রাশিয়া, গণতান্ত্রিক কোরিয়ার ঐতিহাসিক চুক্তি

টিম মার্কসবাদী পথ
‘আমরা এখন এখন এমন একজনকে পেলাম, যে আমাদের কনুইয়ের ধাক্কা দেবে, যাতে (চীন) ও রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত একটু বাড়তে পারে। সেকারণে এই তিনটি দেশ এখন কীভাবে খেলবে সেটা দেখতেই মুখিয়ে আছি আমরা’ (রয়টার্স, ২৪ জুন, ২০২৪)। জবাবে বেজিঙ বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন চীন, রাশিয়া এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়ার মধ্যে বিরোধ তৈরি করতে চাইছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বলেছে, ‘বর্তমান বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক, তাদের পারস্পরিক সমর্থন ভেঙে দিতে পারে পশ্চিমের অবরোধকে।’

আক্রান্ত হলে একে অপরের পাশে থাকবে রাশিয়া ও গণতান্ত্রিক কোরিয়া। 

রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জঙ-উনের মধ্যে হয়েছে এক ঐতিহাসিক নিরাপত্তা চুক্তি। এই চুক্তিতে উভয় দেশই ‘কেউ সশস্ত্র আগ্রাসনের মুখে পড়লে তুরন্ত সামরিক সহায়তার’ প্রশ্নে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। 

‘দু’পক্ষের মধ্যে কোনও পক্ষ কোনও একটি বা একাধিক দেশের সশস্ত্র আগ্রাসনের শিকার হলে, অন্য পক্ষ রাষ্ট্রসঙ্ঘের ৫১ নম্বর সনদ এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়া ও রাশিয়ার আইন মেনে এতটুকু দেরি না করে সঙ্গে থাকা সমস্ত উপায়ে সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করবে।’ চুক্তির ৪-নম্বর ধারায় এমনই বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।  

ওয়ালস্ট্রিট জানার্ল- শিরোনাম, এই ‘অঞ্চলে উত্তেজনা উসকে দিতে পুতিন এবং কিম ফিরিয়ে এনেছেন ঠাণ্ডা যুদ্ধ-যুগের সামরিক জোট’। উপ-শরোনাম, ‘রাশিয়া এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়ার মধ্যে এই চুক্তি উদ্বেগ তৈরি করেছে ওয়াশিংটন, সিওল এবং টোকিও-তে’।  

একসময়ের মিত্র দেশ রাশিয়া এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়া উভয়ই আজ নিষেধাজ্ঞার মুখে। যদিও কারণ আলাদা। পশ্চিমের সঙ্গে উভয়েরই সম্পর্ক বিরূপ। এখন তারা এই জোটকে নতুন করে চাঙ্গা করতে প্রত্যয়ী, যাতে পশ্চিমের বিশ্ব-বিন্যাসের বিরুদ্ধে একসঙ্গে রুখে দাঁড়ানো যায়। গত চব্বিশ বছরে এই প্রথম পিয়ঙইয়ঙ সফরে পুতিন। দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যা এক মাইলফলক।

গণতান্ত্রিক কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচী মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক পদক্ষেপকে অতীতে সমর্থন জানিয়েছিলেন পুতিন। পারমাণবিক সমরাস্ত্রের প্রশ্নে পিয়ঙইয়ঙের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভোট পর্যন্ত দিয়েছিল মস্কো। কিন্তু ইউক্রেনে যুদ্ধ বদলে দিয়েছে ক্রেমলিনের ভূ-রাজনৈতিক পাটিগণিত। মস্কো তাই পিয়ঙইয়ঙের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী। ইউক্রেনে যুদ্ধ এবং পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞায় গোলাবারুদ এবং ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য প্রথম কিমের দ্বারস্থ হন পুতিন। গতবছর সেপ্টেম্বরে কিমের মস্কো সফরের পর গণতান্ত্রিক কোরিয়া একাধিকবার গোলাবারুদ সরবরাহ করেছে রাশিয়াকে। মস্কো সরবরাহ করেছে খাবার ও জ্বালানি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এতে প্রতিরক্ষা থেকে প্রযুক্তি উভয় ক্ষেত্রই পিয়ঙইয়ঙ লাভবান হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গণতান্ত্রিক কোরিয়া-রাশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন করে সংঘাত বাড়াবে চীনের সঙ্গেও। এই রেষারেষি পরিণত হতে পারে সংঘর্ষে। মার্কিন বিমানবাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ব্রাউনের দাবি, ‘আমরা এখন এখন এমন একজনকে পেলাম, যে আমাদের কনুইয়ের ধাক্কা দেবে, যাতে (চীন) ও রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত একটু বাড়তে পারে। সেকারণে এই তিনটি দেশ এখন কীভাবে খেলবে সেটা দেখতেই মুখিয়ে আছি আমরা’ (রয়টার্স, ২৪ জুন, ২০২৪)। জবাবে বেজিঙ বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন চীন, রাশিয়া এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়ার মধ্যে বিরোধ তৈরি করতে চাইছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বলেছে, ‘বর্তমান বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই দুই প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক, তাদের পারস্পরিক সমর্থন ভেঙে দিতে পারে পশ্চিমের অবরোধকে।’ তথাকথিত মার্কিন ভারত-প্রশান্ত মহাসগরীয় রণনীতির বিরোধিতার করে গ্লোবাল টাইমস স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘রাশিয়া ও গণতান্ত্রিক কোরিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্কের অভিন্ন লক্ষ্য হলো উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় শান্তি ও সুস্থিতিকে স্থায়ীত্ব দেওয়া। এবং তাদের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা যুক্তিযুক্ত’ (২৪ জুন, ২০২৪)। এর আগেই গ্লোবাল টাইমস ‘কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি ও সুস্থিতি বজায় রাখা যে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া-সহ সব পক্ষেরই অভিন্ন লক্ষ্য’, তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছে, ‘আশু জরুরি কাজ হলো পরিস্থিতিকে শান্ত করা ও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনাকে প্রশমিত করা এবং রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে বিশ্বস্ত থাকা। চীন বরাবরই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তার অবস্থান নির্ধারণ করে এবং কোরীয় উপদ্বীপে নিজস্ব পথে তারা পালন করবে গঠনমূলক ভূমিকা’ (১৯ জুন, ২০২৪)। 

২০১৯, হ্যানয়ে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের সূত্র ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ, দেশটির ওপর থেকে একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কোরীয় উপদ্বীপের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে যে শম্বুকগতির আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা ভেঙে পড়ায় কিমকে পরিবর্তন করতে হয় তাঁর কৌশল। আর এর ধারাবাহিকতাতেই এখন ইউক্রেন যুদ্ধে তিনি পুতিনকে দিচ্ছেন সমর্থন। অন্যদিকে, স্যাটেলাইট ডেটা ও পশ্চিমের গোয়েন্দা তথ্যে সমৃদ্ধ ন্যাটো বাহিনীর সমর্থন ও পরিচালনা থেকে– রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে মার্কিন সমরাস্ত্র ব্যবহারে অনুমতি দেওয়ার বাইডেন প্রশাসনের সাম্প্রতিক নীতি পরিবর্তন– পিয়ঙইয়ঙের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে ভারতে বাধ্য করে পুতিনকে। 

ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয়, এমন দেশগুলির সঙ্গে রাশিয়ার সহযোগিতা বাড়াতে শুরু করেন রুশ রাষ্ট্রপতি। ইরানের থেকে কিনেছেন কামিকেজ দ্রোন। একবার নয়, একাধিকবার। চীন ইতোমধ্যেই রাশিয়ার অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও শক্তি ক্ষেত্রের অংশীদার দেশ। একটি একঘরে দেশ, যারা দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘাতের হুমকির মুখে সেই গণতান্ত্রিক কোরিয়াকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মস্কো এবারে দিয়েছে পূর্ব-এশিয়াতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার স্পষ্ট বার্তা। গতবছরই পিয়ঙইয়ঙের সঙ্গে মস্কোর দ্বিপাক্ষিক বাণরজ্য নয়গুণ বেড়ে হয়েছে ৩৪০০ কোটি ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যারা বিরোধী, তাদের সঙ্গে বিশ্ব-বিন্যাসে নতুন অক্ষ তৈরি করতে চায় ক্রেমলিন। চীন সতর্ক। তবে পশ্চিমের বিন্যাসের বিরুদ্ধে ঘনিষ্ঠ মিত্ররা একজোট হওয়াতে খুশী। 

রাশিয়া ও গণতান্ত্রিক কোরিয়ার মধ্যে এই চুক্তির হতে পারে সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি। 

এই চুক্তিকে ইউরেশিয়া এবং উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন আঞ্চলিক রণনীতিকে প্রত্যাঘাতের এক বোঝাপড়া হিসেবে দেখা যেতে পারে। গণতান্ত্রিক কোরিয়া এখন নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনায় বসার আগ্রহ কম দেখাবে। কোনও সন্দেহ নেই, এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে যদি রাশিয়া এবং গণতান্ত্রিক কোরিয়া তাদের এই সম্পর্ককে গুণগতভাবে একটি নতুন সামরিক জোটের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এই চুক্তিতে পূর্ব-এশিয়াতে শক্তিশালী হবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক। যা নতুন করে উসকে দিতে পারে ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগকে, যদিও এখন তা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে।


প্রকাশের তারিখ: ২৯-জুন-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org