রোমিলা থাপার, ইতিহাস এবং হেরোইন

রবীশ কুমার
ইতিহাস বিষয়ে যেকোনও যুক্তি তর্কের ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল এরকম ধরনের ব্যাখ্যাকে কোনও ভাবনা চিন্তা ছাড়াই ‘অতীতের মার্কসবাদী বিশ্লেষণ’ বলে তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সমাজ এবং অর্থনীতির আলোচনাকে ইতিহাস ব্যখ্যায় যুক্ত করা হলেই তাকে মার্কসবাদী বিশ্লেষণ বলা চলে না। মার্কসবাদী আলোচনায় সামাজিক অর্থনৈতিক উপাদানগুলি কীভাবে সমাজকে গঠন করছে, তাকে রূপ দিচ্ছে সে বিষয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়। তাই সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উপাদান সংযুক্ত হয়েছে মানেই এটা নয় যে সেখানে মার্কসবাদী তত্ত্ব বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ম্যাক্স ওয়েবারের কথা বলা যায়। তাঁর আলোচনায় সমাজ অর্থনীতির উপাদান আছে ঠিকই, কিন্তু তা মার্কসবাদী বিশ্লেষণ পদ্ধতি থেকে একেবারেই আলাদা।

রোমিলা থাপার সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন। ‘আওর হিস্ট্রি, দেয়ার হিস্ট্রি, হুস হিস্ট্রি?’ আমাদের ইতিহাস, ওদের ইতিহাস, কাদের ইতিহাস? আসলে এর আগে নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে এই শিরোনামেই তিনি একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে জোর দিয়েছিলেন ইতিহাসের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক ব্যাখ্যায়। উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছিলেন, আজকের দিনে ধর্মীয় পরিচিতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কীভাবে ইতিহাসের ব্যবহার হচ্ছে। থাপার তাঁর ভাষণ শুরুই করেছিলেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এরিখ হবসবামের এক উদ্ধৃতি দিয়ে। হবসবাম বলেছিলেন, হেরোইনে আসক্ত একজনের কাছে আফিম যা, জাতীয়তাবাদের কাছে ইতিহাস তা। আর তা উল্লেখ করে থাপার বলেছিলেন, হেরোইন-আসক্ত যখন আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে যান, তখন তিনি উজ্জ্বল অতীতের কল্পনায় ভাসতে থাকেন এবং বর্তমান নিয়েও তার নিরিখে ভাবতে থাকেন। আজকের দিনে জাতীয়তাবাদ ইতিহাসকে সেভাবেই ব্যবহার করছে। সেই ভাষণ থেকেই একটি গোটা পূর্ণাঙ্গ বইয়ের ভাবনা। এর হিন্দি ভাষান্তর করেছেন সঞ্জয় কুন্দন। প্রকাশক লেফটওয়ার্ডের হিন্দি সংস্করণ বাম প্রকাশন। ‘হামরা ইতিহাস, উনকা ইতিহাস, কিসকা ইতিহাস?’ বইটি নিয়ে সাতাশ মিনিট আলোচনা করেছেন মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম, নির্ভীক সাংবাদিক রবীশ কুমার। এখানে সেই আলোচনারই পরিমার্জিত রূপ। ভাষান্তর ও অনুলিখনে বীথিকা সাহানা

আজ আমরা ইতিহাস বিষয়ে কথা বলব। ভারিক্কি চালে নয়, চেষ্টা করব জলের মত সোজা করে বিষয়টি বোঝার। আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই একটা অভিযোগ বেশ বড় আকার ধারণ করেছে যে, ‘আমাদের ইতিহাস ঠিকমত পড়ানো হয়নি’। যাদের যাদের মনে হয় যে, ইতিহাস আপনাকে ঠিকমত পড়ানো হয়নি, তাদের জন্যই আমার আজকের এই আলোচনা। রোমিলা থাপারের সাম্প্রতিক বই: হামারা ইতিহাস, উনকা ইতিহাস, কিসকা ইতিহাস? 

আমার মনে হয়েছে, বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ইতিহাস নিয়ে আমাদের মধ্যে বর্তমানে যে তর্কাতর্কি ঝগড়া চলছে, বইটিতে সরাসরি সেই বিষয় নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। রোমিলা থাপার লিখছেন, রাষ্ট্রবাদ/ জাতীয়তাবাদ/ ন্যাশনালিজম শুধুমাত্র সেই অতীতকে বেছে নিয়ে নানান ধরনের আখ্যান/ ন্যারেটিভ তৈরি করে এবং তর্কবিতর্ক বাড়িয়ে তোলে, যেগুলি থেকে তার উৎপত্তি হয়েছে, এবং তার সেই ভাবনার পক্ষে লাভজনক। এই আখ্যানগুলি একে-অপরকে খণ্ডন করে, কারণ এগুলির উদ্দেশ্য– আলোচনা চালিয়ে যাওয়া– কোনও বিশেষ বাস্তব ইতিহাসকে প্রকাশ, বা ব্যাখ্যা করা নয়। বরং, যেসব সম্প্রদায় জাতীয়তাবাদ প্রচার-অভিযানে শামিল হয়েছে, তাদের বংশ পরম্পরা অনুযায়ী তালিকা তারা পেশ করে। এই জাতীয়তাবাদ চর্চার এবং নিজেদের টিকিয়ে রাখার একটি উদ্দেশ্য (এজেন্ডা) তৈরি করে, তার সমর্থকদের কাছে একটি লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। এবার সমস্ত অনুগামীরা সেই উদ্দেশ্যপূরণের স্বার্থে মনেপ্রাণে লেগে পড়ে, কোনওরকম বিচার বিবেচনার তোয়াক্কা না করেই।

যদি সহজ করে বলি, তাহলে বলা চলে– জাতীয়তাবাদ/ রাষ্ট্রবাদ হল এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে আলাদা আলাদা সম্প্রদায়ের মানুষকে নিয়ে ভিড়ে পরিণত করা হয়, যাতে তাদের গড্ডালিকা প্রবাহে চালিত করতে সুবিধে হয়। আজ এই বইটি নিয়ে আর ইতিহাসের অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়েও কিছুকথা বলব, বইটির কিছু অংশ পড়ব।

আপনারা নিশ্চয় খেয়াল করেছেন, আপনাদের গ্রামে শহরে বেশ কিছু মন্দিরের নামের সঙ্গে ‘প্রাচীন’ শব্দটি উল্লিখিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হল– এই সমস্ত মন্দিরই কি ‘প্রাচীন’? প্রাচীন বলতে কী বোঝায়? কত পুরনো? ১০০-বছরের পুরনো মন্দির কীভাবে প্রাচীন হল? প্রাচীন, মধ্য, বা আধুনিকের সময়সীমা কত কত? প্রাচীন হতে গেলে অন্তত খ্রিঃ পূর্ব হওয়া উচিত নয়? ১৫০০ খ্রিঃ পূঃ-কে বৈদিককাল মনে করা হয়। 

কখনও ভেবে দেখেছেন যে প্রাচীন বলার বদলে সালের উল্লেখ থাকে না কেন? কতগুলো উদাহরণ দিচ্ছি, এগুলো মন্দির নয়। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে অবস্থিত ROZET FISCHMEISTER নামে দোকানটি ১৭৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত বলে উল্লেখ আছে। এখানকার আরেকটি গয়নার দোকানের গায়ে উল্লিখিত হয়েছে ১৮৭৪ সাল। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর SLOANS-এ উল্লিখিত সাল ১৭৯৭। ইতালির ফ্লোরেন্সের পারফিউম কোম্পানি SANTA MARIA NOVELLA ১২২১ সাল থেকে চলছে। তা সত্ত্বেও এরা কেউ শুধু ‘প্রাচীন’ লিখে দেননি। কারণ কি? লন্ডনের বিখ্যাত বইয়ের দোকান HATCHARDS প্রতিষ্ঠা সাল উল্লেখ করেছে ১৭৯৭। স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউব্লিয়ানার দু’টি পুল নির্মিত হয়েছে ১৮৪২ এবং ১৮৪৮ সালে; এসব সেই সময়ের কথা, যখন আমাদের দিল্লিতে বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন বাদশাহ, মির্জা গালিব পুরনো দিল্লিতে থাকতেন। W B MASON নামেও কোম্পানি তাদের প্রতিষ্ঠা সাল উল্লেখ করেছে ১৮৯৮ সাল। সালের উল্লেখ করেছে সবাই। কিন্তু কেউ ‘প্রাচীন’ বলে দাগিয়ে দেয়নি, মানুষই হিসেব করে নিয়েছেন। ফলে সকলেই নিজের মত করে ইতিহাসবোধের পরিচয় দিয়েছেন। সহজভাবেই বোঝা যায়, সাল নিয়ে কোনও অস্তিত্ব-সংকট তাদের নেই, কতদিন ধরে তাদের দোকানগুলির অস্তিত্ব তা স্পষ্ট।

কিন্তু সাল বা ‘প্রাচীন’ উল্লেখ করে দিলেই কি তার ইতিহাসও সঙ্গে-সঙ্গে জানা যায়? এমনটা হয় না। যখনই আমরা ইতিহাসকে ‘হিন্দু’ নাকি ‘মুসলমান ইতিহাস’ এই বিচারে বসি– তখন ইংরেজদের আদ্ধেক করে যাওয়া এজেন্ডাকে আমরা পূর্ণ করতে লেগে পড়ি। ঔপনিবেশিক পর্বে ‘ডিভাইড এন্ড রুল’-এর উদ্দেশ্যে ইতিহাসকে এভাবেই ধর্মীয় ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। 

১৮১৭ সালে জেমস মিল, তাঁর বই এ হিস্ট্রি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া-তে ভারতের ইতিহাসকে হিন্দু মুসলিম এবং ব্রিটিশ ইতিহাসে ভাগ করেন। আজ যারা হিন্দু ইতিহাসের কথা তুলে ধরতে চাইছেন তারা ব্রিটিশের দাগিয়ে দেওয়া ইতিহাসের ছায়া থেকে আলাদা হতে পারছে না, কোনও নতুন কথাও বলছে না। কিন্তু বুলি আওড়াচ্ছে, আমরা ওদের প্রভাব থেকে ইতিহাসকে মুক্ত করে স্বদেশি করতে চাইছি!

ইতিহাসকে সাধারণভাবে বোঝার ক্ষেত্রে মূর্তির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। কলাকৃতি, কলার ইতিহাসের ধারা বর্ণনা তো রয়েছেই, কিন্তু ইতিহাস মানে শুধু মূর্তি বা ব্যক্তির ইতিহাস নয়। আজকালকার নেতারা জেনেবুঝে ইতিহাসকে মূর্তি এবং ব্যক্তিতেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। কারণ এভাবে ইতিহাস বলা সহজ, লেখাপড়ারও দরকার হয় না। প্রথমে, একটি আবেগপূর্ণ ন্যারেটিভ বানাতে হয়, তারপর জনতার করের কোটিকোটি টাকা ব্যয় করে গগনচুম্বি মূর্তি বানাতে হয়– তারপর নেতারা দাবি করে– তারা ইতিহাস বদলে দিয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মূর্তি তাদের পার্টিই তৈরি করেছে... এই পদ্ধতিতে চটজলদি পরিচিতির আধারে রাজনীতি করতে সুবিধে হয়। এই প্রেক্ষিতেই আমি আগে মন্দিরের গায়ে ‘প্রাচীন’ উল্লেখের উদাহরণ দিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য এটাই যে আমরা ইতিহাস নিয়ে দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠছি, ভাবছি খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে কিন্তু আসলে সবই ফাঁপা। ধরুন যদি ১০০ বছরের পুরনো মন্দির প্রাচীন হয়, তাহলে আধুনিক সাল কত থেকে কত? আমরা আধুনিক যুগে আছি, না প্রাচীন যুগে আছি? যুগগুলির ব্যাপ্তি বা কতদিনের?

এসব ফাঁপা দাবি দাওয়া বুলি ছাড়াও ইতিহাস নির্ণয়ের বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক রীতি পদ্ধতি রয়েছে। আগে কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে তারিখ আবিষ্কার করা যেত। এখন আরও আধুনিক পদ্ধতি এসেছে– Archaeomagnetic Dating, Rehydroxylation Dating, Luminescence Dating, Infrared Thermography ইত্যাদি। এসব নাম পড়াই বেশ কঠিন সাধারণ লোকের পক্ষে। কিন্তু নেতাদের পদ্ধতি সহজ। তাদের দাবি করলেই হল, ‘ইতিহাস তাই, তারিখ তাই, যা আমি বলছি’। পাথুরে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের দরকার নেই।

বলতে চাইছি, আপনি প্রাচীন বা সাতশ বছর আগের বলুন কিছু তো একটা পদ্ধতি থাকবে যার দ্বারা তারিখ দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে? নাকি যা মনে এল সেটাকেই ইতিহাস বলা হবে? এমন ব্যাপার নয় তো যে মনের কল্পনাকেই কেউ কেউ সত্যি ইতিহাস বলে চাপিয়ে দিতে চাইছে? আজকাল এমনটা প্রায়শই হচ্ছে কারণ এই ধরনের মহান নেতা/ প্রবক্তারা কেবল একক ব্যক্তি নন। এদের পক্ষে রয়েছে গড্ডালিকা প্রবাহে শামিল ভিড়, ভিড়ের সাহস বাড়ানোর জন্য রয়েছে পুলিশ, মূর্খের মিছিলসুদ্ধ গোদি-মিডিয়া, কোনও কোনও ক্ষেত্রে আদালতও রয়েছে এদের পক্ষে। এতসবের ফল যা হচ্ছে তা হল– ইতিহাস লেখার জন্য ইতিহাস সঠিক ভাবে জানা বলার জন্য পেশাদার ডিগ্রিধারী দক্ষ ইতিহাসবিদদের আর প্রয়োজন পড়ছে না।

যদি নিজের জজ, নিজেদের পুলিশ, মিডিয়া, বাহিনী থাকে তাহলে সত্যি ইতিহাসকে বদলে দিয়ে কল্পিত গল্পগাথাকেই ইতিহাস বলে চালানো সম্ভব! 

নিশ্চয় খেয়াল করবেন, আমরা পেশাদার ইতিহাসবিদদের প্রসঙ্গ তুলেছি। এই পেশাদার ইতিহাসবিদ মানে কি? তিনিই পেশাদার দক্ষ ইতিহাসবিদ– যিনি সারাজীবন ইতিহাস পড়েছেন, পড়িয়েছেন, কোনও এক বা একাধিক বিষয়ে অগুন্তি বই পড়ে দক্ষতা তৈরি করেছেন, অগুন্তি দলিল-দস্তাবেজ-প্রমাণ নেড়েঘঁটে দেখেছেন, শিলালিপি-পাথুরে প্রমাণ বিষয়ে খোঁজ রাখেন, খোঁজ করেন, শহর অঞ্চলের অলিগলি অনুসন্ধান করেন। গবেষণার জন্য তিনি অন্য বিষয়ের সাহায্য নিয়ে নির্বাচিত কোনও এক বা অন্যান্য বিষয়ে মতামত প্রকাশ করেন বা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাকে বিকশিত করতে পারেন।

কিন্তু এতসব না করে সহজ পদ্ধতি হল– প্রথমে একটি সংগঠন বানিয়ে ফেলুন, তার নামে ‘হিন্দু’ জুড়ে দিন, তারপর আপনার শহরের যেকোনও জায়গায় রুমাল পেতে সেখানকার যা খুশি একটা ইতিহাস বানিয়ে ফেলুন। এবার নিজেদের প্রশ্ন করুন– আপনারা কোন পদ্ধতিতে ইতিহাস বিষয়ে জানতে-বুঝতে-পড়তে চেয়েছিলেন? এরা তো শুরু করেন এই বলে– যে সঠিক ইতিহাস পড়ানো হয়নি? তাহলে এটাই কি সঠিক ইতিহাস পাঠ পদ্ধতি? এটাই আপনারা শিখতে চান?

তাও ভালো এদের দাবি এটা নয় যে আমাদের অঙ্ক ভালো করে শেখানো হয়নি বা ইংরাজি ভালো করে শেখানো হয়নি। আপনারা নিশ্চয় জানেন যে আমাদের দেশে কিন্তু লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে এই দু’টি বিষয়ে ফেল করে বা ফেলের ভয়ে পরীক্ষা দেয় না। সেই সংখ্যাটা কিন্তু কম নয়। তা সত্ত্বেও এইসব দলকে কখনও মিছিল বা সভা করতে দেখা যায় না, যেখানে তারা দাবি করছে– কেন বাচ্চাদের অঙ্ক ভাল করে শেখানো হচ্ছে না, ভীতি কাটানো যাচ্ছে না। এইসব হিন্দু সংগঠন গুলি অঙ্ক ফিজিক্স বিষয় নিয়ে আন্দোলন করতে পারে না? কেন বাচ্চাদের এই বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে শেখানো হচ্ছে না? এর জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে তারা ফেল না করে?

এর সঙ্গে কতকগুলি সাম্প্রতিক খবর এখানে উল্লেখ করছিঃ

বিবিসি নিউজের প্রতিবেদনঃ দিল্লি এবং গুজরাটঃ দু’সপ্তাহে ২৩ হাজার কোটির ড্রাগস বাজেয়াপ্ত, কীভাবে চলছিল এই নেটওয়ার্ক

নবভারত টাইমসে ৪ ডিসেম্বর ২০২৪-এর প্রতিবেদনঃ কোকেইন চরস গাঁজা আফিম... দেশে এতবড় চোরাকারবার– টাকার অঙ্ক অবাক করার মত

জাগরণ প্রত্রিকার খবরঃ দিল্লিতে ফের ধরা পড়ল ২০০০ কোটি টাকার ড্রাগস, ক’দিন আগে ৫ হাজার কোটি টাকার কোকেইন

অমর উজালায়ঃ দিল্লিতে ৫৬২০ কোটি টাকার ড্রাগস বাজেয়াপ্ত, চার গ্রেপ্তার, আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের পর্দাফাঁস

আরও খবরঃ ১৮১৪ কোটি টাকার ড্রাগস বাজেয়াপ্ত হওয়ার খবর জেলে তৈরি হয়েছিল দোষীদের চক্র, ফার্নিচার তৈরির নামে কারখানা ভাড়া

দৈনিক ভাস্করেঃ গুজরাতের পোরবন্দরে ৩৩০০ কেজি ড্রাগস বাজেয়াপ্ত, যার দাম ২ হাজার কোটির বেশি ৫ জন বিদেশি অপরাধীও গ্রেপ্তার

প্রশ্ন, হঠাৎ ড্রাগসের খবর কেন বলছি? ইতিহাসের আলোচনার সঙ্গে এর যোগ কোথায়? অপ্রাসঙ্গিক কথা বলছি কেন? এর সঙ্গে ইতিহাস বা লেখাপড়ার যোগ কোথায়?

প্রথম উত্তর, খবরে উল্লিখিতর বহুগুণ টাকার ড্রাগস যাচ্ছে কোথায়? আমাদেরই সমাজে এগুলি পৌঁছচ্ছে। যেখানে আমাদের বাচ্চারা বড় হচ্ছে সেখানেই এর কারবার। অতএব ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত এই নেশার জগতে কীভাবে সুরক্ষিত?

দু’নম্বর কথা ড্রাগস আর ইতিহাসের সম্পর্ক কোথায় সেই বিষয়ে।

রোমিলা থাপার, তাঁর আমাদের ইতিহাস, ওদের ইতিহাস, কাদের ইতিহাস? বইয়ে একজন ইতিহাসবিদের উল্লেখ করেছেন, তাঁর নাম এরিখ হবসবম। এরিখ হবসবম এমন একজন পণ্ডিত যিনি দীর্ঘদিন ইতিহাস পড়েছেন, পড়িয়েছেন, লিখেছেন, গবেষণা করেছেন। কিন্তু এমন কোনও সংগঠন জীবনে বানিয়ে উঠতে পারেননি, যারা কোর্টে সার্ভের জন্য আবেদন করে যে, অমুক মসজিদের তলায় মন্দিরের খোঁজে খোঁড়াখুঁড়ি অভিযান চালানো হোক। এভাবে এরকম কোনও কাজ করে ‘কাজের মানুষ, কাছের মানুষ’ তিনি হয়ে উঠতে পারেননি! তাহলে আমরা তাঁকে স্মরণ করছি কেন? কারণ যারা সত্যি ইতিহাস শিখতে চান, তাঁদের কাছে উনি খুব গুরুত্বপূর্ণ দক্ষ পেশাদার ইতিহাসবিদ, গবেষক। তিনি যা বলেছেন, সেই প্রসঙ্গেই আমি বর্তমানের ড্রাগসের কারবারের বাড়-বাড়ন্তের খবরগুলি যুক্ত করেছি। তাঁর বিখ্যাত বই অন হিস্ট্রি-তে বলছেন, জাতীয়তাবাদী কট্টরপন্থী মৌলবাদী মতবাদের জন্য ইতিহাস কাঁচামালের কাজ করে। যেমন হেরোইনের নেশাড়ুদের কাছে আফিমের বীজ হল কাঁচামাল। তেমনি এই মৌলবাদী রাষ্ট্রবাদী মতবাদের ক্ষেত্রেও ‘অতীত’ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, বলা ভালো সবচেয়ে আবশ্যক উপকরণ। এদের ভাবনার উপযুক্ত কনো অতীত যদি বাস্তবে নাও থাকে তখন এরা ‘কাল্পনিক অতীত’ নির্মাণ করে নেয়।

তার মানে, বাস্তব অতীতে, ইতিহাসে তাদের সপক্ষে কোনও তথ্য-তত্ত্ব না থাকলেও মনগড়া অতীত বানিয়ে তাকেই ইতিহাস ঘোষণা করে দেওয়া হয়, বলা হয়, ‘এটাই আমাদের ইতিহাস, এসো বাকি সব বঞ্চনা শোষণ ভুলে আমাদের সঙ্গে ইতিহাস বদলাতে শুরু করে দাও, বর্তমান ভুলে মনগড়া অতীত গড়ে তোলো, তাতে ধর্মীয় জাতপাতের উস্কানি যোগ করে শহরে দাঙ্গা ছড়াও...’

খবরে আমরা যেমন দেখলাম, যে রোজ ভারতে হাজার কোটির নেশার জিনিস পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি কিন্তু রোজ নতুন নতুন হাজার হাজার দক্ষ পেশাদার ইতিহাসবিদ গবেষকও তৈরি হচ্ছে, তেমনটা একেবারেই নয়। তাহলে আমরা ভেবে দেখতে পারি, এরিখ হবসবম ইতিহাসকে কাঁচামাল কেন বলেছেন জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে? কেন তাদের সঙ্গে নেশাখোরদের তুলনা করেছেন? নেশাখোররা ইতিহাসবিদ নয়। কিন্তু তারা অতীতের নেশা, ধর্মের নেশা তৈরি করে, ইতিহাস বদলে দেওয়ার দাবি করে নেতারাই ইতিহাসবিদ হয়ে ওঠে। যে অবস্থা কোনও নেশাড়ু বা গাঁজাড়ুর হয়, ঠিক একই হাল হয় এইসব ছদ্ম-ইতিহাস সৃষ্টিকারীদের এবং তাদের ওপর অন্ধবিশ্বাসীদের। এইসব বিশ্বাসী-অন্ধভক্ত কারা? হোয়াটস অ্যাপ প্রতিষ্ঠানের বিবেচনাহীন পাঠক এবং শেয়ারকারীরা। ভারত সরকার শিক্ষাখাতে বা ইতিহাস বিষয়ে লেখা-পড়া-চর্চা-গবেষণা খাতে কত বাজেট বরাদ্দ করেছে, সে ব্যাপারে এরা আসলে চিন্তিত নয়। আপনাদের কী মনে হয়? উন্মত্ত ভিড় নিয়ে রাস্তায় লাঠিচার্জ, বুলডোজার-রাজ, স্থাপত্য ধ্বংসলীলার মধ্যে দিয়ে অঙ্ক বা ইতিহাসের লেখাপড়া-চর্চা সম্ভব? বা উচিত কাজ? উচিত পদ্ধতি?

এবার রোমিলা থাপার ইতিহাস নিয়ে যা বলেছেন, এবার তার কিছু অংশ উদ্ধৃত করব। কিছু অংশ পড়ে ইতিহাস চর্চা বিষয়ে আগ্রহ তৈরি করতে চাইছি যাতে আগ্রহীরা বইগুলি সংগ্রহ করে নিজেরাই পড়ে নিতে পারেন। রোমিলা থাপার একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং গবেষক। যদি আপনার এমন অভিযোগ থাকে যে আপনি সময় করে বসেছিলেন, তাও আপনাকে ইতিহাস পড়ানো হয়নি, তাহলে রোমিলা থাপারের বইগুলি পড়ে দেখতে পারেন। তাঁর বই না পড়তে চাইলে অন্য কোনও পছন্দমত ইতিহাসবিদের বইও পড়তে পারেন। পড়াটা জরুরি। তার আগে বুঝে নিন, যে এত পড়াশোনার জন্য আপনি তৈরি তো? পড়তে গেলে ধৈর্য, অধ্যাবসায় দরকার, আগামাথা ছাড়া ফরওয়ার্ডেড শেয়ারের খবর পড়লে হবে না।

রোমিলা থাপারের অন্যান্য কিছু বইও আমি পড়ার জন্য প্রস্তাব করছি– Early India, The Past before Us, A History of India, Ashok and the decline of the Mouryas, Somnath: The many voices of History, The Past and the Present, The Public Intellectual in India, Cultural Past, The Future in the Past, Sakuntala- text readings Histories, Indian Tales

শুধু বইগুলির নামকরণেই তাঁর ইতিহাসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। ইতিহাস কখনো একগতের, একাকার হয় না, সবসময় তা বহুমাত্রিক এবং বহুত্বের কথা বলে। এই বহুত্বের স্বীকৃতিও রয়েছে Interpretations, Reflections, Identities-এর মত শব্দগুলিতে। রোমিলা বইয়ের নাম দিয়েছেন A History of IndiaA কখন বসে? যখন অনেকগুলির মধ্যে একটিকে বোঝাতে চাওয়া হয়। The বসলে মনে করা যেত– এটাই একমাত্র ইতিহাস, আর অন্য মত থাকতে পারে না। জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে মহৎ দক্ষ পণ্ডিত গবেষকরা এভাবেই বিনয় প্রকাশ করেন। রোমিলাও বিনীতভাবে বহুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। এবং তারসঙ্গে এই যে দেখনদারির রাজনৈতিক ইতিহাস চর্চার ঔদ্ধত্ব, একবগ্‌গা রক্ষণশীল মতামতকে তিনি অস্বীকার করেন, সেকথাও ধরা আছে। এই বিনয় জ্ঞান থেকেই আসা সম্ভব, কারণ সত্যিকারের জ্ঞান জ্ঞানীকে বিনয় দান করে তা আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি। বুলি আওড়ে, ভিড় উস্কে, ধ্বংসলীলায় উৎসাহ দিলে জ্ঞানী হওয়া যায় না। জ্ঞানী লাইব্রেরিতে জীবন কাটিয়ে তৈরি হয়, মারমুখী লাঠি উঁচিয়ে নয়।

আশা করি, আপনারা নিজেরা ইতিহাস বই পড়বেন, আলোচনা করবেন। ইতিহাসচর্চা সবসময় লেখাপড়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। ইতিহাস-লিখন বিষয়ে আমি সব জানি– এমন দাবি করাও সঙ্গত নয়। আমি ইতিহাসের ছাত্র, তার মানে এই নয় আমিও সব বই পড়ে ফেলেছি। ইতিহাসের অধ্যায়ভাগ কীভাবে হবে এবিষয়ে শয়ে শয়ে বই আছে। ১৯৪৩-১৯৪৭ এই পাঁচ বছরের ভারতে ইতিহাস নিয়ে শ’খানে বই রয়েছে, তাও দক্ষ ইতিহাসবিদদের লেখা। স্বাভাবিকভাবেই সব বই তো কোনও কোর্সে ছাত্রদের পড়িয়ে ওঠা সিলেবাসের মধ্যে সম্ভব নয়। সময়ের অভাব। কিন্তু এইসব নেতাদের প্রচুর সময়, কিন্তু একটাই সমস্যা, ওরা পড়ে না। সেইজন্য তাড়াহুড়ো করে সেন্টিমেন্টাল অযৌক্তিক ভাষণ দেয়– আমরা ইতিহাস বদলে দিচ্ছি, ঠিক ইতিহাস আমাদের পড়েনো হয়নি, তাই আমিই ঠিক করে দিচ্ছি আসল ইতিহাস কি– আমার কথাই ইতিহাস– বই-তথ্য-প্রমাণের কোনও দরকার নেই!

কীভাবে এরা বদলাচ্ছে ইতিহাস? রাস্তার শহরের নাম বদলে দিয়ে। এর সঙ্গে ইতিহাস বদলানোর যোগ কই? রোমিলার বইয়ের কিছু অংশ তুলে ধরছি, তিনি বলছেন, অতীত বিষয়ে সমস্ত আখ্যান/ ন্যারেটিভ সঠিক ইতিহাস নয়। নিজেদের ভাবনা দৃষ্টিভঙ্গি অনু্যায়ী অতীত বিষয়ে যা বানানোও হচ্ছে তাই যে বাস্তবে ঘটেছিল এর কোনও নিশ্চয়তা নেই। ট্রাম্পও শ্লোগান তুলেছে, আমরা আবার আমেরিকার ‘মহান ইতিহাস’কে স্পর্শ করতে চলেছি। প্রশ্ন হল, এই দাবি অনুযায়ী আমেরিকার ইতিহাস কি সত্যি কখনও মহান ছিল? সেসব কথা প্রমাণসহ বইয়ে পড়লে আমাদের অবাক হতে হবে।  

ঘটনা হল, এই সব নেতারা দেশে বিদেশে অতীত নিয়ে যখন-তখন এসব দাবি করে জনতাকে ভ্রমের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। হবসবম যেমন বলেছেন, যে অতীত এইধরণের রাজনীতির কাঁচামাল। বাস্তবকে প্রকাশ করা নয়, অতীতকে কাল্পনিক পদ্ধতিতে নির্মাণ করা এদের উদ্দেশ্য। এরা কখনও মানুষকে পড়ে জানতে বলবে না, বলবে তাদের কথায় অন্ধবিশ্বাস করে তাদের পক্ষের ভিড়ে শামিল হতে। অন্য বিষয়ে পঠনপাঠনে তাদের আগ্রহ নেই, আগ্রহী করার চেষ্টাও নেই, তা বলা বাহুল্য। অতীত ইতিহাস নিয়েই এদের সমস্ত মাথব্যাথা বর্তমানের সমস্যার সমাধান হিসেবে। 

রোমিলার কথায় ফিরে যাই– অতীত নির্মাণ সম্ভব পাথুরে প্রমাণ-সূত্রের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিচার বিশ্লেষণ গবেষণা পরীক্ষার মাধ্যমে। ব্যাখ্যা করাও একটি তার্কিক পদ্ধতি, কার্যকারণ সম্পর্ককে খুঁজে বের করতে হয় তারপর সতর্ক বৈজ্ঞানিক সমাধান বা সিদ্ধান্তের কাছাকাছি ইতিহাসবিদ পৌঁছতে পারেন। আর এইসব স্বঘোষিত নেতা-ইতিহাসকাররা, দক্ষ ইতিহাসবিদের বিশ্লেষণ এবং সিদ্ধান্তকে বিকৃতভাবে ভেঙেচুরে পেশ করে, এসবই নিজেদের দিকে মিডিয়ার আলো টানার এক বিকট আকাঙ্ক্ষামাত্র। দক্ষ ইতিহাসবিদ এইধরণের প্রচেষ্টাগুলিকে প্রায়শই কোনও বুদ্ধিহীনের বালখিল্য আচরণ ভেবে এড়িয়ে যান, নিজের লেখাপড়ায় লেগে পড়েন। কারণ এদের দাবিগুলির প্রমাণ চাওয়া বা তাদের প্রশ্ন করা মানে দেওয়ালের সঙ্গে কথা বলা। এই নেতাদের একমাত্র কথা– ‘খোঁড়ো ভারত’, ‘পড়ো ভারত’ নয়। কথা বলতে গেলেই এরা গলাবাজি করে পালিয়ে যায়।

রোমিলা আরও বলেছেন– ইতিহাস লিখনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে যারা জানেনা তারা দক্ষ ইতিহাসবিদদের মতের বিপরীত বা বিরুদ্ধ কথা বলে– আমাদের ইতিহাসে অমুক ছিল, তমুক ছিল, আমরা আগের মত সব বানিয়ে দেব ইত্যাদি। তারা অতীত নিয়ে তেমন ছবিই বানায় যা তাদের সীমিত কল্পনাশক্তিতে কুলোয়। অষ্টাদশ উনিশ শতকে এরকম একটি ধারা ছিল- সেখানে ঘটনা ধরে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যকে তারিখ অনুযায়ী বলা হত এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারার অনুকূল করে ব্যাখ্যা করা হত। সেই মতের সপক্ষে কোনও সাক্ষ্য প্রমাণ রয়েছে কী না তা বিচার্য ছিলনা। মনে হওয়া কথাকেই সঠিক ব্যাখ্যা বলে মনে করা হয় এই ধরনের চর্চায়। স্বঘোষিত ইতিহাসবিদ আগে গল্প বানায় অতীত বিষয়ে, তারপর সেই গল্পকেই প্রমাণ বলে চালানো হয়। অন্যদিকে দক্ষ ইতিহাসবিদ মতের সপক্ষে পাথুরে প্রমাণ খোঁজেন। এখানেই এই দুপক্ষের বুনিয়াদী তফাৎ। উদ্ধৃত প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর যারা কথা বলছেন অন্যপক্ষ সেই প্রমাণের তোয়াক্কা করেনা।

ইতিহাস বিষয়ে যেকোনও যুক্তি তর্কের ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল এরকম ধরনের ব্যাখ্যাকে কোনও ভাবনা চিন্তা ছাড়াই ‘অতীতের মার্কসবাদী বিশ্লেষণ’ বলে তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সমাজ এবং অর্থনীতির আলোচনাকে ইতিহাস ব্যখ্যায় যুক্ত করা হলেই তাকে মার্কসবাদী বিশ্লেষণ বলা চলে না। মার্কসবাদী আলোচনায় সামাজিক অর্থনৈতিক উপাদানগুলি কীভাবে সমাজকে গঠন করছে, তাকে রূপ দিচ্ছে সে বিষয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়। তাই সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উপাদান সংযুক্ত হয়েছে মানেই এটা নয় যে সেখানে মার্কসবাদী তত্ত্ব বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ম্যাক্স ওয়েবারের কথা বলা যায়। তাঁর আলোচনায় সমাজ অর্থনীতির উপাদান আছে ঠিকই, কিন্তু তা মার্কসবাদী বিশ্লেষণ পদ্ধতি থেকে একেবারেই আলাদা। 

রোমিলা আরও যোগ করেন, তাই আমি সংক্ষেপে বলতে চাই, ইতিহাস লিখন পদ্ধতি চর্চার যে ধারাবাহিকতা রয়েছে তাতে আমার ভূমিকা কী? কোনও বিষয়কে কোন পদ্ধতিতে খোঁজা হচ্ছে, আর কীভাবে তার্কিক এবং মানবিক পদ্ধতিতে তার বিশ্লেষণ হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। যখন অধ্যয়নের জন্য নির্বাচিত বিষয় এবং তাকে কেন্দ্র করে মূল এবং মৌলিক প্রশ্নগুলি হাজির হয় তখন সন্ধানী সবার আগে তাঁর দীর্ঘদিনের লেখাপড়ার ওপর ভিত্তি করে, তাঁর প্রকল্প এবং অনুমানকে সামনে রেখে একটি পরিকল্পনা করেন। এই পদ্ধতিতে আমার কাছে জরুরি চারটি A–  Artifacts, Author, Agenda, Audience এগুলিই শুধুমাত্র সমস্ত জবাব হাজির করে তা বলছি না, প্রাথমিক খোঁজের বিন্দু বলা যায়। তারপর যখন বিস্তৃত খোঁজ এবং বিশ্লেষণ শুরু করি, তখন আরও আরও প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে– কী? কবে? কোথায়? কেন? এভাবেই অধ্যয়ন পদ্ধতি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে।

আধুনিক ইউরোপের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ এরিখ হবসবম জাতীয়তাবাদ এবং ইতিহাসের সম্পর্কে নিয়ে লিখেছেন। তা আমরা উদ্ধৃত করেছি। মৌলবাদীরা নিজেদের ভাবনাকে অতীতের মধ্যে দিয়ে বৈধ ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে চায়, মনগড়া ইতিহাস বানিয়ে জনগণকে ম্যানিউপুলেট করতে সুবিধে হয়। ইতিহাসের দাবি করলে তাদের প্রচারকাজে সুবিধে হয়। একস্তরে ‘রাষ্ট্র’-র ধারণা নির্মাণে অতীত গুরুত্বপুর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে তখন মনে হতে থাকে রাষ্ট্রের নামে বানিয়ে তোলা সমস্ত আখ্যানই ইতিহাসসম্মত বাস্তব, আদতে তা নয়।

হবসবম, অতীতের সঙ্গে এদের সম্পর্ককেই, নেশাখোরদের সঙ্গে আফিমের সম্পর্কের মত বলেছেন। রোমিলা থাপার বলছেন, আমি শুধু এর সঙ্গে যুক্ত করতে চাই– যে এই সম্পর্ককে আমাদের চিনতে হবে, বুঝে নিতে হবে।

ভ্রম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যখন বর্তমানকে মোকাবিলা করার প্রয়োজন হয় তখন আদি বা মূল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে–  ‘এসব তো বহু আগে থেকেই চলছে’, ‘অতীতেও এমনটা ছিল’–  এসব বলা গেলে সেই দাবির জোর অনেকখানি বেড়ে যায়। কারণ তখন একে পরম্পরা/ ধারাবাহিকতা হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যায়। তাই সেগুলির বিচার বিবেচনা অনুসন্ধান না করে যে যা বলছে তা মেনে নেওয়া ঠিক নয়।

রোমিলা আরও লিখেছেন, যখনই সরকার, শাসনকামী দলেরা সমস্যার মুখে পড়ে, প্রশ্নের মুখে পড়ে, জনগণ তাদের প্রশ্ন করে– চাকরির অবস্থা, কম আয়, বেরোজগারি, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, শিক্ষা স্বাস্থ্যের নিম্নমুখী অবস্থা নিয়ে; তখনই শাসকগোষ্ঠী সমাধান খুঁজতে অতীতে চলে যায়। ধর্মে, বৈষম্যে ইন্ধন দিয়ে তারা মসজিদ ঘিরে ফেলে, বা খোড়াখুঁড়ির জন্য সার্ভের আবেদন করে। এই পদ্ধতি খুবই চমকদার। ফ্যান্টাসি দিয়ে বর্তমানকে ভ্রমের মধ্যে ফেলে নিজেদের ন্যারেটিভ এবং ছদ্ম-কর্মদক্ষতাকে প্রচার করা হয়। তাদের ব্যর্থতাগুলিকে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করা হয়। যারা যুক্তি দিয়ে ইতিহাস বোঝেন, বা নেশা কীভাবে মানুষকে ভ্রমে বুঁদ করে রাখে সেবিষয়ে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অভিজ্ঞতা আছে, তাঁরা এই ফাঁপা, চোখে ধুলো দেওয়া পদ্ধতিকে সহজেই বুঝে নিতে পারবেন। ফ্যান্টাসি-ভ্রম এবং তথাকথিত ইতিহাসের সঙ্গে এর সম্পর্ক কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষে খুবই লাভজনক।

রোমিলা থাপারের পুরো বইটি পড়ে বলা উচিত নয়। আশা রাখছি, আমার এই আলোচনার মধ্যে দিয়ে আপনাদের মধ্যে জিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছে। ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টা অবশ্যই করা উচিত। ইতিহাস কাকে বলে? এই একটা প্রশ্ন নিয়েই বহু বিখ্যাত ইতিহাসবিদের বহু মোটা মোটা বই রয়েছে। ইতিহাসের দর্শন নিয়েও তাঁরা লিখেছেন। এটুকু জানতেই বেশ কয়েকবছর সময় লেগে যাবে। পড়াটা জরুরি। আমাদের ইতিহাস পড়ানো হয়নি বলে– অন্যের বাড়িতে, অন্যের ধর্মস্থানে, অন্যের পাড়ায় গিয়ে গুণ্ডাগিরি করে দাবি করা যে– আমরা ইতিহাস ঠিক করতে এসেছি– এই অভ্যেস ভয়ঙ্কর। এই অভ্যেস ইতিহাস পড়িয়ে, বা না পড়িয়ে তৈরি করা হয়নি। এই অভ্যেস আসলে গুণ্ডাগিরির রাজনীতি শেখাচ্ছে, ইতিহাস নয়। এই ধরণের রাজনীতি আপনাকে ইতিহাস শেখানোর নামে অমানবিক এবং অপরাধী বানিয়ে তুলছে।

শিরোনাম : মার্কসবাদী পথ


প্রকাশের তারিখ: ১০-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org