ঋত্বিক ঘটক বিজন ভট্টচার্য ও মাতৃতত্ত্ব

রণেশ দাশগুপ্ত
ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো' মাতৃতান্ত্রিকতার বিপ্লবী দলিল। এই চলচ্চিত্রের কাজটি বিশেষভাবে পরীক্ষণীয় এ কারণে যে এর মধ্যে ঋত্বিক ও বিজন একত্রিত রয়েছেন। এঁরা দুজনের প্রত্যেকেই রূপসৃষ্টির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রতিভূ হওয়া সত্ত্বেও একটি কাজের অঙ্গনে হাতে-হাত রেখে দাঁড়িয়েছেন।

[ঋত্বিক ঘটকের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে গতবছর মার্কসবাদী পথের ইউটিউব চ্যানেলে দুটি সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হয়েছিল। কথা বলেছিলেন চলচ্চিত্র বিদ্যার দুই অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ও মানস ঘোষ। এ-বছরে আমরা তিনটি লেখা পুনর্মুদ্রিত করছি। প্রথম লেখাটি বিজন ভট্টাচার্যের। দ্বিতীয় লেখাটি রণেশ দাশগুপ্তের। এ-দুটি লেখাকে পরিপূরক বলা চলে এক অর্থে। একদা সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন ঋত্বিকের মধ্যে হলিউডের প্রভাব নেই, এবং তিনি প্রকৃত অর্থে বাঙালি। আর ঋত্বিকও আজীবন রত থেকেছেন ভারতীয় চলচ্চিত্র-ভাষা সৃষ্টিতে। যদিও তাঁর আরেক কমরেড মৃণাল সেন এ-প্রসঙ্গে ভিন্ন মতই পোষণ করতেন; তাঁর কাছে চলচ্চিত্রের ভাষা আন্তর্জাতিক। ঋত্বিকের মতো বিজন ভট্টাচার্যও ভারতীয় নাটকের ফর্ম খুঁজে বেরিয়েছেন। ফলে তাঁদের শিল্প-ভাবনার মধ্যে সখ্য রয়েছে। রণেশ দাশগুপ্ত তাঁদের সৃষ্টিতে ‘গ্রেট মাদার আর্কেটাইপ’-র ব্যবহার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। রণেশ দাশগুপ্তের অভিমত নিয়ে কেউ ভিন্ন মত পোষণ করতে-ই পারেন; সে-বিষয়ে বিতর্ক ঋত্বিক ও বিজন চর্চাকেই সমৃদ্ধ করবে। ঋত্বিক বিষয়ে কতকগুলো কথা ভেসে বেড়ায়, সেগুলিকে ছানবিন করেছেন বাসব দাশগুপ্ত, এবং তাঁর অ-জনপ্রিয় অভিমত স্বাভাবিকভাবেই উসকে দেবে বিতর্কের সম্ভাবনা। পরের অংশে বাসব দাশগুপ্ত অভিনিবেশ দিয়েছেন মার্কস এবং ইয়ুং বিষয়ে ঋত্বিকের অভিমত নিয়ে। সত্যি-ই কি ইয়ুং এবং মার্কসকে মেলানো যায়? এ-নিয়েও বাসব দাশগুপ্ত তাঁর অভিমত জানিয়েছেন। সামগ্রিকভাবে ঋত্বিককে তাঁরা কীভাবে দেখেছেন, পড়েছেন, তর্ক করেছেন সেটিকেই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। –মার্কসবাদী পথ]

ঋত্বিক ঘটক ও বিজন ভট্টাচার্য বাংলায় এমন দুজন নাট্যশিল্পী যাঁরা যুগ-যুগান্তর সঞ্চিত শোষণ ও লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে শ্রমজীবী জনগণের বিদ্রোহকে ভাষা দিতে গিয়ে প্রবলভাবে মাতৃতান্ত্রিক ভাব-প্রতীক ব্যবহার করেছেন। দুজনেই যেহেতু বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম বা মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে জীবনাদর্শরূপে গ্রহণ করেছিলেন, সেইজন্য দুজনের কাজই আদৃত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে বিতর্কেরও সৃষ্টি করেছে। এর কারণ, মাতৃতান্ত্রিক ভাব-প্রতীককে বস্তুবাদী বলা গেলেও অগ্রসর বিজ্ঞানের পরিপোষক বলা যায় না। এই সম্প্রতি- দুই নাট্যশিল্পীর দুজনেরই প্রায় একটানা চল্লিশ বছরের কাজ যেহেতু তাঁদের মৃত্যুর পরেও আগামীতে বেশি-বেশি আদৃত হবে বলে মনে করার সৃষ্টি হয়েছে ইতিমধ্যেই, সেজন্যে বিতর্কের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচ্য। সামঞ্জস্য যদি আসে তবে কীভাবে আসবে, সেটি চিন্তনীয়।

এই দুই নাট্যশিল্পীই আদিম সাম্যবাদে ফিরে যাওয়ার জন্যে তাগিদ দেবার পরিবর্তে শ্রেণীসংগ্রাম দ্বারা শ্রেণীসমাজকে ভেঙে চুরমার করে সভ্য সমাজের চরম উৎকর্ষে পৌঁছবার দিকেই তাঁদের মূল্যবোধগুলিকে বিন্যস্ত করতে চেয়েছেন। তাঁদের কাউকেই লোকনাট্যকারও বলা যায় না। দুজনেই আধুনিক নাট্যশিল্পী। বিজন ভট্টাচার্যের ‘দেবী গর্জন’ নাটক এবং ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি তক্কো আর গপ্পো'র চিত্রনাট্য থেকেই এটা প্রমাণিত। ব্যতিক্রমী আধুনিকতম রূপের মধ্যে একটা আবহমানতার সারসত্তাকে কেন তবে ধরে রাখতে চাইলেন তাঁরা? মাতৃতান্ত্রিকতার ভাবধারা আদিম সাম্যবাদী মানবগোষ্ঠীগুলিতে সর্বময় হিশেবে অধিষ্ঠিত থাকার পরে সামন্ততন্ত্রের আমলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রথা ও প্রসারের ভিত্তিতে শ্রেণীসমাজ ব্যবস্থায় একদিকে অভিজাত এবং অন্যদিকে জনগণের দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে যায়। এই দ্বিধাবিভক্ত ভাবধারাকে কীভাবে বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদের সঙ্গে যুক্ত রাখলেন তাঁরা? ভাবের জগতে সামন্ত্রতন্ত্রের শাসকশ্রেণীর মাতৃ-অর্চনা যে-প্রভাব সৃষ্টি করেছিলেন, তাকেই বা কী করে কাটিয়ে উঠলেন তাঁরা? এই ধরনের প্রশ্নগুলির মীমাংসা প্রয়োজনীয়। বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদের সঙ্গে মাতৃতান্ত্রিক ভাব-প্রতীকগুলির সামঞ্জস্যবিধানের সম্ভাব্যতার জন্যে এই প্রয়োজন।

কেন তাঁরা দুজনেই নাটকে এবং চিত্রনাট্যে মাতৃতান্ত্রিক ভাবপ্রতীক ব্যবহারের দিকে এত বেশি ঝুঁকেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর কয়েকভাগে দেয়া যেতে পারে। 

এই দুই বিদ্রোহীর প্রায় চল্লিশ বছরের কাজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, দুজনেই আধুনিক নাট্যজগৎ থেকে বেরিয়ে গণনাট্যে উপকরণের সন্ধানে শ্রমজীবী জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে এমন কতকগুলি ভাবপ্রতীকের খোঁজ করছিলেন, যেগুলোর মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদ নিয়ে লেখা আধুনিকতম নাটককেও জনগণের সংগ্রামী বোধের মর্মভূমিতে সহজেই স্থাপন করা যেতে পারে। মাতৃপ্রতীকই তাঁদের কাছে সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী মাধ্যম বলে এই সময়ে মনে হয়েছিল। এই মাতৃপ্রতীককে নিয়ে তাঁরা আমৃত্যু কাজ করেছিলেন।

তিরিশের দশকের শেষে এবং পুরো চল্লিশের দশকে এই দুই শিল্পীর প্রথম যৌবনের একই সঙ্গে অতিজিজ্ঞাসু ও সর্বগ্রাহী মনে মার্কসবাদী-লেনিনবাদীদের একটা প্রিয় কথা রং ধরিয়েছিল। সেটা হচ্ছে—‘জাতীয় রূপাবরণে সমাজতান্ত্রিক বিষয়বস্তু।' দুজনেই যেমন জনগণের মুক্তির উপায়কে সাম্যবাদী সমাজের রূপরেখায় স্থাপন করেছিলেন, তেমনি সঙ্গে-সঙ্গে বিনা দ্বিধায় বাংলায় গণমানসের প্রিয় রূপরেখাগুলিকে নিয়ে পরীক্ষা করার কাজে অন্যান্য সাথীদের সঙ্গে মিলে গণনাট্য আন্দোলনের যৌথ আত্মানুসন্ধানের কর্মী হিশেবে নিজেদের উৎসর্গিত করেছিলেন। মাতৃ-ভাব-প্রতীক অথবা মাতৃতন্ত্রকে বিপ্লবের কাজে ব্যবহার করার প্রাথমিক উৎস-সূত্র এখানেই। 

দুজনেরই জীবনে আর-একটা তাগিদ মাতৃ-প্রতীককে প্রাধান্য দেবার জন্যে উপকরণের সন্ধানী করেছিল। শ্রমজীবী নারীকে অবক্ষয়ী সামন্তবাদী-পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যে-চরম দুঃখ, লাঞ্ছনা ও অবমাননার চক্রে নিষ্পেষিত করে আসছে; এবং এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে বিশেষ করে বাংলায় শ্রমজীবী নারীর তরফ থেকে যে-মর্মন্তুদ আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তাতে বিজন ভট্টাচার্য ও ঋত্বিক ঘটক সমসাময়িক আরও অন্যান্য যুবার মতো বিশেষ করে চল্লিশের দশকের যুদ্ধ দুর্ভিক্ষ ও দেশভাগের সময়ের শ্রমজীবী নারীর চরম অবমূল্যায়নে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা দুজনেই তখন সেই সমাজের ভিত্তিকে রাতারাতি গড়ে তুলবার ব্যবস্থা করতে না-পেরে শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে মাতৃরূপের বর্ম তৈরি করেছিলেন এবং নারীকে সেই বর্ম পরিয়েছিলেন। এই বর্মের ছাঁচটাকে তাঁরা দুজনেই নিয়েছিলেন বাংলার নিপীড়িত জনগণের কাছ থেকে, যারা হাজার-হাজার বছর ধরে তাদের নারীকে যে-দুর্ভেদ্য ভাব-প্রতীক দ্বারা মর্যাদার আসনে বসিয়ে চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও সেই মর্যাদাকে রক্ষা করে এসেছে। নারীকে শক্তিস্বরূপিণী করতে গিয়ে শ্রমজীবী জনগণ যে-অতিপ্রাকৃত শক্তি আরোপ করে এসেছে, তাকেও গ্রহণ করতে বাধেনি তাই। 

[আরও পড়ুন- "অযান্ত্রিক ছবিটির কথাই বলি। ধুলোর ঝড় ও জলের ছড়া— ফিল্ম তৈরির একটি সুচারু প্রতীকের মাধ্যমে সামনের পথের নিদারুণ বিপত্তির আভাস দিয়ে বিমলের জগদ্দল তো রওনা হয়ে গেল। ভাঙা সানকিতে পাগলের এক সাংকেতিক তবলা লহরা শুনলাম আমরা। জীবনের চড়াই-উৎরাই ধরে বিমলেরা যেমন শোনে। চমৎকৃত হলাম আমরা।", গান শেষের গান, বিজন ভট্টাচার্য]

তৃতীয় যে-ঘটনা দুজনকেই মাতৃতান্ত্রিকতার প্রতি আকৃষ্ট করেছিল, সেটা হচ্ছে সম্প্রদায় নির্বিশেষে এবং ধর্মনির্বিশেষে মাতৃপ্রতীকগুলির গভীর ঐতিহ্যিক আকর্ষণীয়তা। '৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের কারণগুলি ও পরিণতি এই দুই নাট্যশিল্পীর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। যে- সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও হানাহানি দেশভাগের আগেই পুঞ্জীভূত হয়ে দেশভাগের পরে তাদের সমস্ত গলিত বিষাক্ত পুঁজি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল এবং শ্রমিকশ্রেণী এবং কৃষকদের সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ করে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদেরও একাংশকে বিভ্রান্ত করে বসেছিল, তার বিরুদ্ধে দুজনেই দাঁড়িয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় হানাহানির দরুন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিপ্লবী মূল্যবোধগুলিকে সংহত করার উপায় তাঁরা পেয়েছিলেন জনগণমানসে মূল্যবোধের ক্ষেত্রে মাতৃতান্ত্রিক ভাব-প্রতীকগুলিতে। তাঁরা দেখেছিলেন, জনগণ কতকগুলি মূল্যবোধ হারায়নি এবং এই সুরক্ষিত মূল্যবোধগুলির একটি হচ্ছে মাতৃতান্ত্রিকতা।

এ বিষয়টিকে বৈজ্ঞানিক সাম্যবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নিতে পারার মূলে আরেকটা ব্যাপারও উৎসাহ যুগিয়েছিল। বিশ্বের একজন সেরা কমিউনিস্ট নাট্যশিল্পী বার্টোল্ট ব্রেশটের প্রবল মাতৃ-ঝোঁক বস্তুতপক্ষে বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র উপরিউক্ত আকাঙ্ক্ষিত সামঞ্জস্য বিষয়ের প্রয়াসকে মহিমান্বিত করেছে। এ প্রসঙ্গে ‘মাদার কারেজ’, ‘ককেশিয়ান চক সার্কেল' উল্লেখ্য। ব্রেশট তাঁর মাতৃতান্ত্রিক ঝোঁককে শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী নরনারীর সংগ্রামকে ও বিপ্লবে বিদ্রোহে জার্মন পরিবেশের ভিতরে এবং বাইরে স্বচ্ছন্দে কাজে লাগিয়ে যে-বিশ্বব্যাপী রেওয়াজ এনে দিয়েছেন, তাতেও বিজন ভট্টাচার্য ও ঋত্বিক ঘটক অনুপ্রাণিত বোধ করেছেন নিশ্চয়। 

[ আরও পড়ুন-  "ঝড়ের কাছে ঠিকানা গচ্ছিত রেখেছিলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক। অজানা সংকটময় পথে হেঁটেছিলেন এবং হাঁটতে হাঁটতে জুড়তে চেয়েছিলেন। ছিন্নমূল হওয়া এবং জুড়ে থাকতে চাওয়ার আকুতি নিয়তই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টি কর্মে। সেই ঝড়ের ঠিকানা-ঠিকুজির খোঁজে রত হয়েছেন দুই পরিচালক সঈদ আখতার মির্জা (জ. ১৯৪৩) ও কুমার সাহানি (১৯৪০-২০২৪)।" ] 

চল্লিশের দশকে বাংলা গণনাট্য আন্দোলেনর উদ্বোধন ও প্রাথমিক অভ্যুত্থানে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ নাটকের মঞ্চায়ন মাতৃতান্ত্রিকতার সপক্ষে একটা অগ্রসর চিন্তার বাতাবরণ তৈরি করেছিলেন, এ কথাটাও এখানে প্রণিধানযোগ্য। আমাদের আলোচ্য দুই নাট্যশিল্পীর কাজ গণনাট্য আন্দোলনের এই প্রচেষ্টার সঙ্গেও আত্মিকভাবে যুক্ত ছিল। 

