রাশিয়ার গণ-আন্দোলন

সুচেতনা চট্টোপাধ্যায়

৪১ জ্যাকারিয়া স্ট্রীট থেকেই কলকাতার কমিউনিস্ট পার্টি তৃতীয় আন্তর্জাতিকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। কমরেড জন জেমিসন, চীন থেকে পালিয়ে আসা এক বিপ্লবী কমরেড কলকাতার পার্টির কাজকর্ম যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৩১ সালে নিয়মিত অর্থ সাহায্য করতেন। ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে বৈদেশিক আইন প্রয়োগ করে ভারত থেকে বহিষ্কার করে সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দেয়। তারপর আর তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।

রাশিয়ার গণ-আন্দোলন ১৬০৫-১৯০০: আবদুল হালিম

একটি মুখবন্ধ

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ কমরেড আবদুল হালিম (১৯০৬-১৯৬৬) প্রণীত ‘রাশিয়ার গণ-আন্দোলন ১৬০৫-১৯০০’ প্রথম ছাপা হয় ১৯৩২ সালে। প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় তিনি ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বইটির বিষয়ের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন: শাসকশ্রেণির অত্যাচার, জমিদার এবং পুঁজিপাতিদের শোষণ, কৃষক অভ্যুত্থান, জনবিচ্ছিন্ন সশস্ত্র বিপ্লববাদ এবং শ্রমিকশ্রেণির সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সংগঠিত গোড়াপত্তন।

আট বছর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তাই ফ্যাসিবাদ, যুক্তফ্রন্ট এবং স্পেন আর চীনে প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে প্রতিরোধের প্রচেষ্টা দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় স্থান করে নিয়েছিল। পুঁজির সাম্রাজ্যের গভীর আন্তর্জাতিকের সংকটের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বিপ্লবী সম্ভবনার ওপরেই জোর দিয়েছিলেন কমরেড হালিম। প্রথম সংস্করণের গোড়াতেই হালিম তৃতীয় আন্তর্জাতিকের কনট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যান এবং বলশেভিক নেতা ইয়ারোস্লাভস্কির লেখা রাশিয়ার ইতিহাসের প্রতি ঋণ স্বীকার করেছেন। লিখেছেন ভবিষ্যতে বলশেভিক দলের ইতিহাস রচনার ইচ্ছার কথা। বইটির প্রথম প্রকাশের কিছু আগে জেল থেকে বেরিয়ে সংগঠন এবং পত্রপত্রিকায় কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রচারে অন্যতম প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন হালিম। ১৯৩০ সালে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালীন ঔপনিবেশিক সরকারের দমন নীতি উপেক্ষা করে কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্গঠনের দ্বায়িত্ব পেয়ে রণেন সেন, সোমনাথ লাহিড়ীর সঙ্গে ‘কলকাতা কমিটি’ গড়ে তোলেন তিনি। কলকাতার গাড়োয়ান ধর্মঘটে কমিউনিস্টদের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে ঐ বছরের এপ্রিলে গ্রেপ্তার হন। একবছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ১৯৩১ সালের জানুয়ারি মুক্তিলাভ করেন। হালিম লিখেছেন ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে তিনি তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ১৯৩১ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতায় ফেরা মাত্র আবার তিন সপ্তাহ কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়ে আলিপুর জেল থেকে ছাড়া পান। লণ্ডনে গোল টেবিল বৈঠক চলছিল সেই সময়। সব রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সরকারের রোষানল নেমে এসেছিল।

আর্থিক অনটন, অনাহার এবং পুলিশের নজরদারী অগ্রাহ্য করেই দুজন মেডিকাল কলেজের ছাত্র কমরেড অতুল চন্দ্র এবং নূর মহম্মদের সাহায্যে ৪১ নং জ্যাকারিয়া স্ট্রীটের (বর্তমান নাম ‘ঢাকা হাউস’) ২৫ নম্বর ঘরে কলকাতার কমিউনিস্টদের আফিস তৈরি করলেন কমরেড হালিম। তাঁর ভাষায়:

“আমরা ২৫ নম্বর কামরাখানিকে বাসস্থান ও আফিসে পরিণত করলাম। এখানেই হইল আমাদের মার্কসবাদী সাহিত্য ও পত্রিকা প্রকাশের প্রথম সূচনা। আমরা কিছু অর্থ সংগ্রহ করিয়া ‘চাষী মজুর’ সাপ্তাহিক-পত্রিকা প্রকাশ করিলাম। পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী-সরকারের গোয়েন্দা-পুলিশের কর্মপ্রেরণা বৃদ্ধি পাইল— তাহারা খুবই সজাগ হইয়া উঠিল। ৪১ নম্বর জ্যাকারিয়া স্ট্রীটের ২৫ নম্বর কামরাটি সরগরম হইয়া উঠিল—ইহা একটি বৈপ্লবিক কেন্দ্রে পরিণত হইল। একে একে বন্ধুরা আসিয়া জুটিলেন। কমরেড রণেন সেন, অবনী (চৌধুরী), সোমনাথ লাহিড়ী, সরোজ মুখার্জী আসিলেন।... ১৯৩১ সালে জামিনে মুক্তি পাইয়া কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ মীরাট হইতে কলিকাতায় আসিয়া আমাদের সঙ্গে এই ২৫ নম্বর কামরায় কিছুদিন ছিলেন। তাঁহার আগমন উপলক্ষে এই বাড়িটি আরো প্রসিদ্ধ হইয়া উঠে। গোয়েন্দা-পুলিশের স্পাইরা প্রায়ই তাঁহাকে অনুসরণ করিত। তদুপরি কমরেড আহ্‌মদের সঙ্গেই দেখা সাক্ষাৎ করার জন্য বহুলোক এখানে আসিতেন।”

৪১ জ্যাকারিয়া স্ট্রীট থেকেই কলকাতার কমিউনিস্ট পার্টি তৃতীয় আন্তর্জাতিকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। কমরেড জন জেমিসন, চীন থেকে পালিয়ে আসা এক বিপ্লবী কমরেড কলকাতার পার্টির কাজকর্ম যুক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৩১ সালে নিয়মিত অর্থ সাহায্য করতেন। ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে বৈদেশিক আইন প্রয়োগ করে ভারত থেকে বহিষ্কার করে সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দেয়। তারপর আর তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি। আরেক জন চীনে বন্ধু হগ মার্কেটে থাকতেন। তিনিও সাহায্য করতেন। এম. মার্টিন নামে এক অ্যামেরিকান ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়র কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলেন। তিনি জাহাজে কাজ করতেন। খিদিরপুরের জাহাজঘাটায় তাঁর সঙ্গে গোপনে দেখা করতেন হালিম। কমিউনিস্ট সাহিত্য এবং পত্রিকা এনে দিতেন এবং সামান্য হলেও অর্থ সাহায্য করতেন মার্টিন।

এই বিদেশী কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদীদের সাহায্যে কলকাতা কমিটি আবার করে শ্রমিকদের মধ্যে কাজকর্ম শুরু করে। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের দমননীতির প্রকোপে ৪১ জ্যাকেরিয়া স্ট্রীটের কমিউনিস্ট দপ্তর বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এই পরিবেশেই কমরেড হালিম রাশিয়ার গণআন্দোলন বিষয়ে লিখতে সক্ষম হন।

তথ্যসূত্র:

১. আবদুল হালিম,’ ‘তিরিশের দশকে কমিউনিস্ট আদর্শ প্রচারের জন্য প্রচেষ্ঠা: ৪১নং জ্যাকেরিয়া স্ট্রীটের কাহিনী’

২. শ্যামসুন্দর দে ও গোপাল ঘোষ (সম্পাদিত), অনুশীলন/৩য় বর্ষ/ শারদীয়া সংখ্যা, শ্রাবণ/আশ্বিন ১৩৬৯, পুনর্মুদ্রণ

৩. গোপাল ঘোষ, অনীত বসু (সম্পাদিত), অনুশীলন, শারদ সংখ্যা, ১৪০৯, পৃ: ১৪-২০

* আগ্রহীরা বইটি পড়তে চাইলে নিচের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করুন। আমরা ই-মেলের মাধ্যমে বইটার PDF পাঠিয়ে দেব।


প্রকাশের তারিখ: ১০-নভেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org