|
নদী, নথি ও নাগরিকত্বঋতপ্রিয়া নন্দী |
|
চরে যাওয়ার রাস্তা আসলে কোনও একটিমাত্র রাস্তা নয়। কোথাও বালির পথ, কোথাও শুকিয়ে আসা নদীর বুকের ওপর দিয়ে হাঁটা, কোথাও আবার নৌকার অপেক্ষা। পদ্মার এই পাড়ে এসে প্রথম যে বিষয়টি বুঝতে হয়, তা হল এখানে মাটি নিজেই পরিবর্তনশীল। এই চরগুলি কেবল নদীর বুকে জেগে ওঠা ভূখণ্ড নয়। এগুলি একই সঙ্গে সীমান্ত-চর, যেখানে নদীর ভাঙন ও সীমানার অনিশ্চয়তা মানুষের জীবন, চলাচল ও নাগরিকত্বকে প্রতিনিয়ত পুনর্গঠিত করে। যে জমিকে আজ বসত বলা হচ্ছে, কয়েক মাস পরে সেটিই হয়তো নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে। আবার নদী সরে গেলে অন্য কোথাও নতুন মাটি জেগে উঠবে। সেই নতুন মাটিকে ঘিরেই তৈরি হবে নতুন বসতি এবং আরেকটা জগৎ। ভগবানগোলা ২ ব্লকের নির্মলচরে যাওয়ার পথে আমাকে অনেকেই বলেছিলেন, ‘আপনি যে রাস্তা দিয়ে এসেছেন, বর্ষায় কিন্তু ওই রাস্তা থাকবে না।’ কথাটি খুব সাধারণ, কিন্তু এই ভূ-দৃশ্যকে বোঝার জন্য সেটিই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে স্থায়িত্ব একটি অনুমান মাত্র। রাস্তা বদলায়, নদী বদলায়, জমি বদলায়। বদলে যায় মানুষের ঠিকানাও। অথচ, এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেই মানুষকে নিজের স্থায়িত্ব প্রমাণ করতে হয়। একটি ঠিকানা, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, জমির কাগজ কিংবা ভোটার তালিকায় একটি নাম যেন ক্রমাগত বলে দিতে থাকে: আমি এখানে আছি। চরের মানুষের কাছে নদী কেবল একটি প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য নয়। নদী তাদের জমি, বাড়ি, জীবিকা এবং স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কার বাড়ি কোথায় ছিল, কোন বছর নদী কতটা ভেঙেছিল, কোন বর্ষায় কে ঘর সরিয়ে নিয়েছিল, কোন জমিতে আগে ধান হত, কোন জায়গাটি এখন আর নেই, এইসব স্মৃতি দিয়ে নদীর একটি সামাজিক মানচিত্র তৈরি হয়। সরকারি মানচিত্রে যে জমির একটি দাগ নম্বর আছে, মানুষের স্মৃতিতে তার সঙ্গে জুড়ে থাকে আরও অনেক নাম, সম্পর্ক এবং হারিয়ে যাওয়ার গল্প।
এই অনিশ্চয়তা এখন আর কেবল একটি পুরনো স্মৃতি নয়। পদ্মা এখনও প্রতিদিন তার গতিপথ বদলাচ্ছে। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মুর্শিদাবাদের নদীপাড়ের বেশ কয়েকটি গ্রামে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। কোথাও কয়েকদিনের মধ্যে বসতবাড়ি নদীতে চলে যাচ্ছে, কোথাও চাষের জমি ও গাছপালা হারিয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও মানুষ রাত জেগে অপেক্ষা করছে কখন নদীর পাড়ের মাটি ভেঙে পড়বে। সেপ্টেম্বর মাসে রাধাকৃষ্ণপুরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একাধিক বাড়ি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর বহু পরিবার ঘর খুলে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। লালগোলার তারানগরেও সাম্প্রতিক ভাঙনে বসতবাড়ি ও চাষের জমি হারানোর আশঙ্কা নতুন করে দেখা দিয়েছে। চরের মানুষের কাছে তাই নদী কেবল একটি দূরবর্তী বিপদের নাম নয়। নদী কখনও কখনও এত দ্রুত এগিয়ে আসে যে ঘর সরিয়ে নেওয়ার মতো সময়ও থাকে না। একটি বাড়ি ভেঙে পড়ার সঙ্গে শুধু ইট, টিন বা বাঁশ হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যায় রান্নাঘর, উঠোন, গাছ, জমি, গবাদি পশু, নথিপত্র, প্রতিবেশী এবং বহু বছরের পরিচিত একটি মানচিত্র। গত কয়েক বছরে বহু পরিবার একাধিকবার স্থানান্তরিত হয়েছে। কোথাও নদী গিলে নিয়েছে পুরনো বসতি, কোথাও নতুন জেগে ওঠা চরে মানুষ আবার ঘর তুলেছে, শুধু পরবর্তী ভাঙনের অপেক্ষায়। নিম্ন গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় এই নদীভাঙন, বাস্তুচ্যুতি এবং পুনর্বাসন-এর পুনরাবৃত্তি নিয়ে গবেষণাতেও একই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার কথা উঠে এসেছে। এই ভাঙনের সবচেয়ে গভীর অভিঘাত সম্ভবত এই যে, মানুষ কেবল জমি হারায় না। হারায় ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি স্থিরতা। আগামী বছর কোথায় চাষ করবে, সন্তান কোথায় স্কুলে যাবে, কোন ঠিকানা সরকারি নথিতে থাকবে, কোথায় ঘর তুলবে, কোন জমিকে নিজের বলে ভাববে, এসব প্রশ্নের কোনও নিশ্চিত উত্তর থাকে না। নদী যখন ঠিকানা সরিয়ে দেয়, রাষ্ট্রের নথি তখনও সেই মানুষকে একটি নির্দিষ্ট ঠিকানায় স্থির করে রাখতে চায়। কিন্তু যেখানে বাড়ি-ঘর বাঁচানো দুষ্কর, সেখানে নথিপত্র কি ভাঙনে আগলে রাখা সম্ভব? ফলে প্রাকৃতিক অনিশ্চয়তা এবং নথিগত অনিশ্চয়তা একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। একটি পরিবার নদীর ভাঙনে বাস্তবে স্থানচ্যুত হয়, কিন্তু তার নাগরিক ও প্রশাসনিক পরিচয়কে আবার নতুন ভূগোলে স্থাপন করতে হয়। এই কারণেই চরে জীবনকে শুধু ‘বিপন্ন জীবন’ হিসেবে দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মানুষ এখানে বিপদের মধ্যেই ঘর বানায়, জমি চাষ করে, সন্তান প্রতিপালন করে, ভোট দেয়, নথি সংগ্রহ করে এবং আবার প্রয়োজনে ঘর ভেঙে অন্যত্র চলে যায়। নদী তাদের জীবনকে স্থির হতে দেয় না, কিন্তু মানুষও নদীর সঙ্গে বসবাসের নিজস্ব কৌশল তৈরি করে।
পদ্মার এই চলমান ভাঙন তাই একদিকে ধ্বংসের ভূগোল, অন্যদিকে পুনর্গঠনেরও ভূগোল। প্রতিবার নদী যখন একটি বসতি মুছে দেয়, মানুষ অন্য কোথাও আবার জীবনের চিহ্ন তৈরি করে। কিন্তু চরের এই পরিবর্তনশীলতার বিপরীতে রাষ্ট্রের নথির জগৎ অনেক বেশি স্থিরতার দাবি করে। সেখানে একটি নামের বানান, কারোর বাবার নাম, একটি ঠিকানা, একটি জন্মতারিখ কিংবা ভোটার তালিকায় উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নদী যদি একটি বাড়ি সরিয়ে দেয়, মানুষকে আবার নতুন ঠিকানায় নিজের অস্তিত্ব নথিভুক্ত করতে হয়। একই মানুষ, একই পরিবার, একই জীবন, কিন্তু কাগজে তার পরিচয় বারবার সংশোধন, পুনর্নবীকরণ এবং যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। এসআইআর-এর সময় এই নথির প্রশ্নটি আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গে। চায়ের দোকানে, বাড়ির উঠোনে কিংবা বাজারে বসে কথোপকথন হঠাৎ ভোটার তালিকা, বিএলও, পুরনো নথি, পরিবারের সদস্যদের নাম এবং ‘কার নাম আছে, কার নেই’ এই প্রশ্ন তুলে ধরেছে। কেউ পুরনো ভোটার তালিকা খুঁজছিলেন, কেউ বাবার বা মায়ের নামের সঙ্গে নিজের নাম মিলিয়ে দেখছিলেন, কেউ আবার জানতে চাইছিলেন কোন নথি গ্রহণ করা হবে। কাগজের এই উদ্বেগ কেবল প্রশাসনিক ছিল না। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বহু পুরনো একটি প্রশ্ন: রাষ্ট্রের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য একজন মানুষের কতগুলি কাগজের প্রয়োজন? চরের মানুষদের জন্য প্রশ্নটি আরও জটিল, কারণ তাদের জীবনের ভূগোলই নথির স্থায়িত্বের সঙ্গে সবসময় মেলে না। যে বাড়িটি কয়েক বছর আগে ছিল, সেটি এখন নদীর মধ্যে। যে ঠিকানায় একটি পুরনো নথি তৈরি হয়েছিল, সেটি হয়তো আর নেই। কেউ ভাঙনের পরে অন্য গ্রামে চলে গিয়েছেন, কেউ কাজের জন্য শহরে থাকেন, কেউ আবার বিয়ের পরে অন্য পরিবারের ঠিকানায় যুক্ত হয়েছেন। অথচ ভোটার তালিকা এবং অন্যান্য সরকারি নথি মানুষের এই চলমান জীবনকে নির্দিষ্ট ঘর, ঠিকানা এবং সম্পর্কের মধ্যে ধরে রাখতে চায়। এই কারণেই এসআইআর নিয়ে কথাবার্তায় কেবল ‘নাম বাদ পড়বে কি না’ এই প্রশ্ন শুনিনি। তার সঙ্গে ছিল আরও গভীর এক অনিশ্চয়তা: ‘আমার নাম থাকব তো?’ ‘ওর নাম আছে, আমারটা নেই কেন?’ ‘কাগজ না থাকলে কী হবে?’ ‘আমরা তো এখানেই থাকি, কিন্তু কাগজে যদি সেটা না থাকে?’ এই প্রশ্নগুলির উত্তর অনেক সময় কারও কাছে স্পষ্ট ছিল না। ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষা তৈরি করেছিল। এই প্রতীক্ষার মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনাও ক্রমশ প্রবেশ করছিল। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন কখনও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত থাকে না। কে ‘এখানকার’, কে ‘ওপারের’, কে বহু বছর আগে কোথা থেকে এসেছিল, কার আত্মীয় কোথায় থাকে, কার নাম কোন তালিকায় আছে, এইসব প্রশ্ন খুব সহজেই রাজনৈতিক অর্থ ধারণ করে। চায়ের দোকানের আলাপ থেকে পারিবারিক কথোপকথন পর্যন্ত এসআইআর নিয়ে আলোচনা তাই কেবল নির্বাচন নিয়ে ছিল না। তার মধ্যে সীমান্ত, অভিবাসন, নাগরিকত্ব এবং belonging-এর পুরনো উদ্বেগগুলোও ফিরে আসছিল। একদিন কথা বলতে বলতে একজন বলেছিলেন, ‘আমরা তো ভোট দিই, তাহলে আবার প্রমাণ করতে হবে কেন?’ কথাটি আমার নোটবুকে একটি প্রশ্ন হয়ে থেকে গিয়েছিল। কারণ এই প্রশ্নের মধ্যে নাগরিকত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ধরা পড়ে। নাগরিক হওয়া এখানে শুধু একটি আইনি status নয়। এটি বারবার প্রদর্শন, যাচাই এবং স্বীকৃত হওয়ার একটি প্রক্রিয়া। ভোটার তালিকায় একটি নাম সেই স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হয়ে ওঠে। তবু এই উদ্বেগকে শুধু ভয়ের ভাষায় বোঝা যায় না। মানুষ একই সঙ্গে নথি সংগ্রহ করছে, প্রতিবেশীর কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছে, বিএলও-র সঙ্গে কথা বলছে, পুরনো কাগজ খুঁজছে এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের এই যাচাই-প্রক্রিয়ার মধ্যেও মানুষ নিষ্ক্রিয় নয়। তারা নিজেদের নথি, সম্পর্ক এবং স্মৃতিকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ভাষার সঙ্গে নিজেদের জীবনকে মেলানোর চেষ্টা করছে। চরে রাষ্ট্রের উপস্থিতি তাই কোনও একটি অফিস বা সরকারি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেটি নদীর ঘাটে, সীমান্তের পথে, ভোটার তালিকায়, পরিচয়পত্রে, মোবাইল ফোনে, বিএলও-র বাড়ি বাড়ি যাওয়ায় এবং মানুষের অপেক্ষার মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
একই ভূখণ্ডে নদী মানুষের ঠিকানা বদলে দেয়, আর প্রশাসন সেই ঠিকানাকে নথিতে স্থির রাখার চেষ্টা করে। একদিকে ভূদৃশ্য ক্রমাগত সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিকত্বের কাগজ মানুষকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থির করে দিতে চাইছে। দিনের শেষে যখন চর থেকে ফিরছি, নদীর ওপরে আলো ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। দূরে কয়েকটি নৌকা চলছে। সকালে যে পথ দিয়ে এসেছিলাম, ফেরার সময় সেটিকে আবার অন্যরকম মনে হচ্ছে। নদী তখনও তো একই নদী, কিন্তু তার স্রোত, পাড় এবং আলো বদলে গিয়েছে। ঘুরপাক খাচ্ছে কিছু জরুরি প্রশ্ন, এই সীমান্তকে বোঝার জন্য কেবল কাঁটাতারের বেড়া কিংবা মানচিত্রের রেখার দিকে তাকানোই যথেষ্ট! না। তাকাতে হয় সেই মানুষগুলোর দিকে, যারা একদিকে ভাঙতে থাকা জমি ও নদীর সঙ্গে নিজেদের জীবনকে মানিয়ে নিচ্ছেন, অন্যদিকে ক্রমাগত নিজেদের অস্তিত্বকে নথি, তালিকা এবং রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান করে তুলছেন। চরের এই জীবনে সীমান্ত তাই শুধু ভূখণ্ডের বিভাজন নয়। এটি একটি চলমান অভিজ্ঞতা, যেখানে নদী জমিকে সরিয়ে দেয়, মানুষ ঠিকানা বদলায়, রাষ্ট্র পরিচয় যাচাই করে এবং রাজনীতি সেই অনিশ্চয়তাগুলিকে নতুন অর্থ দেয়। চরের মানুষের কাছে ‘আমি কোথাকার?’ প্রশ্নটির উত্তর তাই কখনও কেবল একটি গ্রামের নাম নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নদী, ভাঙন, স্মৃতি, কাগজ, ভোট এবং নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত থাকার এক অবিরাম চেষ্টা। প্রকাশের তারিখ: ০৯-অক্টোবর-২০২৬ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |