|
রাইনিসে জেইতুং এবং সাংবাদিক মার্কসতপন মিশ্র |
এই কর্মকাণ্ডে মার্কসের দার্শনিক জ্ঞানের এবং অর্থনৈতিক তত্ত্ব সম্পর্কে গভীরতার পরিপূরক ছিল শ্রমিক-শ্রেণির জীবন সম্পর্কে এবং তৎকালীন বিজ্ঞান গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে এঙ্গেলসের অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণ। |
The Rheinische Zeitung für Politik, Handel und Gewerbe (ইংরাজিতে লিখলে Rhenish newspaper for politics, trade and commerce) জার্মানির কোলন শহর থেকে প্রকাশিত পত্রিকার হাত ধরে ১৮৪২ সালে কার্ল মার্কসের সাংবাদিকতার জীবন শুরু। গত অগাস্টের ২১ তারিখে ট্রিয়ের শহরে মার্কস হাউস দেখার পর আমাদের গন্তব্য ছিল কোলন শহর। জার্মানির কোলন শহরের ভিতর দিয়ে বিশ্বের অন্যতম এক গুরুত্বপুর্ণ নদী, রাইন, বয়ে গেছে। সে দেশের ইতিহাসের অনেক অধ্যায়ের সাক্ষী এই নদী। নদীর দু’পাড়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম রাইন দিয়ে শুরু। কোলন শহর জার্মানির রাজনৈতিক এবং ইদানীং কালে বিজ্ঞান প্রযুক্তি গবেষণার একটি গুরুত্বপুর্ণ কেন্দ্র। এই শহরে এসে অন্যান্য দ্রষ্টব্যের মধ্যে আমাদের ইচ্ছা ছিল শিল্ডারগাসে এলাকায় রাইনিসে জেইতুং-এর পত্রিকার সম্পাদকীয় কার্যালয়টি দেখার। গিয়ে দেখা গেল যে, এখানে পত্রিকা দপ্তরের কোন স্মৃতি নেই। ১৮৪৮ সালে নতুন প্রয়াশের রাইনিসে জেইতুং অর্গান অফ ডেমোক্রেসির প্রকাশস্থল হয়মারক্ট-এ একটি স্মৃতি ফলক রয়েছে। তবে ট্রিয়েরের মার্কস হাউসে যে তথ্য ভাণ্ডার রয়েছে, সেগুলি থেকে পত্রিকাটি এবং এর সঙ্গে সাংবাদিক হিসাবে কার্ল মার্কসের যোগ সহজেই বোঝা সম্ভব। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ‘নয়ে রাইনিসে জেইতুং অর্গান অফ ডেমোক্রাসি’ পত্রিকার কাজ শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। তখন মুখ্য সম্পাদক হিসাবে কাজ শুরু করেন কার্ল মার্কস এবং অন্যতম সহকারী হিসাবে ছিলেন ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। পত্রিকাটি মাত্র এক বছরের কিছু কম সময় চলে, এবং মার্কস ইংল্যান্ড চলে যাওয়ায় এই পত্রিকাটিও বন্ধ হয়ে যায়। মার্কস তাঁর সমস্ত সঞ্চয় এই পত্রিকা প্রকাশের জন্য ব্যয় করেন। কোলনের ‘সিটি আর্কাইভস’-এ দুটি সংবাদপত্রের ইতিহাস এবং সাংবাদিক ও বিপ্লবী হিসেবে মার্কসের ভূমিকার উপর মূল নথির একটি বড় সংগ্রহ রয়েছে- যদিও তা আমরা দেখতে পারিনি। এই সমস্ত তথ্যের খণ্ডগুলি ১৯৮৩ সালে "কার্ল মার্কস এবং কোলন ১৮৪২ –১৮৫২" শিরোনামের একটি প্রদর্শনী ক্যাটালগে প্রকাশিত হয়েছিল। ট্রিয়েরে থেকে কোলনে কার্ল মার্কস ১৮১৮ সালে ট্রিয়ার শহরের প্রায় মধ্যভাগে ব্রুকেন স্ট্রাসের বাড়িতে কার্ল মার্কসের জন্ম। বর্তমানে এই ঘরটি ‘কার্ল মার্কস হাউস’ নামে একটি মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই ঘরে নাহলেও এই শহরে তিনি ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত ছিলেন। পরে উচ্চশিক্ষার কারণের তাঁকে এক বছরের জন্য যেতে হয় জার্মানির বন শহরে। এখনে তাঁর পাঠ্য ছিল আইন। ১৮৩৬ থেকে ১৮৪১ অবধি তিনি ছিলেন বার্লিন শহরে যেখানে তিনি দর্শন শাস্ত্রে পিএচডি অর্জন করেন। এর পর তিনি ফিরে আসেন কোলন শহরে। সেই সময়ে জার্মানির অধিকাংশটাই ছিল প্রুশিয়া সাম্রাজ্যের অংশ। বার্লিন ছিল তার রাজধানী। তখনই কোলন শহরে রাইনিসে জেইতুং পত্রিকার হাত ধরে কার্ল মার্কসের সাংবাদিকতার জীবন শুরু হয়। রাইনিসে জেইতুং-এর চড়াই উতরাই মার্কস ১৮৪১ সালে প্রথমে সাংবাদিক এবং পরে মুখ্য সম্পাদক (১৮৪২ সালের অক্টোবর ১৫ থেকে) হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পত্রিকার প্রচার সংখ্যা প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পায়। মূলত রাজনৈতিক আলোচনা এই জনপ্রিয়তার কারণ। তখন সংবাদপত্রটি কয়েকজন উদার শিল্পপতিদের সাহায্যে চলছিল। মূলত মধ্যবিত্তদের মধ্যে প্রুশিয়ার নিপীড়নকারী সাম্রাজ্য এবং ক্যাথলিকদের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে মতামত তৈরির জন্য বেশ কিছু প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। রাইনিসে জেইতুং-এর এই বাড়বাড়ন্ত সরকারের পছন্দ হয়নি। ১৮৪২ সালের শেষের দিকে, প্রুশিয়ার সরকারের হস্তক্ষেপে সংবাদপত্রটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রুশিয়ার তৎকালীন রাজা চতুর্থ ফ্রেডরিক উইলিয়াম রাইনিসে জেইতুং কে "The Whore on the Rhine" অর্থাৎ রাইনের বেশ্যা আখ্যা দেন। ১ এপ্রিল, ১৮৪৩ নিষিদ্ধকরণের এই নির্দেশ কার্যকর হয়। তার আগেই ১৭ মার্চ, ১৮৪৩ তারিখের একটি বিবৃতিতে, মার্কস-সহ অন্যান্য সম্পাদকীয় কর্মীরা পদত্যাগের ঘোষণা করেন। অবশ্য সেই সময়ে কোলনের মার্কস বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান ফ্রিঞ্জস-এর মতে সংবাদপত্রের স্বাতন্ত্র রক্ষা নিয়ে প্রুশিয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অনেক সমালোচনা হয়। তার পর মার্কসের ফ্রান্সে নির্বাসন এবং পরে বেলজিয়াম ঘুরে আবার কোলনে ফিরে আসেন নতুন করে রাইনিসে জেইতুং প্রকাশ করার সঙ্কল্প নিয়ে। সঙ্গী সাংবাদিক ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ১৮৪২ সালে এঙ্গেলেসের সঙ্গে মার্কসের প্রথম কথোপকথন ছিল অপ্রীতিকর। এঙ্গেলসের একজন পরিচিতকে রাইনিসে জেইতুং পত্রিকার সম্পাদকীয় থেকে বের করে দেওয়ার কারণে এই দুই সৃষ্টিশীল বিপ্লবীর কিছু কথা কাটাকাটি হয়। পরে অবশ্য ১৮৪৪ সালে তাঁরা প্যারিসে পুনরায় মিলিত হন। এখান থেকে শুরু হয় তাঁদের বৈপ্লবিক সহযোগিতা। এই কর্মকাণ্ডে মার্কসের দার্শনিক জ্ঞানের এবং অর্থনৈতিক তত্ত্ব সম্পর্কে গভীরতার পরিপূরক ছিল শ্রমিক-শ্রেণির জীবন সম্পর্কে এবং তৎকালীন বিজ্ঞান গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে এঙ্গেলসের অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণ। নব কলেবরে রাইনিসে জেইতুং ‘নয়ে রাইনিসে জেইতুং অর্গান অফ ডেমোক্রেসি’ অর্থাৎ নতুন কলেবরের রাইনিসে জেইতুং ১৮৪৮ সালের জুন মাসে কমিউনিস্ট লীগের পক্ষ থেকে কার্ল মার্কস একটি দৈনিক সংবাদপত্র হিসাবে শুরু করেন। কমিউনিস্ট লীগ একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দল হিসাবে লন্ডনে ১ জুন ১৮৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্রিস্টিয়ান ফ্রিঞ্জস কার্ল মার্কসের জন্মের ২০০ বছর পুর্তিতে ১৮৪২ এর মার্কসের লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করেন “..not a communist, but a radical democrat" এবং ১৮৪৮ সালের নতুন রাইনিসে জেইতুং পত্রিকার লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করেন “... a radical democrat to a class conscious revolutionary”। এর অর্থ করলে দাঁড়ায় যে ১৮৪২ সালের মার্কস একজন কমিউনিস্ট ছিলেন না বরং ছিলেন উগ্র গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন কিন্তু ১৮৪৮ সালের মার্কস হয়ে ওঠেন একজন শ্রেণি-সচেতন বিপ্লবী। ক্রিস্টিয়ান ফ্রিঞ্জস, কোলনের বাসিন্দা এবং মার্কসের রাজনৈতিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেন। তিনি রোজা লুক্সেমবুর্গের আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং কোন রাজনৈতিক সংগঠন ব্যতিরেকে স্বাধীনভাবে শ্রমিকদের বৈপ্লবিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের তত্ত্ব সমর্থন করেন। যে যাই বলুন না কেন এই দুই পত্রিকার কয়েকটি প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করলেই সাংবাদিক কার্ল মার্কসের একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী কার্ল মার্কস হয়ে ওঠার ধারা বোঝা আমাদের কাছে সহজ হবে। ১। ১৮৪২ সালের ২৫ অক্টোবর রেইনিসে জেইতুং পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ (Debates on the Law on the Theft of Wood) মার্কসের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অরণ্যবাসী দরিদ্র মানুষের অরণ্য সম্পদের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক লেখার মাধ্যমে সোচ্চার প্রতিবাদ। সেই মর্মে প্রুসিয়ার সরকার অরণ্য সম্পদ ব্যবহারের উপর বেশ কিছু বাধা নিষেধ আরোপ করে। পত্রিকার দুটি সম্পাদকীয় অফিস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমাহামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। ২০১৮ সালে কার্ল মার্কসের ২০০তম জন্মদিন উপলক্ষে, একটি স্মারক ফলক হিউমার্কট ৬৫ বাড়িটির বাইরে, সম্মুখভাগে সংযুক্ত করা হয়। এখন একটি ক্যাফে রয়েছে। এখানে থাকা প্রায় ৯৫% নথি আংশিকভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কোলনের ‘সিটি আর্কাইভস’ এই দুটি সংবাদপত্রের সম্পুর্ণ নথির অনেকটাই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানা যায়। এখনও এই সমস্ত নথির ডিজিটাইজেসানের কাজ চলছে। প্রকাশের তারিখ: ১১-অক্টোবর-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |