বাল্মীকির রাম, ফিরে দেখা - ১

সুকুমারী ভট্টাচার্য
বনে যাবার প্রসঙ্গে লক্ষ্মণ সঙ্গে যেতে চাইলে খানিকটা আপত্তির পর রাম রাজি হলেন। সীতা যেতে চাইলে, বনবাসের কষ্টের কথা বলে তাঁকে নিবৃত্ত করতে চাইলেন, বললেন, -- 'তুমি শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা কর রাজধানীতে।' ব্রাহ্মণ-সাহিত্যে আমরা পড়ি, 'কুলায় কন্যা প্রদীয়তে'; অর্থাৎ, বধূকে শ্বশুর কুলে দান করা হয়। রামচন্দ্রও এখানে প্রায় তেমন কথাই বলেছেন।

যুদ্ধ বা লঙ্কাকাণ্ড পর্যন্ত এবং ব্রাহ্মণ্য বা ভার্গব প্রক্ষেপ অর্থাৎ, আদি বা বালকাণ্ডের প্রথমাংশ ও উত্তরকাণ্ড। মূল রামায়ণে রাম দেবতা নন, মানুষ। প্রক্ষিপ্ত  অংশে, বিষ্ণুর অবরামায়ণ সম্বন্ধে কিছু বলতে গেলে সংক্ষেপে তার রচনাকাল, স্তরবিন্যাস এবং রচনার প্রক্রিয়া বিষয়ে কিছু বলে নেওয়া দরকার। পণ্ডিতেরা মনে করেন খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় শতকের কাছাকাছি এর রচনার সূত্রপাত এবং খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়-তৃতীয় (কারও কারও মতে চতুর্থের প্রথমাংশে) এ রচনা তার বর্তমান কলেবর লাভ করে। সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে কাহিনীর বিভিন্ন অংশ অবলম্বনে নানাস্থানে কিছু কিছু গাথা রচিত হতে থাকে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় শতকে কিছু কিছু গাথা পরস্পর-সম্পৃক্ত হয়ে রামায়ণের কাণ্ডগুলির আংশিক কাঠামো প্রস্তুত করে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের বাল্মীকি বা কোনো মহাকবি এগুলিকে সংহত রূপ দেন। তারই শ'খানেক বছরের মধ্যে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের শেষ দিক থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের মধ্যে মূল রামায়ণ অর্থাৎ, অযোধ্যা থেকে লঙ্কাকাণ্ড পর্যন্ত গ্রন্থটি বর্ণনা ও অলংকার সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। এর পর এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রথম ব্রাহ্মণ্য বা ভার্গব প্রক্ষেপ অর্থাৎ, আদিকাণ্ডের প্রথমার্ধ ও উত্তরকাণ্ড, যা সমাপ্ত হয় খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে। পরের প্রক্ষেপ সম্ভবত দ্বিতীয় শতকে এবং হয়তো চতুর্থের শুরুতে এর শেষতম প্রক্ষেপ।

মূল এবং প্রক্ষেপের পার্থক্য নিহিত আছে ভাষায়, ব্যাকরণে, অলংকারে, বিষয়বস্তুতে ও ধর্মীয়-দার্শনিক মূল্যবোধে। এগুলি অনুধাবন করেই আমরা রচনার বিভিন্ন স্তরের চরিত্র ও রূপ জানতে পারি। এর দুটি প্রধান অংশ—মূল ক্ষত্রিয় কাহিনী : অযোধ্যা থেকে তার। আদিকাণ্ডের শুরুতে বাল্মীকি নারদকে জিজ্ঞেস করছেন: 'এই পৃথিবীতে কে এমন গুণবান, বীর্যবান, ধর্মজ্ঞ, কৃতজ্ঞ, সত্যবাক্, দৃঢ়ব্রত, চরিত্রবান, সর্বভূতে হিতকারী আছেন—যিনি বিদ্বান, সমর্থ, প্রিয়দর্শ, আত্মবান, জিতক্রোধ, দ্যুতিমান্ ও পরশ্রীকাতর নন? যুদ্ধে ক্রুদ্ধ হলে কাকে দেবতারাও ভয় পান?' (১/২-৪) উত্তরে নারদ বলেন, “এইসব গুণযুক্ত যিনি বীর্যে বিষ্ণুর সদৃশ, সেই মানুষের কথা বলছি।" (১/২/১৮) অন্য একটি সংস্করণে নারদ বলেন, “যেসব গুণের কথা বলছ, তার আধার তো দেবতাদের মধ্যেও কাউকে দেখতে পাইনে, যে মানুষটি এইসব গুণযুক্ত, তার কথা বলছি, শোনো।” (১/১১)

এই যে 'অশেষবিধ গুণযুক্ত মানুষ রামচন্দ্র, তাঁর চরিত্রের ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি দিক আলোচনা করলে হয়তো রামায়ণের সামাজিক অর্থ ও তাৎপর্য আমাদের কাছে আরো খানিকটা স্পষ্ট হবে। রামায়ণে তাঁকে প্রথম দেখা যাচ্ছে পুত্ররূপে। প্রথমদিকে দেখি বাধ্য সন্তানের মতো তিনি পিতার আজ্ঞায় বিশ্বামিত্রের যজ্ঞে বিঘ্নকারী রাক্ষস মারতে গেলেন লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে। এ সময়ে অহল্যার শাপমুক্তি ঘটান পদস্পর্শে, এটা প্রক্ষিপ্ত অংশে রামের দেবত্ব প্রতিপাদন করার জন্য সংযোজিত। তাড়কাকে বধ করতে রাম ইতস্তত করছেন দেখে বিশ্বামিত্র তাকে বললেন— এই স্ত্রীবধে কোনো অন্যায় হবে না, (১/২৫/২৭)। রাক্ষস-বধে শৌর্য প্রমাণ হলো, পরে বিশ্বামিত্র দুই রাজপুত্রকে নিয়ে জনকরাজার কন্যার বিবাহসভায় গেলেন। এই কন্যা বস্তুত ধরিত্রীদেবীর কন্যা। জনকরাজা হলকর্ষণের সময়ে এঁকে খেতের মধ্যে পান বলে এর নাম সীতা। অর্থাৎ, ইনি প্রকৃতপক্ষে দেবকন্যাই। জনকরাজার সভায় এ কন্যা বীর্যশুল্ক। লক্ষণীয় কন্যাপণেরই একটি প্রকারভেদ এটি, যে কন্যাপণ আগে সমাজে চলিত ছিল। সভায় রাম অবলীলাক্রমে হরধনু ভঙ্গ করলে পর সীতার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হলো। রাম বিয়েতে অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে দাসদাসী ও একশত কন্যাও যৌতুক পান। চার ভাই বধূদের নিয়ে অযোধ্যায় এসে কিছুকাল সুখে বাস করার পর দশরথের ইচ্ছে হলো রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করবেন। স্বাভাবিক নিয়মে জ্যেষ্ঠকুমারই রাজ্য পান, তবু রামায়ণে দেখি দশরথ ভরতকে কেকয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এবং বৈবাহিক জনককে কোনো নিমন্ত্রণ করেননি, খবরও দেননি। কৈকেয়ী যখন পুরোনো দুটি বরে রামের বনবাস এবং ভরতের রাজত্বপ্রাপ্তি চেয়ে নেন এবং তা শুনে লক্ষ্মণ ক্রোধে অধীর হয়ে কটূক্তি করতে থাকেন, তখন রাম লক্ষ্মণকে বলেন, 'ভাই, আগেই, জননী কৈকেয়ীকে বিবাহ করার সময়েই মাতামহ কেকয়রাজের কাছে পিতা কৈকেয়ীর পুত্রকে রাজ্য দানে প্রতিশ্রুত ছিলেন (২/১০৭/৩) অতএব কৈকেয়ী সেই কথা ভুলে গোলমাল করতে পারেন বা ভরতও সে দাবি করতে পারেন এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত ভরতকে মামার বাড়ি পাঠানো হয়েছিল। যদিও দশরথ বলেন, – ভরত তেমন ছেলেই নয়, সে রামের চেয়েও ধার্মিক। (২/১২৬১-৬২) কৈকেয়ী অবশ্য সে কথা তোলেননি। দশরথের দেওয়া বরের জোরেই ইষ্টসিদ্ধি করেন।


এখানে লক্ষণীয়, আগের দিন যাঁর অভিষেক ঘোষণা করা হয়েছে, আগের রাত্রে যিনি সীতার সঙ্গে ব্রতশীল হয়ে অগ্নিগৃহে কাটিয়েছেন, সকালে কৈকেয়ীর মুখে নিজের মর্মান্তিক ভবিষ্যৎ জানতে পেরেও রাম মাত্র একটিই অভিযোগ করেছেন, 'আমি পিতার কথায় অগ্নিতে প্রবেশ করতে পারি। কেন পিতা আগের মতো আমায় অভিনন্দিত করছেন না? একটি অলীক ব্যাপার আমার চিত্তকে দগ্ধ করছে; রাজা কেন আমাকে ভরতের অভিষেকের সংবাদ দিলেন না? বললে, আমি খুশি হয়েই ভাই ভরতের জন্য সীতা, রাজ্য, প্রাণও দিতে পারতাম' (২/১৯/৬০৭) লক্ষণীয়, যৌতুকে পাওয়া শত কন্যার মতো বিবাহিত ভার্যা সীতাকেও দানের কথা ওঠে; যেন তিনি ব্যক্তি নন, বস্তুমাত্রই; সমাজ নারীকে মুখ্যত এই দৃষ্টিতেই দেখত।

বনে যাবার প্রসঙ্গে লক্ষ্মণ সঙ্গে যেতে চাইলে খানিকটা আপত্তির পর রাম রাজি হলেন। সীতা যেতে চাইলে, বনবাসের কষ্টের কথা বলে তাঁকে নিবৃত্ত করতে চাইলেন, বললেন, – 'তুমি শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা কর রাজধানীতে।' ব্রাহ্মণ-সাহিত্যে আমরা পড়ি, ‘কুলায় কন্যা প্রদীয়তে’ অর্থাৎ, বধূকে শ্বশুর কুলে দান করা হয়। রামচন্দ্রও এখানে প্রায় তেমন কথাই বলেছেন। সীতা যে যুক্তি দিলেন তাতে শ্বশুরকুলের পরিচর্যা গৌণ হয়ে গেল। যে সীতাকে রাম খুশি হয়েই ভরতকে দান করতে পারতেন সেই সীতা বললেন, “তোমাকে বাদ দিয়ে আমার স্বর্গে বাস করতেও অভিরুচি নেই। তোমার বিরহে, রাম, আমি এখানে প্রাণত্যাগ করব।' (২/২৭/২১, ২/১৯/৫) এ কথা কোনোরকম কর্তব্যবোধে উচ্চারিত হয়নি, সতী-সাধ্বীর মর্যাদা পাবার জন্যেও নয়, এর প্রেরণা এসেছে রামের প্রতি প্রগাঢ় প্রেম থেকে। রাম সঙ্গে নিলেন সীতাকে ; তেরো বছর বনবাসের সঙ্গিনী হলেন সীতা।

রামের সৌভ্রাতৃত্ব বারেবারেই দেখা গেছে। লক্ষ্মণ ও ভরতের সঙ্গে তিনি সস্নেহ ব্যবহার করেছেন, যদিও লক্ষ্মণ দাসের মতো নিরস্তর অক্লান্ত পরিশ্রমে তাঁদের পরিচর্যা করে গেছেন। রাম যখন রাজচিহ্ন হিসাবে নিজের উত্তরীয় বা বল্কল না দিয়ে পাদুকা দুটি দিলেন, সেই পাদুকাকে সিংহাসনে রেখে নিচে বসে নন্দীগ্রামে চৌদ্দ বছর রাজকার্য সম্পাদনের মধ্যেও রামের প্রতি ভরতের একটা দাস্যভাব দেখা গেছে, যা তখনকার সমাজে প্রতিষ্ঠিত মনোভাব। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতার বিকল্প, একথা লক্ষ্মণকে বিদায় দেবার সময়ে সুমিত্রার কথাতেও স্পষ্ট, 'রামকে দশরথ মনে করো।’ প্রাচীন জগতে বড় ভাইকে বাবার প্রতিনিধি বলেই মনে করা হতো, "অধিকাংশ প্রাচীন সভ্যতাতেই জোষ্ঠত্বের দাবি ও সম্মান এ ধরনেরই ছিল। যখন ভরত এসে রামকে বহু মিনতি করলেন সিংহাসন নেবার জন্য, তখন রাম পিতৃসত্য রক্ষায় ব্রতী বলে কোনো মতেই রাজি হলেন না। ভরতের ওপরে তাঁর এ বিশ্বাস ছিল যে বনবাসকাল পূর্ণ হলে তিনি অবশ্যই রামকে রাজত্ব ফিরিয়ে দেবেন। তাছাড়া নির্বাসনের কথা শুনে বারে বারে রাম বলেছেন যে, রাজ্যে তাঁর লোভ নেই এবং সত্যই তিনি এমন যুক্তি একবারও দেননি যে জ্যেষ্ঠপুত্র হিসাবে সিংহাসনে তাঁর অপ্রতিহত দাবি, কৈকেয়ীর কাছে দশরথের প্রতিজ্ঞার কোনো মূল্য নেই। এ ব্যাপারে সত্যই তিনি নির্লোভতা দেখিয়েছেন। জাবালি, বশিষ্ট, লক্ষ্মণ ও কৌশল্যার যুক্তিতেও তিনি পিতৃসত্য রক্ষার দায়িত্ব ত্যাগ করেননি।

বনে অনেক রাক্ষস আক্রমণ করত, মুনি-ঋষিদের যজ্ঞ এবং তপস্যায় বিঘ্ন ঘটাত, তাই রাম-লক্ষ্মণকে প্রায়ই বহু সংখ্যক রাক্ষস মারতে হতো। সীতার মনে হয়েছিল এটা অনাবশ্যক প্রাণী বধ। রাম অবশ্য বুঝিয়েছিলেন যে, মুনি-ঋষিদের জীবন বিঘ্নমুক্ত করার জন্য এর প্রয়োজন আছে। কিন্তু সীতার কোমল চিত্ত এ আপত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে।

