সন্দেশখালির প্রেক্ষিতে (শেষ পর্ব)

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, কুমার রাণা, অনিতা অগ্নিহোত্রী
কিন্তু উন্নয়নকে কীভাবে দেখব... এইখানে তো সদর্থে বামপন্থী রাজনীতির একটা মস্ত বড় ভূমিকা আছে। বস্তুত বামপন্থী রাজনীতি ছাড়া এইটা আর কেউ করবে না। একদল তাদের শাসকের জায়গায় থেকে কীভাবে এই ব্যবস্থাটাকে লালন করে যাওয়া যায় তার জন্য লড়ছে। আর, পশ্চিমবঙ্গে সংসদীয় প্রধান বিরোধী দল যারা, তাদের রাজনীতিতে তো এই কথাগুলোই কখনও উঠবে না। তাদের রাজনীতি তো অন্য রাজনীতি। সেটা তো সমস্ত পরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয়ের খোপে রেখে কীভাবে ভাগটা করা যায়... *

অনিতা অগ্নিহোত্রী: আমার মনে হয় এই পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের কথাটা নিয়ে আমাদের আরও একটু দীর্ঘায়িতভাবে ভাবনা-চিন্তা করা দরকার। অনৈতিক রাজনীতির কথা আমরা বললাম। এখন সন্দেশখালির ব্যাপারে একটা কথা মনে রাখা দরকার। সন্দেশখালি কিন্তু কেবল এক জায়গায় নেই, পশ্চিমবঙ্গে এরকম বহু পকেট আছে। কিছুদিন আগে পূর্ব মেদিনীপুরে আমি দেখেছি, শুনেছি লোকের মুখে– যা ছিল একমাস আগে ধানের জমি, তা ভেড়ি হয়ে যাচ্ছে। এখন কোনটা জোরে, কোনটা প্রলোভনে, কোনটা অনিচ্ছায়, এর একটা সূক্ষ্ম বিচার তো বাইরে থেকে করা সম্ভব নয়। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের এ বিষয়ে নজর রাখা দরকার, যেটা তাঁরা করছেন না এবং দ্বিতীয়ত এর আগেও কিন্তু আমরা পূর্ব মেদিনীপুরে শুনেছি।

কুমার রাণা: শুধু পূর্ব মেদিনীপুর কেন, বালি পাথর কয়লা এই সমস্তটা নিয়েই তো একই ধরনের অন্যায় চলছে। এবং এই সব ক্ষেত্রেই অত্যাচারের প্রধান শিকার কিন্তু হন মেয়েরাই।

অনিতা অগ্নিহোত্রী: হ্যাঁ আমি এই প্রসঙ্গে আসছি। কেন নৈতিকতার জায়গাটা নেই? আমরা যেটা এখন দেখছি, চোখের সামনে ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠেছে, কেন্দ্রেও যেমন, রাজ্যেও তেমন। আমাদের কি নির্বাচন আয়োজন করা, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা, নির্বাচনে জেতা– হারার তো প্রশ্নই নেই!– এই ছাড়া আর কোনও কাজ নেই? আমরা সারা বছর মানুষের জন্য কী করব? এই কথাটা তাঁদের ভাবতে হবে, যাঁদের হাতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো সংগঠিত করার দায়িত্ব আছে। এখন এই যে প্রক্রিয়াটা, এটা নিয়ে একটি গবেষণাপত্রে প্রফেসর Camille Bruneau-এর লেখা পড়ছিলাম। তিনি সেখানে বলছেন যে, মেয়েদের ওপর অত্যাচার আগেও ছিল, কিন্তু যখন ধনতন্ত্র মানে ক্যাপিটাল এবং পুরুষতন্ত্র যখন এক জায়গায় হয় তখন অত্যাচারের চেহারাটা বদলে যায় এবং এই রূপটা ধারণ করে, যেটা আমরা এখন দেখছি। এখন সন্দেশখালিতে যেটা দেখলাম যে, মেয়েরা এলেন, তাঁদের নির্যাতনের কথা বললেন ক্যামেরায়, এবং সেরকমভাবে পুলিশ এবং মহিলা কমিশনের সামনে বললেন না বা বলতে চাইলেন না। কারণ তাঁরা জানেন যে দুটোর মধ্যে একটা তফাত আছে। আমি আজকে এই কথাগুলো বলব, কালকে তো এখন যারা এলাকা ছেড়ে গেছে, তারা ফিরে আসবে। পুলিশও তো আমাকে রক্ষা করে বসে থাকবে না। তখন আমাদের কী হবে? তো যা-ই হোক, তাঁরা যেটা ভেবেছেন এটা তাঁদের একটা চয়েস-এর ব্যাপার। কিন্তু কথা হচ্ছে, এর আগেও মিনাখাঁ থেকে আমি শুনেছি এরকম ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ এসেছিল, এবং ২০২১-এ এই সন্দেশখালির মেয়েরাই লিখিত ভাবে একটি দরখাস্ত প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পাঠান। তার ফল তো কিছু হলই না, বরং স্থানীয় পুলিশ তাঁদের নানারকম ভাবে হেনস্থা করতে লাগল যে তাঁরা কী করে এরকম স্মার্ট হওয়ার দুঃসাহস দেখান! এই কথাটা আমরা যারা কাজ করছি তাদের মনে রাখতে হবে।

এই কথাটা কুমার খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবে বলেছেন যে, শ্রমজীবী মেয়েরা উঠে এসেছেন, তাঁরা কিন্তু এখন চোখের সামনে দৃশ্যমান। তাঁরা কাজ করছেন। কিন্তু আরও অনেক ব্যাপার আছে। এই যে আজকে পশ্চিমবঙ্গ ধরা যাক নাবালিকা মেয়েদের বিবাহে ভারতবর্ষের অন্যতম একটা রাজ্য। এটা কেন? এটার কারণ হচ্ছে, গরিব ঘরের বাবা-মা মনে করছেন যে যৌন সুরক্ষা আর পরিবার দিতে পারে না, যে কোনও ভাবে একটা বিয়ে হয়ে যাক, বিয়ে হয়ে গেলে আমরা নিশ্চিন্ত। তাঁরা অনেক সময় জানেন যে বিয়েটা ঠিক বিয়ে নয়, হয়তো চোরাচালান, তাতেও তাঁরা মেনে নিচ্ছেন। এই যে অ-সুরক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করে রাখা হচ্ছে, এইটা কিন্তু আমাদের দিবারাত্র কাউন্টার করতে হবে। এখানে যাঁরা বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করছেন তাঁদের সারা বছর কাজ করার প্রস্তুতি থাকতে হবে। আজকাল শুনছি নাবালিকা বিবাহের নালিশ পেলে পুলিশ আর নিজে থেকে যায় না। তারা ওখানকার সংগঠনগুলোকে বলে, ‘যাও তোমরা দেখো কী করা যায়’। মানে ব্যাপারটা এরকম অবস্থায় এসেছে... কারণ, সত্যি সত্যিই তো যদি ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট, ভিআইপি ডিউটি, পুলিশের অন্য কাজকর্ম আমরা দেখি, ‘মেয়েদের পাশে দাঁড়াও’– এটা তাদের কাছে প্রায়রিটি বলে আমার তো মনে হচ্ছে না।

তার সঙ্গে সঙ্গে যেটা আছে, পুষ্টির সমস্যা। শিশুদের অপুষ্টি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে সেখানে এটা দুঃখের, গর্বের দুটোই বলব যে, মিড-ডে মিল-এর কর্মী মহিলাদের আজকে বলতে হয়, এই বাজেটে কী করে আমরা শিশুদের খেতে দেব? মনে আছে আমরা হাওড়ার স্কুলে গিয়েও শুনেছিলাম যে এইটুকু টাকায় তারা ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’-এর মতো অবস্থায় সংসার চালাবার মতো করে ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছেন কী করে তাদের খেতে দেবেন, এবং তাঁরা এটাও বলেছেন যে, আমরা ওই বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে যেতে পারছি না বলে এই কাজে এই টাকাতে লেগে আছি।

আর মেয়েদের সমস্ত জীবনটাই বলতে গেলে অ-সুরক্ষিত। সেখানে এই নির্যাতনটা এতটাই আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে যে ক্যামেরার সামনে মেয়েরা এসেছেন, তাঁদের মুখ অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা বলছেন, ‘এই যে হাত ধরে টানল বা আমাদের জামা ধরে টানল’। এগুলো এমন পর্যায়ে এসেছে যে হয়তো কেউই আর খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে নিচ্ছেন না। সেখানেই কিন্তু আমাদের বিপদ। আজকে তো বলতে গেলে মেয়েদের শ্রমেই সমাজটা তৈরি– আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, মিড-ডে মিল কর্মী, সম্পূর্ণ অবমূল্যায়িত মেয়েদের শ্রমের উপরে আমাদের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা, আমাদের শিশুদের দেখা-শোনার ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে, এসব ক্ষেত্রে তাঁদের ওপর নির্ভর করছি আমরা। কিন্তু আমরা তাঁদের জন্য কিছু করতে প্রস্তুত নই। তাঁরা যদি অভিযোগ করেন তখন আমরা বলব, কই ওই অভিযোগ তাঁরা করেননি তো, তাঁরা অন্য কিছু অভিযোগ করেছেন। তা হলে পুরো পরিবেশের মধ্যে যে ভয়, যে অ-সুরক্ষা, শ্রমের যে অবমূল্যায়ন, পুরুষরা বাইরে চলে যাওয়ার ফলে একা একা একটা সংসার চালানোর যে গুরুদায়িত্ব মেয়েদের ওপরে আছে, সেটা কি আমরা একেবারেই অ্যাড্রেস করব না? এটা যদি প্রশাসন না করেন, প্রশাসন যদি উদাসীন হয় তা হলে তো আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। যাঁরা মানুষের সঙ্গে কাজ করছেন তাঁরা যেন সারা বছর ধরে কাজ করার প্রস্তুতি নিয়ে আসেন।

আর একটা বিষয় হল শিক্ষা। শিক্ষা নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়টাতে– কোভিডের সময়– কোনও কথা হল না। আমাদের অনেক উপায় ছিল ছোটদের লেভেল অব লার্নিংটা একটু ধরে রাখার জন্য একটা ব্যবস্থা করার। আমরা অনেক কিছু ব্যবহার করতে পারতাম। টেলিভিশন ব্যবহার করার একটা কথা উঠেছিল। পরে দেখা গেল সম্পূর্ণ নীরবতা। অথচ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাদ দিলে, সরকারের আরও যে অসংখ্য কর্মী পঞ্চায়েত স্তর থেকে আরম্ভ করে জেলাস্তর পর্যন্ত, তাঁদের নিয়োজিত করার আমাদের ক্ষমতা ছিল। আমরা তো কেউ করলাম না। এইখানে যাঁরা গণতান্ত্রিক সংগঠনগুলোতে কাজ করছেন তাঁদের কিন্তু ভাবনাচিন্তা করতে হবে পুরো পরিসরটা ধরার। তা না-হলে শেষ পর্যন্ত যেটাকে ফায়ার ফাইটিং বলে সেটাই চলতে থাকবে। আজকে সন্দেশখালিতে পুলিশ এল, একটা দল তৈরি হল, তারপর তারা চলে গেল। তারপর আবার যে কে সেই। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: একটা ফায়ারকে ফাইট করা যায় হয়তো, কিন্তু আগুনের আসল উৎসটা তাতে ধরা পড়ে না। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: সন্দেশখালিকে নিয়ে এখন চিন্তা হচ্ছে। একটা কমিটি গড়ে দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে বলা হয়েছে যাদের যাদের জমি নেওয়া হয়েছে, কিন্তু অনেকের পাট্টা ছিল না, পাট্টা নিতে গিয়ে ফিরে এসেছে, তাদের পাট্টা দেওয়া হবে। এটা কিন্তু একটা খুব জটিল প্রসেস। একজন সাধারণ গরিব মানুষ ওখানে পাট্টা নিতে যাবেন কাজ ফেলে, তারপর তিনি প্রমাণ করবেন তাঁর ওখানে জমি ছিল এখন গেছে, ওই ভেড়িতে বা এই টাকাটা তিনি পাননি– এ-সবের জন্য কিন্তু যথেষ্ট হ্যাণ্ডহোল্ডিং দরকার। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: এবং গেলেই যে কাজটা হবে এই ব্যবস্থায়, এরকম তো মনে করার কোনও কারণ দেখি না। 

কুমার রাণা: একটা ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা হচ্ছে যে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর এই জিনিস ঘটে চলেছে। এটা তো হঠাৎ হল না। সরকারের তরফ থেকে এখন বলা হচ্ছে যে আচ্ছা এগুলো হয়েছে? তা হলে আমরা এগুলো ঠিক করে দিচ্ছি। আচ্ছা, এগুলো কি সরকার জানে না? 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: সরকার সবই জানতেন। 

কুমার রাণা: না জানার কোনও কারণ নেই। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: বস্তুত যদি এটা তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া হয় সরকার জানে না, তা হলেও তো বলব সেটা মস্ত বড় অপরাধ। না জানাটাই অপরাধ। আমি সরকারে বসে আছি, আমি এগুলো জানব না? তা হলে আমি কিসের সরকার?

কুমার রাণা: শুধু না-জানা নয়, জানতে না দেওয়া। আমি সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের তথ্য কী আছে, দেখার চেষ্টা করছিলাম সম্প্রতি। কী তথ্য দেওয়া আছে? ২০১৫-১৬ সালের তথ্য। তারপর আপনি কিচ্ছু পাবেন না। শুধু স্কুল এডুকেশন নিয়ে তথ্য দেখতে যদি সরকারি ওয়েবসাইটে যান, পাবেন সেই ২০১৩-১৪ সালের কিছু তথ্য। কিচ্ছু নেই। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: কিন্তু স্ট্যাটিক ডেটা থেকে কি-ই বা তুমি পাবে?

কুমার রাণা: না কিন্তু আমার তো এটা জানার অধিকার আছে যে আজকের দিনে সন্দেশখালিতে কত স্কুল আছে, কত শিক্ষক আছেন, কোথায় কী আছে। সেটা স্বাভাবিকভাবে স্কুল এডুকেশনের ওয়েবসাইটে দেখতে পাওয়ার কথা। কিন্তু আপনি কিচ্ছু পাবেন না। কিছু নেই। কিন্তু সেটা তো একটা সরকারি অকর্মণ্যতার প্রশ্ন। আমি বলছি রাজনীতির প্রশ্ন, এটা নিয়ে যে রাজনীতিটা হওয়া দরকার। এই যে এক্সপ্লয়টেশনটা, এটা তো আজ সর্বত্র। আপনি ধরুন বীরভূমে কোথাও একটা বাড়ি ভাড়া নিতে গেলেন, লোক নিয়ে। তারপর দেখবেন আপনি জিনিসপত্র নামাবার আগেই তারা হাজির হয়ে গেল— কেন আপনি লোক নিয়ে এসেছেন, আমার লোক করবে। সমস্ত জায়গায় ছোট ছোট পুল আর কার্টেল তৈরি হয়ে আছে। এটাকে ভাঙতে গেলে তো একটা ইনফর্মড মুভমেন্টের প্রয়োজন। এইটা হচ্ছে বক্তব্য। আন্দোলনের ধরনটাকেও কিন্তু বদলাতে হবে। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: একটা জিনিস এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সকলেই লক্ষ্য করেছি আমরা। পশ্চিমবঙ্গের যে অর্থনৈতিক অবস্থা তাতে স্পষ্টতই বলা যেতে পারে যে একে ক্রমেই রক্তশূন্য করে দেওয়া হচ্ছে। এই যে সর্বত্র কার্টেল, সর্বত্র তোলাবাজি, যেন এটাই জীবিকার একমাত্র উপায়। এবং বড়মানুষের অর্থনৈতিক অভিসন্ধি, যেমন ভেড়ি। কেন করব না? চিংড়ি মাছের দাম বাড়ছে, এক্সপোর্ট মার্কেট বড় হচ্ছে ইত্যাদি। এইগুলো কিন্তু শেষ অব্দি হয়ে যাচ্ছে নির্বাচনকে ফান্ড করার মেকানিজম। কাজেই এগুলো তো কেউ বন্ধ করবে না। শাসকদের তরফ থেকে কে বলবে এগুলো কোরো না? এই টাকার প্রভাব তো সর্বত্র পৌঁছচ্ছে। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: এবং এটা এমনই একটা প্রক্রিয়া, এটা এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে এখনই, যে আজকে এটা ভাবাই কঠিন যে এরা কেউ এখান থেকে আর সরে আসবার কথা ভাববে। কারণ এইটাই তাদের লালন করছে। যে পলিটিকাল পাওয়ার যেভাবে তৈরি হচ্ছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে সেটা তো এইভাবেই লালন করা হচ্ছে। সুতরাং তার জন্য ওই বালিই তোলা হবে, জমিতে জল ঢুকিয়ে ভেড়িই তৈরি করে দেওয়া হবে। ওইটাই বলার চেষ্টা করছিলাম– আমি সারপ্লাসটা কীভাবে দখল করছি, এবং সেই উদ্বৃত্তকে আমি আমার পলিটিক্যাল পাওয়ার-কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে কীভাবে ব্যবহার করছি। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: কিন্তু আমাদের তো একটা বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচি থাকা দরকার।

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: এটা বুনিয়াদি এবং কাঠামোগত প্রশ্ন একেবারেই। এবং এই প্রশ্নটাতে তো আবারও বলব যে, কেন্দ্র বা রাজ্যে যাঁরা শাসন করছেন তাঁরা এই বিকল্প নিয়ে মাথা ঘামাবেন না।

কুমার রাণা: আবারও ওই রাজনীতির দিশা পরিবর্তনের কথায় আসতে হবে। আমি বারবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির কথাতে এইজন্য আসছি যে ওগুলো খুব দৃশ্যমান উন্নয়ন নয়। উন্নয়নটাকে ইট কাঠ সিমেন্ট বালিতে আনলে একে দৃশ্যমান করে তোলা যায় আর প্রচুর উপার্জন করা যায়। মানে দুটো দিকই খোলা থাকে। আমি একদিকে ওটা দেখিয়ে বলতে পারি, এই তো আমি এত কিলোমিটার রাস্তা করে দিলাম, এত বাঁধ করে দিলাম ইত্যাদি। আর সেখান থেকে যাকে বলে কাটমানি... 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: একটা কথা মনে হল, একটু মাঝখানে থামিয়ে বলে নিই। আমি যদি যাদের স্বাস্থ্য ভাল ছিল না এমন অনেক লোকের স্বাস্থ্য ভাল করতে পারি তা হলে ওটা উন্নয়ন হিসেবে দেখা হবে না। আমি যদি একটা জায়গাতে অনেক হাসপাতাল তৈরি করতে পারি ওটা উন্নয়ন হিসেবে দেখা হবে। আসলে তো ব্যাপারটা উল্টো। 

কুমার রাণা: আসলে তো উল্টো। স্বাস্থ্য ভাল হলে তো আর হাসপাতালের দরকার হবে না। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: কিন্তু ওটা ‘উন্নয়ন’ হবে না! 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: কিন্তু পরিকাঠামোয় অনেকের স্বার্থ জড়িত থাকে না! ঠিকাদার থেকে শুরু করে!

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: হাসপাতাল দরকার, খুবই দরকার, সেটাকে আমি তুচ্ছ করছি না। কিন্তু উন্নয়নকে কীভাবে দেখব... এইখানে তো সদর্থে বামপন্থী রাজনীতির একটা মস্ত বড় ভূমিকা আছে। বস্তুত বামপন্থী রাজনীতি ছাড়া এইটা আর কেউ করবে না। একদল তাদের শাসকের জায়গায় থেকে কীভাবে এই ব্যবস্থাটাকে লালন করে যাওয়া যায় তার জন্য লড়ছে। আর, পশ্চিমবঙ্গে সংসদীয় প্রধান বিরোধী দল যারা, তাদের রাজনীতিতে তো এই কথাগুলোই কখনও উঠবে না। তাদের রাজনীতি তো অন্য রাজনীতি। সেটা তো সমস্ত পরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয়ের খোপে রেখে কীভাবে ভাগটা করা যায়... 

কুমার রাণা: একদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের খোপ, আর একদিকে কর্পোরেটের টাকা। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: সেটাই বললাম। এই দুটো একেবারে মিশে আছে। এইখানে তো বামপন্থার একটা মস্ত বড় ভূমিকা আছে। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: আমার কিন্তু মনে হয় আমরা যদি এখনই একটা জিনিস নিয়ে ভাবি– একটা বিকল্প অর্থনীতির কথা। এটা শুনতে হয়তো খুব বড় শোনায়, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তো কত কিছুর পোটেনশিয়াল ছিল। কত কিছু আছে এখানে। হর্টিকালচার আছে, অন্যান্য নানারকম বিকল্প চাষ আছে, ছোট চাষ আছে। আমরা অনেক কিছু করতে পারি। কিন্তু অনেক বিকৃতি এর মধ্যে চালু হয়ে গেছে। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: একটা সময়ে তো এ নিয়ে অজিতনারায়ণ বসু’র মতো লোকেরা খুবই দরকারি কাজ করেছেন।

অনিতা অগ্নিহোত্রী: সেগুলোকেই রিভাইভ করে আলোচনা করা দরকার। কারণ এটা তো আমরা মানতে পারি না যে আর কিছুই করা যাবে না, এবং মানুষকে দিনের পর দিন ভয়ে থাকতে হবে। 

কুমার রাণা: বিকল্প অর্থনীতি... এখন এই সমস্ত কথাগুলো আমরা বলতেই পারব না, যতক্ষণ না এই একটু আগে যেটা বললেন– ‘ভয়’, ওই ভয়টা না কাটিয়ে... এখন যে পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে, যে রাজনৈতিক অবস্থা তৈরি হয়েছে তাতে আপনি কোনও গঠনমূলক প্রসঙ্গ উত্থাপনই করতে পারবেন না। আপনি বলার আগে, আপনার মুখ থেকে কথা বেরোনোর আগেই কোনও একজন, মানে যাঁরা সব কিছু ‘অচক্ষু দেখিতে পান, অকর্ণ শুনিতে পান’ তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে ‘আমরা তো করে দিয়েছি’, ‘আমরা তো জেনে গিয়েছি’ বলতে শুরু করবেন। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: কিন্তু কুমার, আমি এইখানে একটু ডিফার করব। আপনি যেটা বলছেন সেটা কেন বলছেন পরিষ্কার বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার একই সঙ্গে এটাও মনে হয় যে আমরা– আমি সাধারণ অর্থে বলছি ‘আমরা’– আমরা কি এই বিকল্পটার কথা যথেষ্ট বলছি? এটা কি যথেষ্ট আর্টিকুলেট করবার চেষ্টা করছি? এটা একেবারেই ঠিক যে, অল্টারনেটিভ বললেই সঙ্গে সঙ্গে যাঁরা শাসনের গদিতে আছেন, তাঁরা যেখানেই থাকুন কিছু একটা করে দিয়ে বলছেন ‘আমরাও করেছি’। কিন্তু আমাদেরও তো একটা দায়িত্ব আছে– ‘টু কল দ্য ব্লাফ’। এটাও তো খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অনিতা অগ্নিহোত্রী: মানুষকে তো বোঝাতে হবে যে– ‘ওটা নয়’। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: বোঝাতে হবে যে, তুমি কিছু একটা ধরে দিলে, কিছু একটা করে দিলে– এইটার কথা আমরা বলছি না। এখানে একটা কথা বলা দরকার। বামপন্থী রাজনীতি সংঘর্ষের রাজনীতি হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, এখনও করছে। তার পাশাপাশি সম্ভবত যেটা করা দরকার– এবং সেটা সংঘর্ষকে সরিয়ে রেখে নয়, গণতন্ত্রে সংঘর্ষ খুব গুরুত্বপূর্ণ– কিন্তু নির্মাণের রাজনীতিটাও করা দরকার। এই বিকল্প তৈরি করা এবং মানুষকে তাতে শামিল করা– শুধু বোঝানোর কথা বলছি না– এটাও একটা রাজনীতি। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: এখনই নয়, হয়তো আরও এক মাস পরে...

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: না, আমি শুধু সন্দেশখালির প্রসঙ্গে বলছি না, সামগ্রিকভাবে বলছি... 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: এখন যেহেতু খুব অস্থির হয়ে আছে চারদিক। 

কুমার রাণা: আমি সম্পূর্ণ একমত। যে পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে সেখানে হয়তো আপনি ঠিকই বলছেন, হয়তো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে, মানুষের দ্বারা যদি এরকম একটা কিছু উঠে আসে। যেটা উঠে আসছে কোথাও কোথাও। প্রতিরোধগুলোও তো একটা নির্মাণের প্রশ্ন। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: তুমি যেটা বললে ‘কলিং দ্য ব্লাফ’। লোককে বোঝানো– তোমাদের কী চাই আর তোমরা কী সেটা পাচ্ছ? 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: এই যে প্রচার করা হচ্ছে, অযোধ্যায় একটা মন্দির হলে তো অনেক লোকে কাজ পাবে, অর্থনীতির ভাল হবে এতে। কাজ তো পাবেই, কিন্তু এটা তো কোনও সত্যিকারের উন্নয়নের নীতি হতে পারে না যে, আমি মন্দির বানিয়ে তার থেকে উন্নয়ন করব। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এইভাবেই একটা হেজিমনি তৈরি হচ্ছে। বহু লোকের মধ্যে। সমাজের একটা বড় অংশে। বহু লোক বলছেন, হ্যাঁ সত্যিই তো, মন্দির হচ্ছে, তা হলে তো অনেক লোক কাজ পাবে। এগুলো তো পরিষ্কার করে বোঝা এবং বোঝানো দরকার। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: যাঁরা এই কথাগুলো বলছেন তাঁরা তো দেশটা কীভাবে চলে, চলা উচিত কিছুই জানেন না। তাঁরা সিকিয়োরড, উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা ধনী। আমি আর একটা জিনিস বলছিলাম এই প্রসঙ্গে। যে দাবিটা করার সময় এসেছে। এটা হচ্ছে একটা অ্যাকাউন্টেবিলিটি অব গভর্নমেন্ট। আমি তো একটা নির্বাচিত সরকার। সেখানে এই যদি অবস্থা হয় যে তারা ধরেই নিয়েছে তারা গরিবের পাশে কোনও ভাবেই দাঁড়াবে না। এটা কী করে আমরা মেনে নেব? মানে একবার নির্বাচিত হয়ে গেছে বলে আমাদের তাদের কি আর কিছু বলার অধিকার নেই? একজন মানুষ, সে অ্যাবস্কন্ডিং, সে একজন দুষ্কৃতকারী। সে ওই পলাতক অবস্থায় এফআইআর করেছে একশো সতেরো জনের নামে। সেই এফআইআর গৃহীত হয়েছে। কী করে পুলিশ সেই এফআইআর-টা নিল? তার ভিত্তিতে একজন প্রাক্তন এমএলএ, তিনি ওই এলাকায় সংগঠনের কাজ করছিলেন, ওঁদের মতে জনতাকে উত্তেজিত করছিলেন, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হল। এইভাবে যদি ল অ্যান্ড অর্ডার ভেঙে পড়ে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন কিন্তু সাধারণ মানুষ, গরিব মানুষ। মেয়েরা। তার কারণ যাঁরা ধনী তাঁরা যে-কোনও পরিস্থিতিতেই– যাকে বলে, দি এলিট উইল গেট অ্যাকসেস টু এভরিথিং। তাঁদের জন্য এই ল অ্যান্ড অর্ডারের কোনও মানে নেই।

অনেক রাজ্য আমি দেখেছি ভারতবর্ষে, যেখানে সরকার বদলায়, অনেক রকমের গণ্ডগোল হয়, বেসিক কাজ কিন্তু চলতে থাকে। মানে মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের, পুলিশের, সাধারণ এক-একটা ডিপার্টমেন্টের কাজ। তো এই যে ভেঙে-পড়াটা আমরা ফেস করছি, এটা কিন্তু উত্তরোত্তর বাড়তে পারে। এই যে সরকারের কাছে অ্যাকাউন্টেবিলিটি দাবি করা, এটা আমাদের এবার করা দরকার। সেটা আমরা কীভাবে করব, কী ভাষায় করব সেটা নিয়ে এখনই ভাবনাচিন্তা করতে হবে। এটা কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না। আমরা কতবার কার পাশে গিয়ে দাঁড়াব, কীভাবে তাদের প্রোটেক্ট করব?

কুমার রাণা: গোটা জিনিসটাই, অনির্বাণদা যেটা বললেন, ক্যাপিটালকে সার্ভ করা। এই যে মিড-ডে মিল-এর কর্মী মেয়েদের ওপর যেটা ঘটছে, এটা একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার না? একজন মানুষকে আমি ছ’ঘন্টা কাজ করাব, তারপর বারো টাকা হাতে ধরিয়ে দেব– এটা কী করে কেউ মেনে নিতে পারে? 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: এবং প্রশ্ন করলে বলব যে– ওরা তো স্বেচ্ছাসেবী। 

কুমার রাণা: যে-কোনও, যত ধরনের সামাজিক প্রকল্প আছে সবগুলোতে মেয়েরা কাজ করেন। মিড-ডে মিল বলুন, আইসিডিএস, আশা কর্মী বলুন, সমস্ত কিছু মেয়েদের দিয়ে করানো। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: কেবল সেটাই নয়। যখন ওই গৃহনির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ উঠল তখন আশা কর্মীদের বলা হল তোমরা গিয়ে এটাকে সার্টিফাই করো। কী ভয়ংকর এই কাজ! প্রচণ্ড ঝুঁকির কাজ। কীভাবে তাঁরা সেই কাজটা করেছেন! 

কুমার রাণা: প্রথমে একটা বড় কাজ হচ্ছে যে চিহ্নিত অন্যায়গুলোকে অন্যায় বলা। আমি নির্মাণের দিকটাতে সম্পূর্ণ একমত– বিকল্পের কথা বলতে হবে, ভাবতে হবে। সেগুলো প্রথমে সোজা কথাটা সোজাভাবে বলার মধ্যে দিয়েই হয়তো উঠে আসবে। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: মধ্যে দিয়েই বলতে হবে। নির্মাণকে কখনওই আলাদা একটা প্রশ্ন হিসেবে ভাবা যাবে না। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: আসলে একটা জিনিস নিয়ে চিন্তা হয়, এবং পুরো দেশের প্রসঙ্গেই। সরকার সব জায়গাতে এক ধরনের ভূমিকা পালন করছে। তারা হচ্ছে প্রোভাইডার। তুমি আমাদের কাছে এসো, কী চাও বল। আমরা করে দেব। সন্তানের জন্মের আগে থেকে শুরু করে তার স্কুলের বই-ব্যাগ-ছাতা-জুতো-সাইকেল সব দেওয়া থেকে সৎকার পর্যন্ত সরকারের দায়িত্ব। গোষ্ঠী-জীবনটা কিন্তু এই ইন্টারভেনশনের আধিক্যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গোষ্ঠী-জীবন যদি নষ্ট হয়ে যায়, মানুষ উঠে দাঁড়াতে পারে না। আমরা তো শেষ পর্যন্ত দেখলাম– পঞ্চায়েত ব্যবস্থা থেকে যতখানি পাওয়ার কথা ততখানি আমরা পেলাম কি? কিন্তু এটার বাইরেও তো আমাদের একটা জীবন ছিল। সেটার মধ্যেও রাজনৈতিক দলগুলো ছিল বা আমাদের নিত্যদিনের একটা সম্মিলিত অস্তিত্ব ছিল। সেই সম্মিলিত সমাজটাকে কিন্তু দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: তার সঙ্গে সঙ্গে একই প্রক্রিয়ায় অধিকারের বোধটাকেও নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে। যেটা বুনিয়াদি অধিকার, সেইটাকে। একটা কথা বলা যায় শেষকালে। আমাদের সংকটটা তো একেবারে আক্ষরিক অর্থে সর্বগ্রাসী। আমার মনে আছে অনেকদিন আগে– কোনও একটা বড় নির্বাচনের আগে, বছর ছয়-সাত হল বোধহয়– প্রফেসর অমর্ত্য সেনকে বলেছিলাম, যে, স্যার, আমরা তো একেবারে একটা খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি তো এর থেকে বেরোবার উপায় কী? উদ্ধারের উপায় কী? উনি একটু হেসে বলেছিলেন যে, খাদের কিনারা কী বলছেন, আমরা তো গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের নীচে পড়ে আছি! এখন মনে হয় আমরা গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের নীচে শুধু না, তারও বোধহয় ভেতরে ঢুকে গেছি। সুতরাং সংকট ভয়ংকর। কিন্তু একই সঙ্গে, সেই কারণেই হয়তো সংকটের মোকাবিলার জন্য অন্তত কীভাবে এগোনো দরকার, কী করা দরকার সেইটা, সেই রাস্তাগুলো মোটামুটি পরিষ্কার। তার কিছুটা আমরা আলোচনা করলাম। কুমার যদি এই বিষয়ে শেষে একটু বলেন।

কুমার রাণা: আবার অধ্যাপক সেনের কথাতেই বলি, তিনি বার বার যেটা বলেন, যে-কোনও বড় সংকটই একটা বড় সুযোগ সামনে এনে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পৃথিবীতে যে নানান জিনিস ঘটেছিল, বিশেষ করে যে জিনিসগুলোর ওপর সমাজতান্ত্রিক প্রভাব খুব প্রবল ছিল সেগুলো তো ওই সংকট থেকে উঠে আসা। যে কথাটা মাথায় রেখেই আমার মনে হয় একটা বিষয় হল– কী করতে হবে সেইটা জানা। কিন্তু কীভাবে করতে হবে, তার জন্য চিন্তাভাবনা দরকার, মানসিক প্রস্তুতি দরকার। তার জন্য আমার মনে হয় আমরা যেভাবে ভেবে এসেছি, জিনিসগুলো যেভাবে দেখে এসেছি সেখানে একটু মার্কস-বর্ণিত পথে পিছন দিক দিয়ে হেঁটে যাওয়া, বর্তমান পরিস্থিতিটা কোথা থেকে আসছে সেটা একটু খুঁটিয়ে দেখা দরকার। আর একটা বিষয় হচ্ছে, কোথাও যেন মনে হচ্ছে যে– অপরাধ নেবেন না– সাধারণ মানুষের শক্তি সম্পর্কে, বিবেচনা-শক্তি সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল নই, শ্রদ্ধাশীল নই। তাদের কথা তো শুনতে হবে। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: গ্রামেগঞ্জে যেতে হবে, যেখানে ক্রাইসিস নেই সেখানেও যেতে হবে।

কুমার রাণা: আমি আমাদের কথাই বলছি...

 অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: হ্যাঁ একদমই।

কুমার রাণা: তাঁরা যে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলেন, তা শোনার যেটুকু সুযোগ আমরা পাই তাতে কিন্তু পথটা পরিষ্কার। আমি আবার বলছি, যে জিনিসটা এখন প্রবল আকারে দেখা দিচ্ছে সেটা হচ্ছে অনৈতিকতা। তার বিরুদ্ধে আমরা যদি একটা নৈতিক রাজনীতিকে দাঁড় করাতে পারি, তা হলে অনেকগুলো কাজ তুলনামূলক ভাবে সহজ হয়ে যায়। 

অনিতা অগ্নিহোত্রী: শোনাটা কিন্তু একটা বড় কাজ। 

কুমার রাণা: খুব খুব জরুরি কাজ। যেটা অনির্বাণদা বার বার ওঁর লেখায় বলেন, লেখেন– শুশ্রূষা। শোনার ইচ্ছা। আমার মনে হয় শোনার ইচ্ছা, লোকের কাছে পৌঁছনো, এগুলো জরুরি। তাঁদের জ্ঞান দেবার খুব একটা প্রয়োজন নেই, বরং জ্ঞানটা যদি আমরা নিতে পারি। যে– বলুন, কী করতে হবে। 

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: একসঙ্গে ভাবা। একসঙ্গে কাজ করা। 

কুমার রাণা: ঠিক। আবার জ্ঞান দেবার প্রয়োজন নেই তা বলব না। যেমন, এই ইলেক্টোরাল বন্ড জিনিসটা কী এটা তো মানুষকে বোঝানোর প্রয়োজন আছে। আমার মনে হয় এখানে একটা খামতি থেকে গেছে। আমরা অনেক সময়েই এইগুলো নিয়ে খুব একটা বোঝাতে যাই না। বা কেন অযোধ্যাটা আসলে ভারতবর্ষের জন্য ক্ষতিকর। এটা ভারতবর্ষের জন্য শুধু যে অপ্রয়োজনীয় তা নয়। রাম মন্দিরটা শুধু অপ্রয়োজনীয় তা নয়। এটা ভারতবর্ষের ভেতরের যে অন্তর্বস্তু সেইটাকে কীভাবে নষ্ট করছে...

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: এটা শুধু একটা মন্দির তৈরি করার ব্যাপার নয়। 

কুমার রাণা: আমার মনে হয় এইটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর আরও উপায় খুঁজে বার করতে হবে।

অনিতা অগ্নিহোত্রী: আসলে এটার জন্য যেতে হবে তো মানুষের কাছে সারা বছর ধরে। একটা সময়ে, ষাটের দশকে এটা করতেন বামপন্থীরা। গ্রামে যেতেন, কথা বলতেন, ক্লাস নিতেন। কিন্তু কথাও শুনতেন। এটা কিন্তু একটা রাউন্ড দ্য ইয়ার অ্যাক্টিভিটি। এটা খালি ভোটের সময় সচল হলে তো চলবে না।

কুমার রাণা: আজকেই আমি একজনের বই পড়ছিলাম। ডি কুনহামান। কেরলের একজন দলিত মানুষ। তাঁকে খেতে দেওয়া হত মাটিতে একটা গর্ত করে। সেখানে পাতায় করে ভাত দেওয়া হত। সেখান থেকে তিনি পরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে খুব নাম করেছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী পড়ছিলাম। তাঁর কয়েক বার দেখা হয়েছিল ইএমএস নাম্বুদিরিপাদের সঙ্গে। তিনি অন্যান্য অনেক নেতাদের সঙ্গে বামপন্থী নেতাদের একটা পার্থক্য করছেন। বহু বামপন্থী নেতাদের সঙ্গে তাঁর ওঠাবসা ছিল। নাম্বুদিরিপাদ তাঁকে বার বার বলতেন, তুমি আসো না কেন? তুমি তো আসছ না। কী হল? তিনি বলেন, না, আমি তো খুব সমালোচনা করি আপনাদের। তখন উনি বলেন, ওটাই তো দরকার। সমালোচনা করাটাই তো দরকার। তুমি যদি আমার সমালোচনাই না করলে তা হলে আমি কী করে বুঝব আমি জিনিসটা কী? তা হলে তো আমি নিজেকে ভগবান মনে করব। এই জিনিসটা আমার মনে হয় বামপন্থী চৈতন্যের একেবারে গোড়ার কথা। এটা আমাদের নতুন করে কাউকে বলবার কিছু নেই।  

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়: দরকার এটার অনুশীলন করা। এইটাই।

 

*তিনজনের কথোপকথনের পরিমার্জিত রূপ
অনুলিখনঃ শিঞ্জিনী সরকার 


অন্তিম পর্বের ভিডিওটি দেখুন 

 


প্রকাশের তারিখ: ২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৪

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org