আলঙ্কারিক বিরহ? শুধু সীতাসম্ভোগ-বঞ্চিতের বিলাপ? নতুবা দীর্ঘ অদর্শনের পরে রামের ‘হৃদয়ান্তর্গতভাব’ এমন হলো কেন যে সীতাকে দেখা মাত্রই তাঁর দুই চক্ষু পীড়িত বোধ করল এবং রাজনন্দিনী রাজকুলবধূ সীতাকে শিবিকা থেকে নেমে হেঁটে আসবার হুকুম দিলেন, সীতা আসামাত্রই বললেন, ‘গচ্ছ বৈদেহি’ তোমার জন্য যুদ্ধ করিনি, করেছি ইক্ষ্বাকু বংশের গৌরব রক্ষার জন্য? কোথায় ছিল সে ইক্ষ্বাকু কুলের গর্ব যখন লঙ্কায় প্রকাশ্য সভায় অপ্রমাণিত, অসত্য আশঙ্কায় রাজকুলবধূকে কটু কথা বলেছিলেন? কোথায় ছিল সে কুলগর্ব যখন দেবতাদের সাক্ষ্য, ঋষি বাল্মীকির শপথ সব অগ্রাহ্য করে পুত্রদের, প্রজাদের, অতিথিদের সামনে ইক্ষ্বাকু কুলবধূ সীতাকে আবার অগ্নি-পরীক্ষা দিতে বললেন? কোথায় রইল সে গর্ব যখন দেবী বসুমতী বারংবার সন্দেহে পীড়িত, লাঞ্ছিত, অপমানিত কন্যাকে কোলে নিয়ে অন্তর্ধান করলেন? কে অপরাধী প্রমাণিত হলো? অকারণ সন্দেহ এবং তার বশে দণ্ডদানের অপরাধে কলঙ্কিত হলেন না, ইক্ষ্বাকু-কুলতিলক রামচন্দ্র? সীতা লক্ষ্মণকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছিলেন, ‘রামকে বোলো, আমাকে চিরদিনই সম্পূর্ণ নির্দোষ জেনে, রামের হিতব্রতিণী জেনে, শুধু লোকাপবাদের আতঙ্কে ভয় পেয়ে ত্যাগ করলেন তিনি।’ এতে কি ইক্ষ্বাকু কুলের গৌরব বাড়ল? গৌরব বাড়ল অন্যায় দণ্ডদাতা রাজার? এ-ই রাম রাজ্যের নমুনা?

‘রামকিয়েন’-এ ‘হিকায়েং সেরি রাম’ (zeis 2627) এবং ‘কম্বন’ রামায়ণে (২/১, ৫) বলা হয়েছে, মন্থরা রামের প্রতি প্রতিকূল ছিল। অর্থাৎ কৈকেয়ী নিজের থেকে রামের বনবাস চাননি। কৈকেয়ীকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলেও দশরথের অন্যায় খণ্ডিত হয় না কিন্তু কৈকেয়ীকে দেওয়া বর দুটির গুরুত্ব কমে যায়। কিন্তু এইসব ও অন্যান্য সংস্করণেও রামের তিনটি প্রধান অন্যায়, বালীকে বধ করা, শম্বুককে বধ করা ও সীতা-পরিত্যাগ এগুলো প্রায় সর্বত্রই আছে। বাল্মীকির তৃতীয় অধ্যায়ে রামায়ণের যে চুম্বকটি দেওয়া আছে তাতে লঙ্কায় রামের সীতা পরিত্যাগ ও অগ্নিপ্রবেশ নেই, কিন্তু অযোধ্য সীতা-বিসর্জন আছে (৩/১/৩৮)। বাল্মীকি লব- কুশকে যে রামায়ণ গাইতে শিখিয়ে-ছিলেন তাতে রাবণবধ পর্যন্তই ছিল (পৌলস্ত্য-বর্ধমিত্যেবম্) অর্থাৎ, ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা ঋষিও পুত্রদের শেখাননি তাদের গর্ভধারিণীর প্রকাশ্য অসম্মানের কাহিনি, কারণ তখনো সেটা ঘটেনি।

মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সব মহাকাব্যই যুদ্ধবিজয় শেষ হয় (তুলনীয় মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি, এল সিড্‌, কালেভ্লা, নীবেলুঙ্গেন লীড্ ইত্যাদি)। একসময়ে রামায়ণও রাবণ বধ পর্যন্তই ছিল। ‘ভাস’-এ বালকাণ্ড এবং উত্তরকাণ্ডের উল্লেখ নেই। লক্ষণীয় ষষ্ঠ শতকে, বাল্মীকি রামায়ণে শেষতম সংযোজনের অনেক পরে ভট্টি তাঁর মহাকাব্য লিখছেন, 'রাবণবধম্' নাম দিয়ে। যদিও তাতে অগ্নিপরীক্ষা আছে কিন্তু কালিদাসের ‘রঘুবংশ’-এ লঙ্কায় সীতার প্রত্যাখ্যান নেই, যদিও একটি মাত্র দ্ব্যর্থক শব্দে সীতার অগ্নিশুদ্ধির ইঙ্গিত আছে (জাতবেদো-বিশুদ্ধাম্। রঘুবংশ ১২/১০৪; এর অর্থ, অগ্নি দ্বারা পরিশুদ্ধও হতে পারে, আবার অগ্নির মতো বিশুদ্ধাও হতে পারে)। কিন্তু সেখানেও চতুর্দশ সর্গে সীতা এই উপমিত রূপক সমাসের অবকাশ রাখলেন না, লক্ষ্মণকে দিয়ে রামকে বলে পাঠালেন, ‘চোখের সামনে আমাকে অগ্নি দ্বারা শুদ্ধ দেখেও’ (বহ্নৌ বিশুদ্ধামপি যৎ সমক্ষম্ ১৪/৬৯) অর্থাৎ, রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডের অগ্নিপরীক্ষার বিবরণ কালিদাসের অরুচিকর ঠেকেছিল তাই তার বর্ণনা করেননি। কিন্তু সীতার আত্মসম্মান রক্ষার জন্য সে ঘটনাটির তীক্ষ্ণ এই উল্লেখের দ্বারা সীতার প্রতি তাঁর সমস্ত সহানুভূতি জানিয়েছেন।

রামের চরিত্রের যে-সব অসঙ্গতি চোখে পড়ে তার কারণ কী? ক্ষত্রিয়কুলোচিত বীরত্বের আদর্শে দীক্ষিত ও শিক্ষিত রাম মানবিক নৈতিক আদর্শের মর্যাদা রক্ষার জন্য, পিতৃসত্য রক্ষার জন্য অকুণ্ঠ চিত্তে বনে গেলেন সিংহাসনের আশা ত্যাগ করে। তার আগে ঋষিদের তপোবিঘ্ন নিবারণ করবার জন্যে, এবং বনবাসকালেও সেই কারণেই বীরের মত বহু রাক্ষস তিনি বধ করেন, পিতৃবন্ধু জটায়ুর প্রতি যথাকর্তব্যে শেষকৃত্য সমাধা করেন তিনি, এই মানুষ পরপর তিনটি গর্হিত অন্যায় আচরণ (বালীবধ, সীতা পরিত্যাগ ও শম্বুক ব) করলেন কেন?

রাম ‘একপত্নীক’, তাঁর অন্য স্ত্রীদের উল্লেখ আছে কিন্তু তাঁর জীবনে তাদের কোনো স্থান ছিল না। তবে একপত্নীক হওয়া সত্ত্বেও, সীতার প্রতি তাঁর যথেষ্ট আসক্তি থাকা সত্ত্বেও, সীতাহরণের পর সাময়িক উন্মাদনা হওয়া সত্ত্বেও সীতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মুখ্যত সম্ভোগের, সে কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। সম্পর্কটা প্রধানত কামনার বলে মেনে নিলে সীতা তাঁর ভোগ্যবস্তু হয়ে ওঠেন, ‘তাই প্রত্যাখ্যানের সময়ে বলতে পারেন তোমাকে আর পরিভোগ (সর্বপ্রকারে ভোগ) করতে পারব না।’ সীতার জন্যে রামকে কখনো কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি, হলে তাঁর প্রেমের পরীক্ষা হতো। শূর্পণখা প্রলোভন ছিল না, কিন্তু রামের সঙ্গে পুনর্মিলন অসম্ভব জেনেও রাবণকে বিমুখ করা ছিল সীতার দিক থেকে সত্যকার প্রলোভন জয় করা। সেই অপহরণের সময়ে রাবণের প্রতি তাঁর কটুক্তি-পরম্পরা এবং লঙ্কায় রাবণের শৌর্য যশ সমৃদ্ধি এবং তাঁর আগ্রহাতিশয্য এই সবই সীতা অনায়াসে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাঁকে কেটে ফেলা হবে জেনেও। আসন্ন মৃত্যুর সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে এ ত্যাগ স্বীকার মাসান্তে তাঁর গভীর প্রেমের পরিচায়ক। রাম যে যুদ্ধ করেছিলেন তা সীতার জন্য নয়, ইক্ষ্বাকু কুলের মর্যাদা রক্ষার জন্যে একথা তিনি নিজেই উচ্চারণ করে বলেছেন। সীতা যে ত্যাগ স্বীকার ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন তা কেবলমাত্র রামেরই জন্যে। প্রত্যাখ্যান করবার আগেই বাল্মীকি বলেছেন, রাম তাঁর ‘মনোগতভাব’ প্রকাশ করেছেন : কাজেই পরে তিনি বলেছেন যে, ‘আমি জানতাম সীতা নিষ্পাপ’ কিন্তু জনসাধারণের প্রত্যয়ের জন্যে বলেছি এইসব কথা, এটা সত্য নয়। দুটি কারণে, প্রথমত, তিনি সেকথা উচ্চারণ করে বলতে পারতেন যে, ‘আমার সন্দেহ নেই, লোকের সন্দেহ মোচনের জন্য তুমি অগ্নিতে প্রবেশ কর।’ দ্বিতীয়ত, এই প্রসঙ্গে আরো অনেক কথা বলছেন যা নিজের সন্দেহ না থাকলে নিরর্থক হয়ে পড়ে। যেমন চক্ষুপীড়াগ্রস্তের পক্ষে প্রদীপ যেমন পীড়াদায়ক, আমার দৃষ্টিতে তুমিও তাই।' কিংবা ‘কুকুরে চাটা ঘি-এর মতো তুমি অভোগ্যা’ অথবা লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, বিভীষণ, সুগ্রীব যাকে ইচ্ছা পতিত্বে বরণ করো। এইসব কথাই রামের নিজস্ব সন্দেহ বা এই প্রত্যয়ই প্রকাশ করে যে সীতা পাপিষ্ঠা। না হলে সীতার হরণের পর উন্মত্তবৎ আচরণ করেন যিনি, দীর্ঘ এক বৎসর অদর্শনের পরে প্রথম দর্শনেই তিনি বলেন, ‘তুমি যাও, তোমাকে আমার কোনো প্রয়োজন নেই?’

সীতাকে বহু বৎসর ঘনিষ্ঠভাবে জানার পর, হনুমানের কাছে তাঁর প্রলোভন জয় করার এবং বিরহক্লিষ্ট অবস্থার বর্ণনা শোনবার পর, নিঃসন্দিগ্ধ অভিজ্ঞান ও নিবিড় দাম্পত্য জীবনের প্রামাণ্য উপাখ্যান শোনবার পরে, সীতাকে দীনবেশে দেখে, রাম-দর্শনে উৎফুল্ল তাঁর মুখ দেখবার পরেও রামের মনে এ সন্দেহ জাগল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর সবটা রামচরিত্রের মধ্যে পাওয়া যাবে না। সেই যুগটাকেও দেখতে হবে। রামায়ণ রচনার কাল নির্ণয়ে দেখেছি মূলগ্রন্থ (আদিকাণ্ডের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে লঙ্কাকাণ্ড পর্যন্ত) মোটামুটি কুষাণ সাম্রাজ্যের সমাকালীন : খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের মধ্যে। এই সময়ে ভারতবর্ষের সমাজ, দর্শন ও চিন্তাধারার আমুল পরিবর্তন ঘটে। এর কিছু আগে থেকেই বারবার বিদেশি আক্রমণকারীরা আসেন ও ধীরে ধীরে তাঁদের মত, বিশ্বাস, আচার, অনুষ্ঠান, সামাজিক বিধি ইত্যাদি নিয়ে তাঁরা ভারতীয় জনসাধারণের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হন। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত ক্রমাগত যবন, শক, পারদ, পহ্লব, কুষাণ, মুরুণ্ড, হুন ইত্যাদি আক্রমণগুলি ঘটে এবং এর দ্বারা ভারতবর্ষের সামাজিক ও মননগত জগতে যে বিরাট ও স্থায়ী পরিবর্তন আসে তার সবচেয়ে স্পষ্ট চিহ্ন আছে রামায়ণ মহাভারতের ভার্গব প্রক্ষেপে।

এই কালসীমার মধ্যেই রচিত বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ যেখানে দু'বার নারী সম্বন্ধে স্পষ্ট করে উচ্চারিত হয়েছে যে সে ‘পণ্যদ্রব্য’ (তস্যাঃপণ্যসধর্মত্বাৎ ২/১/১৩, ৪/১/১)। এই কালসীমার মধ্যে রচিত ভাগবদ্গীতা, যেখানে বর্ণসঙ্করের পুরো দায়িত্ব নারীকে দেওয়া হয়েছে (স্ত্রীষু দুষ্টাসু বার্ষ্ণেয় জায়তে বর্ণসঙ্কর: ১/৪০)। অথচ ভেবে দেখলে বোঝা যায় পুরুষের ভূমিকা সমান সক্রিয় না হলে বর্ণসঙ্কর হওয়া অসম্ভব। অর্থাৎ, বিদেশিদের সঙ্গে বৈবাহিক বা বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক সম্বন্ধে সমাজের আতঙ্ক তখন অত্যন্ত তীব্র। মহাভারতের ভার্গব সংযোজনে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন, ‘নারীর চেয়ে পাপিষ্ঠ আর কেউ নেই’ (১৩/৪০/৪)। এই মর্মে বিস্তর কথা তৎকালের সাহিত্যে পাওয়া যায়। ‘মনুসংহিতা’ আর একটি ভার্গব রচনা, গোবিন্দরাজের টীকায় দেখি ভৃগুর কোনো শিষ্য ইতস্তত-বিক্ষিপ্ত উপাদান সংগ্রহ করে মনুসংহিতা রচনা করেন। ব্যুহলার বলেন, 'ভৃগুর মনুসংহিতা হলো বহু ছন্দোবদ্ধ মনুসংহিতার শেষতম অংশ।' (সেক্রেড বুক্‌স অব দি ইস্ট গ্রন্থরাজিতে মনুসংহিতার ভূমিকা, পৃ. ৯৭)। মনুতে নারীর উপনয়ন নেই, আছে বিবাহ, বেদপাঠ হলো পতিসেবা এবং পতিকুলে বাস হলো ব্রহ্মচর্য (২/৬৭)। অর্থাৎ, সমাজের নারীর অবনমনের এটি একটি দলিল।

তাহলে এই সেই যুগ, যখন নারী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বঞ্চিত, স্বাধীন বৃত্তির অধিকারও তাঁর নেই, পণ্য-দ্রব্য রূপে পরিগণিত, একা তারই দোষে বর্ণসংকর হয়, এবং তার চেয়ে পাপিষ্ঠ কেউই নেই। বিদেশী আক্রমণের ফলে আরো প্রবল হলো বর্ণসংকরের আতঙ্ক। বার্ডোসানেস নামে এক সিরিয় গ্রন্থকার রচনা করেন ‘বুক্ অব্ দ্য লস্ অব্ দ্য কান্ট্রিস্’ ১৪০ খ্রিস্টাব্দে। তাতে তিনি লিখেছেন কুষানেরা নিজেদের স্ত্রীদের রক্ষিতার মতো দেখত, তাদের কাছে কোনো যৌন আনুগত্য প্রত্যাশা করত না। তাহলে হয়তো আক্রমণ-পরম্পরার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জাতির দাম্পত্য সম্পর্কের শিথিলতার প্রভাবে আর্যাবর্তের সমাজ জীবনে কিছু শৈথিল্য দেখা দিয়ে থাকবে, যে-আতঙ্কে নারীজাতিকে মোটামুটি অন্তঃপুরে বন্দিত্বের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে, তাকে সন্দেহ করা অত্যন্ত ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়। এই সন্দেহ প্রথমবার করেন রাম যখন বিরাধ রাক্ষস সীতাকে স্পর্শ করে, তখন। সীতাকে পরে সন্দেহ করেন রাম মূল গ্রন্থাংশে (লঙ্কাকাণ্ডে), পরে করে অযোধ্যার প্রজারা, প্রক্ষিপ্ত অংশে উত্তরকাণ্ডে। ‘যুদ্ধকাণ্ডের শেষাংশ রামায়ণ রচনার দ্বিতীয় পর্যায়ে, তখন ক্ষত্রিয় বীর আর শুধু শৌর্যে মহীয়ান্ নন, তাঁর আচরণের মানদণ্ডও মহাকাব্যের কেন্দ্রে দেখা দেয়। প্রথম অংশে রাম নিশ্চিতই মানব... ন্যায়বিধির ধারক ও বাহক। দ্বিতীয় পর্যায়ের রচনায় শৌর্যের চেয়ে নান্দনিক অংশের দিকে একটা ঝোঁক দেখা যায়, যেটা শৈলীর মধ্যে দিয়ে বৃহত্তর একটা প্রসারের দিকে সরে এসেছে।” (জে. এল. ব্রকিংটন: দ্য রাইটিয়স্ রাম', অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৪, পৃ. ৩২৩-৩২৪, ৩১৯)। এই যে রাম ক্ষত্রিয় শৌর্যের আদর্শ থেকে আদর্শ রাজা হওয়ার চেষ্টা করলেন এতে তাঁর ওপরে দায়িত্ব এল আদর্শ রাজা হবার নিরিখ অক্ষুণ্ণ রাখার। এই আদর্শ রাজার সম্বন্ধে মহাভারত, মনু ও সমকালীন ধর্মশাস্ত্র এবং শিলালিপিতে কতগুলি মানদণ্ড পাওয়া যায়। প্রথমত মৌর্যযুগ থেকেই এবং বিশেষত কুষাণ যুগে, রাজা দেবতা হয়ে ওঠেন। ‘কুষাণ সাম্রাজ্যের অবসংগঠনে ছিল রাজ-কর্মচারী সৈন্যদল এবং সামন্ত শক্তি, আর শীর্ষভাগে ছিল এক পূর্ণ নিরঙ্কুশ বা প্রায়-নিরঙ্কুশ একক সৈন্য শাসিত সাম্রাজ্য” (ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ‘রাইজ অ্যান্ড ফল্ অব্ কুষাণ এম্পায়ার’, ফার্মা কে. এল. মুখোপাধ্যায়, ১৯৮৮, পৃ. ৪৪৮)। কুষাণ আমলেই প্রথম রাজকীয় মুদ্রার প্রচলন হয় ; বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসারের ফলে ও দেশে কৃষি শিল্প বাণিজ্যের বিস্তারের ফলে সমৃদ্ধির বৃদ্ধি ও বিকাশ হয় এবং সে সমৃদ্ধির রক্ষাকর্তা হিসেবে রাজার দায়িত্ব বাড়ে। সমৃদ্ধিমান ও সমৃদ্ধিহীন মোটামুটি এই দুই অংশে ভাগ হয়ে যায় প্রজা। যেমন খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়, তৃতীয় শতকের জৈন প্রাকৃত গ্রন্থ 'অঙ্গ-বিজ্জা' বলে বর্ণ দুটিই, অজ্ঞ ও পেস্‌স' (বা মিলক্ষু অর্থাৎ ম্লেচ্ছ, নিম্নতম বর্গের মানুষ) আর্য অর্থাৎ ধনী ও পেস্‌স প্রেষ্য অর্থাৎ, দাস অর্থাৎ নির্ধন (পুণ্য বিজয়জীর সংস্করণ ৫৪তম অধ্যায়, পৃ. ২১৮)। এর মধ্যে ধনিক শ্রেণীর ধড় যেন নিরাপদ থাকে, অজ্জ যেন পেস্‌সকে বশীভূত রাখতে পারে সেটার দায়িত্ব বর্তায় রাজার উপরেই। কাজেই মহাভারত এবং তৎকালীন অন্যান্য গ্রন্থে রাজাকে দেবত্বে উন্নীত করা হয়েছে (মহাভারত ১২/৬৫/ ২৮, ২৯, ৩২, ৩৩, ৪০। মনু সংহিতা ৮/৫, ১৪)। 'অজ্জ' হলো ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্যের মধ্যে ধনী সম্প্রদায়, আর প্রেস্‌স হল তাবৎ নির্ধন ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং প্রধানত শূদ্র।



পরবর্তী পর্ব আগামীকাল প্রকাশিত হবে 


প্রকাশের তারিখ: ০২-ডিসেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org