বনে যাবার পথে প্রথম রাত্রে তিনজন এলেন রামের বন্ধু নিষাদ রাজা গুহকের রাজ্যে। গুহক নানা খাদ্যসম্ভারে আপ্যায়ন করতে চাইলে রাম বললেন, “তাঁরা বনবাসী, ফলমূলই খাবেন, অন্যের দান প্রতিগ্রহণ করবেন না (২/৫০/৪৩, ৪৪), গুহক যদি রথের ঘোড়াদের জন্য খাদ্য দেন তাহলে উপকার হয়। গুহক তাই করলেন। বনবাসে কিন্তু রাম-লক্ষ্মণ- সীতা, অত্রি-অনসূয়া, ভরদ্বাজ ও অন্যান্য মুনিদের দেওয়া ফলমূল ভোজন করেছেন, গুহকের কাছেও তা করতে পারতেন, কিন্তু তা না করে রাত্রিতে তাঁরা উপবাসে কাটালেন। সেটা কি গুহক জাতিতে নিষাদ ছিলেন বলে ?

রাবণের পরামর্শে মারীচ যখন সোনার হরিণ হয়ে এল এবং সীতা সেটা পাবার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠলেন, তখন রাম সীতাকে বোঝাবার চেষ্টা করেও না পেরে ধনুর্বাণ নিয়ে বেরোলেন, লক্ষ্মণের হাতে সীতাকে রক্ষার ভার দিয়ে। মারীচের মায়াতে বিপন্ন রামের ডাক শুনলেন সীতা, তখন আতঙ্কে হিতাহিত জ্ঞান-শূন্য হয়ে লক্ষ্মণকে কটু কথা বললেন, আদেশ করলেন রামের সাহায্যের জন্য তখনই যেতে। কাজটা অন্যায়। কিন্তু এই কটুকথার পেছনেও আছে প্রিয়তম রামের অমঙ্গল আশঙ্কা, এ পতিব্রতার কর্তব্য নয়, প্রেমের আকুতি।

লক্ষ্মণ চলে যাবার পরে রাবণ প্রথমে সন্ন্যাসীর বেশে আশ্রমে আতিথ্য চাইলে সীতা পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে তাঁকে অপেক্ষা করতে বললেন। তখন রাবণ স্বরূপ ধারণ করে সীতাকে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করেন। শক্তি ও ঐশ্বর্যের মোহ এবং প্রবল কামনার অভিব্যক্তির সঙ্গে ছিল দুর্বল নির্বাসিত মানুষ- স্বামীর সহদুঃখচারিণীর দৈন্য ও গ্লানির কথা। রাবণ একথাও বললেন যে, সীতা বিনা তিনি বাঁচতেই পারবেন না (৩/৬২/১৩)। উত্তরে সীতা বললেন, “তুমি শৃগাল হয়ে সিংহীকে পেতে চাইছ। কাল সাপের মুখে হাত দিয়ে তার বিষদাঁত ওপড়াতে চাইছ। কালকূট বিষ পান করে স্বস্তিতে থাকতে চাইছ, সূচি দিয়ে চক্ষু ভেদ করতে বা জিহ্বা দিয়ে ক্ষুর লেহন করতে চাইছ? রাঘবের প্রিয়াকে তুমি পেতে চাইছ? কণ্ঠে শিলাখণ্ড বেঁধে সমুদ্রে উত্তরণ করতে চাইছ? দুই হাত দিয়ে চন্দ্র সূর্য ধরতে চাইছ? তুমি রামের প্রিয়া বধূকে ধর্ষণ করতে চাইছ? জ্বলন্ত অগ্নিকে কাপড় দিয়ে আহরণ করতে চাইছ, তাই রামের কল্যাণী বধূকে হরণ করতে চাইছ? লৌহমুখ শূলের সামনে বিচরণ করতে চাও, তাই রামের অনুরূপ বধূকে পেতে চাইছ? বনে সিংহ আর শৃগালের যে পার্থক্য, ছোট খাল ও সমুদ্রের যে পার্থক্য, শ্রেষ্ঠ বীর আর কাপুরষের যে পার্থক্য, হস্তী আর বিড়ালের যে পার্থক্য, গরুড় ও সর্পের যে প্রভেদ, পানকৌড়ি ও ময়ূরের যে প্রভেদ, হাঁস ও শকুনের যে প্রভেদ - দাশরথি রামের সঙ্গে তোমারও সেই প্রভেদ।" এই স্পর্ধিত উক্তি-পরম্পরা উদ্‌গত হয়েছে রামচন্দ্রের যোগ্যতায় একান্ত বিশ্বাস এবং তাঁর প্রতি গভীর প্রেম থেকে। সুখে-দুঃখে, প্রাসাদে-কান্তারে একান্তভাবে যে স্বামীকে তিনি দেখেছেন, বুঝেছেন, ভালোবাসতে এবং নির্ভর করতে শিখেছেন, সেই স্বামীর সঙ্গে অন্য কারও তুলনা যেন তাঁর কাছে এক হাস্যকর প্রয়াস, যত প্রবল শক্তিমান্ ও ঐশ্বর্যবানই হোক না কেন সে প্রতিদ্বন্দ্বী।

রাম-লক্ষ্মণ জটায়ুর কাছে সীতা হরণের কথা শুনলেন। যেখানে কেউ সাক্ষী ছিল না, সেই নির্জন অরণ্যে জটায়ু বন্ধু দশরথের পুত্রবধূর অপমান ও অপহরণ দেখে, পরাজয়, আঘাত ও মৃত্যু অনিবার্য জেনেও একাকী রাবণের প্রতিকূলতা করে মুমূর্ষু অবস্থায় বেঁচেছিলেন যেন সীতার খবরটুকু রামকে দেবার জন্য। তাঁর মৃত্যুর পর রাম-লক্ষ্মণ পিতৃতপর্ণের মতো করেই তাঁর অন্ত্যেষ্টি ও তর্পণ করলেন। এ রাম কর্তব্যনিষ্ঠ, সৌজন্যপরায়ণ। সীতা-বিরহে রাম দীর্ঘ বিলম্বিত বিলাপ করতে থাকেন লক্ষ্মণের সামনেই, লক্ষ্মণ তাঁকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন। অযোধ্য ত্যাগ করার সময় থেকে রামের মুখে একটিবারও শোনা যায়নি যে নববিবাহিত লক্ষ্মণ বিনাবাক্যে ঊর্মিলাকে ফেলে রেখে তাঁর অনুগামী হয়েছেন এবং চৌদ্দ বছর বিরহ যাপন করছেন স্বেচ্ছায়। শূর্পণখা প্রসঙ্গে বরং মর্মান্তিক পরিহাস করে রাম রাক্ষসীকে বলেন, 'লক্ষ্মণ অবিবাহিত, তুমি ওকেই বেছে নাও।' পরিহাস হলেও কথাটা মিথ্যা ও হৃদয়হীন। ভদ্র লক্ষ্মণ এ জন্যে রামকে কোনো অনুযোগও করেননি। রামের সৌভ্রাত্বের বিধানে এ কথা লেখে না যে ছোট ভাইয়ের অকুণ্ঠ পরিচর্যার পশ্চাতে যে নীরব দীর্ঘ বিরহযাপন আছে তার কোনো স্বীকৃতি দেওয়া উচিত বা তার জন্য কৃতজ্ঞতারও প্রয়োজন আছে। সীতাও কোনোদিন এর উল্লেখ করেননি। বয়ঃকনিষ্ঠের কাছে যে-কোনো রকম সেবা অকুণ্ঠভাবে নেওয়া সমাজে অনুমোদিত ছিল। ভ্রাতৃস্নেহের প্রমাণ দেখি যখন যুদ্ধে লক্ষ্মণ অজ্ঞান, তখন রামচন্দ্র বিলাপ করে বলেছেন, 'প্রাণ পেয়ে সীতা পেয়ে কী লাভ আমার? মর্ত্যলোকে খুঁজলে সীতার মতো নারী আরো পাওয়া যাবে, কিন্তু লক্ষ্মণের মতো সচিব ও যোদ্ধা ভ্রাতা কোথাও পাওয়া যাবে না' (৬) ৪৯/৫)। পরে আবার শক্তিশেলে যখন লক্ষ্মণ অচেতন তখন রাম বলছেন, 'দেশে দেশে স্ত্রী পাওয়া যায়, বন্ধুও পাওয়া যায়, কিন্তু তেমন দেশ তো দেখি না যেখানে সহোদর ভ্রাতা পাওয়া যায়।' (৬/১০১/১৫)। (লক্ষ্মণ) তুমি যখন মৃত্যুমুখে পতিত তখন আমার জীবন নিরর্থক, সীতা বা বিজয়লাভ করাও নিরর্থক (৬/১০১/৪৯)। বারবারই দেখছি ভ্রাতৃস্নেহের কাছে পত্নীপ্রেম তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। এরই সঙ্গে স্বভাবতই চোখে পড়ে রামের প্রতি সীতার প্রেমের যে ঐকান্তিকতা, সীতার প্রতি রামের প্রেমে সে গভীরতা নেই। তাই স্ত্রীসুলভ, তাকে যত্রতত্র পাওয়া যায়, তাকে ইচ্ছামতো ত্যাগও করা যায়। এ বোধ রামের চিত্তে প্রথম থেকেই ছিল। যদি মেনেও নিই যে, শোকার্তের  বিলাপে অত্যুক্তি কিছু থাকবেই, তবুও একই তুলনা—সীতার প্রতি প্রেমের সঙ্গে লক্ষ্মণের প্রতি স্নেহের—এটার কিছু ভিত্তি না মেনে উপায় থাকে না। এর অনেকটাই যুগধর্ম, পরে আলোচনা করছি। কিন্তু মূল কথা হলো, লক্ষ্মণ শুধু ভাই নন, তিনি পুরুষ, অতএব সীতার ঊর্ধ্বে তাঁর স্থান।

কিচিন্ধ্যা কাণ্ডে সুগ্রীবের সঙ্গে রামের যে বন্ধুত্ব হয় তার মূলসূত্র ছিল পরস্পরের উপকার। সুগ্রীবের দাদা বালী সুগ্রীবের রাজ্য ও স্ত্রী ভোগ করেছে সুগ্রীবকে নির্বাসিত করে। রাম যেন সুগ্রীবের স্ত্রী ও রাজ্য উদ্ধার করে দেন, তাহলে সুগ্রীবও তাঁর বানর সেনাদের দিয়ে রামের অপহৃতা সীতার সন্ধান করবেন ও রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রামের সহায়তা করবেন। দুপক্ষই সত্যরক্ষা করেছিলেন। এর বাইরে যা তা রামের দিক থেকে সৌজন্য ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কিন্তু প্রথমেই প্রয়োজন ছিল বালীকে পরাজিত করা। এ ব্যাপারে রাম তাঁর সামর্থ্য ঘোষণা করলেন একটি তিরে সাতটি তালগাছকে একসঙ্গে ভেদ করে। পরে রামের প্ররোচনায় সুগ্রীব বালীকে আহ্বান করে যুদ্ধ করে হেরে গেলেন, দু ভাই একই রকম দেখতে বলে রাম বালীকে বধ করতে সাহস পেলেন না, পাছে তাঁর ভুলে সুগ্রীব নিহত হন। দ্বিতীয় বার সুগ্রীব গজপুষ্পীর হার পরে যাওয়ায় রাম গাছের আড়াল থেকে লুকিয়ে বাণ নিক্ষেপ করে বালীকে বধ করেন। বালী রামকে দেখতে পেয়ে প্রবল ধিক্কার দিলেন (৪/১৭/১৬) ক্ষত্রিয় হয়ে যুদ্ধনীতির মূলসূত্র লঙ্ঘন করে আড়াল থেকে শত্রু নিধন করার জন্য। কাজটা যে একটুও বীরোচিত নয়, বরং অত্যন্ত গর্হিত, একথা রাম কি জানতেন না ? আগে বালী রাম সম্বন্ধে বলেছিলেন, 'ধর্মজ্ঞ, কৃতজ্ঞ রাম কেমন করে পাপ করবেন?' (৪/১৬/৫) দেখা গেল পাপ করতে রামের বাধল না, সীতা উদ্ধারের জন্য সুগ্রীবের সহায়তা তাঁর মতো নির্বাসিত অসহায় মানুষের পক্ষে যে অপরিহার্য, তাই অনায়াসে বীরনীতি পরিত্যাগ করলেন। বালীর অনুযোগ শুনে রাম একটার পর একটা কু-যুক্তির অবতারণা করলেন, ক্ষত্রিয় রাজারা মৃগয়া করে ভক্ষ্য মাংস সংগ্রহ করেই থাকে। উত্তরে বালী বললেন যে, যে পাঁচটি মাত্র পঞ্চনখ ভক্ষ্য, শজারু, কুমির, গোসাপ, খরগোস, কচ্ছপ — বানর তার মধ্যে পড়ে না' (৪/১৭/৩৯/৪০)। রাম বললেন, ‘রাজ্য ভরতের, আমি তাঁর আজ্ঞায় পাপীর দণ্ড দিই, তুমি ভ্রাতৃবধূকে গ্রহণ করেছ, অতএব দণ্ডনীয়।' কিন্তু কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যটা ইক্ষ্বাকুদের ছিল না, ছিল বানরদের। রাম বললেন, ‘শিকারি তো লুকিয়েই প্রাণীবধ করে' (৪/১৮/৩৮)। বালী আগেই বলেছেন, 'বানরমাংস ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়ের অভক্ষ্য।' কাজেই শেষ পর্যন্ত স্বীকার না করলেও প্রতিপন্ন হয়ে রইল যে, রাম অধার্মিক উপায়ে কাপুরুষের মতো বালীকে বধ করেছেন। কেন এমন করলেন? একটি মাত্র উত্তরই সম্ভব, স্বার্থসিদ্ধি। বালী এত বড় বীর যে, রামের আশঙ্কা ছিল সম্মুখসমরে তিনি পরাজিতও হতে পারেন, তাই ক্ষাত্র-ধর্ম, বীরধর্ম জলাগুলি দিয়ে ‘যেন তেন প্রকারেণ' ইষ্ট সিদ্ধ করলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে বনবাসকালে চৌদ্দ হাজার রাক্ষসবধ কেমন যেন অবাস্তব সাজানো কাহিনী, রূপকথার উপাদান মনে হয়। প্রথম সম্মুখ সমরে রাম নৈতিকভাবে পরাজিত, বীরধর্মচ্যুত।

সীতাকে লঙ্কায় এনে রাবণ তাঁকে অশোকবনে রাখেন, রাক্ষসীদের নিযুক্ত করেন তাঁকে পাহারা দেবার জন্য। নিজে প্রায়ই এসে সীতাকে লঙ্কার সমস্ত ঐশ্বর্যের অধীশ্বরী হবার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে অনুরোধ করতেন রাবণকে গ্রহণ করতে। সীতা রাজি না হওয়ায় শেষবারে একমাস সময় দিয়ে বলেন একমাস পরেই তাঁকে কেটে রান্না হবে। এর মধ্যেই বানর সেনা চতুর্দিকে সীতার সন্ধানে গিয়ে হতাশ হলেন। হনুমান লাফ দিয়ে সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কায় এসে ঘুরতে ঘুরতে অশোকবনে এক গাছের উপরে বসে নিচে সীতাকে দেখতে পেলেন। রামের অদর্শনে বন্দিনী সীতার অবস্থা কী রকম? ‘উপবাসে কৃশতনু, দীনহীন, দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। বারেবারেই, যেন নির্মল প্রতিপদের চন্দ্রকলাটি' (৫/১৫/১৯)। হনুমানের সঙ্গে রামের প্রথম দেখার সময়ে রাম সীতাবিরহে আর্ত, বহু বিলাপ করেছেন তার আগে, কিন্তু সেই অবস্থায় হনুমান রাম লক্ষ্মণকে দেখেন, “শ্রীযুক্ত, রূপবান, বিক্রমে বৃষভশ্রেষ্ঠের ন্যায়, করিকরের মতো তাঁদের বাহু, উজ্জ্বলকান্তি নরবৃষভ দুটি। ... বিশালবক্ষা, সিংহস্কন্ধা দুই বীর। তাঁদের দুই হাত আয়ত, গোল যেন প্রাচীরের মতো' (৪/৩/১০, ১২, ১৪)। এই বর্ণনায় আর যাই থাক, বিরহক্লিষ্ট শীর্ণতা নেই। সেই হনুমানই সীতাকে দেখে প্রথমে যা লক্ষ্য করলেন তা হলো কৃশতনু, দীনহীনবেশ, ক্রমাগত দীর্ঘনিশ্বাস ফেলছেন। হনুমান সীতাকে আশ্বস্ত করলে সীতা রামের প্রত্যয়ের জন্য একটি ছোট দাম্পত্য কাহিনী বলে' নিজের চূড়ামণিটি তাঁকে দিলেন অভিজ্ঞান হিসাবে। সে মণি হনুমানের হাতে দেখে রাম বললেন, 'সেই কৃষ্ণায়তনেত্রাকে না দেখে এক মুহূর্তও বাঁচব না' (৫/৬/১০)। বললেন, ‘ঘন কালো যার চোখ দুটি, সে রাক্ষসদের মধ্যে থেকে কোনো পরিত্রাতার সন্ধান পাচ্ছে না, আমিই তার নাথ, এখন সে অনাথার মতো আছে' (৬/৫/১৫)। হনুমানকে সীতা রামের বিষয়ে যখন কুশল প্রশ্ন করেন, 'দীন ভ্রান্ত অবস্থায় তিনি কর্তব্য ধর্ম থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন না তো? সেই রাজপুত্র পুরুষোচিত কাজগুলি সব করছেন তো'? (৪/৩৬/১৮)। এ প্রশ্ন শুধু স্বামীর শারীরিক মঙ্গলবার্তার জন্য নয়, এ হলো কর্তব্যনিষ্ঠ ক্ষত্রিয়বীর, মর্যাদাবান রাজার শ্রেষ্ঠসত্তার কুশল সম্বন্ধে প্রশ্ন। এ প্রশ্নে রামের প্রতি সীতার সেই প্রেম দেখি যে প্রেম সম্মুখপানে চলতে, চালাতে জানে, যার মধ্যে দিয়ে প্রেমিকযুগলের সত্তার উত্তরণ ঘটে। একথা বলতে হলো এজন্যে যে, এ প্রেমের জাত আলাদা এবং কাহিনীর শেষদিকে বারবার সীতার এই প্রেমকেই অপমানিত, ধুলি-লুণ্ঠিত করা হয়েছে।

রাম সম্বন্ধে সীতার আশঙ্কাও ছিল, হনুমানকে বললেন, আমার এই নির্বাসনে রাম আমার ওপরে স্নেহ ত্যাগ করেননি তো? এই বিপদ থেকে আমার উদ্ধার করবেন তো? (৮/৩৬, ৪০)। এর প্রথমাংশে হয়তো কতকটা সত্য ছিল। যুদ্ধ শেষে স্বামী-স্ত্রীর প্রথম সাক্ষাতে দেখা গেল দীর্ঘ অদর্শনে রামের মনে সীতা সম্বন্ধে আশঙ্কা জন্মেছিল, স্নেহ বিলীন হয়েছিল। প্রশ্নের দ্বিতীয়ার্ধে : এই বিপদ থেকে আমাকে উদ্ধার করবেন তো? সত্যও হয়েছিল, মিথ্যাও হয়েছিল; সীতা লঙ্কাপুরীর বন্দিত্ব থেকে মুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর জন্য যুদ্ধ হয়নি, সেকথা রাম স্পষ্টই বলেন, এবং মুক্তি এল বঞ্চনার রূপ ধরে। সেকথা পরে।

লঙ্কায় প্রবেশ করে রামের মনে হয়েছিল, মৃগশাবকের মতো চোখ যার, সেই বৈদেহী কৃশ দেহে ভূমিশয্যায় শুয়ে আমার জন্যে শোকাতুরা হয়ে কষ্ট পাচ্ছেন (৬/২৪/৮,৯)। 'দেবকন্যার মতো যে সীতা কখন সেই সাধ্বী উৎকণ্ঠিত হয়ে আমার কণ্ঠ আলিঙ্গন করে আনন্দাশ্রু বিসর্জন করবেন?' (৬/৫/২০) যুদ্ধ শেষে হনুমান রামকে বলেন, সীতা রামকে দেখতে চান। শুনে ধার্মিক-শ্রেষ্ঠ রাম, ঈষৎ অশ্রুপ্লুত-নেত্রে যেন ধ্যানাবিষ্ট হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চারিদিক দেখে বিভীষণকে হুকুম দিলেন (৬/১১৪/৪, ৫) সীতা যেন স্নান করে সাজসজ্জা করে সভায় আসেন। এখানে রাম চাইলেন যেন, রাজবধূ বেশে সীতা সভায় অবতীর্ণ হন ও রামের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। দীর্ঘ অদর্শনের পর সীতাকে দেখবার অধীর আগ্রহ এর কাছে গৌণ হয়ে গেল। দীর্ঘ অদর্শনে অধীরা সীতা অবশ্য যেমন ছিলেন সেইভাবেই দেখা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর হুকুম মেনেই যেতে হলো। সীতা শিবিকায় করে আসছিলেন, চারিদিকে অসম্ভব ভিড় ; বিভীষণ লোকদের সরিয়ে শিবিকাটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। রাম তা দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘পায়ে হেঁটে আসুন সীতা' (৬/১১৪/৩০)। এতে হনুমান, লক্ষ্মণ, সুগ্রীব মনে করলেন, যেন সীতার প্রতি অপ্রীত হয়ে সীতা সম্বন্ধে এভাবে এই দারুণ ইঙ্গিত দিয়েছেন রাম (৬/১১৪/৩৩) জনাপবাদের ভয়ে রামের চিত্ত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেল। রাজনন্দিনী রাজকুলবধূ জনসমাকুল সভাগৃহে পায়ে হেঁটেই স্বামী সন্দর্শনে গেলেন।

সীতা রামের কাছে এসে প্রণাম করে দাঁড়ালে নতমুখী মৈথিলীকে দেখে রাম তাঁর হৃদয়ের অন্তর্গতভাব ব্যক্ত করতে শুরু করলেন (৩/ ১১৫/১)। একথাটির উল্লেখ করছি এইজন্যে যে, সীতার তথাকথিত অগ্নিপরীক্ষার পরে রাম বলেছিলেন যে, সীতার শুদ্ধতা নিয়ে তাঁর কোনো সংশয় ছিল না, শুধু প্রজাদের অপবাদের ভয়েই তিনি তাঁকে পরিত্যাগ করার কথা বলেন। কিন্তু তিনি যা বলেন তা তাঁর 'হৃদয়ের অন্তর্গতভাব’ একথা বাল্মীকি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন।


পরবর্তী  পর্ব প্রকাশিত হবে আগামীকাল, ০২/১২/২০২২


প্রকাশের তারিখ: ০১-ডিসেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org