উপরিউক্ত ঘটনাটি থেকে প্রাথমিক সিদ্ধান্তে আমরা আসতে পারি।

আদিম সাম্যবাদী মানবগোষ্ঠীকে বিপর্যস্ত করে যে-শ্রেণীসমাজের উদ্ভব হওয়ার দরুণ মাতৃতান্ত্রিকতার একটা নিছক ভাববাদী এবং সংকীর্ণ স্বার্থবাদী প্রয়োগ ঘটিয়েছিল সামন্ততন্ত্রের শাসকগোষ্ঠী, তার পরবর্তী অবক্ষয়ী রূপাবরণগুলি বিজন ভট্টাচার্য ও ঋত্বিক ঘটককে কোনভাবে মোহগ্রস্ত করতে পারেনি। কারণ, তাঁরা দুজনেই অভিজাত মূল্যবোধকে নিয়ে কাজ করার কথা ভাবতেই পারেননি। তাঁরা লোকায়ত মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করেছেন। এই লোকায়ত মূল্যবোধগুলিকে তাঁরা আবহমান হিশেবে দেখলেও যে-নিপীড়িত লোকসমাজকে নিয়ে তাঁরা কাজ করেছেন, সেখানে শুধু যে শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চল্লিশের দশকের পরে আগামী শতাব্দীকালের জন্যে উন্মোচিত হয়েছে তা নয়, এই বিদ্রোহের প্রস্তুতিকে তাঁরা দেখেছেন অতীত বহু শতাব্দীতে পুঞ্জীভূত হতে। এই কারণেই ছৌ নাচের মুখোশগুলিকে ঋত্বিক ঘটক দেখেছেন লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে আঘাতের জন্যে প্রয়োজনীয় অবনত শ্রেণীর মহাক্রোধের অভিব্যক্তি রূপে। বিজন ভট্টাচার্যের বেদে এবং সাপুড়িয়াদের মনসা- মঙ্গলের প্রতীকগুলির মধ্যে অনায়াসে দিতে পেরেছেন অবনত শ্রেণীগুলির সংহতির বিদ্রোহী সচেতনতা। 

বস্তুত লোকায়তকে অপরিবর্তনীয় আবহমানরূপে রেখে এঁরা দুজনে কোন কাজেই প্রয়োগ করেননি । এঁরা লোকায়তকে আবহমান দেখেছেন তার দুর্দমনীয় পরিবর্তনীয়তায়। এই আবহমানতা বিদ্ৰোহী বিপ্লবী গতিশীলতা। এই গতিশীলতার প্রধান চালক শ্রমজীবী জনগণ, যার বৈপ্লবিক ও বিদ্রোহী সংহতি চুম্বক হিশেবে কাজ করে মাতৃপ্রতীক। সেইজন্যে মাতৃপ্রতীকের আদর তাঁদের কাছে।

যদি কোন স্ববিরোধিতা এই দুই শিল্পীকে উত্ত্যক্ত করে থাকে, তবে তা আর যাই হোক অভিজাত-প্রভাবিত ভাবধারায় সংক্রমিত স্ববিরোধিতা নয়। এ বিষয়ে তাঁদের কাজ বাংলা নাট্যশিল্পরূপে একটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট অগ্রপদক্ষেপ। লোকায়তকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবার দিকে তাঁদের ঝোঁকের এটা বলিষ্ঠ ইতিবাচকতা অর্জনে সহায়ক হয়েছে। লোকায়তকে অভিজাত থেকে তীব্র শ্রেণীসংগ্রামের ধারক-বাহক হিশেবে পৃথক করে দেখেছিলেন বলেই তাঁরা মাতৃপ্রতীককে কমিউনিস্ট ইস্তাহারের নির্বিত্ত শ্রমজীবী প্রয়াসের প্রতীক করতেও দ্বিধা করেননি।

[আরও পড়ুন-  "এই কারণেই হয়তো পরে তাকে ছিন্নমূল ভবঘুরেতে পরিণত হতে হবে। কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার অবদান বোঝা যায়, যখন অসংখ্য পরবর্তী প্রজন্মের পরিচালক তাকে নানাভাবে সম্মান জানান। আমি নিজেও তার একটি সাউন্ড ট্র্যাক ব্যবহার করেছিলাম, একজন মহিলার উপর নির্যাতন দেখাতে গিয়ে, তার হেরে না-যাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে।"] 

অর্থাৎ লোকায়তের ব্যাপারে আতিশয্য আধুনিক সাম্যবাদী বিপ্লবকে ছত্রাকার করার পরিবর্তে কেন্দ্রীভূত করেছে।

আরেকটি আতিশয্যও এখানে বিচার্য।

ক্রোধ, যন্ত্রণা ও বেদনা মাঝে-মাঝে বিজন ভট্টাচার্যের নাটক এবং ঋত্বিক ঘটকের চিত্রনাট্যকে এত ভারাক্রান্ত করেছে যে মনে হয় তাঁরা দুজনে ইয়োরোপীয় ক্রুদ্ধ নাট্যকারদের মানবজীবনকে অর্থহীন প্রতিপন্ন করার অকাজের অনুষঙ্গী। কোনরকম ইচ্ছাসুখের মাধুর্যের সামান্য অবকাশটুকুকেও তাঁরা রাখতে নারাজ। বরং এর বিপরীতটাকে উপস্থিত করা যেন তাঁদের একটা মূল প্রবণতা। 

‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো' চিত্রনাট্য কিংবা ‘চলো সাগরে' নাটকে আত্মসংঘাতের উপরেও কোন আব্রু নেই। 

কিন্তু, তবু কি এঁরা জীবনকে এবং নরনারীর আত্মপ্রকাশকে এবং গণবিপ্লবকে কোনভাবে বদ্ধ গলিতে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন কোন নাট্যকর্মে?

এটা কেউ দেখাতে পারবেন না অবশ্যই। 

বরং জীবনকে, নরনারীর আত্মপ্রকাশকে এবং গণবিপ্লবকে অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্যেই যন্ত্রণা ও বেদনার আতিশয্য। শ্রমজীবী মানুষের অবিনশ্বরতাকে দুই শিল্পীই তাঁদের কাজের মর্মভূমিতে রেখেছেন বলেই দাউদাউ করে জ্বলা আগুনে পুড়ে মানুষ খাঁটি হয়ে বেরিয়ে আসছে, এ সত্য সুস্পষ্টভাবেই দুজনের কাজে রয়েছে আনুপূর্বিক। 

শ্রমজীবী জনগণ কোন অবস্থাতেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। তারা কোন বিচ্ছিন্নতা এলে তাকে দূর করার জন্যে বিপ্লবে নেমে নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার সংগ্রামে ব্রতী হয়। এটা ইতিহাসের উন্মোচনী ধারা। এই অবিচ্ছিন্নতাকে বিজন এবং ঋত্বিক শুধু আদর্শবাদ নয় অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েও আয়ত্ত করেছিলেন। এ কারণেই, একা-একা ভেবেছেন কোন-কোন সময়ে, কিন্তু একা থাকেননি। নিঃসঙ্গ হবার কিংবা নিঃসঙ্গ জীব অথবা মহামানব হবার বাসনাকে পরিহার করেছেন বড়-বড় বিপর্যয়েও। তাছাড়া নিঃসঙ্গ হবার উপায় তাঁদের ছিল না তাঁদের কাজের প্রকৃতির জন্যেও। তাঁরা ছিলেন নাট্যশিল্পী। নাটমঞ্চেই হোক অথবা চলচ্চিত্রেই হোক, তাঁরা ছিলেন দলপতি। কাজের ক্ষেত্রে ছিল অনেককে নিয়ে অবিচ্ছেদ্য সংসার। একাকী থাকার উপায় ছিল না এই কর্মীদের। দল ভাঙলেও তাই আবার জোড়া লেগেছিল দল। তাছাড়া ক্ষমতার জন্যে ক্ষমতাদখল কিংবা আঁকড়ে ধরে থাকার নেতৃত্ব এঁদের দুজনের একজনও কামনা করতেন না। এঁদের সুযোগই ছিল না যে অধিপতির একাকীত্ব জাহির করবেন। চল্লিশের দশকের গণনাট্য কর্মীরা গত তিন দশক ধরে বিভক্ত হলেও যে-কারণে একাকী হতে পারেননি, সেই কারণে ঋত্বিক ও বিজন একাকী হতে পারেননি। এঁরা কাজ ছাড়েননি। এঁরা অক্লান্ত কর্মী। এঁদের সকলের সম্বন্ধেই এ কথা প্ৰযোজ্য৷

 অবক্ষয়ীরা বাংলা গণনাট্যের কর্মীদের মন ভেঙে দেবার জন্যে বহু চেষ্টাই করেছে একজনকে আরেকজনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিশেবে দাঁড় করিয়ে। কিন্তু বাংলা গণনাট্য ধ্বসে পড়েনি, যদিও বহু নতুন - নতুন কর্মীর আবির্ভাবে ও চাপে দলের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। গণবিপ্লবের মূল তারে আঘাতই যেহেতু সকল গণনাট্য সংস্থার বৈশিষ্ট্য থেকেছে, সেজন্যে বিভাজনেও ঐক্য ভেঙে যায়নি। বিজন ভট্টচার্য ও ঋত্বিক ঘটকের নিরন্তর গণনাট্য-সাধনার জয়ধ্বনি করি এই ভেবে যে এই দুই নাট্যশিল্পী উপরিউক্ত ধারার সাধনায় ব্রতী থেকেছিলেন আমৃত্যু। মাতৃতান্ত্রিকতা তাঁদের এইভাবে ব্রতী থাকার পক্ষে সহায়ক ছিল বলে মাতৃতন্ত্রের জয়ধ্বনি দেব। 

ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো' মাতৃতান্ত্রিকতার বিপ্লবী দলিল। এই চলচ্চিত্রের কাজটি বিশেষভাবে পরীক্ষণীয় এ কারণে যে এর মধ্যে ঋত্বিক ও বিজন একত্রিত রয়েছেন। এঁরা দুজনের প্রত্যেকেই রূপসৃষ্টির ক্ষেত্রে স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রতিভূ হওয়া সত্ত্বেও একটি কাজের অঙ্গনে হাতে-হাত রেখে দাঁড়িয়েছেন। শুধু তাই নয়। এতে তৃপ্তি মিত্রের জন্যে স্থান করার মধ্যে দিয়ে বুঝতে পারা গিয়েছে গণনাট্যের চল্লিশ বছরের কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করার সুতোটাকে ছিঁড়ে ফেলে দেননি। 

আরও কথা আছে। গণনাট্যের বিভাজনের একটা মূল কারণ কমিউনিস্টদের বিভাজন। অর্থাৎ কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক বিভাজন। 'যুক্তি তক্কো আর গপ্পো'তে এই রাজনৈতিক বিভাজনকে মায়া বলে উড়িয়ে না-দিয়েও কমিউনিস্টদের ঐক্যের অবিচ্ছেদ্য সূত্রটিকে প্রত্যক্ষ করিয়েছেন ঋত্বিক ঘটক। এই একান্ত সম্ভবপর ঐক্যের প্রতীক হিশেবেই যেন ঋত্বিক এবং বিজন একদিকে যেমন রূপসৃষ্টির, তেমন সঙ্গে-সঙ্গে রাজনৈতিক বৈপ্লবিক সংগ্রামের জন্যে বিপ্লবীদের মিলনের একটা ইশারা রেখেছেন এই ছবিতে। 

মাতৃতন্ত্র এখানে শ্রমজীবী জনগণের বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রামের বক্তব্যকে বিজ্ঞানের ভাষাতেই ব্যাখ্যা করতে ইতস্তত করেনি। 

এখানে একটি বিশেষ নামকে যুক্ত করে দিয়েছেন ঋত্বিক। সে নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

বিজন ভট্টাচার্য ও ঋত্বিকের মাতৃতান্ত্রিকতা যে প্রকৃতপক্ষে অপ্রাকৃত দেবীত্বের ব্যাপার নয়, সেই বক্তব্যকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলবার জন্যেই এই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামের অবতারণা। 

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শক্তিস্বরূপিণী বলে উপস্থিত করেছেন সংগ্রামী শ্রমজীবী নারীদের। কলে-কারখানায় ক্ষেতেখামারে কর্মরতা নারীরা শোষণের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহে সামনের সারিতে রয়েছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল্যবোধে। এটাই আধুনিক মাতৃতান্ত্রিকতা। শক্তিস্বরূপিণীর তত্ত্ব। বিপ্লবধাত্রীর তত্ত্ব। নারীর জন্যে সমমর্যদার ভিত্তি। রূপ হচ্ছে সংগ্রাম ও শ্রমের একটা বহিঃপ্রকাশ। গায়ের রং কিংবা গঠন সেখানে ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্যমাত্র। একই কারণে ধর্মবিশ্বাসের পার্থক্য এই বিপ্লবী নারীসত্তা বা মাতৃতান্ত্রিকতার মধ্যে কোন পার্থক্যের রেখা টানে না। এর কোন বিশেষ জাত নেই। যে সাম্যবাদী বিপ্লব সমস্ত জাতি ও মানুষকে স্বাধীনতার মঞ্চে সমমর্যাদা দিয়ে দাঁড় করাতে চায়, মাতৃতান্ত্রিকতা তারই প্রতীক। 

যুক্তি তক্কো গপ্পো’তে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামোল্লেখ একটা নিছক শুভেচ্ছা নয়। 

এই নামোল্লেখ সাম্যবাদী বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার অবধারিত প্রকাশ।

বিজন ভট্টাচার্য ও ঋত্বিক ঘটকের মাতৃতান্ত্রিকতার জনগণাত্মক সম্পর্কের এক বড় প্রকাশ তাঁদের দুজনেরই আঞ্চলিক গণভাষার ব্যবহারে। নাটকে ও চিত্রনাট্যে তাঁরা দুজনেরই ব্যবহার করেছেন সেই ভাষা, যা পুববাংলারই হোক অথবা পশ্চিম বাংলারই হোক, একান্ত শ্রমজীবী নরনারীর ভাষা এভাবেও তাঁরা দুজনে মাতৃতন্ত্রকে কোন পরিশীলিত অভিজাত বিশ্বদর্শনে যুক্ত করার চেষ্টা না করে রেখেছেন মাটির কাছাকাছি। এই মাতৃভাষার জনগণাত্মক ব্যবহার মাতৃতন্ত্রকে জাত-ধর্মের গণ্ডি ভাঙতে সাহায্য করেছে। 

প্রথম প্রকাশ- সাহিত্যচিন্তা, মে ১৯৮৬
সূত্র- শিবাদিত্য দাশগুপ্ত ও সন্দীপন ভট্টাচার্য (সম্পা.), সাক্ষাৎ ঋত্বিক, দীপায়ন

আরও দেখুন- ঋত্বিক শতবর্ষে 'ঋত্বিক তন্ত্র' । মুখোমুখি সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় 
                             শতবর্ষে ঋত্বিক স্মরণ | মুখোমুখি মানস ঘোষ


প্রকাশের তারিখ: ০৩-নভেম্বর-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org