সংগীতের বামপন্থা

শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
গণনাট্যের গান কি শুধু লড়াই সংগ্রামের তাৎক্ষণিক আবেদনের সাময়িক সৃষ্টির মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখবে? গান কি শুধুমাত্র তৈরি হবে মিছিলের, হরতালের আর গণসমাবেশকে উপলক্ষ্য করে? যে মানুষ এই মিছিলের গানে উদ্বুদ্ধ হল, সে ঘরে ফিরে তার বিনোদনের সময়ে, বিশ্রামের সময়ে কী গান গাইবে বা শুনবে? সে কি আবার ফিরে যাবে ওই ধর্মীয় সংগীত আর বাণিজ্যিক গানের ছত্রছায়ায়? তবে মাঠের গানে তার যে উত্তরণ হল সেটা তো মাঠেই ফুরিয়ে গেল, ঘরে কিছুই এলো না। উত্তরের খোঁজে সলিল চৌধুরী। আজ তাঁর জন্মদিনে সলিল-স্মরণ।

গণনাট্য সঙ্ঘের সপ্তম সর্বভারতীয় সম্মেলন চলছে তখনকার বম্বে শহরে, ১৯৫৩ সাল। 

১৯৪৩ সালে এই বম্বে শহরেই মাড়ওয়ারি স্কুলে অনুষ্ঠিত হওয়া সর্বভারতীয় সম্মেলন থেকেই যাত্রা শুরু হয়েছিল গণনাট্যের। ব্যক্তি সলিল চৌধুরীর গণসংগীতের হাতেখড়ি অবশ্য গণনাট্যে যুক্ত হওয়ার আগেই। দক্ষিণ ২৪ পরগণার কৃষক আন্দোলন ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের পরিসরে লেখা হয়ে গেছে প্রতিবাদের গান। দশটা বছর গণনাট্যের গৌরবের বছর, আবার অভ্যন্তরীণ টালমাটালেরও সময়। একদিকে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতায় ও দুর্ভিক্ষ পীড়িত বাংলার মানুষের সহায়তায়, ত্রাণ সংগ্রহে সাংস্কৃতিক প্রচারাভিযানের মাধ্যমে সারা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে গণনাট্য। মানুষ স্তব্ধ বিস্ময় ও মুগ্ধতায় দেখছে শিল্পকলার নতুন ভাষা, নতুন প্রকরণ, নতুন বাণীকে। সংগীত নাটক নৃত্যে চিত্রকলায় বিপ্লব ঘটে গেছে প্রায়। ট্রাম শ্রমিক দশরথ লাল আর অভিজাত পরিবারের সুচিত্রা, দেবব্রতরা মঞ্চে গান গাইছেন পাশাপাশি। গ্রামের দরিদ্র চাষী হয়ে উঠেছে নাটকের প্রধান চরিত্র। চিত্রকলায় রাজরাজড়া বা দেবদেবী নয়, অঙ্কিত হচ্ছে দুর্ভিক্ষপীড়িত হাড্ডি কঙ্কালসার হতভাগ্য মানুষের ছবি। শিল্পকলা সাহিত্যের এই যুগান্তকারী পরিবর্তনকেই অশোক মিত্র পরবর্তী সময়ে বলেছেন 'বাংলার দ্বিতীয় নবজাগরণ'। এমন একটি যুগান্তকারী ঘটনার পাশাপাশি ১৯৪৮ সালে পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে কমিউনিস্ট আন্দোলনের লাইন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গণনাট্যের ভেতরেও তৈরি হল সংস্কৃতির সংগ্রাম নিয়ে নানা প্রশ্ন। ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক মঞ্চে যুক্ত করা হয়েছিল শাস্ত্রীয় সংগীত, নৃত্যের দিকপালদের পাশাপাশি শ্রমজীবী শ্রমিক ও লোকশিল্পীদেরও। কেউ কেউ মত দিলেন শ্রেণি সংগ্রামের সহযোগী সংস্কৃতি আন্দোলন গড়ে উঠবে শ্রমজীবী ও শ্রেণিচ্যুত শিল্পীদের অংশগ্রহণেই। শাস্ত্রীয় সংগীত, নৃত্য থেকে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে অপাংক্তেয় ভাবলেন কেউ কেউ। কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভ্যন্তরে যেমন বিতর্কের ঢেউ উঠল রাজনৈতিক লাইনের শুদ্ধ-ভুল নিয়ে, গণনাট্য আন্দোলনেও শিল্পের বিষয়, আঙ্গিক, পরিবেশন পরিসর, কাঙ্ক্ষিত দর্শক-শ্রোতা, শিল্পী নিয়ে তর্কবিতর্ক শুরু হল। পার্টির কলকাতায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কংগ্রেসের মতই এলাহাবাদে অনুষ্ঠিত গণনাট্যের ষষ্ঠ সম্মেলনে উগ্র সংকীর্ণতার নীতি গৃহীত হল। অন্যদিকে পুলিশি আক্রমণ ও জীবন জীবিকার অনিশ্চয়তায় অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেন, অনেকে আদর্শগত ভিন্নমত প্রকাশ করে সংগঠন থেকে সরে গেলেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভেতরের তর্কবিতর্ক হঠাৎই একটা দিকনির্দেশনার আভাস পায় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মঞ্চ কমিনফর্মের একটি নিবন্ধের আলোয়। সেখান থেকেই কলকাতা কংগ্রেসের বিচ্যুতির পর্ব থেকে বেরিয়ে আসার একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হয়। গণনাট্যের সপ্তম সম্মেলন আহূত হয়েছিল প্রায় অনুরূপ একটি আবহে। পেছনে ফেলে আসা টালমাটাল সময়পর্ব থেকে কীভাবে বেরিয়ে এসে আবার সংগঠনের পুনর্গঠন করা যায় সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে। 

এই সম্মেলনের একটি পর্যায়ে গণনাট্যের সংগীতের প্রকরণ নিয়ে একটি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন হেমাঙ্গ বিশ্বাস ও সলিল চৌধুরী। বিষয়টা ছিল গণনাট্যের গানের আঙ্গিক কেমন হবে? এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় ঢোকার আগে, সলিল চৌধুরীর সংগীতসত্তার গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি জানা খুব জরুরি। আসামের প্রত্যন্ত পাহাড় সংলগ্ন চা বাগান, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার পল্লী অঞ্চল ও উত্তর কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিট, এমন তিনটি বিচিত্রধর্মী সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভূগোলে সলিল চৌধুরীর শৈশব কেটেছে। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়েছে, শ্রবণে একইসাথে বাবার সংগ্রহে থাকা রেকর্ড থেকে বিঠোফেন, মোজার্ট, চাইকভস্কির পাশ্চাত্য সংগীত আর হরিমতি, কে, মল্লিক, পঙ্কজ মল্লিকদের সংগীতের প্রবেশের সাথে। সন্ধ্যার পর নির্জন চা বাগানে শুনেছেন দূর থেকে ভেসে আসা নাচের ছন্দ ও ঢোল বাঁশির সংগীত। বাঁশি বাজানো শিখেছেন চা শ্রমিক শিল্পীর কাছে। কলকাতায় সুকিয়া স্ট্রিটে, জ্যাঠার বাড়িতে ছোড়দা নিখিল চৌধুরীর হাত ধরে ঢুকেছেন অর্কেস্ট্রার দলে। পাঠ নিয়েছেন নানান যন্ত্রসংগীত বাদনের। ছ’সাত বছরের শিশু সলিল দাদার সাথে নির্বাক সিনেমার আবহ সংগীত বাজাতে গেছেন ছায়া সিনেমা হলে। কলেজে পড়ার সময়েই পেশাদার নৃত্যশিল্পীদের সাথে বাঁশি বাজিয়েছেন পেশাদার যন্ত্রশিল্পী হিসেবে। গণনাট্যে যখন যুক্ত হন সলিল তখনই তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মিউজিশিয়ান। বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা লিখেছেন গণনাট্যে আসার আগেই ছাত্র সম্মেলনে যোগ দিয়ে। ফলে গণসংগীত বা রাজনৈতিক আন্দোলনের গানকে দেখেছেন একইসাথে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কর্মী ও সংগীতশিল্পীর অবস্থান থেকে। সেই বিতর্কে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেন, গণসংগীত রচিত হবে শুধুমাত্র লোকায়ত সুরে, যে সুর শ্রমিক কৃষকের চেনা। এখানে পাশ্চাত্য সংগীতের হারমনি, কাউন্টার পয়েন্ট চলবে না। শ্রমজীবী মানুষ লোকসুর জানে, হারমনি পলিফোনি জানে না। অতএব গণসংগীতে পাশ্চাত্য সংগীতের পরীক্ষা নিরীক্ষা ফরম্যালিজম বা আঙ্গিকসর্বস্বতা মাত্র। শ্রমজীবী মানুষের অভ্যস্ত সুরেই গান বাঁধতে হবে। এর জবাব দিতে গিয়ে বলেন সলিল, পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদের জাতীয়তাবাদী গান থেকেই শুরু হয়েছে। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই পাশ্চাত্যের প্রভাব এসে পড়েছে। উপন্যাস, ছোটগল্প, সনেট, ছবিতে থ্রি ডায়মেনশন সবই এসেছে পাশ্চাত্য থেকে এবং আমরা তাতে আপত্তি করি নি। আমরা পাশ্চাত্যের পোশাক শার্ট প্যান্ট পরেই কৃষকের কাছে যাই। কৃষকের পোশাকে যাই না। আমরা একটা নতুন সংস্কৃতির কথা বলছি, নতুন রাজনীতির কথা বলছি, ফলে তার ভাষাও নতুন হবে। গ্রামের যাত্রাপালায় পাশ্চাত্যের ক্ল্যারিওনেট, হারমোনিয়াম, ভায়োলিন পৌঁছে গেছে। তার কাছে এই যন্ত্রগুলো আর বিদেশি নয়। ফলে আমাদের গানের ভাষাকে লোকায়ত আঙ্গিকের পাশাপাশি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও পাশ্চাত্য সংগীতের থেকেও উপাদান নিতে হবে। বিতর্কের সেদিন সমাধান হয় নি। গণনাট্য সম্মেলন থেকে সংগীত বিষয়ক একটি কমিশন গঠন করে দেওয়া হয়। তার পরিণতি কী হয়েছিল আমরা জানি না। তবে পরবর্তী কালে নিজের আত্মজীবনী, নানা নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছেন, সেদিনের বিতর্কে সলিলের অবস্থানই সঠিক ছিল। আমরাই ভুল ছিলাম। লোক আঙ্গিককে সর্বাবস্থায় প্রাধান্য দেওয়ার অবস্থানটিও আসলে এক ধরনের ফর্ম্যালিজমই। 

হেমাঙ্গ বিশ্বাসের এই অবস্থান পরিবর্তনের স্বাক্ষর আমরা তাঁর সৃষ্টিতে পেয়েছি। যিনি একটা সময়ে শুধুমাত্র প্রচলিত লোকসংগীতের সুরের ওপর কথা বসিয়ে গণসংগীত রচনা করেছেন, তিনি পরবর্তী কালে সুরের নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। প্রথম দিকের গান, হৈরর তেল কুন দেশে গেল, মাউন্টব্যাটেন মঙ্গল কাব্য, লঙ্গর ছাড়িয়া নাওয়ের দে, কাস্তেটারে দিয়ো জোরে শান ইত্যাদি সবই ছিল প্রচলিত লোকসুরের ওপর কথা বসানো গান। তখনকার হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ভাষায় স্তালিনের নির্দেশ অনুযায়ী, ইন্টারন্যাশনাল ইন কনটেন্ট, ন্যাশনাল ইন ফর্ম। পরবর্তী সময়ে সেদিনের সলিল চৌধুরীর অবস্থানের আদর্শে রচনা করেছেন শঙ্খচিল, আরো বসন্ত বহু বসন্ত তোমার নামে আসুক, রুশ দেশের কমরেড লেনিন, আমি যাই শাওশান বা সরাসরি ইংরেজি গানের অনুবাদ জন ব্রাউন, জন হেনরী, আমরা করব জয়

প্রকৃতপক্ষে এই বিতর্কটি শুধুমাত্র গণসংগীতের আঙ্গিকের প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, বামপন্থা ও বিকল্পের লড়াইয়ের আরো বৃহত্তর প্রশ্ন যা নিয়ে গণনাট্য আন্দোলনের অভ্যন্তরের বিতর্কগুলো আবর্তিত হয়েছিল। এ ধরনের বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি কখনোই হয় না, তবে একটা সাময়িক নিষ্পত্তি হয় নতুন বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হওয়া অবধি। কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভ্যন্তরে যে বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতির ছায়ায় গণনাট্য আন্দোলনের এই বিতর্কের জন্ম হয়েছিল পার্টি স্তরে ৬৪ ও ৬৭-র বিভাজন উত্তর সময়ে একটি মতাদর্শগত দিশা নির্মিত হয়েছে। গণনাট্য আন্দোলনে সেটা হয় নি কারণ সংগঠনের সর্বভারতীয় রূপ পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। 

সলিল চৌধুরীর জন্মদিনে এই বিতর্কের আরো গভীরে গিয়ে সংগীতের বা সংস্কৃতির বামপন্থার স্বরূপ সন্ধান করা যেতে পারে। ১৯৫০-৫১ সাল থেকে সলিল চৌধুরীর মনে যে প্রশ্নগুলোর উদয় হচ্ছিল সেটার সাথেও সংস্কৃতির সংগ্রামের মৌলিক কতগুলি বিষয়ের সম্পর্ক রয়েছে। 

১৯৪৮ সালের পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেস সাতচল্লিশের স্বাধীনতার মূল্যায়ন করে বলেছিল এ আজাদী ঝুটা হ্যায়, বলেছিল এই স্বাধীনতা মূল্যহীন দেশের শ্রমজীবী জনতার জন্যে। এক্ষুনি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বিপ্লব সমাধা করতে হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে কৃষক সংগ্রামগুলি গড়ে উঠছিল তাকে ক্ষমতা দখলের সংগ্রামে পরিণত করতে হবে। ওই সংগ্রামের সহযাত্রী হয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গান বাঁধছেন পূর্ব বাংলার লোকগানের আঙ্গিকে, ও মাউন্টব্যাটেন সাহেব ও, তোমার সাধের ব্যাটন কার হাতে থুইয়া গেলায় ও, আমরা তো ভুলি নাই শহীদ। কিংবা জয়ন্তীয়া লোকগানের সুরে, আজাদী হয় নি আজো তোর, নববন্ধন শৃঙ্খলডোর, দুঃখ রাত্রি হয় নি ভোর, আগে কদম কদম চলো জোর। সলিল চৌধুরী গান তৈরি করলেন, নাকের বদলে নরুন পেলুম টাক ডুমা ডুম ডুম, আর জান দিয়ে জানোয়ার পেলুম লাগল দেশে ধুম। লড়াইয়ের জোশ যেন গানের কথা সুরে প্রতিফলিত হয়, ও গাঁয়ের যত মা-বোন আছ, তোমরা থেকো ঘরে, ওই আঁশবটি আর কাটারিটা রেখো হাতে করছ, যেন দালাল বেইমান যত, পায় শিক্ষা উচিত মতো, এই বাংলাদেশের মা-বোন কত শক্তি হাতে ধরে 

১৯৫০-৫১ থেকে সলিল চৌধুরীর মনে প্রশ্ন জাগছে, গণনাট্যের গান কি শুধু লড়াই সংগ্রামের তাৎক্ষণিক আবেদনের সাময়িক সৃষ্টির মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখবে? গান কি শুধুমাত্র তৈরি হবে মিছিলের, হরতালের আর গণসমাবেশকে উপলক্ষ্য করে? যে মানুষ এই মিছিলের গানে উদ্বুদ্ধ হল, সে ঘরে ফিরে তার বিনোদনের সময়ে বিশ্রামের সময়ে কী গান গাইবে বা শুনবে? সে আবার ফিরে যাবে ওই ধর্মীয় সংগীত আর বাণিজ্যিক গানের ছত্রছায়ায়? তবে মাঠের গানে তার যে উত্তরণ হল সেটা তো মাঠেই ফুরিয়ে গেল, ঘরে কিছুই এলো না। তাছাড়া স্থিতাবস্থার যে সাংগীতিক আক্রমণ তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে গণশিল্পীকে কোন আদলে গড়ে তোলা হবে? এই সমস্ত ভাবনার সূত্র ধরেই আসে ফর্ম ও কন্টেন্টের ১৯৫৩ সালের বিতর্ক। 

এই সমস্ত কিছুর মূলে রয়েছে একটি প্রশ্ন, সংস্কৃতি শুধুই কি হাতিয়ার? সংস্কৃতির কাজ কি শুধু অন্য একটি লড়াইয়ের অস্ত্র হয়ে ওঠা? তার নিজের কোনও লড়াই নেই? আজকের পৃথিবীর কথা বলতে গিয়ে ২০০৮ সালে ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেসের ৬৯ তম অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ দিয়েছিলেন কে এন পানিক্কর এই শিরোনামে, 'কালচার এজ এ সাইট অব স্ট্রাগল'। প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতি সর্বযুগেই যতটা হাতিয়ার, তার চেয়ে অনেক বেশি যুদ্ধক্ষেত্র। সংস্কৃতির বুকের ভেতরেই অহরহ প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার লড়াই চলছে। তুলসীদাসের কাব্য থেকে কবীরের দোহা হয়ে গান্ধীজীর ঈশ্বর আল্লা তেরে নামে রামের রূপান্তর যে পথে ঘটে সেটাও সংস্কৃতির অভ্যন্তরে ঘটতে থাকা দ্বন্দ্ব সংঘর্ষেরই ফল। এভাবেই খ্রিস্টিয় গসপেলের আন্তঃপাঠ্যতায় আই শ্যাল ওভারকাম, উই উইল ওভারকাম হয়ে উই শ্যাল ওভারকামের চেহারা নেয়। গানের ভেতর থেকেও গানের বিরুদ্ধে লড়াই চলে। দ্বিজেন্দ্রলালের জাতীয়তাবাদী উগ্র চেতনার প্রকাশ সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি রবীন্দ্রনাথের মানবিক স্বাদেশিকতায় জানি নে তোর ধনরতন আছে কিনা রাণীর মতন, শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে-তে পরিণত হয়। এর ধারাবাহিকতায় পৃথিবী আমারে চায় রেখো না বেঁধে আমায়,খুলে দাও প্রিয়া, খুলে দাও বাহুডোর এর উত্তর সলিল চৌধুরী দেন এভাবে আজ নয় গুণ গুণ গুঞ্জন প্রেমের, চাঁদ ফুল জোছনার গান আর নয়, ওগো প্রিয় মোর, খোলো বাহুডোর, পৃথিবী তোমারে চায়। সলিল চৌধুরীর শিল্পীত রাজনৈতিক তুলির টানে প্রিয়া একটা অন্য অবস্থানে চলে যায়। সংগীতের এই বামপন্থায় তাৎক্ষণিক চীৎকৃত ডাক নেই, কিন্তু গভীরতর রাজনীতি রয়েছে। সলিল চৌধুরীর চেতনায় সংগীত শুধু হাতিয়ার ছিল না, ছিল যুদ্ধক্ষেত্রও। তাই রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলি তেভাগার সেই মেয়েতে রূপান্তরিত হয়, রূপকথার সাত ভাই চম্পা আর একটি পারুল বোন সমকালের মাটিতে এসে দাঁড়ায়। 

সংগীতের বামপন্থার গভীরে আরো দু’টি প্রশ্ন রয়েছে। প্রথম, গানে ফর্ম কি এবং কনটেন্ট কী? সাধারণ ভাবে ধরে নেওয়া হয় সুর ফর্ম আর কথা কনটেন্ট। এটা একটা অতি পুরাতন ভ্রান্তি। সুর শুধুই ফর্ম হয় তবে তো বিঠোফেন থেকে আলি আকবর রবিশঙ্কর, সারা জীবন শুধু ফর্মই বাজালেন। কোনো কনটেন্ট দিলেন না। আবার ফর্মের শরীরেও কি কোনোই কনটেন্ট থাকে না? কিংবা একটি কনটেন্ট কি প্রকাশিত হতে পারে যেকোনো ফর্মের মাধ্যমে? এই যে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন কনটেন্ট অ্যান্ড ন্যাশনাল ইন ফর্ম’ জাতীয় প্রতিপাদ্য কি ফর্ম ও কনটেন্টকে দু’টি পরস্পর বিযুক্ত সত্তায় বিভাজিত করে দেয় না? ১৯৫৩ সালের গণনাট্য সম্মেলনের সেই বিতর্ক কি এই বিভ্রান্তিরই প্রতিফলন নয়? সলিল চৌধুরী যখন বলেন যে নতুন রাজনীতিকে প্রকাশ করার সাংগীতিক ভাষাও হবে নতুন। সংগীতের এই লড়াই বা সামগ্রিক ভাবে সংস্কৃতির লড়াই কি অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত বা শখের সংস্কৃতি কর্মী দিয়ে সম্ভব? সলিলের মত ছিল গণনাট্যের শিল্পীকে সাংগীতিকভাবে শিক্ষিত হতে হবে; লোকশিল্পীকেও। ঠিক যেভাবে শ্রেণি আন্দোলন মজুর কৃষকের দৈনন্দিনের বাস্তব হওয়া সত্ত্বেও তাকে রাজনীতির পাঠ নিতে হয়। নতুন পৃথিবীর সংস্কৃতির যুদ্ধের যোদ্ধা হয়ে উঠতে হলে লোকশিল্পীকেও সহজাতভাবে শেখা সংগীতের বাইরেও অতিরিক্ত পাঠ নিতে হবে। এই প্রসঙ্গেই দ্বিতীয় প্রশ্নের অবতারণা করা যায়। কারা হবে, সংস্কৃতি আন্দোলনের মূল সৈনিক। গণনাট্যের সপ্তম সর্বভারতীয় সম্মেলনের কাছাকাছি সময়েই ১৯৫৪ সালে ঋত্বিক ঘটক পার্টিতে ‘থিসিস অন কালচারাল মুভমেন্ট’ নামে একটি দলিল পেশ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আংশিক সময়ের বা শখের সংস্কৃতি কর্মী সংস্কৃতি আন্দোলনের মূল সৈনিক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। মূল সৈনিক হবে তারাই যাদের জীবন জীবিকা সংস্কৃতির উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ হোলটাইমার বা পেশাজীবী সংস্কৃতি কর্মী কিংবা লোকশিল্পী। সলিল চৌধুরীর অভিমত অভিন্ন হলেও তিনি গণনাট্য শিল্পীদের জীবনধারণের বাস্তব সংকট নিয়ে লিখেছেন। তিনি নিজেও পেশাদার শিল্পীই ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ছ’জন ছোটভাইবোনের সংসারের দায়িত্ব পালন করতেই বম্বের চলচ্চিত্র জগতে গিয়েছিলেন। কারণ বিদ্যমান অবস্থায় কলকাতার জীবনে তার কোনো পথ খোলা ছিল না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গণনাট্য আন্দোলনের ভাঙা গড়ার পর্বে বহু গণনাট্য শিল্পী বম্বের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র জগতে তখন যেতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ জীবনধারণের কোনো বিকল্প পথ ছিল না। সবচেয়ে মর্মান্তিক অবস্থা হয়েছে শ্রমজীবী শিল্পীদের। দশরাথ লালের মত শিল্পী যিনি পেশায় ট্রাম শ্রমিক ছিলেন তাঁকে গণনাট্যের আন্ধেরি কমিউনে নিয়ে গিয়েছিলেন পিসি যোশী। রণদিভে পর্বে আন্ধেরি কমিউন ভেঙে দেওয়া হলে দশরথ লালকে প্রাণ ধারণের জন্যে কলকাতার কসাইখানায় কাজ নিতে হয়। এই প্রশ্ন অন্য একটি প্রশ্ন তোলে, মূলধারার সংস্কৃতিতে জীবনধারণের জন্যে যুক্ত হয়ে কি সমান্তরালে সংস্কৃতি আন্দোলনের কর্মী হওয়া যায়? সেক্ষেত্রে সলিল চৌধুরী থেকে সাম্প্রতিকের সমতুল্য দৃষ্টান্ত অবধি বাণিজ্যিক সংস্কৃতির অঙ্গনে জীবিকার প্রয়োজনে যাওয়াকে পলায়ন হিসেবে অভিহিত করা কি যায়? সলিল চৌধুরীর জীবনই ধরা যাক। তিনি বম্বের চলচ্চিত্র জগতে যখন গেছেন, তখন গণনাট্যকে পেছনে ফেলে যান নি। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। সংগীত স্রষ্টা হতেও যান নি। গ্রামের কৃষকের শহরের রিকশাওয়ালায় পরিণত হওয়ার রাজনৈতিক আখ্যানের স্ক্রিপ্ট লিখেই ডাক পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সংগীত রচনার ক্ষেত্রেও প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁর গণনাট্যের আদর্শকে। এমনকি তাঁর যে বাংলা আধুনিক গানগুলিকে নিছক প্রেমের গান বলা হয়, তার গভীরে আলো ফেললে দেখা যাবে সেখানেও তাঁর বামপন্থা কীভাবে উপস্থিত রয়েছে। হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ এর সুর থেকে করা ক্লান্তি নামে গো গানকে ও আলোর পথযাত্রী র পাশাপাশি শুনলে এর রাজনীতি বোঝা যাবে। গভীরভাবে রবীন্দ্রভক্ত সলিল যিনি রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর একমাস অশৌচ পালন করেছিলেন, তাঁরও অনুপ্রেরণা রয়েছে নানা ভাবে। সতীর্থ বন্ধুদের সমালোচনা ও আক্রমণের স্মৃতি ও প্রত্যক্ষ সংসর্গ থেকে তার সরে যেতে হওয়ার বেদনার ছায়া আছে পথ হারাবো বলেই এবার গানে। এই গানের পরোক্ষে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ওরে সাবধানী পথিক গানটি। এই গানটি এতটাই হয়ত তাঁর প্রিয় ছিল তাই একই নামে তাঁর একটি অসমাপ্ত গল্প রয়েছে যেখানে এমন একটি গ্রামের কথা বলা হয়েছে যা তার নিজের গ্রামের মতই। রবীন্দ্রনাথের গানের ‘তুমি’ যেমন শুধু ঈশ্বর নয়, ঈশ্বরের মোড়কে জীবন, সলিল চৌধুরীর গানের ‘তুমি’ও শুধু প্রেয়সী নয়। রবীন্দ্রনাথের জীবন দেবতার মত সলিলের তুমি জীবন প্রেয়সী। প্রেয়সীর মধ্যে জীবনকে দেখেছেন, জীবনের মধ্যে প্রেয়সীকে। এভাবে দেখলেই বহু আধুনিক গানের ভেতর ঘরের চাবি খুলে সংগীতের এক নতুন বামপন্থার সন্ধান পাওয়া যাবে। ১৯৮১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক সাক্ষাৎকারে সলিল চৌধুরী বলেছিলেন, যিনি জীবনে একবার মার্কসবাদী হয়েছে সে আজীবন মার্কসবাদীই থাকে যদি অন্তর থেকে মার্কসবাদকে গ্রহণ করে থাকে। তিনি আরও বলেছেন, আজীবন সংগীতে যা সৃষ্টি করেছেন সেটা মার্কসবাদী চেতনা থেকেই করেছেন। 

সেই অর্থে তাঁর গোটা জীবনই এক সংগীতের বামপন্থা। 


প্রকাশের তারিখ: ১৯-নভেম্বর-২০২২

© কপিরাইট মার্কসবাদী পথ. সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রীট , কলকাতা ৭০০০১৬, +91 33 2217 6638, +91 70599 23957
marxbadipath.22@gmail.com
www.marxbadipath.org