|
‘সৌন্দর্যর নিয়মকানুন’: মার্কসের চোখেরামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য |
মানুষকে মার্কস মনে করতেন উৎপাদনশীল জীব। অর্থাৎ প্রকৃতি থেকেই মালমশলা নিয়ে প্রকৃতিতে যা নেই এমন কিছু গড়া এমন কিছু তার স্বভাবেই আছে। জীবজগতে আরও কিছু প্রাণীও উৎপাদনশীল। মার্কস উদাহরণ দিয়েছেন মৌমাছি, বিভর, পিঁপড়ের (১৯৬১ পৃ.৭৫; ১৯৭৫ পৃ. 276 ) ; পরে, পুঁজি-তে এসেছে মাকড়সার দৃষ্টান্ত (১৯৮৮ পৃ.২২৭; ক্যাপিটাল ১৯৭৬ পৃ.২৮৪)। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি বলেছেন: তাদের উৎপাদন-ক্ষমতা প্রবৃত্তিগত; নিজেদের ও তাদের প্রজাতির নতুন প্রজন্মর জন্যে তারা যুগের পর যুগ একই ধরণের চাক, জাল ইত্যাদি তৈরি করে। আগে মাথায় পরিকল্পনা করে নতুন ছাঁদে কিছু গড়ার ক্ষমতা তাদের নেই। |
১৮৪৪-এর অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি (পরে পারী পাণ্ডুলিপি বলা হবে)-র এক জায়গায় মার্কস লিখছেন : 'অতএব সৌন্দর্যর নিয়মকানুন অনুযায়ী মানুষ জিনিসপত্রর রূপ দেয়' (১৯৬১ পৃ.৭৬, ১৯৭৫ পৃ.২৭৭)। মানুষের গড়িয়ে দিকটি নিয়ে মার্কস পরেও আলোচনা করেছেন। জার্মান ভাবাদর্শ (এঙ্গেলস-এর সঙ্গে একযোগে ১৮৪৫-৪৬), কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার (এঙ্গেলস-এর সঙ্গে একযোগে, ১৮৪৮), অর্থশাস্ত্র-বিচার প্রসঙ্গে (১৮৫৮-৫৯), ও পুঁজি-র বিভিন্ন খণ্ডে (বিশেষ করে ‘উদ্বৃত্ত-মূল্যর তত্ত্বাবলি’, ভাগ ১, ১৮৬৩-৬৫) বিষয়টি নানাভাবে এসেছে। কোথাও বলা হয়েছে বস্তুগত উৎপাদন ও মানসজাত উৎপাদন-এর কথা, কোথাও বা (যেমন, মার্কস ১৮৫৮-৫৯-এ) বনিয়াদ ও ইমারত-এর রূপক-এ। কিন্তু সেগুলির কোথাও আলাদা করে 'সুন্দর' বলতে মার্কস কী বুঝতেন তা বলা নেই। এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ তাঁর আরও পরবর্তীকালের রচনাতেও পাওয়া যায় না। ফলে এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আমাদের মার্কসবাদী ও অ-মার্কসবাদী মার্কসবিশারদ-দেরই করে নিতে হবে। মার্কস-এর পারী পাণ্ডুলিপি-তে আছে : [D]er Mensch formiert daher auch nach den Gesetzen der Schoenheit (১৯৬৮ পৃ.৫১৭)। আমাদের লক্ষ্য হল Gesetzen der Schoenheit এই শব্দগুচ্ছটি বোঝা। গেসেৎজ মানে আইনকানুন, বহুবচনে গেসেৎজেন, ইংরিজিতে laws। বাঙলায় আমরা তর্জমা করেছি : নিয়মকানুন। নাখ ডেন গেসেৎসেন মানে আইনের অধীনে, ইংরিজিতে under the law। প্রসঙ্গ অনুসারে according to law, 'আইন অনুযায়ী ও হতে পারে। আর শ্যোন বলতে অনেককিছু বোঝায়, বিশেষণ হিসেবে তার ব্যবহারও ব্যাপক। তবে তার থেকে বিশেষ্য করে শ্যোনহাইট; এককথায় বলতে, সৌন্দর্য, beauty। আরও একটি শব্দগুচ্ছ ঠিকমতো বোঝা দরকার। মার্কস লিখছেন : ফরমিএরট, formiert; সাধারণ বর্তমান-কালে formieren ধাতুর প্রথমপুরুষ একবচনের রূপ । ইংরিজিতে এর মানে form up, বাঙলায় বলা যায় : রূপ দেওয়া । ডাহের, মানে therefore, therefrom, that is why (or how ) ; বাঙলায়: অতএব, সুতরাং। সব মিলিয়ে আগে বাক্যটির ইংরিজি তর্জমা করা হতো : man therefore also forms objects in accordance with the laws of beauty। পারী পাণ্ডুলিপি-র প্রথম ইংরিজি তর্জমায় অবজেকস্-এর বদলে ছিল থিংস্ (১৯৫৯/১৯৬১ পৃ.৭৬, আর ১৯৭৫ পৃ. ২৭৭ দ্র.)। বাঙলায় তাহলে আক্ষরিক তর্জমা হবে: অতএব সৌন্দর্যর নিয়মকানুন অনুযায়ীও মানুষ জিনিসপত্রর রূপ দেয়। এবার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে যাব । কিন্তু তার আগে প্রসঙ্গটি বোঝার জন্যে, যে-অনুচ্ছেদের শেষে এই বাক্যটি সিদ্ধান্ত হিসেবে এসছে, সেটিও উদ্ধৃত করা দরকার: একটি বস্তুগত জগতের বাস্তব উৎপাদন, অজৈব প্রকৃতির আকারদান এ থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে, মানুষ তার প্রজাতির একজন সচেতন সদস্য, অর্থাৎ সে এমন একটি সত্তা যে আত্মসত্তার প্রতি যেমন আচরণ করে প্রজাতির প্রতিও তেমন আচরণ করে অথবা প্রজাতির প্রতি যেমন আচরণ করে আত্মসত্তার প্রতিও তেমন আচরণ করে। সহজ সত্য এই যে, জীবজন্তু উৎপাদন করে। মৌমাছি, বীবর [বিভর], পিঁপড়ে প্রভৃতির মতো তারা বাসা বাঁধে, বাসস্থান তৈরি করে। কিন্তু তারা উৎপাদন করে তাদের নিজেদের বা সন্তানদের আশু প্রয়োজন মেটানোর জন্যে; তারা উৎপাদন করে একদেশদর্শী ভাবে কিন্তু মানুষ উৎপাদন করে সর্বদেশদর্শী ভাবে; তারা উৎপাদন করে কেবলমাত্র আশু দৈহিক প্রয়োজনের তাগিদে কিন্তু মানুষ উৎপাদন করে দৈহিক প্ৰয়োজন থেকে নিরপেক্ষভাবে, বাস্তবিকপক্ষে, সে উৎপাদন করে যখন এই প্রয়োজনগুলি থেকে মুক্ত হয় [বাঁকা হরফ লেখকের]। তারা উৎপাদন করে কেবল নিজেদেরকে কিন্তু মানুষ পুনরুৎপাদন করে সমগ্র প্রকৃতিকে; তাদের উৎপন্ন প্রত্যক্ষভাবে তাদের নিজেদের দৈহিক সত্তার অন্তর্গত কিন্তু মানুষ স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে তার উৎপন্নের সম্মুখীন হয়। নিজেদের প্রজাতির পরিমাপ ও প্রয়োজন অনুসারেই জীবজন্তু সৃষ্টি করে; কিন্তু প্রত্যেক প্রজাতির মাপ অনুসারেই মানুষ সৃষ্টি [করতে] পারে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়টির অন্তর্নিহিত পরিমাপটিকে সর্বত্র সঞ্চারিত করতে পারে (মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন ১৯৫৮ পৃ. ১৫-১৬ ব্যাঁকা হরফ যোগ করা হয়েছে)।১ মানুষকে মার্কস মনে করতেন উৎপাদনশীল জীব। অর্থাৎ প্রকৃতি থেকেই মালমশলা নিয়ে প্রকৃতিতে যা নেই এমন কিছু গড়া এমন কিছু তার স্বভাবেই আছে। জীবজগতে আরও কিছু প্রাণীও উৎপাদনশীল। মার্কস উদাহরণ দিয়েছেন মৌমাছি, বিভর, পিঁপড়ের (১৯৬১ পৃ.৭৫; ১৯৭৫ পৃ. 276 ) ; পরে, পুঁজি-তে এসেছে মাকড়সার দৃষ্টান্ত (১৯৮৮ পৃ.২২৭; ক্যাপিটাল ১৯৭৬ পৃ.২৮৪)। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি বলেছেন: তাদের উৎপাদন-ক্ষমতা প্রবৃত্তিগত; নিজেদের ও তাদের প্রজাতির নতুন প্রজন্মর জন্যে তারা যুগের পর যুগ একই ধরণের চাক, জাল ইত্যাদি তৈরি করে। আগে মাথায় পরিকল্পনা করে নতুন ছাঁদে কিছু গড়ার ক্ষমতা তাদের নেই। মৌমাছির সঙ্গে বোলতা-ভীমরুল ইত্যাদির চাক, বাবুই-এর মতো পাখির বাসা ইত্যাদির কথাও যোগ করা যায়। এগুলিও উৎপাদন, এমনকি শিল্পসৃষ্টি, কিন্তু প্রবৃত্তিজাত। হাজার হাজার বছর ধরে বাবুই সর্বত্র একই ধরনের বাসা বোনে। কিন্তু বাসা বোনার নতুন কোনো আদল বা ধাঁচ তার পক্ষে গড়া সম্ভব নয়। কম্পিউটারের পরিভাষায় বললে, যে-ভাবে তারা ‘প্রোগ্রামড’ তার বাইরে তারা যেতে পারে না। দ্বিতীয় কথা, এইসব প্রাণী ও পাখির গড়া কোনো জিনিসেরই ব্যবহার-মূল্য ছাড়া আর কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই। মানুষ অবশ্যই সেগুলির তারিফ করে, চড়ুই-এর বাসার সঙ্গে বাবুই-এর বাসার তুলনামূলক বিচার করে। কিন্তু সেটি মানুষের নিজের মাপকাঠি অনুযায়ী, ঐসব পশুপাখির তেমন কোনো মাপকাঠি নেই। তৃতীয় কথা, আর আমাদের পক্ষে সেটিই সবচেয়ে জরুরি কোনো প্রয়োজন না-থাকলেও মানুষ এমনকিছু উৎপাদন করে যেগুলি নিছকই আনন্দ পাওয়া ও দেওয়ার জন্যে। যে-তাগিদে মানুষ ছবি বা মূর্তি গড়ে, মিনার বা স্মৃতিস্তম্ভ খাড়া করে, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে তার কোনো মূল্য থাকে না। আবার, মানুষ কবিতা, গান, নাটক ইত্যাদি রচনা করে, গল্প বলে ও লেখে, অভিনয় করে, ফিলম্ তোলে সেগুলিও এই একই ধরণের উৎপাদন। ঐ তাগিদকেই মার্কস বলেন, 'সৌন্দর্যর নিয়মকানুন অনুযায়ী জিনিসপত্র গড়া'। এখানেও বহুবচনে 'নিয়মকানুন' কথাটি খেয়াল করার মতো। অর্থাৎ একটিমাত্র সর্বাত্মক 'নিয়ম' নয়, একাধিক নিয়ম আছে। যেমন, কোনো দৃশ্যবস্তুর ক্ষেত্রে উজ্জ্বল রঙ বা জ্যোতি বা দ্যুতি মানুষকে তৃপ্তি দেয়; ম্যাড়ম্যাড়ে রঙ তা দেয় না। তামা বা লোহার চেয়ে সোনা ও রুপোর নান্দনিক আবেদন তাই নিঃসন্দেহে বেশি (যদি ধরে নিই তামা বা লোহার আদৌ কোনো নান্দনিক আবেদন আছে)। সূর্যোদয় ও অস্ত, সর্ষে বা সূর্যমুখীর খেত আর তাদের ছবি এসবের ভালো দৃষ্টান্ত। মাটির তলা থেকে যা-কিছু পাওয়া যায়, হিরে তার একটি। কয়লার সঙ্গে তার যোগ থাকলেও, নান্দনিক আবেদনের দিক থেকে হিরের কাছে কেউ লাগে না। তার প্রধান কারণ: দীপ্তি। পাকা হাতে কাটলে তা আরও বাড়ে। তেমন আর-একটি 'নিয়ম': সুষমা বা সামঞ্জস্য। মানুষের বা দেবতার মূর্তির গড়নে নাভির ওপরের অংশর সঙ্গে তার সারা শরীরের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত আছে। গ্রীক ভাস্কর, ফিডিয়াস (আনু. –৪৮০-৪৩০) তাঁর মূর্তিগুলিতে এই 'সোনালি অনুপাত' ব্যবহার করতেন (১:১.৬১৮)। তাঁর নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী এই অনুপাতের নাম দেওয়া হয়েছে : ‘ফাই’(phi, Ø)। কবিতার ছন্দমিল, স্তবকবিভাগ, নাটকের আদি-মধ্য-অন্ত ভাগ (আরিস্ততল, কাব্যতত্ত্ব ৭.৩, ১৪৫০খ ২৫-৩৫) বা যে-গড়ন থেকে একটি পিরামিড-এর মডেল খাড়া করেছিলেন গুস্তাভ ফ্রেইটাগ (১৮১৬ ১৮৯৫) (অ্যাব্রাস্ ১৯৯৩ পৃ.২৬১) ইত্যাদিও এই নিয়মের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে। এমন আরও একটি 'নিয়ম': অখণ্ডতা ও পূর্ণাঙ্গতা। ক্ষতিগ্রস্ত, অঙ্গহীন বস্তু মানুষের চোখে অসুন্দর বলে ঠেকে, যদি-না সেই অবস্থাতেও বস্তুটির কোনো গুণ দেখা যায় (যেমন, মিলো-র ভেনাস-মূর্তি)। বেসুরো গান, কবিতায় ছন্দপতন ইত্যাদি এই কারণেই দোষী। ওপরে যে-'নিয়ম’গুলির কথা বলা হলো সেগুলিকেই প্রথাগতভাবে 'সৌন্দর্য'র নিয়ম বলে ধরা হয়েছে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদেহর সৌন্দর্য বিচার করা হতো এগুলির (এক বা একাধিক গুণের) ভিত্তিতে। দাঁড়িয়ে-থাকা কোনো পুরুষ বা নারীর শরীরের বাঁ ও ডান পাশের প্রতিসাম্য/সামঞ্জস্য (bilateral symmerty)তো সকলেরই থাকে। কিন্তু তার ভিত্তিতে কি সুন্দর-অসুন্দরের তফাত করা হয়? অতীতে যা-ই হয়ে থাকুক, আমরা এখন অন্তত প্রথমেই মুখশ্রীর কথা বলি, অন্য দিকের কথা আলাদা করে আসে। কিন্তু প্রাচীন গ্রীস-এ, রোম-এ বা ভারতে বা আর কোথাওই মুখশ্রী দিয়ে বিচারের চল ছিল? যতটুকু জানি : না। ইওরোপে নবজাগরণের সময়েও ভাস্কর্যে, দেবতাদের মূর্তি গড়ায় অনুপাতই ছিল প্রধান বিচার্য। বরং রাফাএল (১৪৮৩ ১৫২০) থেকে অনেক চিত্রকরের ছবিতে মুখ-কে শ্রীমণ্ডিত হতে দেখা যায়। আমার জানার মধ্যে ইংরেজ নাট্যকার, ক্রিস্টফার মারলো (১৫৬৪ ১৫৯৩)-র ডক্টর ফসটাস নাটকে নায়কের একটি উক্তিতে সৌন্দর্য বিচারের এই নতুন মান-এর কথা ধরা পড়ে। অলৌকিক উপায়ে ফসটাস-এর সামনে গ্রীক পুরাণের চরিত্র, অপরূপ সুন্দরী হেলেন-কে হাজির করা হয়েছে । বিস্মিত, বিহ্বল ফসটাস বলে ওঠেন : Was this the face that launched a thousand ships . . এই কি সেই মুখ যা সহস্র তরীকে ভাসিয়ে ছিল [সমুদ্রে] . (৫।১।৭৯)? মুখ যে সৌন্দর্যর সূচক, লাবণ্যর মূলাধার তারই এক নির্ভুল নিশানা ফসটাস-এর কথায় পাওয়া যায় (পরিশিষ্ট দ্র.)। এখানে, একটু থেমে, অন্য একটি কথা বলা যাক। বোধহয় মহাবিজ্ঞানী আইজাক নিউটন (১৬৪২ ১৭২৭) -এর বিলম্বিত প্রভাবে, উনিশ শতক থেকে ‘ল’ (সূত্র) কথাটির ব্যাপক প্রয়োগ শুরু হয়। শুধু প্রকৃতিবিজ্ঞানে নয়, অর্থনীতি, ভাষাতত্ত্ব ইত্যাদি ক্ষেত্রেও শব্দটির যথেচ্ছ ব্যবহার চালু হলো। যেমন, 'বাজে টাকা [বাজার থেকে] ভালো টাকাকে হটিয়ে দেয়।' লোকে টাঁকশাল থেকে সদ্য-বেরনো চকচকে মুদ্রা বা কড়কড়ে নোট নিজের কাছে রেখে দেয়; জিনিসপত্র কেনে বা লোককে দেয় রঙচটা মুদ্রা বা বহু ব্যবহারে জীর্ণ টাকার নোট। ঘটনাটি সুদূর অতীতেও জানা ছিল। ৫ শতকে গ্রীক নাট্যকার, আরিস্তোফানেস-ও তার উল্লেখ করেছেন। ইংল্যান্ড-এর রয়াল একস্চেন্জ্-এর প্রতিষ্ঠাতা, টমাস গ্রেশাম (১৬ শতক)-ও নাকি এই কথাই বলেছিলেন। ব্যস, উনিশ শতকে তাঁর নামে ঐ কথাটির নাম হয়ে গেল Gresham's Law, গ্রেশাম-এর সূত্র। এখন আর সূত্র কথাটি যেখানে-সেখানে নির্বিচারে ব্যবহার হয় না।২ তাই মার্কস যাকে 'নিয়মকানুন' বলেছেন, তাকে আমরা গুণ, লক্ষণ, বড়ো জোর ‘নরম্’ বা ‘আদর্শ’ বলব। গত একশ বছরে সুন্দর সম্পর্কে মানুষের ধারণাও খানিক পাল্টেছে। সামঞ্জস্য-র বদলে অসামঞ্জস্য, ছন্দ-মিল ছাড়াই কবিতা, এমনকি টানা গদ্যে লেখা হলেও এগুলো এখন অনেকটাই, অন্তত কিছু মানুষের কাছে, গ্রাহ্য। ওপরে যে 'নিয়মকানুন'-এর কথা বলা হয়েছে, সেগুলি আসলে ইওরোপে ধ্রুপদী যুগের তত্ত্ব। মধ্যযুগ পর্যন্ত এগুলি প্রায় নির্বিবাদে মেনে নেওয়া হতো। 'সুন্দর' প্রসঙ্গে প্লাতো (-আনু. ৪২৯ ৩৪৭), আরিস্ততল (-৩৮৪ ৩২২) প্লাতিনুস ( + আনু. ২০৫ ৭০), সন্ত অগুস্তিন ( + ৩৫৪ – ৪৩0 ), সবশেষে সন্ত টমাস আকুইনাস ( + ১২২৫ ১২৭৪) এগুলির কথাই বলেছেন। এখানে তার বিস্তৃত বিবরণ দেওয়ার দরকার নেই।৩ কিন্তু লক্ষ করার এই যে মার্কস-এর রুচি ছিল একান্তভাবেই ধ্রুপদী, ‘ক্লাসিকাল’। মনে হয়, সেই রুচির ভিত্তিতেই তিনি 'সৌন্দর্যর নিয়মকানুন'-এর কথা বলেছিলেন। ভাবতে মজা লাগে, মার্কস এখানে যেন সন্ত টমাস-এর সার্থক উত্তরসূরি। অর্থনৈতিক চিন্তা প্রসঙ্গে আর. এইচ. টনি একবার বলেছিলেন, The last of the Schoolmen was Karl Marx, মার্কসই ছিলেন শেষ স্কুলম্যান (১৯২২/১৯৩৮ পৃ.৪৯)।৪ এমন চমকদার কথাটি কোথায় আকুইনাস আর কোথায় মার্কস! তো এমনি এমনি বলা হয় নি! নন্দনতত্ত্বর প্রসঙ্গেও কথাটি খাটে।৫ এগুলি থেকেই আন্দাজ করা যায় 'সৌন্দর্যর নিয়মকানুন' বলতে মার্কস কী বুঝতেন, নিদেনপক্ষে কী বুঝিয়ে থাকতে পারেন। পরিশিষ্ট আরিস্ততল-এর কাব্যতত্ত্ব-য় মুখশ্রীর কথাও এসেছে ( ২৫.৯; ১৪৬১ক ১২-১৪)। হোমর-এর ইলিআদ (১০।৩১৬)-এ আছে: 'দেখতে সে কুৎসিত ছিল'। আরিস্ততল মনে করেন: এর মানে বোধহয় এই নয় যে, লোকটির দেহ ছিল বিকৃত। তার মুখই বিকৃত ছিল, কারণ ‘সুশ্রীমুখ’ অর্থে ক্রেতানরা (প্রাচীন ক্রিত-এর লোকজন) ব্যবহার করতেন এউএইদেস (সুশ্রীদেহী) শব্দটি।' গ্রীক শব্দটি ভাঙলে তা-ই পাওয়া যায় : এউ, 'সু বা ভালো', এইদেস, 'আকার বা রূপ'। এর থেকে মনে হতে পারে : ৪ শতকেও মুখকেই সৌন্দর্য-র সূচক বলে ধরা হতো। কিন্তু ডি. ডবলিউ. লুকাস দেখিয়েছেন: এইদেস কাকোস বলতে 'কদাকার' (মিশেপেন) বোঝাতে পারে । যেমন এখনও ক্রিত-এ. এইদেস কথাটি শুধু মুখ বোঝাতেই ব্যবহার হয়; পুরো মানুষটি সম্পর্কে নয় (লুকাস ১৯৮৮ পৃ.২৪১)। যদি এইদেস-এর এই অর্থটি আঞ্চলিক ব্যবহারও হয়, তাহলেও বলা যেতে পারে: সুন্দর মুখ সম্পর্কে এই ধারণাটি প্রাচীন ক্রিত-এর মানুষদের চেতনায় উপস্থিত ছিল। কিন্তু সুন্দর মুখকেই সৌন্দর্য-র সূচক মনে করা হতো এমন ভাবাটাও ঠিক হবে না। সৌন্দর্য বলতে আরিস্ততল সেই পরিমিত দৈর্ঘ্য ও বিন্যাস-এর কথাই বলেছেন (কাব্যতত্ত্ব ৭.৪; ১৪৫০খ ২৫-৪০ দ্র.)। মেটাফিজিক্স্ ১৩, ৩-এও একই ধরণের কথা আছে। সুন্দর আর কুৎসিত নিয়ে দুটি চিত্রিত, সুদৃশ্য ও সুখপাঠ্য বই লিখেছেন বহুমানভাজন ইতালীয় বিদ্বান, উমবের্তো একো (১৯৩২ ২০১৬) । আলাদা করে মুখশ্রীর কথা তো সেখানে চোখে পড়ল না। হয়তো মারলো-র আগেও, সৌন্দর্যর সূচক হিসেবে মুখের কথা অন্য কেউ বলে থাকতে পারেন; আমার জানা নেই। কেউ জানালে বাধিত হব।
প্রকাশের তারিখ: ০৫-মে-২০২৪ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |