|
খাওয়া না-খাওয়ার গল্প: সোমনাথ লাহিড়ীর ‘১৯৪৩’ এবং ‘উনিশ-শো চুয়াল্লিশ’সৈকত ব্যানার্জী |
‘১৯৪৩’ এ যেমন খিদের তাড়নায় ভেঙে পড়তে দেখা গিয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক, ‘উনিশ-শো চুয়াল্লিশ’ গল্পে তেমনি মুনাফার লোভ আর পুঁজির ষড়যন্ত্র খতম করতে থেকেছে মানবিক মূল্যবোধগুলোকে। প্রথম গল্পে যা ছিল অভুক্ত মানুষের অসহায়তা, দ্বিতীয় গল্পে তা লোভী ও ক্ষমতাবান লোকের নিষ্ঠুরতা হয়ে উঠেছে। |
‘সেই যে ল্যাংটো ছেলেটা ২০২০ সালের মে মাস। লকডাউনে খেতে না পেয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন অজস্র পরিযায়ী শ্রমিক আর তাঁদের পরিবার। খাবারবিহীন কুঁজো হয়ে আসা পেটে পথ চলতে চলতে বিহারের মুজাফফরপুর স্টেশনে এসে পৌঁছয় এক মা আর তার সন্তান। ক্লান্ত শরীরটাকে স্টেশনের মেঝেতে বিছিয়ে দিয়ে একটু জিরিয়ে নেবে বলেই হয়তো শুয়ে পড়ে মা। চোখ দুটো লেগে যাওয়ার আগে কী ভেবে কে জানে অভুক্ত ছেলেটার কপালে একটা চুমু খায়। কিছুক্ষণ পর ছেলে যখন মাকে ডেকে তোলার চেষ্টা করতে থাকে ঘুম থেকে, ততক্ষণে স্টেশনে উপস্থিত বাকি সকলে বুঝে গেছে, এ ঘুম আর কখনও ভাঙবে না। শুধু ছোট্ট ছেলেটা কিছুতেই বোঝে না কেন তার মা উঠছে না। সে তো জানত যেখানে তারা যাচ্ছে সেখানে গেলেই অনেক অনেক খাবার পাবে। এবার কে তাকে খাবারের দেশে নিয়ে যাবে! খাবারের দেশে, বেঁচে থাকার দেশে যেতে চেয়েই পথে বেরিয়েছিল জামলো মাকদুম, বারো বছরের যে মেয়েটা তেলেঙ্গনার লঙ্কা ক্ষেতে কাজ করত। খালি পেটে ১৫০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে পথ চলার পর উল্টে পড়ে সে। সময়টা ২০২০ সালের এপ্রিল মাস। ভারতবর্ষ মৃতের মিছিল দেখে আরেকবার। আরেকবার। কিন্তু প্রথমবার নয়। ঝাঁ চকচকে স্বচ্ছ ভারতের ভেতরে আধমরাদের খাবারের দেশে যেতে চাওয়া, আর চাইতে চাইতে মরে যাওয়ার দৃশ্য জন্ম নিয়েছে বারবার। আর যতবার নেমে এসেছে মৃত্যুমিছিল ততবারই পেছনে থেকেছে ক্ষমতার রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র। আজও, অতীতেও। ১৯৪৩ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল। বাংলার বড়লোক জমি-মালিকরা বুঝতে পেরেছিল দুর্ভিক্ষ আসন্ন এবং ধ্বসে পড়া আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনও সাহায্য আসারই সম্ভাবনা নেই। ফলে তারা শস্য মজুত করতে শুরু করেছিল। অর্থপিশাচ দালালরা শস্য মজুত করছিল ফাটকাবাজির জন্য। আবার সরকারও মজুত করছিল যুদ্ধের প্রয়োজনে। ক্ষেত থেকে ফসল লুঠ করতেও পিছুপা হয়নি। খাদ্য পরিস্থিতির সংকটকালেও দেখা গিয়েছিল ভারতবর্ষ থেকে খাদ্যশস্য রপ্তানি জারি রেখেছে ব্রিটিশ সরকার। যুদ্ধের আগে যেখানে ভারতে অন্তত দশ লক্ষ টন চাল ও গম আমদানি হত, সেখানে ১৯৪২-এর ১ এপ্রিল থেকে ১৯৪৩-এর মার্চ পর্যন্ত ভারত রপ্তানি করেছিল ২,৬০,০০০ টন চাল। সিংহল, আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা যেখানে যেখানে চাল ফুরিয়েছে সব জায়গায় ব্রিটিশদের প্রয়োজনে ভারত থেকে চাল রপ্তানি করা হয়েছে। ফলে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করার ন্যূনতম উপায়ও আর রাখা যায়নি। ১৯৪৩ সালেই এই দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে মারা যান পনেরো থেকে ত্রিশ লক্ষ মানুষ। রাজনৈতিক কর্তব্যবোধ থেকেই এই সময়ের গা শিউরোনো নিষ্ঠুরতাকে গল্পের আকার দিতে চেষ্টা করেছেন সোমনাথ লাহিড়ী, শাসকের ইতিহাস যাতে মুছে না ফেলতে পারে এই তাবৎ যন্ত্রণার ইতিবৃত্ত। সোমনাথ লাহিড়ীর দুটি গল্পের নাম ‘১৯৪৩’ এবং ‘উনিশ-শো চুয়াল্লিশ’। নামকরণ থেকেই আন্দাজ করা যায়, নিছক গল্প বলতে বসেননি লেখক। ধারণ করে রাখতে চেয়েছেন মানুষেরই ষড়যন্ত্রে তছনছ হতে থাকা এক কালপর্বের যন্ত্রণাকে। ‘১৯৪৩’ গল্পে যখন ব্রিটিশ মিলিটারি একের পর এক কারখানাকে যুদ্ধের প্রয়োজনে অধিগ্রহণ করছে সেই সময় কাজ হারায় চটকলের শ্রমিক বিষ্টু আর রানি। ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে দিনের পর দিন আধপেটা খেয়ে কাটায় রানি। কমিউনস্ট পার্টির চেতাবনিকে উপেক্ষা করে দু নম্বর কারখানায় কাজের জন্য যেতে বারণ করা হয় শ্রমিকদের। বলা হয়, ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে ঘরে বসেই আরামে কাটবে তাদের। এই ফাঁদে পা দেওয়ার কিছুদিন পরেই মোহভঙ্গ হয় বিষ্টুদের। ক্ষতিপূরণ আসে না। যখন বিষ্টু কাজ খুঁজতে বেরোয় তখন আর কাজ নেই কোথাও৷ আধপেটা খেয়ে রোদ্দুর মাথায় করে হন্যে ঘুরেও ফাঁকা হাতে বাড়ি ফেরার আফসোস রাগ হয়ে আছড়ে পড়তে থাকে স্ত্রী আর সন্তানের ওপর৷ পেটের খিদে পরিবারের মানুষকেও শত্রু বানিয়ে তুলতে থাকে। ওদিকে মজুর সর্দার উমেদি বারবার হাতছানি দিতে থাকে রানিকে, স্বামী সন্তানকে ফেলে তার সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার জন্য। ধর্মে সইবে না বলে কিংবা সন্তানকে ফেলে যেতে না পারার পিছুটানে নিজেকে আটকে রাখে রানি। আবার সেই সন্তানকেই চোখের সামনে না খেয়ে মরতে দেখার চেয়ে ফেলে চলে যাওয়া ভালো কিনা তাই নিয়েও দ্বিধা চলে রানির মনে। তাই বিষ্টু-রানি যখন গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তখন রানি কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। তার মনে হয়, ‘গাঁয়ের মন্দিরে কত ধম্ম আছে। ভাতও আছে নিশ্চয়...’। না খেয়ে থাকতে নিশ্চয়ই হবে না তাদের৷ ভাতের লোভে স্বামী-সন্তান ছেড়ে পরপুরুষের সঙ্গে পালাতেও হবে না রানিকে। বিষ্টু-রানির ফেরার পথ দুর্ভিক্ষের বীভৎসতায় ভরা। তারা দেখতে পায় দলে দলে মহিলারা বাচ্চাদের সঙ্গে করে না-খাওয়া শরীরগুলোকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে কলকাতার দিকে৷ কলকাতা তাদের চোখে স্বপ্নপুরী, যেখানে লঙ্গরখানায় নাকি খিচুড়ি পাওয়া যাচ্ছে৷ যদিও লঙ্গরখানা সম্পর্কেও তাদের কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই, কলকাতার বাস্তবতা সম্পর্কেও। কলকাতার পথে ফুটপাথেও তখন অভুক্ত মানুষের মৃতদেহের স্তূপ। সেই ধারণা নেই বলেই খেতে পাওয়ার আশায় তারা দলে দলে ছুটছে। পুরুষেরা আগেই ছেড়ে চলে গিয়েছে গ্রাম কাজের সন্ধানে, কিংবা কাজ খোঁজার নামে পরিবারের বোঝাকে পিছনে ফেলে রেখে। গ্রামের পর গ্রাম তখন ফাঁকা। কোনও ঘরে বা পড়ে রয়েছে পচন ধরা মৃতদেহ। সেই গা ছমছমে মৃত্যুপুরী পেরিয়ে পেরিয়ে বিষ্টু-রানিরা এসে পৌঁছয় নিজেদের গ্রামে। সেখানেও দৃশ্যের কোনো পরিবর্তন নেই। খাবারের আশায় বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক দিয়ে নিরুদ্দেশে চলে গিয়েছে বিষ্টুর ভাই। আশেপাশের সমস্ত গ্রাম ফাঁকা। কেবল পালানোর প্রয়োজন হয়নি গ্রামের বাঁড়ুজ্যে ঠাকুরদের। দুর্ভিক্ষের বাজারে অন্যদের জমি-বাড়ি-শস্য দখল করে করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে বাঁড়ুজ্যে ঠাকুর। খাবারের আশায় তার কাছে গিয়ে ব্যর্থ হতে হয় বিষ্টুদের। শুধু রানির প্রতি লালসার চোখ গিয়ে পড়ে বাঁড়ুজ্যে ঠাকুরের৷ তারই প্ররোচনায় বিষ্টু শেষ সম্পদটুকুর বিনিময়ে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় কলকাতায়। পিছনে পড়ে থাকে রানি আর তার ছেলে। খাঁ খাঁ করা গ্রামের পর গ্রামে হাড় জিরজিরে সন্তানকে ট্যাঁকে নিয়ে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে থাকে রানি। কখনও সন্তানকে সেও ফেলে রেখে চলে যেতে চায় বিষ্টুর মতো। পারে না। আত্মসমর্পণ করে বাঁড়ুজ্যে ঠাকুরের কাছে। শরীরের বিনিময়ে খাদ্য সংগ্রহ করতে থাকে। তাও চলে না বেশিদিন। ছেলের মুখ থেকে ছোলা কেড়ে খেতে চায়। বেঁচে থাকার নির্মম সমস্ত চেষ্টাকে ভাষায় রূপ দিয়েছেন সোমনাথ লাহিড়ী এই গল্পে। যখন মৃত্যুপথযাত্রী সন্তানের পাশে বসে আছে রানি সেই সময় ছেলের পায়খানার সাথে বেরিয়ে যাওয়া ছোলা জলে ধুয়ে খেতে দেখা যায় রানীকে। দেখা যায় মৃত সন্তানের পাশে শুয়ে খাবারের আশায় দেহ বিক্রি করতে। খেতে না পাওয়ার যন্ত্রণা কীভাবে পরিবার, মানবতা, সংবেদনা সবকিছু মুছে ফেলে মানুষকে জান্তব করে তোলে, ‘১৯৪৩’ তারই উদাহরণ। ‘১৯৪৩’ গল্প আসলে সময়েরই ধারা বিবরণী। যতই নিষ্ঠুরই হোক, তা যে কষ্টকল্পনা নয় তার প্রমাণ আমরা পাব সেই সময়ের সংবাদপত্রের দিকে তাকালে। ১৯৪৩-এর ২৮ নভেম্বর হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় খবর বেরোয়, এক ব্যক্তি যাকেই দেখতে পায় তাকেই নিজের শিশুকন্যাটি কিনে নিতে অনুরোধ করে। কেউই রাজি না হলে সে শিশুটিকে কুয়োর মধ্যে ফেলে দেয়। বাঁচিয়ে রাখলে খেতে দিতে হবে যে! ১৫ সেপ্টেম্বর ‘বিপ্লবী’ পত্রিকায় লেখা হয়, জ্ঞানেন্দ্রনাথ পাণ্ডা নামে ছোঙরা গ্রামের এক ব্যক্তি খিদেয় পাগল হয়ে গিয়ে পরিবারের সকলকে কেটে ফেলে। আত্মহত্যা সেই সময় এতোটাই সাধারণ ঘটনা হয়ে গিয়েছিল যে সংবাদপত্রে আর সেই বিবরণ দেওয়া হত না৷ কেবল নাম-ঠিকানা-তারিখ লিখে তালিকা প্রকাশ করা হতো। কলকাতার সংবাদপত্রগুলো মন্বন্তরের কারণে নৈতিক অধঃপতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করত বারবার। তখন মায়েরা খুনিতে, গ্রামের সুন্দরী মহিলা গণিকায়, বাবা মেয়ের চালানকারীতে পরিণত হয়েছিল বহু জায়গাতেই। রানির ঘটনাও সেই সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু কেন তাহলে খিদের জ্বালায় ছটফট করতে থাকা মানুষ দোকান থেকে খাবার লুটপাট করেনি কোথাও, বেশিরভাগ দোকান অরক্ষিত অবস্থায় থাকলেও? ধর্মবোধ কিংবা অদৃষ্টচিন্তা থেকে? খিদে যখন মানুষকে পশুতে পরিণত করে তখন ওসব থাকে না। লুটপাট করেনি, কারণ সেই শারীরিক শক্তিও তাদের আর বাকি ছিল না। ত্রাণ আধিকারিক বিনয় রঞ্জন সেন বলেছেন, ‘যখন একটা মন্বন্তর ব্যাপক রূপ নেয়, মানুষ এত শক্তিহীন হয়ে পড়ে যে সেসময় যেখানে খাদ্য সরবরাহ করা হয় সেখানে গিয়ে হিংস্র হয়ে ওঠার মতো শারীরিক ক্ষমতা তাদের আর থাকে না।’ রানিকেও সন্তান বুকে নিয়ে মিঠাইয়ের দোকানের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখি আমরা। কেড়ে খাওয়া তো দূরের কথা, হাত পেতে চাইবার সাহসও তার তখন অবশিষ্ট নেই৷ খিদের চোটে মানুষ থেকে প্রেতে পরিণত হতে থাকার দৃশ্যই কি একমাত্র সত্য? মন্বন্তরের বাংলায় শুধু কি না খেয়ে মরে যাওয়া মানুষেরাই ছিল? অল্প হলেও আরেক অংশের মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে সেই সময়ের বাংলার মানচিত্রে যারা এই দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের বাজারকে কাজে লাগিয়ে মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলেছিল। ‘১৯৪৩’ গল্পের বাঁড়ুজ্যে ঠাকুর যেমন, তেমনি ‘উনিশ-শো চুয়াল্লিশ’ গল্পের বিকাশ কিংবা শ্রীমন্ত। যুদ্ধের বাজারে কন্ট্রাক্টরি করে লাভ বেশি বলে মধ্যবিত্তের এক অংশ এই ব্যবসায় ঢোকে। লাভের নেশায় দেদার চলতে থাকে ঘুষের কারবার৷ অনাহার-পীড়িত বাংলার এ আরেক পিঠের ছবি। একই মুদ্রার দুইদিক যেন। ভেঙে পড়া বাংলার আমলাতন্ত্র, সরকারী নীতিহীনতা, আর যুদ্ধের বাজারকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা কামাতে চাওয়া বিকাশ কিংবা শ্রীমন্তের মতো বেনিয়াদের কাছে দুর্ভিক্ষ কিংবা যুদ্ধের টালমাটাল পরিস্থিতি আসলে ওপরে ওঠার সিঁড়িই কেবল। সেই সিঁড়ি বেয়ে একে অন্যের সঙ্গে রেষারিষি করার এমন খেলায় তারা মশগুল, যে জেতার আশায় শ্রীমন্ত তার বউকেও ঘুষ আকারে কর্ণেলের কাছে পাঠাতে পিছুপা হয় না। বিকাশও প্রস্তুত হয় নীরদাকে ভেট হিসেবে উপস্থাপন করতে। ‘১৯৪৩’ এ যেমন খিদের তাড়নায় ভেঙে পড়তে দেখা গিয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক, এ গল্পে তেমনি মুনাফার লোভ আর পুঁজির ষড়যন্ত্র খতম করতে থেকেছে মানবিক মূল্যবোধগুলোকে। প্রথম গল্পে যা ছিল অভুক্ত মানুষের অসহায়তা, দ্বিতীয় গল্পে তা লোভী ও ক্ষমতাবান লোকের নিষ্ঠুরতা হয়ে উঠেছে। বাড়তি মুনাফার লোভে প্লাইউডের সঙ্গে সঙ্গে কেসিন তৈরির ব্যবসাও শুরু করে বিকাশ। কেসিন তৈরির জন্য প্রয়োজন হয় দুধের। এই ব্যবসা কখন শুরু করছে বিকাশ? যখন না খেতে পেয়ে চারপাশে মরে যাচ্ছে বাচ্চা থেকে বুড়ো। মানুষের খাদ্য দুধ যে গুঁড়ো হয়ে, আঠা হয়ে, তিনটে প্লাইকে জোড়া লাগিয়ে কিছু মানুষের সুখ বাড়ালো আর তার জন্য আরও কয়েক হাজার পরিবার তাদের সন্তানের মুখে দুধের বদলে বার্লি কিংবা ভাতের মাড় তুলে দিতে বাধ্য হল সেকথা বিকাশের মাথায় এলেও, এসব মানবিকতার চিন্তা মুনাফার আনন্দের সামনে এঁটে উঠতে পারল না। কেবল শিমূল গাছের দামের ওপর যখন গভর্নমেন্টের কন্ট্রোল অর্ডার জারি হলো, তখন বিকাশের মনে হল খাবার দুধের ওপর এদিকে দামের কন্ট্রোল নেই। বাহ্যিকভাবে সেই মনে হওয়ার পিছনে বহু শিশুর না খেতে পাওয়ার যুক্তি থাকলেও আসলে বেশি দামে বিকাশকে যে কেসিনের জন্য দুধ কিনতে হচ্ছে, সেই জ্বালাই ছিল প্রধান। এক শ্রেণির মানুষের যন্ত্রণার জন্য যে আরেক শ্রেণির মানুষের নিষ্ঠুর লোভই দায়ী, শ্রেণিবৈষম্যই যে আদতে নিয়ে এসেছে মন্বন্তরের অভিশাপ, তা বুঝিয়ে দিতে ভুলচুক হয়নি লেখকের। ‘কলিযুগের গল্প’ গল্পগ্রন্থের মধ্যে সংকলিত হয়েছে সোমনাথ লাহিড়ীর দুটো গল্পই। গল্পগ্রন্থের একটি গল্প ছাড়া বাকি সব গল্পই ১৯৪৩ থেকে ১৯৬০-এর মধ্যে রচিত। মন্বন্তর, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, বেকারত্ব আর শ্রেণিশোষণের যে চিহ্নগুলিকে দিয়ে লেখক ‘কলিযুগ’ নির্দেশ করেছেন এত বছর পেরিয়ে এসেও সেই চিহ্নগুলি মুছে যায়নি ভারতবর্ষ কিংবা বাংলার বুক থেকে। সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে আজও। একদিকে না-খাওয়ার গল্প ‘১৯৪৩’, আরেক দিকে ঘুষ খাওয়ানো আর লাভের গুড় খাওয়ার গল্প ‘উনিশ-শো চুয়াল্লিশ’ - সময়সূচক দুই গল্প যন্ত্রণার সমতুল্যতায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ফিরে এসেছে আজকের সময়েও। যেভাবে ইতিহাস ফিরে ফিরে আমাদের বাস্তবতাকে চিনিয়ে দিয়ে যায়, সেভাবেই। ঋণ স্বীকার: প্রকাশের তারিখ: ২৮-আগস্ট-২০২৩ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |