|
বাল্মীকির রাম, ফিরে দেখা - ৩সুকুমারী ভট্টাচার্য |
এ আতঙ্ক ওই কলির আতঙ্ক, যে কলির প্রধান ভয় নারী ও যথাক্রমে স্বামী এবং উচ্চবর্ণের প্রভুকে লঙ্ঘন করবে। বিদেশি আক্রমণে অরক্ষিত নারীর পরহস্তগতা হওয়ার একটা রূপক চিত্র রাবণের সীতাহরণ। এইসব অপহৃতা নারীদের সমাজ ফিরে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখেনি। |
শূদ্রের কাজ উচ্চ তিন বর্ণের সেবা। শাস্ত্র শূদ্রকে ধন সঞ্চয়ে অধিকার দেয়নি; সে যদি সঞ্চয় করেও, তবুও সে ধন ব্রাহ্মণ যজ্ঞের জন্যে আত্মসাৎ করতে পারে। শূদ্রনারীকে উচ্চ তিন বর্ণের পুরুষ যথেচ্ছ ভোগ করতে পারে। শাস্ত্র নানাভাবে তাকে স্বীকার করিয়ে অসম্মানের মধ্যে রাখতে চেয়েছে। কিছু বৈশ্য ক্রমেই বাণিজ্যের দিকে চলে যাওয়ার ফলে কৃষি ও পশুপালন ক্রমেই শূদ্রেরই করণীয় হলো এবং কখনো কখনো সে ব্যক্তিগত কিছু ধন অর্জন করতে পারত। মনু ‘আত্মোপজীবী' অর্থাৎ, স্বনির্ভর শূদ্রের কথা বলেছেন, (৭/১৩৮) বলেছেন ‘ন্যায়বর্তী’ শূদ্রের কথা। টীকাকার মেধাতিথি বলেছেন, ‘ন্যায়বতী শূদ্র পাক-যজ্ঞ সম্পাদন করতে পারেন’। যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা পঞ্চ-মহাযজ্ঞেও শূদ্রের অধিকার স্বীকার করেছেন (১/১২১, মনু ৩/১৫৬)। বৃহস্পতি বলেছেন, শূদ্র উচ্চবর্ণের খেতে-খামারে বেগার খাটার পরিবর্তে কাঞ্চন মূল্য দিতে পারে (১২/১৬), আর শূদ্র বণিকের পক্ষে রাজস্বের হার সর্বাধিক। তাহলে কিছু কিছু শূদ্র আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং সমৃদ্ধিমান্ এবং ধর্মের ক্ষেত্রে অনেকটা উন্নতমানের অবস্থান লাভ করেছিলেন। অর্থাৎ, কিছু শূদ্র ধীরে ধীরে অজ্জ বর্ণের কাছে আশঙ্কা এবং আতঙ্কের হেতু হয়ে উঠেছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে রামায়ণের শম্বুকের তপশ্চর্যা সম্বন্ধে অসহিষ্ণুতা বোঝা যায়। গীতায় কৃষ্ণ বলেন—শূদ্র, নারী, বৈশ্য এরা পাপযোনি, কিন্তু কৃষ্ণরে অবলম্বন করলে এরা ‘পরাগতি’ প্রাপ্ত হয় (৯/৩২)। তাই যদি হবে তাহলে সশরীরে স্বর্গে যাবার জন্য তপস্যা এত অসহ্য হবে কেন? মনে রাখতে হবে শম্বুক নিধনের পরে দেবতারা রামের উপরে পুষ্পবৃষ্টি করে বলেন—'তোমার জন্যে এই শূদ্র স্বর্গভাক্ হতে পারল না।' অর্থাৎ, মৃত্যু না হলে শম্বুক স্বর্গে যেত, রাম সেটা নিবারণ করলেন। কিছু কিছু শূদ্রকে সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখবার প্রয়োজন হচ্ছিল। অতএব পরবর্তীকালে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে ‘মায়াতি’ ‘সচ্ছৃদ্র' জাতিকে বলি দেবার বিধান যে কারণে, সেই কারণেই এই যুগেই শূদ্রকে সর্বতোভাবে অবদমিত করে রাখার দায়িত্ব ছিল রাজার। যে শূদ্র দাস, পরিচারক, সে যদি ধনে বা ধর্মে কিছু স্বাতন্ত্র্য অর্জন করে তাহলে 'অজব্বন্ন' হতে পারে।
ব্যাকট্রিয়ান, গ্রিক, রোমান, চীনে হান রাজারা, শক কুষাণ রাজারা, ইউয়েহ্, চিহ্ ও পারসিক রাজারা এই কালসীমার মধ্যেই দেবায়িত হচ্ছেন। ভারতবর্ষে রাজার দেবায়নের সঙ্গে যে-সব দায়িত্ব আসছে তার মধ্যে প্রধান একটি হলো বর্ণ-ধর্মরক্ষা। নাসিক শিলালিপিতে (খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে) রাজা নহপানের জামাই ঊষভদাত ব্রাহ্মণ-কন্যার বিবাহে ধন দান করেছেন। দ্বিতীয় সাতকর্ণীর নানা ঘাটলিপিতে পড়ি, তিনি চারটি বর্ণের মধ্যে সঙ্কর নিবর্তন করেছেন (বিনিবতিতচাতুর্বর্ণসঙ্কর)। মহাভারতে প্রথম যে রাজার উপাখ্যান পাই, তিনি 'বেন'র পুত্র ‘পৃথু’। তিনি প্রথমেই প্রতিজ্ঞা করেন, 'বর্ণসংকর' থেকে দেশকে রক্ষা করবেন (১২/৫৯/১১৪-১৫)। বর্ণসংকরে এত ভয় কেন? কারণ চারটি। ঐতিহাসিকভাবে ভাবে চারশো বছরের বেশি কালসীমার মধ্যে পাঁচ ছ'টি বিদেশি আক্রমণ ঘটে এবং অনিবার্যভাবে বর্ণসংকরের বিস্তার ঘটে, যার দ্বারা ধীরে ধীরে বৈদেশিকরা সমাজ জীবনে অনুপ্রবিষ্ট হয়। প্রথমে শূদ্র রূপে ও পরে বিজেতা বলে ক্ষত্রিয় রূপে। দ্বিতীয়ত, বর্ণসংকর ঘটলে ওই চতুবর্ণের পরিচ্ছন্ন একটা ছক, শাস্ত্রে ও সমাজে যা চলে আসছিল, সেটা এলোমেলো হয়ে যায়, সমাজপতিদের মিশ্রবর্ণ সম্বন্ধে নতুন আইন তৈরি করতে হয়, ক্রমে ক্রমে তা করতে বাধ্যও হয়েছিলেন তাঁরা। তৃতীয়ত, বৃত্তিভেদ অনুসারে বর্ণ ক্রমেই বহু বিভিন্ন ভাগ হয়ে গিয়েছিল এবং যাচ্ছিল। তার ওপরে বিদেশি জাতির সঙ্গে মিলনে আরো বহুধা বিভক্ত সমাজের ছক নির্মাণ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। চতুর্থত, বিদেশিদের প্রথমে শূদ্র বললেও যেহেতু তাঁরা বিজেতা এবং শক্তিমান, তাই ধীরে ধীরে তাঁরা ক্ষত্রিয়ত্বে উন্নীত হলেন। এই যে উচ্চতর বর্ণে অধিরোহণ, এটা শাস্ত্রকারদের অগ্রাহ্য মনে হয়েছিল। (লক্ষণীয় মহাভারত ৭/১৫৮/২০) এর পশ্চাতে ছিল কলিযুগ সম্বন্ধে আতঙ্ক, কারণ সব শাস্ত্রে কলিযুগের একটা প্রধান লক্ষণই হলো বর্ণসংকর এবং কলিতে শূদ্র নিজের হীনত্ব মেনে নেবে না ; সে যে শুধু উচ্চবর্ণের বৃত্তি অবলম্বন করবে তাই নয়, উচ্চবর্ণ সম্বন্ধে শ্রদ্ধাপোষণও করবে না। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের শেষেই এই আতঙ্কের প্রকাশ দেখি ‘যুগপুরাণে’(শ্লোক ৫০, ৫৩, ৫৪)।
আর আতঙ্ক ছিল নারীদের নিয়ে। শাস্ত্র একবাক্যে উচ্চস্বরে বলছে, কলিকালে নারী পতিব্রতা থাকবে না, পুরুষের বশে থাকবে না, স্বয়ম্ভর এবং স্বাতন্ত্র্য্যপরায়ণ হয়ে উঠবে (দ্রষ্টব্য যুগপুরাণ শ্লোক ৮৩-৮৬ ; মহাভারত ৩/১৮৮/৭৭)। নারী কৃষিকাজ পর্যন্ত করবে (যুগপুরাণ শ্লোক ৮৩); অর্থাৎ, আর্থিকভাবেও আর সে পুরুষ-নির্ভর থাকবে না। সহজেই বোঝা যায়, কোনো কোনো অঞ্চলে স্বয়ং-সম্পূর্ণা বিদেশিনীরা স্বামীর বশ্যতা স্বীকার করত না এবং আর্থিকভাবেও কতকটা স্বনির্ভর ছিল এবং এর দ্বারা কিছু নারী প্রভাবিত হয়েছিলেন। মহাভারতের বনপর্বে (ভার্গব সংযোজনের অংশ) সত্যভামার প্রশ্নের উত্তর দ্রৌপদী নিজেকে যেমন পাঁচ স্বামীর ভূমিকায় চিত্রিত করেন ও বলেন—স্বামীদের ক্রুদ্ধ সর্পজ্ঞানে সেবা করি। মহাভারতে অন্যত্র দ্রৌপদী চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন, সে স্বনির্ভর এবং তার স্বামীরা বহুভাবে তাঁর ওপরে নির্ভরশীল। বলা বাহুল্য ওই উপমার মনোভাব স্বামী-স্ত্রী কারোর পক্ষেই সম্মানের নয়, কিন্তু ভার্গব সংযোজনে নারীর জন্যে এই স্থানই নির্ধারিত হলো। নারীর বিন্দুমাত্র স্বাধীনতা তখন মেনে নেওয়া হচ্ছে না, সে পর-পুরুষের সকল রকম সাহচর্য সর্বতোভাবে বর্জন করবে। কেন? পূর্বে যে ঐশ্বর্যবৃদ্ধির কথা বলেছি, সেই ঐশ্বর্য সঞ্চিত হচ্ছিল সমাজের উপরের স্তরে মুষ্টিমেয় একটা শ্রেণির হাতে। তাঁরা সে সম্পত্তি নিজেদের ছেলেদের ও তার দ্বারা নিজেদের বংশ সংরক্ষণ করবার জন্য উৎকণ্ঠিত ছিলেন। সম্পত্তিমান্ ব্যক্তি কী করে নিশ্চিত হবেন যে, মৃত্যুর পর তাঁর যে ছেলে বা ছেলেরা সম্পত্তি পাবে তারা নিঃসংশয়ে তাঁরই ঔরসজাত ছেলে? তাঁর স্ত্রীর যদি স্বাধীনতা থাকে, অন্য পুরুষের সংস্পর্শে আসবার তাহলে এ নিশ্চিতি ধ্রুব হতে পারে না। কাজেই নারীর সবরকম স্বাধীনতা হরণ করা হলো, বার বার নানা শাস্ত্রে বলা হলো, কৈশোরে তার রক্ষক পিতা, যৌবনে স্বামী এবং বার্ধক্যে পুত্ররা, নারী স্বাধীনতার যোগ্যই নয়। বন্ধন এত দৃঢ় হলো যে পর-পুরুষকে স্পর্শ করা বা তার সান্নিধ্যে আসা নিতান্ত গর্হিত বলে গণ্য হলো। স্বামীকে অন্য নারী স্পর্শ করলে স্ত্রীর কোনো অধিকার নেই সে জন্যে স্বামীর কাছে জবাবদিহি চাওয়া। কেমন করেই বা চাইবে? বহুবিবাহ, বহু উপপত্নী গ্রহণ ও গণিকাগমনে যার অধিকার, সে পুরুষ ওই অর্থে তো একনিষ্ঠ নয়ই। ‘সতী' শব্দের সমার্থক কোনো পুংলিঙ্গ শব্দই তাই নেই। কিন্তু নারী যে বংশধর গর্ভে ধারণ করে সে যে একান্তভাবে স্বামীরই, সে আশ্বাস পেতে গেলে নারীকে কঠোরভাবে অন্তঃপুরচারিণী হতে হবে, যাতে পর-পুরুষের সংস্রবের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা না থাকে। তাই বিরাধ রাক্ষস যখন সীতাকে তুলে নেয় তখন রাম বিচলিত হন।
নরমাংস-ভোজী রাক্ষসের হাতে স্ত্রী পড়েছে বলে নয়, পর-পুরুষ তাকে স্পর্শ করেছে বলে। ওই একই কারণে, রাবণ স্পর্শ করে সীতাকে বিমানে তুলেছিল চিন্তা রামকে এত গভীর অস্বস্তিতে ফেলে যে কোনোমতেই তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না যে সীতা আপন শুচিতা রক্ষা করেছেন। রাম তো বলেই ফেলেন, তোমার মতো সুন্দরী নারী পেয়ে রাবণ নিশ্চয়ই দীর্ঘকাল বিলম্ব করেনি তোমাকে ভোগ করতে। তাই পরহস্তগতা নারীকে আমি ভোগ করতে পারিনে। অর্থাৎ, নিশ্চিত হতে পারব না যে তোমার সন্তান হবে সে রাবণের না আমার; সে ইক্ষ্বাকু কুলের সম্পত্তি, সম্পত্তির আইনসিদ্ধ উত্তরাধিকারী কিনা। সব আসামীকেই আত্মপক্ষ সমর্থনের একটা সুযোগ দেওয়া হয়। আদর্শ রাজা রামের বিচার পদ্ধতি অন্যরকম, সেখানে আসামী প্রতিপন্ন হয়েছে সমাজের চাপে। প্রায় কাজীর বিচার। এখানেও, শম্বুকের ক্ষেত্রেও। এ আতঙ্ক ওই কলির আতঙ্ক, যে কলির প্রধান ভয় নারী ও যথাক্রমে স্বামী এবং উচ্চবর্ণের প্রভুকে লঙ্ঘন করবে। বিদেশি আক্রমণে অরক্ষিত নারীর পরহস্তগতা হওয়ার একটা রূপক চিত্র রাবণের সীতাহরণ। এইসব অপহৃতা নারীদের সমাজ ফিরে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখেনি। অথচ মহাভারতে বৃহস্পতির স্ত্রী তারা চন্দ্রের সহবাসে দীর্ঘদিন থেকে চন্দ্রের পুত্র বুধকে জন্ম দিয়ে এবং সে কথা নিজমুখে স্বীকার করবার পরও বৃহস্পতি তারাকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। গৌতমও অহল্যাকে ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। যেমন গ্রিক পুরাণে দেখি অপহৃতা স্ত্রী হেলেনকে মেনেলাওস্ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। ধর্মশাস্ত্রেও বলা আছে পর-পুরুষের দ্বারা অপহৃতা ও ভুক্তা নারীকে স্বামী মাসান্তে শুচি জ্ঞান করবে এবং স্বগৃহে তার সঙ্গে বাস করবে। তবে? তবে ইক্ষ্বাকু কুলের বংশমর্যাদা এমনই সুউচ্চ, যে সন্দেহের ছায়ামাত্র স্পর্শ করলেই তা ম্লান হয়ে যায়? অগ্নিসাক্ষী করে গ্রহণ করা স্ত্রীকে নিছক সন্দেহবশে বিসর্জন দিলে কিন্তু সে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না, ইক্ষ্বাকুকুলের বংশধরদের গর্ভে ধারণ করে আছেন যে নিষ্পাপ নারী তাঁকেও নিষ্করুণ ছলনা করে নির্বাসন দিলে কোনো গ্লানি স্পর্শ করে না বংশগৌরবকে। সহস্র-বর্ষতপস্বী যখন নিজের সমস্ত তপস্যার পুণ্যফল গচ্ছিত রেখে আজন্ম দেহে-মনে-বাক্যে সত্যাচরণের পুরস্কার থেকে স্বেচ্ছাবঞ্চিত হতে প্রস্তুত হয়ে শপথ করেন, সীতা নিষ্পাপা, তখন রাম লক্ষ্মণ যদি তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতেন যে লঙ্কায় দেবতারাও প্রমাণ দিয়েছেন যে সীতা নিষ্কলঙ্ক, তাহলে সন্দিহান অযোধ্যার প্রজাদের ঘাড়ে কটা মাথা ছিল ঋষি, রাজা ও রাজভ্রাতার যৌথ প্রমাণের বিরুদ্ধে মাথা তোলবার ? তা নয়, ভয়টা ওই কলির। তখনই সমাজে নারী বিদ্রোহিণী। প্রথম শতাব্দী থেকে নিজের হাতে চাষ করছে কোনো কোনো নারী, স্বোপার্জন তাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। চতুর্থ শতকে কার্টিয়াস বলেন—রণক্ষেত্রে আর্য নারী যুদ্ধ করছে। বিদেশি নারীদের অপেক্ষাকৃত স্বাধীন আচরণ তাদের স্বনির্ভর করেছে। অনেক সময়ে স্বামীরা, বিশেষত বিদেশি স্বামীরা, নিগড়শৃঙ্খল হয়তো খুলে দিয়েছেন, পেয়েছেন দাসীর বদলে চিত্তসঙ্গিণীকে। হয়তো সম্পত্তি ঔরস সন্তানের হাতে পড়বে কি না এর চেয়েও উভয়ত খোলাখুলি মেশা ও দাম্পত্য-সুখ তাদের কাছে অধিক কাম্য মনে হয়েছে। কিন্তু ‘অহল্যা’ হয়তো প্রায়শ্চিত্ত করে সংসারে পুনঃপ্রবেশ করেছেন। কিন্তু তারা, হয়তো প্রায়শ্চিত্ত না করেও স্বামীর গৃহে ঢুকেছেন হেলেনের মতো। কিছু শৈথিল্য ও মুক্ত বাতাস হয়তো আগন্তুক বিদেশি নারী-পুরুষ সঙ্গে করে এনেছিলেন, সমাজের বিকারদুষ্ট আবহাওয়ায হয়তো কতকটা সংশোধিত হচ্ছিল কোথাও। যোদ্ধা নারী, তপস্বী নারী, অনূঢ়া নারী, পুনর্ভবা, গান্ধর্ব মতে বিবাহিত নারী, এমনকী রাক্ষস, পৈশাচ বিবাহে বিবাহিতাকেও 'অনুলোম' বলে স্বীকার করা হচ্ছিল। যেমন কানীন সন্তান, ঊঢ়পূর্বা নারী এরাও স্থান পাচ্ছিল সমাজে, তাই শাস্ত্রকারেরা আরো কঠিন নিগড়ের গ্রন্থিবন্ধন করলেন, তার জানালা দরজা বন্ধ করে দিলেন। এই হলো রামরাজ্য। সেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষী শূদ্র অকালমৃত রাক্ষসসন্তানকে বাঁচাতে প্রাণ দেয়; এবং সে প্রাণ নেবার পবিত্র কর্তব্য পালন করেন রাজা। সেখানে কলির ভয়ে উচ্চ ত্রিবর্ণের, ধনিক শ্রেণি এবং সমাজে ক্ষমতায় আসীন শ্রেণিটির স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে নির্ধন, তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ এবং নারীকে মানুষের মর্যাদা দিতে অস্বীকার করে সমাজ। ভার্গব প্রক্ষেপে রামায়ণে, মহাভারতে, মনুসংহিতায়, কামশাস্ত্রে নারী পণ্য- দ্রব্য, ভোগ্যবস্তু, তাই রাম সীতাকে প্রত্যখ্যান করার সময় প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেন, ‘তোমাকে পরিভোগ (= সর্বতোভাবে ভোগ) করতে পারিনে।' তাই ত্রিবর্ণের প্রতি-স্পর্ধী শম্বুককে প্রাণ দিতে হয় (যেমন মহাভারতে উচ্চবর্ণ অর্জুনের অহমিকা চরিতার্থ করার জন্য একলব্যকে বিকলাঙ্গ হতে হয়)। ‘কলি’ মানে কি? প্রচলিত সমাজ-ব্যবস্থার মধ্যে এমন আমূল পরিবর্তন, যার দ্বারা নিম্নবর্গের মানুষের স্বার্থসিদ্ধি হয়, ধনে-ধর্মে ক্ষমতাসীন মানুষের স্বার্থহানি ঘটে। এটা যাতে না ঘটে সেটা দেখার দায়িত্ব রাজার। প্রথম রাজা পৃথু বৈন্যের প্রথম প্রতিজ্ঞা বর্ণসংকর ঠেকাবার অঙ্গীকার, তাকে যারা নির্মাণ করে প্রাণ দিয়েছিল সেই ব্রাহ্মণদের কাছে। রামরাজ্যে প্রজারা নাকি অতি সুখে বাস করত। রামায়ণে তিনটি জাতির চারটি রাজার কথা পাই : দশরথ, সুগ্রীব ও রাবণ, এবং অবশেষে রাম। ভুল, স্বার্থ-বিরোধী ও ধর্ম-বিরোধী প্রতিজ্ঞার ফলে মনঃকষ্টে দশরথের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু অযোধ্যায় তাঁর রাজত্বের যে বর্ণনা পাই তা প্রজাদের পক্ষে হিতকর, সমৃদ্ধি ও শাস্তির রাজত্ব। তেমনি বর্ণনা পাই কিঙ্কিন্ধ্যায় সুগ্রীবের এবং লঙ্কায় রাবণের। গুণগত মানে তিনজনের রাজত্বই আদর্শ। এর মধ্যে আর্য মূল্যবোধ রামের আগেই দেখেছি দশরথের কালে এবং ভরতের পাদুকারাজ্যে। রামচন্দ্রের রাজত্বের ছকটিও ওই দুই পরবর্তী রাজ্যের অনুরূপ। বৈশিষ্ট্য দু'জায়গায়, এক শম্বুক হত্যায়, দুই সীতা নির্বাসনে। প্রথমটি ব্রাহ্মণের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে শূদ্রের প্রাণহানি, দ্বিতীয়টি তথাকথিত প্রজারঞ্জনের জন্য নিষ্পাপ সন্তান-সম্ভবা ধর্মপত্নীর বনবাসদণ্ড। প্রথম যে রাজা দশরথ, তাঁর রাজত্বের বর্ণনায় শুনি প্রজারা সুখী, বর্ণসংকর নেই (১৬/১২), শূদ্ররা স্বকর্মনিরত অর্থাৎ, উচ্চ তিনবর্ণের সেবায় নিয়ত (১/৬/২৯)। দ্বিতীয়, নন্দিগ্রামে ভরত সব রাজকার্য পাদুকাদুটিকে নিবেদন করে সম্পাদন করতেন। এ এক প্রতীকী রাজ্য, কিন্তু সহজেই অনুমান করা যায় দশরথের মতোই সফল রাজত্ব ছিল এই প্রতীকী রাজার। বানর রাজ্যে প্রথম রাজা বালী তেজস্বী যোদ্ধা এবং স্বেচ্ছাচারী। তাঁর নিধন হলে পর লঙ্কায় যুদ্ধ সমাপ্তির পরে রাম সুগ্রীবকে বানররাজ্যে অভিষিক্ত করেন। বানরদের মধ্যে জাতিভেদ ছিল না। তাই বর্ণসঙ্কর থেকে প্রজাদের রক্ষা করার দায় ছিল না রাজার ; কিন্তু নারী যে ভোগ্য পদার্থ এ নিয়ে দ্বিমত ছিল না, তাই বালী নিরুদ্দিষ্ট হলে সুগ্রীব ভ্রাতৃবধূ তারাকে গ্রহণ করেন এবং বালীর বধের পর আবার তাঁকে এবং নিজের স্ত্রী রুমাকে নিয়ে একসঙ্গে বাস করেন। বালীর পর তাঁর অনুরোধে পুত্র অঙ্গদ অভিষিক্ত হয়ে কিষ্কিন্ধ্যায় রাজত্ব করেন, কিন্তু বানর রাজ্যের বিস্তৃত বিবরণ পাই না। মনে হয়, সমস্ত প্রধান বানর ও সেনাপতিরা হৃষ্ট এবং তুষ্ট যখন ছিলেন তখন রাজ্য বিধিমতোই চলত, প্রজারা সুখে ছিল। রাবণের যে প্রতাপ ও ঐশ্বর্যের পরিচয় হনুমান ও বিভীষণের কথায় পাওয়া যায় তার মধ্যে বর্ণসংকরের প্রশ্ন ওঠে না কিন্তু কামার্ত রাবণ বহু নারীর প্রতি অসম্মান ও অত্যাচার করেছেন একথা পাওয়া যায়। মন্দোদরীর বিলাপে আভাসে বোঝা যায় রাজা হিসাবে রাবণ ভালোই ছিলেন। রাম রাজত্ব পেলেন উত্তর-যৌবনে এবং পিতা ও বংশের সম্মান রক্ষার জন্যে যথাবুদ্ধি রাজত্ব করেছিলেন। প্রজাদের মুখে সর্বদাই রামনাম। ফলমূল সারা বছর ধরে পাওয়া যেত। যথাকলে (বা প্রয়োজন মতো) বৃষ্টি হতো, বায়ু ছিল সুখস্পর্শ, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র নির্লোভ ছিল, প্রত্যেকে যথানির্দিষ্ট কর্ম করত এবং তাতেই সুখী ছিল। সকলে সুলক্ষণ, ধর্মপরায়ণ, মিথ্যাবর্জিত ছিল। এগারো হাজার বছর রাম রাজত্ব করেছিলেন, ভাইদের সঙ্গে। ধর্ম, যশ ও আয়ুর বর্ধক রাম অন্য রাজাদের জয় করে রাজত্ব করেছিলেন (৬/১২৮/১০২-৭)। এই বর্ণনার অতিরঞ্জন বাদ দিলেও মনে হয় প্রজারা সুখে ছিলেন। সেই প্রজারাই সন্দেহ করল সীতার চরিত্রে, এবং রামায়ণ বলে, দূতদের ডেকে রাম বললেন প্রজাদের সন্দেহ মোচনের জন্য এবং 'আমারও সন্দেহ মোচনের জন্য' সীতা সর্বসমক্ষে নিজের শুদ্ধি প্রমাণ করুন (৭/৯৫/৬)। এই রামরাজ্যে শূদ্র ও নারীরা কখনো মানুষের মর্যাদা পায় না। শাস্ত্র বলে শূদ্রের কর্ম হলো ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্যের সেবা। বলা বাহুল্য, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সেবায় মর্যাদা আছে, শাস্ত্র-নির্দেশিত সেবায় নেই, কারণ তার মধ্যে বাধ্যবাধকতা আছে, বিকল্প নেই। অসহায়ভাবে এই সেবা করে শূদ্র রামরাজত্বে সুখী ছিল এটা ততটাই সত্য যতটা সারা বছর গাছে ফল থাকা বা এগারো হাজার বছর রামের রাজত্ব করা। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে আক্রমণকারী বিভিন্ন জাতি যখন আর্যাবর্তে বসবাস করল তখন গ্রিকদের সময়ের পর থেকেই নারীর অন্য একটা সামাজিক অবস্থান ভারতীয় নারীদের চোখে পড়ল। এই কালসীমার মধ্যে খোদাই করা ও আঁকা নারীচিত্রে নারীরা পুরুষের দলে মিশে দেবতাদের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য নিয়ে যাচ্ছে। এমন সব এম্ফোরা, পানপাত্র, ছোট বড় মাঝারি সুরাভাণ্ডও বহু পাওয়া গেছে এদেশে প্রত্ন খননে। ভারতীয় নারী নৃত্যপরা গ্রিক নারীর মূর্তি দেখল। আলেকজান্ডারের পরে গ্রিক প্রতিনিধিদের রাজত্বকালে বহুবার যেমন গ্রিক নাটক গ্রিক অভিনেতা অভিনেত্রীদের দ্বারা মুক্তমঞ্চে অভিনীত হতো, তাতে নারী অনেক বেশি। স্বতন্ত্র, স্বনির্ভর, এমনকী মধ্যে মধ্যে পুরুষ-পীড়কের ভূমিকাতেও দেখা দিত (নিউ অ্যাটিক কমেডির মুখ্য নাট্যকারদের মধ্যে টেরেন্স, মেনান্ডার, প্লটাস এঁদের নাটকে এমন নারীদের বার বার দেখা যায়)। মধ্য এশিয়া ও মিশর থেকে এল সিংহবাহিনী দেবী, আইসিস, ইনান্না, এস্টার, অর্ধোক্ষা ও অন্যেরা। প্রত্যয়ের প্রতিমূর্তি কোনো দেবতার স্ত্রীরূপে নয়, স্বেমহিন্মিপ্রতিষ্ঠাতা দেবী রূপে। মহাদেবীর আবির্ভাব, মহালক্ষ্মী, দুর্গা ও কালিকারূপে এই সময়েই। এরা স্বয়ং অসুর-মর্দিনী অতএব পুরুষ-প্রধান দেবমণ্ডলীর তথা পুরুষ-শাসিত সমাজের পক্ষে আতঙ্কস্থল। শাস্ত্রে যখন পুরুষ এঁদের আলেখ্য সৃষ্টি করেন তখন তার পশ্চাতে থাকে নবসমাগতা ভিন্ন জাতির উপাস্যা দেবীরা, যাদের আর্যায়ণ বা ব্রাহ্মণায়ন সাধিত হচ্ছে শাস্ত্রকারদের হাতে। (গ্রিক পল্লাস, আথেনে হল 'অপালা', গ্রিক ইরিনে হন ইরিণী)। ভারতীয় নারী একদিকে তখন বৃহত্তর পরিসরে স্বাধীন-সঞ্চারিণী নারীকে দেখল, অন্য সমাজের ধর্মে, নাটকে, সাহিত্যে, শিল্পে এবং প্রত্যক্ষত সমাজে, তেমনই নারী-অবদমনের অন্যবিধ চিত্রও দেখতে পেল অন্যান্য সমাজ। শক রাজাদের মৃত্যুর পর রানীরা 'সতী' হতেন, হূণ নারীরাও মৃত স্বামীর অনুগমন করতেন। হয়তো প্রাগার্যদের মধ্যেও এ প্রথা বর্তমান ছিল। অথর্ব বেদে দুটি উল্লেখে (১৮/৩/১, ৩) তাই মনে হয়। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে ডিওডোরাস সেক্যুলাসের বর্ণনায় ‘সতী’ হওয়ার বিবরণ পাওয়া যায়। মহাভারতের ভার্গব প্রক্ষেপে সতীর আদিকল্প রচিত হয়, হিমালয় ও মেনকার দুহিতা সতী স্বামীনিন্দায় দেহত্যাগ করেন। এ সতীত্ব স্বামীর মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করেনি; কাজেই পতি-ভক্তির এবং পতিব্রাত্যের আদি-কল্পটি নির্মাণ করেন এক দেবী। তাহলে দেখছি স্বাধীন- চারিণী নারীর চিত্রকল্প—যেমন বৈদেশিক নাট্য সাহিত্য, ভাস্কর্য চিত্রে ও সামাজিক আচরণ দেখে আর্যাবর্তের নারী প্রভাবিত হচ্ছে এবং সে কারণে আতঙ্কিত হচ্ছেন সমাজপতিরা। তাই রামায়ণ মহাভারত উভয় মহাকাব্যেরই ভার্গব প্রক্ষেপে ‘গেল গেল’ রব উঠেছে, কলিকালের উপযুক্ত এ আচরণ বলে কলিকে সর্বদোষের আধার বলা হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে শক হুনদের মধ্যে ‘সতী’ হওয়া এবং মহাভারতে সতী উপাখ্যানে (ও অন্যত্র শত শত উপাখ্যানে) পতিব্রতা নারীর যথোচিত আচরণের আদর্শ সৃষ্টি করে সমাজ আত্মরক্ষা অর্থাৎ সমাজের স্বীকৃত কাঠামোটি রক্ষার জন্যে তৎপর হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় নারী যাতে কোনওরকম স্বাধীন (লক্ষণীয় 'স্বাধীনা' শব্দটির অর্থ গণিকা) হয়ে উঠতে না পারে তার পরিব্রাত্যে, পতিসেবায় যেন বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি না ঘটতে পারে সেই জন্যে তো তার স্বামীকে কঠোর হাতে শাসন করতে হবে। চরিত্র-লঙ্ঘনের আশঙ্কাতেই তাই দণ্ড দিতে হচ্ছে। এই আদর্শ স্বামী যিনি তিনি স্ত্রীকে সর্বতোভাবে আত্মসম্পত্তি জ্ঞান করেন এবং পর-পুরুষের কলুষ স্পর্শমাত্রকেই চরিত্রভ্রংশের কারণ বলে গণ্য করে দণ্ডবিধান করেন, যাতে প্রজা অর্থাৎ সমাজ নিশ্চিত হতে পারে যে ওই নারীতে কলির কালিমা লাগেনি। এই আদর্শ স্বামী রাম। এবং শাস্ত্র বলে 'রামাদিবং প্রবর্তিত্রব্যং ন রাবণাদিবৎ, রামের মতো আচরণ করা উচিত, রাবণের মতো নয়। রাবণ একদিকে কামুক, স্বেচ্ছাচারী এবং লোভী ছিলেন, কিন্তু মন্দোদরীর প্রতি তাঁর আচরণে কোনো মালিন্য স্পর্শ করেনি, কোনো অকারণ নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পায়নি, একথা মন্দোদরীর বিলাপ থেকেই বোঝা যায়। কলিতে শূদ্র দ্বিজাতির প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠবে একথা রামায়ণ মহাভারত উভয় মহাকাব্যের ভার্গব প্রক্ষেপে অত্যন্ত স্পষ্ট। কাজেই এমন আদর্শ রাজার আকল্প নির্মাণ করতে হবে যিনি কঠোর হাতে প্রতিস্পর্ধী শূদ্রকে দমন করেন, বিনা দ্বিধায়, বিনা চিন্তায়। সেই আদর্শ রাজা রামচন্দ্র, যিনি শম্বুককে হত্যা করলেও দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করে বলেন—তুমি দেবতাদের কাজ করেছ। বর্ণগুলোর ক্রম যাতে নষ্ট না হয় সেটা দেখা রাজার কর্তব্য। রাম সেই আদর্শ রাজা, যাঁর এক খড়গাঘাতে প্রতিস্পর্ধী শূদ্র মরল এবং বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণের অকালমৃত পুত্রও বাঁচল। কলির আসন্ন সংক্রমণ থেকে যিনি প্রজাকুলকে বাঁচালেন, সমাজকে আশ্বস্ত এবং সুস্থির করলেন। পিতৃভক্ত, বন্ধু-বৎসল, প্রজাহিতৈষী, ভ্রাতৃ-বৎসল, দেবদ্বিজে ভক্তিমান্, সুবিচারক, যজ্ঞকারী—অতএব আদর্শ যুগোচিত নায়ক। শূদ্র যদি ত্রিবর্ণের সেবা ছাড়া অন্য কিছুর আকাঙ্ক্ষা করে তবে বর্ণ- ধর্মরক্ষাকারী রাজা তো তাকে মেরে ফেলবেনই। স্ত্রী যদি অনিচ্ছাতেও পর-পুরুষের দ্বারা স্পৃষ্ট বা অপহৃত হয়—তবে যতই সচ্চরিত্রা হোন না তিনি, অগ্নিপরীক্ষা, নির্বাসন, পুনর্বার পরীক্ষা এইসব অবমাননা তাঁকে নির্বিকার চিত্তে মেনে নিতেই হবে। সমাজ কখনোই নারীকে ব্যক্তি বলে স্বীকার করেনি। ভোগ্যবস্তু, পণ্যদ্রব্য এইসব আখ্যা দিয়েছে। স্বর্গারোহণের পূর্বে ভরতকে অযোধ্যার সিংহাসন দিলেন রাম, তাঁর ও সীতার দুইপুত্র কোশল ও উত্তর কোশলের রাজত্ব পেলেন। সীতা সচ্চরিত্রা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হবার পরও তাঁর গর্ভজাত সন্তানদের ইক্ষ্বাকুকুলের রাজসিংহাসনে অধিকার দেওয়া গেল না। প্রজারা নিশ্চয়ই পুলকিত হলো, আদর্শ রাজা রাজকুল-মর্যাদায় এতটুকু কলুষের বা তার সন্দেহেরও স্পর্শ লাগতে দিলেন না। এই যে নতুন আদর্শের প্রজাপালক রাজার নির্মাণ হলো, ইনি কিন্তু মহাকাব্যের নায়ক নন। সে নায়ক ক্ষত্রিয় যোদ্ধা বীর, আদর্শ রাজা হওয়া তাঁর কাছে প্রতীক্ষিত ছিল না। ক্ষত্রিয় নায়কের অঙ্গীকার ও কর্তব্য শেষ হয়েছে যুদ্ধ-জয়ে রাবণ বধে। তারপর শুরু হলো মহাকাব্যটি ঢেলে সাজানো, আদিকাণ্ডে প্রথমার্ধে ও উত্তরকাণ্ডে এর নবকলেবর রূপায়ণ ঘটল। এখন ইনি বর্ণধর্মের পরিপালক রাজা। শূদ্র ও নারীর কোনোরকম স্বাধীনতা, স্পর্ধা বা অধিকার স্বীকার করলে পাছে কলির স্পর্শদোষ ঘটে। রাজ্যে, তাই ইনি সমাজের স্থিতাবস্থা রক্ষা করেছেন অতন্দ্রভাবে। এর কিছু মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকে, এক-পত্নীক রাজা সীতাকে হারালেন। সমাজে নারীর সতীত্ব শুচিতা নিয়ে যে নতুন নিরিখ তৈরি হয়েছে তার কাছে বলি দিতে হলো আপন দাম্পত্য-সুখ। কিন্তু এর মূল্য দিতে তাঁর বিশেষ বাজেনি, কারণ সীতাকে যখন তিনি প্রথম কঠিন কথাগুলো বলেন লঙ্কায়, তখন তা তাঁর হৃদয়ান্তর্গত ভাব। অর্থাৎ, সমাজের নির্মম নির্দেশ তিনি নিজ অন্তরে স্বীকার করে নিয়েছিলেন বলেই পারলেন ওই কথাগুলি বলতে। এইখানে মহাকাব্যের পরাজয় ঘটল শাস্ত্রকারদের কাছে। আজ যখন ‘রামরাজ্য’ সম্বন্ধে একটা স্বপ্নকে পুনর্বার কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করার একটা উদগ্র চেষ্টা হচ্ছে এ দেশের লোকমানসে, তখন যেন আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি: নারী, শূদ্রের ওপর অত্যাচার যে তন্ত্রে অপরিহার্যভাবে গৃহীত, যেখানে ধর্মাকাঙ্ক্ষী শূদ্র ব্রাহ্মণ-পুত্রের জন্য প্রাণ দিতে বাধ্য হয়, নিষ্পাপ অন্তঃসত্ত্বা নারী অকারণে যেতে বাধ্য হয় নির্বাসনে, দেওরালা- আড়ওয়ালের পরও আমরা কি সেই রাজতন্ত্রই চাই? এরই নায়ক কি ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’? অর্থাৎ পুরুষের সর্বোত্তম আদর্শ অসহায়কে বিপন্নকে ও নারীকে রক্ষা করাই তো এতদিন আদর্শ পুরুষদের অবশ্য করণীয় ছিল, তাকে বর্জন করে যে রাজতন্ত্র, তা কি সাধারণ মানুষের পক্ষে চূড়ান্ত অভিশাপ হয়ে উঠবে না? তাকে ঠেকানোই কি আজ আমাদের প্রধান কর্তব্য নয়? প্রকাশের তারিখ: ০৩-ডিসেম্বর-২০২২ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |