|
সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রমিকশ্রেণিচিত্তব্রত মজুমদার |
ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, সাম্প্রদায়িকতাই মানুষের বিশ্বাস অনুসারে ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করে। প্রতিটি ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের মধ্যেই এই সাম্প্রদায়িক শক্তির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। এই শক্তিগুলি আজ নিজ নিজ ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় প্ররোচিত করে দেশের জাতীয় সংহতি ও ঐক্যকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। এ কারণেই এই শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আজ প্রতিটি দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কর্তব্য হিসাবে উপস্থিত হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূল করেই আমরা একদিকে প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ বিশ্বাস অনুসারে ধর্মপালনের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবো অন্যদিকে জনজীবনের সমস্যাগুলির সমাধানের লক্ষ্যেও সমস্ত ধরণের ধর্মে বিশ্বাসী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো। |
সারা দেশ আজ এক ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির সম্মুখীন। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি এভাবে কখনোও বিপন্ন হয়নি। পরিস্থিতি আজ দেশের সমস্ত দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবার আহ্বান জানাচ্ছে। নানা ধর্মের মানুষকে নিয়ে আমাদের এই বিশাল দেশ ভারতবর্ষ। একদিকে আমরা বিপুল প্রাকৃতিক ও মানবিক সম্পদের অধিকারী, অন্যদিকে আমাদের বিপুল সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করবার ফলে পবর্তপ্রমাণ বাধা আমাদের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করে রেখেছে। পরিণতি হিসাবে, আজও আমরা অনাহার, অচিকিৎসা, অশিক্ষা, দারিদ্র্য, বেকারীর জ্বালায় জর্জরিত। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়েই আমাদের এই সমস্ত বাধা দূর করে এগোতে হবে। জাতীয় ঐক্য এবং সংহতিই আমাদের অগ্রগতির অন্যতম প্রধান শর্ত। এ কারণেই আমাদের সংবিধানে ভারতবর্ষকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ, এর অর্থ আমাদের দেশ কোনো একটি বিশেষ ধর্মের জন্য নয়, এদেশে সমস্ত ধর্মের মানুষই সমান অধিকার ভোগ করবে। ধর্ম পালনের প্রশ্নেও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষ তার নিজের বিশ্বাস অনুসারে ধর্ম পালনের সমান অধিকার ভোগ করে থাকে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কোনো মানুষকেই তার নিজের বিশ্বাস অনুসারে ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করে না, কোনো একটি বিশেষ ধর্মকেও অন্য ধর্ম থেকে প্রাধান্য দেয় না। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংখ্যাগুরু অংশের ধর্ম-বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। কোন মানুষকে তার বিশ্বাস অনুসারে ধর্ম পালনে বাধাদান ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে অপরাধ হিসাবেই গণ্য হয়ে থাকে। রাষ্ট্র ও সমাজের অগ্রগতির বিষয়টি আমাদের প্রত্যেকের কাছেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জীবনযাপনের সমস্যা ও তার সমাধান রাষ্ট্রের নীতি ও কর্মসূচীর দ্বারাই নির্ধারিত হয়। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী হলেও সমাজের অগ্রগতির স্বার্থে রাষ্ট্রের নীতি এবং কর্মসূচী কী হওয়া উচিত সে প্রশ্নে প্রত্যেকের স্বার্থ একই। রাজনীতির প্রশ্নে এ কারণেই ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে। ধর্মবিশ্বাসের বিভিন্নতা তাদের ভিন্ন ভিন্ন পথে পরিচালিত করে না। এটা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী। এ কারণেই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে ফেলে না, উভয়ের স্বতন্ত্রতা বজায় রাখে। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িকতা অন্য ধর্মের অস্তিত্বকে সহ্য করতে পারে না। সাম্প্রদায়িক শক্তি ধর্মের ভিত্তিতে এক ধর্মমতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে তাদের পরিচালিত করে। সাম্প্রদায়িকতা রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করে এবং ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের দাবি করে। এভাবেই তারা জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে জনজীবনের সমস্যাগুলি থেকে জনগণের দৃষ্টিকে সরিয়ে দেয়। আমাদের অভিজ্ঞতা এটাই যে ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত যে কোনো রাষ্ট্রই জনজীবনের সমস্যাগুলির সমাধান করেনি। ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, সাম্প্রদায়িকতাই মানুষের বিশ্বাস অনুসারে ধর্ম পালনে বাধা সৃষ্টি করে। প্রতিটি ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের মধ্যেই এই সাম্প্রদায়িক শক্তির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। এই শক্তিগুলি আজ নিজ নিজ ধর্মে বিশ্বাসী মানুষদের ঐক্যবদ্ধ করে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় প্ররোচিত করে দেশের জাতীয় সংহতি ও ঐক্যকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। এ কারণেই এই শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আজ প্রতিটি দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কর্তব্য হিসাবে উপস্থিত হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতাকে নির্মূল করেই আমরা একদিকে প্রতিটি মানুষের নিজ নিজ বিশ্বাস অনুসারে ধর্মপালনের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবো অন্যদিকে জনজীবনের সমস্যাগুলির সমাধানের লক্ষ্যেও সমস্ত ধরণের ধর্মে বিশ্বাসী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে আমরা এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো। নানা ধর্ম-বর্ণ-ভাষার মানুষকে নিয়েই আমাদের দেশের শ্রমিকশ্রেণি গড়ে উঠেছে। শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এবং অধিকারের অর্জনের দাবিতে শ্রমিকশ্রেণিকে সংগ্রাম করেই এগিয়ে যেতে হয়। শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যই এই সংগ্রামের শক্তি। সংগ্রাম পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকেই শ্রমিকশ্রেণি তার ঐক্য গড়ে তোলবার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে। একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিই শ্রমিকশ্রেণির এই ঐক্যকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারে। সাম্প্রদায়িকতা শ্রমিকশ্রেণির এই ঐক্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং ঐক্যকে দুর্বল করে শ্রমিক আন্দোলনকে অ-কার্যকরী করে তোলে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেও আমরা দেখছি যে সংগ্রামরত অবস্থায় শ্রমিকশ্রেণিকে সাম্প্রদায়িকতা স্পর্শ করতে পারেনি। ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হবার পূর্বেই বার্ণপুরে শ্রমিকশ্রেণি তাদের জীবন-জীবিকার সংগ্রামে ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। অন্যান্য অঞ্চলে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লেও বার্ণপুরের শ্রমিকশ্রেণি সংগ্রামে এগিয়ে যাবার স্বার্থেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন। দেশ বিভাগের পরও আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি সমানভাবে সক্রিয় ছিল। তার বিষময় ফলও আমরা মাঝে মাঝেই প্রত্যক্ষ করেছি। পাশাপাশি শ্রমিকশ্রেণিও বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার শ্রমিকশ্রেণি অনেক বড় বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনা করেছে। স্বভাবতই এই সমস্ত সংগ্রামের অভিজ্ঞতা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শ্রমিকশ্রেণিকে আরও অনেক বেশি সচেতন করে তুলেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নয়া আর্থিক নীতি ও শিল্পনীতি ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশের শ্রমিকশ্রেণি যে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছেন পশ্চিমবাংলায় শ্রমিকশ্রেণি সেই সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সংগ্রামের অভিজ্ঞতা আজ কেবলমাত্র শ্রমিক ঐক্য নয় জনগণের অন্যান্য অংশকে যুক্ত করে ব্যাপক ঐক্য গড়ে তোলবার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও তাদের সচেতন করে তুলেছে। এ সচেতনতা শ্রমিকশ্রেণিকে সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে তুলতে সাহায্য করছে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, এ রাজ্যের শ্রমিকশ্রেণি নিজেদের অনেকটাই সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ভিন্ন ধর্ম, ভাষা প্রভৃতির মানুষকে নিয়েই এরাজ্যের শ্রমিকশ্রেণি গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছে সে অবস্থাতেও পশ্চিমবাংলা ছিল তুলনামূলকভাবে শান্ত। ৭ ডিসেম্বরের বাংলা বন্ধ ও ৮ ডিসেম্বরের ভারত বন্ধে বিপুলভাবে সাড়া দিয়ে এবং ৯ ডিসেম্বর বিজেপি-র ডাকা বন্ধকে প্রত্যাখ্যান করে এ রাজ্যের শ্রমিকশ্রেণি তাদের উন্নত সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী মানসিকতারই পরিচয় দিয়েছেন। সামান্য কয়েকটি ঘটনা ছাড়া রাজ্যের বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চল ছিল শান্ত। এখানে শ্রমিকশ্রেণি কল-কারখানায় তাদের স্বাভাবিক কাজকর্মকে বজায় রেখেছেন, সাম্প্রদায়িক উস্কানি তাদের প্ররোচিত করতে পারেনি। শিল্পাঞ্চলের যে কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছুটা হাঙ্গামা হয়েছে তা সমগ্র রাজ্যের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা মাত্র। যে সমস্ত এলাকায় কিছু হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেছে সে সমস্ত এলাকার বাসিন্দারা সবই শ্রমিক নন। শ্রমিক নয় এরকম সমাজবিরোধীদের ভূমিকাই ছিল এক্ষেত্রে মুখ্য। পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় যে সমস্ত কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে তাতেও শ্রমিকশ্রেণি ব্যাপকভাবেই অংশগ্রহণ করেছেন। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মানসিকতা এ রাজ্যের শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে গড়ে ওঠা সত্ত্বেও আত্মসন্তুষ্টির কোনও অবকাশ আজ আমাদের মধ্যে থাকতে পারে না। ধর্মের নামে দেশের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করতে সাম্প্রদায়িক শক্তি আজ মরিয়া হয়ে উঠেছে। শ্রমিকশ্রেণি তার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী চেতনা যেটুকু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রচেষ্টার মোকাবিলায় তাকে আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। শ্রমিকশ্রেণির সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী চেতনা উন্নত হলেও তাদের একাংশের মধ্যে এখনো যে সাম্প্রদায়িক প্রচার কোন কাজই করছে না- একথা আমরাও জোর করে বলতে পারি না। আমাদের এ দুর্বলতা দ্রুত কাটিয়ে তোলবার স্বার্থেই শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতিগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করবার পাশাপাশি শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে ব্যাপক সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী প্রচার গড়ে তোলা জরুরী হয়ে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় যে সমস্ত সভা, সমাবেশ, মিছিল প্রভৃতি সংগঠিত হচ্ছে কেবলমাত্র সেগুলিতে অংশগ্রহণ করার মধ্যে দিয়েই শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী চেতনাকে আরও সম্প্রসারিত করার কাজে আমরা প্রয়োজনীয় সাফল্য অর্জন করতে পারবো না। উপরোক্ত কর্মসূচীগুলিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তৃণমূলে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী প্রচারের বিষয়টিকে নিয়ে যেতে আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ছোট ছোট গ্রুপ সভা সংগঠিত করে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে দিয়েই এ কাজে আমরা সাফল্য অর্জন করতে পারি। আজ যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন আমরা হয়েছি তার মোকাবিলায় শ্রমিকশ্রেণিকে যোগ্য করে তুলতে একাজে আমাদের নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ঋণ: শ্রমিক আন্দোলন: জানুয়ারি, ১৯৯৩ প্রকাশের তারিখ: ২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৫ |
© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত |